সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরহাদ মজহার


Wednesday 03 October 12

print

যে সকল দুর্বৃত্ত বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ জনপদ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছে তারা সজ্ঞানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্তিত্বের গোড়ায় আগুন দিয়েছে। পুড়ে যাওয়া ভগবান বুদ্ধের মূর্তি তথাগতের নয়, বাংলাদেশের নিজেরই ছবি। পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছবি চোখে লেগে আছে। ছাই হয়ে যাওয়া উপাসনাস্থল, প্রায় ভস্ম হয়ে যাওয়া নানান জিনিসপত্রের পাশে পুড়ে যাওয়া টিনের স্তুপ। ঐসবের মধ্য দিয়ে তথাগতের মূর্তি – দূর থেকে মুর্তির গায়ে আগুনে পুড়ে যাবার চিহ্ন, অথচ ওর মধ্যেও দূরে মাথা উঁচু করে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে সুপারি গাছের সারি। ভস্মস্তুপ থেকে নতুন ভাবে উপাসনা গৃহ হয়তো আবার বানানো অসম্ভব নয়। পুড়ে যাওয়া বাড়িঘরগুলোও হয়ত আবার বানানো সম্ভব হবে। কিন্তু যে জায়গাটুকু পুড়ে ছাই হয়ে গিয়ে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের বুকে গভীর ক্ষত তৈরী হয়েছে তার নিরাময় আদৌ সম্ভব কিনা কে জানে। বাস্তবের আগুন নিভিয়ে ফেলা সহজ, কিন্তু যে আগুন সামাজিক সম্পর্ক ও রাষ্ট্রের ন্যূনতম ভিত্তি পুড়িয়ে ফেলতে চায় তাকে নেভানো কঠিন। কারন কোথায় কিভাবে এই আগুন ছড়াচ্ছে তা বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল। এই আগুন বাংলাদেশকে ছারখার করে ফেলতে পারে। যারা এই ভয়াবহ কর্মটির পরিকল্পনা করেছে, নেতৃত্ব দিয়েছে এবং তা বাস্তবায়িত করেছে তারা তাদের কর্মকাণ্ডের রাজনৈতিক পরিণতি কি হতে পারে তা জেনেই এই কাজ করেছে।তাদের কাজের প্রাথমিক ফল হচ্ছে কিছু বিষয় প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠিত করা। সেই ফলগুলো আলোচনা করলে এই কাণ্ড যারা সজ্ঞানে ঘটিয়েছে তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আমরা কিছুটা ধরতে পারব।

প্রথম উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা প্রমাণ করা যে বাংলাদেশে মুসলমান ছাড়া ভিন্ন ধর্মাবলম্বিদের জীবন, সম্পত্তি ও ধর্ম নিরাপদ নয়; যে সকল সম্প্রদায়ের সঙ্গে ইসলাম ধর্মাবলম্বিদের নানান ঐতিহাসিক কারণে বিরোধ আছে শুধু তারা নয়, এমনকি যাদের সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠদের কোন ঐতিহাসিক বা সামাজিক শত্রুতা নাই তারাও এই দেশে অরক্ষিত। তাদের কোন নিরাপত্তা নাই। যে কোন সময় তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে।

 দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে, সংখ্যাগুরু ভারতীয় জনগণের কাছে বাংলাদেশের জনগণ সম্পর্কে আতংক তৈরী করা। বাংলাদেশের জনগণ ইতোমধ্যেই ভারতীয় জনগণের চোখে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত। জঙ্গি ইসলামের সার্বক্ষণিক আতংক তৈরি তো আছেই, দিল্লী সবসময় প্রমাণ করতে ব্যস্ত যে উত্তরপূর্ব ভারতের স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহীদের অভয়স্থান বাংলাদেশ, ফলে বাংলাদেশ ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। শেখ হাসিনার আমলে উলফাসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের হস্তান্তর ও দিল্লিকে খুশি করবার সম্ভাব্য সকল আওয়ামি প্রচেষ্টার পরেও ভারতের এই অভিযোগ বন্ধ হয় নি।

সীমান্তে কাঁটাতার এবং পাখির মতো বাংলাদেশীদের হত্যার কোন প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ ভারতে খুবই ক্ষীণ বা নাই বললেই চলে। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতীয় জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি এই লক্ষণ থেকেও টের পাওয়া যায়। দিল্লির প্রতি ক্ষমতাসীনদের দাসত্ব আছে, কিন্তু ভারতের গণতান্ত্রিক জনগণের সঙ্গে মৈত্রীর কোন সক্রিয় ও ফলপ্রসূ প্রয়াস বাংলাদেশে নাই। ভারতের আগামি নির্বাচন যতোই কাছে এগিয়ে আসছে ততোই ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারনে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে প্রচার তীব্র হচ্ছে । বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যম আছে যারা ভারত ও বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে মৈত্রীর সম্পর্ক চর্চার চেয়েও দিল্লির নীতি বাস্তবায়ন করাকে নিজের কাজ মনে করে। যার মর্ম হচ্ছে বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরী করা। এই উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশে জঙ্গি ইসলামের উপস্থিতির কথা তারা সরবে প্রচার করে।

এইসকল নানা অজুহাতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এখন প্রকাশ্যেই দাবি করছে যে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা হ্রাস পাবার কারনে বাংলাদেশে ক্ষমতার কোন পরিবর্তন হোক সেটা ভারতের কাম্য হতে পারে না। কারন এতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে ভারতের বিরুদ্ধে সহিংস তৎপরতা আবার চালানো হবে, এবং বাংলাদেশের ইসলামি জঙ্গিরা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠবে। এর সমাধান হচ্ছে ক্ষমতার সম্ভাব্য পরিবর্তন প্রতিহত করা। এই সকল যুক্তি দেবার অর্থ হচ্ছে নির্বাচন হোক বা না হোক বাংলাদেশের রাজনীতিতে দিল্লির হস্তক্ষেপের ন্যায্যতা আগে ভাগেই প্রতিষ্ঠিত করা। সেটা কূটনৈতিক বা গোয়েন্দা তৎপরতা যে কোন দিক থেকেই হতে পারে। এ বিষয়ে কিছুটা ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে আঞ্চলিক উত্তাপ’ শিরোনামে আগে আলোচনা করেছি। কোন বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ছাড়া বৌদ্ধ উপাসনালয়, হিন্দু মন্দির ও সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ভাংচুর ও জ্বালিয়ে দেওয়ার দোষ সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তি কিম্বা ইসলামি জঙ্গিদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে এই যুক্তিকেই আরও শক্তিশালী করা হয়।

তৃতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলাম যে মূলত বর্বরদের ধর্ম তার পক্ষে প্রমাণ হাজির করা। বুঝিয়ে দেওয়া বাংলাদেশীরা নিজেদের যতোই ‘মডারেট’ বলে দাবি করুক না কেন যে কোন ‘মুসলমানের’ মতো হিংস্রতা ও বর্বরতা বাঙালি বা বাংলাদেশীদের স্বভাবের অন্তর্গত। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মনমানসিকতার কোন পরিবর্তন যেমন হয় নি, বাঙালি বা বাংলাদেশিরা তাদের তিক্ত ইতিহাস থেকেও তেমন কোন শিক্ষা নেয় নি। বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি তাদের আন্তরিক প্রীতি এই ক্ষেত্রে তাদের চিন্তাচেতনায় কোন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক রূপান্তর ঘটায় নি। বৌদ্ধ মন্দির ও জনপদ জ্বালিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি যারা করে তাদেরকেই এই অপকর্মে নেতৃত্ব দিতে দেখা গিয়েছে। এই রাজনীতির দোহাই দিয়ে যারা ক্ষমতায় রয়েছে তারা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। আর, বৌদ্ধ মন্দির ও জনপদ জ্বালানোতে সকলেই অংশগ্রহণ করেছে। তার মানে বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে কে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি করে আর কে ইসলামি রাজনীতি করে তাতে কিছুই আসে যায় না। সব আরশোলাই রাত্রে বেরিয়ে আসে এবং নিজের স্বভাব প্রদর্শন করে।


উদ্দেশ্য হচ্ছে ইসলাম যে মূলত বর্বরদের ধর্ম তার পক্ষে প্রমাণ হাজির করা। বুঝিয়ে দেওয়া বাংলাদেশীরা নিজেদের যতোই ‘মডারেট’ বলে দাবি করুক না কেন যে কোন ‘মুসলমানের’ মতো হিংস্রতা ও বর্বরতা বাঙালি বা বাংলাদেশীদের স্বভাবের অন্তর্গত।


চতুর্থ উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার, থাইল্যাণ্ড ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোর সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্কের সম্ভাবনা নস্যাৎ করা। বিশেষত যেসব দেশের জনগণ প্রধানত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। আমরা শুনে আসছি বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ দেশ। কিন্তু তার প্রতিবেশীরা যদি প্রত্যেকেই বাংলাদেশ প্রতি বিরূপ হয় তাহলে এই ভূকৌশলগত তাৎপর্যের কোন রাজনৈতিক মূল্য যেমন থাকবে না, তেমনি বাংলাদেশের নিজের নিরাপত্তাও ভয়াবহ হুমকির মুখোমুখি হবে।

বাংলাদেশের প্রতি মায়ানমারের জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন সেটা রোহিঙ্গাদের ‘বাঙ্গাল’ ও ‘কালা’ বলে ডাকা দিয়েই বোঝা যায় । রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া ও গণহত্যার যে নারকীয়তা আমরা দেখেছে তার চেয়েও বিপজ্জনক হচ্ছে বাঙালি মুসলমানদের প্রতি মায়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের সাম্প্রদায়িক ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গী। এমনকি যারা গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তাদের মধ্যেও এই মানসিকতা বিস্মিত করে বটে, কিন্তু এটাই বাস্তবতা। দীর্ঘ বছরের সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক নিপীড়ন এর একটা কারন। বাংলাদেশের সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আদান প্রদানের অভাবও এই বাস্তবতা তৈরির কারন। এই পরিস্থিতি বদলানো বদলানো এখন আরও কঠিন হয়ে পড়বে এবং বাংলাদেশের ঘটনাবলীর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হবে।

বলাবাহুল্য পাশের দেশ থাইল্যান্ডেও এর মন্দ প্রতিক্রিয়া হতে বাধ্য। ইতোমধ্যে যেসব প্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া গেছে তাতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় প্রতিবাদ করেছেন এবং বাংলাদেশে এই ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি জানাচ্ছেন। বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার ক্ষেত্রে একদিকে ভারত ও অন্যদিকে মায়ানমার-থাইল্যান্ডের জনগণের সঙ্গে মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে তোলা অসম্ভব করে তোলা হয়েছে। শত্রু পরিবেষ্টিত থাকলে বাংলাদেশের মতো একটি ছোট, দুর্বল ও আভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিক থেকে বিভক্ত জনগোষ্ঠির জাতীয় নিরাপত্তা মারাত্মক ভাবে বিঘ্নিত হবে, সন্দেহ নাই।


protest

বাংলাদেশে বৌদ্ধ উপাসনালয় ও জনপদ পোড়ানোর প্রতিবাদে থাইল্যান্ডে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা প্রতিবাদ করছেন


আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতীয় রাজ্যের জনগণের সঙ্গেও দূরত্ব তৈরি করা। বৌদ্ধবিহার ও বৌদ্ধজনপদ জ্বালিয়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে যে হিংস্র রূপ প্রদর্শিত হয়েছে তাতে বাংলাদেশের জনগণ সম্পর্কে তাদের নেতিবাচক অনুমান আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। ভারতে বাংলাদেশিদের খেদিয়ে দেবার আন্দোলন দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ থেকে অবৈধ ভাবে এসেছে অভিযোগ করে আসামে সম্প্রতি বিশাল দাঙ্গা হয়েছে। সেখানে বোড়োরা ভূমিকা রেখেছে। দাঙ্গার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতি পড়শি রাজ্যগুলোর জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি আমরা বুঝতে পারি।

অর্থাৎ আঞ্চলিক ভাবে বৌদ্ধ উপাসনালয় ও বৌদ্ধ জনপদ জ্বালিয়ে দেওয়ার ক্ষতি ভয়াবহ। বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সাম্প্রদায়িক ঘৃণা তৈরি, ছড়ানো ও তার ভিত্তিতে উপমহাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরীর ক্ষেত্রে এই ঘটনা বারবারই অজুহাত হয়ে হাজির হবে। হাজির থাকবে।

গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জানিয়েছেন রামুর ঘটনায় কোন বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবে না। যে কোন ঘটনা ঘটবার পর আমরা দেখি আস্থা রাখা যায় এমন কোন বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করতে সরকারের অনীহা। বিপরীতে কোন তদন্তের আগেই সরকারের একটা ভাষ্য প্রচার করা হয় । তারপর সবাইকে সেই ভাষ্য বা প্রপাগান্ডা মেনে নিতে চাপ সৃষ্টি শুরু হয়।বাধ্য হয়ে অধিকাংশই সরকারী বয়ান মেনে নিতে বাধ্য হয়। এই প্রক্রিয়ায় দলবাজির লাইনে জনগণ বিভক্ত হয়ে পড়ে । এইসব কারনে এই কুকর্ম মূলত ক্ষমতাসীন সরকারই করেছে জনগণের মনে সেই সন্দেহ জোরদার হয়েহে।

... ... ... ... ...

দুই

বলাবাহুল্য, বাংলাদেশে যারা নিজেদের ভালমানুষ ও ভদ্রলোক বলে মনে করেন তারা এই ঘটনার প্রতিবাদ করছেন। নিজেদের তারা বাংলাদেশের বিবেক হিশাবে হাজির করতে চান। ভাল। আশ্চর্য হবার কিছু নাই যে বিবেকের দংশনে যথারীতি তারা এই ঘটনার জন্য মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকেই দায়ী করেছেন। কে কিভাবে বুঝি সেই তর্ক বাদ রেখেও বলা যায় অন্য যে কোন দেশের মতো বাংলাদেশেও অবশ্যই “মৌলবাদ” ও সাম্প্রদায়িকতা আছে। তার বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম অবশ্যই সঠিক এবং সেই লড়াই তীব্র করাও ন্যায্য। কিন্তু একথা মনে রাখতে হবে বৌদ্ধ উপাসনালয় ও জনপদ জ্বালিয়ে দেবার এই ন্যক্কারজনক ঘটনার ক্ষেত্রে প্রধান দায় রাষ্ট্র ও সরকারের। রাষ্ট্রের চরিত্র ও সরকারের ভূমিকার কথা উহ্য রেখে “মৌলবাদ” ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বলার কার্যকর কোন মানে হয় না। যারা সেটা চান তাদের সঙ্গে একমত হবার কোন কারন নাই।

তাছাড়া মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়, এই অঞ্চলের সমস্যা। উপমহাদেশের ইতিহাসের মধ্যে তার উপাদান আছে। শুধু উপমহাদেশ বলি কেন, সারা পৃথিবীতেই সাম্প্রদায়িকতা এবং “মৌলবাদ” বিশাল একটি সমস্যা। দেশভেদে সংস্কৃতি ভেদে অর্থনৈতিক অবস্থা ও রাজনীতির বিকাশ ও সচেতনতার মাত্রা অনুযায়ী উভয়ের প্রকাশের মধ্যে ভেদ-বৈচিত্র আছে। সেটা পরের প্রশ্ন। কিন্তু বাংলাদেশে যেখানে সরকারের বিরুদ্ধে কোন কর্মসূচিতে এক কদম রাস্তায় বেরুবার জো নাই, পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে যেখানে বিরোধী কাউকেই কোন কর্মসূচি পালন করতে দেওয়া হচ্ছে না, এমনকি যেখানে তেল গ্যাসের জন্য যারা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তাদের নির্মম ভাবে পেটাতে সরকারের বাধছে না, সেখানে একের পর এক বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ জনপদ কিছু লোক ‘আল্লাহু আকবর’ হাঁক ছেড়ে জ্বালিয়ে ছাই করে দিয়ে গেল কিভাবে? সরকার সেনাবাহিনী, পুলিশ ও র‍্যাবের বিশাল বাহিনি জনগণ ও বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে চলেছে। অথচ নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের রক্ষা করতে তারা ব্যর্থ হোল কেন? আইনশৃংখলা বাহিনীর নিজেদের দোষে? নাকি সরকার চায় নি বলেই সেটা সম্ভব হয় নি। সত্য মিথ্যা জানি না, এমনকি কোন কোন মিডিয়ায় দেখা গেছে যে স্থানীয় বর্ডার গার্ড ও সেনাবাহিনী নাকি ঘটনার সন্ধ্যা থেকেই অপেক্ষা করেছে নির্দেশের অপেক্ষায়।

তবুও যারা বৌদ্ধ মন্দির ও বৌদ্ধ জনপদ আগুন দিয়ে পোড়ানোর নিন্দা করছেন ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তাদের সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্যের জন্য অবশ্যই সংহতি প্রকাশ জরুরি। যারা রাস্তায় প্রতিবাদ জানাতে নামছেন তাদের প্রতি তো অবশ্যই। কিন্তু যারা সন্তর্পনে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকার প্রশ্ন বাদ দিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন শুধু সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে, তাদের সমর্থন করা কঠিন। প্রতিবাদ তো শুধু সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে করলে হবে না, এই লড়াই একই সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধেও। ক্ষমতাসীন আওয়ামিলিগের রাজনীতির বিরোধিতা না করে যারা শুধু বিছিন্ন ভাবে সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয় নিপীড়নের প্রতিবাদ করছেন তাদের রাজনীতির সমালোচনা না করলে বৃহত্তর সংহতি ভুল দিকে আমাদের নিয়ে যাবে। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাবহির্ভূত -- রাজনীতির দুই প্রধান ধারাকেই জনগণের দুষমন হিশাবে চিহ্নিত করতে হবে ও তার বিরুদ্ধে লড়তে হবে।

পরপর তিন দিন বৌদ্ধদের উপাসনালয় ও জনপদ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন আওয়ামি লিগ কিছুই জানে না, কিছুই তারা করতে পারে নি, এটা অবিশ্বাস্য। আমরা এখনও জানি না ক্ষমতাসীনদের এই আত্মঘাতি নিষ্ঠুর ও অমানবিক রাজনৈতিক খেলা আদৌ বন্ধ হয়েছে কিনা। অথচ এই দিকটা অন্ধকারে রেখে ও তার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ না করে শুধু মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামার অর্থ প্রকারান্তরে যারা এই তাণ্ডব ঘটিয়েছে তাদের পক্ষাবলম্বন করা হয়ে যায়। সরকারের হাত পরিস্কার তা প্রমানে সরকারকে বাধ্য না করে কেবল মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কথা বললে সেটা সরকারের পক্ষেই যাবে। নীরবতার এই রাজনীতি আরও ভয়াবহ কারণ সাম্প্রদায়িকতা, জাতিগত নিপীড়ন ও মৌলবাদ বিরোধিতার আড়ালে এতে মূলত অপরাধীদেরই আড়াল করা হবে। পত্রিকায় খবর হচ্ছে রামুতে প্রথম মিছিলটি বের হয় উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা ও রামু প্রেস ক্লাবের সভাপতি নূরুল ইসলাম সেলিম ও উপজেলা মৎস্যজীবী লীগ নেতা আনসারুল হক ভুট্টুর নেতৃত্বে। মিছিলটি রামুর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে চৌমুহনী চত্বরে প্রতিবাদ সভায় মিলিত হয়। এতে ঐ দুই আওয়ামী লীগ নেতা বক্তৃতা করেন।

আজ প্রথম আলোর( ২ অক্টোবর ২০১২) প্রতিবেদনে ‘সন্দেহে রোহিঙ্গা জঙ্গীরা’ শিরোনামে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। অথচ তাদের মূল প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “রাত সাড়ে নয়টার দিকে ছাত্রলীগের নেতা সাদ্দাম হোসেন ও মৌলভি হাসানের নেতৃত্বে ৫০-৬০ জন লোক মিছিল বের করে। মিছিল শেষে একটি সমাবেশ হয়। এতে রামু নাগরিক উন্নয়ন কমিটির সভাপতি ও ছাত্রলীগের সাবেক নেতা নুরুল ইসলাম ওরফে সেলিম ও মৎস্যজীবী লীগের নেতা আনসারুল হক বক্তব্য দেন। সমাবেশের খবর পেয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজিবুল ইসলাম সেখানে যান। তিনিও বক্তব্য দেন। প্রথম আলো পুলিশের রোহিঙ্গাদের সন্দেহ করছে তাকেই শিরোনাম করেছে অথচ প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে তার কোন মিল নাই। এই রিপোর্টকে কিভাবে পড়ব? প্রতিবেদনের সাথে সম্পুর্ণ অমিল শিরোনামে রোহিঙ্গা লিখে সরকারের মন যোগানো আর বিনিময়ে যতটুকু সত্য লেখা যায়? নাকি অন্য কিছু?

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি গণহত্যার শিকার। এই ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির মানবাধিকার লংঘিত হছে দীর্ঘ দিন ধরে। শুধু তাই নয়, প্রাণ বাঁচাতে তারা বাংলাদেশে যখন সাময়িক আশ্রয় চেয়েছে, সেই মানবিক আবেদনও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তাদের একমাত্র অপরাধ তারা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান বা ‘আদিবাসী’ পাহাড়ি নয়।এখন তাদের ইসলামি জঙ্গি প্রমাণ করে এবং বৌদ্ধদের বাড়িঘর জ্বালানোর প্রধান হোতা হিশাবে অভিযুক্ত করে মায়ানমারে তাদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন ও হত্যার নতুন ছুতা তুলে দেওয়া হোল। কসাইয়ের হাতে গরু জবাই করবার ছুরি তুলে দেবার মতো। একইসঙ্গে প্রমাণ করা হোল ইসলাম মূলত বর্বরদেরই ধর্ম, মুসলমান মাত্রই সাম্প্রদায়িক।

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করবার জন্য কিছু রোহিঙ্গাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। অথচ প্রথম আলো পুলিশের সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে জঙ্গি রোহিঙ্গারা যুক্ত আছে বলে নিজেরা যে-খবর ছেপেছে সেই রিপোর্টের ভেতরে রয়েছে ভিন্ন কথা। রিপোর্ট বলছে, “হামলার ঘটনায় গতকাল সোমবার রাত পর্যন্ত ৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের পরিচয় জানা যায়নি”। সমাবেশের ব্যাপারে প্রথম আলো নুরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “রাত ১০টার দিকে তিনি লক্ষ করেন, হঠাৎ করে বিভিন্ন যানবাহনে করে শত শত লোক রামুর দিকে আসছে। ওই বহরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারাও ছিলেন”।

তাহলে রোহিঙ্গা এল কোত্থেকে?

সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখে প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন ছিল “রোহিঙ্গাদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে গঠিত হয় জামাআতুল আরাকান”। এই তথ্যের উৎস হছে পুলিশ। এই তথ্য কোন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ভিত্তিতে পাওয়া তথ্য নয়, কিম্বা কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার পর আদালতে প্রমাণিত হওয়া সত্য নয়। পুলিশ কিছু যুবককে সন্দেহ করে গ্রেফতার করেছে। তাদের কাছ থেকে কথা আদায় করবার জন্য “রিমাণ্ডে” নেওয়া হয়। রিমাণ্ডে তারা এইসব স্বীকার করে। রিমান্ডে কিভাবে তথ্য আদায় করা হয় আমরা তা জানি। অত্যচার নির্যাতন ভয় ভীতি প্রদর্শন করে কোন স্বীকারোক্তি আদায় করলে আইনের চোখে তা গ্রহণীয় নয়। কিন্তু রিমাণ্ডে নিয়ে আদায় করা এই তথ্যের ভিত্তিতে প্রথম আলো জানিয়েছে বাংলাদেশে “মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংগঠিত করে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করে জামাআতুল আরাকান। এ কারণে সংগঠনেরনামকরণকরাহয়‘জামাআত আরাকান’।“কক্সবাজারে গ্রেপ্তার হওয়া চার জঙ্গি রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এসব কথা বলেছেনবলে পুলিশ সূত্র জানায়”।

সেপ্টেম্বরের চার তারিখের প্রথম আলোতে জানানো হয়, “আত্-তাহরীদনামের মাসিক পত্রিকাও ছিল ‘জামাআতুল আরাকানের’। সংগঠনের মুখপত্র হিসেবে পত্রিকাটি গোপন প্রেসে ছাপিয়ে সংগঠনের সদস্য ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে বিক্রি ও বিতরণ করা হতো। আর তাতে সদস্যদের উজ্জীবিত করার জন্য আল-কায়েদাসহবিদেশি জঙ্গিদের লেখা ও সাক্ষাৎকার বাংলায় অনুবাদ করে ছাপানো হয়”। (কোথায় দেখব? দেখুন, ‘জামাআতুল আরাকানের মুখপত্রে পাকিস্তানি জঙ্গিদের লেখা’)

অর্থাৎ রোহিঙ্গারা শুধু ‘জঙ্গি ‘নয়, এমনকি আল কায়েদার সঙ্গেও যুক্ত। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এই ভাবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রচারণা চালানো হয়েছে। বাকি আছে বৌদ্ধ উপাসনালয় ও বৌদ্ধ জনপদ পুড়িয়ে ফেলবার পেছনে আল কায়েদার হাত আবিষ্কার করা।

জঙ্গি রোহিঙ্গার গল্প যদি সত্যিই হয়ে থাকে তবে সরকারের উচিত হত যে কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রকাশ ঘটার আগেই নজরদারি ও কঠোর হাতে তা দমন করা। কিন্তু আমরা দেখছি একদিকে রোহিঙ্গাদের প্রমাণ ছাড়া ‘জঙ্গি’ বলে প্রচারণা অন্য দিকে দাঙ্গা ঘটতে দেয়া। কোন তদন্ত অনুষ্ঠানে অনীহা। আর এখন জঙ্গি রোহিঙ্গার গল্প বলে সেই দাঙ্গাকেই হালাল করার উদ্যোগ। এটাকে আগুন নিয়ে খেলা বললে কম বলা হবে।

সেই কারনে বলি, সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের যারা স্থানীয় মিত্র সেইসব গণমাধ্যমের ভূমিকার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ না জানিয়ে তাদেরই রাজনীতি বহন করে যে-প্রতিবাদ তার চেয়ে নিকৃষ্ট প্রহসন আর কিছুই হতে পারে না।

আসুন, আমরা সঠিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হই। আমাদের অসচেতনতা ও অজ্ঞতার কারনে আমরা যেন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির শিকারে পরিণত হয়ে বাংলাদেশকে ছারখার না করি।

১৮ আশ্বিন ১৪১৯। ৩ অক্টোবর ২০১২। শ্যামলী।

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(1)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : বৌদ্ধ মন্দির, রামু, রোহিঙ্গা, সাম্প্রদায়িকতা, সহিংসতা, ফরহাদ মজহার, Farhad Mazhar

View: 5833 Leave comments-(1) Bookmark and Share

http://sushantakar40.blogspot.com1

ইতিহাসের কোন এক কালে ইসলাম দুনিয়া জুড়ে শাসকের ধর্ম ছিল বটে, এখনও বাংলাদেশের মতো বহুদেশের সংখ্যাগুরুর তথা শাসকের ধর্ম বটে, কিন্তু মার্কিন কেন্দ্রিক বিশ্ব ব্যবস্থাতে ইসলাম এবং মুসলমান যে আক্রমণের শিকার এটা মুসলমান না হলে সবার পক্ষে বোঝা মুস্কিল। আক্রমণ বলতে কেবল শারীরিক নয়, 'ছদ্ম-দার্শনিক' ইসলাম বিরোধী প্রচারেরও। সে প্রচার হোক মার্কিনিদের , ইউরোপীয় স্বেতাঙ্গদের, ইহুদিবাদী বা হিন্দুত্ববাদীদের কিম্বা মেকী বামপন্থীদের। দেশে দেশে যখন আত্মরক্ষার্থে মুসলমানদের মার্কিনি সাম্রায্যবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে লড়তে হয়, তখন সেই লড়াইকে ব্যহত , প্রতিহত, করতে এই ইসলাম বিরোধী প্রচারকে সঙ্গী করে ফেলা হয়। এই যেমন, বাংলাদেশে--- পাহাড়ে হাঙ্গামা-বিশ্বায়নের যুগে কোন দেশে এগুলো হচ্ছে না বা হবে না? আর করতে গিয়ে জাতিগত বিদ্বেষকে হাতিয়ার করবার দরকারতো সাম্রায্যবাদের নিজেরই। এটা ভারতেও হচ্ছে। কিন্তু মুসলমান প্রধান দেশে এর পুরো দায় ইসলাম এবং মুসলমানের ঘাড়ে চাপানো সহজ। এই দিকটা আমি বুঝি।
কিন্তু কথাগুলো বেশ জটিল, এবং বহুমাত্রিক। লীগের হাত রয়েছে এমন সত্য ভারতেও অনেকে হজম করতে বেগ পান। ইনি সেই সত্য লিখেছেন। বদরুদ্দীন ওমরও লিখেছেন। আমি কিন্তু বুঝিনি, লীগের কী লাভ মুসলমানকে বদনামী করে? বা এই ক্ষেত্রে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের শরিক হয়ে? উচ্ছেদে ভারতের হাত থাকতে পারে, আগামীতে আরো থাকবে। সাহারা যে ঢাকাতে আবাসন প্রকল্পে হাত দিচ্ছে, বা অন্যেরা, সেখানেও উচ্ছেদ ইত্যাদি হবে। লড়াইও হবে। কিন্দু সেটি কি ভারত সেখানে ইসলামকে বদনামী করে করতে পারবে? না সঙ্গে নিয়ে করবে? ইসলামকে বদনামী করতে লীগের শাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে কী করে? ভোটার অধিকাংশতো মুসলমান। পাহাড়ে এই যে আক্রমণ, তা কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এবং অর্থনীতিতে বাঙালি-মুসলমান উগ্রজাতীয়তাবাদের আধিপত্য অক্ষত রাখবার জন্যে নয়?
ইসলাম বা মুসলমান আক্রান্ত বটে। রোহিঙ্গিয়াদের কাঁধে দায় চাপিয়ে অপরাধী আড়াল তাতেই সম্ভব হয়েছে। কিন্তু শাসকের সহযোগী ইসলামোতো রয়েছে। স্থানকালের বৈচিত্রগুলো বুঝব না?
এই দায় নিতে হবে না? গদ্দাফীকে হটালো যারা তারাও কি ইসলামী রাজনীতি করছেন না, কিম্বা ইরাকে সিরিয়াতে আফগানিস্তানে মার্কিনী সহযোগীরা? সৌদীতে?
বাংলাদেশে, শাসকের দর্শনযে ইসলাম-বাংলার আধিপত্যবাদ-এই সত্যও বুঝে নিতে হবে। লীগকে দল হিসেবে দায়বদ্ধ করবার সঙ্গে সঙ্গে শাসক শ্রেণিটিকে বুঝে নিতে হবে না? বুঝে নিতে হবে না, লীগকে কেন মুখোস পরতে হয়, সমস্ত সাম্প্রদায়িকতা করবার পরেও অসাম্প্রদায়িকতার?
আমার মনে হয়, লীগকে না চেনা অব্দি বাংলাদেশের রাজনীতি বোঝাই যাবেনা, তৃতীয় শ্রেণির হিন্দুত্ববাদী, এবং ক্লিশে বামপন্থী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বোধই আমাদের মনকে শাসন এবং বিভ্রান্ত করে যাবে।
সংখ্যালঘু আক্রান্ত হতেই থাকবে, আর অপরাধীরা পার পেতেই থাকবে। ফরহদ মজহর লীগের দিকে আঙুল তুলেছেন -এইটুকু সঠিক কাজ করেছেন।
কিন্তু আমার চোখে আরো দুটি ভালো লেখা এইটিঃhttp://www.mongoldhoni.net/2012/10/03/an-analysis-on-recent-brutal-attack-on-buddhists/
কিম্বা এটিঃ http://www.amardeshonline.com/pages/details/2012/10/04/166966#.UG3RU5KGBmr.facebook

Thursday 04 October 12
Sushanta Kar


EMAIL
PASSWORD