সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরহাদ মজহার


Wednesday 07 August 13

print

তথ্য মন্ত্রণালয় তথ্য চায়। তাদের কাছে তথ্য নাই যে তা না, তবু তারা তথ্য চায়। আজব ব্যাপার! তথ্য মন্ত্রণালয় তথ্য চেয়েছে ‘অধিকার’ ও ‘টি আই বি’র কাছে। দৈনিক জনকন্ঠে বিভাষ বাড়ৈ রিপোর্ট করেছেন, “শাপলা চত্বরের মৃত্যুর বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে বিপাকে ‘অধিকার’ (১৪ জুলাই ২০১৩)”। ভালো তো, ভালো না?

পড়ুক অধিকার বিপাকে। আসলে কেউই মারা যায় নি। জাতীয় সংসদেও সরকারদলীয় নেতৃস্থানীয় সংসদ সদস্যরা বলেছেন ৫ মে রাতে হেফাজতের সমাবেশে কোন প্রাণহানির ঘটনাই ঘটেনি। আর স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী গত ১৯ জুন জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তৃতায় বলেন, “৫ মে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের ওপর কোনো গুলিবর্ষণ করা হয়নি বরং হেফাজতের কর্মীরা লাল রঙ লাগিয়ে মৃতের অভিনয় করেছে। হেফাজতের কর্মীরা গায়ে লাল রঙ মেখে রাস্তায় শুয়ে ছিল। পরে পুলিশ আসলে তারা ভয়ে দৌড়ে পালায়”। খুবই সুন্দর ব্যাখা। ২৬ জুন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলির সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম জাতীয় সংসদে বলেছেন, “হেফাজতের সমাবেশে কোন গুলি হয়নি। কোনো হত্যাকাণ্ড হয়নি। যদি বিরোধী দল একজন নিহত হয়েছে এমন প্রমাণ দিতে পারে, তাহলে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব”।

এমনকি পুলিশ কর্মকর্তারাও আমাদের নিশ্চিত করেছেন, ৫ মে তারিখে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটে নি। ঢাকার পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ ৮ মে তারিখের এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন, “রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজত কর্মীদের সরিয়ে দিতে যে-অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল সেখানে কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এই অভিযানে কোন মরণঘাতি অস্ত্রেরও ব্যবহার করা হয় নি”।

ভালো তো, ভালো না! তারপরেও তথ্যের কী দরকার!

অধিকার সম্প্রতি ‘হেফাজতে ইসলাম-এর সমাবেশ ও মানবাধিকার লংঘন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। টি আই বি প্রকাশ করেছে ‘গ্লোবাল করাপশান ব্যারোমিটার ২০১৩’। বোঝা যাচ্ছে দুটো প্রতিবেদনই সরকারকে বেশ ক্ষিপ্ত করেছে। দুটো প্রতিবেদনের চরিত্র এক নয়। আমরা বিষয়ের পার্থক্যের কথা বলছি না, তাদের তথ্যানুসন্ধান ভিত্তিক প্রতিবেদনের পদ্ধতির দিক থেকে বলছি। ‘অধিকার’-এর প্রতিবেদন হেফাজতে ইসলামের সমাবেশের ওপর সরকার যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে সেইক্ষেত্রে বাস্তবে কি ঘটেছে নানান সাক্ষীসাবুদের ভিত্তিতে তৈরী করা প্রতিবেদন। তবে চলমান।

অধিকার বলছে, ৫ মে দিবাগত রাত্রে নিরস্ত্র ও ঘুমিয়ে থাকা মানুষের ওপর সরকারের সশস্ত্র ও সহিংস হামলায় যারা শহিদ হয়েছেন  অধিকার তার একটা তালিকা তৈরি করেছে। রিপোর্ট প্রকাশ করবার দিন অবধি তারা ৬১ জন বাংলাদেশের নাগরিকের শহিদ হবার একটি প্রাথমিক কিন্তু অসম্পূর্ণ তালিকা পেশ করেছে। আবারও বলছি, অধিকার বক্তব্য হচ্ছে, এই অনুসন্ধান চলমান, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে, এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু তারা যা পেয়েছে তার ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করবার উদ্দেশ্য সরকারকে বোঝানো, কাজটা সরকারের নিজেরই করা উচিত। হেফজতে ইসলামের ওপর যে অকথ্য দমন নিপীড়ন চলছে তার ফলে অবিলম্বে কোন তালিকা হাজির করা তাদের পক্ষে সহজ নয়। তাছাড়া গ্যারান্টি কি যে সরকার নাম ঠিকানা পরিচয় সহ তালিকা পাবার পর পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করবে না? পদ্ধতির দিক থেকে দেখলে ‘অধিকার’-এর প্রতিবেদন হচ্ছে আসলে কি ঘটেছে তার ওপর সরেজমিন তদন্ত করে তৈয়ার করা রিপোর্ট। টি আই বি দুর্নীতির যে ব্যারোমিটার প্রকাশ করেছে, সেটা আসলে ব্যারোমিটারই বটে। সরকার আসলে দুর্নীতি করছে কিনা তার ওপর সরেজমিন তদন্ত করে তৈরী করা রিপোর্ট এটা নয়। তবে দুর্নীতিকে সাধারণ মানুষ কিভাবে উপলব্ধির করে সেই উপলব্ধির মাত্রা জরিপ করে তৈরি করা রিপোর্ট। টি আই বি দুর্নীতির বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সরেজমিন গবেষণা করে তৈরী করা রিপোর্ট নয়। দুর্নীতি সম্পর্কে মানুষের অনুভূতি বা উপলব্ধির মাত্রা নির্ণয় করবার জরিপ। সরকারকে জনগণ কিভাবে দেখে ও কিভাবে বিচার করে তার একটা ইঙ্গিত টি আই বি রিপোর্টে মেলে।

কিন্তু ‘অধিকার’-এর রিপোর্ট সেই জাতীয় নয়। জনগণের উপলব্ধির মাত্রা নিয়ে কথা হচ্ছে নয়া। সরকার কয়েক লক্ষ লোক মেরে ফেললেও জনগণ মনে করতেই পারে যে কাজটি খারাপ হয় নি। তারা বলবে, ভালো না? ভালোই তো! মৌলবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল, পশ্চাতপদ ও আরো নানান গুণাবলী সম্বলিত হেফাজতিদের এভাবেই আরশোলার মত মেরে ফেলাই উচিত। নইলে সভ্যতা বলে কিছু টিকবে না, থাকবে না। কিন্তু ‘অধিকার’ মানবাধিকার সংগঠন হবার কারনে পড়েছে বিপদে। যদি আমরা নিজেদের ‘সভ্য’ বলি গণ্য করি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ইত্যাদি বস্তা বস্তা গালগল্পে বিশ্বাস করি তাহলে হেফাজতে ইসলামের সদস্য ও সমর্থকদের এদেশের ‘নাগরিক’ বলে স্বীকার করতে হবে। উপায় নাই। আরশোলা গণ্য করে মেরে ফেলা যাবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্ট আইন ও বিচার ব্যবস্থার নিয়মানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। কিন্তু শেষ রাত্রে ইলেক্ট্রিসিটি বন্ধ করে পরিকল্পিত ভাবে ব্ল্যাক আউটের অন্ধকার শামিয়ানার অধীনে টিভি ও সংবাদপত্রের কর্মীদের সরিয়ে দিয়ে নিজ দেশের নাগরিকদের একটি নির্বাচিত সরকার যেভাবে হত্যার উন্মাদনায় মেতে উঠেছিল সেটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য ঘটনা। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের এই ইতিহাসের জন্য যারা দায়ী তাদের কে তো একদিন না একদিন কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।

অতএব আসলে কী ঘটেছে সততার সঙ্গে সেই ঘটনাবলী নথিভূক্ত করে রাখা দরকার। এটা ‘অধিকার’-এর কাজ নয়, সকল নাগরিকেরই দায়। এমনকি শুধু হেফাজতে ইসলামের একার কর্তব্যের মধ্যেও এই দায় পড়ে না। গণতন্ত্র যদি রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসাবে নিজেকে দাবি করতে চায় তাহলে নাগরিকদের মানবাধিকার অলংঘনীয়। এখানে কোন আপোষ চলবে না। হেফাজতের তেরো দফা দাবি তোলার ও প্রচারের যেমন অধিকার আছে, তা বাতিল করার অধিকারও যে কোন নাগরিকের আছে। কিন্তু হেফাজতের ইমান-আকিদা এবং বিশ্বাসের ঘোর বিরোধী হলেও তাদের হত্যা করবার অধিকার রাষ্ট্র বা সরকারের থাকতে পারে না। ধর্ম কিম্বা আলেম-ওলামাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গী যাই হোক – সকলেই নাগরিক – প্রতিটি নাগরিকের নাগরিক অধিকার রাষ্ট্রকে রক্ষা করতেই হবে। রাষ্ট্র যখন এই দায় পালন করতে অক্ষম হয় তখন তাকে আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে না। রাষ্ট্রের বিকৃতি যদি এমন মাত্রায়  গিয়ে পৌঁছে যে খুনি সরকারের সিদ্ধান্ত তামিল করাই তার একমাত্র কাজ তখন সেটা নাগরিকদের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদের কারণ হয়ে ওঠে। 

কিন্তু অধিকার ‘বিপাকে’ কেন? দৈনিক জনকন্ঠের বিভাস বাড়ৈ বলছেন, “৫ মে হেফাজত-জামায়াতের ভয়াবহতার পর রাতের অবস্থান সরাতে চালানো অভিযান নিয়ে দেশে-বিদেশে দফায় দফায় হত্যার কাল্পনিক তথ্য ছড়িয়ে এবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে মানবাধিকার সংগঠনের নামে সক্রিয় গ্রুপ ‘অধিকার’। দিনের পর দিন সংগঠনটি রীতিমতো হেফাজত-জামায়াতের ভাষায় ৬২ জনকে হত্যা ও কয়েক শ’ নিখোঁজের জন্য সরকারকে দায়ী করে রিপোর্ট প্রকাশ করে চললেও এখন সেই তথ্য স্পষ্ট করতে পারছে না। মানবাধিকারের ধোয়া তুলে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর মাধ্যমে দেশে-বিদেশে বিএনপি, জামায়াত, হেফাজতসহ উগ্রবাদীদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের সুযোগ করে দিয়ে অধিকার এখন তাদের আবিষ্কৃত ‘নিহতদের নাম, পিতার নাম, গ্রামের বাড়িসহ ঠিকানার তথ্য দিতে ব্যর্থ। তথ্য মন্ত্রণালয় নিহতদের পরিচয় চাইলেও চলছে লুকোচুরি। এদিকে কেবল অধিকার নয়, মাদ্রাসার গরিব ছাত্রদের পুঁজি করে ফায়দা লুটতে তিন হাজার নিহত ও কয়েক হাজার নিখোঁজের দাবি করে চুপসে গেছে বিএনপি জামায়াতের স্নেহধন্য হেফাজত। দুই মাসেও হেফাজত তিন হাজার তো দূরের কথা নিহতের কোন তালিকাই প্রকাশ করতে পারেনি”। -- বোঝা যাচ্ছে সরকার ও তার সমর্থক ও ‘রং-মেখে-শুয়ে থাকা’ তত্ত্বের জায়গা থেকে কথাগুলো বলা হচ্ছে। ‘অধিকার’-এর বিষোদ্গারের এটাই কারন। খুনি ও মানবাধিকার লংঘনকারী সরকার ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের প্রতি নির্বিচার পক্ষপাতে দুষ্ট এ লেখা। উপেক্ষাই করা উচিত। তবে কিছু আমোদের খোরাক হলেও ক্ষতি কি? মজা দেখুন।

১. ‘অধিকার ‘রীতিমতো হেফাজত-জামাতের ভাষায়’ কথা বলে। তার মানে হেফাজত-জামাত নাগরিক ও মানবিক অধিকারের ভাষায় কথা বলে, কারণ এটাই ‘অধিকার’-এর ভাষা, আদর্শ ও রাজনীতি। ভালো তো, ভালো না?

২. দুই মাসেও হেফাজত নিহতদের তালিকা প্রকাশ করতে পারে নি। বিলকুল ঠিক। কিন্তু আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি একাত্তর সালে। ইতোমধ্যে ৪২ বছর চলে গিয়েছে। তিরিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে এ দেশের যে স্বাধীনতা, সেই স্বাধীনতার শহিদদের তালিকা ৪২ বছরে করা সম্ভব হয় নি, আর হেফাজত দুই মাসে তাদের নিহত আহতদের তালিকা প্রকাশ করে ফেলবে? এতে তো আমরাই বিপদে পড়ে যাবো। তাতে কি আমরা এই অভিযোগ সহ্য করব আমাদের তিরিশ লক্ষ শহিদের সংখ্যার তথ্য ‘আবিষ্কৃত’। অথবা আমরা অযোগ্য। অথবা মুক্তিযুদ্ধ ও তার শহিদদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এই তথ্য লুকিয়ে রেখেছি। অথচ হেফাজতে ইসলামকে এই অতিকথনগুলো সহ্য করতে হচ্ছে।

স্বাধীনতা যুদ্ধ চলার সময় খুনি পাকিস্তানী সরকার ও সেনাবাহিনীও বারবার বলেছিল গণহত্যার যে-অভিযোগ তোলা হচ্ছিলো সেইসব মিথ্যা। শেখ হাসিনার সরকারের মতো দাবি করেছিল যারা নিহত হয়েছে তাদের নাম ঠিকানা তালিকা সরকারের কাছে জমা দেবার। উদ্দেশ্য সেই তালিকা মোতাবেক শহিদের পরিবারকে ধরা এবং তাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালানো। শেখ হাসিনার সরকারও এই জন্যই তালিকা চায়। হেফাজতের বিরুদ্ধে দমন নিপীড়ন চালাবার জন্য। হেফাজতের নেতারা মনে হচ্ছে যথেষ্ট বুদ্ধিমান। তারা টের পেয়েছে পাকিস্তানী সরকারের ভুত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হয়ে এখন বাংলাদেশ শাসন করছে। সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার ও রাষ্ট্র কায়েম হোক তখন তারা সেই গণতান্ত্রিক সরকারের কাছেই বরং তালিকা দেবে।

৩. অধিকার তাদের ‘আবিষ্কৃত নিহতদের নাম, পিতার নাম, গ্রামের বাড়িসহ ঠিকানার তথ্য দিতে ব্যর্থন’ ! ভালোই তো, ভালো না? কেন ‘অধিকার’ হেফাজতের ওপর আরও দমন-পীড়ন চালাবার জন্য সরকারের হাতে তালিকা ধরিয়ে দেবে? সরকারের কি গোয়েন্দা বিভাগ নাই? প্রশাসনিক লোকবলের কি অভাব পড়েছে নাকি সরকারের? ফলে ‘অধিকার’-এর তালিকা না দেওয়াই মানবাধিকার সংগঠন হিসাবে একমাত্র যুক্তিসঙ্গত দায়িত্বশীল কাজ। নাগরিকদের ওপর সরকার ও রাষ্ট্র দমন-পীড়ন জেল জুলুম হত্যা রক্তপাত চালাক সেটা কি আমরা চাই? সেটা দৈনিক জনকণ্ঠ কিম্বা বিভাষ বাড়ৈ-এর নীতি হতে পারে। সে নীতি হতে পারে সেইসব টিভিওয়ালা ও সংবাদপত্রের যারা হেফাজত তালিকা তৈরি করতে পারছেনা ও প্রকাশ করছে না বয়লে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে তুলেছে। ইত্যাদি কোলাহলে দীর্ঘদিন আমাদের কান ঝালাপালা করে রেখেছে। কিন্তু এটা তো মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর নীতি হতে পারে না।

কিন্তু ‘অধিকার’-এর যুক্তি আর হেফাজতের যুক্তি এক হবে না। এটা আন্দাজ করতে পারি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠির জবাবে ‘অধিকার’ কি বলেছে সেটা এখন জানা যাচ্ছে। এই সত্য কেউই অস্বীকার করছে না যে বিপুল সংখ্যক আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্য ৫ মে রাতে বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে ঘুমন্ত মানুষের ওপর গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করেছে, অনাকাংখিত ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে হেফাজতিদের তাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু কেউই মারা যায় নি, হতাহত হয় নি! শুধু রং মেখে দুষ্ট হেফাজতিরা শুয়ে ছিল! সে রাতে মানুষকে কিভাবে হত্যা করেছে তার ভিডিও ও ছবি তো আমরা ফেইসবুকে দেখলেও সেইসব তাহলে বানোয়াট। ফটোশপের কারসাজি।

দেখা যাচ্ছে সরকার আর ‘অধিকার’ একই কথা বলছে না। দেশে ও বিদেশের আরও অনেক মানবাধিকার সংগঠনের মতো ‘অধিকার’-এর চোখে সরকার তার নিজের দেশের নাগরিকদের হত্যার দায়ে অভিযুক্ত। কিন্তু অভিযুক্ত সরকার এই ঘটনার কোন নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ তদন্ত দূরে থাকুক উলটা তার অপরাধ ও দায় অস্বীকার করছে। অথচ সরকার অভিযুক্ত শুধু নিজ দেশের জনগণের কাছে নয়, নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও বিধিবিধানের মানদণ্ডেও ক্ষমতাসীনরা অপরাধী বলে অভিযুক্ত। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সরকারকে এই দায়েই দায়ী করছে। তারপরেও সে রাতে কিছুই ঘটেনি বা কোন প্রাণ হানি হয়নি দাবি করে সরকার প্রমাণ করছে এই ঘটনা সর্ম্পকে অনুসন্ধান ও নিহতের প্রকৃত সংখ্যা জনগণকে জানানোর বিষয়ে সরকার একদমই আন্তরিক নয়। এই যখন পরিস্থিতি তখন সরকারকে তালিকা সরবরাহ রীতিমতো বিপজ্জনক।

তাছাড়া হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা ও পরবর্তী দমনপীড়নের কারনে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা ভীত-সন্ত্রস্ত্। মানবাধিকার সংগঠন হিসাবে এদের প্রতি ‘অধিকার’-এর দায় আছে। গত ৫ মে’র ঘটনায় অন্তত এক লক্ষ তেত্রিশ হাজার পাঁচশ জন (১,৩৩,৫০০) অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামী করে ২৩ টি মামলা দায়ের করেছে সরকার। সরকার দমনপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি খুবই বিপজ্জনক ও ভয়াবহ। এই দকটা আমাদের বুঝতে হপবে। বিশেষত বুঝতে হবে ভিকটিম ও সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার কোন আইন বাংলাদেশে নাই। অথচ মানবাধিকার সংগঠন হিসেবে ভিকটিমদের নিরাপত্তাবিধান ‘অধিকার’-এর কর্তব্য। কিভাবে তাহলে ‘অধিক্র’ তাদের তাল;ইকা সরকারের হাতে তুলে দেবে?

এই পরিস্থিতিতে ‘অধিকার’ কি করতে পারে। অধিকার সরকারকে অবশ্যই সহযোগিতা করতে চায়। সমস্যা সমাধানের জন্য তারা সরকারকে তিনটি শর্ত দিয়েছে ভিকটিমদের পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে।

১. নিহতদের তালিকা অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে যেসব মানবাধিকার সংগঠন কাজ করছে তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে অবিলম্বে সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করা।

২. তথ্যপ্রদানকারী এবং ভিকটিম ও তাদের পরিবার ও সাক্ষীদের সুরক্ষার সুষ্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

৩. এই তথ্য প্রদানকারী, ভিকটিম এবং তাদের পরিবার এবং সাক্ষীদের ক্ষেত্রে কখনই কোন ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটবে না সেই ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেয়া।

দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ব্যাপারটা এক অদ্ভূত জিনিস। সমাজ যেখানে দুই পক্ষে বিভক্ত এবং এক পক্ষ আরেক পক্ষকে শত্রু মনে করে, মানুষের ভালমন্দ হুঁশজ্ঞান আর থাকে না, তখন মানবাধিকার কর্মীদের বিরাট ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। খুবই বিনয়ের সঙ্গে ভেজা ও মিনমিনে গলায় মানবাধিকার কর্মীকে বোঝাতে হয় আরশোলা তুমি মারলে মারতে পার, তবে মুশকিল হচ্ছে আরশোলা তো একটি প্রাণী। যে আরশোলা মারবে বলেই পণ করে বসে আছে তার হিংস্র ও বদ্ধমূল সংকল্প থেকে তাকে সরিয়ে আনা যাবে কিনা সেটা আগাম বলা যাবে না। কিন্তু কাউকে না কাউকে বলে যেতেই হবে যে এটা মানবাধিকারের নীতির মধ্যে পড়ে না। হেফাজতে ইসলামে্র আদর্শ, রাজনীতি, কর্মপদ্ধতি সবই কারো বিবেচনায় মন্দ হতে পারে, কিন্তু তারা দেশের নাগরিক। তাদের কথা বলার, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের, ন্যায় বিচার পাবার অধিকার আছে।

তার পরেও শেখ হাসিনা বলবেন তারা রঙ মেখে শুয়ে ছিল, পুলিশের সাড়া পেয়ে পালিয়েছে। এই রেকর্ড বাজবে। কিছুই করাই নাই। কিন্তু কেউ যদি নিজেকে মানবাধিকার কর্মী বলে দাবি করেন তাহলে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের কথাগুলো বলে যেতে হবে। সে কাজ তখন মানবাধিকার রক্ষার লড়াই নয়, অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হয়ে ওঠে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের লড়াই।

কিন্তু বিভাস বাড়ৈরা বলবেন, গণতন্ত্র, নাগরিক ও মানবিক অধিকার হচ্ছে জামাতী আর হেফাজতীদের ভাষা। আর, ‘অধিকার’ তাদের ভাষাতেই কথা বলছে।

ভালোই তো, ভালো না!

১৯ জুলাই, ২০১৩/ ৪ শ্রাবণ, ১৪২০, শ্যামলী, ঢাকা

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : মানবাধিকার, হেফাজত, হাসিনা

View: 3480 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD