অহিংসা ও বিপ্লব


[ মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী উপমহাদেশে অহিংসার বাণী শুনিয়েছিলেন, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী তাতে মোহিত হন নি, তিনি তাকে ‘আফিম খাওয়ানো’ মনে করতেন। মওলানার দাবি, “অহিংসার বাণী এবং অহিংস কৌশল মানুষের বিপ্লবী চেতনাকে ভোঁতা” করে দেয়। কিন্তু এটা নিছকই চেতনাগত সমস্যা নয়। এটা হচ্ছে “চোয়ালেই লাগাম আঁটিয়া দেওয়া”। চিন্তার যে গভীরতা থেকে ভাসানী কথাগুলো বলেছেন তা বুঝতে হলে তাঁর 'অহিংসা ও বিপ্লব' লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে।

প্রথমত অহিংসাবাদ জালিম ব্যবস্থা উৎখাত করবার জন্য ব্যবস্থার রক্ষকদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অনিবার্যতা ও প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে এবং মজলুম যখন জালিমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয় তখন তাকে ‘অপরাধ’ হিসাবে গণ্য করবার নৈতিক, সামাজিক ও আইনী ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়ায় এবং তাকে আরও শক্তিশালী করে। অর্থাৎ অহিংসা নিপীড়ন উপশম দূরের কথা বরং  নিপীড়িতকে আরো নিপীড়নের ব্যবস্থা করে দেয়।

দ্বিতীয়ত অহিংসাবাদ রাজনীতিকে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের ক্ষমতার লড়াই ও ক্ষমতা বিকাশের ক্ষেত্র হিসাবে দেখে না, বরং ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক আচরণ, নৈতিক ও মানুষের সঙ্গে মানুষের ব্যবহার ইত্যাদি সামাজিক বিষয়ে পরিণত করে। যে সহিংস ভিত্তির ওপর জালিমের রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে সেই সহিংসতাকেই অহিংসাবাদ বৈধতা দেয়।  এর ফলে রাজনীতি ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল যে আসলে জালিমের ক্ষমতার বিরুদ্ধে মজলুমের ক্ষমতা অর্জনের লড়াই -- এই বাস্তবতা ও কর্তব্যকে সরাসরি আড়াল করা হয়।  যার আদত উদ্দেশ্য হোল খোদ রাজনীতিরই নিরাকরণ ঘটানো। রাজনীতি হয়ে ওঠে সামাজিক ক্ষেত্রে আদব কায়দা আচার আচরণ প্রেম ভালবাসা চর্চা করবার ক্ষেত্র। জালিম সরকার, রাষ্ট্র ও তার সমর্থক শ্রেণি ও শক্তি কেন এই কৌশল গ্রহণ করে? কারন তারা জুলুম বা হিংসার ওপর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক সম্পর্কগুলোকেই মূলত রক্ষা করতে চায়, অহিংসা সেই ক্ষেত্রে জালিমের হাতে শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে কাজ করে।

তৃতীয়ত, ব্যক্তিগত, সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনে অহিংসার নীতি চর্চার অবশ্যই প্রয়োজন আছে, মওলানা ভাসানী কখনই তাঁর ব্যাক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে এই চর্চার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করেন নি। অস্বীকার করবার প্রশ্নই আসে না।  কিন্তু ব্যক্তিগত, সামাজিক বা আধ্যাত্মিক নীতিকে যখন রাজনৈতিক রণনীতি ও রণকৌশলে উন্নীত করবার কথা বলা হয়, তখন অহিংসাবাদের উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে হিংসার ওপর টিকিয়ে রাখা আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখা। মওলানা ভাসানী এই জন্য স্পষ্ট বলছেন, “অহিংসায় ভালবাসার বাণী থাকিলেও তাহা কোনদিন বাস্তবায়িত হয় না। বিশেষ করিয়া ধনতন্ত্রবাদী সমাজব্যবস্থায় তাহা তো সম্ভব নয়ই... প্রকৃতপক্ষে মানুষের সুকুমার বৃত্তিকে জয় করিতে অহিংসা একটি মহৎ মাধ্যম হইতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনেতিক আন্দোলনের সহিত মানুষের যে ধরনের বৃত্তিসমূহ জড়িত থাকে সেগুলিকে জয় করিতে অহিংসার নয়, মারমুখী কৌশলেরই প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে”। তাঁর চিন্তার স্বচ্ছতা এবং স্পষ্টতা অসামান্য।

চতুর্থত, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মানুষের ‘সমষ্টিগত শক্তি’-র বিকাশ না ঘটিয়ে এবং তাকে রুদ্ধ করে দিয়ে অহিংসাবাদ জনগণের চেতনাকে  শুধু ভোঁতা করে দেয় না বরং জনগণের বিক্ষোভকে গণশক্তিতে রূপান্তরের সম্ভাবনাকে গোড়াতেই নস্যাৎ করে দেয়। যে কারনে অহিংসাবাদকে মওলানা ভাসানীর মনে হয়েছে “চোয়ালেই লাগাম আঁটিয়া দেওয়া", অথচ "...বিপ্লবী মন সব সময় অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর - শুধু মুখের ভাষায়ই নয় স্থান-কাল-পাত্র ভেদে অস্ত্রের ভাষায়ও”।

আব্দুল হামিদ খান ভাসানী জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের রাজনৈতিক লড়াই পরিচালনার ক্ষেত্রে  ও বিদ্যমান ব্যবস্থা উৎপাটনের লক্ষ্যে নিপীড়িতের সংঘবদ্ধ বলপ্রয়োগের অনিবার্যতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁর এই ক্ষুদ্র লেখাটিতে যেভাবে বলেছেন তার তুলনা হয় না। বৈপ্লবিকতা বা বিপ্লবী রাজনীতি ও রণকৌশল সম্পর্কে মওলানা ভাসানীর এই বিখ্যাত নিবন্ধ আজ নানা কারনে চাপা পড়ে গিয়েছে। কেউ ভাসানীকে ‘পীর’ বানাতে চায়, আর কেউ চায় তিনি নখদন্তহীন ‘লাল’ মওলানা হয়ে থাকুক। আজ সময় হয়েছে বাংলাদেশে এই উভয় ধারার খপ্পর থেকে দুনিয়ার সকল নিপীড়িত মানুষের নেতা মওলানা ভাসানীকে উদ্ধার করা এবং জালিম বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে দুনিয়ার যে যেখানে লড়াই করছে তাদের কাছে তার নিরাপোষ ও অকুতোভয় জীবনকথা,  শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা পৌঁছিয়ে দেওয়া। - ফরহাদ মজহার]


অহিংসা ও বিপ্লব

মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী

যে মত ও পথ বিশেষ করিয়া রাজনীতির ন্যায় সদা গতিশীল বিষয়ে, মানুষের সমষ্টিগত শক্তিকে দুর্বল এবং স্থবির করিয়া ফেলে উহার সহিত আমার মানসিকতাকে কোনদিন খাপ খাওয়াইয়া নিতে পারি নাই। মানবজাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস সম্পর্কে যতটুকু জানিতে পারিয়াছি এবং আমাদের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত যতটুকু শিক্ষালাভ করিয়াছি উহাতে আমি স্থির সিন্ধান্তে পৌঁছিয়াছি যে অহিংসার বাণী এবং অহিংস কৌশল মানুষের বিপ্লবী চেতনাকে ভোঁতা করে মাত্র - দেশের শতকরা পাঁচানব্বইজন মানুষের চিরস্থায়ী কোন কল্যাণ সাধন করিতে পার না। তাই যখনই আমি দেখিতে পাই যে দেশবাশী অহিংসার মন্ত্রে দীক্ষা লাভ করিয়া মানবীয় কল্যাণের কথা ভাবিতেছে তখন সত্যিই আমার করুণা জাগে – কি আফিমই না তাহাদিগকে পাইয়া বসিয়াছে। দেশবাসীর এহেন বিনীত আরজের সুযোগে দেশের শতকরা মাত্র পাঁচজন লোক কি সুবিধাই না লুটিয়া থাকে! যে জনতা বিপ্লবের ঝাণ্ডা বহন করিয়া কৌশলীদের অপমৃত্যু ঘটাইয়া দিতে পারিত তাহাদিগের চোয়ালেই লাগাম আঁটিয়া দেওয়া হয়। তাঁহারা তখন কথা বলে ঠিকই কিন্তু যাহারা কোনদিনই তাহাদের মুক্তিদান করিবে না তাহাদের দরবারেই বলে। সেই জনতা তখন একটি তত্ত্বের দিকে ধাবিত হয় বটে কিন্তু উহা তাহাদিগকে কত পিছনে লইয়া যায় তাহার খোঁজই রাখে না। মোট কথা, অহিংসা শোষণের একটি মহৎ কৌশল- এই সত্যটি কেউ বুঝিয়া উঠে না।


শোষণ মুক্তির বলিষ্ঠ ধাপ তথা বিপ্লবের পথে পা বাড়াইবার মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা ধ্বংস করিবার মোলায়েম মত ও পথই হইল অহিংসা। অহিংসার বাণী এবং অহিংস কৌশল মানুষের বিপ্লবী চেতনাকে ভোঁতা করে মাত্র - দেশের শতকরা পাঁচানব্বইজন মানুষের চিরস্থায়ী কোন কল্যাণ সাধন করিতে পারে না। তাই যখনই আমি দেখিতে পাই যে দেশবাসী অহিংসার মন্ত্রে দীক্ষা লাভ করিয়া মানবীয় কল্যাণের কথা ভাবিতেছে তখন সত্যিই আমার করুণা জাগে – কি আফিমই না তাহাদিগকে পাইয়া বসিয়াছ!


শোষণ মুক্তির বলিষ্ঠ ধাপ তথা বিপ্লবের পথে পা বাড়াইবার মানসিকতাকে নিয়ন্ত্রণ কিংবা ধ্বংস করিবার মোলায়েম মত ও পথই হইল অহিংসা। তাই পূর্বেই আমি উল্লেখ করিয়াছি যে অহিংসার মন্ত্র যতই আপাতঃ মধুর হউক না কেন, যতই দর্শনসুলভ হউক না কেন - বাস্তবে উহাকে আমি কোনদিন বরদাশত করিতে পারি নাই। অহিংসার মন্ত্রকে ঘৃণাভরে পদাঘাত করিয়া বিপ্লবের কর্মসূচী যথাযথ রাখাতেই দেশের শতকরা পাঁচানব্বইজন মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিহিত বলিয়া আমি বিশ্বাস করি।

শুধু সমষ্টিগতভাবেই নয় ব্যক্তিগত পর্যায়েও অহিংসা মানুষের সমূহ ক্ষতিসাধন করে। অবশ্য যিনি অহিংসার মৌলিক চেতনায় গড়া প্রতিভা লইয়া জন্ম লইয়াছেন তাহার কথা আলাদা। তবে এমন প্রতিভা লইয়া প্রতি শতাব্দীতে কয়জনই বা জন্ম গ্রহণ করে। তাহাদিগকে লইয়া তো আর সমাজ কিংবা রাষ্ট্র চলিতে পারে না। অহিংসা ব্যক্তির আত্মশক্তিকে খর্ব করিয়া ফেলে। অন্যায় অবিচারের সহিত আপোষ করাটা এক সময় তাহার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হইয়া দাঁড়ায়। তখন তাহার নিকট শান্তির দোহাই এবং সহ-অবস্থান নীতি অতি বড় হইয়া দেখা দেয়। এইভাবে অহিংসার বাণী ব্যক্তির বেগবান সৃজন প্রবাহকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। ব্যক্তিগতভাবে অধঃপতিত হইয়াই সে বসিয়া থাকে না- অহিংসা বাণীর বদৌলতে নিরীহ জনসাধারণকে শোষণ করিবার পথও খুঁজিয়া বেড়ায়। ধার্মিকের বেশে দুনিয়াতে যেমন বহু রকমের ভণ্ডের আবির্ভাব ঘটিয়াছে তেমনি অহিংসাপরায়ণ সাজিয়া মোনাফেক শোষক গড়িয়া উঠিয়াছে। এই সকল পরিস্থিতির মোকাবিলা করিতে বিপ্লবী মহলকে সচেতন ও সক্রিয় থাকিতে হয়।


অহিংসায় ভালবাসার বাণী থাকিলেও তাহা কোনদিন বাস্তবায়িত হয় না। বিশেষ করিয়া ধনতন্ত্রবাদী সমাজব্যবস্থায় তাহা তো সম্ভব নয়ই। পক্ষান্তরে বিপ্লব যে আবেদন আর শক্তি লইয়া মানব সমাজে উপস্থিত হয়, তাহা আর কিছু বহন করুক বা না করুক -কুসংস্কার এবং শোষণের ধ্বংস প্রত্যক্ষভাবে লইয়া আসিবেই। তাই বিপ্লবে ভাওতাবাজীর কোন দ্বার খোলা থাকে না- থাকে শুধু ব্যবস্থা বিশেষের মূল্যোৎপাটন - তা যে কৌশলেই হউক।


অনেকে মনে করেন অহিংসার রাজ্যে বিপ্লবী মহল কাজ করিতে পারে না। আমার মতে ধারণাটা ভুল। কারণ বিপ্লবী মন সব সময় অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মুখর - শুধু মুখের ভাষায়ই নয় স্থান-কাল-পাত্র ভেদে অস্ত্রের ভাষায়ও। কারণ, বৃহত্তর কল্যাণের প্রয়োজনে সে আশেপাশে অপারেশন চালাইয়া থাকে যেমনটি একজন দূরদর্শী ডাক্তার রোগীর একটি চক্ষু তুলিয়া ফেলিয়া অপরটিকে অক্ষত রাখেন। অবশ্য ইহাও সত্য যে বিপ্লবের নামে উদ্দেশ্যহীন ধ্বংস সাধন করিবার জন্য মহল বিশেষের আবির্ভাব ঘটিতে পারে। তবে তাহা একান্তই ক্ষণস্থায়ী হইয়া থাকে। খাঁটি বিপ্লবী দল তাহাদিগকে অচিরেই গ্রাস করিয়া ফেলিতে সক্ষম হয়। কিন্তু অহিংসার নামে সুবিধাবাদী মহল স্বার্থ উদ্ধার করিয়া সারিয়া উঠে এবং এমন কৌশলে জনতার ঘাড়ে চাপিয়া বসে যে অনেক মাশুলদান করিয়া তাহার কবল হইতে মুক্তি পাইতে হয়। তাই অহিংসায় ভালবাসার বাণী থাকিলেও তাহা কোনদিন বাস্তবায়িত হয় না। বিশেষ করিয়া ধনতন্ত্রবাদী সমাজব্যবস্থায় তাহা তো সম্ভব নয়ই। পক্ষান্তরে বিপ্লব যে আবেদন আর শক্তি লইয়া মানব সমাজে উপস্থিত হয়, তাহা আর কিছু বহন করুক বা না করুক -কুসংস্কার এবং শোষণের ধ্বংস প্রত্যক্ষভাবে লইয়া আসিবেই। তাই বিপ্লবে ভাওতাবাজীর কোন দ্বার খোলা থাকে না- থাকে শুধু ব্যবস্থা বিশেষের মূল্যোৎপাটন - তা যে কৌশলেই হউক।

 রাজনৈতিক আন্দোলনে গান্ধীর অহিংসা নীতি প্রসঙ্গে আমরা বহুবার তর্ক-বিতর্ক করিয়াছি। বিশেষ করিয়া কারাগারে বিভিন্ন মতাবলম্বী নেতৃবর্গের মধ্যে অহিংস তত্ত্ব লইয়া তর্ক বাধিয়া যাইতে দেখিয়াছি। অহিংসবাদী নেতাগণ বরাবরই সম্রাট অশোকের সাফল্য ও মহত্ত্বকে আমাদের সামনে তুলিয়া ধরিতেন। আমি তখন বলিতাম, আজও বলি - সম্রাট অশোক অহিংসা বলে যে সাম্রাজ্য ও শাসন কায়েম করিয়াছিলেন তাহার মৃত্যুর পর উহা কয়দিনই বা টিকিয়াছিল? তদুপরি সম্রাট অশোক যতটুকু সাফল্য অর্জন করিয়াছিলেন তাহার অন্যতম কারণ ছিল যুগের পরিবেশ। তৎকালে একে অন্যকে শোষণ করিবার রকমারি কৌশল আবিস্কার হয় নাই এবং প্রয়োজনও পড়ে নাই। তাছাড়া সম্রাট অশোকের নীতি ও ব্যবস্থাপনায় আন্তরিকতা এবং অভিনবত্ব ছিল বলিয়া তিনি জনসাধারণের আস্থাভাজন হইয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সবই ঝুট মনে হইয়াছিল। আমি এমন অনেক নেতার সাক্ষাত পাইয়াছি যাহারা ইসলামের নামে রাজনীতি করিতে নামিয়া অহিংসার দোহাই পাড়িয়া থাকেন। মওলানা মুহাম্মদ আলী ঐসব নেতাকে লেখায় ভাষণে খুব ধোলাই করিতেন। তিনি অসংখ্য নজীর তুলিয়া ধরিয়া প্রমাণ করিতেন যে ইসলাম যুদ্ধংদেহী নীতির স্বীকৃতিদান করিয়াছে। একার মওলানার এমনি একটি বক্তব্যের জবাবে গান্ধী তাঁহাকে লিখিয়াছিলেনঃ আপনার নবী সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তলোয়ার ধরিয়াছিলেন সত্য কিন্তু বিনা তলোয়ারে অর্থাৎ প্রেম দিয়া জয়লাভকে তিনি বেশী পছন্দ করিতেন ইহাও সত্য।


প্রকৃতপক্ষে মানুষের সুকুমার বৃত্তিকে জয় করিতে অহিংসা একটি মহৎ মাধ্যম হইতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনেতিক আন্দোলনের সহিত মানুষের যে ধরনের বৃত্তিসমূহ জড়িত থাকে সেগুলিকে জয় করিতে অহিংসার নয়,  মারমুখী কৌশলেরই প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে।


প্রকৃতপক্ষে মানুষের সুকুমার বৃত্তিকে জয় করিতে অহিংসা একটি মহৎ মাধ্যম হইতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক ও অর্থনেতিক আন্দোলনের সহিত মানুষের যে ধরনের বৃত্তিসমূহ জড়িত থাকে সেগুলিকে জয় করিতে অহিংসার নয় মারমুখী কৌশলেরই প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে। ইসলামের সবচেয়ে সফল খলীফা হযরত ওমরের চরিত্রে বিনয় ছিল বটে, কিন্তু তিনি যাহা অবলবম্বন করিয়া সাফল্য অর্জন করিয়াছিলেন তাহা আদৌ বিনয় নয়, শক্তি ও কঠিন্যই ছিল সেক্ষেত্রে সম্বল। অবশ্য শক্তি প্রয়োগের ব্যাপারে ইসলাম অত্যন্ত সুক্ষ্ম একটি নীতি নির্ধারণ করিয়া দিয়াছে। তাহা হইল বর্ণে বর্ণে ইনসাফ বজায় রাখা। স্বীয় কার্যক্রমের নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাহা বজায় রাখাও সম্ভব বটে। তবুও কেন যেন আমার মনে হয় রাসুলুল্লাহ (দঃ) যদি মক্কা বিজয়ের দিন নবী সুলভ ক্ষমা প্রদর্শন না করিতেন তবে ইসলামের গৌরবময় খিলাফত ত্রিশ বৎসরেই খতম হইয়া যাইত না। কারণ, এই ক্ষমার মধ্য দিয়াই মোনাফেক মুসলমান শোষণের প্রশ্রয় পায় এবং সময় বুঝিয়া মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। পক্ষান্তরে মক্কার ধনিক-বণিক এবং ক্ষমতালোভী ষড়যন্ত্রপ্রিয় সম্প্রদায় নিহত কিংবা নির্বাসিত হইলে অঙ্কুরেই সব ধ্বংসপ্রাপ্ত হইত।

অনেকে মনে করেন ইসলামের বিধান হইল শুধু আক্রান্ত হইলেই পাল্টা অভিযান শুরু করা যায়। কিন্তু মোটেই তাহা সত্য হইতে পারে না যদি সত্যিই ইসলাম মানুষের কল্যাণ সাধন করিতে চায়। এই দিক দিয়া কমিউনিষ্টদের কৌশল ও বিশ্লেষণ খুবই বাস্তবানুগ হইয়া থাকে। মহৎ উদ্দেশ্য লইয়া মহান আদর্শ কায়েম করিতে কমিউনিষ্টদের অভিযান তাই বিলম্বে হইলেও সর্বসাধারণে স্বীকৃত হয়। লেনিন ও মাও- সেতুঙ এই পরীক্ষা- নিরীক্ষায় সাফল্য অর্জন করিয়াছেন। পক্ষান্তরে গান্ধী ও টলষ্টয়ের অহিংসা দর্শন লইয়া শিক্ষিত মহলে উন্নতমানের একটি সেমিনার জমিতে পারে-সাম্রাজ্যবাদী, উপনিবেশবাদ, ধনতন্ত্রবাদী শাসন - শোষণের অবসানকল্পে সর্বহারা জনতার মুক্তিকল্পে কোন বাস্তব কর্মসূছী গ্রহণ করা যাইবে না। ডক্টর মার্টিন লুথার কিং মার্কিন নিগ্রোদিগকে প্রাণ দিয়া ভালবাসিয়াছেন ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু তাঁহার অহিংসনীতি নিগ্রোমুক্তি আন্দোলনের অনেক ক্ষতি করিয়াছে ইহাও সত্য। আমার মতে, চপেটাঘাতের বদলে পাল্টা চপেটাঘাত তো বটেই পারিলে পদাঘাতও করিতে হয়। মার্কিন ধনিক-বণিক সমাজ নিগ্রোদেরকে যেমনভাবে শাসন-শোষণ করিয়াছে তাহার দাদ উঠাইতে অহিংসার দর্শন হাস্যকর ব্যাপার বৈ কি! আব্রাহাম লিঙ্কন যত মহান প্রেসিডেন্ট হউন না কেন গৃহযুদ্ধ না বাঁধিলে চোখও হয়তো খুলিয়া যাইত না।


শিক্ষা-দীক্ষায় মুসলমানদের যতই অগ্রগতি হউক না কেন - বিপ্লবী অভিযানে তখন হইতেই তাহারা যেভাবে পশ্চাপদ হইয়া পড়িয়াছিল উহার প্রতিক্রিয়া আজ পর্যন্তও বর্তমান। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে সৈয়দ আহমদ বেরেলভী, শহীদ তীতুমীর, হাজী শরিয়তুল্লাহ প্রমুখ যে বিপ্লবের বাণী ছাড়াইতেছিলেন তাহা সেই শতাব্দীরই শেষভাগে স্তিমিত হইয়া শান্তশিষ্ট রূপ গ্রহণ করিয়াছিল। উহা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মানানসই ছিল বটে কিন্তু বিপ্লবী জাগরণের জন্য মোটেই যুৎসই ছিল না।


১৮৫৭ সালে এই উপমহাদেশে বিদ্রোহ সংঘটিহ হইবার পর স্যার সৈয়দ আহমদ মুসলমানদিগকে শিক্ষার পথ দেখাইয়া উপকার সাধন করিয়াছেন সত্য কিন্তু তৎসঙ্গে ইহাও মানিয়া লইতে হইবে যে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমমার্ধ নাগাদ এই জাতিতে যে বিপ্লব চেতনা বিরাজমান ছিল তাহা ভোঁতা হইয়া সংস্কারধর্মী চেতনায় রূপান্তরিত হইয়া পড়িয়াছিল। শিক্ষা-দীক্ষায় মুসলমানদের যতই অগ্রগতি হউক না কেন - বিপ্লবী অভিযানে তখন হইতেই তাহারা যেভাবে পশ্চাপদ হইয়া পড়িয়াছিল উহার প্রতিক্রিয়া আজ পর্যন্তও বর্তমান। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে সৈয়দ আহমদ বেরেলভী, শহীদ তীতুমীর, হাজী শরিয়তুল্লাহ প্রমুখ যে বিপ্লবের বাণী ছাড়াইতেছিলেন তাহা সেই শতাব্দীরই শেষভাগে স্তিমিত হইয়া শান্তশিষ্ট রূপ গ্রহণ করিয়াছিল। উহা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে মানানসই ছিল বটে কিন্তু বিপ্লবী জাগরণের জন্য মোটেই যুৎসই ছিল না। সৈয়দ আহমদ বেরেলভী পেশোয়ারে যে স্বাধীন রাষ্ট্র এবং খেলাফত কায়েম করিয়াছিলেন তাহাই হয়ত গোটা উপমহাদেশের মুক্তির জন্য কাজ করিয়া যাইতঃ সেই সংগঠনই হয়তো সর্বত্র বিপ্লবের বাণী ছাড়াইত। তাহা হইলে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হইত না এবং স্যার সৈয়দ আহমদকে সংস্কারমুখী হওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিত না। কিন্তু আফসোস, বিপ্লবী হইয়াও সৈয়দ আহমদ বেরেলভী বিশ্বাসঘাতক এবং মোনাফেক চক্রান্তকে অহিংসার বাণী শুনাইলেন এবং ক্ষমার চোখে দেখিলেন। অবশেষে মুষ্টিমেয় কয়েকজন বিশ্বাসঘাতক রাতারাতি শত শত বিপ্লবী কর্মীকে হত্যা করিয়া এই উপমহাদেশে বিপ্লবী জাগরণের কবর রচনা করিয়াছিল। যে যাহাই বলুন না কেন সৈয়দ আহমদ বেরেলভীর সাময়িক দুর্বলতা অর্থাৎ মোনাফেক আফগানদের প্রতি অহিংসা প্রদর্শন গোটা উপমহাদেশের রাজনৈতিক পটভূমি বদলাইয়া ফেলিয়াছিল বলিয়া আমি বিশ্বাস করি।

যাহোক আমি ইতিহাসবেত্তা নাই, রাজনৈতিক আন্দোলনের ভাষ্যকারও নই। আমি হাড়ে হাড়ে রাজনীতিবিদ থাকিতে চাই এবং অহিংসার বাণীতে নয় বিপ্লবের মন্ত্রে উদ্দীপিত হইয়া আন্দোলন চালাইয়া যাইতে চাই। ইতিহাসের পাতায় স্থান-কাল পাত্র ভেদে অহিংসার বাণী যেভাবে ব্যর্থ বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছে এখানে তাহার প্রতি ইঙ্গিত করিলাম মাত্র। তবে যে পরিমণ্ডলে আমি রাজনীতি করি তাহার অনুসারীদের প্রতি আমার অনুরোধ - আপনারা অহিংসার মন্ত্রে গদগদ হইয়া যাইবেন না। তাহা হইলে বিপ্লবী চেতনা হারাইয়া ফেলিবেন। তখন খুব বড় জোর একজন সৌখিন দেশপ্রেমিক সাজিতে পারিবেন - সর্বহারা জনতার জন্য কাজের কাজ কিছুই করিত পারিবেন না।

(মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ‘হক-কথা’, শুক্রবার ৩রা চৈত্র ১৩৭৮; ১৭ মার্চ ১৯৭২)

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।