বাংলাদেশের রাজনীতিতে আঞ্চলিক উত্তাপ


অনেকে দাবি করছেন, বাংলাদেশের রাজনীতি সংঘাতের দিকে যাচ্ছে আবার। এই দাবির পেছনে তারা বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেই দায়ি করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংঘাত নতুন কিছু নয়। ফলে শেখ হাসিনার সরকারের মেয়াদ শেষ হবার তারিখ যতোই ঘনিয়ে আসবে ততোই সংঘাতের সম্ভাবনা বাড়বে। কিন্তু এই সংঘাত বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির জন্য অতিশয় বিপজ্জনক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা খুব কমই ছিল। কিন্তু ভারতের আভ্যন্তরীন রাজনীতির কারণে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে এই কথাটি বলবার জন্যই এই লেখাটি লিখছি। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়াদি নিয়ে লিখবার আগে আঞ্চলিক পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে এই ধারণাটুকু দিয়ে শুরু করতে চাইছি।

বাংলাদেশে আগামি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে, বাংলাদেশে এর আগের প্রতিটি নির্বাচনের সময় মারদাঙ্গা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এবারও হতে পারে। এতে অবাক হবার কোন কারন ঘটবে না। কিন্তু এর পরিণতি বাংলাদেশের জন্য ঠিক কি পরিবর্তন ডেকে আনবে সেটা আমরা নিশ্চিত করে বলতে না পারলেও রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ে সমাজে যে সকল চিন্তার আধিপত্য রয়েছে তার দ্বারা খানিক আন্দাজ করতে পারি। সেই চিন্তা নির্বাচন কেন্দ্র করে আবর্তিত। অর্থাৎ ব্যবস্থা যেমন আছে তেমনই থাকবে, মৌলিক কোন সংস্কার বা পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই কম। এখনও প্রধান রাজনৈতিক উৎকণ্ঠা আসলে কিভাবে বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনার মধ্যে একটা সমঝোতা ঘটিয়ে নির্বাচন সম্পন্ন করা যায়। এর বেশি কছু নয়। সংঘাত এড়ানোর নাম করে বিদ্যমান ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার পুরানা প্রক্রিয়াটাই আমরা কমবেশি আবার আবর্তিত হতে দেখব। এই ভাবে ভাবা ভুল ছিল না তবে আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারনে দ্রুত পরিবর্তন ঘটবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।


রাজনৈতিকতা, রাষ্ট্রের গঠন, ক্ষমতা চরিত্র কিম্বা তাদের সম্ভাব্য রূপান্তর নিয়ে বাংলাদেশে আলাপ-আলোচনা তর্ক বিতর্ক নাই বললেই চলে। যে-সকল লেখালিখি পত্রপত্রিকায় আমরা দেখি সেইসব  নির্বাচন কেন্দ্র করেই আবর্তিত। অর্থাৎ ব্যবস্থা যেমন আছে তেমনই রেখে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কিভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যায় সেটাই রাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয়। মৌলিক কোন সংস্কার বা পরিবর্তনের নয়, বরং  সংঘাত এড়ানোর নাম করে বিদ্যমান গণবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার পুরানা প্রক্রিয়াটা সচল রাখাই প্রধান রাজনৈতিক ধারা।


তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে কিছু আইনী তর্ক বিতর্ক আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই তর্কবিতর্কগুলো দলবাজিতার অধিক কিছু নয়। রাজনীতি, ক্ষমতা, আইন বা রাষ্ট্র নিয়ে নতুন ভাবে ভাববার ক্ষেত্রে এইসব তর্কবিতর্ক কোন অবদান রাখে না। আপোষ-ফর্মুলার কথা ভাবতে গিয়ে আওয়ামি লিগের তরফ থেকে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার’ নামক ধারণা নিয়ে নাড়াচাড়া দেখছি। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার জাতীয় আরেকটি জোড়াতালির ফর্মুলা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এর কোন গ্রহণযোগ্যতা নাই। অন্যদিকে বিএনপি ও তার সঙ্গে জোটবদ্ধ দলগুলোর এমন কোন শক্তি নাই যে আন্দোলন করে শেখ হাসিনাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় রাজি করাতে পারে। বেগম খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল চান। এই দাবি ছাড়া তিনি এমন কোন দাবি করেন নি যার পেছনে জনমত পরিগঠিত হয়ে উঠতে পারে। তাছাড়া ইলিয়াস আলির গুম হয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে যে-আন্দোলন গড়ে উঠছিল এবং যার সমর্থনে জনগণ রাজপথে নেমে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিল বিএনপি হঠাৎ সেখানে ছেদ দিয়ে আত্মঘাতি পিছুটান প্রদর্শন করেছে। তার কারনে জনগণের সঙ্গে বিএনপির বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আওয়ামি লিগ ফাঁকির জায়গাগুলো পুরামাত্রায় কাজে লাগাবে। লাগাচ্ছে । প্রতিপক্ষের দুর্বলতার সুযোগ পুরা মাত্রায় নেবেন শেখ হাসিনা। তার দুঃশাসন ও সরকারের বিরূদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করবার যে জিদ তার স্বভাবের অন্তর্গত সেই জিদ প্রদর্শনে কোন কমতি হবে বলে মনে হয় না।

ক্ষমতার আসার পর থেকেই শেখ হাসিনার সরকারের প্রধান কৌশল হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়া ও তার ছেলেদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া। গত তত্ত্বাবধায়ক ও শেখ হাসিনার আমলে পঁচিশটি মামলা হয়েছে। ক্ষমতার মেয়াদ থাকতে থাকতেই দ্রুত সেই মামলায় বিচার ও বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সদস্যদের দোষি সাব্যস্ত করে আগামি নির্বাচনের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করা শেখ হাসিনার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কৌশল। এই পদক্ষেপ শেখ হাসিনা ইতোমধ্যেই নিতে শুরু করেছেন। এতে তিনি বিফল হবেন তার কোন চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না।


আন্দোলন করবার সংগঠন ও শক্তি বিএনপির নাই, খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে চান। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের সংঘাতের আশংকা বিএনপির দিক থেকে আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু খালেদা জিয়ার জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দ্রুত কমে যাচ্ছে। তার বিরুদ্ধে করা মামলায় সাজা দিয়ে তাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা আছে ক্ষমতাসীনদের। নির্বাচন বয়কট করলে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে নির্বাচন হবে, বিএনপি ও বিএনপির নেতৃত্ত্বাধীন জোট তা ঠেকাতে পারবে বলে মনে হয় না। সে নির্বাচনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলবে না, সেকথাও বলা যায় না।


শেখ হাসিনার দ্বিতীয় পদক্ষেপ হচ্ছে বিএনপি যদি আগামি নির্বাচন বয়কট করে তাহলে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে নির্বাচন করা। এই ক্ষেত্রে প্রধান বিরোধী দল হিশাবে জাতীয় পার্টির আবির্ভাব ঘটার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বেগম খালেদা জিয়া যদি ভেবে থাকেন তিনি নির্বাচনে না গেলে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে আগামি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না, তবে তিনি ভুল করবেন। কিন্তু তিনি ভুল করতে না চাইলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ তার জন্য ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়বে ও পড়ছে। সেটা শুধু বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য নয়, ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্যও বটে। এই দিকটিই আমরা এখানে বোঝার চেষ্টা করব

ভারতীয় পত্রপত্রিকায় ভারতীয় গোয়েন্দাদের বরাত দিয়ে বলা হছে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা হ্রাস পেয়েছে। এটা খবরের গৌণ দিক। মূল প্রচার হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশে আবার ইসলামি সন্ত্রাস মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা তৎপর হয়ে উঠবে, বাংলাদেশ থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসি তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে, ইত্যাদি। অগাস্টের ২৯ তারিখে টাইমস অব ইন্ডিয়ার যে প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে তার সারকথা হচ্ছে আইএসআই খালেদা জিয়াকে সমর্থন করে এবং অতীতেও করেছে; আগামি দিনে তার আবার ক্ষমতায় আসা ভারতের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। বিশেষত আসামে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছে তার কারণে সেখানে একটা নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে মুসলমানরা খালেদা জিয়ার সরকারের কাছ থেকে সমর্থন পেতে পারে। তাছাড়া ভারতে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী যে হারে ‘অনুপ্রবেশ’ করেছে তাদেরকেও ভারতে বিভিন্ন তৎপরতায় বাংলাদেশ উৎসাহিত করতে পারে। এই পরিপ্রেক্ষিতে রিসার্চ এন্ড এনালিসিস উইং সহ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাজ হচ্ছে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তায় ধস ঠেকানোর চেষ্টা করা এবং যেভাবেই হোক বেগম খালেদা জিয়ার আবার ক্ষমতাসীন হওয়া ঠেকানো। এটা হোল ভারতীয় গোয়েন্দাদের প্রচারের বাইরের দিক। কিন্তু প্রচারের আসল মর্মার্থ এটা নয়।

আসলে বাংলাদেশে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা তৎপর থাকতেই পারে, শুধু পাকিস্তান কেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এমনকি মায় মায়ানমারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও বাংলাদেশে কাজ করছে। সন্দেহ করার কারন নাই। কিন্তু ভারতীয় পত্রপত্রিকায় তাদের গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে যে খবরগুলো প্রচার করছে তার উদ্দেশ্য হছে বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার অন্তর্ঘাতমুলক তৎপরতার পক্ষে যুক্তি হাজির করা। বাংলাদেশে আইএসআইয়ের ভূমিকা উদাম করে দিয়ে এটাই বলা যে ভারতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হলে বাংলাদেশে ভারতীয় গোয়েন্দাদের তৎপরিতা বৃদ্ধি করতে হবে। এখন শেখ হাসিনার সরকারকে যে কোন মূল্যে যেভাবেই হোক রক্ষা করা ও ক্ষমতায় থাকতে সহায়তা করা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধান কর্তব্য। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য এ এক সম্পূর্ণ নতুন পরিস্থিতি।

অন্যদিকে আবার ভারতে আগামি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে, নগ্ন সাম্প্রদায়িকতা শুধু মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে নি, ভয়াবহ দাঙ্গার রূপ নিচ্ছে। ভারতে নতুন শত্রু হচ্ছে ‘অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশী’। ভারতের ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে ‘অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি’ নতুন উপাদান শুধু নয়, এক নির্ণায়ক উপাদান হয়ে উঠেছে । এই বিষয়ে এখন বিস্তৃত আলোচনা না করে ভারতের ‘আউটলুক’ পত্রিকার অনলাইনের সাম্প্রতিক সংখ্যাটি পাঠকদের পড়তে অনুরোধ করব। এর প্রচ্ছদ হচ্ছে, “নতুন দুষমন”। কারা এই নতুন দুষমন? বাংলাদেশ থেকে আসা অবৈধ দেশান্তরী খেটে খাওয়া মানুষ। ভারতের আগামি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ‘বাংলাদেশি মুসলমান’ সেখানে দুষমণ হয়ে উঠেছে। কিভাবে বাংলাদেশ ভারতের জাতীয় রাজনীতির নির্ণায়ক হয়ে উঠছে সেই দিকে নজর না দিলে আঞ্চলিক রাজনীতির গতি-প্রকৃতি আমরা বুঝব না। বাংলাদেশের আগামি দিনের রাজনীতিও এর দ্বারা প্রভাবিত হবে। আসাম প্রসঙ্গে ‘পূব থেকে বিদেশি দুষমন’ শিরোনামের লেখাটি পড়লে ভারতীয় গোয়েন্দাদের উৎকণ্ঠা কিছুটা আমরা ধরতে পারব। বাংলাদেশ, বাংলাদেশের সন্নিহিত ভারতের সাত রাজ্যসহ এই অঞ্চলের আগামি দিনের রাজনীতি কী রূপ নিতে যাচ্ছে তার আগাম চিহ্ন ফুটে উঠছে দ্রুত। বাংলাদেশের আগামি দিনের রাজনীতি বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন কারণে যতোতা নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি আঞ্চলিক কারণে সংঘাতমুখি হবে, এটা অনায়াসেই অনুমান করা যায়।

শেখ হাসিনা মুখে দাবি করছেন আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে রায় দিয়েছে বলেই তিনি তত্ত্বাবধায়ক ব্যাবস্থার অধীনে নয়, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করবেন। তার এই দাবি ঠিক নয়। ক্ষমতা ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাষ্ট্রের বল প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ ও নির্বাহি বিভাগের ওপর থেকে কর্তৃত্ব চলে যাওয়া শেখ হাসিনার জন্য বিপজ্জনক। ক্ষমতা আসার পর থেকে তার দুঃশাসন ও দুর্নীতির মাত্রা এতো চরমে পোঁছেছে যে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সামাল দেওয়া তার জন্য কঠিন। শেখ হাসিনা এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করত নারাজ বলে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন চান না। বর্তমান সংসদ ভেঙ্গে না দিয়ে যে কোন মূল্যে তিনি নির্বাচন করতে চাইবেন। ভারতীয় পত্রপত্রিকার খবর দেখে মনে হয় এই ক্ষেত্রে তিনি বাইরের সহায়তা পাবেন। কিছু কিছু দৈনিক পত্রিকা সংসদ না ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করা নিয়ে যে সাংবিধানিক তর্ক করছে রাজনৈতিক বাস্তবতা বিচার করলে সেই সব তর্ক পানশে ও অর্থহীন মনে হয়। কিন্তু সেই সব তর্কেও আমরা প্রবেশ করব। তাছাড়া অন্যান্য তর্কেও আমরা আগামি কিস্তিগুলোতে যোগ দেব। যেমন বিচার বিভাগ বনাম জাতীয় সংসদের ক্ষমতা ও এখতিয়ার নিয়ে তর্ক।


কিছু কিছু দৈনিক পত্রিকা সংসদ না ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করা নিয়ে যে সাংবিধানিক বা আইনী তর্ক করছে রাজনৈতিক বাস্তবতা বিচার করলে সেই সব তর্ক পানশে ও অর্থহীন মনে হয়। কিন্তু সুশী সমাজের রাজনীতি বিচার করবার জন্য সেই সব তর্কেও আমাদের প্রবেশ করতে হবে। অন্যান্য তর্কের মধ্য দিয়েও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির রাজনীতি আমরা বুঝতে পারব। যেমন বিচার বিভাগ বনাম জাতীয় সংসদের ক্ষমতা ও এখতিয়ার নিয়ে তর্ক।


তবে যেসব তর্ক বাংলাদেশে চলছে সেইসব শুধুই নির্বাচনের দিকে নজর রেখেই। মোটামুটি বলা যায়, বড় কোন পরিবর্তন ঘটবার মতো পরিস্থিতি বাংলাদেশের সমাজে এখনও ঘটে নি। কি বিষয় নিয়ে তর্ক হচ্ছে তার দ্বারা সমাজের চিন্তার মাত্রা আমরা ধরতে পারি। অর্থাৎ সমাজের ক্ষমতাবান শ্রেণীগুলোর চিন্তার দৌড় সম্পর্কে আন্দাজ করতে পারি আমরা। দেখা যাচ্ছে যে সুশীল সমাজও রাজনৈতিক প্রশ্নকে আইনী তর্কে পরিণত করতে বিশেষ ভাবে আগ্রহী। কেন তারা এটা করে সেই দিকটা আমাদের বোঝা দরকার। এর মধ্য দিয়ে সুশীল সমাজের রাজনীতিও আমরা বুঝতে পারব, আশা করি। এই দিকগুলো আমরা আগামি কয়েক কিস্তিতে হাজির করব।

কেউ কেউ আরেকটি এক এগারো জাতীয় ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশংকাও করছেন। এই আশংকাটা যে-ভাষায় বলা হয় তা বেশ আমোদ উদ্রেক করে। ‘তৃতীয় শক্তি’ নামক একটি ধারনা বাংলাদেশে চালু হয়েছে। তো কথাটা বলা হয় এই ভাবে যে বাংলাদেশে কি কোন তৃতীয় শক্তির ক্ষমতার আসার সম্ভাবনা আছে? রাজনীতিকে যখন রহস্যে মোড়া গোপন ষড়যন্ত্র ভাবা হয় তখন এই ধরণের ভাষা তৈরী হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো খেয়োখেয়ি করছে, এই সুযোগে রাজনীতির দুই প্রধান প্রতিপক্ষের বাইরে কি অন্য কেউ ক্ষমতা দখল করে নিতে পারে? এই আশংকার পেছনে অলস কল্পনার আতিশয্যই বেশি, বাস্তব বিচার নয়। কিন্তু আগামি দিনে আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশকে সংঘাত-সংকুল রাজনীতির মধ্যে পতিত হতে পারে। কিভাবে আমরা তা এড়াতে পারি, কিম্বা শাসক শ্রেণীর নিজেদের সংঘাতকে কিভাবে গণবিরোধী শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে রূপান্তর ঘটাতে পারি সেটাই হবে জনগণের দিক থেকে আলোচনার বিষয়। সেই দিকে লক্ষ্য রেখে কি কি বিষয় আমাদের আলোচনা করা উচিত আগামি কিস্তিতে তার প্রস্তাব করব।

আজ এতোটুকুই।

১ সেপ্টেম্বর ২০১২। ১৭ ভাদ্র ১৪১৯। শ্যামলী।