গণমাধ্যম ও মানবাধিকার


আদিলুর রহমান খান শুভ্রকে প্রথমে অপহরণ করা হয়েছিল, তাঁর বাসার সামনে থেকে। আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অপহরণ ও গুমের যে রেকর্ড বর্তমান সরকারের রয়েছে তা বিবেচনা করে এই অপহরণকে দেশে ও বিদেশে মানবাধিকার কর্মীরা সহজ ভাবে নেয় নি। তার পরদিন তাঁকে আদালতে হাজির করা হবে তার কোন নিশ্চয়তা ছিল না। সরকার তাঁকে হাজির করেছে বাধ্য হয়ে। কারন তাঁকে অপহরণের খবর দেশে বিদেশে বেশ দ্রুততার সঙ্গেই জানাজানি হয়ে গিয়েছিল। উৎকন্ঠা ও উদ্বিগ্নতা ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। কেন তাঁকে কোন আগাম অভিযোগ ছাড়া গ্রেফতার করা হোল তার কোন ব্যাখ্যা সরকার দিতে পারে নি। গ্রেফতারের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যমে জানিয়েছেন আদিলুরের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। প্রশ্ন উঠল, যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে তাঁকে কেন ফৌজদারি কার্য প্রণালীর ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করা হোল? সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে হোলনা কেন? এর কোন উত্তর সরকার পক্ষ থেকে দেওয়া হয় নি। ফৌজদারি কার্যপ্রণালীর ৫৪ ও ১৬৭ ধারা নিয়ে তর্ক অনেক দিনের। পুলিশ এর অপব্যবহার করে। পুলিশের অপব্যবহার রোধ করার বিরুদ্ধে আগে আদালতে মামলাও হয়েছে। আদালত ৭ এপ্রিল ২০০৩ পরিষ্কার রায়ও দিয়েছে। ফৌজদারি পুলিশী ক্ষমতা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ৩১, ৩২, ৩৩ এবং ৩৫-এর সঙ্গে পুরাপুরি সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ছয় মাসের মধ্যে এই বিধানগুলো এবং একই সঙ্গে পুলিশ এক্ট, পেনাল কোড এবং এভিডেন্স এক্ট ইত্যাদির সংস্কার বা পরিবর্তনেরও নির্দেশ দিয়েছিলো হাইকোর্ট। ছয় মাস অনেক আগেই গত হয়েছে। ইতোমধ্যে জোট সরকার গত হয়েছে এবং এক এগারোর সেনা সমর্থিত সরকারের পর ডিজিটাল সরকার ক্ষমতায় এসেছে। একজন মানবাধিকার কর্মীকে এই সরকারের আমলে অনায়াসে পুলিশ অপহরণ করল আগে, তারপর বলল ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরপর দেশবিদেশের চাপে বলা হোল পুলিশ সন্দেহ করছে তিনি তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার বিধান লঙ্ঘন করেছেন। এটা সন্দেহ। তার মানে তার বিরুদ্ধে কোন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এখনও – এই লেখা যখন লিখছি – তখন তোলা হয় নি। যা কিছু অভিযোগ সরকার বক্তব্য বিবৃতির মাধ্যমেই চাউর করছে। পুলিশ সন্দেহের জোরেই আদিলুরকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়েছে। আদালত দশ দিন কমিয়ে পাঁচ দিন করেছে। কিন্তু উচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে তাকে যা জিজ্ঞাসাবাদ করবার কারাগার ফটকে করতে বলেছে। এর আগে হাইকোর্টে পুলিশী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নালিশ করবার পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছিলো পুলিশের কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করবার থাকলে সেটা কারাগার ফটকে করতে হবে। থানায় নিয়ে গিয়ে অভিযুক্তকে নির্যাতন করে তার কাছ থেকে তথ্য আদায় করা যাবে না। আদিলুর কিছুটা রেহাই পেয়েছেন।

আদিলুর রহমানের বিরুদ্ধে সরকারের অভিযোগ হচ্ছে তিনি ভুল তথ্য দিয়েছেন। ভুলটা কোথায়? সেটা সংখ্যায়। সরকার দাবি করছে ৫ ও ৬ মের শাপলা চত্বরে হেফাজত কর্মীদের তাড়িয়ে দিতে গিয়ে যে গুলিগোলা, টিয়ারগ্যাস, সাউণ্ড গ্রেনেড ব্যবহার হয়েছে তাতে একজনও হতাহত হয় নি। ‘অধিকার’ সেই ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা সেইদিন শহিদ হয়েছে তাদের অনেকের তথ্য ‘অধিকার’ বিভিন্ন জেলায় জেলায় সরেজমিন গিয়ে অনুসন্ধান করে জানিয়েছে ৬১ জনের নামঠিকানা তারা জোগাড় করতে পেরেছে। তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। এটাই চূড়ান্ত নয়। এই তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি কোন কানকথা বা শোনা কথার ভিত্তিতে নির্ণয় করা হয় নি। এর সঠিকতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন এবং দলমত নিরপেক্ষ মানবাধিকার সংস্থা হিসাবে ‘অধিকার’ সবসময় সতর্ক পদ্ধতি অবলম্বন করে । তথ্যের যাচাইবাছাইও করা হয় অতিশয় সতর্কতার সঙ্গে। এই প্রথম ‘অধিকার’ কোন মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করছে তা নয়। প্রতি মাসেই মাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় এবং বছর শেষে বাৎসরিক প্রতিবেদনও ‘অধিকার’ প্রকাশ করে আসছে। এই সংগঠনটির কৃতিত্ব, সাফল্য এবং বিপুল গ্রহণযোগ্যতা সঠিক তথ্য হাজির করবার নৈতিক দৃঢ়তার মধ্যে নিহিত। অতি অল্প সময়ের মধ্যে মানবাধিকার সংস্থা হিসাবে ‘অধিকার’-এর আন্তর্জাতিক খ্যাতি তথ্যের সঠিকতার জন্যই। এতদিন ‘অধিকার’ কোন ভুল তথ্য দিল না, শুধু মে মাসের হত্যাযজ্ঞের মৃতের সংখ্যা নিয়ে ভুল তথ্য দেবে, এটা অবিশ্বাস্যই মনে হয়। কিন্তু তারপরও দেখছি মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামের গোড়ার প্রশ্ন বাদ দিয়ে ৫ ও ৬ তারিখে শহিদের সংখ্যা নিয়ে তর্কটাকেই নানান ভাবে প্রধান করে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশে অতিশয় নিম্ন পর্যায়ের দলবাজিতা এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানসিক ও নৈতিক অবক্ষয়ই এর কারণ, এটা স্পষ্ট। এটাও লক্ষ্য করছি যারা একজন মানবাধিকার কর্মীকে এভাবে হেনস্থা ও পুলিশী নির্যাতনের নিন্দা করছেন তারাও শহিদের সংখ্যা নিয়ে বেশ কাতর । তারা বলছেন, সংখ্যা এতো হবে না। পঞ্চাশ-টঞ্চাশ বা কাছাকাছি কিছু হতে পারে। সরকারের অভিযোগ সঠিক হলেও, তারা বলছেন, আদিলুর রহমান খানকে এভাবে গ্রেফতার করা ঠিক হয় নি। এর জন্য আওয়ামি লীগের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েছেন তারা। বেশ কৌতুককরই মনে হোল। একজন মানবাধিকার কর্মী ও মানবাধিকার সংস্থার প্রধানের বিরুদ্ধে আওয়ামি লিগের কাজটা খারাপই হয়েছে। এই সত্য ও বাস্তবতা তারা অস্বীকার করতে পারছেন না। কিন্তু তাদের আশংকা এর সুযোগ নিতে পারে বিএনপি। তারা আগামি নির্বাচনে আওয়ামি লিগের বিরুদ্ধে এই অন্যায় গ্রেফতারের ইস্যু কাজে লাগাতে পারে। যারা এভাবে দেখছেন বোঝা যায় তারা আওয়ামি পন্থি এবং ঘোর বিএনপি বিরোধী। তদুপরি যে কোন ভাবে ইসলামপন্থিদের বিরোধিতা করা তারা তাদের ধর্ম জ্ঞান করেন। তবে সেটা একটা ভদ্রলোকী বা সুশীল মতাদর্শের মোড়কে ঢেকে রাখেন। কিন্তু মোড়ক ফেটে ভেতরটা বেরিয়ে আসে। তারপরেও বলব, এটা মন্দের ভালো। বিশেষত যদি মনে রাখি যে প্রধান মন্ত্রীর লাল রঙ মেখে শুয়ে থাকা ও পুলিশের গুতা খেয়ে পালিয়ে যাবার কাহিনীটা বিশ্বাস করে এমন লোকের সংখ্যা বাংলাদেশে কম নয়। চেতনা ও বিবেক নিম্ন শ্রেণির দলবাজিতা ও ক্ষমতার কাছে বন্ধক দেওয়া বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়।


কামাল আহমেদ বছরওয়ারি অধিকারের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছেন। তার লেখায় স্পষ্ট যে মানবাধিকার সংগঠন হিসাবে অধিকার কোন দলীয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শের দ্বারা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে কাজ করে না। প্রতিটি সরকারের অধীনেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে এবং অধিকার তা যথাসাধ্য সঠিক ভাবে পেশ করবার চেষ্টা করেছে। এমনকি আদিলুর যখন জোট সরকারের আমলে ডেপুটি এটর্নি জেনারেল ছিলেন তখন জোট সরকারের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ও তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করেছে ‘অধিকার’। কামাল আহমেদের লেখার গুরুত্ব হচ্ছে তিনি একজন সাংবাদিক হিসাবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। লিখেছেন, “জাতিসংঘের বর্ণনায় একজন মানবাধিকাররক্ষীকে (হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার) আদালতের বিচারের আগেই দোষী সাব্যস্ত করায় একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি লজ্জিত এবং আন্তরিকভাবে দুঃখিত”। তিনি যে গণ মাধ্যমগুলো সম্পর্কে ইঙ্গিত করছেন, তাদের নাম নেওয়ার কোন দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশের সচেতন পাঠকদের কাছে তারা পরিচিত।


এই পরিপ্রেক্ষিতে লন্ডনে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি কামাল আহমেদের লেখা, ‘বিচারের আগে দোষী একজন আদিলুর’ (১৬ অগাস্ট ২০১৩) পড়ে কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছি। কামাল আহমেদ বছরওয়ারি অধিকারের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছেন। তার লেখায় স্পষ্ট যে মানবাধিকার সংগঠন হিসাবে অধিকার কোন দলীয় বা রাজনৈতিক মতাদর্শের দ্বারা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে কাজ করে না। প্রতিটি সরকারের অধীনেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে এবং অধিকার তা যথাসাধ্য সঠিক ভাবে পেশ করবার চেষ্টা করেছে। এমনকি আদিলুর যখন জোট সরকারের আমলে ডেপুটি এটর্নি জেনারেল ছিলেন তখন জোট সরকারের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ও তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করেছে ‘অধিকার’। কামাল আহমেদের লেখার গুরুত্ব হচ্ছে তিনি একজন সাংবাদিক হিসাবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। লিখেছেন, “জাতিসংঘের বর্ণনায় একজন মানবাধিকাররক্ষীকে (হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার) আদালতের বিচারের আগেই দোষী সাব্যস্ত করায় একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি লজ্জিত এবং আন্তরিকভাবে দুঃখিত”। তিনি যে গণ মাধ্যমগুলো সম্পর্কে ইঙ্গিত করছেন, তাদের নাম নেওয়ার কোন দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশের সচেতন পাঠকদের কাছে তারা পরিচিত।

এটা অস্বীকার করবার জো নাই যে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের ভূমিকা ন্যক্কারজনক। অথচ মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা শক্তিশালী না হলে শুধু মানবাধিকার সংস্থার সাহসী ভূমিকা দিয়ে নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষা অসম্ভব। এই পরিপ্রেক্ষিতে দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনামের লেখা পড়ছিলাম। তাঁর লেখার শিরোনাম হচ্ছে ‘Something that should seriously worry the PM’ (প্রধানমন্ত্রীর কিছু গুরুতর বিষয়ে চিন্তিত হওয়া উচিত’ – দেখুন, ১৬ অগাস্ট ২০১৬) । জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কেন আদিলুর রহমান খানের পক্ষে দাঁড়াল মাহফুজ আনাম যেন তার জন্যই কাতর হয়ে পড়েছেন। এর ফলে সরকার ও রাষ্ট্রের বদনাম হয়েছে। জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এক কাতারে দাঁড়িয়ে আজ শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। এ এক বিব্রতকর পরিস্থিতি। বলেছেন, এটা বাংলাদেশের প্রাপ্য নয় (Bangladesh does not deserve) । কিন্তু জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কিম্বা কানাডা কেউই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় নি, বরং শেখ হাসিনার অত্যাচার, নির্যাতন ও দমন নীতির বিরোধিতা করছে। একজন মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করা মারাত্মক ঘটনা, মাহফুজ যা মেনে নিতে পারছেন না। হিউমেন রাইটস ওয়াচের ব্রাড এডাম বলেছেন, এটা অনেকটা মেরুদণ্ডে হিম প্রবাহ বয়ে যাবার মতো ব্যাপার – এতোই ভীতিকর। বাংলাদেশে মানবাধিকার এবং সাধারণ ভাবে নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রশ্ন কী পরিমান নাজুক হয়ে পড়েছে তার কোন স্বীকৃতি মাহফুজ আনামের লেখায় পেলাম না। তিনি সরকারের মতোই বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে সেই কথাই বলেছেন। তার লেখার সরকারের প্রতি পক্ষপাত স্পষ্ট।

পাঁচ ও ছয় তারিখে হেফাজতের সমাবেশ ও হত্যাযজ্ঞের ক্ষেত্রে ডেইলি স্টারের ভূমিকা ছিল সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে একান্তই সরকারের পক্ষে সাফাই ও ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদ ছাপানো ও প্রচার। মাহফুজ আনাম দাবি করেছেন তারা সতর্ক ভাবে সেদিন কতজন মারা গিয়েছে তা নিরীক্ষণ করেছেন এবং তিনি ‘অধিকার’-এর সংখ্যার সঙ্গে একমত নন। সেটা হতেই পারে। তাহলে কতজন সেইদিন মারা গিয়েছে সেই সংখ্যা উল্লেখ করলে বোঝা যেত তাঁর আপত্তি ঠিক কোথায়। কিন্তু তাঁর লেখায় কোন সংখ্যা তিনি উল্লেখ করেন নি, তাঁর পত্রিকার সতর্ক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী সেই দিন কয়জন মারা গিয়েছিল।

যেটা বিস্ময়কর সেটা হোল মাহফুজ আনাম বলতে চাইছেন আদিলুর রহমানের সমস্যা হচ্ছে অধিকারের রিপোর্ট ও আদিলুর রহমান খানকে সরকারের হ্যাণ্ডলিংয়ের সমস্যা। কীরকম? সেই হ্যান্ডলিং-এর ক্ষেত্রে সরকারের আযোগ্যতা বা চরম অক্ষমতাই প্রকাশিত হয়েছে (The handling of the Odhikar report and the subsequent arrest of its secretary Adilur Rahman, are examples of incompetence at their devastating worst that has today brought the government to disrepute and the country to worldwide embarrassment.) ফলে কিভাবে জাতিসংঘ ও বিদেশীদের না খেপিয়ে আদিলুরকে শায়েস্তা করা যেত তিনি তার একটা ফিরিস্তি দিয়েছেন বা পদ্ধতি বাতলে দিয়েছেন। গণবিরোধী ও মানবাধিকার বিরোধী একটি সরকার কিভাবে একজন মানবাধিকার কর্মীকে শায়েস্তা করবে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর লেখায় সেই পরামর্শ দিয়েছেন। এই হচ্ছে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি প্রভাবশালী ইংরেজি পত্রিকার সম্পাদকের অবস্থান।


যদি আমরা উদারনৈতিক মূল্যবোধেও বিশ্বাস করি তাহলে মানবাধিকারের ন্যূনতম নীতিগত ক্ষেত্রগুলো যে কোন মূল্যে রক্ষা করতে হবে। সেটা ইনক্লুসিভ বা সকলের ক্ষেত্রে সমান ভাবে হতে হবে, এক্সক্লুসিভ নয় – অর্থাৎ ইসলামপন্থিদের মানবাধিকার থাকবে না, কেবল আওয়ামি লীগ ও সেকুলারদের থাকবে, তা হবে না। যদি তা করি তাহলে সমাজকে আমরা আরও গভীর বিভাজনের দিকে ঠেলে দেব। যার ফল হবে মারাত্মক। যদি ইসলামপন্থাকে উদারনৈতিক রাজনীতি দেশের জন্য মঙ্গলজনক মনে না করে তবে তার বিরুদ্ধে মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রাম চালাক। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চলতে পারে না।


মাহফুজ আনামের এই রাজনীতির আমি বিরোধিতা করি। সামাজিক ক্ষেত্রে তাঁকে বন্ধু গণ্য করি বলে এই রাজনীতির বিপদ সম্পর্কে তাঁকে সতর্ক করবার জন্যই কথাগুলো তুলেছি। বাংলাদেশ দলীয় ও রাজনৈতিক-মতাদর্শিক ভাবে একটি বিভক্ত দেশ। এই ক্ষেত্রে যদি আমরা উদারনৈতিক মূল্যবোধেও বিশ্বাস করি তাহলে মানবাধিকারের ন্যূনতম নীতিগত ক্ষেত্রগুলো যে কোন মূল্যে রক্ষা করতে হবে। সেটা ইনক্লুসিভ বা সকলের ক্ষেত্রে সমান ভাবে হতে হবে, এক্সক্লুসিভ নয় – অর্থাৎ ইসলামপন্থিদের মানবাধিকার থাকবে না, কেবল আওয়ামি লীগ ও সেকুলারদের থাকবে, তা হবে না। যদি তা করি তাহলে সমাজকে আমরা আরও গভীর বিভাজনের দিকে ঠেলে দেব। যার ফল হবে মারাত্মক। যদি ইসলামপন্থাকে উদারনৈতিক রাজনীতি দেশের জন্য মঙ্গলজনক মনে না করে তবে তার বিরুদ্ধে মতাদর্শিক ও রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রাম চালাক। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে তাদের ওপর রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন, নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চলতে পারে না। তারপর কয়জন নিহত হয়েছে মৃত মানুষগুলো নিয়ে সংখ্যার রাজনীতি খুবই ন্যক্কারজনক ব্যাপার। যে কোন নাগরিক – তার ধর্ম বা মতাদর্শ যাই হোক – রাষ্ট্র ও সরকার তার নাগরিক ও মানবিক অধিকার লঙ্ঘন করতে পারে না। বাংলাদেশকে যদি এই জায়গায় আমরা নিতে না পারি তাহলে সেটা মস্তো বড় বিপদের কারন হয়ে দেখা দেবে।

‘অধিকার’ সরকারকে তথ্য দেবে না কখনই বলে নি। সুস্পষ্ট ভাবে যাদের কাছ থেকে ‘অধিকার’ তথ্য সংগ্রহ করেছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চেয়েছে। আর যেখানে খোদ সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণহত্যার দায়ে মানবাধিকার কর্মীদের কাছে অভিযুক্ত সেই ক্ষেত্রে স্বাধীন একটি তদন্ত কমিশন গঠিত না হলে সরকারকে তথ্য দিতে বলার অর্থ মানবাধিকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। যেখানে অধিকারের সম্পাদক তার নিজেদের মানবাধিকার রক্ষা করতে পারেন নি সেখানে যারা ৫ ও ৬ তারিখে হত্যার সাক্ষী হয়েছে বা তথ্য দিয়েছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে? কামাল আহমেদ গণমাধ্যমের ভূমিকায় যথার্থই লজ্জিত ও দুঃখিত হয়েছেন।

আদিলুর রহমান খানের গ্রেফতার সুশীল বা ভদ্রলোকী রাজনীতির জন্য বেশ বড় ধরণের পরীক্ষাও বটে। একদিকে একজন মানবাধিকার কর্মী ও একটি আন্তর্জাতিক ভাবে খ্যাত সংগঠনের সম্পাদককে গ্রেফতার করায় তারা বিব্রত। সুশীলদের প্রমাণ করতে হচ্ছে তারাও ভদ্রলোক, ফলে তাদের বলতে হচ্ছে আদিলুরকে যেভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে সেটা ঠিক হয় নি। কিন্তু তাদের মানবাধিকার বিরোধী চরিত্র ময়লা আবর্জনার মত বেরিয়ে আসে যখন তারা বিষয়টিকে সংখ্যার তর্কে পরিণত করতে একই নিঃশ্বাসে প্রবল উৎসাহী হয়, কারন হেফাজতিদের বিরুদ্ধে সরকারের ভূমিকার তারা সমর্থক। ৫ ও ৬ তারিখে হেফাজতিরাই ‘তাণ্ডব’ করেছে এটা প্রতিষ্ঠা করবার প্রাণপণ চেষ্টা যেমন চালিয়ে যাচ্ছে, একই ভাবে তারা ক্ষমতাসীনদের মতোই অস্বীকার করতে চায় ৫ ও ৬ তারিখে কোন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় নি। অধিকার ২৫০০ হাজার, ১৫০০ বা অসংখ্য মানুষকে হত্যা হয়েছে দাবি করে নি। তাদের চলমান অনুসন্ধান থেকে শুধু এতোটুকুই বলেছে আমরা ৬১ জনের নামঠিকানা নিজেরা তদন্ত করে পেয়েছি। এই সংখ্যাও ফোঁড়ার মত সরকার ও সুশীল উভয়ের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। অতএব অধিকারের সংখ্যা অস্বীকার করার জন্য তারা উভয়েই সমান ব্যতিব্যস্ত। সুশীলদের পত্র পত্রিকায় আমদের এই গান শুনতে হচ্ছে যে এতো লোক মারা গিয়েছে, এটা ঠিক না, কিন্তু তাই বলে কি আদিলুরকে গ্রেফতার করে সরকার ঠিক করল?

ইংরেজিতে যাকে ‘লিবারেলিজম’ বলা হয় যদি তাকে আমরা সুশীল বা ভদ্রলোকী রাজনীতি গণ্য করি তবুও মানতে বাধা নাই নাগরিক ও মানবিক অধিকারের প্রশ্নে সেই রাজনীতির একটা ইতিবাচক ভূমিকা বাংলাদেশে থাকতেই পারে। আদিলুর রহমানের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে তার কার্যকারিতা প্রমাণের একটা সুযোগ তৈরী হয়েছে।

কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে সুশীলরা এই সহজ পরীক্ষাতেও ফেল করেছে।

 

১৬ আগস্ট, ২০১৩, শ্যামলী

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।