বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির পরিণতি


এ লেখাটি মূলত একটি অভিভাষণ। এই সময়ে রাজনৈতিক মঞ্চে সর্বাধিক আলোচিত মানুষ মাহমুদুর রহমানের বই প্রকাশনা উপলক্ষে গত ২৩ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে অভিভাষণটি দেওয়া হয়েছিল। শাহাদৎ তৈয়ব ভাষণটির অনুলিখন করেছেন। মাহমুদুর রহমানের প্রকাশনার মধ্যে দুইটি তার নিজের লেখা এবং একটি তিনি সম্পাদনা করেছেন। বইয়ের দুইটির নাম হচ্ছে, 'জয় আসলে ভারতের' এবং 'গুমরাজ্যে প্রত্যাবর্তন' , সম্পাদিত বইটির নাম 'দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশঃ সমাজচিন্তকদের ভাবনা'। এই পাতায় ছাপবার দরকারে দরকারে কিঞ্চিৎ সম্পাদনা করে এখানে পেশ করা হোল।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ যে চরিত্র গ্রহণ করেছে তাতে শাহবাগের রাজনীতি ও আচরণের বিপরীতে বিপুল মানুষের ক্ষোভ তৈরী হয়েছে। মাহমুদুর রহমান এই ক্ষোভের প্রতীক হিশাবে গণমানুষের প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছেন। আমরা অবশ্যই সেই প্রিয় মানুষ মাহমুদুর রহমানের তিনটি নতুন প্রকাশিত বই নিয়ে আলোচনা করতে এসেছি। তার বইয়ের দুই মলাটের মধ্যে পৃষ্ঠাবন্দী লেখাগুলো নিয়ে আলোচনা করা গেলে সুবিচার হোত। কিন্তু গত কয়েকদিনে বেশকিছু ঘটনা ঘটে গিয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের লক্ষণ এতে ফুটে উঠেছে। ফলে এই অনুষ্ঠানের সময় গত কয়েকদিনে যে-পরিবর্তনগুলো ঘটেছে, তা আমাদের সকলেরই চিন্তা দখল করে আছে। সেই পরিবর্তনে, আপনারা নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন, মাহমুদুর রহমান এবং দৈনিক ‘আমার দেশ’ রাজনীতিতে নির্ধারক ভূমিকা পালন করেছে। মোদ্দা কথা হচ্ছে মাহমুদুর রহমানের বই নিয়ে আলোচনা করতে এলে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলা ছাড়া উপায় থাকে না। সময় কম বলে তার বই প্রকাশকে স্বাগত জানাব, কিন্তু বই নিয়ে কথা বলার সময় বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বারবার আলোচনায় ফিরে না এসে বরং বর্তমান রাজনীতির ওপরই আমার বক্তব্য কেন্দ্রীভূত রাখব। তাঁর বইয়ের লেখাগুলো এর আগে পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। অনুমান করে নেব আপনারা তা পড়েছেন।

আপনারা জানেন, মাহমুদুর রহমান আমার বন্ধু। তিনি স্বাধীনচেতা মানুষ। তাঁর নিজস্ব চিন্তা আছে, তিনি আমার মতো কমিউনিস্ট নন, কিন্তু আমি আবার বামপন্থী নই। অতএব নাস্তিকও নই। খেয়ে না খেয়ে ধর্মের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার সঙ্গে কমিউনিজমের কোনই সম্পর্ক নাই। মনে রাখতে হবে আস্তিক/নাস্তিক ভাগ শুরু হয়েছিল স্নায়ু যুদ্ধের সময় থেকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চিনের বিরুদ্ধে বেসামরিক যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল হিশাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীরা প্রচার করেছিল কমিউনিজম নাস্তিকের ধর্ম। তার বিরুদ্ধে জেহাদ ঈমানী কর্তব্য। তারা আমাদের ধর্মপ্রাণ মানুষ আলেম ওলামাদের বিভ্রান্ত করতে পেরেছিল, কারণ কমিউনিস্টদের একাংশ নিজেদের নাস্তিক বলে জাহির করত এর ফল তাদের জন্য ভাল হয় নাই ইতিহাস তার প্রমাণ। এতে ধারণা তৈরী হয়েছে নাস্তিকতাই প্রগতিশীলতা। কিন্তু কমিউনিজমের যাঁরা গুরু মার্কস বা লেনিন তারা কখনই ধর্মের বিপরীতে নাস্তিকতাবাদ প্রচার করেন নি। কিন্তু ধর্মের নামে জালিমের ওপর শোষণ নিপীড়নের বিরোধিতা করেছেন।  গণমানুষের দরদী যে কোন মোমিন মুসলমান যে কাজটি সবসময়ই করে থাকেন। একই সঙ্গে বারবার বলেছেন, ইতিহাসে ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে যখন ধর্ম জালিম শাসক ও তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা হিশাবে কাজ করেছে। বাংলাদেশে আজ আমরা সেই পরিস্থিতির মধ্য প্রবেশ করেছি কিনা তার বিচার আমি আপনাদের ওপর ছেড়ে দেব। ফলে ‘বামপন্থী’ হলেই ওদের প্রগতিশীল ভাববেন না। যাদেরকে মওলানা ভাসানীর মতো আমরা মজলুম, নিপীড়িত শোষিত মানুষের পাশে দেখি না, দেখি শেখ হাসিনার বাদশাহী টিকিয়ে রাখবার গর্হিত কাজে, তাদের 'প্রগতিশীল' বলে মানবার কোন যুক্তি নাই। তারা সারাদেশের গরিব, শোষিত নিপীড়িত তরুণদের ‘তরুণ’ বলে স্বীকার করে না। স্বীকার করে না কলকারখানায় যারা এদেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখবার জন্য দিনের পর দিন তাদের রক্ত ক্ষয় করে যায়, যারা পুড়ে মরে, কারখানা ভেঙে চাপা পড়ে, জ্যান্ত কবর হয় । বাংলাদেশের যে সকল ‘তরুণ’ দেশে দেশে শ্রমিক হয়ে বুকের জল পানি করে এদেশে অর্থ পাঠায়, বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখে তারা ‘প্রজন্ম’ নয়। প্রজন্ম হোল তারাই যারা ‘জয় বাংলা’ শ্লোগান দেয়। দিন রাত আওয়ামী লীগ ও ছাত্র লীগের পাহারায় ও পুলিশি নিরাপত্তার বেষ্টনীর মধ্যে বিচার মানি না শুধু ‘ফাঁসি চাই, ফাঁসি চাই’ বলে উৎসব করে। ভেবে দেখুন আমরা গণমাধ্যমের বদৌলতে কী পরিমান মিথ্যা ও অবাস্তব জগতে বাস করছি। প্রপাগাণ্ডা ও মিথ্যচারেরও একটা সীমা থাকে। রাজনীতির বোঝাবুঝি থাক, কেউ কমিউনিস্ট হোক বা না হোক, ‘তারুণ্য’ আর ‘প্রজন্ম’ নামক শাহবাগী ধারণার মধ্যেই যে এদেশের গরীব অত্যাচারিত, নির্যাতীত শ্রমিক ও খেটে খাওয়া জনগণকে অস্বীকার করার তত্ত্ব নিহিত রয়েছে সেটা বোঝার জন্য কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট। সেইসব কোটি কোটি বাংলাদেশের সত্যিকারের তরুণ যাদের ঘামে ও রক্তে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরে তারা নয়, শহরের তরুণদেরও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি অংশ-- একমাত্র তারাই নাকি তরুণ। আবার শাহবাগীরাই দেশের একমাত্র ‘ব্লগার’ নয়, আরও বহু চিন্তা ও মতের ব্লগার আছে। কিন্তু গণমাধ্যম আজ তাদেরকেই ‘প্রজন্ম’ বলে হাজির করছে যদের অনেকে ধর্মের বিরুদ্ধে ও মহানবী হজরত মোহাম্মদের পর্নো-জীবনী লিখবার দুঃসাহস দেখিয়েছে। এখন তারা চায় ‘আমার দেশ’ বন্ধ হয়ে যাক। এই পত্রিকাটি তারা জ্বালিয়ে দিতে চায়, তারা চায় মাহমুদুর রহমানকে বন্দী করে আবার কারাগারে পাঠাতে। মাহমুদ আমার বন্ধু। আমি তাঁকে ও তার পরিবারকে ঘনিষ্ঠ ভাবে দেখেছি। তিনি ভয়টয় পান না। আমার বোন তাঁর সহধর্মিনী পারভিনেরও ভয়ডর কম। কিন্তু এই লড়াইতে আমি আবেদন করি যার যার বিশ্বাস ও রীতি অনুযায়ী মাহমুদুর রহমান ও তাঁর মা ও পরিবারের প্রতি দোয়া, আশীর্বাদ ও সংহতি জানাতে। আজ বাংলাদেশ খুব কঠিন লড়াইয়ের সম্মুখিন। গণমাধ্যমের মিথ্যাচারের কারনে আমরা যেন সংগ্রামে বিভিন্ন পক্ষের শ্রেণি চরিত্র বুঝতে ভুল না করি।


‘বামপন্থী’ হলেই ওদের প্রগতিশীল ভাববেন না। যাদেরকে মওলানা ভাসানীর মতো আমরা মজলুম, নিপীড়িত শোষিত মানুষের পাশে দেখি না, দেখি শেখ হাসিনার বাদশাহী টিকিয়ে রাখবার গর্হিত কাজে, তাদের 'প্রগতিশীল' বলে মানবার কোন যুক্তি নাই। তারা সারাদেশের গরিব, শোষিত নিপীড়িত তরুণদের ‘তরুণ’ বলে স্বীকার করে না। স্বীকার করে না কলকারখানায় যারা এদেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখবার জন্য দিনের পর দিন তাদের রক্ত ক্ষয় করে যায়, যারা পুড়ে মরে, কারখানা ভেঙে চাপা পড়ে, জ্যান্ত কবর হয় ।


আমরা মনে করি, আজ নতুন যে মামলাটি মাহমুদুর রহমানের উপর দেয়া হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেও আশা করি আপনারা তার জন্য দোয়া ও আশির্বাদ করবেন, সংহতি জানাবেন। তিনি ও তার পরিবার যেন সাহসের সঙ্গে মোকাবিলার শক্তি পায়। যেন আমরা সামনের লড়াইও সাহসের সঙ্গে সবাই মোকাবিলা করতে পারি।

আমাদের বুঝতে হবে বাংলাদেশকে যে জায়গায় আজ নিয়ে যাওয়া হয়েছে, - গত দুদিনের ঘটনায় যা স্পষ্ট - আমরা ফিরে আর সেই আগের জায়গায় যেতে পারছি না। আমরা যারা রাজনীতি একটু একটু বুঝি, আমাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে একটু আধটু ধারণা রাখেন তাদের এটা বুঝতে কষ্ট হবার কথা নয় যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। আর আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া যাবে না। শফিক রেহমান ভাই শান্তির কথা বলেছেন, আমাদের এখানে হাজির এমন কেউ নাই যারা শান্তি চায় না। আমরা সবাই এখানে শান্তি চাই। কিন্তু অনেকে বলছেন গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধ ঘটিয়ে দেবার ইতিহাস কিন্তু আওয়ামী লীগের আছে। বাংলাদেশ যদি সেই বিপর্যয়ের মধ্যে নিপতিত হয় তাহলে সেটা প্রথম ঘটনা হবে না। গৃহযুদ্ধ এর আগেও বাংলাদেশে হয়েছে। আপনারা ভুলে যাবেন না সেইকথা। কিভাবে সেটা হয়েছিল? যখনই আপনি আপনার ভাষা বা সংস্কৃতিকে – আপনার ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়, সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে ও সামাজিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ না রেখে তার ‘রাজনীতিকরণ’ করেন, তাকে পলিটিসাইজ করেন, তখনই আপনি দেশে একটি সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি তৈরী করেন। যারা পলিটিক্যাল সাইন্সে একটু পড়াশোনা করেছেন তারা জানেন ‘রাজনীতিকরণ’ কথাটার মানে কি। নৃতাত্ত্বিক বা ভাষা ভিত্তিক কোন একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও পরিচয়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের আকার দিবেন, একটা রাজনীতি দাঁড় করাবেন, মনে রাখবেন তখন এই রাষ্ট্র দুর্বল হবে, একটি পরিচয়ের বিপরীতে আরেকটি পরিচয় এসে দাঁড়াবে, নতুন সংঘাতের ভিত্তি হবে। যেটা শেষ পরিণতিতে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি জন্মানোর উৎস হবে।


গৃহযুদ্ধ এর আগেও বাংলাদেশে হয়েছে। আপনারা ভুলে যাবেন না সেইকথা। কিভাবে সেটা হয়েছিল? যখনই আপনি আপনার ভাষা বা সংস্কৃতিকে – আপনার ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়, সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে ও সামাজিক পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ না রেখে তার ‘রাজনীতিকরণ’ করেন, তাকে পলিটিসাইজ করেন, তখনই আপনি দেশে একটি সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি তৈরী করেন।


আমাদের দেশে বাঙালি আছে, চাকমা, আছে, মান্দিরা আছেন আরও অনেক জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতি আছে। তাদের মধ্যে সামাজিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখা ও পরস্পরের মধ্যে আদানপ্রদানের ভিত্তিতে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলা সহজেই সম্ভব। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা এবং পরস্পরের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবন যাপনে সামাজিক স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে সেটা খুবই সম্ভব। কিন্তু যদি ‘বাঙালি’রা বলে তাদের সংস্কৃতিই রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে একমাত্র জাতীয় পরিচয়, রাষ্ট্রের ভিত্তি হিশাবে সকলকে এই ‘বাঙালিত্ব’ স্বীকার করতে হবে, তখনই সেটা অন্য ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তাকে রাজনৈতিক ভাবে চ্যালেঞ্জ করে। অথচ বাঙালি আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠের আত্মপরিচয় এ ব্যাপারের কোন সন্দেহ নাই, এবং সেই পরিচয় স্বীকার বা ত্যাগ করবারও কোন প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু আপনি ‘বাঙালি’ বলে যদি দাবি করেন যে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ই আমাদের রাজনৈতিক আদর্শ, একে সাংবিধানিক ভাবে রাষ্ট্রনীতির অন্তর্ভূক্ত করতে হবে, তাহলে আপনি চাকমাসহ পাহাড়ি ও সমতলের অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে রাজনৈতিক ভাবে চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন। পাহাড়িরা তা মানবে না, মানে নি, মানবার কথাও নয়। তাদের আর্জি, আকুতি কিছুই আপনি শুনলেন না। বাঙালি জাতীয়তাবাদকেই রাজনৈতিক, রাষ্ট্রনৈতিক ও সাংবিধানিক ভাবে প্রতিষ্ঠা করলেন। তখন কি হবে? প্রথমে তারা প্রতিবাদ করবে। মানবেন্দ্রনাথ লারমা প্রতিবাদ করলেন, আপনি শুনলেন না। তখন তারা আন্দোলনে নামলেন, আপনি তারপরেও শুনলেন না। এরপর তারা তাদের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য অস্ত্র ধারণ করলেন। আপনি যেমন পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির রাজনৈতিক সত্তা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ভারত থেকে সহায়তা পেয়েছিলেন তারাও ভারত থেকে সহযোগিতা পেলেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের রণধ্বনী বাংলাদেশকে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিল। যার ক্ষত আমরা এখনও শুকিয়ে উঠতে পারিনি। নতুন করে ১৫দশ সংশোধনীতে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে এখন আবার নতুন বিষফোঁড়া হিশাবে গাড়া হয়েছে।

সামাজিক, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ‘রাজনীতিকরণ’বলতে কী বোঝায় তা আশা করি পরিষ্কার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জায়গা থেকে না বুঝলেও অভিজ্ঞতা থেকেই আপনারা জানেন ভাষা, সংস্কৃতি ইত্যাদির রাজনীতিকরণের অর্থ কি। এমনকি সেকুলার বনাম ইসলাম এভাবে রাষ্ট্রের ভিত্তির তর্ক তুলেও এই আকাম আপনি করতে পারেন। যদি বলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদই বাংলাদেশের সকলের একমাত্র রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়, বাঙালি ছাড়া আমরা আর কোন জাতিসত্তাকে রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় ভাবে স্বীকার করি না, তাহলে অন্যদের আপনি দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করলেন। তারা তখন প্রতিবাদ জানাবে, শক্তি থাকলে অস্ত্র হাতে আপনার মতোই নিজেদের আত্ম-মর্যাদা ও আত্ম-পরিচয় রক্ষার জন্য আপনার বিরুদ্ধে লড়বে। আপনার রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়বে। পারলে রাষ্ট্রকে দুই ভাগ করে ফেলবে। তাই বলছিলাম বাংলাদেশের প্রথম গৃহযুদ্ধের কথা ভাবুন। বাঙালি জাতীয়তাবাদ কি বাংলাদেশের প্রথম গৃহযুদ্ধে্র উস্কানিদাতা হিসাবে হাজির হয় নি? বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে কি রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা হয় নি? কিন্তু এরাই আবার ধর্মকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা যাবে না সেই দাবি তোলে, ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে।

মনে রাখবেন গৃহযুদ্ধ আওয়ামী লীগ লাগাতে জানে। আওয়ামী লীগ মনে করে তারাই দেশের একমাত্র মালিক, ফলে সকল ক্ষমতারও মালিক। এখন তারা দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ শুরু করেছে। নতুন যে পরিস্থিতি তারা তৈরি করেছে তাতে সমাজকে তারা দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছে। একদিকে আছে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা আর অন্যদিকে আছে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষ। যারা অবশ্যই ভাষা ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে বাঙালি, কিন্তু একই সঙ্গে ধর্মও তাদের সংস্কৃতির অংশ। ধর্ম তাদের আত্ম-পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু যদি আপনি নিরন্তর আর বারবার দাবি করেন ভাষা ও সংস্কৃতিই আপনার মূল পরিচয়, ধর্ম নয়, তখন নতুন এক বিরোধ আপনি তৈরী করেন। সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্র অতিক্রম করে ভাষা ও সংস্কৃতিকে যদি রাজনৈতিকতা ও রাষ্ট্রের স্তরে উন্নীত করে আপনি দাবি করেন, এই স্তরে – অর্থাৎ আপনার রাজনৈতিক পরিচয়ে শুধু ‘বাঙালিত্বই’ স্বীকার করা হবে, ইসলামকে স্বীকার করবেন না। তখন আপনি যেমন ভাষা ও সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক ঝাণ্ডা বানিয়ে সামনে দাঁড়ান, তখন আপনি চান বা না চান, প্রতিপক্ষ হিশাবে ইসলামও তার ধর্মের ঝাণ্ডা নিয়ে সামনে দাঁড়ায়। দাঁড়াতে বাধ্য। দাঁড়াবার শর্ত তৈরি হয়ে যায়। বাঙালিকে আপনি বিভক্ত করেন। একদিকে থাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা আর অন্যদিকে ইসলাম ও ধর্মের মর্যাদা রক্ষার জন্য ধর্মপ্রাণ মানুষ। আপনি তখন তাদের ধর্মান্ধ, গোঁড়া, পশ্চাতপদ এবং খুব অপছন্দ হলে ‘রাজাকার’ গালি দিয়ে থাকেন। এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য বিশ্বের সহযোগিতায় তাকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে তার বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নেমে পড়েন। আজ শেখ হাসিনার সরকার সেই দ্বিতীয় গৃহযুদ্ধ শুরু করেছে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি বাংলাদেশের মানুষকে ‘বাঙালি’ ও ‘মুসলমান’ – এই দুই ভাগে ভাগ করে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছে। মানুষের ধর্মানুভূতিকে আহত করা হয়েছে।


যদি আপনি নিরন্তর আর বারবার দাবি করেন ভাষা ও সংস্কৃতিই আপনার মূল পরিচয়, ধর্ম নয়, তখন নতুন এক বিরোধ আপনি তৈরী করেন। সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্র অতিক্রম করে ভাষা ও সংস্কৃতিকে যদি রাজনৈতিকতা ও রাষ্ট্রের স্তরে উন্নীত করে আপনি দাবি করেন, এই স্তরে – অর্থাৎআপনার রাজনৈতিক পরিচয়ে শুধু ‘বাঙালিত্বই’ স্বীকার করা হবে, ইসলামকে স্বীকার করবেন না। তখন আপনি যেমন ভাষা ও সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক ঝাণ্ডা বানিয়ে সামনে দাঁড়ান, তখন আপনি চান বা না চান, প্রতিপক্ষ হিশাবে ইসলামও তার ধর্মের ঝাণ্ডা নিয়ে রাজনৈতিক শক্তি হিশাবে সামনে দাঁড়ায়। দাঁড়াতে বাধ্য। দাঁড়াবার শর্ত তৈরি হয়ে যায়।


যারা ইসলামে বিশ্বাসী তারা নিঃসন্দেহে নাস্তিকতার বিরোধী – এটা তাঁর ঈমান-আকিদার অংশ। কিন্তু কেউ যদি নাস্তিক থাকতে চায় – সেটা তার নিজের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের দায় দায়িত্ব তার নিজের। নাস্তিকদের সঙ্গে মোমিন মুসলমানের সামাজিক কোন ঝগড়া নাই। ফলে কাউকে যখন তখন মুরতাদ বলা বা তার বিশ্বাসের জন্য শারিরীক ভাবে ক্ষতি করা মোমিনের কাজ হতে পারে না। সমাজে নাস্তিক আছে, থাকবে। সামাজিক কোন ঝগড়া নাই। আপনার ছেলেও নাস্তিক হতে পারে। আপনি তাকে বুঝান, ঘরের মধ্যে বুঝান, নাস্তিকতাও একটা আদর্শ হতেই পারে। অসুবিধা নাই। কিন্তু আপনি যখন নবী রসুলদের বিরুদ্ধে এমনসব কুৎসিত ও কদর্য ভাষায় লেখেন, লেখালিখি করেন, তখন কি হবে? একে দিনের পর দিন যখন প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তখন বোঝা যায় পরিকল্পিত ভাবে আপনি বাংলাদেশকে হিংসার পথে নিয়ে যেতে চান। ব্লগে নবীকরিম সাল্লালাহু আলাইহে ওয়াসাল্লেমের বিরুদ্ধে যে কদর্য ভাষায় লেখালিখি হয়েছে তা কোন বিবেকবান মানুষের পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। এটা কিন্তু নতুন না। সবসময়ই সেকুলারিজমের নামে, বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে বাংলাদেশে এইসবকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে এইসব চিন্তার স্বাধীনতা। এখন শাহবাগের কিছু ব্লগারের কীর্তিকাহিনী প্রকাশ হয়েছে বলে নয়। শেখ হাসিনা তো এই ধরনের ব্লগারদেরই প্রশ্রয় দিয়েছেন। দীর্ঘ দিন ধরে তাদের প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এর আগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কেউ দুই একটি মন্দ কথা লিখেছে বলে তাদের তাদের জেলে ঢুকিয়েছেন তিনি। কিন্তু কুৎসিত ভাষায় লেখা এই ব্লগগুলো এর আগে রাষ্ট্রের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ গণ্য করা হয় নি। এটাকে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে উসকানি দেবার জন্যই প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানে রয়েছে পাবলিক অর্ডার নষ্ট করতে পারে এমন কাজ করা যাবে না। আমাদের বিচার বিভাগের নজরে আনার পর তারা সুনির্দিষ্ট ভাবে এইসব ব্লগ ও ব্লগারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন।শেখ হাসিনার সরকার কোন ব্যবস্থা নেয় নি। রাষ্ট্র কোন কিছুই করে নি। উলটা দেখছি এই ধরণের ব্লগারদের নিয়েই শাহবাগের ‘প্রজন্ম’ গঠিত হয়েছে।

যারা এই দেশের মানুষের ধর্মানুভূতিকে সচেতন ভাবে আহত করেছে তারা আজ শেখ হাসিনার মদতপুষ্ট হয়ে বরং মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে উল্টা উসকানি মূলক বক্তব্য দিচ্ছে। পত্রিকা পোড়াচ্ছে। ফলে আমাদের খেয়াল করতে হবে এ ধরনের উসকানির জন্য শেখ হাসিনা সরকার এবং বর্তমান রাষ্ট্র ষোল আনা দায়ী। আজ উস্কানিদাতারা মাহমুদুর রহমানকে উস্কানি দাতা বলছে এবং সরকার তাকে গ্রেফতার করবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে

ব্লগের কুৎসিত লেখাগুলো আগে ইনকিলাবে ছাপা হয়েছে সেগুলো মাহমুদুর রহমান তুলে ধরেছেন, যারা নিজেদের এইধরণের ব্লগার এবং এক্টিভিস্ট বলে দাবি করেন বাংলাদেশে তারাই ‘তরুণ’, তারাই নাকি ‘প্রজন্ম’। শাহবাগ তাদেরই গণজাগরণ হচ্ছে।

তারপরও ব্লগার রাজিবের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করতে হবে আমাদের। কিন্তু যিনি তার ছেলেকে হারিয়েছেন সেই ছেলের মায়ের যেমন ব্যথা, তার বাবার যেমন ব্যথা, মনে রাখতে হবে ঠিক একইভাবে একটা ছেলে যদি ইসলামি রাজনীতি করে, আপনি তাকে পছন্দ না করতে পারেন, সমর্থন করতে না পারেন, কিন্তু সে যখন মারা যায়, তাকে যখন গুলি করে মারা হয়, তার বাপের ব্যথা মায়ের বেদনাও আপনাকে শুনতে হবে। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা সেটা শুনতে পায় না। শেখ হাসিনা শুনতে পাননা। আপনি শুনতে পারেন না, আপনি তার মায়ের ব্যথা শুনতে কিন্তু রাজি নন। কারন সে নাকি ইসলামি রাজনীতি করে। সে বাঙালি জাতীয়তাবাদী নয়। ইতিমধ্যে যাদের প্রাণ হারিয়েছে আমরা, এমনকি তাদের নিয়েও আমরা কথা বলি না। তাদের নিয়ে মিডিয়াতে কথা বলি না। মানবাধিকার কর্মীরাও কথা বলি না।


একটা ছেলে যদি ইসলামি রাজনীতি করে, আপনি তাকে পছন্দ না করতে পারেন, সমর্থন করতে না পারেন, কিন্তু সে যখন মারা যায়, তাকে যখন গুলি করে মারা হয়, তার বাপের ব্যথা মায়ের বেদনাও আপনাকে শুনতে হবে। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা সেটা শুনতে পায় না। শেখ হাসিনা শুনতে পাননা।


আপনি দাবি করছেন আপনি তরুণ প্রজন্ম, আমি আজ সকালে এক তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে কথা বলি, যে তরুণ প্রজন্ম শাহবাগে যান। আমি তাদের প্রশ্ন করিঃ আপনারা ‘তরুণ’ কিন্তু যে তরুণকে পুলিশ গুলি কতে হত্যা করল সে কি তরুণ নয়? সে তাহলে কোন প্রজন্ম? তাহলে কি তারা জন্তু জানোয়ার? আপনি যদি ইসলামের কথা বলেন তাহলে আপনি ‘তরুন’ হবেন না, নিজেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী না ভাবলে আপনি তরুণ প্রজন্মের লোক নন? এটা কি করে হতে পারে? তাহলে এই যে বিভক্তিটা টানা হচ্ছে তার ভিত্তিটা কি? যে গণমাধ্যমগুলো প্রজন্ম প্রজন্ম করছে -- লক্ষ লক্ষ মানুষ, কোটি কোটি মানুষ, শত কোটি কণ্ঠস্বরের কথা বলছে তারা কাদের কথা বলছে? তারা কারা? যে গণমাধ্যম এগুলো বলছে তারাও দেশকে আজ দুইভাগে ভাগ করে ফেলেছে। প্রত্যেকটি গণমাধ্যম উসকানির জন্য দায়ী। এই ধরণের প্রত্যেকটি গণমাধ্যমকে প্রমাণ করতে হবে, আগামী দিনে যে বিশৃংখলা হবে তার শর্ত তারা তৈরি করেছে দিনের পর দিন, তারা সাংবাদিকতার নামে পলিটিক্যাল এক্টিভিস্টের ভূমিকা পালন করেছে, তাদের একদিন নিশ্চয়ই জবাবদিহি করতে হবে। সাংবাদিকতার ভূমিকা এরা কেউ পালন করে নি।

এটা খুব পরিষ্কার থাকতে হবে, উসকানির ক্ষেত্রে যে গণমাধ্যমগুলো দায়ী আজকে তারাই উলটা মাহমুদুর রহমানকে উসকানিতে অভিযুক্ত করছে। আপনাদের যদি মাহমুদুর রহমানের কোন সংবাদের ব্যাপারে আপত্তি থাকে, তার কোন লেখার ব্যাপার আপত্তি থাকে, সেটা নিয়ে নিশ্চয়ই আলোচনা করা যায়, আলোচনা করা উচিত। আমিও করতে রাজি আছি। কিন্তু যারা উসকানি দিচ্ছে প্রতিনিয়ত তাদের উসকানির ব্যাপারে কিছু বলছেন না, কিন্তু যেভাবেই হোক মাহমুদুর রহমানকে কারাগারে ঢোকাবার জন্য আপনারা ব্যস্ত হয়ে গিয়েছেন।

তরুণরা যারা শাহবাগে যাচ্ছেন তাদের আমি বিনীতভাবে বলছি আপনারা যারা ভেবেছেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচার হয়নি, ঠিক আছে। আসলেই তো হয় নি। শেখ মুজিব ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। এখন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার চলছে। আপনারা প্রতিবাদ জানাতে গেছেন, বিক্ষুব্ধ হয়েছেন, কেন? কারণ এর আগে একজনের ফাঁসির রায় না হয়ে যাবজ্জীবন হোল। আপনাদের মনে হয়েছে জামাতের সঙ্গে আওয়ামীলীগের একটা আঁতাত হয়েছে, আপনারা এর জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করতে, প্রতিবাদ জানাতে ওখানে গেছেন, এটা ন্যায্য। এর অধিকার আপনার আছে। কিন্তু গিয়ে যখন দেখছেন, পুরো ব্যাপারটা আওয়ামীলীগের সাজানো। ছাত্রলীগ পুরো এই অনুষ্ঠানটা পরিচালনা করছে, যারা ওখানে সাংস্কৃতিক কর্মী বলে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন তারা আওয়ামীলীগের মানুষ, যারা অন্য পরিচয় দিচ্ছেন -- যেমন, নিজেকে ব্লগার বলছেন তিনি আওয়ামী লীগেরই অঙ্গ সংঠনের একজন লোক। তাহলে এটা তো পরিষ্কার হয়ে যাবার কথা যে পুরোটাই একটা আওয়ামী সমাবেশ ছাড়া কিছুই না। আপনি কিসের ভিত্তিতে একে তরুন প্রজন্ম ভাবলেন? তরুণ প্রজন্ম কাকে বলছেন? তারা কারা? এরা ছাত্রলীগ, যুব লীগ বা আওয়ামী রাজনীতির সমর্থক। এর আগে পরশু তারা যেখানে ঘোষণা দিচ্ছিল, ওখানে দাঁড়িয়ে ছিল ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি। তারাই ডিক্টেট করছেন, তারাই নির্দেশ দিচ্ছেন, অথচ গণমাধ্যম সেই সত্য লুকিয়ে তাকে বলছে এটা তরুণ প্রজন্ম চত্বর।

অস্বীকার করবার উপায় নাই তরুণদের বড় একটি অংশ মনে প্রাণে ক্ষুব্ধ। তাদের এ ক্ষুব্ধতাকে অবশ্যই আমাদের বুঝতে হবে। কিন্তু তারা যেভাবে আওয়ামী ছত্র ছায়ায় নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সেটা সঠিক ভাবে করছেন না। দেশকে তারা যেখানে ঠেলে দিয়েছেন সেই জায়গা থেকে ফিরে আসার উপায় নাই। আমি রাজনীতি যতটুকু বুঝি, তাতে মনে করি এখান থেকে ফিরে আসার সুযোগ খুবই কম। কারণ পরিণতিটা ব্লগারদের সামনে রাখার মধ্যে নিহিত রয়েছে। যে কুৎসিত ব্লগ নিয়ে কথা হয়েছে হতে পারে সেটা একজন ব্লগারের সমস্যা। এটা ব্যক্তিগত কুকাণ্ড। শাহবাগের তরুণদের যারা নিজেরা খুব সহনশীল নয়, তাদের বহুরকম বেয়াদপি আমরা সহ্য করতে রাজি আছি। একজন ব্লগারের জন্য সব ব্লগারকেতো আমরা দোষী করতে পারি না। তরুণ বলে ক্ষমা করে দিতেও রাজি আছি। কিন্তু সেই তরুণকে তরুণ প্রজন্মের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের ‘শহিদ’ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। শুধু শহীদ বলে ঘোষণা দিয়ে ক্ষান্ত হন নি। আপনারা তার ভাস্কর্য স্থাপন করছেন। প্রধানমন্ত্রী তার বাসায় গেছেন, যাকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হোল সেই বিশ্বজিতের বাসায় যান নি। এতে তিনি কি প্রমাণ করলেন? এটাই প্রমাণ করলেন যে তিনি ব্লগার রাজিবের আদর্শ ধারণ করেন। সেই আদর্শ হচ্ছে রসুলে করিমের বিরুদ্ধে কুৎসিত লেখালিখি করা। এখন চলছে ব্লগার রাজিবের কুকাণ্ড লুকাবার জন্য নির্জলা মিথ্যাচার। শেখ হাসিনার কাছে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের পক্ষ হয়ে জবাব চাইতে পারি আমরা। ছাত্রলীগ কুপিয়ে বিশ্বজিতকে হত্যা করল, টেলিভিশানের ক্যামেরার সামনে। তার বাড়িতে যাবার সময় আপনার হয় নি। কিন্তু ব্লগার রাজিবকে আপনি কোন যুক্তিতে মহামান্বিত করলেন? কোন আদর্শের তাগিদে আপনি তা বোধ করলেন? কোন নৈতিকতায় আপনি বিশ্বজিতের প্রতি সমবেদনাও নয়, অথচ ব্লগার রাজিবকে মহান চিহ্নিত করলেন? বাংলাদেশে যদি কোন ধর্মপ্রাণ বা ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ থাকে, সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ থাকে, অপ্রকৃতিস্থ না হয় -- এরকম যদি কোন মানুষ বাংলাদেশে আদৌ থেকে থাকে তাহলে এরপরে তিনি যদি শেখ হাসিনার সরকারকে সমর্থন করেন তাহলে আমি নিশ্চিত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।


যে কুৎসিত ব্লগ নিয়ে কথা হয়েছে হতে পারে সেটা একজন ব্লগারের সমস্যা। এটা ব্যক্তিগত কুকাণ্ড। শাহবাগের তরুণদের যারা নিজেরা খুব সহনশীল নয়, তাদের বহুরকম বেয়াদপি আমরা সহ্য করতে রাজি আছি। একজন ব্লগারের জন্য সব ব্লগারকেতো আমরা দোষী করতে পারি না। তরুণ বলে ক্ষমা করে দিতেও রাজি আছি। কিন্তু সেই তরুণকে তরুণ প্রজন্মের দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের ‘শহিদ’ বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।


একজন প্রধানমন্ত্রী, যিনি দেশের সকল মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন তিনি জানেন এই ব্লগার কি লিখেছে। তিনি রাজিবকে পুরো আন্দোলনের শহিদ আকারে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। এখান থেকে শাহবাগী ও আওয়ামী রাজনীতির সরে আসার কোন সুযোগ আমি দেখছি না। এর বিপরীতে রাজিবের আদর্শ যে রাজনীতি ধারণ করে, যা এতদিন সুপ্ত ছিল, সেটাই মাহমুদুর রহমান প্রকাশ করে দিয়েছেন। এতে গণবিস্ফোরণ ঘটেছে। কিন্তু আজকে যারা বিস্ফোরণে ফেটে পড়ছে, প্রতিবাদ জানাচ্ছে, তাদের প্রতি আমাদের নিবেদন, কোন অবস্থাতেই সাম্প্রদায়িকতাকে যেন কোনভাবেই আমরা প্রশ্রয় না দেই। ফলে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে যে, এই লড়াই মুসলমান-অমুসলমানের লড়াই নয়। এটা হচ্ছে অশ্লীল-কুৎসিত বিকৃত রুচির আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই – শেখ হাসিনার বাঙালি জাতীয়তাবাদ যে আদর্শ ধারণ করে। ধর্মীয় কোন বিশ্বাসের প্রতি যাদের শ্রদ্ধা নাই। অন্যের চিন্তা ও মতকে যারা সহ্য করতে পারে না। তাদের বিরুদ্ধে ধর্মপ্রাণ সাধারণ জনগণের, গরিব ও নিপীড়িত মানুষের লড়াই।

নিঃসন্দেহে নবি করিমের ইজ্জত ও ইসলামের মর্যাদা রক্ষা এই লড়াইয়ের প্রধান বিষয়, কিন্তু এটা নয় যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতোই আমরা ইসলাম ধর্মকে, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেমেছি। আমরা লড়ছি আত্ম-মর্যাদার জন্য, শেখ হাসিনা আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে। আমরা লড়ছি গণতন্ত্রের জন্য যেখানে ইসলাম, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি তো অবশ্যই, একই সঙ্গে অন্য সকল জাতি গোষ্ঠির ভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। প্রতিটি ধর্মের মানুষ যেখানে নাগরিক, রাষ্ট্রের চোখে সমান।আজ আমাদের মওলানা মাশায়েখদের পরীক্ষা দেবার সময় এসেছে। তারা ভুল করলে ‘ইসলামী সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় এই দেশকে প্রস্তর যুগে পরিণত করবে। আমাদের হুঁশিয়ার হতে হবে। তারা প্রচার করছে যে একটা ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করবার জন্য জনগণ মাঠে নেমে এসেছে। প্রচার চলছে আবারও মৌলবাদীরা মাঠে নেমে এসেছে। আবারও জামাত শিবির চক্রান্ত করছে। আপনাদের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ ওই পথে যাবেন না। শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আফগানিস্তান বানাতে চায়। ইরাক বানাতে চায়। তারা বাংলাদেশকে একটা ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে চায়। ওই মারাত্মক বিপদের দিকে আমরা যেন না যাই।


নিঃসন্দেহে নবি করিমের ইজ্জত ও ইসলামের মর্যাদা রক্ষা এই লড়াইয়ের প্রধান বিষয়, কিন্তু এটা নয় যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মতোই আমরা ইসলাম ধর্মকে, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেমেছি। আমরা লড়ছি আত্ম-মর্যাদার জন্য, শেখ হাসিনা আমাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেছে। আমরা লড়ছি গণতন্ত্রের জন্য যেখানে ইসলাম, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি তো অবশ্যই, একই সঙ্গে অন্য সকল জাতি গোষ্ঠির ভাষা ও সংস্কৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। প্রতিটি ধর্মের মানুষ যেখানে নাগরিক, রাষ্ট্রের চোখে সমান।


গরিব মানুষ, হাজারো মজলুম মানুষ, লক্ষ কোটি নিপীড়িত মানুষ যাদের মনের কথা কোনদিন আমরা শুনি নাই, তাদের বিভিন্ন ভাবে লুণ্ঠন করা হয়েছে। দেশ লুটপাট করা হয়েছে। বিচার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে। জনগণ বিচার পায় না, কিছুই পায় না। এইযে একটা নৈরাজ্য তৈরি করা রাষ্ট্রহীন অবস্থা তৈরী করা হয়েছে তারই বিরুদ্ধে এই বিস্ফোরণ। তারা মৌলবাদের কথা বলে, জামাত-শিবিরের কথা বলে। ধর্মের ওপর দোষ চাপায়। আসলে তারা টুপি পরা, পাগড়ি পরা লোকদের ঘৃণা করে। ওরা আমাদের – গরিব মানুষদের পছন্দ করে না। তাই যা কিছুই আমরা করি তাকে তারা জামাত-শিবিরের চক্রান্ত বলে দমিয়ে দেবার চেষ্টা করে। যেহেতু আমরা টুপি পরি। দাড়ি রাখি, আমরা আমাদের নিজস্ব একটা সংস্কৃতির কথা বলি এটা তারা পছন্দ করে না।


আপনি যদি মনে করেন, সংস্কৃতি এবং ভাষাকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করবেন, যদি তার দ্বারাই বাংলাদেশের শত্রুমিত্র ঠিক করেন, তখন যারা নিজেদের বাঙালি ভাববার চেয়েও মুসলমান ভাবতে চান -- আর সেই সামাজিক অধিকার তার অবশ্যই আছে – তখন তারাও রাজনৈতিক ভাবে আপনার বাঙালি জাতীয়তাবাদ মোকাবিলার জন্য ইসলামের পতাকা নিয়ে মাঠে নামবেন। এর দ্বারাই বাংলাদেশের শত্রুমিত্র ঠিক হবে।


যারা তরুণ, শাহবাগে গিয়ে তারা অনেকেই নিজেদের বামপন্থী দাবি করেন। তারা অনেকে আছেন। তাদের আমি কিছু কথা বলব। প্রথমত, আপনি বাঙালি জাতির হতে পারেন অসুবিধা নাই। বাঙলা সংস্কৃতির হতে পারেন, চাকমা, মান্দি, সাঁওতাল, রাজবংশী যা কিছু হতে পারেন, আপনি নাস্তিক হলেও কোনই অসুবিধা নাই। কিন্তু যখনই আপনি সংস্কৃতিকে এবং ভাষাকে, বিশেষ সামাজিক পরিচয়ের ‘রাজনীতিকরণ’ ঘটান -- ‘রাজনীতিকরণ’ করেন -- তখন অন্যেরা আপনার বিরুদ্ধে তাদের নিজ নিজ পতাকা নিয়ে দাঁড়াবে। এর আগে জুম্ম জাতির পতাকা দাঁড়িয়েছে, এখন ইসলামের পতাকা দাঁড়াবে। দাঁড়াতে বাধ্য। এর জন্য আপনিই দায়ী। আপনি সমাজ আর রাজনীতির ফারাক বজায় রাখেন নি, ফলে অন্যরাও আর রাখতে রাজি থাকবে না। তারা ইসলামের পতাকা দিয়েই আপনার বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র উৎখাত করবে। এটাই নিয়ম। এই ক্ষেত্রে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি বলে কোন লাভ হবে না।


আমরা এমন এক ইনসাফ ভিত্তিক গণতন্ত্র চাই যেখানে ব্যক্তি স্বাধীন, কিন্তুই সে সমাজের সামষ্টিক স্বার্থের উর্ধে নয়। রাষ্ট্র যেখানে জালিমের হাতিয়ার হয়ে গরিব ও মেহনতি মানুষকে নিপীড়ন করবে না।


আপনি যদি মনে করেন, সংস্কৃতি এবং ভাষাকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করবেন, যদি তার দ্বারাই বাংলাদেশের শত্রুমিত্র ঠিক করেন, তখন যারা নিজেদের বাঙালি ভাববার চেয়েও মুসলমান ভাবতে চান -- আর সেই সামাজিক অধিকার তার অবশ্যই আছে – তখন তারাও রাজনৈতিক ভাবে আপনার বাঙালি জাতীয়তাবাদ মোকাবিলার জন্য ইসলামের পতাকা নিয়ে মাঠে নামবেন। এর দ্বারাই বাংলাদেশের শত্রুমিত্র ঠিক হবে। শেখ হাসিনা সেই দিকেই বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়েছে।

কিন্তু এ লড়াইকে সুন্দর পথে নিয়ে যেতে হবে। আমাদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করতে হবে। যদি গ্রিকো-খ্রিস্টিয়ান ধর্ম ও সংস্কৃতি ইয়োরোপীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা হয় তাহলে এই দেশের মানুষের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিও নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের মৌলিক প্রেরণা হিশাবে কাজ করবে। ইউরোপের রাষ্ট্রের চেয়েও এই রাষ্ট্র হবে আরও বিকশিত, উন্নত ও অগ্রসর। এই ক্ষেত্রে ইসলাম অবশ্যই আমাদের পথ দেখাতে পারে। এই রাষ্ট্রে মানুষের মর্যাদা ও অধিকারকে মহিয়ান করা হবে, কারণ ইসলাম মানুষকে আল্লার খলিফা বা প্রতিনিধি হিশাবে স্বীকার করে মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত গণ্য করে। নিজেদের ইশতিহারে বলতে হবে আমাদের ইনসাফ কায়েম করতে হবে। মানুষের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে এবং একই সঙ্গে মানুষের রিজিক বা জীবনধারনের নিশ্চয়তা দেওয়া এই রাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য হবে। ‘ইনসাফ’ যে অর্থ ও দ্যোতনা তৈরী করে তার সমার্থক শব্দ পাশ্চাত্যে নাই। আমরা এমন এক ইনসাফ ভিত্তিক গণতন্ত্র চাই যেখানে ব্যক্তি স্বাধীন, কিন্তুই সে সমাজের সামষ্টিক স্বার্থের উর্ধে নয়। রাষ্ট্র যেখানে জালিমের হাতিয়ার হয়ে গরিব ও মেহনতি মানুষকে নিপীড়ন করবে না।

আমাদের দ্বিতীয় কাজ হবে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য গণপ্রতিরক্ষার ধারণা ও তা কার্যকর ভাবে বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া। বাংলাদেশকে রক্ষা করবার জন্য প্রতিটি নাগরিকের বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা দরকার। আমরা কিন্তু আজ একটি প্রতিরক্ষার লড়াইয়ের মধ্যে আছি। এটা যদি আমরা বুঝতে পারি, তাহলে আমরা এ লড়াইকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারব।

অনুলিখনঃ শাহাদাৎ তৈয়ব