নারী কি শুধু শ্লোগানদাতা?

ফরিদা আখতার || Tuesday 26 February 13

ঢাকার শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে নারী কন্ঠ সোচ্চার।কখনো গণজাগরণ মঞ্চ থেকে কখনও ছোট ছোট দলে জোরালো কন্ঠে শ্লোগান তুলে হাজার হাজার মানুষকে উদ্বেলিত করেছেন কয়েকজন তরুণী, এটা অবশ্যই চোখে পড়ার মতো এবং ভাল। অনেক তরুণও শ্লোগান দিয়েছেন, কিন্তু তাদের কথা তেমন কেউ বলাবলি করছে না, কারণ মিডিয়া নারীকেই তুলে ধরতে চেয়েছে।এটা ঠিক এই নারীরা মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে না পারলে গলা ফাটালেও এতো আলোচনা হোত না। শাহবাগে তরুণরা যে আন্দোলন করছেন তার সাথে শুরু থেকে নারীদের সম্পৃক্ততা জানা যায় নি, ব্লগার বলতে আমরা শুধু কয়েকজন পুরুষদের চেহারা বা নাম দেখছি। তবে আন্দোলন চালিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে নারীকে দেখা যাচ্ছে। সেই দেখা যাওয়ার বিষয়টি একটু পর্যালোচনা করতে চাই।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ১৭ দিন তরুণরা যেমন শাহবাগ চত্বরে আছেন তেমনি আছেন মিডিয়া্তে। মিডিয়ার সরাসরি সম্প্রচারের কারণে যারা সেখানে যান নি বা যেতে পারেন নি, তাঁদের মোটামুটি শাহবাগের পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে। যদিও বলার অপেক্ষা রাখে না, ক্যামেরা যেদিকে মূখ করেছে সেই লেন্সের বাইরে কিছু দেখা বা বোঝা সম্ভব ছিল না। নারীদের ক্ষেত্রে মিডিয়ার আগ্রহ বেড়েছে লাকী আক্তারের মতো তরুণীরা অনবরত দৃপ্ত কন্ঠে শ্লোগান দিয়ে রাত-দিন ২৪ ঘন্টা শাহবাগ জাগিয়ে রেখেছে। হয়তো কেউ তাদের সে ভাবে দায়িত্ব দেয় নি, তারা নিজেরাই নিয়েছে। ব্লগারদের পাশাপাশি বাম দলের অংশগ্রহণ প্রধানত টের পাওয়া গেছে তাদের নারী কর্মীদের শ্লোগান থেকে। লাকী আক্তার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের ছাত্রী এবং বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সংসদের সমাজ কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক (প্রথম আলো, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩)। লাকী শুধু একা নয় আরও চার-পাঁচ জন তরুণী শ্লোগান দিয়ে মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তারা হলেন ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের ছাত্রী উম্মে হবিবা বেনজীর,জাহাংগীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ছাত্রী তানজিদা তুবা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটউটের ছাত্রী সামিয়া রহমান ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি, একজন আইনজীবী আফসানা কলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ও ছাত্র ফ্রন্টের প্রচার-প্রকাশনা সম্পাদক প্রীতিলতা (সমকাল, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩)। এঁদের সকলের পরিচয় থেকে পরিষ্কার যে এঁরা শুধু শ্লোগান দেয়া নয় সাংগঠনিক কাজেও জড়িত। এটা জানা জরুরী। কাজেই শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে তাদের সাংগঠনিক কাজের সুযোগ রয়েছে।

শ্লোগান দেয়া রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য এবং যারা আন্দোলন করেন তাঁদের জন্য খুব গুরুত্বপুর্ণ একটি কাজ। কোন মিছিল বা সমাবেশ ভাল হয় না, যদি ভাল শ্লোগান না থাকে। আমরা যারা নারী আন্দোলন করি আমাদের সব সময় শ্লোগান দিতে হয়। তবে সবাই সুন্দর করে ও দৃপ্ত কন্ঠে শ্লোগান দিতে পারে না, সবার কন্ঠও অতো জোরালো হয় না। লাকী এবং তার সঙ্গীরা সে দিক থেকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো শ্লোগান দিয়েছে নিঃসন্দেহে। তাদের সালাম জানাই।

কিন্তু শ্লোগান দেয়াই কি নেতৃত্ব?  উত্তর হচ্ছে, না। সংগঠিত রাজনৈতিক দলে এবং সংগঠিত আন্দোলনে শ্লোগান কি দেয়া হবে তা আন্দোলন কর্মসুচীতে ঠিক করে দেয়া থাকে। এর বাইরে কেউ শ্লোগান দিতে পারে না। শ্লোগান সব সময় নেতারা নিজেরা দেন না, শ্লোগান দেয়ার জন্য বিশেষ কর্মীও থাকে। কাজেই কেউ শ্লোগান দিলে ধরে নেয়ার কোন কারণ নেই শ্লোগানদানকারীরাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। সেই ক্ষেত্রে এই শ্লোগানের সিদ্ধান্ত কোথা থেকে আসছে সেটা জানা দরকার। শাহবাগের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এখানে দাবী একটি, রাজাকারের ফাঁসী চাই। কিন্তু রাজাকারদের যে কারণে ফাঁসী চাই তার মধ্যে নারী ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন অন্যতম প্রধান অপরাধ ছিল, যা ক্ষমার অযোগ্য। আমার শুনতে যদি ভুল না হয় তাহলে বলতে পারি, এতোদিন মনোযোগ দিয়ে শুনেও আমি মুক্তিযুদ্ধে নারী ধর্ষণ বিরোধী শ্লোগান শুনি নি। এই কথা যারা বক্তব্য রেখেছেন তাঁরা বলেছেন, কিন্তু শ্লোগানে ছিল না কেন তা আমার বোধগম্য নয়।


কিন্তু শ্লোগান দেয়াই কি নেতৃত্ব? উত্তর হচ্ছে, না। সংগঠিত রাজনৈতিক দলে এবং সংগঠিত আন্দোলনে শ্লোগান কি দেয়া হবে তা আন্দোলন কর্মসুচীতে ঠিক করে দেয়া থাকে।এর বাইরে কেউ শ্লোগান দিতে পারে না।শ্লোগান সব সময় নেতারা নিজেরা দেন না, শ্লোগান দেয়ার জন্য বিশেষ কর্মীও থাকে।কাজেই কেউ শ্লোগান দিলে ধরে নেয়ার কোন কারণ নেই শ্লোগানদানকারীরাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে।


শাহবাগ সরকার ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছাড়া সম্ভব ছিল না এটা মেনে নিলেও শাহবাগে রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্য দিতে দেওয়া হয় নি, সেটা দেখা গেছে। তবে ছাত্র রাজনীতির নেতারা ছিলেন। শুরুতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাজেদা চৌধুরি, মাহবুবুল আলম হানিফ এসে সুবিধা করতে পারেন নি, তাঁদের বোতলের আঘাত সহ্য করতে হয়েছে। পরের দিকে আওয়ামী লীগ জাতীয় সংসদে সমর্থন দিয়ে আন্দোলনকারীদের একাংশকে ‘নরম’ করতে পেরেছে। এক পর্যায়ে (ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৩) তোফায়েল আহমদ এসেছিলেন কিন্তু পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে বক্তব্য দেয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি জানিয়েছিলেন লাকী। আর অমনি তার মাথায় আঘাত, সোজা বারডেম হাসপাতালে যেতে হোল তাকে। আগেই বলেছি লাকী শাহবাগ আন্দোলনের আয়োজকদের মধ্যে অন্যতম প্রধান বাম সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের একজন নেতৃ স্থানীয় কর্মী। মঞ্চে থেকে কোন সিদ্ধান্ত দেয়ার অধিকার তার না থাকলেও, গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ব্যাপারে কিছুটা হলেও তার অধিকার সম্ভবত ছিল, সেটা ধরে নেয়া যায়। কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে তাকে মূল্য দিতে হয়েছে, আমরা দূরে থেকে এটাই বুঝেছি।

এর একটা বিহিত করবার ক্ষেত্রে তার দলের পক্ষ থেকেও তাকে কোন সহযোগিতা করা হয় নি।হাসপাতাল থেকে লাকী মাঝ রাতে এসে বলে গেল, “আন্দোলন চলবে, আমি সুস্থ আছি”। একুশে টিভিতে পরিষ্কারভাবে দেখানো হোল, তার সহকর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কিন্তু লাকীকে আবার মঞ্চে এসে শ্লোগান দিয়ে ‘প্রমাণ’ করে দেখাতে হোল তার কিছু হয় নি। সে মঞ্চে এসে আঘাতের কথা একটু বলার চেষ্টা করেও পারে নি। সমকাল পত্রিকায় (১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩) লাকী মাথায় আঘাত কে দিয়েছে এই প্রশ্নের জবাবে বলেছে, “ধারণা করছি এখানকার ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন হবে। ওই সময় ছাত্র লী্গের নেতারা ছিলেন। তোফায়েল আহমদের আশে পাশেও অনেকে ছিলেন – অন্ধকার থাকায় কাউকে সনাক্ত করতে পারিনি”। প্রশ্ন হচ্ছে, লাকীর মাথায় কে আঘাত করলো এটা সনাক্ত করার দায়িত্ব কি লাকীরই ছিল, নাকি সেখানকার সকল সংগঠনের ছিল? কেন আজও জানা গেলো না? নাকি কখনোই জানা যাবে না? এটা কি আন্দোলনের পুরুষতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ নয়? নারী নেতৃত্বের কোন স্বীকৃতি, শাহবাগে যদি থেকে থাকে, এখানে তার অবমাননা করা কি হয় নি?

এর পরে আরও করুণ পরিণতি ঘটলো। লাকীকে একটি টক শোতে জাতীয় সংসদ সদস্য ১৪ দলের বাম নেতা রাশেদ খান মেননের উপস্থিতে বলানো হোল ওটা ছিল আপেলের আঘাত! এই ধরনের বড় কর্মসুচীতে এ রকম একটু আধটু হতেই পারে। তারপর হাসি। মনে হচ্ছিল এই আঘাত পাওয়াটাও যেন বা একটি অর্জন। লাকী এই টক শোতে থাকবে জেনে আমি মনোযোগ দিয়ে শোনার জন্যে বসেছিলাম। কারণ আমার কাছে মনে হচ্ছিল একটা নতুন নেতৃত্ব আসছে। এই নেতৃত্বকে স্বাগত জানাতে হবে। কিন্তু হতাশ হলাম বাম রাজনৈতিক সংগঠনে নারী নেতৃত্ব ধ্বংসের এমন পদ্ধতি দেখে।


এর পরে আরও করুণ পরিণতি ঘটলো। লাকীকে একটি টক শোতে জাতীয় সংসদ সদস্য ১৪ দলের বাম নেতা রাশেদ খান মেননের উপস্থিতে বলানো হোল ওটা ছিল আপেলের আঘাত! এই ধরনের বড় কর্মসুচীতে এ রকম একটু আধটু হতেই পারে। তারপর হাসি। মনে হচ্ছিল এই আঘাত পাওয়াটাও যেন বা একটি অর্জন। লাকী এই টক শোতে থাকবে জেনে আমি মনোযোগ দিয়ে শোনার জন্যে বসেছিলাম। কারণ আমার কাছে মনে হচ্ছিল একটা নতুন নেতৃত্ব আসছে। এই নেতৃত্বকে স্বাগত জানাতে হবে। কিন্তু হতাশ হলাম বাম রাজনৈতিক সংগঠনে নারী নেতৃত্ব ধ্বংসের এমন পদ্ধতি দেখে।


যে কোন আন্দোলনে নারীর ভুমিকা বিচারের দুটো দিক আছে। প্রথমত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা এবং সেই সিদ্ধান্ত নারীর অনুকুল, নাকি তা পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতারই প্রতিধ্বনী। দুই, সংখ্যার দিক থেকে নারীরা আন্দোলনে কতোটা অংশগ্রহন করছে। অর্থাৎ সংখ্যাগতভাবে নারীর অংশগ্রহণ দিয়েও নারীর ভূমিকার মাত্রা বোঝার একটা চেষ্টা থাকতে পারে। শাহবাগে সব ধরণের এবং সব বয়সের নারীদের দেখা গেছে। পেশাজীবী, নাট্ট্য ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে কোলের শিশু নিয়ে স্বামীর সাথে আসা নারী অনেক ছিল। যদিও শিশুদের এনে ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই দাবি শোনানো ঠিক হয়েছে কিনা সেটা গুরুতর বিতর্কের বিষয়। অনেক রাত পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন, কেউ কেউ বাড়িতেই ফিরে যান নি। অনেকে দাবী করছেন শাহবাগে নারী-বান্ধব পরিবেশ ছিল।‘নারী-বান্ধব’ কথাটি কি নারী-বিরোধী পরিস্থতি থাকা না থাকার ইঙ্গিত নয়? আমরা কি ধরে নিচ্ছি এই আন্দোলন শুধু পুরুষদের হওয়ার কথা ছিল? নারী কি এখানে বন্ধু হয়ে এসেছে? এটা কি তাদের ইস্যু নয়? আমি অবাক হয়েছি, বাম রাজনৈতিক দলের নেতারা টক শোতে বলেছেন, শাহবাগে কোন নারীর গায়ে কেউ হাত দেয় নি? এর অর্থ কি? গায়ে হাত দেয়ার কথা ছিল নাকি? এটাই কি স্বাভাবিক ব্যাপার নাকি? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেছেন শাহবাগে কোন মানি ব্যাগ বা মোবাইল ফোন খোয়া যায় নি, কোন মেয়ের গায়ের ওড়না ধরে কেউ টান দেয় নি। তাহলে কি মেয়েদের ওড়না ধরে টান দেয়া আর মোবাইল ফোন বা মানি ব্যাগ খোওয়া যাওয়া এক কথা? বিজ্ঞাপনে নারীদের পণ্য বানানো হয় বলে এই প্রগতিশীলরাই আপত্তি করেন, অথচ তাদের কাছেই নারী মোবাইল ফোন, মানি ব্যাগের মতোই পণ্যের অধিক কিছু নয়।

দ্যা ডেইলি স্টার পত্রিকায় (২১ ফেব্রুয়ারি) Women in Forefront শিরোনামে শাহবাগে নারীদের অংশগ্রহণের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। শাহবাগে নারীদের জন্য সব কিছু ঠিক আছে বলবার পরেও একেবারে কোন সমস্যা হয় নি, এমন কথা বলতে গিয়েও সেটা বলা সম্ভব হয় নি। রিদমা জাহান নামের একজন আন্দোলনকারী বলেছেন “I want to address the handful of men who insult the spirit of Shahbag by poking and staring at women and I tell them to learn to respect women”।‘আমি কিছু পুরুষের নারীর প্রতি কু-দৃষ্টির বিষয়ে বলতে চাই। আমি তাদের নারীকে সম্মান করতে বলেছি’। এই সব কথা পত্রিকায় বা টিভি প্রতিবেদনে আসে নি।মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে ভাবতে চায় নি মনে হয়। উম্মে রায়হানা (বিডিনিউজ২৪.কম ২২ ফেব্রুয়ারি) লিখছেন ‘শাহবাগে উল্লেখযোগ্য কোনো যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেনি। রাজাকারের ফাঁসির দাবিতে একত্রিত হওয়া মানুষদের মধ্যে কি ধর্ষক-নিপীড়ক নেই? তারা কি শাহবাগের অগ্নিকন্যাদের ভয়ে এখান থেকে শতহস্ত দূরে আছে? মনে রাখতে হবে, ধর্ষক বা যৌন নিপীড়ক বলে আলাদা কোনো জাতি বা দল নেই বলেই তাদের রাতারাতি উধাও হয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ধর্ষক-নিপীড়করা অগ্নিকন্যাদেরই বাবা, ভাই, বন্ধু, প্রেমিক ও স্বামী। তাহলে তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণ কী?’এখানে উল্লেখযোগ্য শব্দের ব্যবহার লক্ষ করার মতো। উম্মে রায়হানা্র প্রশ্ন নিয়েও ভাবা যেতে পারে।


আমরা চাই নতুন প্রজন্মের নারীদের মধ্যে নেতৃত্ব গড়ে উঠুক। যে কারনে শাহবাগ নিয়ে কোন রাজনৈতিক তর্কে আমি প্রবেশ করতে চাই না। তার প্রয়োজন আছে বলাই বাহুল্য। নিজের অভিজ্ঞতায় জানি সচেতন নারীরা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই যে কোন আন্দোলন বা আন্দোলন-মুহূর্তের সীমা ও সম্ভাবনার বিচার নিজেরাই করতে সক্ষম হবেন। নারী আন্দোলনে তাদের সংখ্যা খুব কম, সেটা চোখে পড়ছে। কিন্তু তবুও যেসব নারীরা জাতীয় ইস্যুতে আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করছেন আমরা তাদের স্বাগত জানাবো।


নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে আমরা বুঝেছি যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ যতক্ষণ না রিপোর্ট করা হচ্ছে ততক্ষণ এর বিরুদ্ধে কিছু করা যায় না। রিপোর্ট হলেই কেবল বলা হয় ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন হয়েছে। কাদের মোল্লার ফাঁসীর আদেশ দেয়ার আগের দিন পর্যন্ত পত্রিকা পড়ে মনে হচ্ছিল দেশে ধর্ষণের মহামারী লেগে গেছে।দিল্লীর তরুণী ধর্ষণের ঘটনার পর বাংলাদেশ পাল্লা দিয়ে লেগেছে গণধর্ষণ এবং হত্যাযজ্ঞে্র। এখনো চলছে, পত্রিকার ভেতরের পাতায় আগের কোন খবরের ফলোআপ কিংবা নতুন কোন ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়। তবে ক্ষোভে ফেটে পড়ার মতো করে দেয়া হয় না একটিও।শাহবাগের কোন ঘটনাকে মিডিয়া খুঁজতে চাইলে হয়তো পেতো,কিন্তু ‘বড় কিছু পেতে হলে এ রকম একটু আধটু হবে’ ধরে নিলে কোন রিপোর্টিং হবে না। আর নারীরা নিজেরাও যদি সেটা মেনে নিয়ে থাকেন, যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের জানার কোন উপায় নেই। গতকাল (২৩ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার কাছে সাভারে বাসে ধর্ষণ চেষ্টা থেকে আত্মরক্ষা করতে গিয়ে চাদনী নামের এক গৃহবধুর মৃত্যু ঘটেছে (যুগান্তর, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩)। টেলিভিশনের খবরে একটু এসেছে, তবে খুব গুরুত্ব দিয়ে নয়, একটি দুটি পত্রিকা ছাড়া অন্যান্য পত্রিকায় নাই বললেই চলে।

দ্যা ডেইল্য স্টারের প্রতিবেদনে একটি আপত্তিকর বিষয় হচ্ছে নারীদের উপস্থিতিকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লিখতে গিয়ে ইতিহাস বিকৃতি ঘটানো। তাঁরা Women in Forefront শিরোনামের প্রতিবেদনের সাথে লাকীর একটি ছবি দিয়ে ক্যাপশনে লিখেছেন “Along with men, a large number of women were seen at the forefront of demonstrations in Shahbagh in the capital Tuesday night. Some say that such extra ordinary participation of women in a demonstration is first in Bangladesh” অর্থাৎ বলা হচ্ছে এতো বিশাল সংখ্যক নারীর উপস্থিতি বাংলাদেশে প্রথম। এই ধরণের উক্তি যিনি করেছেন তিনি বাংলাদেশের আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ সম্পর্কে খুব ভা্লভাবে না জেনেই লিখেছেন। প্রথমতঃ বিষয়টি কেবল সংখ্যার বিচারে দেখাটাই ভুল। ভাষা আন্দোলনের সময় মাত্র ৫ জন নারী ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার জন্যে মিছিলের সামনের সারিতে থেকে যা করেছেন তা বাংলাদেশের ইতিহাসের অভিমুখ নির্ধারণ করে দিয়েছে। তা রাতভর শাহবাগে থেকে ৫০০ নারী করতে পারে নি। এখন পর্যন্ত শাহবাগের যে রাজনৈতিক চরিত্র দেখছি তা কম্বেশী নির্দাহ্রিত হয়ে গিয়েছে,  নারীরা এই সংগ্রামে নতুন কোন অভিমুখ তৈরী করতে পারবেন কিনা সন্দেহ।  এরপর উনসত্তরের আন্দোলনের সময় নারীরা যেভাবে অংশগ্রহণ করেছেন তা পুরুষদের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। আমি নিজে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় দেখেছি নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি এবং অংশগ্রহণ। সে সময় ঐক্যবদ্ধ নারী সমাজ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কাতারে উল্লেখযোগ্যভাবে ছিল। ১৯৯৫ সালে ইয়াসমিন ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলনে নারীদের উদ্যোগেই হয়েছিল। শাহবাগে অন্ততঃ পুলিশের নিরাপত্তা দেয়া আছে, অথচ নারী আন্দোলনকে সবসময় পুলিশের সাথে লড়াই করতে হয়েছে। তাদের কোন নিরাপত্তা দেয়া ছিল না। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন তখন ব্যাপক সংখ্যক নারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের কোন নিরাপত্তা দেয়া ছিল না। কাজেই শাহবাগে নারীরা আছেন ভাল কথা, তাই বলে এতো বেশী বলা ঠিক নয় যে এর আগে নারীদের উপস্থিতি ছিল না। শাহবাগটাই প্রথম, এই কথা একেবারেই ঠিক নয়।

আমরা চাই নতুন প্রজন্মের নারীদের মধ্যে নেতৃত্ব গড়ে উঠুক। যে কারনে শাহবাগ নিয়ে কোন রাজনৈতিক তর্কে আমি প্রবেশ করতে চাই না। নিজের অভিজ্ঞতায় জানি সচেতন নারীরা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই যে কোন আন্দোলন বা আন্দোলন-মুহূর্তের সীমা ও সম্ভাবনার বিচার নিজেরাই করতে সক্ষম হবেন। নারী আন্দোলনে তাদের সংখ্যা খুব কম, সেটা চোখে পড়ছে। কিন্তু তবুও যেসব নারীরা জাতীয় ইস্যুতে আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহন করছেন আমরা তাদের স্বাগত জানাবো। তবে নারীর প্রশ্নকে দৃশ্যমান করে তুলতে হলে কিম্বা যে কোন আন্দোলনের অন্তর্গত থেকেও তাকে সক্রিয় রাখতে হলে নির্যাতনের মুল জায়গা পুরুষতন্ত্রকে প্রতিহত করতে হবে।

সেই কাজে এই নব প্রজন্মের নারীরা এগিয়ে আসবেন এই বিশ্বাস আমি রাখতে চাই।