প্রতিরক্ষানীতি


মুসতাইন জহির || Sunday 31 October 10

একীভূত সীমান্ত বা যৌথ টহলের আত্মঘাতী বন্দোবস্ত

সম্প্রতি ঢাকায় শেষ হওয়া বিডিআর এবং বিএসএফ শীর্ষ সম্মেলনটা রুটিন কর্মসূচি। দুদেশের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে বিবদমান সমস্যা সুরাহার জন্য এধরনের বৈঠক ঢাকা কিম্বা দিল্লিতে দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধানের নেতৃত্বে হয়। সেখানে ইনডিয়ার তরফে কিছু গৎবাঁধা আশ্বাস শুনিয়ে দেয়া হয়। ব্যাস এটুকুই। তারপরও, যথারীতি চলতে থাকে যখনতখন গুলি করে বাংলাদেশের নাগরিক হত্যা, ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন, অনুপ্রবেশ, জায়গা দখল, বাংলাদেশের সীমানায় এসে বাঙ্কার স্থাপন সহ যাবতীয় আগ্রাসী কর্মকাণ্ড। এটা একটা নিরবচ্ছিন্ন এবং ধারাবাহিকভাবে অনুসৃত সামরিক নীতি। বাংলাদেশ সীমান্তকে সংঘাতপূর্ণ অস্থিতিশীল ও অস্ত্রের দাপটে কাবু করে রাখার একটা সহজ পথ অবলম্বন করে আসছিল দীর্ঘদিন ইনডিয়া। এমনকি তারা বাংলাদেশকে কাঁটাতারের খাঁচায় আবদ্ধ করার কাজটিও করেছে। অনেক জায়গায় এরই মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া উঠিয়েছে, বৈদ্যুতিক তারের শক জুড়ে দেওয়া আছে। তবুও বাংলাদেশকে কেঁদেকেটে বলতে হবে, ইনডিয়া মহান প্রতিবেশী-- চিরবন্ধু!

কিন্তু এরই মাঝে, সীমান্তে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের ঘটনাগুলা তথ্যপ্রমাণ সহ মানবাধিকার সংগঠনের দিক থেকে তুলে ধরা হতে থাকে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে এর প্রতিকারের একটা চাপ তৈরি হয়। বিশেষত, মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, পরিসংখ্যান এবং তথ্যসমৃদ্ধ উপাত্ত দিয়ে ইনডিয়ার এই মিথ্যাচার এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাফের জোরাল নজির তুলে ধরতে থাকে নিয়মিত। তখন থেকে ইনডিয়া জোর গলায় বলতে থাকে যে, তারা অপরাধী, অস্ত্রধারী বা চোরাকারবারীদেরকেই গুলি করে। ভাবখানা এমন যেন, এসব তকমা লাগিয়ে দিলেই তাদের হত্যাকাণ্ড জায়েয হয়ে যায়। যেন, কেউ ‘চোরাকারবারী’ হলেই তাদের তৎক্ষণাৎ গুলি করে মেরে ফেলা যায়। যদিও দু একটা ব্যতিক্রম ছাড়া বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বাংলাদেশ ইনডিয়া সীমান্তের সমস্যা চরিত্র ও মাত্রা এমন যে একে ঠিক ‘বিরোধ’ বলা যায় না। এখানে দু পক্ষ পরস্পর একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘাতে লিপ্ত বা পাল্টাপাল্টি সামরিক শক্তি প্রয়োগের উপায় অবলম্বন করে কৌশলগত ভারসাম্যে এগিয়ে থাকবার চেষ্টায় নিয়োজিত না। যা ইনডিয়ার সাথে পাকিস্তান বা চীনের সীমান্ত বিরোধের বেলায় প্রযোজ্য। বাংলাদেশের বেলায় পুরা ব্যাপারটাই একতরফা। এটা একটা আগ্রাসী বড় প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্প্রসারণ নীতির ছায়ায় ছোট একটা রাষ্ট্রকে ঢেকে ফেলার সামরিক পরীক্ষার নমুনা।

এখন স্পষ্ট যে, ইনডিয়া এবার এই নীতির দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছে। এটা একটা গুণগত পরিবর্তনও বটে। কারণ তারা চীনের বিরুদ্ধে আশু সামরিক সংঘাত এবং ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা থেকে সম্ভাব্য যুদ্ধ পর্যন্ত পুরো সমীকরণে বাংলাদেশকে পেছনের উঠান হিশাবে পাওয়ার এবং ব্যবহার করার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনাকে ইনডিয়া সেই সুযোগে মোক্ষম সদব্যবহার করে। পুরো সীমান্ত, কি এক অজানা কারণে, প্রথমে অরক্ষিত, পরে বিএসএফ-র সহায়তায় পাহারার রাখার কথা ঘোষণা করা হয় ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষ থেকে। অন্যদিকে, পুরা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমন্বয়হীন ছুটাছুটি, অস্পষ্টতা, আবেগ ও ক্রোধান্বিত প্রতিক্রিয়ায় পরিণামে চিন্তাহীন এমন বিপদজনক আবহ সৃষ্টি করা হয়, তাতে খুব সহজে প্রতিষ্ঠান আকারে বিডিআরকে দুর্বল এবং অকার্যকর অবস্থায় ঠেলে দেওয়া গেছে। মনোবলহীন, ভীতসন্ত্রস্ত, নিরস্ত্র বিডিআর সীমান্তে অসহায় আনসার বাহিনীর মত দাঁড়িয়ে থেকেছে বহুদিন। ঠিক সেই সময়, তখনকার বিডিআর মহাপরিচালকের অনুমোদনে অঘোষিতভাবে ইনডিয়ার তরফের প্রস্তাবটি মাঠে প্রয়োগ করা শুরু হয়। আমরা পত্রিকায় ছবি দেখি বিএসএফের সাথে পাশাপাশি হাঁটছে বিডিআর। নিস্তেজ, মিয়ম্রাণ, সৈনিকতার সাহস ও আত্মবিশ্বাসহীন একটি বিধ্বস্ত বাহিনী।

এবার সরাসরি সরকারি স্বীকৃতি এবং অনুমোদন নিয়ে তা পুরাদমে চালু হচ্ছে। এখন থেকে এটা বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নীতি এবং কৌশল হিশাবে চালু থাকবে। সরকার পরিস্কার করে না বললেও যে কেউ বুঝবে, এই যৌথ টহল এখন থেকে পরিচালিত হবে বিএসএফ তথা ইনডিয়ার নেতৃত্বে। বালাবাহুল্য তাদের কৌশল এবং প্রয়োজন মাফিক। যৌথ টহলের প্রস্তাব এবং আয়োজন বাংলাদেশের নিরাপত্তা বা প্রয়োজনের তাগিদ থেকে সৃষ্টি হয় নি। হয়েছে ইনডিয়ার প্রয়োজনেই, তাদের স্বার্থেই।

একটি রাষ্ট্র যেখানে শুরু হয়, সেই সীমানা রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সামরিক বিবেচনায় তার প্রতিরক্ষারও সূচনা বিন্দু। সীমানা একইসাথে রাষ্ট্রের বাইরের আর সকলের সাথে শত্রু-মিত্র বিভাজনের নির্ধারক সম্পর্কের উপস্থিতিও। সীমান্ত মানেই তাই একই সাথে তা সার্বভৌম রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ অধিকারের প্রতিষ্ঠিত গণ্ডি। রাষ্ট্রের উপস্থিতি মাত্রই একক অখণ্ড অবিভাজ্য সত্তার উপস্থিতি। এর কোন যৌথতা নাই, যৌথ রাষ্ট্র বা সীমানা বলে কিছু হতে পারে না। তাই তার সুরক্ষা একই সাথে সামরিক। কারণ রাষ্ট্র হল আন্তর্জাতিক আইনে একমাত্র বৈধ সামরিক সত্তা, যুদ্ধ ঘোষণা ও তা পরিচালনার অধিকার প্রাপ্ত (Jus belli)। আর এই স্বীকৃত নীতির মানেই হল, রাষ্ট্র সামগ্রিকভাবে নিরাপত্তা, অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব, মর্যাদা, সদস্যদের জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, যে কোন হামলা বা হুমকি মোকাবেলা করতে শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের এখতিয়ার রাখে। আধুনিক দুনিয়ায় মানুষের আর কোন সাংগঠনিক সত্তারই এই বিশেষত্ব নাই।

বাংলাদেশে আমরা ক্রমাগত দেখতে পাচ্ছি, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক ধারণা এবং আবশ্যক ভিত্তিগুলাকেই দুর্বল ও নাজুক করে দেয়া হচ্ছে। প্রতিনিয়ত যেই বাহিনীর আগ্রাসন, গুলির মুখে নিজ দেশের নাগরিকদের রক্ষা করতে ব্যস্ত বিডিআর, বিএসএফ’র অনুপ্রবেশ ও জবরদখল ঠেকাতে সীমিত সামর্থ্য দিয়ে সাহসের সাথে জানবাজি রেখে লড়তে অভ্যস্ত--তারা হঠাৎ সেই খুনি বাহিনীর পিছুপিছু হাটবে। যারা বন্দুক তাক করে থাকে বাংলাদেশের কৃষক ও সীমান্ত অঞ্চলের নাগরিকদের বেপরোয়া গুলি চালিয়ে হত্যা করছে, তাদের সাথে যৌথ টহলের নামে ওই হত্যা দৃশ্য দেখার নির্মম রসিকতা হজম করা ছাড়া আর কিছু করার নাই বিডিআর’র?

এখানে ইনডিয়া এক ঢিলে কয়েকটা পাখি শিকার করেছে। একে তো একটা খুনি বাহিনীর হাত সাফ করার অপূর্ব মওকা এবং একই সাথে ইনডিয়ান রাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতি আড়াল করার এক চমৎকার কৌশল। অন্যদিকে এই যৌথ টহলের সীমানা বা সীমারেখা কতদূর বিস্তৃত হবে সেটা আগামীতে দেখার পালা। এই যৌথতা এবং যুক্ততা কোথায় গিয়ে ঠেকে সেটা দেখার হয়ত সময় হবে, কিন্তু তখন আর ফিরে আসার মত কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। ফলে, ঘুরে দাঁড়ালে দাঁড়াতে হবে এখনই। একীভূতকরণ প্রকল্পের বিরুদ্ধে, স্বতন্ত্র ও স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তার পুনরুদ্ধারে।