সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

রোকেয়া বেগম


Sunday 31 October 10

print

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান এর সাথে আলাপচারিতা

ড. মিজানুর রহমান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবা খাতে মানবাধিকার নিশ্চিত হচ্ছে কি না--সে বিষয়ে তদারকি করতে সম্প্রতি তিনি রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলা পরিদর্শন করেন। এর সূত্র ধরে মানবাধিকারের সাথে স্বাস্থ্যসেবার সম্পর্ক এবং বাংলাদেশে স্বাস্থ্য সেবা খাতে মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ে জনাব রহমানের সাথে চিন্তা’র পক্ষ থেকে আলাপে ছিলেন রোকেয়া বেগম

 চিন্তা: আমরা জানি, আপনি স্বাস্থ্য ইস্যু নিয়ে কাজ করছেন, কিন্তু মানবাধিকারের সাথে স্বাস্থ্য সেবার সম্পর্ক কি?

 ড. মিজানুর রহমান: বিবিসিও আমাকে এই প্রশ্নটি করেছিলেন। যাদের ধারণা আছে তারা সেই নিরিখে মানবাধিকার বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। মানবাধিকারের সাথে স্বাস্থ্যের সম্পর্ক এখানেই যে, আমাদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি দায়িত্ব। এবং এটি মানবাধিকারের পর্যায়ে পড়ে। মানবাধিকার শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়। এতে আমরা দেখতে চেষ্টা করেছি যাতে শুধু রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারগুলোকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে আবার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারকে মূল্যহীন করে ফেলা না হয়। এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাহায্য ব্যতিরেকে পূর্ণতা লাভ করতে পারে না। আমাদের দেশের নাগরিকরা বিনা কারণে আটক হচ্ছে। তাদেরকে জেলে আটকিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। এখানেও মানবাধিকার সংগঠন কাজ করছে। তেমনি স্বাস্থ্য সেবা নিতে গিয়ে যখন দরিদ্র জনগণ বঞ্চিত হয় তখন কাউকে সোচ্চার হতে দেখি না। সেকারণে স্বাস্থ্য ইস্যু নিয়ে কাজ করার জন্য বাধ্য হয়েছি। সবাইকে যদি এ বিষয়ে সচেতন না করি তাহলে মানবাধিকার বিষয় নিয়ে কাজ করাটা পূর্ণতা লাভ করে না। স্বাস্থ্য খাতে জনগণের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যতটুকু বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয় সেটা যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে কি না, যদি না হয়ে থাকে তাহলে আমরা মনে করি এখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই স্বাস্থ্য খাতে মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টিতে জোর দিয়েছি। আমরা মনে করছি আমরা যথেষ্ট এগিয়েছি। বেশ কিছু হাসপাতাল পরিদর্শন করার সুযোগ হয়েছে। সেখানে প্রধানত দরিদ্র জনগণ সেবা নিতে এসে অবহেলার শিকার হচ্ছে। সেটাই বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এবং ক্রমাগত তাদের আচার আচরণে এই অবহেলা অবজ্ঞা প্রকাশ পাচ্ছে। ন্যূনতম সেবা পাওয়া জনগণের নাগরিক অধিকার। সে সেবা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। গরিবদেরকে সেবা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। সরকারকে সেটা অবশ্যই দিতে হবে।

 আপনার বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। এসব সরকারি হাসপাতালে বা জনগণের হাসপাতালে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাতে কি দেখতে পেয়েছেন?

 আমাদের পরিদর্শনে আমি পরিস্কার দেখতি পেয়েছি যে, দরিদ্র জনগণের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। সংবিধানের দিক থেকে যদি আইনিভাবে দেখা হয় তাহলে আদালতে এটা টিকবে না। জীবন রক্ষার অধিকার--এগুলা কিন্তু সারা বিশ্বে মৌলিক অধিকার হিশাবে দেখা হয়। আমাদের প্রতিবেশি দেশ ভারতও মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ দেশেও কয়েকটি মামলা হয়েছে স্বাস্থ্য বিষয়ে। আইনিভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি দরিদ্র মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। রাষ্ট্র জনগণের জন্য যে স্বাস্থ্য সেবা বরাদ্দ করেছে সেই সেবা এবং সুচিকিৎসা জনগণ পাচ্ছে কিনা সেটা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একজন ভিক্ষুকের উপার্জিত অর্থও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হচ্ছে। আবার সরকারকে জনগণ ট্যাক্স দেয়। সেই ট্যাক্সের টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে যে খাত থেকে অর্থ আসে তার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না সেটাও দেখার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করি। এটা জনগণের অধিকার।

দরিদ্র জনগণের স্বাস্থ্যসেবা দেয়া সরকারের দায়িত্ব। তাহলে ইউজার ফি মানে সেবার বিনিময়ে আদায়যোগ্য অর্থের বন্দোবস্ত করার ফলে কি গরিব জনগোষ্ঠীর অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে না? এ ব্যাপারে আপনাদের মতামত কি?

 অনেকে মনে করেন বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। আবার অনেকে মনে করেন বিনামূল্যে কিছু দিলে তা অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। দরিদ্রজনগণ যারা সরকারি হাসপাতাল থেকে সেবা নিচ্ছে তারা যে ১০ টাকা দিয়ে টিকেট করেন তখন তারা মনে করেন এখানে আমার একটা অধিকার আছে। কেউ যেন তাকে বলতে না পারে আমাকে দয়া করা হচ্ছে। কেউ যেন বলতে না পারে বিনামূল্যে সেবা দিচ্ছি এর পর আবার কি চাও। এটাও তাদের একটা ক্ষমতায়ন প্রক্রিয়া। যার ১০ টাকা দেয়ার ক্ষমতা নাই তাকেও যেন বিনামূল্যে সেবাটা দেয়া হয়। এই বিষয়গুলি আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে বলছি। বিনামূল্যে সেবা দেয়া নিতান্তই রাষ্ট্রের কর্তব্য।

 হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসকদের আচরণ কোন দিকটি জনগণের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা বলে মনে করেন ?

 এক ধরনের স্বার্থান্বেষী মহল সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবস্থাপনা আর আচরণ এ দুই ক্ষেত্রেই বাধা সৃষ্টি করছেন তারা। অধ্যাপক পদে যারা রয়েছেন তারা যে সময়টা হাসপাতালে দেয়া দরকার সে সময়টা তারা সেখানে দিচ্ছেন না। ঠিক সময়ে কাজে যাচ্ছেন না। চাকরি রক্ষার খাতিরে ওখানে সময় ব্যয় করছেন। ব্যক্তিগত কাজে তারা বেশি সময় ব্যয় করছেন। তারা রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবাটা দিচ্ছে না। আবার উল্টা দেখা যাচ্ছে, জুনিয়র ডাক্তাররা রোগীদের সেবা দিচ্ছে। ফলে সাধারণ রোগীরা বিশেষজ্ঞদের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তার মানে আচরণও ঠিক না, ব্যবস্থাপনারও ঠিক নাই। হাসপাতালে বিভিন্ন প্রকারের দুর্নীতি চলছে। রোগীরা যেসব ওষুধ বিনামূল্যে হাসপাতাল থেকে পাওয়ার কথা তা তারা পাচ্ছে না। হাসপাতালের ওষুধ বাইরে বিক্রি করছে। রোগীদের বলা হচ্ছে, ওষুধ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই সব ওষুধ হাসপাতালের আশে পাশের ফার্মেসিগুলোতে পাওয়া যাচ্ছে। একধরনের দালাল চক্রের সহায়তায় এটা সংঘটিত হচ্ছে। দালালদের সাথে হাসপাতালের অসাধু চক্রের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে হয়। এই বিষয়টি আমাদের সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রয়েছে তাদের নজরে এটা আসা প্রয়োজন বলে মনে করি। এখানে ট্রেড ইউনিয়ন আছে। তারা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে ব্যস্ত। আবার নেতৃস্থানীয় যারা রয়েছে তারাও তাদের ফায়দা লুটতে ব্যস্ত। কিন্তু এসব দেখার কেউ নাই। প্রশাসন অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি গুরুত্ব সহকারে দেখেন তাহলে মনে হয় এই দুর্নীতি বন্ধ হতে পারে। এটা বন্ধ করা দরকার।

 বেসরকারি হাসপাতালের অবাধ বাণিজ্য সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী বলে মনে করেন কি?

 আমি বলব হ্যাঁ, বেসরকারি হাসপাতালে যে ব্যবসা হচ্ছে এর জন্য দায়ী সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা। পঙ্গু হাসপাতালে পরিদর্শন কালে সেটা খুব পরিস্কারভাবে দেখতে পেয়েছি। এখনও পঙ্গু হাসপাতালে দালাল রয়েছে। তারা রোগীদের ভুলিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। এর বিনিময়ে তারা ভাল কমিশন পায়। দরিদ্র রোগীরা সরকারি হাসপাতালের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের দেশে টাকা ওয়ালাদের জন্য চিকিৎসাসেবা একরকম। আর গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য ভিন্নরকম। আমি এটাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে মনে করি। অব্যবস্থাপনার কারণে অনেক সময় রোগীরা বিরক্ত হয়ে চলে যায়। এমনি করে রোগীদের ঠেলে দেয়া হচ্ছে প্রাইভেট ক্লিনিকে। এজন্য অব্যবস্থাপনাই দায়ী। সিংঙ্গাপুরে সরকারি বেসরকারি সব ধরনের হাসপাতালই আছে। তাদের স্বাস্থ্য ইনসিউরেন্স আছে ফলে তাদের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা হচ্ছে না। তারা শিক্ষিত। তাদের সরকার-রাষ্ট্র কঠোর ভাবে নীতি পালন করছে। সেজন্য তারা সঠিক স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছে। আমাদের দেশেও যদি একটি স্বাস্থ্য নীতি তৈরি করা যায়। সেটা যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায় তাহলে আমরাও এই দুরবস্থা থেকে উত্তরণ করতে পারব।

আমাদের সংবিধানে স্বাস্থ্য ‘অধিকার’ কথাটা নাই। এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া জারি আছে। তাই আপনার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সেখানে সুনির্দিষ্ট পরামর্শ থাকবে কি না?

আইনমন্ত্রীকে বলেছি স্বাধীনতার ৪০ বছর পর সুযোগ এসেছে। সেখানে হেলা করে মৌলিক অধিকারকে খর্ব করা যাবে না। ৪০ বছর পর অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু স্বাস্থ্যের অবস্থা তিমিরেই পড়ে রয়েছে। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পেরেছে। আমরা এখনও এটা নিশ্চিত করতে পারি নি। স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে যে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল নাগরিকদের মধ্যে রাষ্ট্র সেটা প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি। মানব সভ্যতার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাষ্ট্রের প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে হয়। ৩০ লক্ষ জীবনের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান--এই মৌলিক অধিকারগুলার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

 বেসরকারি হাসপাতালে যে ব্যবসা হচ্ছে এর জন্য দায়ী সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা। পঙ্গু হাসপাতালে পরিদর্শন কালে সেটা খুব পরিস্কারভাবে দেখতে পেয়েছি। এখনও পঙ্গু হাসপাতালে দালাল রয়েছে। তারা রোগীদের ভুলিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। এর বিনিময়ে তারা ভাল কমিশন পায়। দরিদ্র রোগীরা সরকারি হাসপাতালের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের দেশে টাকা ওয়ালাদের জন্য চিকিৎসাসেবা একরকম। আর গ্রামের দরিদ্র মানুষের জন্য ভিন্নরকম। আমি এটাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে মনে করি।


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : স্বাস্থ্য, মানবাধিকার

View: 2802 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD