সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরহাদ মজহার


Friday 04 May 12

print

হিলারি ক্লিনটন শুধু বাংলাদেশে আসছেন না। প্রথমত তিনি আসছেন চিন থেকে। তারপর তিনি আসবেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশ থেকে যাবেন ভারতে। কলকাতায় মমতা ব্যানার্জির সঙ্গেও দেখা করবেন। তাঁর বাংলাদেশ সফরকে দিল্লী-ঢাকা-ওয়াশিংটন মিলে চিনের বিরুদ্ধে একটা প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তোলার সফর হিশাবে দেখতে চাইছেন অনেকে। এটা খুবই সরল ভাবে দেখা। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা এবং ভাঙন বেসামাল হয়ে পড়ছে প্রায়ই। এর কারনে শক্তিশালী দেশগুলোর সামরিক ও নিরাপত্তা ভাবনা নতুন বাস্তবতায় বদলাচ্ছে। এর রূপ ঠিক কী দাঁড়াবে সেটা এখনও স্পষ্ট হয়ে ওঠে নি। চিনের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈরিতাও আগের মতো তীব্র নয়, এবং এই বৈরিতা চিরস্থায়ী হবে সেটাও আগাম অনুমান করে রাখা অবাস্তব। এটা ঠিক যে নিজ নিজ দেশের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ টিকিয়ে রাখবার জন্য শক্তিশালী দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবসময়ই ছিল, আছে এবং থাকবে। সন্দেহ নাই, সেই ক্ষেত্রে চিনকে সামাল দেওয়ার একটা চিন্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ভারতের আছে। শুধু এই দিকে নজর নিবদ্ধ রাখলে মার্কিন পররাষ্ট্র সম্পর্কের নীতিগত ও কৌশলগত কোন পরিবর্তন ঘটছে কিনা সেটা আমরা ধরতে পারব না। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিন একতরফা ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য ছেড়ে দেবে, এটা ভাবাও ঠিক নয়। ফলে এই তিনটি দেশের স্বার্থের ঐক্য এবং বিরোধ দুটো দিকই নজরে রাখা দরকার।


শেখ হাসিনার নিজের দল ও তার  নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক ও সুশীল সমাজ  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাস বিরোধী অনন্ত যুদ্ধের সৈনিক। নতুন করে শেখ হাসিনাকে সন্ত্রাসবিরোধী সৈনিক বানানোর দরকার নাই। হিলারি ক্লিনটনের সফরের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন কোন কৌশলগত চুক্তি হোল কি হোল না সেই প্রশ্ন এই কারনে গৌণ। চিনের বিরুদ্ধে দিল্লির নেতৃত্বে প্রতিরোধের বলয় গড়ে তোলার চেয়েও এই যুদ্ধ অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি চিনের কাছেও। হিলারি বাংলাদেশের সঙ্গে চারটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। গুরুত্ব অনুযায়ী তাদের ক্রম হচ্ছেঃ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, নিরাপত্তা, তেল-গ্যাস-কয়লা বা জ্বালানি প্রসঙ্গ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর।


যারা বলছেন এই সময়ে হিলারি ক্লিনটনের বাংলাদেশে আসা শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন দেবারই নামান্তর, তারা খুব ভুল বলছেন না। বিশেষত এর আগে না আসবার কথা বলে এবং এই বিশেষ অস্থির রাজনৈতিক সময়টা বাংলাদেশে আসার জন্য বেছে নিয়ে হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারকে বিদ্যমান রাজনৈতিক বিবাদে সমর্থনই জোগালেন। অথচ বিএনপি ও বিনপির নেতৃত্বাধীন জোটের নেতৃস্থানীয় প্রায় সকলের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। এই দুর্দশার পরেও বেগম খালেদা জিয়া বিদেশি মেহমানদের সম্মানে কোন কঠোর কর্মসূচি দিলেন না। তার সঙ্গেও হিলারি ক্লিনটন সাক্ষাৎ করবেন।বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাত যেন বেসামাল না হয় সেই ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন, অবশ্যই। পরিস্থিত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এর ফলে রাজনৈতিক উত্থানপতনের ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়। বিদেশি শক্তিগুলো এই কারনেই রাজনৈতিক সংঘাত সীমা ছাড়িয়ে গেলে বিচলিত হয়। অন্যদিকে দুই পক্ষের এই সংঘাতের সুযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক একটা গুণগত স্তরে উন্নীত করবার চেষ্টাও করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। হিলারি হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতির দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে একটা মধ্যস্থতার চেষ্টা করবেন। সেটা সরবে করতে হবে না। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার দেখা করার মানে এই রকমই দাঁড়ায়। দেখা যাক কী দাঁড়ায়।

চীনের বিরুদ্ধে দিল্লীর নেতৃত্বে এই অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। পারমাণবিক শক্তি ও অস্ত্রের ক্ষমতা সম্পন্ন ভারত, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক ও নিরাপত্তা চুক্তি ও সম্পর্ক পুরামাত্রায় বহাল আছে। এগুলো জানা জিনিস। কিন্তু সামরিক শক্তির অবস্থা ও ভারসাম্যের ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটছে। পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে এইসব পরিবর্তনও নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। যেমন, নৌ বাহিনীর শক্তি বা সমুদ্রের ওপর দখলদারি ও সামরিক আধিপত্য বজায় রাখবার শক্তি। সামরিক শক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যান্য দিকও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। হিলারি ক্লিনটনের এই সফরের মাত্র কিছুদিন আগে ভারত দূর পাল্লার পারমাণবিক ক্ষমতা সম্পন্ন বালিস্টিক মিসাইল অগ্নি-৫ সফল ভাবে পরীক্ষা করেছে। নিজের সামরিক ক্ষমতার উত্তরোত্তর বিকাশ ঘটাতে সক্ষম সেটা দিল্লি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিন উভয়কেই জানান দিল। সুস্পষ্ট ভাবেই সেটা প্রদর্শন করা হোল। এটা হোল হিলারি সফরে আসার আগে একধরনের সরব ঘোষণার মতো। এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভারত বেইজিং ও সাংহাইয়ে পারমাণবিক আক্রমণ চালাতে সক্ষম। যে অল্প কয়েকটি দেশ দূর পাল্লার পারমাণবিক হামলা চালাতে সক্ষম ভারত এখন তাদের ক্লাবে যোগ দিল। দেশগুলো হচ্ছে চিন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিবারের সদস্য হোল এখন ভারত। ফলে সামরিক ও নিরাপত্তার প্রশ্নও সরল ভাবে আলোচনার বিষয় নয়। ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের সম্পর্কের জটিলতাকে বিভিন্ন দিক থেকে বিচার করাই সুবুদ্ধির লক্ষণ।


সুশীল সমাজের ভাষায় শেখ হাসিনা “সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের পরীক্ষিত মিত্র”। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতোই মানবাধিকার লংঘনে শেখ হাসিনার বাধা নাই। এমনকি মানুষকে গুম করে ফেলার সংখ্যা যদি “মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ” ঘটবার মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তাতেও আপত্তি উঠবে না। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির শ্রমিক নেতা আমিনুল গুম হবার পর তার ক্ষতবিক্ষত  লাশ রাস্তায় পড়ে থাকায় আন্তর্জাতিক ভাবে প্রচার ও প্রতিবাদ চলছে। মৃদু তিরস্কার ছাড়া সেটাও মিত্রের বড় কোন অপরাধ বলে গণ্য হবে না।


চিনে মার্কন রাষ্ট্রবিষয়ক সেক্রেটারির সঙ্গে থাকবেন তাদের ট্রেজারি সেক্রেটারি টিমথি গ্রেইথনার। চার এপ্রিলে (২০১২) এই লেখা যখন লিখছি তখ তাদের সভা চলছে উপ-প্রধানমন্ত্রী ওয়াং কিশান এবং রাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা দাই বিনগগু-ওর সঙ্গে। এটা চিন-মার্কিন চতুর্থ সামরিক কৌশল ও অর্থনৈতিক বিষয়ে চতুর্থ দফা পরামর্শ সভা (US-China Strategic and Economic Dialogue (S &ED)। এই সভা দুই দেশের জন্য যোগাযোগ বাড়ানো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে। মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের মুখপাত্ররা জানিয়েছেন এবারের সভার গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে দুই দেশের ‘পুরা সরকার’ (whole of government) এই সভায় অংশগ্রহন করবে। মন্ত্রী ও সরকারের বিভিন্ন এজেন্সির প্রতিনিধিরা এখানে থাকবেন। হিলারি আরেকটি খুব উঁচু পর্যায়ের গুরুত্বপুর্ণ সভায় যোগ দেবেন চিনাদের সঙ্গে। সেটা হচ্ছে ‘জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ’ বাড়াবার পরামর্শ সভা। মার্কিন আর চিনা নাগরিকদের মধ্যে সংস্কৃতি, শিক্ষা, খেলাধূলা, বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল এবং নারী প্রসঙ্গ নিয়ে আরো বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ বাড়াবার পরামর্শ ও পরিকল্পনার জন্য এই সভা। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র ভিক্টোরিয়া নুলান্ড এটাও জানিয়েছেন যে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এক “জবরদস্ত’ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা চুক্তিও হিলারি ঢাকায় পর্যালোচনা করবেন। তবে সেটা চূড়ান্ত কোন চুক্তিতে পৌঁছাবে কিনা তা জানান নি।

পশ্চিম বাংলার কলকাতায় মমতা ব্যানার্জির সঙ্গেও দেখা করবেন হিলারি। মমতা ক্ষমতার আসার পর কী উন্নতি ঘটল তার খোঁজখবর নেবেন বলে প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া ওবামা প্রশাসনের সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে খবর দিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের যে উন্নতি হয়েছে তাতে বাণিজ্যের সম্প্রপ্রসারণ ছাড়া আরো অনেক সুবিধা তৈরী হয়েছে। মমতা কিভাবে সেইসব কাজে লাগাবেন সেটা সম্ভবত শুনতে চাইবেন হিলারি। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বরাত দিয়ে যেসব খবরাখবর শোনা যাচ্ছে তাতে এই ধরনের অস্পষ্ট আওয়াজ ছাড়া বিশেষ কিছু এখনো জানা যায় নি। মমতা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার কী সুযোগ নিতে চান বা চাইবেন সেটা হিলারি ক্লিনটন জানতে চাইতেই পারেন এবং সেখানে বাংলাদেশ, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোন সাধারণ স্বার্থ নিহিত আছে কিনা সেটা জানা এবং মমতা ব্যানার্জিকে বোঝা তার কাজ।। সেই সূত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে রাজ্য হিশাবে পশ্চিম বাংলার সম্পর্ক এবং সে গতিকে আঞ্চলিক সম্পর্ক নিয়েও মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে কথা বলবেন হিলারি, এটা স্বাভাবিক। তবু বলা যায়, বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার সম্পর্ক নিয়ে হিলারি-মমতা কথা বলবেন একে অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়ার দরকার নাই। এই রটনা মনে হয় গৌণ। মমতা ভারতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি। আগামি দিনে ভারতের প্রধানমন্ত্রিও হয়ে যেতে পারেন তিনি। ফলে তার সম্পর্কে এখন থেকেই মার্কিনীদের সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরী একটা কাজ। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের প্রধান প্রতিনিধির এটাই আসল কাজ।


সুশীল সমাজের আবদার হচ্ছে হিলারি ক্লিনটন তার বাংলাদেশ সফরে এই পরিক্ষিত মিত্রের উপযুক্ত মূল্যায়ন করবেন। মহাজোটের দুঃশাসন, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার পরও তাকে পুরস্কৃত করা উচিত। এর আগে না এসে এবং আসবার নানান শর্ত দেবার পরেও হিলারি ক্লিনটনে্র  বাংলাদেশ সফর আসছেন আজ। আসলে এটাই শেখ হাসিনার জন্য পুরস্কার। তার আসাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের ক্ষেত্র থেকে বিএনপির (সাময়িক?) পশ্চাদপসরণও এই পুরস্কারের অংশ। “সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধের পরীক্ষিত মিত্র” শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিভা ওখানে যে এই মৈত্রীকে তিনি এক এগারোর বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে জিতে আসবার জন্য সফলতার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন। শুধু তাই নয় তাকে ছাড়া এই অঞ্চলে ওয়াশিংটন ও দিল্লীর পক্ষে ১৫ কোটি জনসংখ্যার দেশকে সন্ত্রাসের হাত থেকে সামাল দেওয়া কঠিন এই ধারণাও তিনি কমবেশী প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। নিজের সজ্ঞান অবস্থানের এই শক্তি সম্পর্কে তিনি অবহিত এবং এই শক্তি শেখ হাসিনা বিএনপিকে চুরমার ও পঙ্গু করে দেবার জন্য ব্যবহার করবেন, এটাই স্বাভাবিক। এতে সুশীল সমাজের সুশীল  নীতিনৈতিকতায় বাধে বলে তারা মসৃণ ভাষায় শেখ হাসিনার নিন্দাও করে থাকেন। কিন্তু সার কথা হোল এটাই রাজনীতি। বিএনপি তাদের দুর্দশা নিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে দরবার করছে। এতে বিএনপী ও আঠারো দলীয় জোট আরো জনসমর্থন হারাবে। পরাশক্তির সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মিত্র শুধু শেখ হাসিনা নন, গোটা সুশীল সমাজ। বাংলাদেশ  আসলে বিভক্ত।


চিনের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নয়ন ও বিকাশের লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের সভা করে এসে বাংলাদেশে হিলারি ক্লিনটন চিনের বিরুদ্ধে ভারত ও বাংলাদেশ নিয়ে নতুন এক প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তুলতে আসবেন এটা চিন্তা করতে অনেক বেশি কল্পনা শক্তির দরকার হয়। বিপজ্জনক হোল নতুন করে বাংলাদেশকে ভারতের সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীন আনবার প্রয়োজনীয়তা যে নাই এই দিকটাই আমরা ভুলে যাচ্ছি। ভুলছি কারন শেখ হাসিনা ও মনমোহনের দিল্লি ঘোষণা এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ভারতকে করিডোর দেবার চুক্তির মর্ম বুঝবার অক্ষমতার কারনে। ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেইমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট মূলত একটি সামরিক ও নিরাপত্তামূলক চুক্তি। এই চুক্তি এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবার পর শেখ হাসিনার সরকারকে নতুন করে মার্কিন-ভারত ও ইসরাইলের সামরিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের পাহারাদার প্রমাণ করা অপ্রয়োজনীয়। এই বিষয়ে আমি এর আগে লিখেছি। (যেমন “ভারতের নিরাপত্তা বন্দোবস্ত ও হাসিনা-মনমোহন চুক্তির সামরিক লক্ষ্য” (নয়াদিগন্ত ৯/১০/২০১০); “দিল্লীর সামরিক ও নিরাপত্তা স্বার্থের গোলামি বাংলাদেশের ‘নিয়তি’ হত পারে না’ (নয়াদিগন্ত (১৭/৯/২০১১)-- ইত্যাদি)। এখানে সেইসব কথার পুনরাবৃত্তি করব না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের ঠিক কি চুক্তি হয় তা দেখার জন্য আমরা বরং অপেক্ষা করব। তখন নতুন কি যোগ হোল তার বিচার করা যাবে। এখানে হিলারি ক্লিনটন মার্কিন কূটনীতিতে গুণগত পরিবর্তন কিভাবে আনতে চাইছেন ও আনছেন সেই সম্পর্কে তারই একটি লেখা ধরে দুই একটি কথা বলব।

হিলারি ক্লিনটনের যে-লেখাটির কথা বলছি সেটা ছাপা হয়েছিল Foreign Affairs (November December 2010) পত্রিকায় লেখাটির শিরোনাম, ‘বেসামরিক শক্তির জোরে নেতৃত্ব রাখাঃ মার্কিন কূটনীতি ও উন্নয়ন কৌশলের পুনর্বিবেচনা’ (Leading Through Civilian Power: Redefining American Diplomacy and Development) । হিলারি বলছেন, এই কালে বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (সাম্রাজ্যবাদী) নেতৃত্ব বহাল রাখতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে ‘স্মার্ট’ বা চৌকস হতে হবে। এর নাম তিনি দিয়েছেন “স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচ”। বিশ্বের সংকটকে তিনি সাজিয়েছেন সন্ত্রাস -- বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা – জলবায়ুর পরিবর্তন এবং দারিদ্র – এই ভাবে পরপর। বিশ্বে ক্ষমতা আর এক কেন্দ্রিক নয়, ছড়িয়ে যাচ্ছে। তারপরেও এই পরিস্থিতি সকলকে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। যদিও সেটা কঠিন কাজ। এই পরিপ্রেক্ষি্তেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক শক্তিকে সংগঠিত করতে হবে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সেক্রেটারি রবার্ট গেইটস যেভাবে বলেছেন হিলারি ক্লিনটনও তাকে সমর্থন করেই বলছেন বেসামরিক শক্তির সঙ্গে সামরিক শক্তির সঙ্গে আরো ভাল সমন্বয় ঘটাতে হবে। মার্কিন বেসামরিক সংস্থার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। বিশেষত পররাষ্ট্র দফতর ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (United States Agency for International Development সংক্ষেপে USAID)। তাদেরকে আরো নেতৃত্ব দেবার ভূমিকায় নিয়ে আসতে হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ায় তার সাম্রাজ্যবাদী নেতৃত্ব বজায় রাখতে চাইলে শুধু সামরিক শক্তির নেতৃত্বদানকারী ভূমিকার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে দুনিয়া জোড়া সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা নেতৃত্ব রাখা যাবে না। বেসামরিক শক্তিকেও সামরিক শক্তির সঙ্গে সঙ্গে কাজে খাটাতে হবে। বিশেষত সামরিক শক্তির পাশাপাশি মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর ও মার্কিন সাহায্য সংস্থাকেও যার যার ক্ষেত্রে নেতৃত্বদান কারী ভূমিকা পালন করতে হবে। তার মানে সমরনীতি, কূটনীতি ও উন্নয়ন নীতি এই তিন ক্ষেত্রে দায়িত্ব প্রাপ্ত সংস্থাগুলোকেও সমান তালে এবং সমান মাত্রায় নেতৃত্ব দিতে হবে। এর জন্য লোকবল ও অর্থবল বাড়াতে হবে। এই লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই ইউএসএইডকে প্রেসিডেণ্ট বারাক ওবামা নতুন করে সাজাবার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে এটি পৃথিবীর সেরা উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়। এর জন্য মার্কিন লোকজন নিয়োগ করা ছাড়াও বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ভাবে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয় তাদের যেন মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করবার জন্য ঠিকমতো ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করবার ওপর হিলারি জোর দিয়েছেন। নিজের দেশের সম্পর্কে স্থানীয় লোকজনেরই গভীর জ্ঞান থাকে বা আছে। উদাহরন হিশাবে বলা যায় বাংলাদেশে স্থানীয় ভাবে যারা মার্কিন দূতাবাস কিম্বা মার্কিন সাহায্য সংস্থায় কাজ করবে তাদেরকে আরও ভাল ভাবে মার্কিন স্বার্থে ব্যবহার করতে হবে। তারাই বাংলাদেশকে ভাল চেনে ও জানে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বহাল রাখবার জন্য এটা হচ্ছে স্মার্ট পাওয়ার এপ্রোচ। এটা নতুন জিনিস।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন সম্পর্ক শুধু রাষ্টের সঙ্গে রাষ্ট্রের বা সরকারের সঙ্গে সরকারেরই হতে হবে মনে করে না। দুনিয়া জুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা, এশিয়ায় অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিশাবে চিন ও ভারতের আবির্ভাব, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও সর্বোপরি পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে দেশে দেশে অসন্তোষ ও গণ বিক্ষোভ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। সেই দিকে নজর নিবদ্ধ রাখা এবং জনগণের দিক থেকে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের নীতি ও কৌশল নির্ণয় সবচেয়ে বেশি জরুরী কাজ।


এই এপ্রোচ মনে রেখে হিলারি ক্লিনটন ২০০৯ সালে দিকে পররাষ্ট্র দফতর ও মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার আমূল সংস্কার ও কাজ করবার ধরনে পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছেন এবং সেটা বাস্তবায়িত হচ্ছে। কাজের ধরণে যে পরিবর্তন ঘটেছে সংক্ষেপে তার কয়েকটি দিক তুলে ধরছি যা বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এক. কূটনৈতিক তৎপরতা ও উন্নয়ন তৎপরতাকে কাজ করতে হবে সামরিক তৎপরতার পাশাপাশি এবং সামরিক তৎপরিতার সঙ্গে সমন্বয় রেখে।

দুই. কূটনীতি এতোকাল রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধির সম্পর্কের মধ্য দিয়ে চর্চা হোত। কিন্তু এখন সেটা আর হবে না। মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ ও উন্নয়ন সংস্থা একটি দেশের সিভিল সোসাইটি বা সুশীল সমাজের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিভাগ ছাড়াও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দল, গোষ্ঠি ও ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন ও মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করবেন। মার্কিন দূতাবাস ও মার্কিন দূতকয়ে এই কাজ করবার জন্য দক্ষ হতে হবে। বিশেষত কূটনীতির পুরানা ধ্যানধারনা বাদ দিতে হবে, নিজেদেরকেও বদলাতে হবে।

তিন. দুনিয়া জুড়ে যোগাযোগ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে গুণগত পরিবর্তন হয়েছে তার কারনে সরকারের বাইরে নাগরিকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। যেসব ইস্যু আগে আভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে মনে করা হোত এখন তাকে সেভাবে দেখলে চলবে না। যেমন অর্থনৈতিক ও পরিবেশ সংক্রান্ত আইন ও নীতি, ওষুধ ও অসুখ, সংগঠিত অপরাধ, ক্ষুধা, ইত্যাদি। স্বাস্থ্য, কৃষি, গরিবী মোচনের মতো কর্মসূচী বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে উদাহরণ দিতে গিয় হিলারি বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলব্যাপী ফিড দ্য ফিউচার (Feed the Future) কর্মসূচির উল্লেখ করেছেন।

চার. সরাসরি একটি দেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা জরুরী হয়ে পড়েছে এই কারনে যে যারা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি নয়, কিন্তু রাষ্ট্রের বাইরে সক্রিয় (non-state actor), বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জনগণকে আগের চেয়ে তারা আরও অনেক দ্রুত গতিতে প্রভাবিত করতে সক্ষম। হিলারি ক্লিনটন নন স্টেইট এক্টর বলতে মূলত পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াকু রাজনৈতিক গোষ্ঠি যেমন মাওবাদি বা সশস্ত্র বামপন্থি দল এবং মার্কিন শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ইসলামপন্থি দল বা শক্তির কথাই বলছেন। যেসব বামপন্থি মানব বন্ধনের মতো কর্মসূচি দিয়ে বিপ্লবের দায় সারছেন তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আদৌ কোন হুমকি নয়। তারা সুশীল সমাজেরই অংশ, সেই হিশাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র।

পাঁচ. হিলারি পরিষ্কারই বলছেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে শক্তিশালী মধ্যবিত্ত শ্রেণি বা ‘সুশীল সমাজ’ তৈরী ও তাদের বিস্তার ঘটানোই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষা করবার সঠিক নিরাপত্তা কৌশল।

বলাবাহুল্য, মার্কিন সামরিক নীতির সঙ্গে কূটনীতি ও উন্নয়ন নীতির সমন্বয় ঘটাবার মধ্য দিয়ে সামগ্রিক ভাবে হিলারি ক্লিনটন দেশে দেশে মার্কিন স্বার্থ রক্ষা করবার যে-পরিকল্পনা গ্রহন করেছেন এবং বাস্তবায়ন করেছেন তার আরও বিশ্লেষণ দরকার। আজ এর বেশি সুযোগ হবে না। বাংলাদেশে তা কিভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তার ওপর নজরদারি নিবদ্ধ রাখাও খুবই জরুরী।

এতটুকু যদি আমরা বুঝতে পারি তাহলে বাংলাদেশে হিলারি ক্লিনটনের সফরের অর্থ বোঝার জন্য শুধু সরকারী পর্যায়ে কী চুক্তি হতে যাচ্ছে সেইদিকে নজর রাখলে চলছে না। কারন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে কূটনীতির চর্চা করছেনা। সেই নীতি তারা পরিহার করেছে সেটা তো তারা লিখেই জানান দিচ্ছে সারা দুনিয়ায়। এটা গোপন কিছু নয়।

শেখ হাসিনা বা বেগম খালেদার সঙ্গে সাক্ষাতেরও তাৎপর্যও এই পরিপ্রেক্ষিতে গৌন। বরং বাংলাদেশে হিলারি যে সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করবেন সেটাই হবে তার সফরে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক।

সেটা দেখা ও বোঝার অপেক্ষায় রইলাম।

৪ মে ২০১২। ২৫ বৈশাখ ১৪১৯। শ্যামলী।

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : হিলারি ক্লিনটন, মার্কিন কূটনীতি, সাম্রাজ্যবাদ

View: 5025 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD