আঞ্চলিক: নেপালের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি

নেছার আমিন || Saturday 29 May 10

মাঝরাতের সমঝোতায় আরো এক বছর সময় পেল নেপাল

নেপালের সংবিধান হয়তো মাওবাদীদের পরিকল্পনা অনুযায়ী গতকাল ঊনত্রিশে মে’তে রাজপথ থেকেই ঘোষিত হতে যাচ্ছিল, যদি তার আগের দিন গত আটাশে মে মাঝরাতে দেশটির সাংবিধানিক পরিষদের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়াতে অর্ন্তবর্তী আইনভায় সমঝোতায় না পৌঁছতে পারতেন রাজনীতিকরা। সেক্ষেত্রে আবারো চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার দিকে যাচ্ছিল দেশটি। কিন্তু সেই আশংকা এড়ানো গেল। খুব শীঘ্রই নতুন অন্তবর্তী সরকার গঠন করা হবে, আগের সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হবে এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন--এই তিন দফা প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে অন্তর্বর্তী আইনপরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ মাওবাদীরা সাংবিধানিক পরিষদের মেয়াদ বাড়ানোর বিলের পক্ষে ভোট দেয় ঊনত্রিশে মে’র প্রথম প্রহরে।

অন্তবর্তী সংবিধানের অধীনে দুইহাজার আট সালের দশই এপ্রিলের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অন্তর্বর্তী আইনপরিষদ গঠিত হয়--পরে ওই বছরেরই আটাশে মে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বর্তমান সাংবিধানিক পরিষদের মেয়াদ। দুই বছরের মধ্যে এই পরিষদ একটি সংবিধান প্রণয়ন ও গ্রহণ করবে বলে ধার্য করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী আইনপরিষদে এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া মাওবাদী দলটি (নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি- মাওবাদী) জোট সরকার গড়ে মাত্র আটমাস ক্ষমতায় থাকার পর পদত্যাগ করে গত বছর--বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সামরিক বাহিনীর অসহযোগিতার মুখে--এরপর থেকে সাংবিধানিক পরিষদ আসলে কোনো কাজই করতে পারে নাই--সংবিধান প্রণয়নে কোনো অগ্রগতি হয় নাই। মাওবাদী নেতৃত্বাধীন জোটের ক্ষমতা ছাড়ার পর পরিষদ নেপালের কমিউনিস্ট দলের (মার্কসবাদী লেনিনবাদী সংযুক্ত) নেতৃত্বে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ওই দলের নেতা মাধব কুমার নেপালকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করে পরিষদ--যিনি কি না এর আগে সাংবিধানিক পরিষদ নির্বাচনে কাঠামান্ডুর একটা আসনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিলেন, এবং পরাজিত হওয়ার পর নিজের দলের প্রধানের পদ থেকেও পদত্যাগ করেন।

মাধব কুমারের পদত্যাগ এবং প্রধানত সাবেক গেরিলাদের দেশটির নিয়মিত সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা সহ চুক্তি অনুযায়ী সংবিধান প্রণয়ন ও অন্যান্য সিদ্ধান্ত নেয়ার দাবিতে গত বছরের জুন থেকে রাজপথে আন্দোলন করে আসছে মাওবাদী দলটি। সর্বশেষ গত মে দিবস থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশজুড়ে বন্ধ পালন করতে শুরু করে তারা। সপ্তাহকাল ধরে দেশ অচল থাকার পর আটই মে ক্ষমতাসীন জোট আলোচনায় বসে মাওবাদী নেতা পুষ্প কমল দাহালের সাথে। অবশেষে বর্তমান সাংবিধানকি পরিষদের মেয়াদের একেবারে শেষ মুহূর্তে মার্কসবাদী লেনিনবাদী সংযুক্ত কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে নেপালি কংগ্রেস সহ অন্যান্য দলের ক্ষমতাসীন জোটটি মাওবাদীদের সাথে সমঝোতা করলো, আটাশ তারিখ রাত সাড়ে বারোটার কিছু পরে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই পদত্যাগ করবেন মর্মে এই সমঝোতার ঘোষণা দেয় দলগুলা। সমঝোতার ফলে মাওবাদীরা পরিষদের মেয়াদ বাড়ানোর বিলে সমর্থন দেয়, কাজেই অকার্যকর সাংবিধানিক পরিষদ সদস্য রাজনীতিকরা আরো একবছরের জন্য অনুমোদন পেলেন। রাত একটা ঊনত্রিশ মিনিটে পরিষদে ভোটাভুটি চূড়ান্ত হয়। ৫৮৫ সদস্যের আইন পরিষদে মাত্র ৫ জন্য সদস্য বিলটির--অন্তর্বর্তী সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী বিলটির পক্ষে ভোট দেন।

নেপালের মার্কসবাদী লেনিনবাদী সংযুক্ত কমিউনিস্ট দল এবং নেপালি কংগ্রেস সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলা গত একবছর ধরে প্রধানমন্ত্রীর স্বপদে বহাল থাকার বিষয়ে অনড় ছিল। নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে চায় নাই মাওবাদীরাও। কিন্তু সামরিক ফ্রন্টে দীর্ঘ একদশকের গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে আসা ওই দলটি এবারের সর্বশেষ সপ্তাহব্যাপী ‘নেপাল-বন্ধে’ সাধারণ মানুষের সমর্থন পায় নাই আগের মতো। সাধারণ কর্মজীবী বা খেটেখাওয়া মানুষের তরফ থেকেও এবারের বন্ধ মফস্বলে এবং রাজধানী কাঠমান্ডুতে বিরুদ্ধতার মুখে পড়েছে। যদিও তা মোটেই ব্যাপকভাবে সংগঠিত বা বিস্তৃত ছিল না। কিন্তু যেই শ্রেণী ও পেশার মানুষের মধ্যে মাওবাদী জনআন্দোলনের ও জনযুদ্ধের প্রতি অন্তত নিরব সমর্থন হলেও ছিল, তাদের তরফেই এমনতরো নাখোশ মনোভাব দলটির উচ্চ পর্যায়ের নীতি নির্ধারকদেরও পরিস্থিতি বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ছয় মে’ বন্ধের পঞ্চম দিনে দলটি বন্ধ অনির্দিষ্টকালের জন্য চালু রাখা ও আরো জোরদার করার কথা জানালেও মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত বদলায়। আটই মে’ তারা জানায় যে, এই প্রতিবাদ কর্মসূচী সাধারণ জনগণের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেহেতু তারা বন্ধ প্রত্যাহার করছে কিন্তু ‘প্রতিবাদ’ চালু থাকবে। সেই মতো বন্ধ প্রত্যাহার হলেও দলটির কর্মী সমর্থকরা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিপরীতে রাজপথে বিচ্ছিন্নভাবে কর্মসূচী চালাচ্ছিল। আর একইসাথে মধ্যবিত্তের বিরাগভাজন হবার হাত থেকে রেহাই পায় মাওবাদীরা, এ যাত্রায়।

এর আগের দিন--সাতই মে রাজধানী কাঠমান্ডুতে প্রায় বিশহাজারের বেশি নাগরিক দেশজুড়ে অস্থিরতার প্রতিবাদে ও শান্তির স্বপক্ষে মিছিল বের করে। প্রধানত নানা পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠন, ব্যবসায়ীদের চেম্বার, সুশিল সমাজেরে প্রতিনিধিত্বকারী বিভিন্ন ফোরাম ও মানবাধিকার সংগঠনের সাথে সংশ্লিষ্টরা ওই ‘শান্তি মিছিলে’ অংশ নেন। এসব অভিজাত শ্রেণী পেশার গ্রুপ গুলা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ দিতে থাকে সমঝোতায় আসার জন্য। নেপালি কংগ্রেস এবং অন্যান্য ছোট দলগুলা এ সময় তাদের জোটসঙ্গী মাধব কুমারের অনড় অবস্থানের বিষয়ে সমর্থন প্রকাশ করে নাই, অন্তত জনসম্মুখে। কূটনৈতিকরাও অনেকটা রীতি-প্রথার বাইরে গিয়ে অকূটনৈতিকভাবে গোপনে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করে মাধবকে পদগত্যাগ করতে বলেন। এমন সংবাদ এসেছে নেপালের সংবাদমাধ্যমে। এমনকি ক্ষমতাসীন জোটভুক্ত তিনটা রাজনৈতিক দলের নেতারা কাঠমান্ডুস্থ নরওয়ের রাষ্ট্রদূতের বাসায় চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেন--কূটনীতিক এবং রাজনীতিকদের এমন অকূটনৈতিক এবং অরাজনৈতিক আচরণ যে সত্যিই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নড়বড়ে অবস্থার আলামত ছিল, তা এখন কার্যত স্বীকার করে নিল ক্ষমতাসীন জোট। সাংবিধানিক পরিষদের মেয়াদ বাড়তে দেয়ার বিনিময়ে পরিষদে এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করিয়ে ছাড়লো। কিন্তু বাড়তি মেয়াদে রাজনীতিকদের আরো অনেক অমীমাংসিত বিষয়ের ফায়সালা করতে হবে; সাতদলীয় জোট ও মাওবাদীদের মধ্যে নয়াদিল্লীতে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তির পরও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে যেসব বিষয় এখনো ঝুলে আছে, চার বছর ধরে।

অন্যদিকে, সাংবিধানিক পরিষদ ব্যর্থ হলে যেই ‘জনগণের সংবিধান’ রাজপথ থেকে ঊনত্রিশে মে’তে ঘোষণা করবে বলে বলেছিল মাওবাদী দল--পরিষদ ঠিকই ব্যর্থ হয়েছে কিন্তু মাওবাদী দল যেহেতু পরিষদের মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে ভোট দিয়েছে তাই ধরে নেয়া হয়েছিল যে, দলটা ওরকম কিছু করবে না। এবং সত্যিই নেপালের মাওবাদী কমিউনিস্ট দল সেটা করে নাই, কিন্তু যে সংবিধান তারা প্রস্তুত করেছিল সেটি গতকাল ঠিকই তারা প্রকাশ করেছে। দলের প্রেস বিজ্ঞপ্তির ভাষায়--‘দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত পিপলস ফেডারেল রিপাবলিক অব নেপালের সংবিধান বিষয়ে প্রস্তাবনা আকারে একটা খসড়া উপস্থাপন করা হয়েছে।’ অর্থাৎ ‘রাজপথ থেকে জনগণের সংবিধান ঘোষণা’র বদলে সংবিধান আলোচনার অংশ হিশাবে খসড়া প্রস্তাবনা। দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে কাঠমান্ডুতে শনিবার বিকালে এক জনসভায় দলের সহ-সভাপতি বাবুরাম ভট্টরাম এটি পড়ে শোনান। এখন অপেক্ষা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলার প্রতিক্রিয়া ও বাড়তি মেয়াদ পাওয়া সাংবিধানিক পরিষদে এটা আলোচিত হওয়ার।