Forgot your password?

সাব্বাশ হামাস !! সাব্বাশ ফিলিস্তিন!!

ফরহাদ মজহার

Wednesday 16 July 2014
print

 ‘গাজায় হত্যা বন্ধ কর’, ‘শিশু হত্যা বন্ধ কর’, Stop Killing in Gaza’, ‘Stop Killing Children’ – এইসব প্লাকার্ড হাতে বাংলাদেশে এবং বিভিন্ন দেশে ভদ্রলোকী শ্লোগান দিয়ে শহরের নিরাপদ রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে হাজার চেঁচামেচি করলেও ইসরাইল বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করবে না, করছে না, এবং তাদের বোমা মারাও থামবে না। যারা শুধু প্লাকার্ড হাতে প্রতিবাদ করছেন তারা তাঁদের ব্যাক্তিগত বিবেকের তাড়া থেকে করছেন। করুন। তবে আমাদের আরও গভীর ভাবে ভাবতে হবে।

জেনে হোক বা না জেনে হোক, যখন আমরা শুধু শান্তি, অস্ত্র বিরতি, ও সদর্থে হত্যার নিন্দা করি, তখন আমরা ফিলিস্তিনী জনগণের মুক্তি সংগ্রামের বিরুদ্ধে দাঁড়াই এবং তাদের ন্যায়সঙ্গত সশস্ত্র যুদ্ধকে ‘ক্রিমিনালাইজ’ করার শর্ত তৈরি করি। শান্তি, অহিংসা ও যুদ্ধ বিরতির কথা বলে বাংলাদেশের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধেও অনেক ভদ্রলোকী বয়ান ছিল। তাদের কথা শুনলে আমরা আজও পাকিস্তানের উপনিবেশ থাকতাম।

আসলে এ লড়াইকে জায়নবাদ, জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী যুগের সেটলার কলোনিয়ালিজম হিশাবে বুঝতে না পারলে আমরা মারাত্মক ভুল করব। বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে এর প্রাসঙ্গিকতাও আমরা ধরতে পারব না।

জায়নবাদ আর জাতীয়তাবাদ একই কথা – সেটা বাঙালি বা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ হোক কিম্বা হোক মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ বা অন্য যে কোন নামের জাতীয়তাবাদ। বাঙালি বা বাংলাদেশী বলে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক চিরকালীন ও অবিচ্ছেদ্য – এই মতাদর্শ জায়নবাদ থেকে আলাদা কিছু নয়। আধুনিক ও তথাকথিত সেকুলার কালে জায়নবাদে জাতীয়তাবাদের এই ধর্মীয় রূপ্ই আমরা প্রত্যক্ষ করি। জায়নবাদ দাবি করে, আল্লার সঙ্গে ইহুদিদের একটা ‘চুক্তি’ হয়েছে, অতএব ফিলিস্তিনে তাদের দাবি অনুযায়ী একটি ইহুদি রাষ্ট্র কায়েম করতেই হবে, এর বিরুদ্ধে কোন ইহলৌকিক বা সেকুলার যুক্তি খাটবে না। অন্য কোন ধর্মের যুক্তিও খাটবে না।

ধর্মগ্রন্থের কাহিনী অনুযায়ী ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্রের পক্ষে যারা দাঁড়ান, তারা মূলত জায়নবাদেরই সমর্থক। জায়নবাদের যুক্তি মেনে নিলে হিন্দুর জন্য একটি হিন্দু রাষ্ট্র, মুসলমানদের জন্য মুসলমান বা ইসলামি রাষ্ট্র, খ্রিস্টানদের জন্য খ্রিস্টান রাষ্ট্র, বৌদ্ধদের জন্য বৌদ্ধ রাষ্ট্র – এই সবের পক্ষেও একই সঙ্গে দাঁড়ানো হয়। মুখে বলি আর না বলি, ধর্মগ্রন্থে থাকুক বা না থাকুক, জায়নবাদ অন্য সকল ধর্মের জায়নবাদী দাবিকেই ন্যায্য করে তোলে। একই সঙ্গে একটি ভূখণ্ডের সঙ্গে একটি জাতির অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের জাতীয়তাবাদী বয়ানকেও বটে।

আরও নানান কারন ছাড়াও জাতীয়তাবাদ ভয়াবহ জিনিস। এর মধ্যে কমিউনিস্টদের জাতীয়তাবাদ হচ্ছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট চরিত্রের। সশস্ত্র হোক কি নিরস্ত্র -- কমিউনিস্ট যে কোন নিপীড়িত জাতীর মুক্তি সংগ্রামকে নিঃশর্ত সমর্থন করে, কিন্তু কোন প্রকার কাল্পনিক ‘জাতি’ বা ‘জাতীয়তাবাদ’কে প্রশ্রয় দেয় না। বিভিন্ন দেশে কমিউনিজমের বারোটা বাজাবার ক্ষেত্রে এদের অবদান অসামান্যই বলতে হবে।

চল্লিশ দশকের শেষ দিকে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের অবশিষ্ট গুলোর পরিসমাপ্তি ঘটতে শুরু করে। আমাদের এ অঞ্চলে সাতচল্লিশ সালে ইংরেজ শাসনের অবসান যেমন। কিন্তু আশ্চর্য যে একই সময়ে সাম্রাজ্যবাদ নতুন কিসিমের উপনিবেশ বানাতে শুরু করে। নতুন ধরনের ‘সেটলার কলোনিয়ালিজম’। তারা ইউরোপ থেকে ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের বিতাড়িত করে তাদের জন্য আরব ভূখণ্ডে জবরদস্তি চিরস্থায়ী আবাস বানিয়ে তাকে রাষ্ট্রের মর্যাদা দেয়। আর সেটা করতে গিয়ে ফিলিস্তিনীদের নিজ বাসভূমি থেকে বিতাড়িত করা হয়, তারা দেশান্তরী হয়। বিভিন্ন জায়গায় তাদের আশ্রয় হয় শরণার্থী শিবিরে। এই অপরাধকে ন্যায্যতা দেবার জন্য বিশ্বযুদ্ধে ইহুদিদের নির্যাতন ও গণহারে মারাকে (holocaust) অজুহাত হিসাবে খাড়া করে তারা। সাদা মানুষগুলো এর আগে ইউরোপ থেকে গিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা ইত্যাদি মহাদেশে বসতি স্থাপন করেছে। সেই মহাদেশের আদি অধিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে মহাদেশগুলো দখল করে নিয়েছে তারা। যাদের হত্যা করতে পারে নি তাদের এখনও রেখে দিয়েছে রিজার্ভে। আফ্রিকা মহাদেশের অনেককে দাস বানিয়েছে তারা। আমেরিকান ইন্ডিয়ান, মায়া, ইনকা ইত্যাদি সভ্যতাকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে তারা। সে ইতিহাস বড়ই নির্মম, নিষ্ঠুর ও নৃশংস। সেই সকল হোলোকস্টের কথা ভুলে গিয়ে আজ সাম্রাজ্যবাদ শুধু ইউরোপের হোলোকস্টের কথা বলে। শুধু তাই নয়। সকল প্রকার মারণাস্ত্রে জায়নবাদী ইসরাইলকে সজ্জিত করেছে তারাই। সকল প্রকার আর্থিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়ে ফিলিস্তিনীদের নিজ জন্মভূমি থেকে তারা উৎখাতই শুধু করে নি, নির্মম ভাবে হত্যা করছে বছরের পর বছর। আরব দেশগুলোতে টিকিয়ে রেখেছে তাঁবেদার শাসকগোষ্ঠী। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও ফিলিস্তিনীরা তাদের সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে।

ইউরোপে ইহুদীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা চর্চার (anti-semitism) পরিণতি হিসাবে তাদের নির্যাতন ও হত্যা করে আবার সেই ইহুদিদেরই হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাকে সাম্রাজ্যবাদ মহিয়ান করতে চায় কেন? কারন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করার পেছনে তাদের জ্বালানি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার স্বার্থ জড়িত সন্দেহ নাই, কিন্তু একই সঙ্গে রয়েছে তাদের অতীতের জঘন্য ও ঘৃণ্য অপরাধ লুকিয়ে রাখার মতলব। যেন ইহুদি হোলকস্টের কাহিনী দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় সংঘটিত অন্যান্য হোলকস্টের কথা ভুলিয়ে দেওয়া যায়। ইউরোপের এই সাদা মানুষগুলোই কি আদিবাসীদের নির্বিচারে হত্যা করে নি? জনগোষ্ঠির পর জনগোষ্ঠিকে কি নিশ্চিহ্ন করে দেয় নি? এই কিছুদিন আগেও কালোদের দড়িতে লটকিয়ে মারে নি তারা? পুড়িয়ে হত্যা করে নি? সেই সকল হোলকস্টের কী হোল? দুনিয়ায় ইহুদিরাই একমাত্র নির্যাতীত জাতি নয়, অন্যান্য নির্যাতীত জাতিকে যেভাবে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে তাদের ইতিহাস আমরা কি মনে রেখেছি?

modhy amerikay

মধ্য আমেরিকায় স্পেনিশ ঔপনিবেশিক শক্তি সেই দেশ দখল করতে  গিয়ে  কিভাবে বহু জনগোষ্ঠিকে হত্যা করেছে তার একটি চিত্র-বর্ণনা। এই ধরণের বহু জাতিগত বিপর্যয় ( holocausr) ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা হয়েছে। রয়ে গিয়েছে স্মৃতি। স্মৃতি থেকে আঁকা এই সকল চিত্রকলাই ইতিহাসের নির্মম ও নিষ্ঠুর ঘটনার কথা আমাদের মনে করিয়ে দেয়। কোন জনগোষ্ঠিকে নির্মূল করে দেবার অভিজ্ঞতা শুধু ইহুদিদেরই আছে, আর কারো না, এটা নিছকই একই মিথ মাত্র।  অথচ এই অজুহাত দিয়েই ফিলিস্তিনীদের উৎখাত করে তাদের ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইহুদিরাই দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশী নির্যাতীত জাতি -- এই মিথের লড়াই জায়নবাদ প্রতিরোধের অংশ।


 

আমরা ইতিহাস ভুলে যাই। ভুলে যাই তথাকথিত ‘আধুনিকতা’ বা পাশ্চাত্য সভ্যতার ইঁটপাথরগুলো তৈরি হয়েছে সেইসব মানুষের হাড় দিয়ে যাদের গায়ের রং ছিল কালো, বাদামি বা অন্য রঙের। বর্ণবাদ আমাদের নিজেদের কলিজাকে কয়লার কালিতে কালো করে ফেলেছে। তাই যারা ইহুদিদের রাষ্ট্রের দাবির পক্ষে দাঁড়িয়ে আজ ফিলিস্তিনী জনগণকে সেই রাষ্ট্র মেনে নেবার কথা বলেন, তারা জায়নবাদের পক্ষেই শুধু দাঁড়ান না, একই সঙ্গে তারা বর্ণবাদের পক্ষেও বটে। ফিলিস্তিনী জনগণের সংগ্রাম এই দুইয়েরই বিরুদ্ধে।

অন্য জনগোষ্ঠি নিশ্চিহ্ন হয়েছে, কিম্বা ধুঁকছে তাদের জন্য বরাদ্দ ‘রিজার্ভ’ গুলোতে। কিন্তু ফিলিস্তিনীরা দমে নি। গাজাকে কুখ্যাত প্রিজন হাউস বানাবার পরেও লড়ছে তারা। সাবাশ হামাস। গাজা থেকে প্রতিটি রকেট ছোঁড়ার অর্থ সেই সব হোলকস্টের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেওয়া। আমেরিকান ইন্ডিয়ান, মায়া, ইনকা, দাস হিসাবে ধরে নিয়ে যাওয়া আমেরিকায় আফ্রিকার কালো মানুষসহ আরও অগুনতি মানুষ যাদের ইতিহাস সাম্রাজ্যবাদ মুছে ফেলতে বদ্ধ পরিকর।

সাবাশ ফিলিস্তিন! সাম্রাজ্যবাদী যুগে সেটলার কলোনিয়ালিজমের বিরুদ্ধে এই লড়াই। সাম্রাজ্যবাদের হৃদপিণ্ড এখানেই। এর বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়া জাতীয়তাবাদ, জায়নবাদ ও পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিলয় ঘটিয়ে দুনিয়ার সকল মানুষের ঐক্য কায়েমের জন্য শর্ত তৈরি অসম্ভব। অন্য কোন শর্ট কাট রাস্তা নাই।

দুনিয়ায় জাতীয়তাবাদী ও জায়নবাদী বহুত আছে। কিন্তু তাদের মধ্যে তারাই নিকৃষ্ট যারা প্রগতির ভান ধরে। জায়নবাদের সবচেয়ে চরম বিকার এদের মধ্যেই চরম ভাবে দৃশ্যমান হয়। নিজেদের পোষা মতাদর্শের সঙ্গে মিলে না বলে এরাই নিপীড়িত জনগোষ্ঠির ন্যায্য যুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়ায়।

পেটিবুর্জোয়া ইতিহাস ও বাস্তবতাকে নয়, নিজের পোষা মনগড়া আদর্শের সঙ্গে না মিললে ইতিহাস ও বাস্তবতাকেই অস্বীকার করে বসে।

এই উপদ্রব থাকবে। এটাও বাস্তবতা।


নিজের সম্পর্কে লেখকঃ / About Me:

কবিতা লেখার চেষ্টা করি, লেখালিখি করি। কৃষিকাজ ভাল লাগে। দর্শন, কবিতা, কল্পনা ও সংকল্পের সঙ্গে গায়ের ঘাম ও শ্রম কৃষি কাজে প্রকৃতির সঙ্গে অব্যবহিত ভাবে থাকে বলে মানুষ ও প্রকৃতির ভেদ এই মেহনতে লুপ্ত হয় বলে মনে হয়। অভেদ আস্বাদনের স্বাদটা ভুলতে চাই না।



View: 705

comments & discussion (0)

Bookmark and Share