সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

তরিকুল হুদা


Wednesday 01 September 10

print

পোষাক ও পর্দা: ধর্মনিরপেক্ষতা এবং রাষ্ট্র

ধরা যাক এমন একটা পরিস্থিতি। ল্যাংটা অবস্থায় হঠাৎ একজন দেখল, অন্যকেউ তাকে দেখে ফেলেছে। তবে ল্যাংটা নিজেই তার চোখ ঢেকে ফেলে। ভাবখানা এমন; যাক বাবা বাঁচা গেল! আমার উদাম শরীর কেউ দেখল কি না--সেটা অন্তত নিজের চোখে আর দেখতে হচ্ছে না। কিন্তু না, বিষয়টা এখানেই শেষ না। এভাবে নিজের চোখ ঢেকে আর কতক্ষণ! মুখোমুখি যে দেখছে তারও যদি একই হাল হয়, তবেই না স্বস্তি আসে। ক্রমশ ল্যাংটা রাজ্য কায়েম হয়, যেখানে আর কাউকে লজ্জায় নিজের চোখ ঢাকতে হবে না। ল্যাংটাকে যে মুখোমুখি দেখে ফেলে সে নিজে কি ল্যাংটা, পর্দানশীন নাকি অন্যকিছু--এসব ভাবলে চলে না। সে তার দিকে তাকিয়েছে, চোখাচোখি হয়েছে, এতটুকুই যথেষ্ঠ। এখন গায়ে পোশাক থাকলে তা খোল। ল্যাংটারও ল্যাংটা থাকতে কেমন লজ্জা করে, খুঁতখুঁত করে। কে দেখল এইটা নিয়া মন খচখচ করে, আবার কেউ দেখুক এই বাসনাও মনে উকিঝুকি দেয়। ফরাসি দেশে হালে মুসলমান নারীদের পোশাক ও পর্দা নিয়া রাষ্ট্রের ব্যতিব্যস্ত কারবারে এমনটাই দেখা যায়। অপরদিকে পর্দা ওয়ালারা ল্যাংটাদের চাইতে কিছুটা অসুবিধাজনক অবস্থানে আছে। প্রসঙ্গত ফরাসি দেশে তারাই বস্ত্র হরণের শিকার। শিকারী নন। লোকালয়ে এখন তাদের বে-পর্দা করা হচ্ছে। আইন পাশ হয়েছে। জনসমক্ষে পর্দার উপস্থিতি নিষেধ, যার তোড়জোড় শুরু হয় বহুত আগে।

পর্দার বিরুদ্ধে ফ্রান্সে সরকার বিরোধী দল সবাই একাট্টা। শাসক দলের সংসদীয় নেতা জাঁ ফ্রাঁসোরা কোপের ভাষ্য, সমাজে নারীর অবস্থাই আধুনিকতার পরিমাপক। মূল বিরোধী দল সমাজতন্ত্রীরা জোরালভাবে বোরকা-নিকাব তথা পর্দার বিরোধিতা করছে। তারা মনে করে, বোরকা-নিকাব মাত্রই নারীর বন্দিত্ব। কিন্তু তারা আইন নিয়া জবরদস্তির পক্ষপাতি না। এ বছরের জুলাই মাসে ফ্রান্সের জাতীয় বাসতিল দিবসের ঠিক আগের দিন তের তারিখে ৫৫৭ আসনের সংসদে ৩৩৫:১ ভোটে এ সংক্রান্ত বিল পাশ হয়। ভোটের পরে আইনমন্ত্রী মিশেল মাখি বলেন, গণতন্ত্র ও ফরাসি মূল্যবোধের জয় হয়েছে। বোরকা নারীর বিচ্ছিন্নতার চিহ্ন অতএব তাদের মুক্ত করতে হবে--এমনটা মনে করেন, শাসক দলের আরেক এমপি পোলেতি। কমিউনিস্ট নেতা আঁদ্রে জেরিনের মতে, বোরকা হল চলমান কফিন। সরকারি সংস্থা ফ্রেঞ্চ কাউন্সিল অব দি মুসলিম ফেইথের শীর্ষনেতা বোরকা আইনের বিরোধিতা করেন নাই। কিন্তু আইন করার ফলে অনেকে আতঙ্কগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন। মজার কথা তাই না? রাষ্ট্রপতি সারকোজির কাছে পর্দানশীন বোরকা পরা নারী হল ‘পর্দার অন্তপুরে বন্দিনী... সমাজ বিচ্ছিন্ন, পরিচয়হীনা’। শুধু তাই না, বোরকাওয়ালীদের কারণে ফরাসি অমুসলিমরাই নাকি এখন বিচ্ছিন্ন হবার পথে। এধরনের বক্তব্যে ফরাসি জাতিসত্তা, রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ এবং নারীমুক্তির যুক্তিই জোরেশোরে ব্যবহার হচ্ছে।

বিষয়টা নিয়া তর্ক তুঙ্গে। তবে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও কয়েকজন আলোচনা তুলেছেন। প্রচলিত মতের জবরদস্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তারা বেশ শক্তিশালী চিন্তার খোরাক জোগান। সেখান থেকে কয়েকটা লেখা এই নিবন্ধে আমরা পরখ করব। ইওরোপীয় ভাবুক স্লাভো জিজেক ‘বোরকার ভেতরের পড়শি’ (দ্য নেইবার ইন বোরকা) নামক ছোট রচনায় বলেন, এই আইনের ফলে মুসলিম নারীদের বঞ্চনা আরো বাড়বে। তারা আরো বেশি করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হবে। জিজেক মনে করেন, মাত্র দুই হাজারের মত বোরকাওয়ালী নিয়া তামাম ফরাসিদের এই উৎসাহ ঠিক স্বাভাবিক না, বিশেষ লক্ষণাক্রান্ত। মুসলিম নারীর এমনিতেই জেরবার দশা--এটা জিজেক ধরেই নিয়েছেন। তাই বোরকা নিষেধাজ্ঞা নিপীড়নের মাত্রা আরো বাড়িয়ে তুলবে বলে মহাত্মার উদ্বেগ। আমার আশঙ্কা খোদ এই ধরে নেয়া, ফরাসিদের চাইতে জিজেককে খুব আলাদা করে না। ঘুরেফিরে শেষতক একই জায়গায় এসে ঠেকে, এটা অবশ্য তাঁদের সাধারণ লক্ষণ। দুইহাজার তো অনেক বড় সংখ্যা। শুধু একজন বোরকাওয়ালীও ফ্রান্সে বসবাস করলে বা না করলেও আইন হত অনুমান করা যায়। যে জমানায় আমরা বসবাস করছি--ইতিহাসের এই ক্ষণে পর্দা আর বেপর্দার তাৎপর্য সংখ্যার হিশাবে কোনভাবেই বুঝা যাবে না। ফ্রান্সে একজন মুসলিম নাগরিকও যদি না থাকত তাও প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধের কথা বলে হিজাব নিষিদ্ধ হত। ইসলামে নারী বঞ্চনার ধুয়া তুলে আফগানিস্তানে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন জায়েয করা হয়। এখানে সাম্রাজ্যের হম্বিতম্বির বাইরে এক ফোঁটাও নারীবাদ নাই।

যাই হোক, নারীত্বের অবমাননা-অমর্যাদা এসব কথা বলে আবার থেমে যান নাই কেউ। ফরাসি সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়ের সামনে আব্রু-পর্দা-হিজাব-নিকাব অস্তিত্বের সংকট, এক আতঙ্ক আকারে হাজির হয়েছে। এখানে জিজেকের প্রশ্ন--কেন এই ভয়, শঙ্কা? সামান্য নিকাব ঢাকা মুখ দেখে কুঁকড়ে যায় কেন ফরাসি প্রজাতন্ত্র ও নাগরিকগণ? ওই মুখ কি তাহলে ইমানুয়েল-লেভিনার ‘অপর’র মুখ নয়? যে ‘অপর’ বিনাশর্তে নৈতিকতার আহবান ছড়ায়? জিজেকের প্রস্তাব মতে, ঘটনা ঠিক উল্টাইয়া যায় যদি আমরা ফ্রয়েডের চোখে ব্যাপারটাকে দেখি। মুখ দেখে যায় কি চেনা? মুখের আড়ালে পড়শি লুকায় তার সকল যন্ত্রণা। তাহলে মুখই তো মুখোশ। কিন্তু‘ এসব কি আর টের পাই আমরা। শুধু সেই মুখ দেখে আরাম পাই, মনে হয় চেনা চেনা লাগে। যেন আমারই মত। তাহলে এই মুখ ঢাকলে তো গা শিউরাবেই। অস্বস্তি ও অচেনা লাগবেই। নিকাব ওই মুখকে ঢেকে ফেলে--যেই মুখ এতদিন অন্য কিছু ঢেকে রেখেছিল। মুখের অন্তরালে সব গহবর আর ফাঁকা শূন্যতা হুট করে সামনে চলে আসে। বাঁধামুখ আর তাকে রুখতে পারে না। এখন সেই অন্যকিছুর চোখ ধীরে ধীরে মেলতে থাকে। কিন্তু‘ রূপহীন এই অ-রূপ না দেখলে, সে যে কত রূপসী তা বুঝার উপায় নাই। এরকম অ-রূপ পড়শিকে চিনলেই পরে সম্পর্ক অর্থময় হয়। যে মুখ সবকিছু আড়াল করে তাকে আড়াল করতে হবে। জিজেক স্মরণ করান, মুখ নামক মুখোশ ঢাকলে পরে পড়শি তার আসল জায়গায় দাঁড়াতে পারে, চোখ তুলে তাকাতে পারে। মনোবিশ্লেষণে দাওয়াই প্রার্থীকে দাতার মুখোমুখি বসানো হয় না। উভয়ই তৃতীয় কোন বিন্দুতে চোখ রেখে কথা বলে। জিজেকের মতে, এটাই পড়শির জগত। কিন্তু‘ এই খতিয়ানে পড়শির জগতে সবকিছু তালাশ কিভাবে সম্ভব? শুধু পড়শি যার ‘অপর’ তাকে খানিক বুঝা যায়। পড়শির বাসনা কি? সে কি এই খতিয়ানে নিছকই দাগ মাত্র?

এরপর ফরাসি ঘরের ছেলে আলা বাদিউ’র কথায় আসি। এ বিষয়ে তাঁর ‘ওড়না আইনের পেছনে আতঙ্কের বসবাস’(বিহাইন্ড দ্য স্কার্ফ ল দেয়ার ইজ ফিয়ার) লেখায় নজর ফেরানো যাক। লেখাটা তুমুল রাজনৈতিক, আবার রস আর খোঁচায় ভরপুর। স্কুলে বালিকাদের মাথায় ওড়না নিষিদ্ধ করার সময় এই লেখাটা বাদিউ লেখেন।

বলা হয়, পিতা আর ভাইদের কারণেই মুসলিম নারীর বেহাল অবস্থা। বাপ-ভাইদের অত্যাচারের চিহ্ন হিজাব। কাজেই হিজাব নিষিদ্ধ কর। যেহেতু নারী ধর্ষিত সুতরাং তাকে নিরাপত্তার নামে জেলে ঢুকাও। বাদিউ মনে করেন, এই ধরনের যুক্তি দিয়েই ফরাসি শাসকগোষ্ঠী হিজাব নিষিদ্ধ করেছে। না হলে, পিতার অপকর্মের শিকার হয়েও তাকেই দায় গুনতে হচ্ছে। আর যদি স্বেচ্ছায় কেউ হিজাব পরে? তাহলে তো জাতীয় শত্রু, পুরাদস্তুর বিদ্রোহী। এখনই শাস্তি দিতে হবে। আচ্ছা, তাহলে এই মেয়ের কোন বাপ-ভাই থাকার দরকার নাই। নিজেই তো বেয়াড়া। এই বেয়াদব মেয়ে, নিপীড়িত নারী এবং বাপ-ভাইয়ের শ্রেণী পরিচয়ের সন্ধান দিয়েছেন বাদিউ। এককালের ফরাসি উপনিবেশ আলজেরিয়া এবং পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান হতে ছুটে আসা এসব মোহাজের মুসলমানরাই ফ্রান্সের প্রান্তিক শ্রেণী। বাদিউর ঘোষণা খুবই পরিস্কার: ইসলাম হল ফ্রান্সে মজলুমের ধর্ম। কিন্তু‘ ধনতন্ত্র বা পুঁজিতন্ত্র তারচে বড় ধর্ম। আর তার চিহ্ন চারপাশে ভুরিভুরি। দ্রব্য, ভোগ্যসামগ্রী? কি দেখি নাই আমরা? সবকিছুই পুঁজিতন্ত্রেরই প্রকাশ। তাই বাদিউর আহবান, ধর্মতাত্ত্বিক চিহ্ন হিশাবে হিজাব নিষিদ্ধ হতে পারলে চিহ্ন হিশাবে পুঁজিতন্ত্রের পণ্য পসরার বিজ্ঞাপনও নিষিদ্ধ হোক।

হিজাবের আড়ালের নারী সম্পর্কে শাসকশ্রেণী এবং নারীবাদীরের মতের আশ্চর্য মিল পাওয়া যায়। তারা উভয়ই মনে করে মুসলিম নারীরা আসলে সশরীরের অংশ ঢেকে ফেলার মাধ্যমে নিজেরা জনসমক্ষে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আসলে সমাজ বিচ্ছিন্নও বটে। এরকম কোন নীতিমালা অন্তত নারীবাদী বা প্রজাতন্ত্রীদের নাই, যার মাধ্যমে তারা শরীরের কোন অংশ ঢাকা থাকবে বা উন্মুক্ত রাখবে এই ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারে। এখনও কোন স্কুলে স্তনের বোঁটা বা গোপনকেশ প্রদর্শিত হয় না। তা ঢাকাই থাকে। তাহলে এর বিরুদ্ধে কেন অন্যের দৃষ্টি হতে সরায়ে ফেলার অভিযোগ আনা হয় না? বাদিউ আরো বলেন, এখনও ফ্রান্সের সিসিলিতে বিধবারা কালো স্কার্ফ পরে। এতে অবশ্য ইসলামি সন্ত্রাসীদের বিয়ে করার দরকার পড়ে নাই।

হিজাবে নারীবাদীদের চুলকানি দেখে বাদিউ বেশ আমোদ পান। নারী শরীর ভোগ্যপণ্যের মত বাজারে ছড়ানো ছিটানো, বেচাবিক্রি হচ্ছে। অথচ তারা কিনা ফরাসি রাষ্ট্রপতির কাছে গুটিকয়েক হিজাব ব্যবহারকারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হাতজোড়ে ব্যস্ত। নারীদের যা কিছু সম্বল তাতো অবশ্যই দেখাতে হবে। বেচতে হবে। নিয়ন্ত্রিত বিনিময় না বরং বিস্তৃত সর্বজনীন বাজারই তার ঠিকানা। বাদিউর সিদ্ধান্ত, হিজাব আসলে পুঁজিতান্ত্রিক আইন। লক্ষ্য হল, নারীর শরীর পুঁজির নিজস্ব সূত্রে বাঁধা। নারীকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন, যত দামই হোক তা বিকোয়। সবাই বলে পর্দা নাকি নারীর ওপর অগাধ নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। কিন্তু‘ নারীত্ব কি আর কোনভাবেই নিয়ন্ত্রিত হয় না। যা অতিশয় হাস্যকর চিন্তা।

যে সময়ে আমরা বাস করছি এখন, ইতিহাসে নারীর শরীর, যৌনতাকে এত বেশি প্রাধান্য আর কখনোই দেয়া হয় নাই। সে কি খাবে, কিভাবে ঘুমাবে, কি রঙ মাখবে...হেন...তেন... যেন শেষ নাই। মজা মারাটাই এখন ধ্যানজ্ঞান। একটাই কথা, “নারীগণ মজা মার, আরো বেশি মাস্তি কর”। মহাত্মা জাঁক লাকা শরণে বাদিউ বলেন: পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আর যাই হোক, বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণের মত এত ব্যাপক, চিরায়ত ও নিশ্চিত না। সেকুলারিজম এমন এক জ্ঞানব্যবস্থা যা কিনা শুধুই পশ্চিমা রীতিনীতির ধারক। অন্য ধরনের আদর্শবোধের প্রতি যারপরনাই আক্রমণাত্মক। ওখান থেকে নির্গত হওয়া নারীবাদও এর বাইরে না। ‘পশ্চিমা’দের ‘অপর’কে কখনোই লেভিনার ‘অপর’র তত্ত্ব দিয়া ব্যাখ্যা করা যায় না। যেখানে অর্থবহ বিশেষকে নাকচ করে এক বিমূর্ত ফরাসি প্রজাতান্ত্রিক সামান্য ধারণার বিকাশ ঘটেছে। সেই ব্যবস্থার অন্তর্গত শিক্ষালয়গুলাতে নাগরিকদের প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধের চাইতে আর অন্য কিছু শিখানোর কথা ভাবাই যায় না। তো সেখানে প্রজাতন্ত্রের নীতি বৈ অন্য কিছুকে নির্দয়ভাবে নিশ্চিহ্ন করাটাই স্বাভাবিক।

বাদিউর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল মৃত্যু সংক্রান্ত। পশ্চিমারা বিশেষ করে ফরাসিরা মরণরে ডরায়। কোন আদর্শের জন্য মানুষ তার জীবনকেও বিকিয়ে দিতে পারে--এটা ভাবা বা কল্পনা করা তাদের সামর্থ্যরে বাইরে। শূন্য ও অর্থহীন মরণই ফরাসিদের সবচে’ গুরুত্বপূর্ণ বাসনা। বহু মানুষ মরণকে ডরানোর কোন কারণ খুঁজে পায় না। এমনকি তাদের কেউ কেউ প্রতিদিন এক আদর্শের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছে--এটা তথাকথিত ‘সভ্য’দের জন্য ভয়াবহতম আতঙ্ক। পাঠক, বাদিউর মত আপনিও বুঝবেন, কিভাবে নিবেদিত আদর্শিক মানুষ তার নিজেকে বোমার আধার বানায় আর তার বিপরীতে সারি বেঁধে উড়তে থাকে মনুষ্য শরীরবিহীন ড্রোন বিমান। ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের কোন মানুষটা অমর জানতে ইচ্ছা হয়।

বাদিউ জোর দিয়ে বলেন যে, কেবল ভয়ই ওড়না-আইনে খোলাখুলি প্রকাশিত। কিন্তু‘ কিসের ভয়ে কাতর তারা? ওই একই কথা বর্বর,... ইসলামি জঙ্গি... এসব আর কি।

সবশেষে বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ অধ্যাপক তালাল আসাদের ‘ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতা বুঝার কোশেশ’ লেখাটায় আসি। অনেক কারণে লেখাটা গুরুত্বপূর্ণ। যে প্রচলিত বিশ্বাসে ভর করে আধুনিক জাতিরাষ্ট্র নাগরিক মাত্রই একই মূল্যবোধের ধারক বানানোর ন্যায্যতা পায়, তালাল শুরুতেই তাকে প্রশ্ন করেন। জিগান, জাতীয় জনগোষ্ঠী বানানোর জন্য নাগরিকবৃন্দের সমসত্ত মূল্যবোধের ভাগিদার ভাবা শহুরে সমাজের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ। যেখানে কিনা নানা রঙের মানুষের বসবাস। ইহুদি-খ্রিস্টান সিলসিলা ইওরোপীয় মূল্যবোধের মূল উপাদান। তাই, মুসলিম মোহাজেরদের প্রতি আপনাআপনিই অস্বস্তি তৈরি হয়। মুসলিম মূল্যবোধ ইওরোপের জাতিরাষ্ট্রীয় ঐক্যের ধারণায় কি বিরূপ প্রভাব ফেলে তা ভেবে ভেবে ব্যাকুল তারা। ইওরোপীয়রা এখন ইসলাম আতঙ্কে আচ্ছন্ন। তাদের পবিত্র বিশ্বাস--ইসলাম তার বাইরে কোন কিছুকেই পরোয়া করে না। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে গণতন্ত্র মানে সবসময় সহিষ্ণুতা বা মেনে নেয়া নয়। অন্যায় অবিচারকে বৈধতা দেয় এমন অনেক কিছুর বিরোধিতাকেও শায়েস্তার নিমিত্তে গণতন্ত্র নিরলস কাজ করে। তালাল মনে করেন--ঐক্য নিয়ে মনকে আগাম বেড়ি পরানো শাসক চিন্তার মূল বৈশিষ্ট্য।

ঐক্য-মিলন ইত্যাদির গান গাওয়া রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতকরণের অংশ। ইতিহাসে এর নানা উদাহরণ টেনে তালাল নৃতাত্ত্বিক পদ্ধতি মোতাবেক লাইসিতের (ফরাসিতে ধর্মনিরপেক্ষতা বুঝাতে লাইসিতে শব্দটা ব্যবহার হয়) বিশ্লেষণে সচেষ্ট হন। স্বাভাবিকভাবেই তালাল ফ্রান্সের নতুন আইনগুলি বিশ্লেষণ করতে স্টাসি কমিশন প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুুঙ্খ বিশ্লেষণে নামেন। দুই হাজার তিন-চার সালের দিকে মুসলমান বালিকাদের ওড়না পরার ওপর খবরদারি জারি হয়। কারণ হিশাবে অনেক গবেষক মুসলমানদের দোষ শনাক্ত করেন। ফরাসি সমাজে তাদের একাত্ম হবার অনীহাকে দায়ী করেন। তারা উগ্রবাদী ইসলামের প্রতি আকর্ষণ, বিকৃত বর্ণবাদ, অর্থাভাব, মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের উসকানি, ইসলামি ওয়েব সাইট সমূহের প্রচার ইত্যাদি কারণও আবিষ্কার করেন। কিভাবে পবিত্র ফরাসি মূল্যবোধ এসব উৎপাত ধারণ করবে? সংখ্যাগরিষ্ঠ ফরাসি গবেষক বুদ্ধিজীবী বাম-ডান সহ বেশিরভাগ মানুষই বিশ্বাস করে যে, ইসলামি কিছু চিহ্ন ও চর্চার কারণে প্রজাতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংসের পথে। ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি খুব সরল সহজ চিন্তার ওপর মোটেও প্রতিষ্ঠিত না। ষোড়শ শতকে পশ্চিমা খ্রিস্টতন্ত্র ‘রাজ ধর্মই প্রজার ধর্ম’ নীতি গ্রহণ করে। ধর্মনিরপেক্ষতার গোড়া এইখানেই। ‘বিশেষ’ ধর্ম সংক্রান্ত সমস্যা সাধারণ রাজনৈতিক নীতির ভেতর সমাধানের রাস্তা এভাবেই তৈরি হচ্ছিল সে সময়। আধুনিকতাই ইতিহাসে প্রথম ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা করে নাই। মধ্যযুগে খ্রিস্টান জগতেও এই বিভাজন অভাবনীয় ছিল না। যদিও আজকালকার মত একই অর্থে নয়। রাজতন্ত্র ও চার্চ এক জটিল আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ ছিল। পরে এক রাজার দুই শরীর (প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক) তত্ত্ব প্রবর্তন হয়। রাজদেহে প্রবাহিত, খ্রিস্টান ধর্মীয় সত্তা ও রাষ্ট্র সত্তা আলাদা করণের জরুরত প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিক বলয় থেকে ধর্মকে বের করে আনা হয় বা আত্মীকরণ করা হয়। প্রচলিত অর্থে, আধুনিকতার আবির্ভাবের ফলেই রাষ্ট্র ও চার্চ আলাদা--এই চিন্তা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেও তার চর্চা ছিল। অর্থাৎ এর গোড়া ধর্মের ইওরোপীয় ধারণা ও রাজতন্ত্রের ভেতর পোঁতা আছে।

ব্রিটিশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবস’র প্রস্তাব মোতাবেক রাষ্ট্র এক বিমূর্ত, অতিন্দ্রিয় সত্তা। যা কিনা শাসক এবং শাসিত পরিমণ্ডলের বাইরে স্বাধীন অস্তিত্বে বিরাজমান। ফলত, বিভিন্ন জাত-পাত বিশ্বাসের অনুসারী নানা ধর্মের মানুষের জাতীয় দায়িত্ব-কর্তব্য এবং আন্তঃসম্পর্কের ফয়সালা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় নির্ধারণের রেয়াজ চালু হয়। নিজেকে হাজির করার জন্যও রাষ্ট্রের দরকার হয় চিহ্ন ও প্রতীকী ব্যবস্থার। যা কিনা যেকোন রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য অপরিহার্য। বিশেষ করে আধুনিক রাষ্ট্রের। কেননা তাকে হরহামেশা নিজেকে প্রকাশ করতে হয়। সাথে সাথে অন্যকেও আলাদা করতে হয়। সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার নামে ফরাসি বিপ্লবের সময় ধর্মকে বিশেষত ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাকে আক্রমণ করা হয়। লোকালয় দখলের সাথে সাথে ধর্মকে ব্যক্তিগত চর্চার বিষয় বলে অভিধা দেয়া হয়। শুরু হয় চার্চ আর গণক্ষমতার সরাসরি টক্কর। এ সংঘাতের মীমাংসা হতে তৃতীয় প্রজাতন্ত্র পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল ফরাসিদের। তৃতীয় প্রজাতন্ত্র মানবতা, মুক্তি, সাম্য ইত্যকার আদর্শের নামে নাগরিকদের সভ্যকরণের জন্য ছয় থেকে তের বছরের বাচ্চাদের ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাগ্রহণ বাধ্যতামূলক করে। দেশে মোল্লাতন্ত্র বিরোধী শিক্ষার প্রসার, চার্চের সাথে অসম চুক্তি এবং বাইরে ঔপনিবেশিক বিস্তার--এই তিন ভিত্তির ওপর লাইসিতের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। এটাই ফরাসি জাতীয়তাবাদের জন্মের মুহূর্ত। ফরাসি উপনিবেশ থাকলেও আলজেরিয়ার ইতিহাস এই পথে আগায় নাই।

আসলে আধুনিক ফরাসি রাষ্ট্রও ‘রাজ ধর্মই প্রজার ধর্ম’--এই নীতির ওপরই আছে। রাষ্ট্র যেমন সবার ওপরে আবার তা প্রতিনিধিত্বশীল কর্তাসত্তাও বটে--দুর্খেইম যেমনটা ভাবেন। অথবা হবস যেমনটা দেখান যে, রাষ্ট্র সমস্ত রাজনীতিক-জনগোষ্ঠীর চাইতে এমনকি অপ্রাকৃতিক শক্তি হতেও স্বাধীন এবং সার্বভৌম।

যা ইচ্ছা তাই করতে পারি মার্কা রাষ্ট্র কোন চিহ্ন বা প্রতীকের কি মানে, তা ঠিক করার সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। হোক তা ধর্র্মীয় অথবা সেকুলার। এমনকি এটা যে শুধু লোকালয়ের মধ্যে সীমিত তা মোটেই নয়। কারণ সদর-অন্দর সবকিছুর সংজ্ঞা তো আদতে রাষ্ট্রই নির্ণয় করে দিচ্ছে। সেই আলোকে পাঠ করলে স্টাসি রিপোর্ট বুঝতে খানিক সুবিধা হয়।

তালাল খেয়াল করেন যে, স্টাসি রিপোর্ট সরব চিহ্ন (conspicuous religious signs) এবং নিরব চিহ্ন (discreet signs) এর ভেতর ফারাক টানছে। পর্দা (বোরকা, নিকাব...ইত্যাদি) কিম্বা গলায় বড় ক্রশ উল্লেখিত প্রথম ঘরানার আর মেডালিয়ন, ছোট ক্রশ, ডেভিডের তারা, ফাতিমার হাত বা ছোট কুরআন ইত্যাদি দ্বিতীয় ঘরানার। তালালের দাবি, মুসলিম নারীদের কাছে মাথায় ওড়না পরা বা পর্দা গ্রহণ করা ধর্মীয় কর্তব্য। কিন্তু‘ কোন নিরব চিহ্ন বহন করার কোন আবশ্যকতা নাই। তার কাছে পর্দা কোনভাবেই নিছকই কোন চিহ্ন মাত্র না। বরং তার সত্তার অনিবার্য অংশ। কিন্তু রিপোর্টে তা শুধু একরৈখিক স্থির অর্থ বিশিষ্ট ধর্মীয় চিহ্ন, ব্যাঞ্জনাহীন ধবধবে সাদা। বিভিন্ন ধর্মীয় চিহ্নের মুক্ত প্রকাশ ব্যক্তি অধিকারের অপরিহার্য অংশ যতক্ষণ পর্যন্ত না কেউ আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। একটা অতিক্ষুদ্র অংশের গুটিকয়েক ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই ‘আধিপত্য বিস্তার’র অর্থ একেবারেই পরিস্কার না বলে তালাল মনে করেন। শুধু চাক্ষুষ না, এমনকি মানসিক প্রক্রিয়ার কথাও উল্লেখ রয়েছে প্রতিবেদনে। যেমন অভিপ্রায়, বাসনা ইত্যাদি। ‘মুসলিম পরিচয়ের সাথে অনিবার্য দিক হল এই পরিচয় প্রকাশের অভিপ্রায়’। এমনিভাবে কমিশন ‘বাসনা’র মনগড়া অর্থ তৈরি করে।

মাথায় কাপড় দেব কি দেব না--এই দ্বৈততার ভেতর কমিশন দ্বিতীয় সম্ভাবনাই বেছে নেয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। এই বেছে নেয়া লাইসিতের সাথে যায়। ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিটি নাগরিকের আপোষহীন অধিকার--যদিও এই নীতির সাথে বেখাপ্পা। তালাল জোর দেন বাসনার ব্যখ্যার ওপর। বাসনাকে নিমিত্ত বস্তু পর্দা থেকে আলাদা করা হয়। ফলত সেই বাসনা হয়ে যায় সাধাসিদা, যাকে কিনা অংকের হিশাবে বুঝা যায়। ‘বাসনার স্বরূপে কোন ধর্ম বা অধর্ম নাই, এসব হল সোজাসাপ্টা সামাজিক ঘটনা’। কাজেই প্রজাতন্ত্র সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কার অর্থ কি। আর সেটাই চূড়ান্ত। এমনকি রাষ্ট্রই বেঁধে দিচ্ছে ব্যক্তিগত বলয়ের চৌহদ্দি। আবার যা কিছু ব্যক্তিগত তাকে লোকালয়ে টেনে আনছে। এই লোকালয় হচ্ছে লিবারেল গণতান্ত্রিক ভরসার জায়গা। প্রজাতন্ত্র কখনই চাইবে না যে, নাগরিকরা রাষ্ট্রের চাইতে বেশি দূরত্বে অবস্থান করুক।

গোড়ায় ধর্মনিরপেক্ষতার উল্লেখযোগ্য কিছু দ্বন্দ্বমূলক বৈশিষ্ট্য ছিল। যেকোন ধর্মীয় ব্যাপারে নিজেকে গুটায়ে নেওয়া, এমনকি ধর্মীয় চিহ্ন নির্ধারণ-সংজ্ঞায়ন থেকেও বিরত থাকত রাষ্ট্র। অপরদিকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ছিল নাগরিকের ধর্মনিরপেক্ষতার শিক্ষায় শিক্ষিত করা। বিচারকরা স্বাভাবিকভাবেই ভাবতেন যে, ধর্মীয় চিহ্নের অর্থ নির্ধারণ তাদের কাজ না। এটা তাদের এখতিয়ারের বাইরে। ফলত পর্দা নারী-পুরুষে বৈষম্য তৈরি করে কিনা তা নির্ণয়ও বিচারকদের কাজ ছিল না। প্রভাবশালী মহল বিচারকদের এহেন নির্লিপ্ততায় নাখোশ তা স্টাসি রিপোর্টে বুঝা যায়। রিপোর্টের অন্যতম লক্ষ্য আইনই অর্থ নির্দিষ্ট করুক। তাই সে উদ্দেশ্যে প্রথম করণীয় হল কোনটাকে ‘ধর্মীয় চিহ্ন’ বলা হবে তা ঠিক করা। তার পরে প্রয়োজনীয় মানে বসানো যাবে। কমিশন যাকে একটি চিহ্ন বলে সাব্যস্ত করে তার নিজের অন্তর্গত কোন অর্থ নাই। তালালের সিদ্ধান্ত ‘ধর্মীয় চিহ্ন’ প্রজাতন্ত্রের এক নতুন খেলা। যার ভেতর আধুনিক রাষ্ট্র নিজেরে জারি রাখে।

রাজনৈতিক শক্তি ও ধর্ম আলাদা ও স্বাধীন। কেউ কারো ওপর প্রভাব খাটাতে পারবে না। স্টাসি কমিশন এইসব দিকের ওপর জোর দিয়েছে। তবে রিপোর্ট পাঠে প্রতীয়মান হয় যে, ধর্ম ও রাজনীতির সম্পর্ক এখানে অসমান। ধর্ম যদিও রাষ্ট্রকে ঘাঁটায় না। পক্ষান্তরে রাষ্ট্রের দিক থেকে ব্যাপারটা মোটেও এমনটা না। তাই তারা অসমান। কারণ রাষ্ট্রের ক্ষমতার হাত অনেক লম্বা। তালালের সূত্রায়ন ইহাকেই বলে সার্বভৌম ক্ষমতা। মহান রাষ্ট্রতত্ত্ববিদ কার্ল শ্মিটের বরাতে বলেন, লাইসিতে ব্যতিক্রমেরই (state of exception) প্রকাশ। সার্বভৌম ক্ষমতা রাষ্ট্রের অপরিহার্য উপাদান। লাইসিতে সেই সার্বভৌম ক্ষমতারই উপস্থিতি। যার যথেচ্ছা প্রয়োগের মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের সাথে সংযুক্ততা-অসংযুক্ততা নির্ধারণ ও নির্ণয় করা হয়।

ফ্রান্স নানা ধরনের ধর্মীয় সম্প্রদায়-দল-গোষ্ঠী দেখা যায়। ভর্তুকিপ্রাপ্ত ধর্মীয় স্কুল ধর্মীয় সংস্থা ইত্যাদি কার্যকরভাবে ফরাসি সেকুলার কাঠামোয় অস্তিত্বশীল। তালালের প্রশ্ন এসব সম্প্রদায়ের পৃষ্ঠপোষকতা কি সাম্প্রদায়িকতা না?

বিরাজমান এইসকল গোষ্ঠী সম্প্রদায় কোনভাবেই সমান ক্ষমতা অর্জন বা প্রয়োগ করতে পারে না। কাজেই তাদের ক্ষমতা বিন্যাস মোটেও সুষম না। ফলে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলার প্রতি রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার যেই গান গাওয়ার ভান রাষ্ট্র করে তা সমস্যাজনক। নাগরিকতা এবং জাতীয়তার সাথে সম্পৃক্ততার বোধ সবসময় নিশ্চিত, নিরাপদ ও দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে না। মতভেদের প্রতি সহিষ্ণুতা না, বরং সার্বভৌমত্বই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। যা কিনা ব্যতিক্রম অবস্থাকে নির্ণয় করে এবং সায় দেয়। ধর্মনিরপেক্ষতাকে তালাল একেবারেই সহিষ্ণুতার সূত্র মনে করেন না। সেকুলারিজমকে যারা শত্রু মনে করে, সেকুলারিজমও তাদের শত্রু মনে করতে কসুর করে না। তাদের ওপর চরম নিষ্ঠুরতা, ত্রাস প্রয়োগ করতে পিছপা হয় না।

আগামবেনের মতে, বিশ্বে এখন ব্যতিক্রম অবস্থাই চলমান। এমতাবস্থায় লিবারেল গণতান্ত্রিকরা গোলমাল এড়াতে এবং ‘আইনের শাসন’ কায়েম করতে শুধু নির্বাহি বিভাগীয় সরকারি আদেশ জারি করেই ক্ষান্ত হন না। বরং আইনের চোখ বেঁধে গোপন সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়। আধুনিক জগতে শান্তি কায়েমের জন্য অনিবার্যভাবে ধর্মনিরপেক্ষতাই একমাত্র দাওয়াই নয়।

তালাল হাত দেন পবিত্র ত্রিত্ব ধারণায়। সাম্য, স্বাধীনতা, মৈত্রী। এই ত্রিত্বই প্রজাতন্ত্রের মোহর। যার ব্যাপারে কোন অসহিষ্ণুতাই প্রজাতন্ত্র সহ্য করবে না। স্বাধীনতা, সাম্য না হয় নাগরিকের আইনগত অবস্থার সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু মিত্রতা (fraternity) কি চিজ? এর ভিত্তি কি? নানান কিসিমের ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভেতর কেমনে এই সম্পর্ক রক্ষা হয়? তালালের ভাষায় মিত্রতা আসলে আদর্শিক প্রভাব--জাতির সাথে কর বন্ধন। লাইসিতে যে শুধু আইনি ব্যাপার না, মিত্রতা--তার লক্ষণ কি? ভিনসেন্ট গেইসার ফ্রান্সে মুসলিম জনগোষ্ঠীর দূরবস্থা এবং তাদের যে বিরূপ এবং শত্রুতামূলক আচরণের অভিজ্ঞতা লাভ করতে হয় প্রতিনিয়ত সেইসব ঘটনার দলিল দাখিল করেন। তার মতে, ইসলাম এবং মুসলিমদের এমন দুর্দশার শিকড় উপনিবেশের ভেতর প্রোথিত। সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্ব সন্ত্রাসীর অভিধা। নানা অনুভূতি-বিস্ময়-বিরক্তি-তিক্ততা ইত্যাদি মিশে আছে এই দ্বন্দ্বে, আর তা ঐতিহাসিক মুসলিম সালতানাত পার হয়ে প্রজাতন্ত্রের সেকুলার প্রকল্পের অংশ হচ্ছে। যার লক্ষ্য এমন এক জাতীয় কর্তাসত্তা নির্মাণ, যা আইনি, অ-আইনি বা মনোজাগতিক--সর্বোতভাবেই ইসলামি কর্তাসত্তার সাথে বেমানান হবে। এই রাষ্ট্রীয় বৈষম্য প্রকল্পে শামিল হয়েছেন অনেক বুদ্ধিজীবী, লেখক ও শিল্পী। যেমন, জনপ্রিয় লেখক মিশেল হলব্যাক, অরিয়ানা ফালাক্কি। তিনি আরও দেখান, মুসলিমদের প্রতি জনরোষ যতই বাড়ছে, ইহুদিদের সাথে শত্রুতামূলক আচরণের দায় ততই মুসলিমদের ঘাড়ে চাপছে। স্টাসি কমিশনে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইহুদি বিদ্বেষ বাড়ছে যা ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য হুমকি। এ বিষয়ে প্রতিবেদনের গোটা একটা আলাদা অংশ বরাদ্দ আছে। বলা হয়েছে ‘ইহুদি বিদ্বেষের সাথে হাতে হাত ধরাধরি করে নবরূপে ধেয়ে চলছে সেকুলারিজমের প্রতি হুমকি। এই বিদ্বেষ ইহুদি সন্তান, সম্প্রদায়, চিন্তার অনুসারী, সংশ্লিষ্ট সকলকে লক্ষ্য করেই চালিত’।

কমিশনের প্রতিবেদক রেমি সোয়ার্ডস’র বক্তব্য আরও মজার। তার কথা হল, স্কুলে পর্দার জন্য করা আইন ১৯৮৯ সালের জন্য পর্যাপ্ত ছিল, কিন্তু পর্দা করা এখন ইসলামি হুমকির নিশানা। ‘আমরা যার মুখোমুখি তা বিশ্বব্যাপী ইহুদি বিদ্বেষের অংশ। এবং অবশ্যই একে রুখতে হবে।’ একই সমীকরণে তাহলে লাইসিতের ভিত্তি সাম্য, স্বাধীনতা ও মৈত্রীকে চ্যালেঞ্জ করে--এমন বহিঃশত্রুকে রুখে দাঁড়াতেই হবে। এটাই স্টাসি কমিশনের মূল বিষয়। তালাল বলেন নাই যে, কোথাও কোন ইহুদি বিদ্বেষ নাই। বরং বিদ্বেষের গতি কাঠামোকে শনাক্ত করতে চেয়েছেন। তিনি খেয়াল করেন, ফরাসি ইহুদিদের সাথে ফরাসি রাষ্ট্রের সম্পর্ক বেশ জটিল। তা এতটাই স্পর্শকাতর যে, অ-ইহুদিরা এ সম্পর্কে গণমাধ্যমে খুব কমই মন্তব্য করে। ইহুদি ধর্ম বিশেষজ্ঞ ইস্থার বেনবাসা রচিত The jews of France, Zionists without zionism প্রবন্ধের বরাতে তালাল বলেন, ফরাসি ইহুদিরা ইহুদি রাষ্ট্র ইজরাইলের ব্যাপারে খুব ভাবাবেগে আক্রান্ত। দুনিয়ার তাবৎ ইহুদি ইজরাইলে অন্তর্গত। এই আদর্শের সাথে ফরাসি নাগরিক হিশাবে ফরাসি ইহুদিদের দ্বন্দ্বমধুর সম্পর্কের বয়ান প্রবন্ধটিতে পাওয়া যায়। ইজরাইল তার অন্তর্গত সব নাগরিকের রাষ্ট্র নয়। যেমন সেখানকার ফিলিস্তিনিরা। আবার বহু অনাগরিক এবং পরদেশী ইহুদির রাষ্ট্র ইজরাইল। ফরাসি মুসলমানদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হুবহু না হলেও ফিলিস্তিনি মুসলিম বা দখলকৃত ইরাকিদের প্রতি মুসলমানদের সহজাত দুর্বলতা আছে। বেনবাসা এটা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন যে, রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিশাবে ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রীয় ঐক্যের প্রতি জোরাল অবস্থান নিলেও ধর্ম-সম্প্রদায়গত ভিন্নতা বিশিষ্ট সমাজে তেমন খাপ খায় না। উপরন্তু মানুষরা অন্য দেশ কালের একই সম্প্রদায়ের মানুষের দুঃখ বেদনা কষ্টের সাথে আত্মপরিচয়ের বন্ধনে আবদ্ধ থাকে। যা সেকুলার রাষ্ট্র কখনো গ্রাহ্য করে না, কিন্তু ইহুদিদের বেলায় ব্যতিক্রম। মোদ্দা কথা হল, ইহুদি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে ইওরোপীয় বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, রাজনীতিকরা যতটা তৎপর ততটা মুসলিম বিদ্বেষের বেলায় একেবারেই না। আধুনিক ইওরোপে জর্মান নাজিরা ইহুদিদের প্রতি যে প্রতিহিংসা প্রদর্শন করেছিল তার ধারে কাছেও যায় না আরব বা মুসলিম বিদ্বেষীদের কর্মকাণ্ড। তাহলে প্রশ্ন, আলজেরিয়ায় সংঘটিত ফরাসি ধ্বংসযজ্ঞ কি কিছুই না?

অপরাধ, পিতৃতন্ত্র--এগুলা ফরাসি সমাজে বাইরের ব্যাপার না। কিন্তু কি প্রক্রিয়ায় কোন ধর্মীয় সংস্কৃতির মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিশাবে অপরাধ প্রবণতা--পিতৃতন্ত্রকে সংযুক্ত করা হয় তা পরিস্কারভাবে অপরিচ্ছন্ন। নেপোলিয়নের কানুনে স্ত্রীকে মারধর করার অধিকার ছিল স্বামীর, যা এই সেইদিন ১৯৭৫ সালে রহিত করা হয়। কিন্তু এই জন্য কখনও বলা হয় না যে, ফরাসি সংস্কৃতি মূলগতভাবে বর্বর। নারীর প্রতি সন্ত্রাস কোন অর্থেই শুধু ইসলামি সংস্কৃতির সমস্যা না। যারা মাথায় ওড়না পরে তারা মোটেই সকলেই পিতৃতান্ত্রিক জবরদস্তির শিকার না। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লব এবং ইসলামি বৈপ্লবিকতার বিকাশে ফরাসি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা স্পষ্টতই ভীত। কিন্তু ফরাসি ভিত্তিগত আদর্শ কিভাবে তাতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন তা অস্পষ্ট। তালালের মতে, ১৯ শতকে ফ্রান্সের অস্তিত্বের লড়াইয়ে খ্রিস্টান চার্চের অবস্থানের সাথে বর্তমানে ইসলামের অবস্থান তুলনীয় নয়।

তালাল ফরাসি নরবিজ্ঞানী ইমানুয়েল টেরে’র কথা পাড়েন। স্টাসি প্রতিবেদন বিশ্লেষণে টেরে একে রাজনৈতিক হিস্টিরিয়া বলে আখ্যায়িত করেছেন। যে প্রক্রিয়ায় প্রতীকী দমন পীড়নে বাস্তবতা ঢাকা পড়ে।

এরপর তালাল খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছুঁড়েছেন। পর্দার পক্ষে অবস্থানকারীদের মতে পর্দা তাদের ধর্মবিশ্বাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাহলে যারা গ্রহণযোগ্যতার চাপে ফরাসি সমাজের কাছে তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের অংশ বিসর্জন দিতে বাধ্য হচ্ছে, তাদের ব্যথার মর্ম সম্বন্ধে সেকুলার রাষ্ট্র কি অবস্থান নেয়? জবাবটা সহজ? রাষ্ট্র একই আশা করে যে, ওই সমস্ত মানুষ যেন ধর্মবিশ্বাসকে খাটো করে দেখে। বেশিরভাগ লিবারেল তাদের বিশ্বাস প্রকাশের ব্যাপারে তেমনটা আবেগ তাড়িত না। প্রথম দিককার আধুনিক নব্য স্টয়িক ভাবুকরা আবেগকে রাষ্ট্রীয় সংহতির জন্য ক্ষতিকর শক্তি হিশাবেই দেখে ছিল। এই সকল ভাবুকরাই আধুনিক জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের ভিত্তি হিশাবে শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ ব্যবস্থার পক্ষে জোরালো সমর্থন দিয়েছিল। যদি এই আন্তরিক আবেগের বিষয়, ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস হয় তাহলে তা কোনভাবেই ক্ষতিকর হিশাবে চিহ্নিত হয় না। কিন্তু প্রত্যক্ষবাদীদের কল্যাণে আবেগটা ধর্মীয় হলেই ভালমন্দের প্রশ্ন আসে। এরপর তালাল ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্বে প্রবেশ করছেন। স্টাসি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নর-নারীর সমতা ফরাসি সমাজ ও রাষ্ট্রের ভিত্তি প্রস্তর স্বরূপ। এর ওপর কোন আঘাত হলে রাষ্ট্র নিশ্চুপ বসে থাকবে না। কমিশন প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য--মুসলিম স্কুল বালিকারা। যে রাষ্ট্র ইহুদি-খ্রিস্টান ধারার উত্তরাধিকার তারা কিভাবে মুসলিম নারীদের সমতা বিধান করবে। তালাল প্রশ্ন করেন--২০০৪ সালে ভ্যাটিক্যান থেকে প্রকাশিত এক দলিলে (On the collaboration of men of women in the church in the world) নর-নারীর পার্থক্য সম্পর্কে সামাজিক নানা ধারার কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা হয়। প্রতিউত্তরে বিখ্যাত ধর্মীয় সমাজতত্ত্ববিদ দানিয়েল হার্ভি নেগার বলেন যে, চার্চ সময়ের সাথে প্রাসঙ্গিক থাকতে সমর্থ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, চার্চ সমতার পরিপন্থী না। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীকে তিনি সেন্ট পলের বিখ্যাত উক্তি শোনান--‘হতে পারে না কোন ইহুদি না কোন গ্রিক, না দাস না প্রভু, না নর নারী, কিন্তু খ্রিস্টের ভেতর সবাই এক।’ তালালের মতে, এ কোন একতার কথা না। নর-নারী সমান--এতে তা বলা হয় নাই। যা বলা হয়েছে তা হল, যিশুর অস্তিত্বে সবকিছু একীভূত হবে। ঠিক যেমনটা সকল নর-নারী সম্প্রদায় একীভূত হবে নাগরিক হিশাবে। এ পর্যায়ে তালাল সঙ্গত কারণেই পাঠককে প্রশ্ন করেন--‘আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতার শিকড় খ্রিস্টীয় সার্বিকতার পেটে, তা কি আমরা বুঝি?’ ঠিক--একইভাবে নারীদের ভোট প্রয়োগের অধিকার লাভের মাধ্যমেও তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয় না। ভোটের নিজস্ব কোন বৈশিষ্ট্য নাই। ভোটের ফলাফলই আসলে তাৎপর্যময়।

বাকি অংশ : রাষ্ট্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, পর্দা ও আধুনিক আকিদা

ocheton@gmail.com


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(1)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : পর্দা। বোরকা

View: 7607 Leave comments-(1) Bookmark and Share

1

আচ্ছা, খ্রীস্টান নান’দের পোষাকও কি নিষিদ্ধ করা হয়েছে? ওটাও তো প্রায় বোরকা...

Thursday 02 December 10
শেখ সানী অামান


EMAIL
PASSWORD