চিন্তা প্রতিবেদন


Wednesday 02 June 10

print

প্রকাশককে ‘নাই’ করে দিয়ে গায়ের জোরে একটা পত্রিকা বন্ধ করে দিলো সরকার

বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক 'আমার দেশ' পত্রিকা মহাজোট সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। সরকারের কাজকর্মের ওপর সংবাদনিষ্ঠ নজরদারি ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার দিক থেকে তুখোড় ভূমিকা রাখবার কারণে দৈনিক আমার দেশ সাংবাদিকতার পরিমন্ডলে দ্রুত নিজের স্থান করে নেয়। জনগণের স্বার্থ রক্ষার দিক থেকে এই ভূমিকার প্রচন্ড অভাব ছিল বাংলাদেশে। প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনা এবং ছেলে জয়ের বিরুদ্ধে একটা রাষ্ট্রীয় সংস্থা কর্তৃক আনা দুর্নীতির অভিযোগ বিষয়ে একটা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে আমার দেশ, তারপর থেকেই সরকার এই পত্রিকাটার ওপর খড়গহস্ত হয়ে ওঠে। ওপরের ছবিতে ওই প্রতিবেদনের অনলাইন সংস্করণ থেকে নেয়া ছবিতে প্রধানমন্ত্রির পুত্র জয় ও তৌফিক এলাহিকে দেখা যাচ্ছে। শিরোনাম, "তৌফিক এলাহী ও জয়ের বিরুদ্ধে ৫ মিলিয়ন ডলার ঘুষ নেয়ার অভিযোগ : শেভরনকে বিনা টেন্ডারে ৩৭০ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিতে উৎকোচ গ্রহণের বিষয় তদন্ত করছে মন্ত্রণালয়"

অতিসম্প্রতি দৈনিক আমার দেশ বিডিআর বিদ্রোহ বিষয়ে সরকারি তদন্ত কমিটির রিপোর্টও প্রকাশ করে। সরকার এই অতি গুরুত্বপুর্ণ রিপোর্টটি জনসম্মুখে প্রকাশ করে নি। মনে রাখা দরকার বিডিয়ার বিদ্রোহ ও বিপুল সংখ্যক সেনা অফিসার ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নৃশংস হত্যা কেন্দ্র করে শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস রয়েছে তার কোন সুরাহা করতে পারেন নি শেখ হাসিনা। সেনা তদন্ত রিপোর্ট এখনও প্রকাশিত হয়নি। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মী ও পর্যবেক্ষকদের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে বিচারাধীন বিডিআর জওয়ানদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় হেফাজতে থাকা অবস্থায় হত্যা যে সংবেদনা, সন্দেহ ও জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে সেই দিক থেকে দৈনিক আমার দেশ-এর মতো পত্রিকার উপস্থিতি ও মাহমুদুর রহমানে নির্ভীক সাংবাদিকতা ছিল প্রধানমন্ত্রি শেখ হাসিনার জন্য বিপজ্জনক। এসব কারণেই পত্রিকাটি রোষানলে পড়ে, এবং অবশেষে পত্রিকাটির সাবেক প্রকাশক হাসমত আলী হাসুকে গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া, একদিনে মামলা দায়ের, একদিনে পত্রিকাটির ডিক্লারেশান বাতিল এবং একই দিনে সশস্ত্র ভাবে একটি দৈনিক পত্রিকা অফিসে ঢুকে মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে খুবই কলঙ্কজনক ঘটনা।

চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে যে সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের কথা সাধারণত বলা হয়ে থাকে এবং দাবি করা হয় বাংলাদেশের সংবিধান নাকি সেই অধিকার স্বীকার করে -- সেই অধিকার প্রকাশ্যেই দলিত হল। নাগরিক ও মানবিক অধিকারের ফানুস সশব্দে ফুটা হয়ে গেল আমাদের চোখের সামনেই। স্রেফ গায়ের জোরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে 'আমার দেশ'। তবুও যাঁরা মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রতি ক্ষমতাসীনদের প্রতিশ্রুতিকে এখনও মূল্য দেন, তারা এর নিন্দা করবেন, নিন্দা করছেনও অনেকে। তবে এগুলো কদলির বাইরের খোসা। কাঁচকলার ভেতরতাও যে কাঁচকলা সেটা বুঝতে হলে আমাদের আরো গভীরে নজর দিতে হবে।

যাঁরা 'আমার দেশ' পত্রিকার বিরূদ্ধে সরকারের আচরণের নিন্দা করছেন আমরা তবুও তাঁদের প্রশংসা করি। কিন্তু চিন্তার পাঠকদের জন্য নিন্দা যথেষ্ট নয়। ঘটনার পর্যালোচনা এবং গণশক্তি পরিগঠনের প্রতি লক্ষ্য রেখে কোন দিকে আমাদের নজর নিবদ্ধ রাখতে হবে সেই দিকগুলো নির্দিষ্ট করাই আমাদের কাজ। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতার সঙ্গে নির্বাহী ও বিচার বিভাগের সম্পর্ক, সংবিধান ও আইনের মধ্যে পার্থক্য, বুর্জোয়া রাষ্ট্রে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের প্রতি একদিকে প্রতিশ্রুতি অন্যদিকে দিকে তার লঙ্ঘন ইত্যাদি দিক কখনও স্পষ্ট আবার কখনও প্রচ্ছন্নভাবে ফুটে উঠেছে। দৈনিক আমার দেশ-এর ডিক্লারেশান বাতিল, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে মামলা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে এই সম্পর্কগুলোকে যতটুকু সম্ভব আমরা বোঝার চেষ্টা করব। সেই লক্ষে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার আইনী গাফিলতির যে কাহিনী সরকার ও সরকারের সমর্থকরা বানিয়ে ছিলেন তার মর্ম বোঝার জন্য প্রথমে ঘটনাক্রম বোঝা দরকার। ক্রমে আমরা অন্য বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা করব।-- সম্পাদনা বিভাগ।


 

ঘটনাক্রম:

২৬ এপ্রিল ২০০৯: ঢাকার জেলা প্রশাসককে আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড চিঠি দিয়ে জানায় যে, কোম্পানীর বোর্ড অব ডিরেক্টরস এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক কোম্পানীর চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান  আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিযুক্ত হয়েছেন। উল্লেখ্য, প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর নিয়ম অনুযায়ী—সম্পাদক নিয়োগ-প্রত্যাহার-বদল ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে জানাতে হয়।

১৬ জুন ২০০৯: জেলা প্রশাসনের তরফে ঢাকার বিশেষ পুলিশ-সুপার আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডকে জানান যে, নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের আপত্তি নেই।

৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯: মুদ্রণালয়ের নিয়ন্ত্রক ও মুদ্রাকরের নাম বদলের জন্য কোম্পানি আবেদন করে জেলা প্রশাসকের কাছে—তিয়াত্তর সালের প্রিন্টিং প্রেস ও পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী। এবং আইনের বিধান অনুযায়ী এই বদলের বিষয়ে আদালতে ঘোষণাপত্র দেয়। একইসাথে পত্রিকার প্রকাশক বদল করে নতুন প্রকাশ হিশাবে মাহমুদুর রহমানের দায়িত্বগ্রহণের বিষয়টিও জেলা প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।

১১ অক্টোবর ২০০৯: এই দিন সাবেক প্রকাশক হাসমত আলী জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে গিয়ে আইনে নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর করে ঘোষণা দেন যে, তিনি প্রকাশকের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। (বিবিসির সাথে সাক্ষাতকারে জেলা প্রশাসকের দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী)।

৫ নভেম্বর ২০০৯: চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর প্রকাশক বদল বিষয়ে এই দিন অনাপত্তি পত্র দেয়। অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাসুদা খাতুন স্বাক্ষরিত ওই পত্রে বলা হয়, ‘আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশক আলহাজ্ব মোঃ হাসমত আলীর পরিবর্তে জনাব মাহমুদুর রহমানের নাম প্রতিস্থাপন করার অনুমোদন যেতে পারে।’

১৫ মার্চ ২০১০: এইদিন ঢাকার জেলা প্রশাসন এক চিঠিতে আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের কাছে জানতে চায় যে, দৈনিক আমার দেশের প্রিন্টার্স লাইনে কেন এখনো প্রকাশক হিশাবে হাসমত আলীর নাম ছাপা হচ্ছে? জবাবে আমার দেশ চিঠিতে জানায় যে, ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে জেলা প্রশাসনকে মুদ্রণালয়ের নিয়ন্ত্রক-মুদ্রাকর ও প্রকাশক বদল বিষয়ে জানানো হলেও এখনো এবিষয়ে আপত্তি বা অনাপত্তি জানানো হয় নি। কাজেই প্রিন্টিং প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা থাকার কারণে এখনো আগের প্রকাশকের নামই প্রিন্টার্স লাইনে ছাপা হচ্ছে। একই সাথে কোম্পানী কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ জানায় খুব দ্রুত তাদের আবেদন নিষ্পত্তি করতে।

১ জুন ২০১০:  এইদিন রাতে স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার বাহিনী নিয়ে পত্রিকাটির তেঁজগাও শিল্প এলাকস্থ প্রেসে যান এবং প্রেসটি সীলগালা করে বন্ধ ঘোষণা করেন। যদিও  সংবাদ মাধ্যমকে তারা বলেন যে, পত্রিকাটির কোনো বৈধ প্রকাশক না থাকার কারণে পত্রিকাটির ডিক্লারেশন মানে প্রকাশনা বাতিল করেছে জেলা প্রশাসন, ওই সময় তারা প্রকাশনা বাতিল করা বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র কর্মরত সাংবাদিক ও কর্মচারীদের বা বাইরে অপেক্ষারত সংবাদ মাধ্যমকে দেখান নি। এই প্রতিবেদক ১ জুন দিবাগত রাত নয়টা থেকে শুরু করে ২ জুন ভোর পৌনে পাঁচটা তক পত্রিকাটির কাওরান বাজারস্থ বার্তা, সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক বিভাগে হাজির ছিলেন, পুরো সময়ে কোনো আনুষ্ঠানিক দলিলপত্র পত্রিকার কার্যালয়ে পৌছায় নি জেলা প্রশাসন।

ডিক্লারেশন বাতিল করা প্রসঙ্গে এ যাবত পাওয়া একমাত্র সরকারি বক্তব্য

এবং এখনো এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে, লিখিতভাবে ডিক্লারেশন বাতিল করার বিষয়ে পত্রিকাটিকে কিছুই জানায় নি প্রশাসন। অবশ্য বিবিসি রেডিওর বাংলা বিভাগকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ঢাকা জেলা প্রশাসক জনাব মুহিবুল হক কিছু বিষয়ে কথা বলেছেন। অতএব ‘সরকারের বক্তব্য’ কেবল এইটুকুই পাওয়া যায়। সাক্ষাতকারের প্রচারিত অংশের হুবহু পান্ডুলিপি আমরা তুলে দিলাম।

‘‘জেলা প্রশাসক : অ্যাকচুয়ালি আমার দেশ পত্রিকার বর্তমানে কোনো প্রকাশক নেই। নেই বলতে বৈধ কোনো প্রকাশক নেই। কোনো পত্রিকা যদি প্রকাশ করতে হয় তাহলে বৈধ যে আইনটা আছে, ছাপাখানা ও প্রকাশনা  আইন ১৯৭৩ –এর ৫ ধারা অনুযায়ী একজন প্রকাশক থাকতে হবে এবং ৭ ধারা অনুযায়ী তাকে আমাদের সাথে এখানে একটা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করতে হবে। এই পত্রিকার যে বৈধ প্রকাশক ছিলেন তিনি আমাদের অফিসে এসে স্বেচ্ছায় নির্ধারিত ফরমে স্বাক্ষর করে—উনি প্রকাশক হিশাবে অব্যাহতি নিয়েছেন।

বিবিসি: এটা উনি কবে নিয়েছেন ? 

উনি নিয়েছেন এগারো দশ দুই হাজার নয় তারিখে। পত্রিকাটার প্রকাশক ছিলেন আলহাজ্ব মোহাম্মদ হাসমত আলী।

এগারো দশ দুই হাজার নয় . . . আর এখন তো দুহাজার দশ। তো এতদিন ধরে কি হলো- মানে তখনি কি আপনারা কোনো কারজানতে চেয়েছিলেন আমার দেশ পত্রিকার তরফ থেকে, তাদের কাছ থেকে?

হ্যাঁ, আমরা তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলাম। অফিসিয়ালি আমরা তাদের চিঠি দিয়েছি। তারা আমাদেরকে রেসপন্স করেছে। তারা আমাদেরকে অফিসিয়ালি জানিয়েছে- না, এই পত্রিকার আর কোনো প্রকাশক নেই, কাজেই এই পত্রিকা চলতে পারে না। এই কারণে আমরা পত্রিকাটা এখন বাতিল করে দিয়েছি, ঘোষণাটা বাতিল করে দিয়েছি।

আমার দেশকে আপনারা যে চিঠি দিলেন, তার জবাবে তারা স্বীকার করলেন লিখিতভাবে? যে তাদের কোনো প্রকাশক নেই ?

হ্যাঁ, তাদের কোনো প্রকাশক নেই। তারা জানিয়েছে তাদের প্রকাশক নেই।

এবং এটা তারা কবে জানালেন ?

এটা তারা আমাদের জানিয়েছেন কয়েকদিন কিছুদিন কয়েকদিন আগে আমাদের।

মানে আমার দেশের তরফ থেকে কারা তাহলে আপনাদের চিঠির জবাব দিলেন? মানে প্রকাশক যদি না থাকেন তাহলে কে সেই দায়িত্ব নিয়ে আপনাদের চিঠির  জবাব দিলেন?

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জবাব দিয়েছেন।

আমার দেশ পত্রিকার তরফ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে যে তারা এই প্রকাশক বদলের জন্য আপনাদের কাছে অনুমতি চেয়েছিলেন। তো সেটার কি হলো ?

প্রকাশক বদলের জন্য নয়, যে মূল প্রকাশক ছিলেন উনি পদত্যাগ করেছেন আমাদের এখানে ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করে। এরপর আরেকজন প্রকাশক হতে চেয়েছিলেন সেটা আমাদের প্রক্রিয়ায় পড়ে নি বলে তার আবেদনটা নামঞ্জুর করা হয়েছে। কাজেই এখন আমার দেশ পত্রিকার কোনো প্রকাশক নেই।

আপনাদের পক্রিয়ায় পড়ে নি মানে ? মানে, না মঞ্জুরের প্রক্রিয়াটা যদি আমাদের একটু ব্যাখা করেন . .

নামঞ্জুর করার পক্রিয়া হলো যে আমাদের যে আইনটা আছে, যে ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইন অনুযায়ী আবেদন করেছিলেন, আবেদন করার পরে এটা আমরা তদন্তের জন্য পাঠাই, তদন্তে তার পক্ষে মতামত আসে নি। এই কারণে আমরা কোনো প্রকাশককে দিতে পারি নি যিনি আবেদন করেছিলেন। মাহমুদুর রহমান আবেদন করেছিলেন তাকে আমরা প্রকাশক নিযুক্ত করতে পারি নি।

কেন তাকে . . . তার আবেদন নামঞ্জুর করা হলো? মানে তদন্তে কি সমস্যা পাওয়া গেছে সেটা কি তাকে জানিয়েছেন বা সেটা কি বলা যাবে?

আমরা অফিসে . . . আমরা অফিসিয়ালি চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছি। অনেকগুলো বিষয় উল্লেখ আছে। এতটা এই স্বল্প সময়ের ভিতরে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।

এটা আপনারা কবে জানিয়ে দেন তাকে?

আমরা আজকে জানিয়েছি।’’

পাঠক! এত দীর্ঘ উদ্ধৃতি দেয়ার কারণ এখন আমরা পরিস্কার করে দিচ্ছি।

জেলা প্রশাসন ও চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের সাথে যেসব আনুষ্ঠানিক পত্র বিনিময় হয়েছে দৈনিক আমার দেশের সেইসব দলিলপত্র আমাদের কাছে আছে। এবং আছে সরকারের তরফ থেকে পাওয়া একমাত্র বক্তব্য—এই সাক্ষাতকারও। এবার আমরা মিলিয়ে দেখলে পরে স্পষ্ট হয় যে, স্রেফ গায়ের জোরে, অসাংবিধানিক-অগণতান্ত্রিক ও আইন বহির্ভূতভাবে একটা পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হলো। পাশাপাশি এটাও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, সংবাদমাধ্যমের ওপর দমননীতি চালানেওয়ালা বর্তমান সরকার কিভাবে তাদের সর্বশেষ সংবাদমাধ্যম খতম-অভিযান বিষয়ে মিথ্যাচার করলো।

পুলিশি সরকারের মিথ্যা প্রচারণার যন্ত্র

বিবিসি’র প্রথম প্রশ্নের উত্তরে জেলা প্রশাসক স্বীকার করে নিচ্ছেন যে,  ‘এগারো দশ দুই হাজার নয় তারিখে’ অর্থাৎ ১১ অক্টোবর ২০০৯ তারিখে সাবেক প্রকাশক যথানিয়মে ইস্তফা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি যা লুকোচ্ছেন তা হলো; সাবেক প্রকাশকের এই ইস্তফার প্রায় দেড় মাস আগে—৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে আমার দেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেড কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি মারফত জানিয়েছেন যে, কোম্পানি প্রকাশক পদে বদল করেছে এবং এ বিষয়ে প্রশাসনের অনাপত্তির জন্য আবেদন করেছে। আগের এই আবেদনের কথা তিনি লুকাচ্ছেন এবং ওই আবেদনের সপক্ষে সাবেক প্রকাশকের দেয়া ইস্তফার কথাই কেবল বলছেন। তথ্য চেপে যাওয়ার পরে জেলা প্রশাসক জনাব মহিবুল হক এবার সরাসরি মিথ্যা তথ্য দিচ্ছেন—চতুর্থ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন যে, ‘তারা জানিয়েছে তাদের প্রকাশক নেই।’ অথচ ১৫ মার্চ দেয়া জেলা প্রশাসনের চিঠির জবাবে পত্রিকাটি আনুষ্ঠানিকভাবে যে চিঠি দেয় সেখানে এমন কোনো কথা নাই। বরং সেই চিঠিতে পত্রিকা কর্তৃপক্ষ আবারো জেলা প্রশাসনকে মনে করিয়ে দিয়েছিলো যে, ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখে তাদের দেয়া প্রকাশক বদল সংক্রান্ত চিঠির বিষয়ে প্রশাসন কিছুই না জানানোর কারণে—আইন অনুযায়ী তারা সাবেক প্রকাশকের নাম লিখছেন। একই সাথে পত্রিকাটি অনুরোধ জানিয়েছিল যাতে খুব তাড়াতাড়ি এ বিষয়ে প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু প্রকাশকের এই বদলে আপত্তি নাকি অনাপত্তি দেবে সেই বিষয়ে জনাব মুহিবুল হকের জেলা প্রশাসন কোনো সিদ্ধান্ত নেয় নাই কিম্বা ১৫ মার্চের চিঠির জবাবের বিষয়েও কিছু জানায় নাই।

এবং অবশেষে বর্তমান সরকারের ঢাকা জেলা প্রশাসক সাহেব বললেন, ‘আমরা আজকে জানিয়েছি’। ‘আজকে’ মানে ১ জুন ২০০৯ তারিখে। অর্থাৎ দাঙ্গা পুলিশ পাঠিয়ে পত্রিকার প্রেস বন্ধ করে দেয়া এবং কোনো গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া বেআইনিভাবে পত্রিকা অফিসে ঢুকে, সাংবাদিকদের পিটিয়ে পরে সম্পাদককে ধরে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে তারা জানালেন যে, ‘মাহমুদুর রহমান আবেদন করেছিলেন তাকে আমরা প্রকাশক নিযুক্ত করতে পারি নি।’ আরো অনেকানেক সংবাদকর্মীর সাথে এই প্রতিবেদকও রাতভর অবরুদ্ধ আমার দেশ অফিসে ছিলেন। ‘অফিসিয়ালি’ কোনো চিঠি প্রশাসন পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে পৌছায় নি। অর্থাৎ সরকারের উচ্চস্তর থেকে পাওয়া হুকুম তামিল করতে স্রেফ বন্দুক আর লাঠির জোরে বলা হলো যে, পত্রিকার প্রকাশক নাই! কিন্তু সরকারের সেই স্তর কতো উঁচু? কে তাতে আসীন আছেন?

Amar Desh.......................

দৈনিক আমার দেশ অফিসে ১ জুন বিকাল ৫টায় সংবাদ সম্মেলনে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার বরাবরে জমা দেওয়া প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্রের অনুলিপি সাংবাদিকদের দেখাচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান

.......................

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়েছেন !

জাতীয় সংসদে তথ্যমন্ত্রী২ জুন জানিয়েছেন, ‘পত্রিকার ডিক্লারেশন বন্ধ করার দায়িত্ব ডিসির’। মন্ত্রী ঠিক বলেছেন। (এতটুকু বললে ঠিকই ছিল। ঊনিশশো তিয়াত্তর সালের প্রিন্টিং প্রেস ও পাবলিকেশন্স অ্যাক্ট অনুযায়ী ডিক্লারেশন ও রেজিস্ট্রেশনের দায়িত্ব ডিসি মানে ডেপুটি কমিশনার মানে জেলা প্রশাসকের ওপরেই বর্তায়। কিন্তু মন্ত্রী তার আগে বলেছেন—এই দায়িত্ব সরকারের না। তারপর বললেন দায়িত্ব ডিসির। মন্ত্রী কী কোনো বেসরকারি জেলা প্রশাসনের কথা জানেন নাকি? অথবা মন্ত্রী যদি ধরে নেন জেলা প্রশাসন সরকারের বাইরে তবে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সেটা ভয়ের কথা)। আইন অনুযায়ী পত্রিকার প্রকাশনা’র ঘোষণা মানে ডিক্লারেশনসহ ইত্যাদি তদারকির দায়িত্ব হচ্ছে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের।

কিন্তু প্রকাশক বদলের জন্য গত বছরের সেপ্টেম্বরে দৈনিক আমার দেশের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে যখন চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর থেকে, গোয়েন্দা বিভাগ থেকে অনপত্তি দেয়া হলো—তারপরও যখন ঢাকা জেলা প্রশাসন অনাপত্তি দিচ্ছিলো না—তখন পত্রিকাটির পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে প্রশাসন জানিয়েছিল বিষয়টা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবেচনাধীন আছে, সেখান থেকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দৈনিকটির ওই আবেদন বিবেচনাধীন থাকার কথা ঢাকা জেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা সংবাদমাধ্যমের কাছেও স্বীকার করেছেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে। তো, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কি ঢাকা জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়েছেন? তিনি কি এ-দায়িত্ব সম্পাদনের নজির রাখা শুরু করলেন আমার দেশ কে দিয়ে?

নিজের গণতান্ত্রিক চরিত্র প্রমাণের সুযোগ কি সর্বোচ্চ আদালত হাতছাড়া করবে?

হয়তো অন্তত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিষয়টা দেখার ক্ষেত্রে ঢাকা জেলা প্রশাসকের দায়িত্বটুকু নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এবং অবশেষে সরকার পত্রিকাটার অফিসে পুলিশ পাঠিয়ে, স্যাটেলাইট টিভি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, লিফট বন্ধ করে সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ ও লাঠিপেটা করে সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ধরে নিয়ে গেলো; কোনো গ্রেফতারী পরোয়ানা বা মামলার সপক্ষে কাগজপত্র ছাড়াই—অবৈধভাবে অস্ত্রের জোর খাটিয়ে যেভাবে রাতদুপুরে পুলিশকে দিয়ে কাজটা করানো হলো তাতে স্বশস্ত্র অপরাধীদের সাথে পুলিশের কোনো তফাত নাই। সরকার যেন সশস্ত্র অপরাধীদের একটা সর্দার সমিতি।

পত্রিকার নিজস্ব স্থাপনায় জোরপূর্বক অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে যেখানে অপরাধী পুলিশের এবং আদেশদাতাদের বিচার হওয়ার কথা সেখানে তারাই উল্টো পরদিন নতুন মামলা সাজালেন। পুলিশকে বাঁধা দেয়ার ‘অপরাধে’ মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করলেন ২ জুন তারিখে। যারা সেই রাতে পুলিশের পোশাকে ও অস্ত্রসহ সংবাদমাধ্যমে অফিসে আইনত অবৈধ অনুপ্রবেশ করেছিল তাদের আইনি দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত কোনো বাহিনী বলে স্থির করার কোনো কারণ ছিল না সাংবাদিকদের। ওই পোশাক ও অস্ত্রধারীদের সপক্ষে আইনের কোনো যথাযথ সমর্থনের প্রমাণ ছিল না।

তবুও জনাব রহমানের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠালেন নিম্ন-আদালত। এখন পালা হচ্ছে সর্বোচ্চ আদালতের—ন্যায়বিচারের  ভরসাস্থল বলে কথিত সুপ্রিম কোর্টের। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নির্বাহী-আইন ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি সকল নাগরিকের মতামতের প্রতিফলন নিশ্চিত করতে যেই সংবাদমাধ্যম গণতান্ত্রিক চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ—সেই সংবাদমাধ্যমের ওপর নির্বাহী বিভাগের এমন অগণতান্ত্রিক-অসাংবিধানিক ও বিধি-বহির্ভূত শক্তিপ্রয়োগ—স্বৈরতান্ত্রিক সন্ত্রাসী কার্যকলাপের প্রতিকার করা সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব বটে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রচর্চার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের অভিভাবক বলে কথিত সর্বোচ্চ আদালতের সামনে এখন একটা অনুসরনীয় পথই খোলা আছে—পত্রিকাটার ডিক্লারেশন বাতিলের বিরুদ্ধে, সম্পাদককে গ্রেফতারের বিরুদ্ধে স্বপ্রণোদিত হয়ে আইনি অবস্থান নেয়া।


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


Available tags : আমার দেশ, মাহমুদুর রহমান, পত্রিকা বন্ধ, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা

View: 6807 Leave comments (8) Bookmark and Share

1

পুরো ঘটনাচক্রে আমার দেশ বন্ধ ও সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের গ্রেফতার হওয়ার ঘটনার গুরুত্ব অনেক কমে গেছে। বরং এই ঘটনার মাধ্যমে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের যে ভবিষ্যত ঠিক করে দিয়েছেন,তার গুরুত্ব ও ওজনই বেশি।
পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশ ৩৯ বছর পরে নিজের পরিচয়টা মুছে ফেলো আবারও পাকিস্তান হতে চাচ্ছে। তবে এই পাকিস্তান আর আসল পাকিস্তানের পূবের প্রদেশ হইতে যাচ্ছে না। এইটা একটা স্বাধীন পাকিস্তানই হচ্ছে।

Friday 04 June 10
??????? ?????

at present i am abroad,amar desh shut down by awami govt,time will be come this should be questionable. when bangladesh to be fu2



Friday 04 June 10
gias

সবই জানি, বুঝি3

দেশের সবোর্চ্চ আদালত কি সরকারি নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্বের বাইরের কিছূ?
আদালত-তো সরকার নিয়ন্ত্রণ করে, সেক্ষেত্র স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দূরের কথা, মামলা হওয়ার পর ন্যায় বিচার পাওয়া নিয়েইতো আমরা সন্দিহান।

Friday 04 June 10
????? ??????

inside4

These days AmarDesh became challenger of lot more issues as the fact finders in favor of country, quite obvious, may be conspiracy is in real deep, be careful, AL studied a lot before taking such steps against.

Friday 04 June 10
mehnaz

Clap 'Digital Bangladesh' it has slapped of the media indeed. 5

This is nothing new for BAL. Its in their legacy. Jamuna, Chanel 1, Facebook, Amar Desh, got the sequence? THIS govt. did ban you tube and other 7 web pages during Army Massacre. Clap 'Digital Bangladesh' it has slapped of the media indeed.

Friday 04 June 10
Ahmad Abdullah

..............6

কথা কওয়া নিষেধ। সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত!!!!!


Saturday 05 June 10
???? ???????? ?????

7

কিন্তু মন্ত্রী তার আগে বলেছেন—এই দায়িত্ব সরকারের না। তারপর বললেন দায়িত্ব ডিসির। মন্ত্রী কী কোনো বেসরকারি জেলা প্রশাসনের কথা জানেন নাকি? অথবা মন্ত্রী যদি ধরে নেন জেলা প্রশাসন সরকারের বাইরে তবে বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য সেটা ভয়ের কথা)। আইন অনুযায়ী পত্রিকার প্রকাশনা’র ঘোষণা মানে ডিক্লারেশনসহ ইত্যাদি তদারকির দায়িত্ব হচ্ছে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের।
Read carefully the above statement. You have think, people are Ghadha and they don't know nothing! You have tried to mislead the people! Is it fair?

Saturday 05 June 10

from reporter8

thank u sir.
I see ! u've read it carefully.
now would u like to explain how it misleads people? please!

Sunday 06 June 10
Go Back To Issues
EMAIL
PASSWORD