সীমান্তে ইনডিয়ার আগ্রাসন ও অনুপ্রবেশ


কামাল উদ্দিন || Sunday 31 October 10

সরেজমিন জৈন্তাপুর

ওপরের আলোকচিত্রে দেখা যাচ্ছে জৈন্তাপুর সীমান্তে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী হ্যান্ডমাইক দিয়ে ইনডিয়ার অনুপ্রবেশকারীদের ফিরে যেতে বলছে। সিলেট জৈন্তাপুর সীমান্তে ভারতীয় খাসিয়ারা বাংলাদেশের সীমানার ভেতর ঢুকে জমি জবরদখল করার ঘটনা ঘটাচ্ছে অনেক দিন ধরে। গত মার্চ-এপ্রিলে সেখানে খাসিয়াদের বাংলাদেশী জমি জবরদখল এবং বিএসএফ-বিডিআরের মারাত্মক উত্তেজনার পর দুইদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মহাপরিচালক পর্যায়ে সীমান্ত বিরোধ নিরসনে কয়েক দফা বৈঠকও হয়। কিন্তু এরপরও গত চার জুলাই জৈন্তাপুরের শ্রীপুর-মিনাটিলা সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও আগ্রাসনের ঘটনা ঘটে। প্রতিরোধকারী গ্রামবাসী, আহত লোকজন এবং মিনাটিলা সীমান্তের ক্যাম্প কমান্ডারের সাথে কথা বলে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেছি আমরা। আগ্রাসন ও অনুপ্রবেশের ঘটনা চলাকালে সেই ৬ ও ৭ জুলাই শ্রীপুর-মিনাটিলা এলাকায় ছিলেন চিন্তার প্রতিনিধি কামাল উদ্দিন

মিনাটিলা পৌঁছে কয়েকটা গ্রামের বিভিন্ন পাড়ায় সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে ঘটনার পটভূমি ও ধরনাধরণ বুঝতে চেষ্টা করি আমরা। কখনও আলাদাভাবে, আবার কখনও একজায়াগায় জড়ো হওয়া অনেকের সাথে কথা বলে। ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আসামপাড়া গ্রামের বর্গাচাষী শহীদ মিয়া (৪৫) আমাদের সামনে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন এভাবে ‘মাস দেড়েক হবে ইনডিয়ার খাসিয়ারা বাংলাদেশে ঢুকছে। যখনই তারা ঢোকার চেষ্টা করে আমরা তাদের তাড়িয়ে দেই। এইবার গুলি করার চার দিন আগে ওরা ১০ থেকে ১৫ জন ঢুকেছিল। আমরা ক’জন জমিতে কাজ করছিলাম। তখন আমাদের দাবড়ানিতে ওরা চলে যায়। তারপর আবার তারা পরশুদিন নামে।’

শহীদ মিয়াকে প্রশ্ন করি, আপনি তখন কোথায় ছিলেন?

শহীদ: আমি জমিতে কাজ করছিলাম। মনাই ভাইয়ের জমিতে আমি বর্গাচাষ করি। গুলি করার আগে সকাল থেকে দুবার ওরা জোর করে জমি চাষ করার চেষ্টা করে। আমরা দুবারই তাড়িয়ে দেই। দুপুরের দিকে ওরা প্রায় একশ-দেড়শজন তীর, ধনুক, বাটুল, সিভিল গান নিয়া আবার আমাদের জমিনে ঢোকে, আমাদের গালিগালাজ করে। পেছন থেকে ওদের সাথে বিএসএফ ছিল। হ্যান্ড মাইক দিয়ে আমাদের বলে, তোমরা আমাদের নদী থেকে পাথর তোল, বালু তোল, আমরা বাধা দেই না, তোমরাও বাধা দিবা না আমাদের।

আপনি ওদের ভাষা বুঝেন?

শহীদ: হ্যাঁ, আমি কইলাম, আপনাদের সীমানায় আমরা যাই না। আমরা আমাদের নদী থেকেই যা পাই তুলি। আমাদের জমিতে কেউ আসতে পারবে না। সাথে সাথে ওরা তখন তীর, ধনুক, বাটুল দিয়ে আক্রমণ শুরু করে। বিডিআর আমাদের বলল, তোমরা আরও লোকজন নিয়া আস। পরে আমরা দুই-আড়াইশ জন লোক একজোট হয়ে ঢিল ছুঁড়তে ছুঁড়তে ওদেরকে পাহাড়ে তুলে দেই। বিডিআর তখন আমাদের চলে আসতে বলে:‘ওরা চলে গেছে তোমরা চলে আস’। আমরা যখন চলে আসছি তখন ওরা পেছন থেকে আমাদের গুলি করে। গুলিতে পাঁচজন আহত হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। বিডিআরকে গুলি ছুঁড়তে বললে তারা গুলি না করে বাঙ্কারে চলে যায়।

আদর্শ পাড়ার করিম মিয়ার (৩৮) মত হচ্ছে, ‘ওই দিন খাসিয়াদের মত আমাদের কাছেও যদি ‘সিভিল গান’ থাকত তাহলে আজ আমাদের এ অবস্থা হত না। বিএসএফ তাদের সহযোগিতা করলে বাংলাদেশের মধ্যে বিডিআর কেন আমাদের সহযোগিতা করবে না?’

আসাম পাড়া গ্রামের আলী হুসেন (৬৭) জানালেন, ‘বিডিআর আমাদের ছেলেদের বাজার থেকে, খেলার মাঠ থেকে, বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গেছে। পাঁচজন গুলি খেয়েছে তারপরও তারা কোন প্রতিউত্তর দেয় নাই। এজন্যই এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে বিডিআর ক্যাম্প ঘেরাও করে বাঙ্কার ভাঙচুর করেছে। সিলেট-তামাবিল সড়ক অবরোধ করেছে। এম.পি (ইমরান আহমদ) আসার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। আমরা শুনেছি, পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পর বিডিআরের সিও সাহেব ক্যাম্পে এসেছেন।’

তাকে জিজ্ঞেস করলাম, এম.পি সাহেব কি বললেন?

জবাব দিলেন পাশে বসা আবদুর রউফ। রউফ জানালেন, ‘বিডিআরদের উনি বলেছেন, বন্দুক নিয়া না হোক হাত দিয়া পার, লাঠি দিয়া পার, তোমরা জবরদখল প্রতিরোধ করবে। জনগণকে সহযোগিতা করাই তোমাদের কাজ।’ আবার আলাপে যোগ দিলেন আলী হুসেন। হুসেন জানালেন, ‘গতকালও (৫ জুলাই) খাসিয়ারা বাংলাদেশে ঢুকে ধানের বীজ ফেলে গেছে। বিডিআর তাদের কোন বাধা দেয় নাই।’ বিডিআরের চুপ থাকার বিষয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, বিডিআর কি সবসময়ই নিষ্ক্রিয় থাকে?

আলী হুসেন জবাব দিলেন, ‘না অন্য সময় খাসিয়ারা বাংলাদেশে ঢুকলে বা বিএসএফ গুলি করলে তারাও পাল্টা গুলি করত কিন্তু এবারই এর ব্যতিক্রম হল। ঘটনার পটভূমি তুলে ধরতে গিয়ে কথা বলছিলেন শহীদ মিয়া, ‘কেন্দ্রি হাওর, আলু বাগান নিয়াও তাদের আপত্তি। এই জায়গাটা নিয়া এবারই প্রথম আপত্তি জানিয়েছে। এর আগে জাফলং ও জৈন্তাপুরের অনেক জায়গাই তাদের আপত্তির কারণে আমরা ভোগ করতে পারি নাই। আবার জমিও এমনি পড়ে থাকে।

পাশে থেকে কথা বললেন আরেকজন, মনাই মিয়া। মনাই মিয়া জানালেন, ‘আমার সাত একর জমি ১৯৯১ সালে বেহাত হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকেই ওই জমি আমরা ভোগ করছি। তখন বিডিআরের সিও সাহেব বলেছিলেন, আইন অনুযায়ী যার জায়গা সেই পাবে। কিন্তু সেখানে তো আর যেতে পারছি না। দেখলেই বিএসএফ গুলি করে। অথচ আমার বৈধ দলিল আছে।’ তাকে প্রশ্ন করলাম, ইনডিয়ার ওরা কি বলে?

মনাই মিয়া: ওরা বলে, দেশ ভাগের আগে ওই জমি তারা ভোগ করেছে। ওই জমি ওদের। তখন ক্যাম্পের হাবিলদার সাহেব বলেছিলেন, ইনডিয়ার নাগরিক হয়ে এ জমি ভোগ করা যাবে না। এরপরই তো মিনাটিলা ক্যাম্প হল।

আদর্শগ্রাম বাজারের হোটেল ব্যবসায়ী আইয়ুব আলী (৬৭) বলেন, ‘আমরা শুনেছি, দেশ ভাগের সময় যারা চলে গেছে, তাদের জমিকে এনিমি প্রপার্টি(শত্র“ সম্পত্তি) গণ্য করা হয়। যারা ভারত থেকে বাংলাদেশে মুহাজির হয়েছে এইসব জমির কিছু তাদের নামে দেয়া হয়। এবং নতুন ভাবে খাল জমি হিশাবে এদেশের মানুষকে চাষাবাদের জন্য রেজিস্ট্রি করে দেয়া হয়।’

মেম্বার মিরন মিয়া (২ নং ওয়ার্ডের সদস্য) বলেন, ‘ঘটনাটি ঘটেছে ২নং জৈন্তাপুর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে। আমাদের প্রশ্ন হল--তারা (বিডিআর) আমাদের ডেকে নিয়ে গেছে কিন্তু বিএসএফের গুলির জবাব দিল না কেন? তারা বলতেছে, আমাদের গুলির অনুমতি নাই। তাহলে আমাদের ডেকে নিল কেন?’

 

হাবিলদার মুহাম্মদ মনিরুদ্দিন ভূঁইয়া, ক্যাম্প কমান্ডার, মিনাটিলা, বিডিআর

জমি জবরদখল করতে বিএসএফ অসামরিক বাংলাদেশী ও বিডিআরের মিনাটিলা ক্যাম্পে খাসিয়াদের দিয়ে স্বশস্ত্র হামলা করায় জুলাইয়ের চার তারিখে। ঘটনায় বিডিআরের অবস্থান জানতে চেয়েছিলাম বিডিআরের মিনাটিলা ক্যাম্প কমান্ডার হাবিলদার মুহাম্মদ মনিরুদ্দিন ভূঁইয়ার কাছে।

তারা হল শক্তিশালী দেশ

চিন্তা: গুলি হয়েছে কোন সীমানায়?

আমার দায়িত্বের এলাকা হল ১২৮২-১২৮৪ নং পিলার পর্যন্ত। গুলি হয়েছে আমার এরিয়ায়। ১২৭৯ থেকে ১২৮৪ পর্যন্ত পিলার নিয়েই এখন তাদের আপত্তি। ইতিপূর্বে ১২৮৪ নং পিলার থেকে ১২৮৬ নং পর্যন্ত আপত্তি ছিল--যাকে ঢিবির হাওর বলে।

কতটুকু জায়গা জবরদখল করেছে ইনডিয়া?

আমার এরিয়ার (১৯৮২-১২৮৪) মধ্যে ৬৪.৯০ একর জায়গা।

এলাকার লোকজন অভিযোগ করছেন যে, আপনারা তাদের ডেকে এনেছেন খাসিয়াদের প্রতিরোধ করতে। কিন্তু ভারতীয় খাসিয়া এবং বিএসএফ যখন গুলি করেছে তখন আপনারা নিরব ভূমিকা পালন করেছেন, এটা ঠেকাতে কোনও চেষ্টা করেন নাই কেন?

কোন বিবেকবান লোক এটা করতে পারে না। আমরা নিরস্ত্র বাংলাদেশীদের বন্দুকের নলের সামনে ফেলতে পারি না। আপনারা পত্র-পত্রিকা খেয়াল করলে দেখবেন বিএসএফ সীমান্ত আইন অমান্য করে বাংলাদেশীদের গুলি করে। জেনে শুনে এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমরা জনগণকে ঠেলে দিতে পারি না। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, ১২ বছরের ছেলে কায়েসের গায়ে গুলি লেগেছে। কোমরে মান্নানের (২২) গুলি লেগেছে। দুজনকেই পায়ে পেছন থেকে গুলি করা হয়েছে।

এর মানে কি?

আমরা বাংলাদেশী জনগণকে চলে আসতে বলেছি। এরা ফেরার সময়ই খাসিয়ারা গুলি করে। আমরা ওদের সেভ করতে চেয়েছি।

তারপরও পাল্টা গুলি করেন নাই কেন?

আমাদের এলাকাটা সমতল, আমরা পাঁচটা গুলি করলে ওরা দশটা গুলি করত। দশ রাউন্ড গুলিতে অন্তত একশটা লোক মারা যেত। দুইশ থেকে আড়াইশ লোকও খোলা মাঠে লুকানোর জায়গা পেত না। তাই গুলি করি নাই।

তাহলে আপনি বলছেন যে এলাকাবাসীর অভিযোগ ঠিক না?

না। ঠিক না। অভিযোগ থাকতে পারে না। কারণ আমরা আমাদের দায়িত্ব ঠিক মত পালন করি বলেই ওরা জমি চাষ করতে পারে। সীমান্তের কাছে গরু চরাতে পারে।

আপনারা পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে গুলি করেন নাই। এর কারণ হিশাবে পত্রিকায় এসেছে--লোকজন বলল, আপনারা বলেছেন, ‘ওপরের নির্দেশ নেই’।

নির্দেশ নেই সেটা ঠিক না। বললাম তো গুলি করার মত পরিস্থিতি ছিল না।

আপনারা কতক্ষণ সক্রিয়ভাবে ডিউটিতে থাকেন?

আমরা যেহেতু সীমান্তে থাকি, ২৪ ঘণ্টাই আমাদের সীমান্তের দিকে লক্ষ রাখতে হয়।

পরশুদিনের ঘটনায় কজন কোথায় ছিলেন?

পাগলাটিলায় আমি সহ ছয়জন জওয়ান সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিলাম।

গতকাল (৫ জুলাই) নাকি খাসিয়ারা আবার বাংলাদেশে ঢুকেছিল?

হ্যাঁ, পরশুদিন চাষ করেছিল। সেখানে মই দিয়ে বীজ ফেলে গেছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিনা অনুমতিতে অন্যদেশের নাগরিক যদি অনুপ্রবেশ করে এবং ভূমি জবরদখল করে তবে সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিশাবে আপনাদের কি ভূমিকা পালন করার কথা?

১৯৭৫ সালের সীমান্ত চুক্তি অনুসারে সীমান্ত থেকে ১৫০ গজের মধ্যে ঢুকলে বাধা দিতে হবে।

কিন্তু খাসিয়ারা তো ১৫০ গজ থেকেও আরও বেশি ভেতরে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মধ্যে সশস্ত্র হয়ে দলবদ্ধভাবে হামলা করেছে। বাংলাদেশীদের ওপর গুলি চালিয়েছে। বাংলাদেশের ভূমি জবরদখল করে চাষ করেছে। ফসলে বীজ বুনে গেছে। তারপরও চুক্তি অনুযায়ী বাধা দিলেন না কেন? আপনি কি বুঝতে পারছেন, আপনারা আপনাদের ওপর দেয়া দায়িত্ব--প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালন করেন নাই?

হ্যাঁ, এটা জবর দখল। এদিক থেকে হলে বিএসএফ এই ক্ষেত্রে ফায়ার করত। আমরা করি নাই। কিন্তু এটা আমাদেরকে বলা হয় নাই যে ঢুকলেই ফায়ার করতে হবে।

এতকিছুর পরও অনুমতি নাই?

না, তারা হল শক্তিশালী দেশ।

কিন্তু আপনার ভাষায় ইনডিয়া শক্তিশালী দেশ হওয়া সত্ত্বে সীমান্ত আইন ভাঙ্গার অপরাধে এর আগে আপনারা সশস্ত্র প্রতিরোধ করেছেন নানা জায়গায়, গুলিও করেছেন। সে যা-ই হোক খাসিয়াদের কিন্তু বিএসএফই প্রত্যক্ষ সমর্থন দিয়ে অনুপ্রবেশ করাচ্ছে বলে এখানকার অধিবাসীরা অভিযোগ করছেন।

হ্যাঁ, সাপোর্ট দিচ্ছে। বিএসএফ সীমান্ত আইন অমান্য করেছে। ১৯৭৫ সালের চুক্তি অনুযায়ী সীমান্ত পিলার (জিরো পয়েন্ট) থেকে ১৫০ গজের মধ্যে কোন দেশ স্থায়ী কোন স্থাপনা এমনকি বাঙ্কার তৈরি করতে পারবে না। বিএসএফ এই সীমান্ত জিরো পয়েন্টের ১০ গজের মধ্যে বাঙ্কার তৈরি করেছে। এবং জাফলং’র সংগ্রাম ক্যাম্পে তারা বাঙ্কার তৈরি করেছে এক গজের মধ্যে।

কতদিন আগে থেকে চুক্তি ভঙ্গ করে বাঙ্কার নির্মাণ ও জবরদখল করছে বিএসএফ?

১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে এই প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে।

আর বিএসএফ ছাড়াও গত কয়েক মাস ধরে তো ইনডিয়ার নাগরিকরাও সশস্ত্র অনুপ্রবেশ করছে। এটা প্রতিরোধ করতে আপনারা কি পদক্ষেপ নিয়েছেন?

তাদের অনুপ্রবেশে বাধা দিতে অফিসারের নির্দেশে একমাস দশদিন হল পাগলা টিলায় একটি বাঙ্কার নির্মাণ করেছি।

বাধা দেয়ার নিয়ম কি?

প্রথমে বাঁশি বাজাই। তারপর সিড পতাকা টানাই এবং হ্যান্ড মাইক দিয়ে তাদের নামতে নিষেধ করি। তিন ধরনের পতাকা আছে। এক. সবুজ, দুই. সাদা, তিন. লাল। সবুজ পতাকা টানানোর অর্থ হল: আমরা তোমাদের সাথে কথা বলতে চাই। সাদা পতাকা টানানোর অর্থ হল--আমরা ঝগড়া চাই না, শান্তি চাই। লাল পতাকা টানানোর অর্থ কড়াভাবে প্রতিবাদ--তোমরা সাবধান বা বিরত না হলে আমরা ফায়ার করতে বাধ্য হব।

গত পরশু লাল পতাকা টানিয়েছিলেন?

হ্যাঁ।

মাইকে কি বললেন?

ওইদিন বলেছি, তোমরা আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র। পাড়া প্রতিবেশির মত তোমরা আমাদের বন্ধু। ইনডিয়া প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আস বন্ধুত্ব রক্ষা করি।

কিন্তু তারা তো বন্ধুত্ব রক্ষা না করে জমি জবরদখল করেছে। গুলি করেছে।

হ্যাঁ করেছে। এটা তো দেখেছি।

গতকালও তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসেছে। তখনও কি লাল পতাকা টানিয়েছিলেন?

না। আমরা জানতে পেরেছি, ভারতীয় হাইকমিশনের সাথে বৈঠক হবে তাই আমরা তাদের বাধা দেই নাই।

গতকালই বৈঠক হয়েছে। এর মধ্যে কি কোন নির্দেশনা পেয়েছেন?

এখনও আমাদের কিচ্ছু জানানো হয় নাই।

বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে।

সীমান্তে দুই দেশের বাহিনী যৌথভাবে কিছুদিন পরপর সীমান্ত পিলার পরিদর্শন করে থাকে--এটাকে জয়েন্ট পেট্রলিং বলে। মানে, সীমান্ত পিলারগুলা ঠিক জায়গায় আছে কিনা তা দেখা। পিলার নষ্ট হয়ে গেলে বা সরে গেলে ঠিক করাই এ কমিশনের দায়িত্ব। গত জুন মাসের বাইশ তারিখ পেট্রলিং করার ডেট ছিল। ২১ তারিখ বিএসএফ জানিয়েছে, তাদের সমস্যা আছে এখন পেট্রলিং সম্ভব না।

দেখলাম বিএসএফ অনেক জায়গা থেকে পিলার তুলে ফেলেছে। এটা কি ঠিক?

হ্যাঁ, অনেক জায়গায় পিলার তুলে ফেললে সীমানা চিহ্নিত করা কষ্টকর।

চার জুলাই গুলির পর কি পতাকা বৈঠক করেছেন?

ওই ঘটনার পরও আমরা পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছি। আগেও করেছি। তারা কোন সাড়া দেয় নি। আমাদের সীমান্ত বাহিনীর নিয়ম হচ্ছে, ক্যাম্পে কামান্ডোর নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার পিলার ঠিকঠাক আছে কি না তা দেখে দায়িত্ব গ্রহণ করা। কিন্তু আমি যখন এ লক্ষ্যে তাদের চিঠি দিতে যাচ্ছি তখন তারা ১৫০ গজের আগেই আমাদের বাধা দিয়ে বলে--‘হট যাও, হট যাও’ (চলে যাও, চলে যাও)। তখন তাদের বললাম আমি নতুন দায়িত্বে এসেছি। সীমানা পিলার দেখা দরকার। চিঠি দেব। বলল, না। পতাকা বৈঠকের আমন্ত্রণ করেও সাড়া পাই নি।

এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন? তারা কি বলেন?

হ্যাঁ বলেছি। তারা বলেন, আমরা উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু এতে তো কখনও কাজ হয় কখনও হয় না।

এই এলাকার এম.পি সাহেব বললেন, বিডিআরের কাজ হল, সীমান্ত রক্ষা করা, সীমান্তে জনগণের জানমালের হেফাজত করা। এবং তিনি বলেছেন, বিএসএফ গুলি করেছে বাংলাদেশীদের ওপর আর আপনারা বন্দুক নিয়া দাঁড়িয়ে থাকবেন এটা হয় না। এরপর থেকে হয় বন্দুক নিয়ে এর জবাব দেবেন। না হয় বন্দুক রেখে লাঠিসোটা নিয়ে জনগণকে সহযোগিতা করবেন।

আসলে রাজনৈতিক নেতারা জনগণের মন জয় করতে অনেক কিছুই বলেন। আমরা পতাকার পক্ষে কাজ করি। আমরা কোন দলের রাজনীতি করি না। সে পতাকা পাবে। সে আমাদের যেভাবে চালাবে ওই ভাবেই চলব। আমরা ইউনিফর্ম পরি। ইউনিফর্মের কোন দল নাই। আমি বুঝি বাংলাদেশকে রক্ষা করাই পতাকা রক্ষা করা।

কিন্তু এখন যে রক্ষা করতে পারছেন না, কেন? বিডিআর কি আগের চেয়ে দুর্বল?

না, আমরা দুর্বল না।

কিছুদিন আগে তো আপনাদের অস্ত্র ছাড়া সীমান্ত পাহারা দিতে হয়েছে। নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। পোশাক পরিবর্তন হচ্ছে। তাহলে এর কি কোনও ...

হাবিলদার: পোশাক বা নামে কিছু যায় আসে না। আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করে যাব। সাদা পোশাক পরেছি। পলিস্টার খাকি সব পোশাকই পরেছি। সরকার যা দেবে তাই পরব।

দায়িত্ব পালন করার মত সঠিক নির্দেশনা পাচ্ছেন?

আমাদের বলা হয়েছে, দেখ তোমরাও কিছু করতে পারবা না। আমরাও কিছু করতে পারব না। সরকারি পর্যায়ে চেষ্টা চলছে। দেখা যাক কি হয়, আমাদের সেভাবে চলতে হবে। আমাদের নির্দেশনা যেটা দেয়া হচ্ছে ঠিকই দেয়া হচ্ছে।

 

চার জুলাই পাগলাটিলায় ডিউটিতে থাকা একজন জওয়ানের সাথে কথা বলছিলাম

‘আমরা হ্যান্ড মাইকে বাধা দিলাম’

পাগলাটিলায় আপনারা কয়জন ছিলেন?

জওয়ান: হাবিলদার সাহেবসহ মোট ছয়জন।

ইনডিয়ার খাসিয়ারা কখন আসে?

ওরা কখন আসে তার ঠিক নেই। তবে একেকদিন একেক সময় নামে। সেদিনের ঘটনায় ওরা সাড়ে নয়টার দিকে প্রথম নামে।

ওরা সংখ্যায় কতজন ছিল?

দেড়শ বা দুইশ হবে। কিন্তু ওরা তো পাহাড়ে লুকিয়ে থাকে। তাই সঠিক সংখ্যা বলতে পারব না।

বিএসএফ কি বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকেছে?

না। বিএসএফ তাদের বাঙ্কারে ছিল। আমরাও আমাদের বাঙ্কারে ছিলাম।

এমন উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে জওয়ানদের উপস্থিতি বাড়ানো হয় নাই কেন?

৩০০ গজ দূরে দূরে আমাদের বাঙ্কার। এক জায়গায় জওয়ানদের সংখ্যা বাড়ালে অন্য জায়গা ফাঁকা হয়ে যাবে।

পাশের শ্রীপুর ক্যাম্প থেকে আসতে পারত না?

না, আসে নি।

আপনারা কিভাবে তাদের বাধা দিলেন?

আমরা হ্যান্ড মাইকে বাধা দিলাম। হ্যান্ড মাইকে বলেছি, তোমরা (বিএসএফ) তোমাদের লোক নিয়ে চলে যাও। আমরা আমাদের লোকদের নিয়ে যাচ্ছি। এইটা আমরা তাদেরকে বারবার বলেছি।

বিএসএফ কি গুলি করেছে?

প্রথম ফায়ারটা খাসিয়াদের সিভিল গান থেকে এসেছে। এর পরে হই হুল্লোড়ের মধ্যে আরও দুটি ফায়ার হয়েছে। ওই দুটি বিএসএফের না খাসিয়াদের বন্দুকের গুলি, ঠিক বলতে পারব না। কারণ তখন আমরা ফায়ার না করায় গ্রামবাসীরা আমাদের বাঙ্কারে ঢিল ছুঁড়তে থাকে।

 

পরদিন (৫ জুলাই) সীমান্তে দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন জওয়ানের সাথে কথা বলছিলাম

‘এর চেয়ে অপমানের কি হতে পারে!’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই জওয়ান আফসোস করে বলেন, ওরা আমার পঞ্চাশ গজ ভেতরে ঢোকায় নিষেধ সত্ত্বেও সামনে ট্রাক্টর নিয়া চাষাবাদ করে গেল। অথচ হাতিয়ার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি কিন্তু এর কোনও জবাব দিতে পারলাম না। একজন সৈনিকের জন্য এর চেয়ে অপমানের কষ্টের আর কি হতে পারে! আহতদের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে আরেকজন জওয়ান জানালেন, আহতদের মধ্যে ৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২ জনকে জৈন্তাপুর হাসপাতালে বাকি ৩ জনকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের চিকিৎসা খরচ সরকার বহন করেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের এম.পি আহত প্রত্যেককে ২ হাজার টাকা করে মোট দশহাজার টাকা প্রদান করেন।

আহতদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ কেন্দ্রি গ্রামের কায়েস আহমেদের(১৩) অবস্থা খুবই গুরুতর। তার গুলি লেগেছে কোমরে। একবার অপারেশন হয়েছে গুলি বের করা সম্ভব হয় নাই। কায়েসের বাবা কানাই মিয়া সুন্দুর আলী(৩৫) বলেন--সীমান্ত থেকে আমার বাড়ি আধ কিলোমিটার দূরে। আমার জন্ম এখানেই। কোনদিন সমস্যা হয় নি। আমার জমিনে কাজ করতে গিয়েছিল কায়েস। ওরা তাকে গুলি করেছে। আমরা সরকারের কাছে আমাদের জীবনের নিরাপত্তা চাই। জমিনের নিরাপত্তা চাই। আদর্শ গ্রামের আব্দুল মান্নানের (২২) গুলি লেগেছে পায়ে। নিজেদের তিন একর জমি রয়েছে সীমান্তে। জমিতে কাজ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয় সে। মান্নান বলেন, খাসিয়ারা জমি দখল করতে আসলে সবাই মিলে আমরা ধাওয়া করে বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে তাড়িয়ে দেই। আমরা যখন চলে আসছি তখন ওরা পেছন থেকে গুলি করেছে। মান্নানের বাবা নূর ইসলাম বলেন, বিডিআর যদি একটা গুলিও করত তাহলে আমার পোলারা গুলি খাইত না। গতকাল (৫ জুলাই) ওরা আমার জমিতে এসে বীজ ফেলে গেছে। বিডিআর গুলি করে নাই, বাধা দেয় নাই। আমরা যদি ওই জমি চাষাবাদ করতে না পারি বাঁচব কিভাবে?

শ্রীপুর গুচ্ছগ্রামের কামাল হুসেনকে (১৮) খাসিয়ারা ধরে নিয়ে মারধর করে। কামাল হুসেন বলেন--আমরা ফুটবল খেলছিলাম। খাসিয়ারা জমি দখল করতে আসছে শুনে সবাই পাগলা টিলায় যাই। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার এক পর্যায়ে আমাদের ওরা গুলি খাইয়া কিছু দূর এসে পড়ে যায়। ওরে আমি নিয়া আসতে গেলে ওরা আমারে ধরে মারধর করে। আমি অনেক কষ্টে জানে বেঁচে আসছি। কিছুদূর এলে আমিও অজ্ঞান হয়ে পড়ি। পরে সবাই আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।