“টেলিভিশন”: সিনেমার গল্পের সমস্যা


মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর সিনেমা ‘টেলিভিশন’ রিলিজ হয়েছে সম্প্রতি সিনেমা হলে। কিছু তরুণ বন্ধুদের উৎসাহে শুক্রবার সকালে দশটায় অর্থাৎ প্রথম দিনের প্রথম শো দেখতে গিয়েছিলাম। দর্শকরা ছবিটি কিভাবে নেয়, কি ধরণের প্রতিক্রিয়া জানায় ইত্যাদি জানার দিক চিন্তা ভাবনা করে বন্ধুরা বলাকা হল বেছে নিয়েছিল।

সে হিসাবে যথারীতি সকালে যাওয়া। গিয়ে দেখা গেল টিকেটের চাহিদা এত বেশি যে বলাকা-২ বা আগের নাম বিনাকা হলে, তাও ব্যালকনি নয়, নীচতলার টিকেট পাওয়া গেল। সকাল দশটার আগেই হাউসফুল বোর্ডও টাঙানো হয়েছিল দেখেছিলাম। সকাল নয়টার দিকে বাসা থেকে রওয়ানা দেবার সময় ভেবেছিলাম এই শৈতপ্রবাহের সকালে নিশ্চয় হলে গিয়ে দেখব ভীড় তেমন নাই। দর্শকেরা হয়ত পরের শোগুলোতে ভীড় করবে। কিন্তু সিনেমা শুরু হবার এক ঘন্টার বেশি আগে পৌঁছে গিয়েও দেখি তরুণ আর তরুণ -অর্থাৎ আমার অনুমান একেবারেই ভুল। সেই আশির দশকের পরে আর বাংলাদেশের সিনেমা হলে যাওয়া হয়নি নানান কারণে, কেবল মাস ছয়েক আগে বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে গিয়েছিলাম এক বার। যে হিসাবে তরুণ বলছি তাদের জন্ম সেই আশির দশকে। সিনেপ্লেক্সের তুলনায় বলাকা চত্তরে একটা বাড়তি সুবিধা পেয়েছিলাম। লাইনে দাঁড়ানো হবু দর্শক সকলকে সহজেই এক ক্যামেরার চোখে একবারে ধরে দেখে বোঝার একটা সুবিধা ছিল সেখানে। বুঝেছিলাম দর্শকেরা প্রায় সবাই স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ধরণের। নতুন প্রজন্ম। অনুমানে মনে হলো, বড় জোর এর দশ ভাগ হবে তরুণী। একটা প্রাথমিক ভাল লাগাও কাজ করেছিল তাদের সকলের উৎসাহের কথা ভেবে যে, ফারুকী ও তার দলবল তরুণদের মাঝে অন্তত এইটুকু জনপ্রিয়তা বা আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে যে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এবং কনকনে শৈত্যপ্রবাহের এই সাতসকালে গরম-ওম ফেলে তারা সিনেমা হলে ছুটেছে। এসব দিক, ব্যাখ্যা নিয়ে ভাবছিলাম। ফলে একটা ভাল লাগাও কাজ করেছিল এই ভেবে যে এই প্রজন্মের কিছু অংশের সাথে বসে সিনেমাটা উপভোগ করা যাবে। দুঘন্টার সিনেমা, তাই একটু ঢিলেঢালা সময় জ্ঞানে, এগারোটায় সিনেমা শুরু হয়েছিল।


দর্শকেরা প্রায় সবাই স্কুল-কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ধরণের। নতুন প্রজন্ম। অনুমানে মনে হলো, বড় জোর এর দশ ভাগ হবে তরুণী। একটা প্রাথমিক ভাল লাগাও কাজ করেছিল তাদের সকলের উৎসাহের কথা ভেবে যে, ফারুকী ও তার দলবল তরুণদের মাঝে অন্তত এইটুকু জনপ্রিয়তা বা আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে যে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে এবং কনকনে শৈত্যপ্রবাহের এই সাতসকালে গরম-ওম ফেলে তারা সিনেমা হলে ছুটেছে।


এর আগে বাংলাভিশন টিভিতে চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে ঘটনাচক্রে ‘টেলিভিশন’ নিয়ে প্রচারিত প্রায় এক ঘন্টার প্রমো-টা দেখেছিলাম। সেখানে সিনেমার গানগুলো সিনেমার কলাকুশলীসহ উপস্থাপন করা হয়েছিল। এরও আগে ‘টেলিভিশন’ টিমের কোরিয়া সফর সম্পর্কে যেসব মিডিয়া রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল তা দেখেছিলাম। এটুকু ছিল আমার পূর্ব ধারণা অথবা পুঁজি, যা নিয়ে সেদিন সিনেমা হলে গিয়েছিলাম। যদিও এ থেকে কী নিয়ে এই সিনেমা সে কাহিনীর খোঁজখবর রাখিনি। আবার ঠিক কি নিয়ে একটা সিনেমা দেখতে এসেছি, কি দেখব এখানে বিশেষ তেমন প্রত্যাশাও কাজ করেনি। এসব না থাকলেও, ফারুকী ও তার দলবল কি ভাবছে, কি করছে এখন, তা বুঝবার দেখার একটা সুযোগ, ফলে সে নিয়ে একটা ভাল কৌতুহল অবশ্যই ছিল।

কা হি নী  সং ক্ষে প

যারা ছবিটি দেখেন নি, (কিম্বা দেখবেন না, তাদের সুবিধার জন্য সারকথায় গল্পটি পেশ করছি। তবে এক্ষেত্রে আমাকে সহায়তা করেছেন আমাদের আরেকজন তরুণ ছবি পরিচালক, তাসমিয়া আফরিন মৌ। তাঁর বয়ানে গল্পটা হচ্ছে এরকমঃ

টেলিভিশন - এই গল্পের শুরু এমন এক গ্রামে যেখানে নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কোন উপায় নেই। সেই গ্রামে ইন্টারনেট চাট করে তরুণেরা কেউ তবে টেলিভিশন প্রবেশের অনুমতি নেই। গ্রামের চেয়ারম্যান ধার্মিক পরহেজগার যার একচ্ছত্র আধিপত্যে গ্রামে টেলিভিশন দেখা বা কেনার অনুমতি কারো নেই। তবে মুসলমান ছাড়া অন্য কোন ধর্মের মানুষ টেলিভিশন কিনলে নীতিগত কারণে তাকে বাধা দিতে পারে না কারণ, তার ধর্মে “টেলিভিশন” দেখায় নিষেধ নেই।

গল্পের শুরুতে একজন টেলিভিশন সাংবাদিক (বাংলাভিশন) এই চেয়ারম্যানের (রুমি) সাক্ষাৎকার নিতে আসে যার সাথে চেয়ারম্যান জবাব দিয়ে অস্বস্তিতে পড়েন। তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। পরিস্থিতি খারাপ জায়গায় যেতে পারে তাই সাক্ষাতকার শেষ করে দেয়া হয়। দেখা যায় চেয়ারম্যান আবার প্রথম আলো পত্রিকা পড়েন, যেখানে ছবিসহ বিজ্ঞাপনগুলো আগেই সাদা কাগজ দিয়ে চেয়ারম্যানের সহচর ঢেকে দিয়েছে। চেয়ারম্যান একজন খুবই ভালো মানুষ, তার এলাকায় জনপ্রিয় এবং সবাই তার কথা মান্য করে। চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলে সুলেমান (চঞ্চল) প্রেম করে সেই গ্রামের এক উচ্চ মধ্যবিত্ত প্রবাসী ব্যক্তির কন্যা কোহিনূরের (তিশা) সাথে, যে কম্পিউটার চালনায় দক্ষ। সুলেমান বাবার কথার বাধ্য ছেলে, বাবার প্রতি তার সর্মথন আছে। বাবার ব্যবসা দেখা শোনা করলেও তার মোবাইল ফোন কেনার অনুমতি নেই। সুলেমানের কর্মচারি ও সহকারী মজনু (মোশাররফ) ট্রিকস খাটিয়ে চেয়ারম্যান বাবার কাছ থেকেই মোবাইল কেনার অনুমতি পাইয়ে দেয় সোলেমানকে। আবার মজনু ছেলেবেলা থেকে কোহিনূরের খেলার সাথী ছিল। সে মনে মনে কোহিনূরকে ভালোবাসে, এক সময় তাকে বলেও ফেলে। অন্যদিকে সুলেমানের সাথে কোহিনূরের প্রেমে নিয়মিত সহায়তা করলেও, মজনু নানাভাবে কোহিনূরকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।

ঝামেলা বাধে সেই গ্রামে এক হিন্দু শিক্ষক টেলিভিশন নিয়ে প্রবেশ করলে। হিন্দু ধর্মে টেলিভিশন দেখার কোন সমস্যা নেই, এই ধারণার কারণে চেয়ারম্যান অনেক ভেবেচিন্তে তাকে বাধা দেয় না। তবে শর্ত দেয়, কোন মুসলমান তার বাসায় টেলিভিশন দেখতে যেতে পারবে না। পরবর্তীতে হিন্দু শিক্ষক এই শর্ত মেনে চলতে পারে না দুইটি কারণে। এক. গ্রামের মানুষের অত্যাধিক আগ্রহের জন্য চাপ তৈরী হয়। দুই. তার কোচিং সেন্টার টেলিভিশনের আকর্ষণে জমজমাট হয়ে উঠে।

মুসলমানরা হিন্দু শিক্ষকের বাসায় টেলিভিশন দেখতে যায় এই খবর পেয়ে চেয়ারম্যান সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে সেখানে যায়। সেই টেলিভিশনের নিয়মিত দর্শক কোহিনূর সেখানে ওদিনও উপস্থিত ছিল। বেয়াদবির অপরাধে সবার সামনে কোহিনূরকে কান ধরে উঠবস করায় চেয়ারম্যান। এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে কোহিনূর প্রথমে সুলেমানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়, পরে সুলেমানকে শর্ত দেয় টেলিভিশন কিনে বাবার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে সে সম্পর্ক মূল্যায়ন করবে।

সুলেমান বাধ্য হয়ে তাই করে। বাবার লোকজনের সাথে তারা মারামারি হয়। চেয়ারম্যান পিছু হঠে। আবার পরে সুলেমানের অপরাধবোধ তৈরী হয়, সে মাফ চায়, তার বাবা তাকে মাফ করেও দেয়।

ওদিকে চেয়ারম্যান হ্বজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু পাসপোর্টের জন্য ছবি তুলতে হবে বলে তিনি খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে ম্রিয়মান হয়ে থাকেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ছবি তুলে পাসপোর্ট করেন কিন্তু ঢাকায় এসে বুঝতে পারেন তিনি হ্বজ এজেন্সি দ্বারা প্রতারিত হয়েছেন। তিনি যেতে পারছেন না। মনভাঙ্গা সেই পরিস্থিতিতে বাড়িতে না ফিরে তিনি এক হোটেলে খানাদানা বন্ধ রেখে পড়ে থাকেন। তার ম্রিয়মানতা ভাঙ্গে ‘লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’ ধ্বনি শুনে। পাশের রুমের টেলিভিশনে তিনি হজ্জ্ব দৃশ্য দেখতে পান। তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে হোটেলে নিজের রুমের টেলিভিশন ছাড়েন এবং কাঁদতে কাঁদতে টেলিভিশনের সাথে গলা মেলান। নিজেকে সমর্পন করে দেন বোকা বাক্সের আদর্শে। এই হোল মোটামুটি গল্প।

ঝা প সা  ফো কা স  বা  বি ষ য় নি ষ্ঠা হী ন গ ল্প

telviison_1

আসলে কি ছবিটি টেলিভিশান নিয়ে? অর্থাৎ টেকনলজির সঙ্গে প্রাচীন ও সংরক্ষণশীল মনের সংঘাত, নাকি ত্রিভূজ প্রেমের কাহিনীটাই এখানে আসল গল্প !


ছবি তোলা বা টেলিভিশন দেখা ঠিক না – এক প্রত্যন্ত গ্রামের চেয়ারম্যান এক বয়স্ক মুরুব্বীর এই মুল্যবোধের সঙ্গে একালের অবারিত মিডিয়ার – এই দুই এর সংঘাতকে অনুষঙ্গ করে আবর্তিত হতে চেয়েছে সিনেমার কাহিনী। এক বাক্যে এভাবে বললাম বটে, কিন্তু লিখতে গিয়ে টের পাচ্ছি এক বাক্যে এটা বলা কতটা ঠিক হচ্ছে। দ্বিধা আমার নিজের, কিন্তু ভেবে দেখলে দ্বিধার উৎস আমি নই। কারণ, সিনেমায় এটা স্পষ্ট যে গল্পকার বা পরিচালক গল্পের ফোকাস বা নিষ্ঠা অস্পষ্ট করে ফেলেছেন। চেয়ারম্যানের মনের বা বিশ্বাসের সংঘাতের জায়গাটিকে মুখ্য করে রাখতে পারেননি, ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় সেই ফোকাসটা থাকেনি। তাছাড়া বিজ্ঞান বা টেকনোলজির সঙ্গে ধর্মের দ্বন্দ্ব খুবই ক্লিশে, প্রাচীন ছকে বুঝেছেন, আর সেভাবেই মীমাংসা করেছেন। ছবি এই দ্বন্দ্বকে নতুন কোন দিক থেকে আমাদের বুঝতে সহায়তা করে নি।

চেয়ারম্যান গ্রামের কাউকে টেলিভিশন দেখতে দেন না – এই পটভুমির উপর দাঁড়িয়ে আরেকটি আলাদা গল্প এখানে আছে। চেয়ারম্যানের ছেলে সুলেমান (চঞ্চল), তাঁর প্রেমিকা (তিশা) আর ওদিকে বাসার বা ব্যবসায়ের কর্মচারী (মোশাররফ) এই তিনজনের ট্রয়কা প্রেমও সিনেমার মধ্যে গল্পের মুখ্য ফোকাস হয়ে উঠেছে। এই উপ-গল্প ও চরিত্র তিনটা এত সময়, বিস্তার ও ট্রিটমেন্ট পেয়েছে যে মনে করার কারণ ঘটেছে যে এটাই গল্পের ফোকাস। আবার ওদিকে গল্প শেষ হচ্ছে - চেয়ারম্যানকে নিজের মুল্যবোধ বা বিশ্বাস ধরে রাখতে অক্ষমতার পরিবেশে ফেলে দিয়ে; হ্বজে যাবার জন্য আপোষ করে নিজের ছবি তোলা আবার প্রতারিত হয়ে হ্বজে না যেতে পেরে টিভিতে হ্বজ দেখে লাব্বায়েক লাব্বায়েক ধবনিতে শতচ্ছিন্নে ভেঙে পড়ার ভিতর দিয়ে। ফলে চেয়ারম্যানের আত্ম-সংঘাত কি গল্পের ফোকাস? না কি এটা কেবল গল্পের পটভুমি, যে-পটভুমিতে দাঁড়িয়ে অন্য এক প্রেমের গল্প আছে, সেটাই গল্পের মুল বিষয় – এই দুই এর মধ্যে গল্পের ফোকাস দোল খেয়ে ফিরেছে। কোথাও তা স্থির হয়ে বসতে পারেনি, কিম্বা দুই গল্পের মধ্যে কোন শক্ত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি।

ফলে লিখতে গিয়ে আমিও দ্বিধায়। এই দ্বিধা বেশ জটিল। সমস্যাটা সিনেমা দেখার অর্ধ সময়ের পর বা ইন্টারভ্যাল থেকেই টের পাচ্ছিলাম। কারণ ততক্ষণে পরিস্কার হয়ে গেছে, চেয়ারম্যানের চরিত্র ও তার সংঘাত – সেই দিকে গল্প বিস্তারের আর সময় নাই, এই দিকটি আর উপযুক্ত ট্রিটমেন্ট পাবে না। সেই সুযোগ আর গল্পকার পাবেন না বা নিবেন না। অথচ গল্প শেষ হচ্ছে যেখানে সে অনুসারে এটাই গল্পের ফোকাস। সার কথায় চরিত্রটা উপযুক্ত ট্রিটমেন্ট পায়নি।

কোন গল্প সাজানোর সময় সেটা নানা দিকে যেতে পারে, নানান বিস্তারে যেতে হয়, একটা পরিস্থিতি তৈরীর প্রয়োজন থাকে। কোন দিকটায় গল্প কতটুকু বিস্তার হবে তা নির্ভর করে গল্পকার কোনটা ফোকাস করতে চাইছেন তার উপর, সেই প্রয়োজন দ্বারা নির্ধারিত। টিভি সিরিয়ালের তুলনায় সিনেমার ক্ষেত্রে এটা মেনে চলতেই হয়। গল্পের ফোকাস বিচারে সিরিয়ালে প্রত্যেক পর্বেই আলাদা আলাদা ফোকাস চাইলে রাখা সম্ভব। আর সিরিয়ালে পর্ব কয়টা হবে, সেই হিসাবও কিছু অদলবদল করা চলে। তার সীমার বাঁধন অন্তত সিনেমার মত ২-৩ ঘন্টা মেপে সীমাবদ্ধ নয়। ফলে গল্পের ফোকাস বিচারে সিনেমার স্ক্রিপ্ট সাজাতে হয় একটা কিছুকে মুখ্য দৃষ্টিনিবদ্ধ করে।

তবুও ধরে নেয়া যাক, ‘টেলিভিশন’ সিনেমার -স্ক্রিপ্টের ফোকাস হিসাবে গল্পকারের মনে চেয়ারম্যানই ছিল মূল। কিন্তু এই ধরে নেয়া নিয়ে আমরা বেশিদুর অগ্রসর হতে পারি না। সেক্ষেত্রে প্রধান গরমিল বেঁধে যায় মোশাররফের চরিত্রটা। কারণ এই চরিত্র সেক্ষেত্রে একেবারেই নাও যদি থাকে তাতে গল্প ও তার ফোকাসের কোন সমস্যা হয় না। অথচ উলটা, মোশাররফের চরিত্রটা যথেষ্ট গুরুত্বপুর্ণ ও বড়। এটাকে যথেষ্ট প্রমিন্যান্ট একটা চরিত্র করা হয়েছে। এবং এমনভাবে তা করা হয়েছে যে মনে হয়েছে, চঞ্চল যদি তিশার প্রেমিক হতে পারে তবে কোন যুক্তিতে মোশাররফও সমান প্রতিদ্বন্দ্বী ও যোগ্য প্রার্থী নয়। নায়িকার সাথে তার সম্ভাব্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রেমিক হিসাবে বরং মোশাররফকেই বেশি যোগ্য করে দেখানো হয়েছে। ফলে এতে দর্শকের মনে সাজেশন দেয়া হয়েছে যে, এর একটাই কারণ মোশাররফের সোশাল ক্লাস, সোশাল ক্ষমতা চঞ্চলের চেয়ে নীচে। ফলে গল্পের একটা নতুন ডাইমেনশন এখানে তৈরি হয়েছে। অথচ কেন এই গুরুত্ব, মুল ফোকাসের বাইরে এই বিস্তার - এর কোন প্রাসঙ্গিকতা ছবিতে হাজির নাই। ফলে মোশাররফ চরিত্র হয়ে গেছে উদ্দেশ্যবিহীন। অন্যভাবে বললে, এই দিকটাকে প্রমিন্যান্ট করার কারণে স্ববিরোধী একটা ইঙ্গিত তৈরি হয়েছে যেন এটা গল্পের ফোকাস। ফলে গল্পের ফোকাস চেয়ারম্যান চরিত্রের সাথে তুলনায় মোশাররফ চরিত্র বিস্তারে, ট্রিটমেন্টে অন্যায্য ও অসামঞ্জস্য চোখে ভাসে। কমবেশি একইভাবে আবার দিশা ও সুলেমানের (চঞ্চলের) সম্পর্ককেও কখন গল্পের মুল বিষয় মনে হয়েছে। সেক্ষেত্রে চেয়ারম্যান ও মোশাররফ এই দুই চরিত্রের কোনটাকেই এমন প্রমিন্যান্ট ও ডিটেইল করার কোন কারণ থাকে না। এই দিক থেকে ফিল্ম হিশাবে ছবিটি দেখতে বসে একটা বড় অস্বস্তি টের পাওয়া গেছে। এটা গল্পকার কেন করলেন তার ব্যাখা খুঁজে পাওয়া যায় না।

তবু গল্পকার গল্পের ফোকাস ঠিক রাখতে পেরেছিলেন কি পারেন নি সে প্রশ্ন উহ্য রেখে বলা যায় খুব সম্ভবত তিনি ভেবেছিলেন, চেয়ারম্যান কেন্দ্রিক চরিত্র ও তাঁর সমস্যাটাই গল্পের ফোকাস। অনুমান করছি গল্পকার এটাই চেয়েছিলেন। নইলে নামও দেবেন কেন ‘টেলিভিশন? নাম দিতে পারতেন ত্রিমুখী প্রণয় বা এইরকম কিছু।


three

তিন জনের মধ্যে প্রেম, প্রতিযোগিতা আর সংঘাতের ব্যাপারটাও ছকের ব্যাপার মনে হয়েছে। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের নতুন কোন দিক নজরে পড়ে না, বা আমাদের ভাবায় না। 


গ ল্পে র  দ্ব ন্দ্ব  বা ক ন ফ্লি ক্ট

মানুষের ছবি তোলা ঠিক না এই অর্থে টেলিভিশন দেখা ঠিক না এমন বিশ্বাসে বিশ্বাসী একজন বয়স্ক মানুষের সমস্যা আছে ছবিতে। এই মানুষ সামাজিক দিক থেকে প্রতিপত্তিশীল, ফলে যে গ্রামের তিনি চেয়ারম্যান সেই গ্রাম টেলিভিশন-শূন্য। সেখানে কাউকেই টেলিভিশান দেখতে দেওয়া হয় না। এই বাক্য পড়ে পাঠক বা দর্শক তৎক্ষণাৎ প্রশ্ন করবে – তো? তো এনিয়ে পরিচালক কী বলতে চান? এর মানে হলো, পাঠক বা দর্শক জানতে চাইছেন গল্পের দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্টটা অথবা গল্পে তুলে আনা সমস্যাটা কি নিয়ে। এই সমস্যাটাকে গল্পকার বা পরিচালক কি করে ট্রীট করেছেন? আমাদের আজকের আধুনিক জীবনের সাদা চোখে, ছবি তোলা ঠিক না এই অর্থে টেলিভিশন দেখা ঠিক না -এতটুকু যদি কাউকে বলি - এমন ধারণা শুনলে আমরা বলব এটা একটা অচল ধারণা, (সিনেমা শেষে পরিচালকও যেটা প্রমাণ করেছেন যে চেয়ারম্যান একটা ‘অচল মাল’)। কিন্তু সমস্যা হলো, এটা তো একটা সহজ স্বতঃসিদ্ধ ষ্টেটমেন্টে। দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট কই? একটা ‘অচল মাল’ দেখিয়ে আর কতটুকু দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট টেনেটুনে হাজির করা যাবে? সিনেমার গল্পে দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট - সেখান থেকে টান টান টেনশন – চাইলে টেনশনের আরও টুইষ্ট বা মোচড় - আর শেষে সে টেনশনের নিরসন তৈরি করে সিনেমা্র গল্প বানানো হবে। তবে নির্দ্বিধায় বলা যায়, গল্পকার-পরিচালক এই প্রশ্ন মোকাবিলা করতে গিয়ে আগেই ধরে নিয়েছেন, টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বটা হলো, ‘ধর্মের কুপমন্ডুকতা বনাম প্রগতিবাদিতা’ এমনই সরল অর্থাৎ ব্যাপারটা সেই পুরানা সেকুলারিজম বনাম ইসলামের দ্বন্দ্ব। আর এই দ্বন্দ্বের সরল সমাধান আমরা জানি, তা হলো ইসলামের উপরে আধুনিকতার বিজয়। যেন গল্প-স্ক্রিপ্ট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে গল্পকার বা পরিচালক কুপমন্ডুকতার উপর সেকুলারিজমের বা আধুনিক জীবনের বিজয়ের ওপর এক গাথা লিখে ফেলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটা একটা ক্লিশে বিজয়গাথা বা প্রপাগান্ডা হতে পারে – নতুনদিনের নতুন ভাবনার সিনেমা হবে কি না, সেটা সন্দেহ। এই ধরনের ক্লিশে জিনিস দিয়ে পুরানা ভাবনাকে নতুন ভাবে ঘটনার বিন্যাসের মধ্য দিয়ে ভিন্ন ভাবে দেখাবার আগ্রহ তৈরী করবে না। পুরানা জিনিসই মনে হবে। ঘটনাকে নতুন করে দেখবার, দেখানোর আগ্রহ তৈরি করবে না।

ছবি দেখার পর আমাদের অনেকে বলছিলেন, একালে টেলিভিশন দেখা যাবে না -এমন বয়ান আকড়ে ধরে থাকার লোক কি আছে? আবার যদি ধরে নেই কোনাকাঞ্চি কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুএকজন রয়ে গেছেন তাহলে সেই চেয়ারম্যান আবার ‘দৈনিক প্রথম আলো’ পড়েন কিভাবে? ধর্মচিন্তা, নীতিনৈতিকতা বা সুনির্দিষ্ট ভাবে ইসলাম সম্পর্কে কিছু বদ্ধমূল ধারণারই উদ্গীরণ ঘটেছে চেয়ারম্যানের চরিত্রে। সিনেমায় চেয়ারম্যান চরিত্র আমাদের কাছে তুলে ধরবার জন্য দেখান হচ্ছিল যে পত্রিকায় ছাপা এড জাতীয় ছবিগুলোর উপর ছোট সাদা কাগজের তালি দিয়ে ঢেকে তিনি পত্রিকা পড়েন। যুক্তির দিক থেকে হয়ত কথা সত্যি। তবুও মেনে নিতে রাজি যে রেয়ার ও ব্যতিক্রম চরিত্র নিয়েও তো গল্পস্ক্রিপ্ট হয়। এমনকি কাল্পনিক এমন রেয়ার চরিত্র বানিয়ে নিয়েও ভাল স্ক্রিপ্ট হতে পারে। সেটা কোন বড় সমস্যা নয়। আর সিনেমায় চুলচেরা বাস্তবতা খোঁজার চেয়ে গল্প কি বলতে চায় তা মোটামুটি ধরা গেলেই চলে; তাতে সবকিছু খাটি রিয়েলিসটিক না হলেও দর্শক সেসব ত্রুটি উপেক্ষা করে গল্প বুঝতে রাজি থাকে বলেই আমার ধারণা। ফলে এটা কোন বড় পয়েন্ট নয়। কিন্তু একালে টেলিভিশন দেখা যাবে না এমন রেয়ার ও ব্যতিক্রমী বয়ানধারী চরিত্র হাজির করে যদি শেষে তাকে একটা ‘অচল মাল’ বলে নাকচ করে দেয়া হয় তাহলে তা গল্প হওয়া খুবই কষ্টকর। ‘ব্যতিক্রমী লোক অচল’ এটাই তো স্বতঃসিদ্ধ। তাহলে সেখান থেকেই গল্প-স্ক্রিপ্ট কতটুকুই বা আগাবে, বের হবে? অন্যভাবে বললে, সিনেমার গল্প-স্ক্রিপ্টে এক বা একাধিক দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট - সেখান থেকে টান টান টেনশন - আর শেষে সে টেনশনের নিরসন -এভাবে মোটাদাগে কোন গল্পের একটা মৌলিক কাঠামো থাকে ধরে নিলে, সেক্ষেত্রে ‘ব্যতিক্রমী লোক অচল’ এমন স্বতঃসিদ্ধ ধারণার উপর দাঁড়িয়ে ও থেকে আবার দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট বের করা আসলেই কঠিন। কারণ স্বতঃসিদ্ধ ধারণা মানে আগেই যা নিরসিত, ফলাফল আগেই নির্ধারিত। দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট বের করার আগেই এটা ছিবড়া। স্ক্রিপ্ট ন্যারেশন করতে করতে কনফ্লিক্ট–টেনশন-নিরসন এভাবে ধাপে ধাপে না হয়ে নিরসিত দ্বন্দ্ব দিয়ে শুরু করা মানে আগেই গল্পকে হত্যা করা বা এর আর গল্পমুল্য নাই না বললেও এর গল্পমুল্য আগেই দুর্বল হয়ে থাকে। তাই ঘটেছে এখানে।

ছ বি র  ভি লে ন  কে ?  না  থা কা র  স ম স্যা

দর্শকের চোখে ভিলেন বা নেতি চরিত্র যদি সবল ঘৃণা তৈরি করতে পারে তবে গল্পকার সার্থক। দর্শকের জন্য সেক্ষেত্রে উপযুক্তভাবেই ভিলেন বা নেগেটিভ চরিত্র ঘৃণিত। কিন্তু গল্পকারের কাছে? তাঁর কাছে ঘৃণিত আর প্রিয় বলে কিছু নাই; কারণ নেগেটিভ চরিত্র নির্মাণ আর নায়ক বা পজিটিভ চরিত্র নির্মাণ তার কাছে একই কথা, একই কাজের দুই দিক। কোনটাই তার কাছে এতটুকু কম গুরুত্বের নয়। অন্যভাবে বলা যায়, শক্ত নেগেটিভ চরিত্র নির্মাণ করতে পারলে একমাত্র তখনই তুলনায় এবং বিপরীতে পজিটিভ চরিত্রটা ততই শক্তপোক্ত হয়। নেগেটিভ চরিত্র যত শক্তপোক্ত তা ততটাই বিপরীত চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলে, জেগে উঠবার শর্ত তৈরি করে। অনেকটা পরিমিত মাত্রার সাদা-কালোর কনট্রাস্টের মত। নেগেটিভ চরিত্র নির্মাণের সময় তাঁর পক্ষে সম্ভাব্য সমস্ত ন্যায্যতা, শক্ত যুক্তির অভাব খামতি ঘটলে সব শেষ। এর কারণে, কোনভাবেই এ থেকে পজিটিভ চরিত্র দাঁড়াবে না, গল্প-স্ক্রিপ্টও মাঠে মারা যেতে বাধ্য। এটা মনে করা বেকুবি যে যেটা নেগেটিভ চরিত্র সেই চরিত্র তো শেষে পরাজিতই দেখানো হবে; তাহলে আর এর মুখের ডায়লগে সম্ভাব্য পুঙ্খানুপুঙ্খ সব যুক্তি, বিবেচনা পরিস্থিতি দেবার দরকার কী? না, বরং নেগেটিভ চরিত্রের পক্ষে সম্ভাব্য পুঙ্খানুপুঙ্খ সব যুক্তি, বিবেচনা পরিস্থিতি – এক কথায় আপাত ন্যায্যতাগুলো থাকার পরও পালটা একটার পর একটা তা নাকচ করার একটা প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়েই একমাত্র পালটা চরিত্রটা ইতিবাচক বা নায়ক হয়ে উঠে। ফলে কোনটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক চরিত্র হবে এটা স্রেফ গল্পকার বা পরিচালকের আগাম ধরে নেবার বিষয়ই নয়। পরতে পরতে নির্মাণ করার বিষয়। এক অর্থে গল্পকার অর্থাৎ ভিজুয়াল গল্পকার মানে মানুষের মনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, কষ্ট-সুখ, ভাল লাগা-মন্দ লাগা ইত্যাদি নিয়ে সফল মুন্সিয়ানায় খেলা করতে পারা। এটা কোনভাবেই গল্পকারের নিজেই কেবল দর্শক হয়ে যাওয়া নয়। গল্পকার যদি আগেই ধরে নেয়, চেয়ারম্যান চরিত্র তো ঘৃণিত এক রক্ষণশীল ‘এযুগের অচল মাল -যেটা গল্পকার করতে পারে না -ফলে ঐ চরিত্রের পক্ষে আর শক্ত সাফাই জাষ্টিফিকেশন কি থাকতে পারে তো -সেক্ষেত্রে তিনি আর গল্পকার নয়, বড়জোর তিনি একজন কেবলই দর্শক। বলা বাহুল্য এতে স্ক্রিপ্ট-সিনেমার ওখানেই মৃত্যু।


tinjon

ভিলেন কে ছবির? বা যার বিপরীতে প্রধান চরিত্র অর্থবহ হয়ে ওঠে?


যেমন ‘টেলিভিশন’ গল্পে নেগেটিভ চরিত্র কে? চেয়ারম্যান? আর বিপরীতে পজিটিভ চরিত্র তার ছেলে সুলেমান? কিংবা সুলেমানের উপর শর্ত বা প্রণোদণাদাত্রী হিসাবে নায়িকা? সিনেমায় কোনটাই একেবারে স্পষ্ট নয়। তবে আকার ইঙ্গিত আছে মাত্র। আবার, চেয়ারম্যান কি নৈতিক বা মরাল দিক থেকে কোথাও স্খলিত? মোটেও না। কোথাও কোন দৃশ্যে তিনি তা নন। তার একটাই অপরাধ তিনি একটা ভ্যালু অথবা বিশ্বাস যেভাবে বুঝেছেন তাতে অটল। এভাবে তো নেগেটিভ চরিত্র গড়া কঠিন। বিপরীতে, ওদিকে সুলেমান? সে কি কোন সুনির্দিষ্ট ভ্যালু অথবা বিশ্বাস লালন বা ধারণ করে? মোটেই না, এমন কোন লক্ষণও নাই। আর নৈতিক বা মরাল দিক থেকে সে চেয়ারম্যানের ধারে কাছে নয়। বরং তুলনায় কার্য-স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অন্ততপক্ষে সে একজন ম্যানিপুলেটর; সে ছলনা বা মিথ্যা আশ্রয়ী। এর চেয়েও বড় কথা সে চেয়ারম্যানের বিপরীতের নতুন সমাজের একজন ভোক্তা কনজুমার কেবল, এবং বাছবিচারহীন, কর্তাসত্ত্বাহীন। ফলে এই চরিত্র নেগেটিভের চরিত্রের তুলনায় খাটো, মোটেও পজিটিভ নয়। সে ভাবেও নির্মিত হয়নি। করা কঠিনও। অথচ আকার ইঙ্গিতে এটাকে ইতিবাচক বলার চেষ্টা আছে মাত্র।

ওদিকে চেয়ারম্যান চরিত্রের পরিণতি হলো, অচল মাল, সমাজের সাথে আনফিট । তিনি কম্প্রোমাইজ করে হ্বজে যাবার টেকনিক্যাল কারণে ছবি তুলতে বাধ্য হচ্ছেন আবার হ্বজ কোম্পানীর শঠতায় পড়ে যেতে পারেন নাই, চিটেড হয়েছেন। কিন্তু এসব কোনটাই তাঁর বিশ্বাস, মুল্যবোধে হঠাৎ ঘাটতি এসেছে সেজন্য তিনি করেছেন তা নয়। বরং, প্রতারিত হবার জন্য তিনি দায়ীই নন। নতুন সমাজ যা তাকে করতে বাধ্য করছে তাই তিনি করেছেন, এর পরেও তিনি প্রতারিত।

ক ম ন  শ ত্রু -গ ল্প কা রে র  আ ত্ম স ম র্প ণ

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, চেয়ারম্যানের মুল্যবোধ ও বিশ্বাস ধরে রাখার ক্ষেত্রে যা বাধা বা শত্রুর ভুমিকায় তা হলো, নতুন পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের সমাজ বা দুনিয়া, অথবা এর গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া টেলিভিশন টেকনোলজি। আর তার ছেলে সুলেমান ঐ সমাজেরই ভোক্তা, কনজুমার মাত্র, এবং সে বাছবিচারহীন, কর্তাসত্ত্বাহীন। অর্থাৎ উভয়েরই শত্রু একই। কিন্তু তা সত্বেও সেই কমন শত্রু ফেলে পিতা-পুত্র এক আপতিক বিরোধে জড়িয়ে গেছে, আর ঐ কমন শত্রুই এই বিরোধ তৈরির কারণ। অথচ এইদিকটা গল্পকার দেখতে পাচ্ছেন এমন কোন ইঙ্গিতও নাই। ফলে পিতা চেয়ারম্যান বা পুত্র সুলেমান এই শত্রুর কাছে সারেন্ডার করছেন না, আসলে আত্মসমর্পণ করে ফেলেছেন খোদ গল্পকার ও পরিচালক।

কিন্তু এর মানে কি আমি পিতা-পুত্রকে পিছনের ফেলে আসা কোন সময়ে, সমাজে ফিরে যেতে বলছি, মোটেই না। তবে সে জন্য একটা বোধোদয়, আত্ম উপলব্ধি বা আত্মসচেতনতার দিকেও তাদেরকে যেতে হবে। সে কাজ গল্পকার করতে পারতেন হয়ত। কথাটা অন্যদিক থেকে তুলব।

গল্পের মুল প্রসঙ্গ, ছবি না তোলা বা দেখা, সেই সুত্রে টিভি না দেখা। আর সিনেমায় এই ধারণার পরিণতি দেখানো হয়েছে এই মুল্যবোধ ও বিশ্বাসকে বলি দিয়ে। একধরণের প্রশ্নহীন ও আগাম অনুমান দিয়ে সরাসরি ধরে নেয়া হয়েছে, ছবি না তোলা বা দেখা, সেই সুত্রে টিভি না দেখা -এই ধারণাটাই ভুল। সোজাসাপ্টা এক সরলীকরণ সমাধান টেনে অন্তত বলা হয়েছে -এটা অচল ধারণা। সমস্যা সঙ্কটটাকে কোন ক্রিটিক্যাল দিক থেকে দেখার চেষ্টাও সেখানে নাই। যেমন, নিস্তরঙ্গ ফ্লাট ধরে নেয়া হয়েছে ছবি না তোলা বা দেখা -এটা স্রেফ বিশ্বাস মাত্র। প্রশ্নহীন ধরে নেয়া হয়েছে এটা কুপমন্ডুকতা অথবা নেহায়তই এক রক্ষণশীলতা। কেন এই বিশ্বাস, এই বিশ্বাস এমন কেন, কারণ কি? - সে প্রশ্ন তোলার বা খুজে দেখার চেষ্টা কোথাও নাই। ধরেই নেয়া হয়েছে, এটা স্রেফ বিশ্বাস মাত্র, ওর পিছনে কোন যুক্তি বা ব্যাখ্যা নাই। চেয়ারম্যানের মুখ দিয়ে সে সম্পর্কে কোন যুক্তি বা ব্যাখ্যা দেয়ার কারণে চেয়ারম্যান চরিত্রটাকে পুষ্ট হতে দেয়া হয় নাই। ফলে সে একটা ক্লাউন; অচল মাল ছাড়া আর কিছুই হয়ে উঠতে পারে নি।

গ ল্পে র  বি ষ য় ব স্তু  বা ছা ই

এযুগে টেলিভিশন দেখে না, দেখতে দেয় না – এখান থেকে শুরু করে কৌতুককর কাহিনী তৈরি করা যেতেই পারে। খুবই সহজ কাজ সেটা। কিন্তু গল্পকার যা ভেবেই গল্পের বিষয়বস্তু নির্ধারণ করুন না কেন, চিন্তার বিষয়বস্তু হিসাবে এই প্রসঙ্গটা গভীর ও সিরিয়াস।

প্রথম কথা হলো, প্রশ্নটা ছবি তোলা বা না তোলার একেবারেই না। ইসলামের দিক থেকে মানুষ, জীবজন্তু বা যে কোন প্রাণ কোন প্রকার (ছবি, অক্ষর ইত্যাদি) চিহ্নব্যবস্থায় প্রতিফলন ঘটানো বা তাকে নিছকই মূর্তি করে তুলে সৃষ্টবস্তুর মূল সত্তাকে গৌণ করে ফেলার বিরুদ্ধে ইসলাম আপত্তি জানায়। এটা একটা দিক। আরেকটি জটিল ও গভীর দিক হচ্ছে, নিরাকার ধারণা। ইসলামে নিরাকার বা আল্লাহর নিরাকার ধারণা একটা ফান্ডামেন্টাল বিষয়। যেটা একেবারেই মৌলিক ধারণা। আবার এটা নেহায়তই ইসলামের জন্য নয়, মানুষের চিন্তা, ভাব, দর্শনের জট খুলবার জন্য এক মৌলিক ও সিরিয়াস ধারণা। অজান্তে অজ্ঞতায় সেই গুরুত্বপুর্ণ দিক যাতে মানুষ হারিয়ে না ফেলে তা থেকে সাবধান থাকতেই ছবি তোলা বা না তোলার, আকার দেয়া না দেয়ার প্রসঙ্গটা এসেছে।

আকার দিয়ে নিরাকারের ধারণা ধরা যায় না। আকার দিয়ে নিরাকারের ধারণা ধরতে গেলেও তা ‘অধরা’ই থেকে যাবে। আর আকারের ভিতর নিরাকার ধারণা তো অধরা থেকে যাবারই কথা। কারণ তখনও আকারের নেতি হিসাবেই নিরাকারের চিন্তা করা হয়, হেগেলের ভাষায় ‘আকার’-এর মধ্যস্থতায় নিরাকারের হাজির হওয়া। তবু মানুষ আকার, আইকন, চিহ্ন করে, করে ফেলে। করতেই হয়। কোন কিছু বুঝতে নেবার প্রচেষ্টার প্রথম মুহুর্ত থেকেই এই স্ববিরোধটা ঘটে। কিন্তু ইসলাম দাবি করে নিরাকারকে কোন মধ্যস্থতা ছাড়া চিন্তা করবার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। ইসলাম আমরা মানি বা না মানি এই প্রস্তাবের দার্শনিক গুরুত্বকে যতো হাল্কা আমরা গণ্য করি, ব্যাপারটা মোটেই হাল্কা ব্যাপার নয়। ফলে ছবি দেখা না দেখার বিষয়টা সেই জায়গা থেকে এসেছে। আসলে ছবি দেখা বা সে অর্থে টেলিভিশন দেখা আদৌ নিষিদ্ধ কিনা ইসলামের ভেতর থেকেও তার তত্ত্ব-উপায় আছে। কিন্তু চেয়ারম্যানের চরিত্রের মধ্য দিয়ে তার নৈতিক সিদ্ধান্তকে মুখ্য করে আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ দিকে যাবার সুযোগ ছিল। কিন্তু তাকে একটা হাস্যকর চরিত্রে পরিণত করা হয়েছে।

এ বিষয় নিয়ে যাঁরা লিখবার অধিকারী, তাঁরা লিখবেন। তবে আমার নিজের কাছে যেসকল প্রশ্নগুলো হাজির হয় তার কিছুটা নমুনা দিলে বোঝাতে পারব, ছবিতে টেলিভিশন দেখা না দেখাকে যতো ক্যারিকেচার পরিণত করা হয়েছে, আকার/নিরাকারের তর্ক আরও অনেক গভীর ও জটিল।

যেমন, উচ্চারণে যদি ধরা বুঝা শুরু করতে চাই, তাহলে নিরাকার ধারণা তো একমাত্র নৈ-স্বরে, নৈ-স্বরাকারে অথবা নৈ-উচ্চারণেই ধরতে পারার কথা, আলাদা আলাদা শব্দ-উচ্চারণে না। জানি ওরাল বা গলার স্বরে নিরাকার ধরা যাবে না, তবু ওরাল স্বরই আমাদের ভরসা। অধরা ভাবের ভিতর দিয়ে ওরাল স্বরের সীমাবদ্ধতা খেয়াল রেখেই নিরাকার ধারণা করা সম্ভব। অন্তত অর্থহীন স্বর তাকে হতেই হবে। যেমন আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশীয় সনাতন ধর্মীয় আবহে গড়ে উঠা রাগ সঙ্গীত, তা অর্থহীন স্বর অথবা অনন্ত অর্থের এক স্বর হবার পিছনে এটা ছিল অন্তত একটা কারণ। ধ্রুপদি সঙ্গীতে ইসলামের বিশেষ আগ্রহের এটা একটা কারন হতে পারে।

নানান অক্ষর-বর্ণমালা দিয়ে আমরা আমাদের লেখা পুস্তক সাজাই, ওদিয়ে ধারণা ধরার চেষ্টা করি। কিন্তু নিরাকারের ধারণা? একমাত্র অক্ষরগুলোর বিভেদ নিরাকরণে ঘুচলেই নিরাকার ধারণা আসতে পারে। তবু আলাদা আলাদা অক্ষর না আঁকলে, চিহ্ন আইকনে তাদের বিভেদ না করে নিলে লেখা, পুস্তকে কোন ভাব, ধারণা ধরা অসম্ভব। এটা স্ববিরোধ এবং এই সীমাবদ্ধতা খেয়াল রেখেই নিরাকার ধারণা করা সম্ভব।

ভিজুয়ালাইজেশনঃ এতে আলাদা আলাদা ছবি সব, ছবি চিহ্ন আইকনের বিভেদ আমাদের শিখতেই হয়। জানা হয়। এই বিভেদের ভিতর দিয়েই এই সীমাবদ্ধতা খেয়াল রেখেই এবার চোখ বন্ধ করলে নিরাকার ধারণা করা সম্ভব।

একটা চকমকে কাগজে আল্লাহু লিখলে ঐ কাগজ সেটা আল্লাহ নয়। আল্লাহকে তাতে উচ্চারণ করে পড়ে স্বরে, লিখিত অক্ষরে বা অক্ষর দেখে ভিজুয়ালাইজেশন ধরা যাবে না। তবু আমরা আল্লাহু লেখা কাগজ দেখি আমাদের মনে একটা ভাব তৈরি হয়। আমাদের কালচারে তা ফুটে উঠে। ঐ কাগজ কেউ অজান্তে পায়ে দলে দিলে কিছু হবার কথা না কারণ ঐ কাগজ নিজে আল্লাহু নয়। কিন্তু পায়ে দলা যদি ডেস্পারেট এটেম্পট হয় তবে ঐ ভাব গুণাহ কাজ বলে মানা হয়; আমাদের কালচার তা ধারণ করে চলে। সাবধান থাকার পরামর্শ ইঙ্গিত জারি রাখে।

আমরা সবাই আলাদা আলাদা নাম ধারণ করি। একের থেকে অন্যের বিভেদ, তফাত না করলে চিনা জানা মনে রাখা সম্ভব না। প্রকৃতিতে যাই দেখি তাকেই এক একটা আলাদা আলাদা নাম দেই। এগুলো আমাদের চিনা, জানা, মনে রাখার প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু নিরাকার ধারণার একটা ব্যত্যয় তো বটেই এটা। জানাজানি সচেতনতার প্রক্রিয়ায় এই স্ববিরোধ এবং এই সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সতর্ক খেয়াল রাখলেই তবে নিরাকার ধারণা করা সম্ভব। ফলে সেদিকটা বিবেচনা করে আমরা আল্লাহর গুণবাচক অর্থ –সমার্থক নাম রাখি, একটা কালচার গড়ে ঊঠেছে। যদিও তাতে সবদিক সামাল দেয়া যায়নি। প্রকৃতিতে এত কিছু কত কত দেখি আমাদের অনেক নামবাচক শব্দ দরকার। সব কুলকিনারা করা যায়নি। কেবল মানুষের নামের ব্যাপারটায় একটা কালচার তৈরি হয়েছে দেখি আমরা যদিও সেটাতেও ভাঙ্গা গড়া আছে।


‘টেলিভিশন’ সিনেমায় যেভাবে টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বের অতি সরলীকরণ করে বিষয়টা আনা হয়েছে এটা ইসলামের কোন বিষয়ই নয়, মুল প্রশ্ন ইসলামের নিরাকার ধারণা। একদিকে পিতা বা চেয়ারম্যান যেমন নিরাকার ধারণার বদলে টেলিভিশনে আটকে গেছেন অন্যদিকে পুত্র সোলেমান বা তার নায়িকা টেলিভিশন দেখতেই হবে এই বেহুদা মুক্তির বিপ্লবীপনায় আটকে গেছেন। আর ডন কুইকজোটের যুদ্ধ লড়েছেন। কেউই এই ছদ্ম-লড়াই থেকে বের হবার পথ তালাশ করেন নাই। এই তালাশের প্রথম কাজ হত - কেন এই বিশ্বাস, এই বিশ্বাস এমন কেন, পিছনের কথা, বয়ানগুলো অনুসন্ধান, বুঝবার চেষ্টা করা।


পশ্চিম দিকে কাবা শরীফের দিকে কেবলা বেধে নামাজ পড়ার নিয়ম। এর মানে কি আর দশ দিকে আল্লাহ নাই? মোটেই না। এটা ঠিক পুব-পশ্চিমের ব্যাপার না, বরং দশ দিক কেন্দ্রে এসে সমপাতিত হয়, মিলে মিশে একাকার নিরাকার হয়। নৈ-দিক হয়ে যায়। মানুষের ঐক্য, একটা একতাবদ্ধ মানুষের কমিউনিটি গড়ার উদ্দেশ্যের কথা মাথায় রেখে একই কেবলা অভিমুখী করে, কিন্তু নিরাকারের উপাসনার প্রতীকায়িত ঘটনা এটা। এখানে বেশ মজার কিন্তু গভীর একটা দিক আছে। ধরা যাক, ওখানে কাবা ঘর নাই। কিন্তু দুনিয়ার দশ দিকের নানান স্থান অবস্থানের মানুষ সবাইকে একই দিকে অভিমুখী বা কেবলা করতে গেলেও প্রতিটা দিকের অবস্থানের মানুষকে ঐ অবস্থানের ক্ষেত্রে একটা দিকের কথা বলতে হত যেদিকে দশ দিক সমপাতিত হয়। সেক্ষেত্রে সব অবস্থানের দিকের সেই সমপাতিত স্থান হলো যেন কাবা শরীফ। এতে দশ দিকের দশ দশ রকম মানুষের ভিন্নতার সমস্যা মিটিছে – একমুখী করা গেছে। যদিও ব্যবহারিক দিক থেকে একটা আইকন হিসাবে কাবা শরীফ এতে থেকে গেছে। এটা আকারের দুনিয়ায় নিরাকারের ধারণা আনার ব্যবহারিক সমস্যা।

এমন অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। প্রতিমুহুর্তে নানান আকার দেয়ার ঘটনা ঘটছে; চিহ্ন, প্রতীক আইকনে দুনিয়াও নানান আকার প্রকারে হাজির। আমাদের চিনা, জানা, মনে রাখার প্রক্রিয়া জারি রাখতে গিয়ে নিরাকার ধারণার একটা ব্যত্যয় ঘটিয়েই একমাত্র এগুলো করা সম্ভব। তাই এই আপাত স্ববিরোধ। কিন্তু মুল প্রসঙ্গ, এই কাজ করতে গিয়ে এই স্ববিরোধে আমরা যেন নিরাকার ধারণা হারিয়ে না ফেলি। তাই প্রসঙ্গটা আসলে ছবি তোলা বা না তোলার একেবারেই নয়, মুল প্রসঙ্গ নিরাকারের ধারণা যেন আমরা হারিয়ে না ফেলি, বেকুবি অজ্ঞতায় না ডুবে যাই। হারিয়ে চিন্তার, ভাব, দর্শনের চরম সঙ্কটে না পড়ি।

কাজেই মুল ইস্যু নিরাকারের ধারণা রক্ষা করা। নিরাকারের ধারণা ফেলে, ভুলে আমরা যেন চিন্তার গলিঘুপচিতে আটকে না যাই। এইখান থেকেই সতর্কতায়, নবীজির কোন ছবি আঁকা বা আদল দেয়া নিষিদ্ধ। লালনের শিষ্যরা একই কারণে লালনের ছবি বা মুর্তির বিরুদ্ধে। যাতে সেই ছবি, আইকন প্রতীকের ফেরে পড়ে কেবল এসব প্রতীকই সত্য, মুখ্য হয়ে না যায় আর নিরাকারের কনসেপ্ট এর নীচে চাপা পড়ে গড়াগড়ি না খায়। লালনের অনুসারীদের ক্ষেত্রে অবশ্য বলা হয় তাঁরা ছবি পূজা করেন না, মানুষ ভজনা করেন। ফলে নবীজির কোন ছবির ব্যাপারে ইসলাম কেন এত কঠোর এটা স্রেফ মোল্লাদের কুপমন্ডুকতা, পশ্চাদপদতা বা রক্ষণশীলতা একেবারেই নয়। এর পিছনে শক্তিশালী দার্শনিক কারণ আছে এবং আমাদের তা রক্ষা করা দরকার।

অতএব, ‘টেলিভিশন’ সিনেমায় যেভাবে টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বের অতি সরলীকরণ করে বিষয়টা আনা হয়েছে এটা ইসলামের কোন বিষয়ই নয়, মুল প্রশ্ন ইসলামের নিরাকার ধারণা। একদিকে পিতা বা চেয়ারম্যান যেমন নিরাকার ধারণার বদলে টেলিভিশনে আটকে গেছেন অন্যদিকে পুত্র সোলেমান বা তার নায়িকা টেলিভিশন দেখতেই হবে এই বেহুদা মুক্তির বিপ্লবীপনায় আটকে গেছেন। আর ডন কুইকজোটের যুদ্ধ লড়েছেন। কেউই এই ছদ্ম-লড়াই থেকে বের হবার পথ তালাশ করেন নাই। এই তালাশের প্রথম কাজ হত - কেন এই বিশ্বাস, এই বিশ্বাস এমন কেন, পিছনের কথা, বয়ানগুলো অনুসন্ধান, বুঝবার চেষ্টা করা। গল্পকার সেদিকে তার গল্প প্ররোচিত করতে পারতেন। ফলে সেটা গল্পের পরিসমাপ্তি অর্থাৎ দ্বন্দ্ব নিরসন বা একটা সমাধান হতে পারত।

গল্পে যেটা সবচেয়ে দৃষ্টিকটু তা হলো, নায়িকা যেভাবে নায়ককে টেলিভিশনকে মুক্ত করার শর্ত দিয়েছে। নায়িকা যদি সুলেমানকে ভালবাসেই তবে কেন তাঁর হবু শ্বশুর কেন এমন, তিনি ঠিক কি বলতে বুঝাতে চান - সেটা বুঝবার কোন দায়িত্বই সে অনুভব করে নাই। ধরেই নিয়েছে শ্বশুরের উৎখাতেই তার মুক্তি, তাদের প্রেমের মুক্তি - ফলে সুলেমানকে প্ররোচনামুলক শর্ত।


nayika

গল্পে যেটা সবচেয়ে দৃষ্টিকটু তা হলো, নায়িকা যেভাবে নায়ককে টেলিভিশনকে মুক্ত করার শর্ত দিয়েছে। নায়িকা যদি সুলেমানকে ভালবাসেই তবে কেন তাঁর হবু শ্বশুর কেন এমন, তিনি ঠিক কি বলতে বুঝাতে চান - সেটা বুঝবার কোন দায়িত্বই সে অনুভব করে নাই। ধরেই নিয়েছে শ্বশুরের উৎখাতেই তার মুক্তি, তাদের প্রেমের মুক্তি - ফলে সুলেমানকে প্ররোচনামুলক শর্ত।


এই বয়ানটা বাছবিচারহীন ধরে নেয় তথাকথিত আধুনিকতা বনাম ইসলামের লড়াইটাই হচ্ছে প্রগতিশীলতার লড়াই। অথচ এটা অনিবার্য এমন নয়। আবার এর মানে এও নয় যে এনলাইটমেন্ট অথবা আধুনিকতা থেকে মানুষের কিছুই নেবার নাই। আসলে মুল প্রশ্ন হলো, বাছবিচার করতে শিখা। ক্রিটিক করতে শিখা। আধুনিকতাকে টপকে যাওয়া। স্বভাবতই এর প্রথম কাজ জিনিষটা কি তা আকরসহ বুঝা। তবেই না বাছবিচার, ক্রিটিক! এটা অবশ্যই সমর্পণ না। মানুষের অনন্ত সম্ভাবনা মনে রাখা।

যা  হ তে  পা র ত

উপ-শিরোনাম দেখে মনে করার কারণ নাই যে যা হতে পারত সেসবের সীমা টেনে দিচ্ছি। না মোটেই তা নয়। কি হতে পারত সারকথায় এর কিছু ধারণা দিচ্ছি কি বলতে চাই তা বুঝানোর জন্য। যা হতে পারতঃ

১। টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বকেই মুখ্য করে প্রকারান্তরে চেয়ারম্যান কেন এমন, ঠিক কি বলতে বুঝাতে চায় তা - নায়িকা বা নায়ক যে কেউ একজনকে দিয়ে - সেটা বুঝবার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোন একটা সমাধান, দ্বন্দ্ব নিরসনে গল্পের এক মানবিক পরিসমাপ্তি হতে পারত। গল্পকার গল্পে চেয়ারম্যান কেন টেলিভিশন দেখার বিরোধিতা করছে এর কারণ কী সেটা গুমর হিসাবেই রেখে দিয়েছেন। এটা গুমরাহ রেখে দেয়াটাই এই গল্পের ভিত্তি একমাত্র যা থেকে একে সেকুলারিজম বনাম ইসলামের লড়াই অথবা তথাকথিত ধর্মীয় রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে আধুনিকতার লড়াই হিসাবে একে খাড়া করা যায়। অথচ এই গুমোরকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট – উত্তজনা টেনশন চরমে নেবার পর গুমোর ভেঙ্গে দেখানো ভিতর দিয়ে দ্বন্দ্ব নিরসন করা যেতে পারত। তাতে এই ছবি আমাদের সামাজিক চিন্তায় চিন্তা করার ভিন্ন দ্বার খুলতে পারত।

২। গল্পকার বা পরিচালক ধরা যাক, নিজের তৈরি টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্ব নিজেও সমাধান করতে চায় না, বা দেখাতে চায় না। কিন্তু একটা মানবিক সমাধানের পরিসমাপ্তি আকুতি তাঁর আছে, সে চায়। এই মানবিক সমাধান অত্যন্ত আন্তরিকভাবে সে খুজছে এটাই সে ফুটিয়ে তুলতে পারত। ফলে খোলা রেখে দিতে পারত। এটা বলছি, গল্পকার বা পরিচালক একদিকে একজন বিশ্বাসী বয়স্ক লোকের কোন ত্রুটি, (যা সে বিশ্বাস করে তাই সে করেছে) কোন স্খলন দেখাতে পারেনি বা দেখায় নি অথচ তাকে বিশ্বাসের বাইরে যেতে বাধ্য করেছে কিন্তু গিয়েও সে প্রতারিত হয়েছে যার জন্য সে কোনভাবেই দায়ী নয়। অন্যদিকে নায়িকা এক টেলিভিশন দেখার লোভ এতই অমানবিক ও লোভী যে এতে হবু শ্বশুর মরল কি বাঁচল তাতে তার কিছু যায় আসে নাই। এসবের বিপরীতে এটা কমপক্ষে একটা মানবিক সমাধান হত পারত। সিনেমা দেখার পর দর্শকও সেসব প্রশ্নে নানান সামাজিক তর্ক বিতর্কে জড়িয়ে এর সমাধান খুজে ফিরত। কিন্তু এই গল্পে গল্পকার সহজেই পরিণতি দিয়েছেন, এটা নেহাতই এক রক্ষণশীল ‘অচল মালের’ সমস্যা।

৩। এটা হতেই পারে যে গল্পকার বা পরিচালকের টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্ব সমাধান কি করে করবে তা নিজের কাছে জানা নাই। কিন্তু আমাদের সমাজের চেয়ারম্যান ধরণের চরিত্র কে, কেন এটা এমন - তা সে আন্তরিকভাবে অনুসন্ধিতসু, সে বুঝতে চায়। ফলে বিশ্বাসী বয়স্ক মানুষটা কি রকম সব অমীমাংসিত সঙ্কটে পড়েছে এর কেবল মানবিক কষ্ট, সাফারিং - এর সব দিক সে খুটিয়ে প্রকাশ করতে চায়। এটাই তার মুল ফোকাস হতে পারত।

উপরে আমি সম্ভাব্য তিনটা ফোকাস ও পরিণতির কথা বলেছি। এখানেই থামলাম। এর মানে এমন নয় যে আর কোন কিছু হতে পারে না। বরং এমন অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তা হবে না, হয় নাই। কারণ, যতক্ষণ আগাম ধরে নেয়া থাকবে যে, টেলিভিশন দেখা না দেখার দ্বন্দ্বটা হলো, ‘ধর্মের কুপমন্ডুকতা বনাম প্রগতিবাদী’ এমনই সরল অর্থাৎ সেকুলারিজম বনাম ইসলামের দ্বন্দ্ব আর আমরা এভাবে বুঝা দ্বন্দ্বের সমাধান জানি তা হলো ইসলামের উপরে আধুনিকতার বিজয় ততক্ষণ আমাদের গল্পগুলো ‘টেলিভিশন’ এর মত এমনই হবে। আর গল্পে দ্বন্দ্ব কনফ্লিক্ট দুর্বল ফলে গল্পই দুর্বল থেকে যাবে।

গল্পকার যা ভেবেই গল্পের বিষয়বস্তু নির্ধারণ বাছাই করুন না কেন, চিন্তার বিষয়বস্তু হিসাবে এই প্রসঙ্গটা গভীর ও সিরিয়াস। যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে তাই এই ধরণের সিরিয়াস বিষয়কে গল্পের বিষয়বস্তু করতে হবে।

০২ ফেব্রুয়ারী ২০১৩


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।