‘গুম’ হয়ে যাওয়ার বিভীষিকা ও বাংলাদেশের বিপদ


বিএনপির নেতা সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলী এখনও ‘গুম’ রয়েছেন। আজ ২৩ এপ্রিল তার জন্য বিএনপির দ্বিতীয় দিনের হরতাল চলছে। যদি ইলিয়াস ছাড়া না পান তাহলে এই হরতাল লাগাতার চালানো হবে বলে বিএনপি ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে আরও অনেকে গুম হয়েছে। তারা সাধারন নাগরিক। মানবাধিকার কর্মীরা এর বিরুদ্ধে দেশে বিদেশে সোচ্চার ছিলেন। এতে ‘গুম’ হয়ে যাবার বিভীষিকা মানুষের মনে ছাপ ফেলেছে। ইলিয়াস আলী একজন গুরুত্বপুর্ণ রাজনৈতিক দলের নেতা। তিনি ‘গুম’ হয়েছেন বলে ‘গুম’ ব্যাপারটি এখন একটি দলীয় রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এই লেখা যখন লিখছি তখন তাঁর নির্বাচনী এলাকা বিশ্বনাথপুরে পুলিশ ও গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষে দুইজন নিহত ও আরও অনেকে আহত হয়েছে বলে সংবাদ পেয়েছি। বাংলাদেশ আবার দ্রুত রাজনৈতিক অস্থিরিতা ও সহিংসতার দিকে এগিয়ে গেল।

মানবাধিকারের দিক থেকে নিখোঁজ হওয়া আর গুম হওয়ার মধ্যে তফাৎ আছে। ইলিয়াস আলীর পরিত্যক্ত গাড়ি বনানীতে পাবার পরপরই অভিযোগ উঠেছিল তিনি নিখোঁজ হন নি, সরকারী গোয়েন্দা সংস্থাই তাঁকে তুলে নিয়ে গিয়েছে। সরকার যথারীতি অস্বীকার করেছে কিম্বা যেভাবে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাতে সরকারে অবগতির মধ্যেই ঘটনাটি ঘটেছে বলে অভিযোগ। শেখ হাসিনা দাবি করেছেন, বিএনপিই তাকে লুকিয়ে রেখেছে। তার এই মন্তব্যে সরকারের সম্পৃক্ততার অভিযোগ আরও গাঢ় হয়েছ মাত্র। ফলে তিনি হারিয়ে যান নি বা নিখোঁজও নন। ‘গুম’ হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনি ‘গুম’ হয়েছেন। এই চুক্তির নাম “গুম হওয়া থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক চুক্তি” (International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearence)। ‘গুম’ মানে এখানে জবরদস্তি কাউকে নিখোঁজ করে ফেলা – ‘এনফোর্সড ডিসএপিয়ারেন্স। এই চুক্তি অনুযায়ী ‘গুম’ হওয়া মানে স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হওয়া নয়, কিম্বা কোন অপরাধী বা অপরাধী চক্র অপহরণ করলে এবং কাউকে খুঁজে না পেলে সেটাও এই কনভেনশান অনুযায়ী ‘গুম’ হবে না। আক্ষরিক অর্থে তাকে ‘গুম’ বলায় অসুবিধা নাই। কিন্তু এই কনভেনশান অনুযায়ী ‘গুম’ বলার সঙ্গে তার পার্থক্য মনে রাখতে হবে। এই আক্ষরিক অর্থে ‘গুম’ হয়ে যাওয়া ‘গুম’ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশানের বিবেচনার মধ্যে পড়বে না।

কনভেনশানের উদ্দেশ্য অনুযায়ী তাকেই ‘গুম বোঝাবে যদি রাষ্ট্রের কোন এজেন্ট, কিম্বা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠি রাষ্ট্রের অনুমতি নিয়ে, সমর্থন পেয়ে বা মৌন সম্মতিতে কাউকে বিনা বিচারে আটক, অপহরণ বা অন্য কোন উপায়ে তার স্বাধীনতা হরণ করে, তারপর সেই ব্যাক্তিকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে তা অস্বীকার করে অথবা সেই ব্যাক্তির কী দশা হোল বা সে কোথায় আছে তা লুকায় আর এইভাবে তাকে আইনের সুরক্ষার বাইরে স্থাপন করে। এই সংজ্ঞার সার কথা ‘আইনের সুরক্ষার বাইরে কাউকে স্থাপন’ করার বিরোধিতার মধ্যে। এটাও লক্ষ্য করবার বিষয় যে রাষ্ট্র বা সরকারকে এই ক্ষেত্রে সরাসরি কোন নির্দেশ দিতে হবে এমন কোন কথা নাই। রাষ্ট্রের মৌন সম্মতিই (acquisance) যথেষ্ট।

এছাড়া এই কনভেনশানের আরও অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। তার মধ্যে ১(২) অনুচ্ছেদ স্পষ্ট বলছে, এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কোন অজুহাত চলবে না। বলা যাবে না যে ‘গুম’ ঘটছে বিশেষ কোন পরিস্থিতির জন্য। যেমন, যুদ্ধ, যুদ্ধের হুমকি, আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা অথবা অন্য যে কোন ধরনের জরুরী অবস্থা। কোন প্রকার বিশেষ অবস্থা ‘গুম’ করার পক্ষে সাফাই গাইবার জন্য অজুহাত হিশাবে গৃহীত হবে না।

এরপরে অনুচ্ছেদ পাঁচে রয়েছে যে যদি ‘গুম’ হওয়া বেড়ে যায়, কিম্বা ‘গুম’ করে ফেলা রাষ্ট্রের নিয়মিত চর্চা হয়ে ওঠে তাহলে আন্তর্জাতিক আইনে যেভাবে ব্যখ্যা করা আছে সেই ব্যাখ্যা অনুযায়ী তা ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিশাবে গণ্য হবে। ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ আন্তর্জাতিক আইনে অতিশয় নিন্দিত ও ক্ষমার আযোগ্য একটি অপরাধ। এর জন্য যে পরিণতি ঘটবার বা শাস্তি হবার কথা সেই শাস্তি থেকে নিস্তার পাবার সুযোগ নাই।


মানুষকে ‘গুম’ করে ফেলার অপরাধ মানবাধিকারের চরম লংঘন। এই অপরাধের বিরুদ্ধে বিএনপির ডাকা হরতালের ইতিবাচক দিক হচ্ছে মানবাধিকার রক্ষার লড়াই জাতীয় রাজনীতির বিষয়ে পরিণত হবার সম্ভাবনা এই প্রথম বাংলাদেশে তৈরী হয়েছে। সেই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেবার শক্তি ও যোগ্যতা অর্জন করাই এখনকার কাজ। ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি এবং তা রক্ষা করবার কর্তব্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি। এই স্বীকৃতি ও রক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ব্যাক্তি নাগরিক হয়ে ওঠে। এই ভিত্তির ওপর বাংলাদেশ নতুন ভাবে গঠন করবার লড়াই হচ্ছে বাংলাদেশের এখনকার লড়াই। বি এন পি এটা বুঝে করছে ভাববার কোনই কারন নাই। বিএনপির গণবিরোধী ও গণতন্ত্র বিরোধী চরিত্র তখনি ধরা পড়ে যখন এর আগে অন্যান্য নাগরিকদের ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার সময় বিএনপি কোন কর্মসূচি দেয় না, কিন্তু নিজের দলের নেতার ‘গুম’ হওয়ায় হরতাল দিতে বাধ্য হয়। মানবাধিকার বিএনপির হাতেও ভূলুন্ঠিত হয়েছে বারবার। আইনবহির্ভূতভাবে মানুষ হত্যার ক্ষেত্রেও বিএনপির অনুশোচনা নাই, বরং র্যা ব গঠন করেছে বলে গর্ব আছে। কিন্তু যারা এই অজুহাতে এখন হরতালের বিরোধিতা করছে, তারা আসলে বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট শক্তি ও রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখবার জন্যই হরতালের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক দুর্ভোগের কথা বলে ন্যায়সঙ্গত রাজনৈতিক প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ দমন ও গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করবার পক্ষে আইনশৃংখলা বাহিনীর জন্য মতাদর্শিক বয়ান ও যুক্তি তৈরী করে যাচ্ছে তারা।

 


প্রথম আলোর একটি উপসম্পাদকীয়তে মিজানুর রহমান খান লিখেছেন যে “আইন ও সালিশ কেন্দ্র’ (আসক) এবং ‘অধিকার’ আমাদের দুটি শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন। তারা গুমের বিষয়ে কাজ করছে। কিন্তু আন্তরিকতা সত্ত্বেও তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো একটি গুমকেও ‘প্রমাণিত ঘটনা’ হিসেবে দাবি করতে পারেনি। তারা সবকিছু করে শেষে বলে ‘সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ’ পাওয়া গেছে। ‘প্রমাণ পাওয়া গেছে’—তারা এটুকুও বলতে পারে না” (দেখুন, “ইলিয়াসের “গুমের” বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে”, ২২ এপ্রিল ২০১২)।

এই মন্তব্য একজন মানবাধিকার কর্মী হিশাবে আমার কাছে বিপজ্জনক মনে হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ‘আনুষ্ঠানিক ভাবে’ একটি গুমকেও “প্রমাণিত ঘটনা” ঘটনা হিশাবে দাবি করতে পারে নি বলার অর্থ কি? তার মানে বাংলাদেশে কোন গুমের ঘটনা ঘটে নি? মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিচার বিভাগ নয়, “আনুষ্ঠানিক” ভাবে প্রমান করবার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। গুমের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের “সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ’ প্রমান করাই মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দায়িত্ব। সেই অভিযোগ সত্য কিনা এবং এর জন্য রাষ্ট্রের কোন্‌ বিভাগ বা কোন্‌ কর্তৃপক্ষ দায়ী সেটা তদন্ত করবার দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের, বিচার করবার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। সর্বোপরি ‘গুম’ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশান আত্মস্থ করে আইন প্রণয়ন করবার দায়িত্ব জাতীয় সংসদের। আর যদি তারা ব্যর্থ হয় তাহলে আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে তার দায় সকলের। বাংলাদেশের বিচার বিভাগকেও সেই দায় নিতে হবে। তখন এই “সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ” আন্তর্জাতিক নজরদারি ও বিচারে অধীন হতে পারে। গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশানে আমরা দেখেছি রাষ্ট্রের মৌনতা রাষ্ট্রকে দায় থেকে খালাস করে না।

“আইন ও সালিশ কেন্দ্র” তাঁদের কথা বলবেন। মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর উপদেষ্টা হিশাবে বলে রাখা দরকার আমরা ২০০৯ সালে দুই জন, ২০১০ সালে ১৮ জন, এবং ২০১১ সালে ৩০ জন ব্যাক্তি গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘গুম’ হবার কথা বলেছি। এই বছর ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৯ জন ব্যক্তি ‘গুম’ হয়েছেন। তার মানে প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের কোন না কোন এজেন্ট এই গুম হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।

অনেকে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ‘গুম’ হবার সংখ্যার হিশাবে মেলে না বলে বিভ্রান্ত হন। সেই দিক থেকে অধিকারের সংখ্যা কম হবার কারন হচ্ছে, কেউ নিখোঁজ হলেই তাকে ‘গুম’ বলে সংজ্ঞায়িত করা ভুল। এটা বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক। এটা সংখ্যা দিয়ে সরকার বা রাষ্ট্রকে বিব্রত বা বিপদে ফেলবার ব্যাপার নয়, এটা সংজ্ঞার মামলা। রাষ্ট্র এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের চোখে অপরাধী সাব্যস্ত হয় এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে “মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ” উঠতে পারে।

এই বিপদের কথা মনে রেখেই ‘অধিকার’ দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ যেন গুম হয়ে যাওয়া সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক ঘোষণা অনুমোদন দেয় তার জন্য প্রচার চালিয়ে আসছে। এই প্রচারের গুরুত্ব অপরিসীম। সেই দিকে নজর দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনার পর সেটা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

আজ দৈনিক সমকালে দেখছি কেবল দশ শর্ত মানলেই ইলিয়াস ‘মুক্তি’ পেতে পারেন। এই শর্তগুলো দেওয়া হয়েছে একই সঙ্গে ইলিয়াস ও বিএনপিকে। এর মধ্যে পাঁচটি শর্ত মানতে কিছুটা সম্মত হলেও বাকি শর্তগুলো কঠিন হওয়ায় বিএনপির হাই কমান্ড মানতে রাজি না। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, মুক্তি পাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলন করে নিজ থেকে স্বেচ্ছায় আত্মগোপনে ছিলেন ইলিয়াসকে এই কথা বলতে হবে। বলতে হবে, বিদায়ী রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এপিএসের ঘটনায় তার ড্রাইভারের প্ররোচনা ছিল। তিনি রাজনীতি করবেন না এমন প্রতিশ্রুতিও দিতে হবে। এইসব। (দেখুন, “১০ শর্ত মানলে মুক্তি ইলিয়াস আলোর” (দৈনিক সমকাল, ২৩ এপ্রিল ২০১২)।

দৈনিক সমকালের এই খবর সঠিক নাকি প্রপাগাণ্ডা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। এই খবরের মূল সুর দুইটা। এক. ইলিয়াস ‘গুম’ হয়ে সরকারের কাছেই আছেন। দুই. বিএনপি এটা জানে এবং তাকে মুক্ত করবার জন্য ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাদের দেনদরবার চলছে। সমকালের এই প্রতিবেদন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এর ওপর ভিত্তি করে কোন মন্তব্য এখন অনুচিত। তবে এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের জটিল রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে। এই ধরনের খবরের বিপজ্জনক দিক হচ্ছে ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরোধ হিশাবে হাজির করা। তার সমাধানও যেন দুই পক্ষের দেনদরবারের মধ্যেই নিহিত। ফলে ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার ঘটনার মধ্যে মানবাধিকার লংঘনের বিভীষিকা ও তার তাৎপর্য এবং বাংলাদেশের জনগণের মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রামের সম্পর্ক অস্পষ্ট ও অপরিচ্ছন্ন হয়ে যাবার আশংকা ঘটে। ইলিয়াস যেন জীবিত ফিরে আসেন, এটাই এখনকার প্রধান প্রত্যাশা হওয়া উচিত। পরিস্থিতি এখন যা দাঁড়িয়েছে তাতে তিনি ফিরে এলে বা না এলে উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ‘গুম’ হওয়ার শিকার বলেই গণ্য হবেন। দ্বীতিয় ক্ষেত্রে তিনি ‘গুম’ হওয়ার পরেও বেঁচে ফরে এসেছেন বলে বিবেচনা করা হবে। রাষ্ট্র এই ক্ষেয়ত্রে ‘গুম’ করেছে এই অপরাধ থেক নিষ্কৃত পাবে না। একই সঙ্গে সরকারী গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃংখলা বাহিনীও তাদের দায় দায়িত্ব এড়াতে পারবে না। ক্ষমতাসীন্দের জন্য ইল্যাস আলী এখন শাঁখের করাত হয়ে গিয়েছেন।

যদি সমকালের খবর সত্য হয় তাহলে এটা বোঝা যাচ্ছে যে ক্ষমতাসীনরা চাইছে তিনি স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হয়েছেন এই কথা স্বীকার করিয়ে নিয়ে আন্তর্জাতিক নিন্দা ও চাপের হাত থেকে আপাতত রেহাই পাওয়া। পরিস্থিতি যেখানে গিয়েছে তাতে এই দায় থেকে সরকারের নিষ্কৃতি পাওয়া কঠিন হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন-শৃংখলা বাহিনীর কর্মকাণ্ডের দায়দায়িত্ব আসলে কাদের? কাদের কাছে তারা তাদের কাজের জবাবদিহি করে বা করতে বাধ্য। যদি ক্ষমতাসীনদের নির্দেশেই ‘গুম’ হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে বাংলাদেশে জবাবদিহিতার সুযোগ নাই বললেই চলে। বিচার বিভাগের ভূমিকা থাকার সুযোগ ছিল। কিন্তু বিচার বিভাগও ক্ষমতাসীনদের অধীনস্থ হয়ে পড়েছে। এখন আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট ’গুম’ করছে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এলে একই ধরনের ঘটনা ঘটবে না তার নিশ্চয়তা নাই। তার মানে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের গোড়ার প্রশ্ন উহ্য রেখে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের বুঝতে হবে সাধারন ভাবে মানবাধিকারের লংঘনের সঙ্গে রাষ্ট্র ও রাজনীতির সম্পর্ক কোথায়। রাষ্ট্র যদি ব্যাক্তির মানবিক ও নাগরিক অধিকারকে নিজের গাঠনিক ভিত্তি হিশাবে স্থাপন না করে, যদি ব্যাক্তির মর্যাদা রক্ষার কর্তব্য তার অন্তর্নিহিত চরিত্র বানিয়ে গড়ে না ওঠে তাহলে এই রাষ্ট্র ভেঙ্গে নতুন করে বাংলাদেশ গড়া ছাড়া জনগনের সামনে আর কোন পথই খোলা নাই। এই ক্ষেত্রে মানবাধিকার বিরোধী একটি ফ্যাসিস্ট দলের বিপরীতে মানবাধিকার বিরোধী আরেকটি একনায়কতান্ত্রিক ও গণবিরোধী দলের পক্ষে দাঁড়াবার কোনই যুক্তি নাই। যে রাজনৈতিক দলগুলো মানবিক ও নাগরিক অধিকারে বিশ্বাস করে না, যারা জাতীয় সংসদে গিয়ে ১৪২ অনুচ্ছেদের শক্তি ব্যবহার করে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরন করে, সেই দলগুলোর কাছ থেকে আমরা কী আশা করতে পারি? দেশেবিদেশে খুনি বাহিনী হিশাবে খ্যাত র্যা ব গঠন করেছে বিএনপি। শুধু তাই নয়, নির্বাচনী বক্তৃতায় র্যাহবের কর্মকাণ্ডের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ সেই র্যা বকেই ব্যবহার করেছে। আজ অনেকে র্যাপব ভেঙ্গে দেবার কথা বলছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যখন ভেঙ্গে দেওয়ার কথা বলেছিল, তখন অবশ্য অনেককেই দোনামোনা করতে দেখেছে। কথা হচ্ছে শুধু র্যা ব ভেঙ্গে দিলে হবে না, আরো বহু গোড়ার জিনিস ভেঙ্গে নতুন ভাবে বাংলাদেশ গড়তে হবে। গড়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নাই।

অনেকে ইলিয়াস আলীর ‘গুম’ হয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে হরতালে আপত্তি জানাচ্ছেন। তাঁদের যুক্তি, এতে মানুষের অসুবিধা হয়, ব্যবসাবাণিজ্যে বাধা তৈরী হয়, দেশের অর্থনীতি বিপদে পড়ে, হরতালের সময় গাড়ী ভাংচুর হয়, নাগরিকদের সম্পদের ক্ষতি হয়, ইত্যাদি। হরতাল সফল করবার জন্য হরতালের আগের দিন ভয়ভীতি সঞ্চারের কর্মসূচি নেওয়া হয়। এতে জ্বালাও-পোড়াও করতে গিয়ে নিরীহ নাগরিকদের পুড়িয়ে মারার ঘটনাও ঘটেছে। এবারও গাড়িতে ঘুমিয়ে থাকা গাড়ীর চালক বদর আলী বেগ পুড়ে মরেছেন, তাঁর সহকারী মোতালেব অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছেন। গ্রামে বদর আলীর গরিব স্ত্রী, পরিবার পরিজন ও আত্মীয়স্বজনদের আহাজারি দেখেছি। কিছুদিন পর এদের নাম কারো মনে থাকে না। এরা হারিয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে হত্যার চিহ্নগুলো বড় সহজেই মুছে যায়।এই সকল কারনে হরতালের বিরুদ্ধে নাগরিকদের ক্ষুব্ধ হবার বিস্তর কারন আছে। সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসুবিধা ছাড়াও মানবিক সংবেদনাও এখানে কাজ করে, যে-সংবেদনা ছাড়া সমাজ টিকে থাকতে পারে না। এই সকল যুক্তি অস্বীকার করবার কোন কারন নাই। এমনকি এমন একটি ‘গুম’ ঘটে যাবার পরেও মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারমেনও হরতালে আপত্তি জানিয়েছে। বিশেষত, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে। তাদের কথা ভেবে তিনি হরতাল না করবার মিনতি জানিয়েছেন। যদিও মানবাধিকারের দিক থেকে একজন নাগরিকের ‘গুম’ হয়ে যাওয়া ভয়ানক দুঃসংবাদ। রাষ্ট্রের জন্য এটা খুবই বড় ধরনের সংকট।

প্রহসন হোল হরতালের বিপক্ষে একই যুক্তি ক্ষমতাসীনরাও দিয়ে থাকে। গাড়িতে ঘুমিয়ে থাকা একজন নিরীহ ড্রাইভার পুড়ে মরার পরপরই আওয়ামী লীগের নেতারা যেভাবে প্রতিপক্ষকে দায়ী করলেন তাতে বোঝা মুশকিল আসলে এই হত্যার জন্য কোন পক্ষ দায়ী। টেলিভিশনে বদর আলীর একজন আত্মীয়াকে কাঁদতে কাঁদতে বলতে শুনেছি দুই দলই এর জন্য দায়ী। তাদের রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হচ্ছে নিরীহ মানুষ। গণবিরোধী এই দুই পক্ষের বিরুদ্ধে গ্রামের একজন সাধারন মহিলার সচেতনতা অর্থপূর্ণ মনে হোল। যতো বেশী জনগণ আগণতান্ত্রিক, গণবিরোধী ও মানবিক অধিকার বিরোধী শক্তি ও শ্রেণীর বিরুদ্ধে সচেতন হয়ে উঠবে ততোই বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ ও পদ্ধতি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

হরতালের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মুখে যে-যুক্তি আমরা শুনি সেটা এর আগে বিএনপি ও চারদলীয় জোটের কাছেও আমরা শুনেছি। সেই গীত এখন শুনছি আওয়ামী লীগ ও তাদের মহাজোটের মহান সব সদস্যের মুখেও। ফলে নাগরিকদের ন্যায্য ক্ষোভ প্রকারান্তরে ক্ষমতাসীনদের পক্ষেই কাজ করে। এটাই প্রহসন। বিএনপি অফিস বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র্যাহব যেভাবে ঘিরে রাখে এবং বিরোধী দলের মিছিলে ও সভায় যেভাবে আইনশৃংখলা বাহিনী হামলা করে তা অবিশ্বাস্য, কিন্তু এই কাজ বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়েও হয়েছে। তার মানে আইন-শৃংখলা বাহিনী দলীয় স্বার্থেই ব্যবহৃত হয়। তাদের ব্যবহার করা যায়। যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দল তাদের ব্যবহার করে নির্দয় ভাবে বিরোধী প্রতিপক্ষকে দমন করবার জন্য । যে দল ক্ষমতায় যায় সেই দলের সন্ত্রাসী বাহিনী হিশাবে পুলিশ, র্যা ব, গোয়েন্দা সংস্থা ব্যবহৃত হয়। নাগরিকদের সাংবিধানিক বা আইনী অধিকারের কোন তোয়াক্কা তারা করে না। কারন ক্ষমতাসীনরা তাদের দায়মুক্তির দায় নিজেরাই তাদের কাঁধে নিয়ে নেয়, নিজেরাই বহন করে।

বাংলাদেশের সামগ্রিক যে পরিস্থিতি তাতে নাগরিকদের লাগাতার আন্দোলন সংগ্রামে নেমে পড়বার কথা। এই দুঃসহ পরিস্থিতির অবসান চায় সকলেই, কিন্তু সেটা হচ্ছে না। এর কারন হচ্ছে বিএনপি ও তার অধীনস্থ জোটের সদস্যদের দলীয় সমর্থকরা ছাড়া বাংলাদেশের সাধারন মানুষ এই সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছে না। অন্তত যেভাবে নামা উচিত সেভাবে নামছে না। এর কারন বিএনপি জনগণকে কোন রাজনীতি দিতে পারছে না। আদৌ পারবে কিনা সন্দেহ। স্রেফ আওয়ামী বিরোধিতা ও নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি কোন রাজনীতি হতে পারে না। এই রাষ্ট্র যেমন আছে তেমনি রেখে বিএনপি ক্ষমতা চায়। ক্ষমতার হাত বদল চায়, কিন্তু রাষ্ট্রের কোন রূপান্তর চায় না। যে কারনে রাষ্ট্র ও রাজনীতির সংকটের চেয়েও সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্ন মানুষের কাছে বারবার বেশী গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে। হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও মানুষ তার বিরোধিতা করে। জানে এর ফলে তাকে যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতির স্বীকার হতে হবে তার পরিবর্তে রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিবাচক কোন রূপান্তর ঘটবে না। কারন সেটা ঘটাবার কোন দৃশ্যমান রাজনৈতিক কর্মসূচী মানুষের সামনে হাজির নাই। গুম ভীতিকর অবশ্যই। শুধু গুম নয়, ভবিষ্যৎ কর্মসূচির অনুপস্থিতিই বরং সবচেয়ে বেশী ভীতিকর। মানবিক অধিকার নিশ্চিত করবার জন্য রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা এবং তার পক্ষে রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশগ্রহণের বিপরীতে মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক স্বার্থ মুখ্য হয়ে যাবার এই প্রবণতাই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক। (চলবে...)

২৩ এপ্রিল ২০১২। ১অ বৈশাখ ১৪১৯। শ্যামলী।


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।