ফেব্রুয়ারি ভাবনা: ১

জাতীয় রাজনীতির মৌলিক পরিবর্তন কখন কিভাবে ঘটে সেটা সবসময় সংবাদপত্র পড়ে কিম্বা গবেষণা করে বোঝা যায় না। যে প্রতীকী চিহ্নগুলো সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী তাদের শ্রেণীর আধিপত্য কায়েমের জন্য গড়ে তোলে সেই চিহ্নগুলোর বিকাশ, রূপান্তর ও ক্ষয় বিচার খুবই জরুরী কাজ। আমরা লক্ষ্য করলে বুঝব বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদ বা বর্ণবাদী বাঙলিত্বের ক্ষয় একই সঙ্গে শহিদ মিনার বা বেদীকেও গৌণ করে তুলেছে। তার মানে কিন্তু নিজের ভাষার সঙ্গে আমাদের বন্ধন শিথিল হওয়া না। বরং আরও দৃঢ় হওয়া। মাতৃভাষা মানে শুধু 'প্রমিত' ভাষা না, বরং তার নানান জীবন্ত চর্চা জনগণের মধ্যে জারি রয়েছে যার মধ্যে আমরা 'বাস' করি।

ভাষা ও সংস্কৃতি বাঙালি জাতিবাদীদের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশের পেটি বুর্জোয়া অধিপতি শ্রেণি ভাষা নিয়ে যেসকল অনুমান আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয় তার সঙ্গে সাধারণ মানুষের ভাষা সংক্রান্ত চিন্তা ও চর্চার বিস্তর ফারাক রয়েছে। তাই 'শহিদ মিনার' ক্ষয় পাওয়ার অর্থ ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীর একচেটিয়ারও ক্ষয়। একই সঙ্গে ভাষা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র করে তাদের রাজনীতির ক্ষয়ও বটে।

অর্থাৎ শহিদ মিনার তার রাজনৈতিক তাৎপর্য হারিয়েছে, কিন্তু ভাষা বা ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য নয়। তাই শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে নতুন ভাবে ‘শাহবাগ’ বানাবার প্রক্রিয়ায় আমরা সক্রিয় দেখি। অর্থাৎ আরেকটি নতুন স্থানকে বিশেষ রাজনৈতিক তাৎপর্য দেবার চেষ্টা চালাচ্ছে তারা।

বাংলাদেশে ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি এই একই শ্রেণী তাদের শ্রেণী আধিপত্য জারি রাখার দরকারে নতুন করে ‘শাহবাগ’ বানাতে চেয়েছে। কিন্তু সেটা শহিদ মিনার হয় নি। দ্রুতই তা ফ্যসিবাদ এবং ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের সহযোগী হিশাবে হাজির হয়। মহান একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার।

চিহ্ন, প্রতীক, স্থানের প্রতি আমরা সাধারণত নজর রাখি না। সব সময় ক্ষয় নজরেও পড়ে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার জন্য এই দিকগুলো খুবই ইন্টারেস্টিং দিক।

তাই বলা যায়, পেটি বুর্জোয়া শহুরে শিক্ষিত শ্রেণীর বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি, শক্তিবৃদ্ধি, আধিপত্য বিস্তার এবং সাম্প্রতিক ক্ষয়ের মহৎ চিহ্ন হচ্ছে ‘শহিদ মিনার’। ভাষা আর সংস্কৃতি নিয়ে তাদের রাজনীতির পর্ব শেষ হয়ে গিয়েছে। এটা পরিষ্কার। এটা অনস্বীকার্য যে বাংলাদেশের জনগণের আবেগ ও আত্মপরিচয়ের লড়াইয়ের সঙ্গে ভাষা আন্দোলন ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। কিন্তু শহিদ মিনার ও এবং তার ‘বেদী’, যেখানে জুতা পরে যাওয়া নিষিদ্ধ – বাংলাদেশী জনগোষ্ঠির বৃহৎ অংশকে বাদ দিয়েই গড়ে উঠেছে। ‘শহিদ মিনার’এর শ্রেণী চরিত্র এই দিকগুলো বিবেচনায় নিলে আমরা সহজেই বুঝতে পারব। এর সংবেদনার ক্ষয় অনিবার্য ছিল।

প্রথমত শহিদ মিনারে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের স্থান নাই। এই না থাকাটা ঐতিহাসিক ভাবে অন্যায় কিছু নয়।ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস আলাদা। ভাষা আন্দোলন শ্রমিক বা কৃষকের আন্দোলনের ফল নয়। তাদের সংস্কৃতি শহুরে পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীর সংস্কৃতিও নয়। শহিদ মিনার শ্রমজীবী মানুষের কোন চিহ্ন, স্মৃতি বা সংগ্রাম নিয়ে বানানো হয় নি। দ্বিতীয়ত সাধারণ মানুষের সাংস্কৃতিক অভিপ্রকাশও শহিদ মিনার ধারণ করে না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে শহিদ মিনার তা ধারণ করতে পারতো না। সেই সম্ভাবনা তার ছিল। কিন্তু পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের অস্ত্র হয়ে ওঠার কারনে সেটা সম্ভব হয় নি। এর সার্বজনীন সংবেদনা সাধারণ মানুষের আত্মস্থ করার ক্ষেত্রে পেটি বুর্জোয়া শিক্ষিত শহুরে শ্রেণী প্রবল বাধা হয়েই এতোকাল বিরাজ করেছে। সাধারণ মানুষের কাছে শহিদ মিনারের আবেগ, আকর্ষণ ও সংবেদনাও তাই দিন দিন কমেছে। শহিদ মিনার পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীর জয় স্তম্ভের অধিক কিছু হয়ে উঠতে পারে নি। তার পেটি বুর্জোয়া রাজনৈতিক আবেদনও ক্রমে ক্রমে ফুরিয়েছে। তাই পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীকে নতুন করে ‘শাহবাগ’ বানাবার চেষ্টা করতে হয়েছে।

জাতীয় প্রতীক বা পবিত্র চিহ্ন বানানোর মধ্য দিয়ে অধিপতি শ্রেণী তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, কিম্বা আত্মপরিচয় নির্মাণের চর্চা করে। নিজ নিজ শ্রেণীর আধিপত্য কায়েম করার সঙ্গে কিছু কিছু স্থান, স্থাপনা, দিন বা ঘটনাকে ‘পবিত্র’ বিষয় বা চিহ্নে রূপান্তর করা স্বাভাবিক ব্যাপার। পবিত্র বা ঐতিহাসিক চিহ্ন, মনুমেন্ট, স্থান, স্থাপত্য, ভাস্কর্য্য ইত্যদি তৈরি ও প্রতিষ্ঠা অধিপতি শ্রেণীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম রাখার ক্ষেত্রে খুবই নির্ধারক ভূমিকা পালন করে। ‘শহিদ মিনার’ সেই দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। শহিদ মিনারকে পবিত্র পীঠস্থান বা বেদী বানানোর প্রক্রিয়া রাজনৈতিক ভাবে ইসলাম এবং মুসলমানকে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির প্রতিপক্ষ হিশাবে দাঁড় করানোর প্রক্রিয়া থেকে আলাদা কিছু নয়। কিন্তু আমার ধারণা এই পর্বটা আমরা এখন অতিক্রম করে যাচ্ছি।

কিন্তু এর বিপজ্জনক দিক হোল শহিদ মিনার, অর্থাৎ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির বিপরীতে পালটা ইসলামকে দাঁড় করানো। অর্থাৎ একই মূদ্রার উলটা পিঠ দেখান। অথচ দরকার এই প্রকার ভেদ ও বিভাজনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। একটির বিপরীতে আরেকটি খাড়া করবার সর্বনাশী রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানোটাই এখনকার দরকারি কাজ। পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে উপায় গণ্য করে ইসলামের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতিবাদের পতাকা তুলুক, কিম্বা পালটা ইস্লামকে উপায় গণ্য করে পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী ইসলামী জাতিবাদ করুক -- দুটোই পরিত্যজ্য। ভাষা ও দ্বীণ দুটো নিয়েই জনগণ। দুটো নিয়েই আমরা। বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জনগপণ।

শহিদ মিনারের উত্থান, প্রতিষ্ঠা এবং ক্রমে গৌণ হয়ে যাওয়া একটা ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। শহিদ মিনারের গৌণ হয়ে যাওয়া আমরা বুঝব শাহবাগের উত্থান এবং স্বল্প স্থায়িত্ব দ্বারা। এই সময়কালটা বাঙালী জাতিবাদের ক্ষয়ের কাল। শহিদ মিনার আগের মতো জাতিবাদী আবেগ ধারণ, তৈরি ও বিতরণ করতে পারছে না। নতুন চিহ্ন দরকার। শহিদ মিনার গৌণ হয়ে যাবার প্রক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালি জাতিবাদীদের ‘শাহবাগ’ গড়ে তুলতে হয়েছে। এর দ্বারা আমরা বাঙালি জাতিবাদী রাজনীতির উত্থান ও পতন যেমন বুঝতে পারি, তেমনি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাঙালি জাতিবাদ কিভাবে নতুন করে সার্বজনীন মানবাধিকারের পাটাতন ব্যবহার করছে সেটাও লক্ষ্য করি। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের শাস্তি হিশাবে অভিযুক্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি, অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা এবং ফাঁসি চেয়ে মোমবাতি জ্বালানোর মধ্য দিয়ে ফ্যসিস্ট সংস্কৃতির দৃশ্যমান রূপও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। শাহবাগ একই সঙ্গে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার সাংবিধানিক রূপ ও বৈশিষ্ট্য পরিষ্কার আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বিচার ব্যবস্থার ভূমিকাও আমরা দেখছি।

ফলে এটা অনুমান করা যায়,‘শাহবাগ’ শহিদ মিনারের মতো দীর্ঘস্থায়ী কোন রূপ বা চিহ্ন পরিগ্রহণ করতে সক্ষম হবে না। একে ' প্রজন্ম চত্বর' দাবি করা হাস্যকর। তরুণ প্রজন্মের যে সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে বাদ দিয়ে শাহবাগ বানানোর চেষ্টা হয়েছিল তাদের শাপলা চত্বরে জনগণ দেখে ফেলেছে। শাহবাগ কোন মহৎ বা সফল আন্দোলনের চিহ্ন হয়েও উঠতে পারবে না। হেফাজতে ইসলাম সেই সম্ভাবনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে। শাহবাগ পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীর সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক চেতনার সর্বোচ্চ রূপ, যা শহিদ মিনারের রাজনৈতিক সংবেদনার ক্ষয় ঘটাবার বাড়তি কারণ হয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু ভাল দিক হোল, শ্রেণী হিশাবে শহুরে শিক্ষিত পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীর আদর্শিক ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা এখন আগের চেয়ে অনেক স্পষ্ট। পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীর সংবেদনশীল অংশ যা এখন উপলব্ধি করতে সক্ষম বলে আমি মনে করি।

‘শ্রেণী’ কথাটা স্রেফ অর্থনৈতিক বর্গ নয়। জন্মসূত্রে আমরা যে কোন অর্থনৈতিক পরিবারে জন্ম গ্রহণ করতেই পারি। কিন্তু সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর লড়াই সংগ্রামের সঙ্গে আমাদের একাত্মতা, পক্ষপাত, বিভিন্ন চিন্তা বা আদর্শের প্রতি আমাদের সম্মতি, নিজ নিজ সাংস্কৃতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ভূমিকা – ইত্যাদি দ্বারা আমরা কে কোন শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করি বা কোন শ্রেণীর পক্ষে কাজ করি তা বোঝা যায়।

এটা পরিষ্কার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই মূলত পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীর আদর্শ, সংস্কৃতি, ক্ষমতা ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে শ্রমিক, কৃষক ও নিঃস্ব জনগণের লড়াই হিশাবে হাজির হতে বাধ্য। সেটা তাহলে একই সঙ্গে আমাদের নিজেদের পেটি বুর্জোয়া অনুমান, আদর্শ , সক্রিয়তা, পেটি বুর্জোয়া আচার আচরণ ইত্যাদি সব কিছুর বিরুদ্ধেও লড়াই। ব্যক্তি সমাজ কিম্বা সামাজিক-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত থেকে বিচ্ছিন্ন বা স্বাধীন কোন সত্তা নয়।

আশার কথা হচ্ছে বাংলাদেশ নিয়ে নতুন করে ভাববার পরিস্থিতি আগের চেয়েও অনেক বেশী সহজ, স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হয়ে উঠেছে। আমি নিশ্চিত তার লক্ষণ ক্রমে ক্রমে আরও পরিষ্কার হতে থাকবে।

 

 


নিজের সম্পর্কে লেখক

কবিতা লেখার চেষ্টা করি, লেখালিখি করি। কৃষিকাজ ভাল লাগে। দর্শন, কবিতা, কল্পনা ও সংকল্পের সঙ্গে গায়ের ঘাম ও শ্রম কৃষি কাজে প্রকৃতির সঙ্গে অব্যবহিত ভাবে থাকে বলে মানুষ ও প্রকৃতির ভেদ এই মেহনতে লুপ্ত হয় বলে মনে হয়। অভেদ আস্বাদনের স্বাদটা ভুলতে চাই না।



ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।