ধর্ম প্রসঙ্গে


[ চিন্তা (বৃহস্পতিবার) পাঠচক্রে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিয়মিত আলোচনা হয়। তার মধ্যে ধর্ম, ধর্মতত্ত্ব, দর্শন ভাবুকতা ইত্যাদি অন্যতম। সম্প্রতি বিভিন্ন প্রশ্নের প্রেক্ষিতে ফরহাদ মজহার যে আলোচনা করেছেন এখানে তার কিছু সারসংক্ষেপ তুলে দেওয়ার চেষ্টা করা হোল। আলোচনাগুলো যেন হারিয়ে না যায় তার জন্য কিছু বিষয় রেকর্ড করে রাখবার চেষ্টা। আশা করি একে কেন্দ্র করে আরও আলোচনার সুবিধা তৈরী হবে।

বলাবাহুল্য, মুখোমুখি আলাপের গুরুত্ব আলাদা। প্রবন্ধ বা লেখা হিশাবে হাজির করবার চেয়ে জীবন্ত প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা বিষয়ে প্রবেশ করতে অনেক বেশি সহায়ক, এটাই আমাদের ধারণা।  এর বৈশিষ্ট কোথায় পাঠক পড়া মাত্রই বুঝতে পারবেন। প্রাথমিক আলাপের কিছু অংশ এখানে ছাপা হল। - সম্পাদনা বিভাগ, চিন্তা]

... ... ...

প্রশ্নঃ ধর্ম আপনার আগ্রহের বিষয়। বাংলাদেশের এখনকার অবস্থায় বিষয়টা আরও প্রাসঙ্গিক মনে হয়। এখান থেকে আজকে শুরু করি।

ফ.ম: ঠিক। ধর্মের ব্যাপারে আমার আগ্রহ সবসময়ই ছিল। ভাবুকের আগ্রহ অবশ্য। যদি ধর্ম বলতে আমরা শুধু নিছকই বিশ্বাস, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম এবং তার সমাজতত্ত্ব না বুঝিয়ে থাকি। কবি হবার কারণে বোধ হয় আমার এই আগ্রহ। কারণ কবি মাত্রেরই, বিধিবদ্ধ ভাষা ও বদ্ধ চিন্তার শাসন ও বিবরণের বাইরেও জগৎ আছে। হতে পারে কাব্য সেই জগতের সঙ্গে সম্পর্ক রচনার একটা অজুহাত, একটা তাগিদ, একটা প্রবণতা। মানুষ নিজেকে ‘সর্ব সাধনে সিদ্ধ’ হিসাবে নয়, বরং নিজের সাধ্যের সীমা টের পেতে পেতে কিম্বা দেখতে দেখতেই বড় হয়। সীমা সে অতিক্রম করতে পারে না তা নয়, কিন্তু  প্রতিটি অতিক্রমণ নতুন সীমান্তে এসে দাঁড়াবার জন্য। সীমিত সাধ্যে জগত তো গোটাটা মানুষের কাছে ধরা পড়ে না, যুগপৎ বরং ধরা ও অধরা হয়েই হাজির থাকে বা হাজির হয়। ধরা ও অধরার মধ্য দিয়েই চিন্তার চলন, দুইয়ের সম্পর্ক বিচারের মধ্য দিয়েই চিন্তার বিকাশ ঘটতে থাকে। আর, বুদ্ধিমান মাত্রই জানেন, বুদ্ধির বেড়া টেনে জগতের সীমানা টানা কঠিন বা যুক্তি পরম্পরার শৃংখলা দিয়ে জগতকে আগাগোড়া ধরা সবসময়ই বিড়ম্বনায় পর্যবসিত হয়। কথাটা এভাবে শুরু করছি কারণ বদ্ধমূল ধারণা হচ্ছে ধর্ম নিয়ে কথা বলা বুঝি চিন্তা বা বুদ্ধির বাইরের কোন বিষয় নিয়ে কথা বলার চেষ্টা। অবিশ্বাসীদের কাছে সেটা খামাখা, কিন্তু ইন্টারেস্টিং হচ্ছে যাঁরা বিশ্বাসী তাঁরাও মনে করেন বিশ্বাস নিয়ে কথা বলার কিছু নাই। '

ধরা বা অধরা যাই হোক কোন জগতকেই অযৌক্তিক জগত বলা যাবে না। এই অর্থে যে বুদ্ধি সব কিছুকেই নিজের সীমা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে জানবার চেষ্টা করে। চেষ্টায় ক্ষান্তি নাই, কারণ এটাই চিন্তার অন্তর্গত তাগিদ বা স্বভাব। সেই চেষ্টা শুধু ইন্দ্রিয়োলব্ধির জগতে জব্দ হয়ে যায় না, নিজের স্বভাবগুণে প্রত্যক্ষ জগৎ অতিক্রম করে অন্য জগতের স্বাদ নেবার তাগিদও চিন্তা বোধ করে। নইলে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির উৎপাদন হোত কিনা সন্দেহ। ‘আল্লা’ কি, ‘আত্মা’ অমর কিনা, ‘ইহকাল’ ছাড়াও ‘পরকাল আছে কিনা ইত্যাদি প্রশ্ন তোলা চিন্তার স্বভাবেরই অন্তর্গত বিষয়। ইন্দ্রিয় প্রত্যক্ষ উপলব্ধির জগত ছাড়িয়ে চিন্তা নিজেকে নিয়ে নিজে ভাবতে গিয়ে যে-জগত তৈরি করে পাশ্চাত্যের জাঁদরেল দার্শনিকদের অনেকে তাকে অলৌকিক (transcendental) বলেছেন। অলৌকিক মানে আজগুবি নয়। দেশকালপাত্রের বাইরে যে জগত অধরা থেকে যায় তাকে ভিন্ন ভাবে শনাক্ত করার চেষ্টা । অনেকের দাবি এটা উপলব্ধিরই জগত। চিন্তার দিক থেকে কোন কিছু ইন্দ্রিয়-প্রত্যক্ষ হোক বা না হোক মানুষের চিন্তার বিষয় হিসাবে তার আবির্ভাবকে উপলব্ধি বললে বিশেষ কোন আপত্তি থাকার কথা নয়। উপলব্ধির মানে এখানে স্বজ্ঞা বা intuition।

একথা বললে তাহলে ভুল হয় না যে লৌকিক/অলৌকিক সবই মানুষের উপলব্ধিরই জগত। কোন বিশেষ উপলব্ধির ওপর পারলৌকিকতা আরোপ করলে সেটা অবাস্তব হয়ে যায় না। চিন্তা বা বুদ্ধির দিক থেকে কোন কিছুর মধ্যে পারলৌকিকতা আবিষ্কার করা অনিবার্য বা অবধারিত নয়। উপলব্ধির সবকিছুকে তাদের বৈশিষ্ট নির্বিশেষে শুধুমাত্র বুদ্ধির বিষয়, শুধুমাত্র জ্ঞানের অর্জন দাবী করতে চাইলে খোদ উপলব্ধিটাই মার খেয়ে যায়। যে কারণে ইম্মেনুয়েল কাণ্ট চিন্তা বলতে শুধু বুদ্ধি বা বুদ্ধির ব্যবহার বোঝান নি, চিন্তার আরেকটি স্তরকেও বুঝিয়েছিলেন। যে স্তরকে speculative বলা হয়। চিন্তা বুদ্ধির স্তরে কোন বিষয়কে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে যখন নিজের সীমাবদ্ধতা টের পায়, তখন সেই উপলব্ধিকে কাণ্ট বুদ্ধির বাইরে রাখবার পরামর্শ দিয়েছিলেন। যেমন ‘আল্লা’, ‘অমরত্ব’ ইত্যাদি। এই উপলব্ধিগুলোকে প্রজ্ঞার অন্বিষ্ট ভাবাটাই অধিক বুদ্ধিমানের কাজ। যদি বুদ্ধি যথেষ্ট বুদ্ধিমান না হয় তখনই এই জগত বুদ্ধির কাছে মিস্টেরিয়িয়াস, আধ্যাত্মিক বা রহস্যময় মনে হয়। তার মানে চিন্তা বুদ্ধির স্তর থেকে প্তজ্ঞার স্তরে নিজেকে উন্নীত করতে পারে নি। তার কাছে মোকামে মাহমুদা অনেক দূরের রাস্তায় নজরের আড়ালে রয়ে  গিয়েছে।

তার মানে গোচর বা অগোচর যেমনি হোক জগতের স্বরূপ নির্ণয়ে বুদ্ধির কোন ভূমিকা নাই তা নয়। ধরা বা অধরা সকল জগতের সাথে যে কোন সম্পর্ক রচনা বা আদানপ্রদানে বুদ্ধির -- অর্থাৎ চিন্তার একটা ভুমিকা থাকে। থাকেই। সবসময়। শুধু  জগতকে কেবল বুদ্ধির বিষয়ে পরিণত করবার চেষ্টা করতে গেলেই গোলমাল বাঁধে। তার ঐশ্বর্যের দিক আমাদের হাত থেকে ছুটে যায়। এই অর্থেই যা হাতছুট হোল তাই অধরা। এই ব্যাপারটা বুদ্ধি দিয়ে বুঝেছি, দাবি করবো না, তবে কবি হিসাবে সবসময়ই এই উপলব্ধি আমার ধারে কাছেই থেকেছে। আশপাশেই ঘোরাফেরা করেছে।

যুক্তি যেভাবে সত্যকে জানে বা সত্যের নিশ্চয়তা প্রতিষ্ঠা করে, এই জগতের সত্য ঠিক সেভাবে নিজেকে কায়েম করে না। বলছিলাম, এই রকম একটি জগত আছে, -- এই অনুমান ছাড়া কাব্যচর্চা অসম্ভব। কবির অভিজ্ঞতা সেই জগতেরই অভিজ্ঞতা। কবির সত্য সেই জগতেরই সত্য। এই দিক থেকে কাব্যচর্চার সঙ্গে ধর্মপ্রাণতার একটা যোগ আছে। ধর্মে আমার আগ্রহ কবিতা তাড়িত – এ কথা তাই শুরুতেই স্বীকার করে রাখা দরকার। কোন কবি যদি বলে আমি ধর্মপ্রাণ নই তখন তার প্রতি আমার খুব করুনা  হয়।

তবে 'ধর্মপ্রাণতা' বলতে আমি কি বুঝি আশা করি ওপরের কথা থেকে একটা ধারণা পাবেন। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা এই বোধ ও বিবেচনাগুলো হারিয়ে ফেলেছি। যাঁরা ধর্মকর্ম করেন না শুধু তাদের কারণে নয়, যাঁরা ধর্মকর্ম করেন বলে মনে করেন ও নিজেদের ধার্মিক দাবি করেন তাঁদের কারণেও। গোড়ার কারণ, সম্ভবত, আপনি যে প্রশ্ন তুলেছেন তার মধ্যে নিহিত রয়েছে। ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনশাস্ত্রের সম্পর্ক বিচারে আমাদের অনাগ্রহ। ধর্ম ও দর্শনের মিল ও অমিল নিয়ে আমরা বিশেষ চিন্তিত না।

চিন্তিত না হবার অনেক কারণ থাকতে পারে। একটা কারণ আমার আজকাল খুব বেশি মনে হয়। এক অর্থে আমরা 'ধর্ম' হারিয়ে ফেলেছি, ধর্মচ্যূত হয়ে গিয়েছি। কারণ 'ধর্ম' বলতে যা বুঝি সেটা ইংরেজি রিলিজিয়নের অনুবাদ। আমরা ‘ধর্ম’ কথাটা ইংরেজি রিলিজিয়ানের অনুবাদ হিশাবে ব্যবহার করি বটে, কিন্তু বাংলায় ধর্ম শব্দের অর্থ ঠিক ‘রিলিজিয়ন' নয়। আমরা ডিকশনারি উল্টাতেও ভুলে যাই। ডিকশনারী বলছে উৎপত্তিগতভাবে রিলিজিয়ন শব্দের অর্থ যা মেনে চলি, শ্রদ্ধা করি (reverence) ইত্যাদি। [[12th century. Via French < Latin religion- "obligation, reverence"]।

প্রশ্নঃ তার মানে ধর্ম নিয়ে অর্থপূর্ণ আলোচনা করতে হলে মাথা থেকে ‘রিলিজিয়ন’ নামক ভূত নামাতে হবে। ধর্ম, ধর্মপ্রাণতা ইত্যাদিকে গোড়া থেকে বুঝতে হবে।

ফ.ম: ঠিক। তবে ‘রিলিজিয়ন’ নিয়ে কথা বলা বাদ দিতে হবে তা বলছি না। কথা তো হতেই পারে। হতেও হবে।  কিন্তু ‘ধর্ম’কে ‘রিলিজিয়ন’ ভাবা যাবে না। অনুবাদে ভাবার কারণে ‘ধর্ম’ ধারণার যে দ্যুতি, ভাবুকতা ও দার্শনিক তাৎপর্য তা আমরা এখন আর ধরতে পারি না। বোঝা তো দূরের কথা। তোতাপাখির মতো বলি বটে অবশ্য যে ধৃ থেকে ধর্ম। কিন্তু কী সেই জিনিস যা ধারণ করে মানুষ ‘মানুষ’ হয়। কিম্বা জীব শুধুই ‘জীব’ হয়ে থাকে? কি ধারণ কিম্বা ধারণ না করে শেয়াল শেয়াল হয়, সরিসৃপ সাপ, কিম্বা সিংহ সিংহের মতো রাজকীয় হয়ে ওঠে? জীবের কী সেই লক্ষণ যার কারণে সে আর জীব মাত্র থাকে না, পরমের গুণে গুণান্বিত হয়ে ওঠে? কিম্বা লোহার কোন্‌ ধর্মের কারণে তার স্বভাব লোহার মতো, তুলার মতো নয়। জল কী করে জল হোল? ধর্ম কি অর্জন করবার মতো কোন বৃত্তি, আচরণ নাকি স্বভাব? এই ধরণের প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে গিয়েই পাশ্চাত্য দর্শনের প্রতি আমার আগ্রহ আরও পর্যালোচনামূলক হয়ে উঠল। যার পরিণতিতে পাশ্চাত্যের জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিমণ্ডলের বাইরে যে সকল চিন্তা রয়েছে সেই সবের প্রতি আমার আগ্রহ বাড়লো। সে আগ্রহ চর্চা করতে গিয়ে বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে ভাবচর্চার স্বতন্ত্র একটি ধারার উপস্থিতি টের পেতে শুরু করি। বিশেষ ভাবে শনাক্ত করার জন্য আমি একে ‘ভাবান্দোলন’ বলি। একে শুধু চিন্তা বললে ভুল হবে – ভাব বরং মানুষের সঙ্গে তার বাইরের জগতের ও তার নিজের সঙ্গে সম্পর্ক রচনার মামলা। নিছকই জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যাপার নয়।

ভাবান্দোলনে দেখি সবচেয়ে উচ্চকিত প্রস্তাব হচ্ছে ধর্মের উৎপত্তি বা বিরাজমানতার মধ্যে একটা সহজ ব্যাপার আছে, যা সহজ ভাবেই থাকে। মানুষের মধ্যে এই ‘সহজ’ বিকশিত করবার ব্যাপার, অর্জনের ব্যাপার নয়। এমন কিছু যাকে নিজের মতো ফুটতে দিতে হবে, জবরদস্তি করলে এই সহজ আর সহজ থাকে না।

আমি যখন থেকে ভাবান্দোলন নিয়ে ভাবতে শুরু করি তখন থেকেই ধর্ম আমার কাছে ক্রমে ক্রমে  আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে শুরু করে। তবে আমি ঘরে বসে বসে ভাবি নি, কারণ বাংলার ভাবচর্চার প্রধান ক্ষেত্র এখনও ছাপাখানা নয়, বরং শ্রুতি ও কন্ঠের জায়গায় যেমন ছিল সেখানেই রয়ে গেছে – অর্থাৎ যাকে আমরা ইংরাজিতে ‘ওরালিটি’ বা মুখস্থ সংস্কৃতি বলি। ফকিরফ্যাকড়া, বয়াতি, সুফি-ভক্তির শক্তিশালী ধারা যা টিকিয়ে রেখেছে। যার সঙ্গে জীবনযাপনের বিশেষ চর্চার প্রশ্ন জড়িত রয়েছে। মানুষের বাইরে একদিকে প্রকৃতি এবং অন্যদিকে অপরাপর মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক চর্চার সুনির্দিষ্ট ধারার মধ্যেই তার বিবিধ বয়ান গড়ে উঠেছে। তাদের সঙ্গে মিশেছি। তাদের কাছ থেকেই শেখার চেষ্টা করেছি। তবে নিজের অভিজ্ঞতা ও বিচারবুদ্ধি দিয়ে যাচাইবাছাই করেছি। বুঝেছি বাংলার ভাবচর্চা ও ভাবুকতার জগত ‘দর্শন’ নামক কোন মায়া বা প্রপঞ্চ দ্বারা তাড়িত হয় নি। অর্থাৎ তাদের চিন্তার রূপকে নির্ণয় করবার ক্ষেত্রে এই অনুমান প্রধান হয়ে ওঠেনি যে ‘সত্য’ নামক ব্যাপারটা বুঝি দেখিয়ে দেবার, দেখাবার, দ্রষ্টব্য করে তোলার বা নিজে দেখার বিষয়। কিম্বা সত্য বুঝি নিশ্চিত হবার, বুঝবার বা যাচাইবাছাইয়ের ব্যাপার। এই দিকগুলো ভাবান্দোলনের বৈশিষ্টসূচক দিক নয়। অর্থাৎ এই অনুমান কখনই অধিপতি হয় নি যে সত্যকে বুঝি দেখানো যায়, ‘প্রমাণ’ করা যায়। কিম্বা আগেই বুঝি সত্য কোথাও তৈরী হয়ে আছে, আমাদের কাজ হচ্ছে তাকে শুধু হাজির করে দেখানো, ইত্যাদি। এই অতি প্রাথমিক ও সহজ ব্যাপারগুলো আমার কাছে যখন ধরা পড়তে শুরু করল, তখন মানুষের চিন্তা, ভাবনা, তৎপরতার অন্যান্য ক্ষেত্রগুলো সম্পর্কে আমার আগ্রহ আরও তীব্র হোল। তার মধ্যে ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল ও ক্রমে ক্রমে চিন্তাভাবনার কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হোল। আগ্রহ একইসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, ধর্মতত্ত্ব বা ধর্মশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ের দিকেও ধাবিত হোল। আস্তে আস্তে, কিন্তু গভীর ভাবে।

প্রশ্ন: বাংলার ভাবচর্চা ও ভাবুকতার জগত ‘দর্শন’ নামক কোন মায়া বা প্রপঞ্চ দ্বারা তাড়িত হয় নি কেন?

ফ.ম: আমি বুঝতে চেষ্টা করেছি ভাবান্দোলন ‘দর্শন’ নামক মায়া বা প্রপঞ্চ নাকচ করে কেন? আমার অন্বেষণের তৃষ্ণা মিটেছে বলব না। আগেই বলে রাখি উপলব্ধির জগতকে শুধু বুদ্ধির বিষয়ে পরিণত করতে না দেবার পেছনে শরীরকে প্রাধান্য দেবার ব্যাপার রয়েছে। বুদ্ধি তো শরীরহীন নয়, তার শরীর আছে। শারিরীক দিককে প্রাধান্য দিলেও যুক্তি বা বুদ্ধির ব্যবহার বা তাকে খরচ করবার বিপক্ষে নয় মোটেও ভাবান্দোলন। শুধু বুদ্ধির দ্বারা জগতের সকল রহস্যের মীমাংসা, কিম্বা বুদ্ধির দ্বারা মানব জীবনের অর্থ নির্ণয় করবার ব্যাপারে সন্দেহ জারি রাখবার জন্যই শরীরকে সবসময় মনে রাখা দরকার। নইলে শরীরের হুঁশ হারিয়ে বুদ্ধি শরীরের অস্তিত্বকে আড়াল বা অস্বীকার করতে পারে  -- ভাবান্দোলনের কাছে সম্ভবত সেটাই প্রধান বিবেচনা। শরীরের মতো অতিশয় বাস্তব ও বর্তমান জিনিসই ভাবান্দোলনের ভজনার বিষোয়। নইলে মানুষ বুদ্ধির বিমূর্ত জগতে নিজের দোষে চিরকাল বন্দী হয়ে যেতে পারে।  যা 'বর্তমান' শুধু তাই  যদি ভজনার বিষয় হয় তাহলে বুঝতে হবে ভাবান্দোলন মরমিবাদী বা আধ্যাত্মবাদী কোন ব্যাপার নয়।  বুদ্ধির বিরোধী বা বুদ্ধির অজ্ঞেয় রয়ে গেছে এমন ‘রহস্যময়তার’ চর্চাও নয়। মানুষের বিভিন্ন ইন্দ্রিয়শক্তি ও বৃত্তির মধ্যে বুদ্ধির স্থান নির্ণয়ের মামলা এটা।

ভাবান্দোলন পাশ্চাত্য চিন্তার অর্জনগুলোকে নাকচ করে, ব্যাপারটা তাও কিন্তু নয়। পাশ্চাত্য দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নিশ্চয় জ্ঞানের জন্য তাগিদ। কোন কিছু নিশ্চিত ভাবে জানার চেষ্টার মধ্যেও কোন অন্যায় নাই। আসলে শুধু মানুষ কেন, কোন জীব যদি প্রতিমুহূর্তের বাস্তবতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হতে পারে তাহলে জীবের জীবন ধরে রাখা বা প্রাণধারণ করাই তো মুশকিলের হয়ে পড়ে। নিশ্চয়জ্ঞানের তৃষ্ণা জীবের সহজাত চরিত্র। সেই দিক থেকে, ভাবান্দোলন তর্ক করবে, গরুর সঙ্গে মানুষের বিশেষ কোন ফারাক নাই। গরুর কাছে গরুর জীবন জ্ঞানচর্চার ফলাফল হিসাবে হাজির না হতে পারে, বলতে পারি জীবের এই জীবন প্রবৃত্তি তাড়িত, তার জীবনচর্চাকে আমরা মানুষরা ‘প্রবৃত্তি’ বলে আখ্যা দিতেই পারি। কথা হচ্ছে,  ঘাস যে ‘ঘাস’ সেটা নিশ্চিত ভাবে গরু জানে বলেই খাদ্য হিসাবে তা গ্রহণ করতে পারে। তার এই জানাটাকে আমরা ‘জানা’ বলে স্বীকার করি বা না করি তাতে ক্ষতি নাই, তাকে প্রবৃত্তিগত বলে হীনজ্ঞান করলেও কিছু আসে যায় না, কিন্তু জ্ঞানের নিশ্চয়তার তাগিদ জৈবিক প্রবৃত্তির চেয়ে আলাদা কিছু কিনা সেই তর্ক ভাবান্দোলন তুলবে। অর্থাৎ ভাবান্দোলন বলবে, নিশ্চয়জ্ঞানের তাগিদ তো জৈবিক প্রবৃত্তির অতিরিক্ত কিছু নয়। এর কোন পরমার্থিক মূল্য নাই। জ্ঞানতত্ত্বের গোটা কাণ্ড ধরে এই প্রকার গোড়ার প্রশ্ন তুলতে সক্ষম বলে ভাবান্দোলন আমাদের থতমত খাইয়ে দিতে পারে। সম্ভবত সে কারণে আমাদের নতুন ভাবে ভাবতেও ভাবান্দোলন সাহায্য করে।  তবে জ্ঞানতত্ত্বের গোড়ার ভিত্তিটা এতে নড়বড়ে হয়ে যাবার আশংকা দেখা দেয়। আর এই অবসরে ভক্তির ধারা নিজের ন্যায্য আসন দখল করে নিতে পারে।

কোন কিছুকে নিশ্চিত ভাবে জানি বলে ‘প্রমাণ’ করে দেখানো, চোখের সামনে হাজির করে সত্য ‘প্রমাণ’ করা, ইত্যাদি মানুষের জৈবিক প্রবৃত্তির সীমার অধীনস্থ চর্চার অধিক কিছু কিনা সন্দেহ। নিশ্চিত জানার জৈবিক সাধ্য আছে বলেই জীব তার জৈবিক সত্তাকে টিকিয়ে রাখতে পারে। তবে ভাবান্দোলনের কাছে তা পরমার্থিক নয় বলে পরমের ভজনা কিম্বা সাধনা নয়। অতএব শুধু ভাব কিম্বা ধর্ম নয়। ভাবান্দোলনের প্রতি আমার আগ্রহ জ্ঞানতত্ত্বের  গোড়া ধরে  প্রশ্ন তুলতে পারার সামর্থের জন্য। এই ধরণের প্রশ্ন তুলতে পারে  বলেই বাংলার ভাবচর্চার সম্ভাবনা অনেক। সে সম্ভাবনা টের পাই বয়লে ভাব বা ধর্ম নিয়ে বিশেষ ভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ বোধ করি। মানুষের ধর্ম আসলে কী, এই প্রশ্নটি সে কারনে আমাকে নতুন ভাবে তাড়া করে ফেরে।

‘দর্শন’ নামক মায়া বা প্রপঞ্চ নাকচ করার পেছনে আরও অনেক যুক্তি থাকতে পারে। যেমন, ‘দর্শন’ বা দেখাকে সত্য নির্ণয়ের পদ্ধতি ও তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা শাস্ত্র গণ্য করলে অনুমান করা হয়ে যায় যে, অন্য সকল ইন্দ্রিয়ের চেয়ে চোখ বা দৃষ্টিই সত্য নির্ণয়ের একমাত্র শারিরীক হাতিয়ার। সেটা আক্ষরিক অর্থে হোক কিম্বা হোক প্রতীকী অর্থে। কিন্তু মানুষতো চোখসর্বস্ব নয়, তার আরও ইন্দ্রিয় আছে। ভাবান্দোলনে তাই বারবার দেখি জগতের সঙ্গে শরীরের সম্পর্কিত হবার ‘নয় দরজা’ ছাড়াও, দিব্যসত্তা হিশাবে ব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে আমাদের একটি একাকার সম্পর্ক আছে, যেখানে ভাণ্ড ও ব্রহ্মাণ্ড অভিন্ন, সেই দিকে আমাদের নিষ্ঠাকে আন্তরিক করে তুলতে ভাবান্দোলন আগ্রহী। তার জন্য উপদেশ-নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেহ বাদ দিয়ে ভাবান্দোলন কোন সত্য ‘দর্শন’ বা সত্য নির্ণয় সম্ভব মনে করে না।

শরীর নিয়েই মানুষ। মানুষের শারিরীকতা বা ইন্দ্রিয়ময়তা বাদ দেওয়া আহাম্মকি। কিন্তু শরীরের একটি মাত্র ইন্দ্রিয়ের ওপর ভিত্তি করে ‘সত্য’ নির্ণয়ের পদ্ধতিও খণ্ডিত হতে বাধ্য। সাধারণ ভাবে শুধু বাহ্যিক ইন্দ্রিয়ই সত্য নির্ণয়ের একমাত্র উপায়, ভাবান্দোলন তাকেও সন্দেহের চোখে দেখে। সেইজন্য ‘নয় দরজা’ বন্ধ করে নিজের স্বাদ নিজে নেবার চর্চা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বারবার বাংলার ভাবান্দোলন নিজের শরীর নিয়ে নিজেকে পরীক্ষার কথা বলছে।

প্রশ্নঃ ‘দর্শন’ বললে যে চোখকেন্দ্রিক ধারণা মনে আসে তার সমালোচনা তাহলে গুরুত্বপূর্ণ।

ফ।ম: ঠিক। তাহলে সত্য নির্ণয়ের ধারণা বা পদ্ধতি হিশাবে ‘দর্শন’ নামক চোখকেন্দ্রিক ধারণা নাকচ করবার তাৎপর্য কি? শরীরকে অখণ্ড সত্তা হিশাবে বোঝা ও ব্যবহার করা এবং একই ভাবে বিভিন্ন ইন্দ্রিয়ের বিশেষ বৈশিষ্ট সম্পর্কে ধারণা পরিচ্ছন্ন করা। কোন বিশেষ ইন্দ্রিয়কে একক ভাবে কিম্বা সামগ্রিক ভাবে ব্যবহার করতে শেখার সুবিধা, অসুবিধা ও পার্থক্য বোঝানো এবং পরিণামে বিশেষ কোন ইন্দ্রিয়কে প্রধান গণ্য না করে সকল ইন্দ্রিয়ের শক্তি বা বৃত্তি নিয়ে মানুষ-ভজনার ক্ষেত্র তৈরী করা। সে জন্য শুধু ‘দর্শন’ বা চোখের দেখাকে বা চোখে দেখার মতো করে কোন বিষয়কে হাজির করে প্রমান করবার চেষ্টাকে ‘সত্য’ নির্ণয়ের একমাত্র বা পরম পদ্ধতি হিশাবে ভাবান্দোলন নাকচ করে। গায়েবে ঈমান আনা ও রাখার ওপর ইসলাম এতো জোর দেবার কারণ চোখের হেজিমনি থেকে মুক্ত হবার তাগিদও বটে।

‘দর্শন’ নামক ধারণার অনুমান হচ্ছে সত্যকে আক্ষরিক অর্থে দেখানো বা প্রত্যক্ষ করানো যায়। কিম্বা প্রতীকী অর্থে সত্যকে চোখের সামনে উপস্থিত দেখছি সেই ভাবে হাজির করা সম্ভব। আমরা যখন ‘প্রমাণ’ কথাটা বলি সেটাও এই দেখানো অর্থেই বলি, আক্ষরিক কিম্বা প্রতীকী। এই অর্থে কোন কিছু ‘প্রমাণ’ করা অর্থে সত্য প্রতিষ্ঠার যে ধারণা রয়েছে জীবের জীবনে তার প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে, কিন্তু ভাবান্দোলন তাকে মানুষের পরমার্থিক অন্বিষ্ট মনে করে না। এই অর্থে যে মানুষ তো নিজেকে শুধু জীব মাত্র উপলব্ধি করে না, জীবের অতিরিক্ত কিছু ভাবে। সেই অতিরিক্ত কিছু আছে কি নাই সেই তর্ক করতে পারেন। কিন্তু যা নাই তার জন্য মানুষের যে আকুতি তার নিবৃত্তি ঘটাবেন কিভাবে? সেটা আসলে কী, সেই প্রশ্নের সূত্র ধরেই ধর্ম নামক বিষয়ের মর্মে প্রবেশ করা যেতে পারে।

এই আকুতিই কি মানুষের দুঃখের কারণ? যে কারণে আমাদের প্রাচীন প্রশ্ন জগত কী বা কেন নয়, বরং কিভাবে দুঃখ থেকে মুক্তি সম্ভব – এই প্রশ্ন। মোক্ষ। জীবের মধ্যে মনুষ্যবৃত্তিক এই তাগিদকে ‘আধ্যাত্মিক’ কিছু ভাববার দরকার নাই। ধর্মে আমার আগ্রহ এই দিক থেকেও। আমি ইংরেজ না, বঙ্গদেশীয়; জন্মসূত্রে ইসলাম আমার ধর্ম। যা নাই তার সাক্ষ্য দেওয়াই তো আমি শৈশব থেকে শিখেছি। যা গায়েব বা গরহাজির -- সেই নিরন্তর অনুপস্থিতিই মনুষ্যের উপাস্য—আমি তো এই আকুতি শুনে শুনেই বড় হয়েছি। ফলে বাংলা ও ইসলাম আমার রক্তেমাংসে জড়াজড়ি করে আছে। ধর্মে আমার আগ্রহ থাকবেই। ‘দ্বীনের ডংকা’ আমার কানে এসে বাজবেই।

আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন, ইংরেজি ‘রিলিজিয়ান’ শব্দের অনুবাদ বা রোমান অর্থে ধর্ম বলতে আমরা যা বুঝি আমি তা পরিহার করবার চেষ্টা করি। একই সঙ্গে ধর্মের বিপরীতে যুক্তি, বুদ্ধি, আধুনিকতা ইত্যাদি প্রতিস্থাপিত করে এবং ধর্মকে বুদ্ধি, জ্ঞান বা আধুনিক চিন্তাচেতনার বিরোধী একটা কিছু হিশাবে হাজির করবার সস্তা চাতুর্যের আমি প্রয়োজন বোধ করি না। এই ধরণের পাল্টাপাল্টি ‘আধুনিকতা’ বুঝতে যেমন কাজে লাগে না, ধর্মও না। এই বাইনারি ধারণার সারবস্তু হচ্ছে ধর্মকে প্রগতির পরিপন্থী বা প্রতিক্রিয়াশীল জ্ঞান করে আধুনিকতার পক্ষে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা। অসম বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে সাফাই গাওয়া।

‘আধুনিকতা’ সাংস্কৃতিক দিক থেকে সাম্রাজ্যবাদেরই আরেক নাম। ধর্মের মর্মে প্রবেশ করতে চাইলে এই ধরণের সস্তা বাইনারি পরিহার ও প্রত্যাখ্যান করতে হবে। ‘আধুনিকতা’ আর দশটি মতাদর্শের মতো একটি মতাদর্শ মাত্র। পাশ্চাত্য তার ‘অপর’কে অনাধুনিক ও পশ্চাতপদ প্রমাণ না করলে তার আধিপত্য কায়েম রাখতে পারে না। আধুনিকতা ঔপনিবেশকতা ও পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার ফল। একে ঐতিহাসিক ভাবেই বিচার করতে হবে। ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদের সাংস্কৃতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার জন্যই এই মতাদর্শ কাজ করে। আধুনিকতাকে সেইভাবে বিচার করাই উত্তম।

প্রশ্নঃ এডোয়ার্ড সাঈদ তাঁর ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বা প্রাচ্যবিদ্যা বইয়ে যে কথা বলেছেন তার সঙ্গে আপনি কি তাহলে একমত?

ফ.ম: আপনি নিশ্চয়ই মানবেন যে সাঈদের অবদান অসামান্য। শুধু তাঁর প্রাচ্যবিদ্যা বইয়ের জন্য নয়, প্যালেস্টাইন প্রশ্নে তাঁর অবস্থান এবং সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন আমাদের, সন্দেহ নাই। প্রাচ্যকে তার ‘অপর’ গণ্য করে, পাশ্চাত্য কিভাবে নিজের পরিচয় বানিয়েছে, বানাচ্ছে এবং কিভাবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভেদজ্ঞান তৈরী হচ্ছে – সেইসব আমাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক ভাবে তিনি বুঝিয়েছেন। শুধু আমাদের নয়, পাশ্চাত্যের পাঠক এবং পাশ্চাত্যকে যারা সভ্যতার মানদণ্ডে অগ্রসর মনে করে তাদেরকেও। ফলে পাশ্চাত্যকে তার নিজের দিকে তাকাবার, নিজেকে বিচার ও পর্যালোচনা করবার একটা পথ বা পদ্ধতি তিনি দেখিয়েছেন। কিন্তু মনে রাখবেন, তিনি সে কাজে পাশ্চাত্যের পদ্ধতি, পাশ্চাত্যেরই হাল-হাতিয়ার, সুত্র, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ইত্যাদি ব্যবহার করেছেন। প্রাচ্য – যেমন ধরুন ইসলাম তার নিজের অন্তর্গত অনুমান, চিন্তার পদ্ধতি, ধারণা, সুত্র বা এক কথায় বয়ান-পরম্পরার (discursive tradition) মধ্যে এমন কিছু ধারণ করে কিনা যা স্বতন্ত্র, গ্রিক-খ্রিস্টিয় চিন্তার দিগন্তের মধ্যে থেকে যাকে ধরতে পারা কঠিন -- এই ধরণের সংশয় তাঁর মধ্যে দেখি না। যার হদিস না নিয়ে প্রাচ্যের ইসলাম-প্রধান জনগোষ্ঠির নিজস্ব বিকাশ বোঝা আদৌ সম্ভব কিনা সেদিকে তিনি যাননি। কিম্বা প্রাচ্যের ইসলাম-প্রধান জনগোষ্ঠির মত একইভাবে অন্যান্য ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়া বা আফ্রিকার জনগোষ্ঠিকেও তো বোঝা যায় না। তাদের বেলায়ও একই প্রশ্ন থেকে যায়। তিনি ধরে নিয়েছেন পাশ্চাত্য আধুনিক  চিন্তার পদ্ধতিই আদর্শ, প্রাচ্যের নিয়তি এই ভাবেই বুঝি সবার জন্য লেখা হয়ে আছে। গ্রিক-খ্রিস্টিয় চিন্তার অনুমান, পদ্ধতি ও বদ্ধমূল জ্ঞানকাণ্ড চিন্তার যে একচেটিয়া কাঠামো তৈরী করেছে তাকে ভাঙবার কথা তিনি বলেন নি। নইলে দুনিয়ার সব সভ্যতার মানুষের ইতিহাসকে তাদের মতো করে বুঝব কিভাবে?  আর তা যদি সম্ভব না হয় তাহলে মানবেতিহাস সার্বজনীন ইতিহাস হয়ে উঠবে কিভাবে?

প্রাচ্যের কিম্বা ইসলামের অন্তর্গত কোন নিজস্ব শক্তি আছে কিনা যাকে দাবিয়ে রাখা হয়েছে এমন প্রশ্ন নিয়ে তিনি নাড়াচাড়া করেছেন জানা যায় না। শুধু পাশ্চাত্য নয়, ইসলামপন্থিরা নিজেরাও কি নিজেদের ভাবসম্পদের খোঁজ করেছে? যে-সম্পদ ঔপনিবেশকতা ও সাম্রাজ্যবাদ ভুলিয়ে দিয়েছে, সহজে মনে করা এখন কঠিন, সেই চিহ্নগুলো অন্বেষণের আবশ্যকতা এডোয়ার্ড সাইদ আমাদের বোঝাতে পারেন নি। পাশ্চাত্য যাদের ‘অপর’ করে রেখেছে তাদের এমন কোন বুদ্ধিবৃত্তিক বা ভাবগত সম্পদ আছে কিনা যার হদিস নেওয়া দরকার -- না নিলে প্রাচ্য/পাশ্চাত্যের ভেদ মোচন অসম্ভব – সাঈদ এভাবে ভাবেন নি। ফলে তাঁর সঙ্গে আমি একমত বললে আপনি ভুল বলবেন না, বোধহয়; তবে তিনি যেখানে শেষ করেছেন সেখান থেকে আমাদের শুরু করতে হবে। আর ঠিক সে কারণেই, বুঝতে পারছেন, ধর্ম আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আর সাঈদ পাশ্চাত্য অর্থে সেকুলার থেকে গেছেন। পাশ্চাত্যের সেকুলারিজমের ইতিবাচক দিক থাকতে পারে, আছে, কিন্তু তা সাময়িক ও ইতিহাস-নির্দিষ্ট। একে আমি সার্বজনীন বা পরমার্থিক জ্ঞান করিনা। করা ঠিকও না।

প্রশ্নঃ দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে আপনি অনেক দিন ধরেই তো কথা বলছেন। এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক কিভাবে বিচার করব।

ফ.ম: আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শন যেভাবে দর্শন আর ধর্মতত্ত্বের ফারাক ও মিল নিয়ে আলোচনা করেছে সেইদিক থেকে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। দুইয়ের মধ্যে এই পার্থক্য পাশ্চাত্যেই –অর্থাৎ বিশেষ দেশকালে কিম্বা বিশেষ আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় ঘটেছে। সেই ঐতিহাসিকতা মনে রেখেই আলোচনা করছি। ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন বলে চিন্তার এই বিভাজনকে অবশ্য অনিবার্য গণ্য করবারও কোন কারণ নাই। লালনপন্থিরা যেভাবে বলেন, সবই তো তিনি -- যেভাবে সাঁই বর্তমান হয়েছেন সেইভাবেই বুঝুন।

(আধুনিক) দর্শন কোন কিছু আগাম ‘সত্য’ ধরে নিয়ে চিন্তা করে না। কোন আসমানি বরাত দিয়ে নিজের যুক্তি হাজির করে না। ধর্মতত্ত্বের মধ্যেও চিন্তা আছে, দর্শন আছে। কিন্তু চিন্তা নিজের স্বরূপে নয়, ধর্মতত্ত্বের রূপ নিয়ে সেখানে হাজির।

দর্শন মাত্রই অনুমানকে প্রশ্ন করা। দর্শনের কাজ কিন্তু বিদ্যমান চিন্তাকে সত্য ধরে নেয়া নয়। যে অনুমানের ভিত্তিতে একটা বিষয় কে আমরা সত্য বা মিথ্যা বলি, দর্শন সেই অনুমানকে প্রশ্ন করবার সামর্থ দেখিয়ে চিন্তার দার্শনিক চরিত্র বা দর্শনের স্বরূপ প্রদর্শন করে। যে কোন মতাদর্শের অনুমানকে প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই চিন্তা নিজের শক্তি নিজে টের পেতে শুরু করে। দর্শন মানে দর্শনই। দর্শনে কোন ধর্মতত্ত্ব নাই। আগেই সত্য নাজিল হয়ে আছে এই ধরণের কোন অনুমান মাথায় রেখে দর্শন চিন্তা করে না। আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের এই বিকাশ কাজে লাগে।

আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনের দিক থেকে দর্শন মানে এখন আর জ্ঞানচর্চাও নয়। ‘জ্ঞানের জন্য ভালবাসা’ – গ্রিক অর্থে ফিলসফির এই অর্থ এখন আর নাই। চিন্তা কিভাবে চিন্তা করে – কোন একটি ‘বিষয়’ কিভাবে চিন্তার মধ্যে চিন্তার গুণে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে (phenomenology) -- দর্শনের খাসমহলে এখন তারই বিচার চলছে। এই অর্থে ইসলামী ফিলোসফি বলেও কোন ফিলোসফি নাই। কিম্বা হিন্দু, জৈন, বৌদ্ধ এইরকম দর্শনও নাই। ফিলোসফি ইজ অলওয়েজ ফিলোসফি।

সাধারণভাবে বললে, চিন্তা যখন নিজের স্বরূপে নিজেকে হাজির করতে সক্ষম হয়ে ওঠে তখন তাকে আর কোন বিশেষ সম্প্রদায়ের, বিশেষ ধর্মের বা বিশেষ জাতির চিন্তা আকারে শনাক্ত করা যায় না। চিন্তা তখন নিজেকে চিন্তার সার্বজনীন রূপ হিশাবে হাজির করতে সক্ষম হয়। এটাই হবার কথা। গ্রিকো-খ্রিস্টিয় চিন্তা এইভাবেই নিজেকে চিন্তার সার্বজনীন রূপ হিসাবে দাবি করে। এই দাবি পাশ্চাত্য করতে পারে বলেই দুনিয়াব্যাপী তার আধিপত্য বিস্তার সহজ হয়েছে। কিন্তু এটা আসলেই চিন্তার সার্বজনীন রূপ হিসাবে হাজির হওয়া কিনা সে প্রশ্ন এখন উঠেছে। এটা সার্বজনীন নাকি বড় জোর গ্রিকো-খ্রিস্টিয় অভিজ্ঞতার পরিমণ্ডলের মধ্যে সর্বোচ্চ বিকাশ ও প্রকাশ -- যা অন্যদের উপর সার্বজনীনতার দাবিতে নিজের চিন্তার শাসন ও আধিপত্য চাপিয়ে দেবার, অন্যদের সম্ভাবনা বিকাশ ও রুদ্ধ করার উপায় ও কারণ -- সেইসব এখন ভাবতে হচ্ছে।

তবু সাধারণভাবে ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনের মিল-অমিল প্রসঙ্গে বলা যায়, মানবেতিহাসে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মতত্ত্ব জীবন ও জগত সম্পর্কে নানান সময়ে তাদের উপলব্ধি ও বিচারকে সত্য বলে উচ্চারণ ও হাজির করেছে। কিন্তু সেটা করেছে তার বিশেষ বিশ্বাস বা বিশেষ উপলব্ধি হিশাবে। সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের চিন্তার বাইরে অন্য কোন বরাতের দোহাই দিতে হয়েছে তাকে। আল্লাহ, ঈশ্বর বা গডকে যেমন, তেমনি বরাত দিতে হয়েছে নবি-রসুল, ঋষি-আঊলিয়া, জ্ঞানীগুনী বা অন্য কোন অলৌকিক শক্তির। সেই বিশ্বাস বা উপলব্ধিকে চিন্তা সত্যিকারভাবে সার্বজনীন করে তুলতে পেরেছে কিনা তার ওপর নির্ভর করে বিভিন্ন ধর্ম ও ধর্মতত্ত্বের দার্শনিক পরিণতি। তবে মনে রাখতে হবে ধর্মতত্ত্ব দর্শনে রূপ নিতে না পারলেও তার উপযোগিতা হারায় না। বা চিন্তার দিক থেকে তার মূল্য কমে যায় না।

ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে দর্শনের তফাতের আরেকটি বড় দিক হোল, ইতিমধ্যে যা ‘রিভিল্ড’ (revealed) বা ব্যক্ত হয়েছে ধর্মতত্ত্ব তাকে সত্য আকারে ধরে নেয়। সেখান থেকে সে শুরু করে। অনুমান হচ্ছে, সত্যের আবির্ভাব ঘটেছে চিন্তার বাইরে, ঐতিহাসিক মুহুর্ত হিশাবে। অপরদিকে, দর্শন ওখান খেকে শুরু করে না। কারণ যার আবির্ভাব ঘটেছে তার আগমন যে অনিবার্য ছিল সেই সত্য দর্শনকে প্রমাণ করতে হয়। অলৌকিকতা বা আকস্মিকতা প্রমাণ হিশাবে দর্শনে গৃহীত নয়। কিন্তু দর্শন অলৌকিকতাকে সবসময় কুসংস্কার বলে খারিজ করে না। যদি বলা হয়, আল্লাহ জিবরাইলের মাধ্যমে আখেরি নবীকে একটা কোরান শরীফ পাঠিয়েছে, দর্শন বলবে হতে পারে এটা একটা গল্প। কিন্তু একে গল্প মেনে নিয়ে দর্শন সন্তুষ্ট হবে না। তুষ্ট থাকবে না। এটা যথেষ্ট ব্যাখা নয়। সব সত্যই আদতে গল্প মাত্র। প্রশ্ন করবে ১৪ শ বছর আগে, এই গল্পটা কেন তৈরি হল? কোরান শরিফে কী এমন কথা আছে যা মানুষের কাছে শুধু ‘সত্য’ বলে মনে হয় নি, একই সঙ্গে ঐশ্বরিক (দিব্যজ্ঞান)বলেও মনে হয়েছে, আল্লার কালাম বলে মানুষ বিশ্বাস করেছে। ইতিহাসকেও দর্শন তখন তার নিজের বিষয়ে পরিণত করে। দর্শন খুঁজবে মুহাম্মদ (সঃ)) নামে যিনি ছিলেন তিনি তো কোরাইশ বংশে ছিলেন। কোরাইশ বংশে একজন সত্যবাদী নবী আসবেন এই ধারণা কেন তৈরী হোল? তখন দর্শন আরও খুঁজবে কোরাইশ বংশের কি অবস্থা? সেখানে দাসপ্রথা, গোত্রবাদ ছিল। নবীজির পক্ষে প্রথম যে ৪৪ জন কালেমা পড়েছিলেন এদের ৪০ জনই দাস ছিল কেন? (সূত্রান্তরে সংখ্যা কমবেশী হতে পারে)। এটা কি তাহলে ক্রীতদাসদের বিদ্রোহ ছিল? দর্শন এই ক্ষেত্রে ইতিহাসের দ্বারস্থ হবে ঠিকই, কিন্তু দর্শন আবার আর্থ-সামাজিক ইতিহাস নয়। সে কারণে দর্শনকে দেখাতে হবে চিন্তার জগতে আসলে ঘটনাটি কিভাবে ঘটেছে। ইসলাম এমন কি চিন্তা করতে সক্ষম হয়েছে যা ইসলামের আগে ছিল না, কিন্তু প্রাক-ইসলামি চিন্তার অন্তর্গত অভাব, দ্বন্দ্ব বা অমীমাংসা থেকে অনিবার্য ভাবেই চিন্তার নিজের পরিণতি হিসাবে ‘ইসলাম’ নাম নিয়ে হাজির হয়েছে। ধর্মতত্ত্বের মধ্যে গভীর দর্শন থাকতে পারে, কিন্তু তাকে দর্শন বলা হয় না কারণ আসমানি বরাত দিয়ে সত্য প্রমাণের সুবিধা বা আরাম কোনটাই দর্শন ভোগ করে না। এজন্যই বলা হয় চিন্তা নিজের স্বরূপে নিজে হাজির হতে না পারলে তাকে ধর্মতত্ত্বই বলা হয়। সেটা প্রথাগত ধর্ম হোক বা সত্য নিয়ে যে কোন ধরণের তর্কবিতর্ক দেনদরবার হোক। চিন্তা যখন নিজের অনুমানকে নিজে প্রশ্ন করে না, প্রশ্ন করতে পারে না, কিম্বা প্রশ্ন করতে অযোগ্যতা কিম্বা অক্ষমতা প্রদর্শন করে, নিজের জ্ঞানতাত্ত্বিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে আটকে যায় -- তখন তাকে আজকাল ধর্মতত্ত্ব না বলে পরাবিদ্যা , অধিবিদ্যা বা মেটাফিজিক্সও বলা হয়। যেমন, কেউ বলল, পৃথিবী ‘বস্তু’ দিয়ে গঠিত এবং চেতনা বস্তুর জটিল রূপান্তর মাত্র। কিন্তু ‘বস্তু’ কি সেই প্রশ্ন করলে তার আর কোন উত্তর পাওয়া যায় না। বস্তুই এই জগত সৃষ্টির কারণ - পদার্থ। এভাবে ‘আল্লার’ জায়গায় ‘বস্তু’ বসিয়ে দিলে সেটাও ধর্মতত্ত্বই। সেটাও পরাবিদ্যা। অথবা “বস্তুবাদিতার নামে ধর্মতত্ত্ব” বলা যেতে পারে।

এই ধরণের ইতরোচিত পরাবিদ্যার অত্যাচার তো আমরা হামেশাই সহ্য করছি।

প্রশ্ন: বিজ্ঞানবাদিরাও তো আসমানী বরাত মানে না। দর্শনের দিক থেকে তাদের সমস্যাটা কি?

ফ.ম: দর্শনের চোখে বিজ্ঞানবাদিতা আর ধর্মতত্ত্বের মধ্যে চরিত্রের দিক থেকে কোন ফারাক নাই, বিষয়ে পার্থক্য থাকতে পারে। অন্যদিকে বিজ্ঞানবাদিরা কি করে? একটি উদাহরণ দিয়ে কথা বলি। আপনি যখন বলেন বিগ ব্যাং – অর্থাৎ যখন বলেন বিগ ব্যাং-এর দ্বারা একদিন পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছিল। তো আপনি ধর্মতত্ত্ব থেকে আলাদা কিছু বলেন না। ধর্মতাত্ত্বিকেরা বলে আল্লাহ একদিন বলেছেন ‘হও’, সে থেকে দুনিয়া সৃষ্টি হয়েছিল। তো বিজ্ঞানবাদি কি করল? ‘আল্লাহ’র জায়গায় ‘বিগ ব্যাং’ বসাল। দর্শন বরং ভাববে ‘সৃষ্টি’, ‘উৎপত্তি’, ‘স্রষ্টা’, ‘সৃষ্টির কারণ’ ইত্যাদির মানে কি আসলে? কেন চিন্তা এইসব নিয়ে ভাবে? চিন্তার স্বভাবের মধ্যে এমন কি ব্যাপার আছে যাতে তাকে ‘কারণ’ নিয়ে ভাবতে হয়? সৃষ্টি কথার অর্থ কি? নাই থেকে আছে হয়ে যাওয়া? কি করে সেটা ঘটে? সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মানুষকে কেন কোন না কোন বরাতের আশ্রয় নিতে হয়? জগত তো ‘আছে’ হয়েই আছে। তাহলে উচিত কাজ হোল ‘আছে’ কথাটার অর্থ বোঝার চেষ্টা করা। জগত তো ‘নাই’ হয়েই থাকতে পারত, কিন্তু ‘আছে’ হয়ে আছে কেন?

দেখুন, ইসলামের কাছে ‘বিগ ব্যাং’ আর ‘আল্লাহ’কে সমার্থক জ্ঞান করা শেরেকি। ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন উভয় দিক থেকেই এটা নতুন জিনিস -- এই ‘শেরেকি’-র ধারণা। দর্শন প্রশ্ন করবে, কেন ইসলাম একে এতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গণ্য করে? আল্লাহ সংক্রান্ত ধারণাকে কেন কোন ভাবেই দেশকালপাত্রাধীন সত্তার সঙ্গে তুলনা করতে দিতে চায় না ইসলাম? আল্লাহ তো সেই ধরণের ‘সত্য’ নন যিনি কোন বিশেষ জায়গায় ও বিশেষ সময়ে ‘বস্তু’ মাত্র হয়ে হাজির রয়েছেন। ফলে তিনি বস্তুগত ভাবে আছেন নাকি নাই এইধরণের বালখিল্য আন্তিকতা/নাস্তিকতার তর্ক ইসলামের কাছে ফালতু কুতর্ক। যে কারণে ইসলামে আল্লা ‘আছে’ কথাটা ‘আল্লায় ঈমান আছে’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। ফলে ‘ঈমান’ কথাটাও নতুন দার্শনিক তাৎপর্য ধারণ করে। এটা নিছকই ‘বিশ্বাস’ নয়। যদিও এভাবেই এর অনুবাদ হয়। যে সত্তা সম্পর্কে ‘আছে’ বা ‘নাই’ কোন কিছুই নির্ণয় করা জীবের অসম্ভব, তাকে কিভাবে জীব ধারণ করবে? ‘ঈমান’ হচ্ছে এর উত্তর। দেখুন, ‘ধৃ’ বা ‘ধারণ’ করা কথাটার দার্শনিক মানে ইসলামে অনুসন্ধান করতে নামলে আমরা কোথায় এসে হাজির হই। ঈমান ধারণ করা – আল্লার সঙ্গে বিশেষ ধরণের সম্পর্ক স্থাপন ও তা ধারণ।

ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে দর্শনের পার্থক্যটা এভাবেই শুরু হয়। দর্শন বা চিন্তা করতে অক্ষম হলে আপনি ‘মুসলমান’ হতে পারবেন, কিন্তু ‘মোমিন’ হতে পারবেন কিনা সন্দেহ। কারণ ‘ঈমান’ কথাটার অর্থ আপনার কাছে স্পষ্ট নয়, আপনি মোমিন হবেন কিভাবে? যাকে ধারণ করে জীব ‘পরম’ বা আল্লার খলিফা হয়ে ওঠে, সেটা ধারণ করার আকিদা তো ভিন্ন।

প্রশ্ন উঠবে কী দরকার তাহলে মোমিন হবার? ইসলাম কেন এমন এক ‘নির্লোক’-এর প্রস্তাব করে যে জগতের সঙ্গে সম্বন্ধ রচনা ছাড়া মানুষ তার জীবের জীবন অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে না। কিম্বা নিজের স্বরূপ দেখতে সক্ষম হয় না। এটা শুধু ইসলামের ক্ষেত্রে সত্য তা নয়। প্রত্যেক ধর্মই নিশ্চয়ই নতুন কিছু কথা বলে, যার সঙ্গে চিন্তা সম্বন্ধযুক্ত থেকে আনন্দ পায়। নইলে কোন ধর্মই ধর্ম হিশাবে টিকে থাকতে পারতো না। একই ভূগোল ও সংস্কৃতির মধ্যে জন্ম নিলেও ইহুদি, খ্রিস্টিয় ও ইসলামি চিন্তায় ‘আল্লার’ ধারণার যে আগমন ও বিবর্তন ঘটেছে দর্শনের কাছে তা খুবই আগ্রহের বিষয়।

দর্শন যখন এভাবে ইসলামের মধ্যে উত্থাপিত ধর্মতাত্ত্বিক ধারণাকে চিন্তার বিষয়ে পরিণত করে তখন তাকে আর ইসলামি দর্শন বলে না। চিন্তা নিজেই তখন ইহুদি, খ্রিস্টিয় বা গ্রিক চিন্তার বাইরের আরেকটি জগতের হদিস পেতে শুরু করে। আবিষ্কৃত নতুন চিহ্নগুলোকে চিন্তা নিজের অন্তর্গত করে নেবার চেষ্টা চালায়, নিজের সার্বজনীনতা ও অনিবার্যতাকে নতুন করে পরখ করতে শুরু করে। নিজের রূপান্তর ঘটাবার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেটা শুধু ইসলাম নয়, যে কোন ধর্ম বা ধর্মতত্ত্বই এই তাগিদ তৈরী করতে পারে।

‘বিগ ব্যাং’ আর ‘আল্লাহ’কে সমার্থক জ্ঞান করা শেরেকি হলেই ইসলাম বিজ্ঞানবিরোধী হবে তার কোনই যুক্তি নাই। বরং উল্টাটা হবে। আল্লার ধারণা কে বিজ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে বোঝা ও বিচারের পদ্ধতিটাই যে গোড়ায় ত্রুটিপূর্ণ সেই দিকটাই বরং স্পষ্ট হয়ে উঠবে। পরমার্থিক ধারণা প্রজ্ঞার অন্বিষ্ট, বুদ্ধির ‘বিষয়’ নয় – এই হুঁশটুকু ফিরে আসবে। বিজ্ঞানের সীমা ও সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হবে, একই সঙ্গে ধর্ম, ধর্মতত্ত্ব ও দর্শনেরও। কোরান শরিফকে বিজ্ঞানের বই হিশাবে পড়বার দুর্বুদ্ধিও কমবে। বোঝা যাবে, আল্লা এমন কোন ‘বিষয়’ নয় যাকে বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণ কিম্বা অপ্রমাণ করা যায়। আল্লাকে আল্লার জায়গায় থাকতে দেওয়াই প্রজ্ঞা।

প্রশ্ন: ধর্ম ও বিজ্ঞান সম্পর্কে অগ্রসরতা/অনগ্রসরতার তর্ক তো আছে..

ফ.ম: অগ্রসরতা বা অনগ্রসরতার বিচার আরেক ধরণের জটিলতা সৃষ্টি করে। কাকে ‘অগ্রসর’ বলি সে সম্পর্কে একটি আগাম ধারণা বা পূর্বানুমান ছাড়া এই ভাবে মূল্যায়ন করবেন কিভাবে? তবে আপনার প্রশ্ন আমি বুঝেছি। যারা মনে করে বিজ্ঞান মানেই ‘অগ্রসর’ একটা ব্যাপার, দর্শনের কাছে সেটা অগ্রসর নাও হতে পারে। চিন্তার ফিতা দিয়ে মাপলে বিজ্ঞানতত্ত্ব ধর্মতত্ত্ব থেকে ভিন্ন কিছু নয়। দুটোকেই যে কারণে দার্শনিকরা ‘পজিটিভ সায়েন্স’ বলে থাকেন। তবে দুইয়ের উপযোগিত ভিন্ন। ফলে তুলনা করাও বেহুদা।

যারা মনে করেন বিজ্ঞান মাত্রই ‘অগ্রসর’, দর্শন দেখাতে সক্ষম যে চিন্তার দিক থেকে বিজ্ঞান সেই দাবি করতে পারে না। শুধু এই জন্য নয় যে একালের বিজ্ঞান মানে মূলত কর্পোরেট বিজ্ঞান, তার কাজ বহুজাতিক কর্পোরেশানের মুনাফা কামাবার জন্য বেগার খাটা। সেটা অর্থশাস্ত্র দেখায়, এবং সেটা অবশ্যই সঠিক। কিন্তু দর্শনের কাজ ভিন্ন। দর্শনের মতো নিজের অনুমানকে প্রশ্ন করা, কিম্বা তার সিদ্ধান্তের ভিত্তিকে প্রশ্নাত্মক করে তোলা বিজ্ঞানের কাজ নয়। সেটা দর্শনের কাজ। এই অর্থেই বিজ্ঞান পশ্চাদপদ। বিজ্ঞান টেকনোলজির দিক থেকে এগিয়ে গিয়েছে বলে মনে হয়, কিন্তু এভাবে এগুতে গিয়ে মানুষ তার ভেতর বাইরের সঙ্গে যে সম্বন্ধ রচনাকে আবশ্যিক মনে করছে, দর্শনের কাছে সেটা ভয়াবহ ও ক্ষতিকর মনে হতে পারে। ভেতর /বাইরে কথাটার নানান মানে হতে পারে। ধরুন,  ভেতর মানে হচ্ছে চিন্তা ও বাহির মানে জগৎ। আধুনিক বিজ্ঞান যে চিন্তার ওপর দাঁড়ানো সেখানে জগৎ শুধু মানুষের কাছে উৎপাদনের উপায়, কিম্বা কাঁচামাল সরবরাহের ঘাঁটি। প্রকৃতি শুধু ভোগ্যা, এর বাইরে প্রকৃতির অন্য কোন তাৎপর্য নাই। মানুষের কাছে প্রকৃতির উপর নিজের বিজয় ঘোষণাই নাকি মানুষের কাজ। পরিবেশ, প্রাণ ও প্রাণের বৈচিত্র ও ব্যবস্থাপনার দুর্দশা দেখুন। মানুষ কি এগিয়েছে নাকি পিছিয়েছে? বাস্তবে? চিন্তার দিক থেকে বিজ্ঞান অত্যন্ত পশ্চাদপদ জায়গায় রয়েছে। তার মুক্তি দরকার।

অন্যদিকে আবার বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশলের দিক থেকে যদি দেখেন দেখবেন সমাজ পশ্চাদপদ হলেও চিন্তার দিক থেকে বহু অগ্রসর হতে পারে। গ্রীক সমাজ কি ছিল? দাসব্যবস্থার ওপর দাঁড়ানো সমাজ। তো এই গ্রিক সমাজের মধ্যেই তো প্লেটো এসেছেন, এরিস্টটল এসেছেন, আর্ট, শিল্পকলা, ভাস্কর্য হয়েছে। স্ববিরোধী মনে হলেও গ্রীক সমাজের মধ্যেই গণতন্ত্রের ধারণা দানা বেঁধেছে। যাকে আপনি অগ্রসর চিন্তা মনে করেন। তো আপনি কিভাবে বলবেন গ্রিক সভ্যতা পশ্চাদপদ সভ্যতা? কি যুক্তিতে বলবেন? কি করে বলবেন, দাস ব্যবস্থাই পশ্চাদপদ ব্যাবস্থা? কি যুক্তিতে ইতিহাসকে আদিম সাম্য সমাজ, দাস, সামন্ত, পুঁজিবাদ ইত্যাদি পর্যায়ে ভাগ করবেন? মধ্যযুগকে কিভাবে মধ্যযুগ বলবেন? কি যুক্তিতে? আবার বলবেন না যে আমি মধ্যযুগে ফিরে যাবার কথা বলছি। আমাদের বদ্ধমূল ধারণার মধ্যে যদি গোলমাল থাকে তবে চিন্তাই গিঁটগুলো ধরিয়ে দিতে সহায়তা করে। এতকাল যাকে সঠিক বলে গণ্য করছি তাকে প্রব্লেমেটাইজ বা প্রশ্নাত্মক করে তোলাই চিন্তার কাজ।

দর্শনের দিক থেকে মধ্যযুগ বলে কোন যুগ নাই । দর্শনে কাছে দিব্যযুগ আছে। মধ্যযুগ নাই। লালনের গানে আছে চার যুগ ছাড়াও গৌরাঙ্গ বা শ্রী চৈতন্য আরেকটি যুগ দেখায়। যার নাম ‘দিব্যযুগ’। শাস্ত্রের চার যুগ হচ্ছে সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর-কলি, ইত্যাদি। নতুন যে যুগ গৌরাঙ্গ দেখায় সে যুগ পৌরাণিক বা ইহলৌকিক যুগও নয় – ‘দিব্যযুগ’। ভাবান্দোলনের দিক থেকে ‘দিব্যযুগ’ দার্শনিক তাৎপর্যে টইটুম্বুর হয়ে আছে। যে কারণে নদিয়া আমার কাছে চিন্তার ইতিহাসে একটি বৈপ্লবিক মূহুর্ত হয়ে বারবারই ধরা দেয়।

আসলে দর্শনের সাথে অন্যান্য চিন্তার ফারাকটা বোঝা দরকার। মানুষের সব কিছুতেই চিন্তা আছে। মানুষ চিন্তাশীল প্রাণী। চিন্তা নিজের স্বরূপে নিজেকে যখন হাজির করে সেই রূপ 'দর্শন' করতে পারা, তার স্বাদ নিতে পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। চিন্তা নিজের জন্য নিজে বিষয় দেয়, নিজের বিষয় নিজে নির্ধারণ করে। চিন্তা তার নিজের বাইরে অন্য কারো প্রস্তাবিত বিষয়ের মুখাপেক্ষি নয়। কিন্তু সাইন্সের বেলায় তার বিষয় তার নিজের বাইরে তৈয়ার হয়ে থাকে বা আছে। যেমন, বোটানি। বোটানি কি? বৃক্ষবিদ্যা। গাছপালা নিয়ে যে বিজ্ঞান তাকে বলে বোটানি। তো এই অবজেক্টটা তো তৈরী হয়েই আছে। আপনি যদি বৃক্ষবিদ্যা পড়তে চান তো আপনি আগে থেকে জানেন আপনি কি পাঠ করতে যাচ্ছেন। আপনার বিষয় আগে থাকতেই চিহ্নিত। ফিলোসফিতে এরকম কোন অবজেক্ট তৈরি হয়ে থাকার ব্যাপার নাই, কোন পূর্ব নির্ধারিত সীমা বা চৌহদ্দি নাই। যে কোন জায়গা থেকে চিন্তা শুরু হতে পারে। সে কারণে দর্শনের কোন সাবজেক্ট নাই। অন্য কথায় দর্শনেরই আরেক নাম হচ্ছে চিন্তা। তবে সপ্রাণ। লাইভলি চিন্তা। জীবন্ত চিন্তা।

তো জীবন্ত চিন্তা তো একমাত্র জীবন্ত মানুষই করে। মৃত ব্যাক্তি তো আর চিন্তা করতে পারে না। পারে কি? এ জন্যই বড় দার্শনিকরা যেমন, ফকির লালন কি বলেন? বলেন যে, এই জন্যই জীবন্ত মানুষকেই ভজনা করতে হবে। জ্ঞানতত্ত্ব বা পাশ্চাত্যের ‘দর্শন’ ধারণার সঙ্গে অবশ্য লালনের ‘ভাব’ কথাটার পার্থক্য আছে। ভাবান্দোলনের অন্বিষ্ট শুধু চিন্তা করা না, নিজের ভেতর ও বাইরের সঙ্গে সম্বন্ধ ভাবনির্ণয়ের প্রশ্ন। কিন্তু সেই প্রশ্নে তখনই প্রবেশ সম্ভব হবে যদি ধর্ম, দর্শন ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের অনুমান ও ধারণা পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন: ইসলামের ব্যাপারে দর্শনের এই প্রক্রিয়া কেমন?

ফ.ম: কোরান কি নিজের ব্যাখ্যা নিজে করতে পারে? কোরান যদি নিজের ব্যাখ্যা নিজে করতে পারত তাহলে তো খুব ভাল হত। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে কাগজ, কালি কিম্বা কোন জড় চিহ্নব্যবস্থা নিজের ব্যাখ্যা নিজে করতে পারে না। টিকা, ব্যাখ্যা, ভাষ্য ইত্যাদি সবইতো কোন না কোন জীবন্ত মানুষকেই করতে হয়। কোরানকেও ব্যাখ্য করতে হয় একজন মানুষকেই। সেটা পাঠক হিসাবে আপনি নিজে হতে পারেন, কিম্বা আপনার ওস্তাদ, শিক্ষক বা আপনার গুরু হতে পারে। যে কোন বইয়ের ক্ষেত্রে কথাটা খাটে। কিন্তু ধর্মের দিক থেকে আপনি কোরানকে একটি ‘বই’ গণ্য করতে পারবেন না। ইসলামের দিক থেকে সেটা সঙ্গত হবে না। এখন দেখুন, ‘বই’ হিসাবে গণ্য করলে আপনি নিজেকে একটি বইয়ের অধীনস্থ করছেন, সেটাই দাঁড়াবে। সেইক্ষেত্রে এই সম্পর্ক বই পূজায় পর্যবসিত হবার আশংকা থেকে যায়, যাকে ইসলাম শেরেকি গণ্য করবে। বরং এই সম্পর্কের মধ্য দিয়ে আপনার মধ্যে যে দিব্য সম্ভাবনা রয়েছে তাকে জাগ্রত করাই আপনার কাজ। অর্থাৎ নিজেকে সপ্রাণ, জীবন্ত, ও চিন্তাশীল সত্তা হিশাবে জাগিয়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা ও কর্তব্য আপনি বুঝবেন । কোরান পাঠ, কেরাত, কোরানের সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্কে সম্পর্কিত হওয়ার এটাই একটা দার্শনিক মানে। নিজেকে জাগিয়ে তুলতে পারলেই আপনি তখন কোরানকে কোথায় আক্ষরিক ভাবে পড়বেন, কোথায় উপমা, উৎপ্রেক্ষা, প্রতীক বা ইশারা থেকে নতুন অর্থোৎপাদন করবেন তার জন্য নিজেকে সজ্ঞান ও শিক্ষিত করে তুলতে পারবেন। দর্শন এই দিকগুলোর ওপর আলো ফেলতে পারে। এই দিক থেকে ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন নিজ নিজ পার্থক্য বজায় রেখেও পরস্পরের পরিপূরক হতে পারে। কোরান শরিফকে নিছকই একটি বই হিসাবে গণ্য করা যায় না। গণ্য করতে না পারাটা নিছকই বিশ্বাসী  হবার হিসাবে কারণে নয়, বরং দার্শনিক বা ভাবুক হিসাবেই আপনি তা করতে চাইবেন না।

অর্থাৎ কোরান যে-অর্থে নিজেকে ‘কিতাব’ বলে তাকে আক্ষরিক অর্থে ‘বই’ হিসাবে বোঝা শুধু ধর্মতাত্ত্বিক দিক থেকে ভুল তা নয়, দর্শন বা ভাবুকতার দিক থেকেও অগ্রহণযোগ্য । আক্ষরিক অর্থে আমরা যাকে ‘বই’ বলি সেই ধরণের মুদ্রিত অক্ষর সম্বলিত মৃত কোন বস্তু জ্ঞান করে কোরানের সঙ্গে সম্পর্কিত হওয়া মোমিনের জন্য সঙ্গত নয়। শুধু এ কারণে নয় যে কোরান পবিত্র গ্রন্থ। কোরান শরিফ দিব্যার্থজ্ঞাপক উপমা, উৎপ্রেক্ষা, প্রতীক, ইশারা ও ইঙ্গিতে ভর্তি -- সেটা তো আছেই; সেটা ধরুন মোমিনের জন্য এক নম্বর কারণ। কিন্তু শুরুতে বা পাঠের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে কোরান শরিফের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের ধরণ আপনাকে আগেই নির্ধারণ করে নিতে হবে; নইলে কিভাবে পড়বেন, কী পড়তে বসেছেন ইত্যাদি আপনার কাছে স্পষ্ট হবে না। কোরান নিশ্চয়ই পদার্থবিজ্ঞান বা গণিতের বই না যে এর মধ্যে আপনি বিজ্ঞানের ‘সত্য’ পাবেন। কিন্তু এই বলেই তো পড়েন যে ‘জালিকাল কিতাবু লা রাইবা ফিহে’ – এই বইয়ের মধ্যে যা আছে তাতে সন্দেহ বা মিথ্যা কিছু নাই’। এখান থেকে ‘সত্য’ সংক্রান্ত ধারণা কোরান কিভাবে ব্যক্ত করে দর্শন তা বিচার করে দেখতে আগ্রহী হয়। অন্যদিকে কোরানের আরেক নাম ‘ফোরকান’ – স্রেফ নিজের আবর্ভাব ও উপস্থিতির দ্বারা সত্য আর মিথ্যার মধ্যে যে ফারাক করতে সক্ষম, কিম্বা যার প্রধান ভূমিকা মানুষের মধ্যে সত্য আর মিথ্যার ফারাক নির্ণয় করে দেওয়া। কোরানের মধ্যে কোন ‘মিথ্যা’ নাই, কোরান ‘সত্য’ এই কথার সঙ্গে তুলনা করুন - কোরান শরিফ মানুষকে সত্য থেকে মিথ্যাকে আলাদা করতে অনুপ্রাণিত করে, শেখায়, উদ্বুদ্ধ করে, আগ্রহান্বিত করে, দিশা দেয় ইত্যাদির সঙ্গে। দুটো ধারণার মধ্যে পার্থক্য আছে। খেয়াল রাখবেন। দর্শন এই সব পার্থক্য বিচারে প্রবল ভাবে উৎসাহী।

এখন আপনি দাবি করতে পারেন যেকোন বই সম্পর্কে এ কথা খাটে। কারণ যে কোন বই পড়বার আগেই বইয়ের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আগাম নির্ধারিত করে নিতে হয়। সেটা কূটতর্ক হবে। কারণ বাক্য বা কালামের সঙ্গে আধুনিক কালে মানুষের সম্পর্কের যে ধরণ সেখানে এই ভাবটা আর হাজির নাই। ‘বই’-এর সঙ্গে এখন যে সম্পর্কে আপনি সম্বন্ধযুক্ত হন সেই সম্পর্কের চরিত্র আগে থাকতেই সামাজিক ভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে। সেটা পাশ্চাত্য অর্থে সেকুলার বলতে পারেন। আধুনিকতার মধ্যে বই তার ঐশ্বরিক মহিমা থেকে অধঃপতিত। তাকে আর আপনি ধর্মভাব নিয়ে পড়েন না। কিম্বা কোন গ্রন্থ আপনার মধ্যে সে ভাব জাগিয়ে তুললে সেই ভাবকে আপনি আর মর্যাদা দেন না। কিম্বা কিভাবে দিতে হয় জানেন না। ভুলে গিয়েছেন। আপনার ক্ষয় ও বিকৃতি ঘটেছে। চিকিৎসা দরকার।

যথেষ্ট ব্যাখ্যা করবার ফুরসত পাবো না তবে এখানে বলা রাখি, ইসলামে কিতাব বা কালামের ধারণা গ্রিক-খ্রিস্টিয় ‘লোজোস’ (Logos)-এর পর্যালোচনা হিসাবেই হাজির হয়েছে বলে আমার সন্দেহ হয়। হেরাক্লিটাস থেকে এরিস্টটল অবধি লোজসের যে ধারণা তার পর্যালোচনা হিশাবে ‘কিতাব’ বা ‘কালাম’ ধারণা হিসাবে কিভাবে বিবর্তিত হয়েছে তার হদিস নিলে ইসলামের সঙ্গে গ্রিক দর্শনের বিরোধের কিছু জায়গা স্পষ্ট হতে পারে । শিষ্য জনের সুসমাচারে যেভাবে বলা আছে আদিতে লোজস দিয়েই সবকিছু দৈবসত্তা হিসাবে তৈয়ারি ছিল, আর যীশু হচ্ছেন লোজস বা প্রজ্ঞার শরীরী প্রকাশ বা মুহূর্ত। যীশু হয়েই শারিরীক রূপ নিয়ে প্রজ্ঞা মানুষের কাছে ধরা দিয়েছে – এই ধারণার পর্যালোচনা হিশাবে ‘কিতাব’, ‘কালাম’ ইত্যাদির মানে বোঝা জরুরী। কিছু কিছু সুফিরা যখন বলেন যে আল্লার নূর হয়ে হজরত মোহাম্মদ (সঃ.) আল্লার কাছে ছিলেন, তাঁর কারণেই জ্ঞান ধরায় অবতীর্ণ হয়েছে। মনে হয় এই ধারণাগুলো গ্রিক-খ্রিস্টিয় ধারণারই প্রতিফলন। সুফিদের সঙ্গে শরিয়তপন্থীদের বিরোধের জায়গাগুলো দর্শন আমলে নেয়। শরিয়তপন্থিরা সুফিদের চেয়ে ছহি, কিম্বা সুফিরা শরিয়তপন্থিদের চেয়ে ভালো – এই ধরণের শর্টকাট ও সস্তা সিদ্ধান্তে আসা দর্শনের কাজ না। বরং চিন্তার দিক থেকে বিরোধের জায়গাগুলো শনাক্ত করাই আসল কাজ। তারপরের কাজ হচ্ছে চিন্তার জগতে এই বিরোধগুলোর আদৌ মীমাংসা হয়েছে কিনা তা নির্ণয় করা। এ বিষয়ে আরও গবেষণার দরকার আছে সন্দেহ নাই। গ্রিক দর্শনের কিছু যদি ইসলাম কবুল করে থাকে তবে সেটা কি, এবং ইসলাম যা কবুল করে নি, লড়ে গিয়েছে এখনও লড়ছে সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত করবার পদ্ধতি কি হবে, এইসব বিষয় দর্শনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এই সুত্রে মার্কসেও আসি। এখন যদি আপনি মার্কসের ক্যাপিটাল পড়েন, বুঝবেন কি? অবশ্যই বুঝবেন। আপনি যদি জীবন্ত হন তাহলে বুঝবেন। আর যদি মৃত হন তাহলে তো বোঝাবুঝির বাইরে চলে গেলেন। অথবা আপনি বোঝার জন্য গুরুর কাছে যাবেন গুরু বুঝিয়ে দেবেন। যাকে আপনি ‘নেতা’ বলে মানেন। একাডেমিক ভাবে পড়তে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে আপনি টাকা দিয়ে গুরু ভাড়া করেন, তাকে ‘স্যার’ ডাকেন। তার কাছে পরীক্ষা দেন। পাশ করলে সমাজে চাকরি পান। ‘গুরু’ কথাটা সেই দিক থেকে রহস্যজনক কিছু নয়। এর মধ্যে আধ্যাত্মিক, কুয়াশা বা গুহ্য ধরণের কোন ব্যাপারস্যাপার নাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার বা প্রফেসারের সঙ্গে গুরুর এই ক্ষেত্রে কোন ফারাক নাই। গুরু রহস্যজনক কোন ব্যক্তি নন। দুজনকেই জীবন্ত হতে হয়। এবং মৃত বই পাঠ করে তার জীবন্ত ব্যাখ্যা দিতে হয়। যখন আপনি নিজেকে মার্কস-লেনিন-মাওয়ের চিন্তাধারা বিশ্বাস করেন, আপনার চিন্তার সঙ্গে ধর্মতত্ত্বের পার্থক্য কোথায়?

তবে বিষয় বিচারে ‘গুরু’ কথাটার একটা আলাদা মানে আছে। গুরুর কাছে যে বিষয় জানতে ও শিখতে যান সেটা পরমার্থিক বিষয়। যে বিষয়ের তাগিদ আপনার জীব জীবনের অতিরিক্ত। এ কথা আগেই বলেছি। তিনি ইহলৌকিক জীবন সম্পর্কে কিছু শিক্ষা দেন না তাতো নয়। অবশ্যই দেন। কিন্তু তিনি পরমার্থিক যা শেখান তার মধ্য দিয়ে আপনি আরও চিন্তাশীল হয়ে উঠতে পারেন। অন্যদের কাছে আর যা কিছু শেখেন বা শিখেছেন তার গোড়ার অনুমানগুলোও গুরু ধরিয়ে দেন। তখন তাদের সীমা সম্পর্কে আপনার ধারণা পরিচ্ছন্ন হয়ে ওঠে।

গুরু আপনাকে প্রশ্ন করতে শেখায়। উত্তর তাঁর কাছে নাও থাকতে পারে। দর্শনের দিক থাকে গুরুর এই ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পাশ্চাত্য দর্শনের দিক থেকে দেখলে রোল মডেল হিশাবে আপনি সক্রেটিসকে ‘গুরু’ ভাবতে পারেন। তবে ভাবান্দোলন সেটা মানবে না। অর্থাৎ শুধু প্রশ্ন করতে শেখানোর মধ্যে জ্ঞানকর্তাকে পাওয়া যায়, গুরুকে নয়। গুরুকে অবশ্যই তাঁর জীবন যাপন আচার আচরণ চলা ফেরা কথা বার্তা সব দিক থেকে ‘সত্য’ হয়ে উঠতে হবে। তিনি পূর্ণচন্দ্র রসিক। সচ্চিদানন্দ। একমাত্র আল্লার অলি বা সাধকদের মধ্যেই এই গুণ পরিলক্ষিত হয়। তারা নিজেরাই পরমার্থিক হয়ে ওঠেন। ‘গুরু’ ধারণাকে খুব হাল্কা ভাবে নেবার সুযোগ নাই।

এ জন্য জীবন্ত মানুষ ‘ভজনা’ নদীয়াতে গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামের দিক থেকেও ব্যাপারটা বুঝতে পারেন। ইসলামে ভাষ্য অনুযায়ী মানুষ দুনিয়াতে এসেছে আল্লাহর ‘খলিফা’ হিসাবে। আল্লাহর প্রতিনিধি হয়ে। এই ধারণাগুলো দর্শনের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এটা যদি সত্যিই কেউ মানে তাহলে দুনিয়াতে আল্লার প্রত্যক্ষ ‘অনুপস্থিতি’ সত্ত্বেও সৃষ্টির হেফাজত করবার নৈতিক দায় এসে পড়ে তার ওপর। শুধু নিজের নয়। পশু, পাখি, কীটপতঙ্গ জীব, অণুজীব সকলের – এমনকি জৈব ও অজৈব সকল জগতের। সবই তো তাঁর সৃষ্টি। নিজেকে মু্সলমান দাবি করলে এই দায় নিতে হবে।

মানুষ আল্লার খলিফা হিসাবে পরিগণিত হবার পেছনে নিশ্চয়ই কিছু যুক্তি আছে। মানুষের বিশেষ কোন গুণ রয়েছে যা দিব্যগুণসম্পন্ন, অতএব মৃত বই পড়েও মানুষ আল্লার কালামের জীবন্ত সার সংগ্রহ করতে সক্ষম। আল্লার কালামের অর্থ বোঝার জন্য সেই ক্ষেত্রে তাকে আল্লার বরাত দেবার দরকার পড়ে না। যে অর্থ সে করছে সেই অর্থ সে আল্লার কাছ থেকে সরাসরি পেয়েছে এই দাবি করবার তার কোন প্রয়োজন নাই। যেন সে বরাত না দেয়, এবং নিজের ক্ষমতার ওপর আস্থাশীল থাকে ও আল্লার দেওয়া প্রতিভা চর্চা করে সেই জন্য আখেরি নবীর পরে মানুষের কাছে আর কোন নবি আসারও দরকার নাই। আর কোন উকিল দরকার নাই। শেষ নবি এসে গিয়েছেন। এখন মানুষ নিজেই নিজেকে বুঝতে ও উপলব্ধি করতে সক্ষম। নিজে চেষ্টা করলেই কোরান পড়ে তার অর্থ বুঝতে মানুষ সক্ষম হবে না কেন? এ ক্ষমতা সবসময়ই সব মানুষের মধ্যে আছে। নতুন পরিস্থিতিতে মানুষ নতুন অর্থ তৈয়ার করতে জানে। কারণ মানুষ সপ্রাণ ও জীবন্ত। এখন এই সময়ে তার কর্তব্য নির্ধারণ করবার জন্য কোরানের যদি কোন নতুন বয়ান দরকার হয় তা মোমিন করতেই পারে। সে যদি জীবন্ত হয় তাহলে সে এটা অবশ্যই পারে। তার মানে তাকে দৈহিক ভাবে জীবন্ত থাকলে হবে না, চিন্তার দিক থেকেও সজীব থাকতে হবে। সাম্প্রতিক হতে হবে।

প্রশ্নঃ দর্শন কিম্বা ভাবচর্চার দিক থেকে ধর্মের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীর সীমাবদ্ধতা ও সংকীর্ণতাই আপনি তুলে ধরছেন। ধর্ম নিয়ে যারা লেখালিখি করেছেন ও করেন চিন্তার জগতের সেইসব মনীষীদের পাঠ করবার সময় একজন তরুণ ভাবুকের কোন দিকটা মনে রাখা দরকার বলে আপনি মনে করে্ন। যেমন ধরুন, মার্কসকে পড়বার সময়...

ফ.ম: ধর্ম সম্পর্কে মার্কসের বিক্ষিপ্ত কিছু লেখা আছে। লেখা না বলে মন্তব্য বলাই শ্রেয়। কারণ তরুণ বয়সে অন্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি প্রসঙ্গক্রমে কিছু মন্তব্য করেছেন। বিক্ষিপ্ত ভাবে সেই সকল মন্তব্য থেকে দুই একটি বাক্য তুলে নিয়ে তাকেই ধর্ম সম্পর্কে মার্কসের চূড়ান্ত বক্তব্য হিসাবে মার্কসের অনুসারী এবং তার ঘোর শত্রু উভয়েই নানান সময়ে দাবি করেছেন। যেমন, মার্কস নাকি বলেছেন, ধর্ম হচ্ছে আফিম—এইসব...। মার্কসকে ইতরোচিত অর্থে ‘নাস্তিক’ প্রমাণের কোশেশ মার্কসবাদীরা যেমন আদাজল খেয়ে করেছে, ঠিক তেমনি মার্কসের শত্রুরাও। বাংলাদেশের এখনকার কমিউনিস্টদের (??) কীর্তি দেখুন। তুলনা করুন ইসলামপন্থিদের নাস্তিক ও কমিউনিস্ট বিরোধী আবেগ ও আন্দোলনের সঙ্গে। তত্ত্বগত জায়গায় তারা উভয়েই একই পাটাতনে। উভয়েই মনে করে কমিউনিজম নাস্তিকদের ধর্ম। একপক্ষ এই নাস্তিকতাকে যে কোন মূল্যে রক্ষা করতে চায়, খেয়ে না খেয়ে সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি থেকে ধর্মকে বিতাড়িত করাকেই তারা কমিউনিজম মনে করে। ধর্ম থাকবে প্রাইভেট ব্যাপার হয়ে, সমাজে রাজনীতিতে, সংস্কৃতিতে ধর্ম থাকবে কেন?  ধর্ম বুঝি টেনিস বলের মতো প্রাইভেট জায়গায় লুকিয়ে রাখা যায়! 

তার পালটা ইসলামপন্থিরা লড়ছে এই ধরণের কমিউনিস্ট ও নাস্তিকদের বিরুদ্ধে। এই ধরণের কমিউনিস্টরা একই সঙ্গে ঘোরতর ইসলাম-বিদ্বেষীও বটে। বিরোধিতার সেটা একটা কারণ। কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী না হলেও ইসলামপন্থিরা কমিউনিস্টদের পছন্দ করে না। তাদের শত্রু গণ্য করে। আমাদের সমাজে তো এই গভীর মুশকিল রয়ে গেছে। এগুলো বিপদের জায়গা। প্রথাগত নাস্তিক কমিউনিজম নানা কারণে আপদ আকারে টিকে থাকবে আরও অনেকদিন। তবে আমি মনে করি না, মানবেতিহাসের কোন মৌলিক রূপান্তর ঘটাবার ভাবুকতা বা রাজনীতি তারা জন্ম দিতে পারবে।

অন্যদিকে ইসলামপন্থিরা চরম ভাবে মার খাবে যদি তারা কমিউনিস্টদের মতোই ভুল করে ভাবে যে কমিউনিজম নাস্তিকদেরই আদর্শ। তারা যদি আদৌ বিশ্বব্যবস্থার মৌলিক কোন রূপান্তর ঘটাতে চায় তাহলে তাদের চিন্তাচেতনা, ধ্যান ধারণার মধ্যেও মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে হবে। যেমন, বিশ্বাসকে শুধু বিশ্বাসের জায়গায় রেখে দিলে চলবে না, তাকে জ্ঞানে ও প্রজ্ঞায় কিভাবে রূপান্তর ঘটাতে হয় জানতে হবে। সেটা করতে হলে ভাবুকতার জায়গা থেকে ইসলামের বৈশিষ্টসূচক অবদানটা আসলে কী, সেটা শনাক্ত করা ও সকলকে বোঝানো দরকার। এটাও বোঝাতে হবে কেন নতুন বিশ্বব্যবস্থার আবির্ভাব ত্বরান্বিত করবার জন্য ইসলামের বৈশিষ্টসূচক অবদানকে আত্মস্থ করা মানবেতিহাসের জন্য জরুরী। মানুষের ঐতিহাসিক বিকাশের জন্য যেমন, তেমনি নিজের অর্থ সে নিজে করতে সক্ষম হয়ে উঠছে কিনা এই দুই দিক থেকেই। বুঝতে হবে মুসলমানদের শাসন কায়েম করা আর ইসলাম কায়েম করার মধ্যে যোজন যোজন ফারাক আছে। অসম বিশ্বব্যবস্থায় মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার রাজনীতি থাকবে, অস্বাভাবিক কিছু নয়। তার সাম্প্রদায়িক চরিত্র থাকাও অসম্ভব নয়। কিন্তু ইসলাম কায়েমের রাজনীতি কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নয় – বরং ইসলাম অনুপ্রাণিত চিন্তা ও আদর্শকে সার্বজনীন করে তোলা -- এই দিকটা বুঝতে পারলে বাংলাদেশে আমরা বহুদূর এগিয়ে যেতে পারব।

ইসলামপন্থিরা বাংলাদেশে যাদেরকে ‘কমিউনিস্ট’ ভাবছে তাদের সঙ্গে জালিমের বিরুদ্ধে লড়াকু কমিউনিজমের কোনই মিল নাই। কিম্বা মিল নাই চিন্তা নিজের সঙ্গে নিজে নিরন্তর পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যুগে যুগে যে বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করে তার সঙ্গে। কমিউনিজম এবং নাস্তিকতা মোটেও সমার্থক নয়। স্নায়ু যুদ্ধের সময় কমিউনিজম এবং কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল প্রপাগাণ্ডার মুল মর্মই ছিল কমিউনিস্টরা নাস্তিক, কমিউনিজম নাস্তিকদের আদর্শ। এই অজুহাতে ইসলামপন্থিরা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে দেশে দেশে লড়েছে। কমিউনিস্টরা নাস্তিক এটা সাম্রাজ্যবাদের শেখানো বুলি। পাকিস্তান আমলে আমরা দেখেছি, কিভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ সহায়তায় কমিউনিজমের বিরুদ্ধে বই লেখা হয়েছে। বিশেষত সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে। মনে পড়ে হাসান জামানের ‘ইসলাম ও কমিউনিজম’ বইয়ের কথা। ষাট দশকের শুরুতেই বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নে কিভাবে মুসলমানরা অত্যাচারিত হচ্ছে তার ওপর প্রপাগাণ্ডা। এই রকম বহু বই প্রকাশিত হয়েছে। তথাকথিত কমিউনিস্ট ও ইসলামপন্থিদের বুকে সেই প্রপাগান্ডাই খচিত রয়েছে যে, কমিউনিজম ও নাস্তিকতা সমার্থক। আর, খচিত রয়েছে, মার্কস বুঝি খেয়ে না খেয়ে ধর্মের বিরোধিতা করেছিলেন। আমি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্দশা কাটিয়ে তোলার জন্য ‘মোকাবিলা’ বইতে এই তর্কের প্রাসঙ্গিক কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি।

ধর্মকে সুনির্দিষ্ট ভাবে পর্যালোচনার বিষয় গণ্য করে ধর্ম সম্পর্কে চূড়ান্ত কোন ‘তত্ত্ব’ হাজির করেছেন এটা মার্কস নিজেও দাবি করেন নি। কোত্থাও না। ধর্ম সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তরুণ বয়সে তিনি লেখেছিলেন, ‘জার্মানিতে ধর্মের পর্যালোচনা মোটামুটি শেষ হয়েছে, আর অন্য যে কোন বিষয়ের পর্যালোচনার পূর্বশর্ত হর্ত হচ্ছে ধর্মের পর্যালোচনা সমাপ্ত করা”। জার্মানিতে ধর্মের পর্যালোচনা শেষ হয়েছে এটা তিনি ধরে নিয়েছেন ফয়েরবাখের কাজের কথা মনে রেখে। মার্কসকে বোঝার জন্য সে কারণে ফয়েরবাখ বোঝা জরুরী। কিন্তু এ কালের গুরুত্বপূর্ণ কোন দার্শনিকই মনে করেন না যে ফয়েরবাখের হাতে ধর্মের পর্যালোচনা পরিসমাপ্ত হয়েছে। কিম্বা একালে ধর্ম যখন বিপুল শক্তি নিয়ে আবার ফিরে আসছে – রাজনীতি হয়ে শুধু নয়, দর্শনের বিষয় হয়েও বটে -- তখন ধর্মের পর্যালোচনা আরও নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে। আমাদেরও করতে হবে।

তবে আপনি পাঠের কথাই বোধ হয় তুলছেন। কিভাবে একটি গদ্য আমরা পড়ব, কিভাবে একটা বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করলে পাঠক হিসাবে লাভের সম্ভাবনা বেশী থাকে – প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবহারিক প্রশ্ন হিশাবে শুধু নয় চিন্তার শ্রমের দিক থেকে সাশ্রয়ী হবার ক্ষেত্রেও কাজে লাগে। সেটা তো যে কোন বই – এমনকি ধর্মশাস্ত্র কিম্বা কবিতার বই সম্পর্কেও খাটে। আমার মনে হয় ভাবুকরা – বিশেষত যাঁরা বাংলাভাষী ও তরুণ – তাদের আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলব যে মনীষীদের, তাদের লেখালিখির দিক থেকে, দুই ভাগে ভাগ করে বিচার করলে কিছু সুবিধা তাঁরা পেতে পারেন। এই পদ্ধতিটাও কবি হিসাবে আমার কাছে একসময় কাজে লেগেছে।

যেমন, কবিতার বই আপনি দুইভাবে পড়তে পারেন। এক. পড়তে পারেন জিকির করার মতো। কিছু একটা ভুলে গিয়েছেন, স্মরণ করবার তাগিদ থেকে। এখন  কল্পনা করুন মানুষ নানা কারণে তার অভিজ্ঞতার অনেক কিছুই ভুলে গিয়েছে। কিন্তু কোনকিছুই তো আর পুরাপুরি মুছে যায় না, ভাষার মধ্যে তার দাগ থেকে যায়। উপমা, উৎপ্রেক্ষা ও প্রতীকের মধ্যে দানার মতো চিন্তার নানান বীজ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতেই পারে। কবি ও কবিতার প্রতি যদি আপনি সদয় থাকেন তাহলে আপনি অনুমান করেন যতোই দুর্বোধ্য হোক কবিতার মধ্যে যে দাগগুলো দেখছেন, যে সকল চিহ্ন নিয়ে কবিতা কবিতা হয়ে ওঠে, তার মধ্য থেকে এমন কিছু উঠে আসছে যা আপনার কাছে নতুন। কবিতার সঙ্গে আপনার সদয় সম্পর্ক ছাড়া এই জিকির, এই স্মৃতিচর্চা বা এই উদ্ধারক্রিয়া অসম্ভব। সদয় বলেই যা অদৃশ্য তাকে দৃশ্যমান করতে, কিম্বা যা আছে বলে আপনি ডুবতে নেমেছেন তা উদ্ধার করতে পারছেন – নইলে না। কোন কিছু আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠ করার চেষ্টা করলে মানুষ যা ভুলে যায়, কিম্বা ভুলে গিয়েছে, কিম্বা এখনও পুরাপুরি চিন্তা করে উঠতে পারে নি, সেই জায়গাগুলো ধরা পড়তে পারে।

কাব্য বা দর্শন মানুষের কি কাজে লাগে সেটা বলা খুবই মুশকিলের,কিন্তু কবিতাপাঠ আমার কাছে সবসময়ই জিকির করার মতো ধর্মপ্রাণ ব্যাপার বলে মনে হয়। সেটা আমার জন্য মুশকিলও তৈরী করে। কারণ সকলের কবিতা সেভাবে টানে না, বা পড়ি না। কবিতা, ধর্মগ্রন্থ, ধর্মতত্ত্ব বা দর্শনের সঙ্গে একটা সদয় সম্পর্ক তো আর একপক্ষীয় ভাবে হয় না। কিছু একটা আছে যা উদ্ধার করা সম্ভব, এই বোধগুলো তো সকল ক্ষেত্রে জাগে না। হয়তো যা উদ্ধার করলেন তা কবিতার মধ্যে নয়, আপনার মধ্যেই ছিল, কিন্তু কাব্যের সঙ্গে যে-সম্পর্ক আপনি তৈরী করেন সেই সংবেদনা আপনাকে দিয়ে এই জিকির করিয়ে নিল।

এবার মনীষীদের ব্যাপারে আসি। তাঁরা ধর্ম বা ধর্মতত্ত্বের প্রতি সদয় নাকি সদয় নন, সেই দিক থেকে তাঁদের ভাগ করতে পারেন। একদল মনে করেন ধর্ম বা ধর্মতত্ত্বের নিজের কিছু সারবস্তু আছে। ধর্মভাবের কিছু ‘ভাব’ আছে যাকে সেই ভাবে জানা ও বোঝা দরকার। মানবেতিহাসের বিশেষ বা সার্বজনীন কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা তারা ধারণ করে এবং সেইসব উদ্ধার করা সম্ভব। কাব্য, ধর্ম বা ধর্মতত্ত্বের সঙ্গে পাঠের বিশেষ সম্পর্কের মধ্য দিয়ে মনীষী নিজেই এমন কিছু অভিজ্ঞতার নাগাল পেতে পারেন যা প্রজ্ঞার সদর রাস্তা ধরে আরও কয়েক কদম এগিয়ে যেতে কাজে লাগে। এদের বলতে পারেন ধর্ম বা ধর্মতত্ত্বের প্রতি সদয় মনীষী। হেগেলকে এর মধ্যে রাখতে পারেন এক নম্বরে, রাখতে পারেন হেইডেগার, দেরিদা এদেরকেও।

এবার দ্বিতীয় ভাবে পাঠ করার কথা বলি। এই পাঠের অনুমান হচ্ছে কবিতা, ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মের নিজের কোন সারবস্তু নাই। এদের যদি কোন অর্থ থাকে সেটা তাদের নিজের অর্থ নয়। সেটা অন্য কোন কিছুর লক্ষণ বা সিম্পটম মাত্র। যেমন আপনি কবিতাকে কবির মনস্তত্ব্ব বিচারে পর্যবসিত করতে পারেন। কিম্বা অলংকার শাস্ত্র, নন্দনতত্ত্ব ইত্যাদি দিয়েও ব্যাখ্যা করতে পারেন। কবিতার সমাজতত্ত্ব প্রস্তাব করা কিম্বা কবিতার উপযোগিতা দিয়ে উপযোগিতাতত্ত্বও খাড়া করা খুবই সম্ভব। এইসব হচ্ছেও হামেশা।

ধর্ম ও ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রেও আমরা দেখি মনীষীদের একদল আছেন ফরাসি দার্শনিক পল রিকোয়েরের (Paul Ricoer) পরামর্শ অনুযায়ী যাঁদের সন্দেহবাতিকগ্রস্ত বলা যায়। মন্দ অর্থে নয়। সন্দেহ করা দার্শনিকতার প্রাথমিক অবস্থা। এদের অনুমান হচ্ছে ধর্ম বা ধর্মতত্ত্বের আদৌ নিজস্ব কোন ‘বিষয়’ আছে কিনা সে সম্পর্কে তাঁরা সন্দিহান। অনেকেরই ধারণা ধর্মের কোন সারবস্তু নাই, ধর্ম একধরণের ইলিউশান। বিভ্রান্তি। নানান কারণে এই বিভ্রান্তি ঘটতে পারে । যেমন, জগতকে ব্যাখ্যা করার গলদ, জগত উল্টে আছে বলে উলটা চিন্তা করা, ইত্যাদি।

তবে মনীষীদের মধ্যে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুঃসাধ্য যারা ধর্ম বা ধর্মতত্ত্বকে এক কথায় নাকচ করেন। তাঁরা শুধু মনে করেন ধর্ম বা ধর্মতত্ত্ব থেকে সুনির্দিষ্ট ভাবে ‘ধর্মীয় বিষয়’ হিসাবে উদ্ধার করার মতো কিছু নাই। তার পরেও মানুষ কেন ধর্ম করে তা ব্যাখ্যা করার ব্যাপার আছে। ধর্মকে এই মনিষীরা অর্থহীন হাওয়াই কিছু গণ্য করেন নি। ধর্ম চেতনাকে তাঁদের অনেকে  বিপথে পতিত চৈতন্য বলেছেন, কিন্তু মানুষ কেন এই ভুল করে সেটা ব্যাখ্যা করবার দায় এড়িয়ে যান নি তারা। সেই ব্যাখা আমাদের কাজে লাগে অবশ্যই।

তারপরেও সন্দেহবাদীরা জরুরী এ কারণে যে তাঁরা মনে করেন ধর্ম বা ধর্মতত্ত্বের নিজস্ব কোন ‘বিষয়’ আছে স্বীকার না করলেও ধর্ম বা ধর্মতত্ত্বের কোন ব্যাখ্যা না দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। তারা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছেন। তবে ব্যাখ্যা দেবার জন্য তাঁরা মধ্যস্থতা মেনেছেন অন্য শাস্ত্রের। মার্কস – বিশেষ ভাবে মার্কসবাদীরা -- ধর্মের ব্যাখ্যা করেন অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিচার আশ্রয় করে, ফ্রয়েড করেন মানুষের মনের অবস্থাকে সচেতন/অবচেতন বিভাজনে বিভক্ত করে, নীৎসে করেন মানুষের নিজের ওপর নিজের ইচ্ছার নিয়ন্ত্রণ থাকা না থাকা দিয়ে।

মার্কস, ফ্রয়েড কিম্বা নীৎসে প্রত্যেকেই মনে করেছেন ধর্ম নিয়ে বা ধর্মকথা হিসাবে মানুষ নিজে যা কিছু বলে তাকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া ঠিক না। কারণ ধর্ম বা ধর্মতত্ত্ব হিসাবে মানুষ  যা বলে তার প্রণোদনা বাইরে তৈয়ার হয়। অর্থাৎ মানুষের বাইরে, বা তার চেতনা বা ইচ্ছার বাইরে সক্রিয় অন্য কোন শক্তি বা প্রক্রিয়া তার কারন। কারো কাছে সেটা অর্থনীতি, কারো কাছে অবচেতন মন, কারো কাছে মানুষের নিজের শক্তি নিজে শনাক্ত করতে না পারার অক্ষমতা, ইত্যাদি।

(চলবে)


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।