সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরহাদ মজহার


Monday 21 October 13

print

এ সাক্ষাৎকারটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে 'মাসিক রহমত' পত্রিকার আগস্ট ২০১৩, বর্ষ ২১, সংখ্যা ২৪৮। বাংলাদেশে ইসলামপন্থী রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে ইসলাম ও গণতন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্ক। সাক্ষাৎকারে দর্শন ও ইতিহাসের দিক থেকে এই প্রশ্নটি ইসলামি রাজনীতি কিভাবে মোকাবিলা করতে পারে সে সম্পর্কে আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়াও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গণশক্তি বিকাশের বাস্তব ও ব্যবহারিক দিকগুলোও আলোচনায় এসেছে। রাজনীতির তিনটি প্রধান 'স্তর' শনাক্ত করা হয়েছে যাতে জনগণের দিক থেকে এখনকার বাস্তব কাজের ধরণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা নির্ণয় সহজ হয়। সে তিনটি স্তর হচ্ছে (ক)  ইমান-আকিদার লড়াই, (খ)  বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামের দ্বন্দ্ব টিকিয়ে রাখার আত্মঘাতী মতাদর্শ ও রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং (গ) জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই। এই তিন স্তরের নানান মতাদর্শিক বয়ান ও প্রকাশ আছে। কিন্তু বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার দিক থেকে সুনির্দিষ্ট ভাবে তাদের প্রকাশ ঘটছে দুটো পরস্পরমুখী রাজনৈতিক ধারায়। এক পক্ষে আছে সেই সকল শক্তি যারা বিদ্যমান গণবিরোধী ও মানবাধিকার হরণকারী রাষ্ট্র ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চায় আর তাদের বিরুদ্ধে আছে  বাংলাদেশের বিদ্যমান জালিম ও জাহেলি ব্যবস্থার রূপান্তর ঘটিয়ে জনগণের ইচ্ছা, আকাংখা ও সংকল্প ধারণ করে যারা নতুন ভাবে রাষ্ট্র গঠন করতে চায় তাদের লড়াই ও সংরাম।

স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ বা সামাজিক ন্যায়বিচার কায়েমের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের মৌল ভিত্তিগুলো এখানেই নিহিত রয়েছে। উল্লেখ্য যে এই তিনটি নীতির সঙ্গে ইসলামের কোনই সংঘাত নাই। অথচ স্বাধীনতার ঘোষণার বিরুদ্ধে হাজির করা হয়েছিল 'বাঙালি জাতীয়তাবাদ', 'ধর্মনিরপেক্ষতা' ও 'সমাজতন্ত্র' -- যার পরিষ্কার উদ্দেশ্য হচ্ছে (এক)  ইসলাম বিরোধিতা ও ইসলাম বিদ্বেষ, (দুই) বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামের দ্বন্দ্ব তৈরী করা ও টিকিয়ে রাখা এবং (তিন) মজুলমের হক ও অধিকার হরণ করে জালিমদের ক্ষমতা ও শোষণলুন্ঠনের ক্ষেত্র হিসাবে বাংলাদেশকে উদাম করে দেওয়া।  যার মুল্য আমরা গত বেয়াল্লিশ বছর দিয়েছি। আজ সমাজের তিন 'স্তরে' যে দ্বন্দ্ব তা মুক্তিক্সুদ্ধের উদ্দেশ্য, সংকল্প ও চেতনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতারই পরিণতি। এর সংশোধন ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব।

বলাবাহুল্য রাজনীতির এই  তিন স্তরের মধ্যে মিল ও অমিল উভয়ই রয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামকে শক্তিশালী করতে হলে এই তিন স্তরে  সম্ভাব্য রাজনৈতিক ঐক্যের জায়গাগুলোকে স্পষ্ট করা খুবই জরুরী। এর ওপর বাংলাদেশের আগামি দিনের গণতান্ত্রিক রাজনীতির সফলতা নির্ভর করছে।

... ... ... ... ...

[নিজেকে আধুনিক প্রমাণ করতে গোটা বিশ্ব আজ তৎপর। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রযন্ত্র- সবার একই মনোষ্কামনা। কেউ কেউ আরেকটু এগিয়ে নিজের জন্য বেছে নিয়েছেন ‘উত্তরাধুনিকতা’র ব্যানার। সে সময় ফরহাদ মজহার জানালেন বিপরীত বক্তব্য, ‘আধুনিকতা’ আসলে সাম্রাজ্যবাদেরই আরেক নাম। ইসলামের সঙ্গে এর ধারণা সাংঘর্ষিক। এটা এক ধরণের জাহেলি বা অজ্ঞানতা।’ ধর্ম হিসেবে ইসলাম নিয়েও রয়েছে তার বিশিষ্ট বক্তব্য, ‘প্রচলিত অর্থে ধর্ম বলতে আমরা যা বুঝি তার সঙ্গে ইসলামের পার্থক্য রয়েছে।’

দেশীয় রাজনীতিতে সাম্প্রতিক ইসলামী আন্দোলন ও এ ক্ষেত্রে তার অবস্থান বিবেচনায় মুখোমুখী হবার বিষয়টি প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়ায়। সে লক্ষ্যে এক দুপুরে হাজির হই তার শ্যামলীস্থ ‘উবীনিগ’-এ। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলেও চলে আলোচনা। নানা প্রসঙ্গে নানাবাবে কথা শেষে ‘উবিনীগ’ ছাড়ি রাত করে।

বিভিন্ন পরিচয়ে তিনি পরিচিত। বিশিষ্ট দার্শনিক, কবি ও বুদ্ধিজীবী। পাশাপাশি মানবাধিকার কর্মী ও নয়া কৃষি আন্দোলনের প্রবক্তাসহ অন্যান্য বিশেষণ তার সাথে জুড়ে দেয়া যায়।

সে আলোচনার সারাংশ পাঠকের জন্য তুলে ধরেছেন মহিম মাহফুজ ও আবদুল্লাহ সিদ্দীক।]

 ----

রহমত : রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে প্রচলিত গণতন্ত্র সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?

ফরহাদ মজহার : প্রথমত রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসাবে ‘গণতন্ত্র’ একটি পাশ্চাত্য ধারণা। পাশ্চাত্য -- বিশেষত ইউরোপীয় বাস্তবতা। একেই আপনি ‘প্রচলিত গণতন্ত্র’ বলছেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নামে যে ক্যারিকেচার চলছে সেটা নয়। বাংলাদেশের প্রশ্ন আপাতত উহ্য থাকুক।

পাশ্চাত্যের ইতিহাসের মধ্যেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের ধারণার আবির্ভাব। অতএব উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস থেকে একে বিচ্ছিন্ন করা কঠিন। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যে, আপনি গণতন্ত্রের সমালোচক বা বিরোধী একথা বলা প্রায় অসম্ভব। সঙ্গে সঙ্গে আপনি সভ্যতার দুষমনে পরিণত হবেন। কিন্তু পাশ্চাত্য গণতন্ত্রই একমাত্র আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং দেশকালপাত্র ভেদে সকলকে নির্বিচারে এই ব্যবস্থাই মেনে নিতে হবে এই দাবির পক্ষে যেমন ঐতিহাসিক সত্যতা নাই, ঠিক তেমনি দার্শনিক দিক থেকেও পাশ্চাত্যের ইতিহাস ও গণতন্ত্রের ধারণা পর্যালোচনার বাইরের কিছু না, রাষ্ট্রব্যবস্থার এটাই শেষ অবস্থা নয়। এখনও দেখুন, ইউরোপকেই যেহেতু সজ্ঞানে কি অজ্ঞানে সভ্যতার আদর্শ বলে গণ্য করা হয়, অতএব কেউ যদি বলে গণতন্ত্র একটি ‘কুফরি’ মতবাদ তখন তাকে সভ্যতার শত্রু হিসাবে অনায়াসেই শনাক্ত করা সম্ভব। যারা গণতন্ত্রকে ‘কুফরি’ বলে তাদের তখন বর্বর বা ইসলামি সন্ত্রাসী হিসাবে আখ্যা দেওয়া ও তার বিরুদ্ধে সকল মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া গণতন্ত্র রক্ষা করার জন্য বৈধ বলে গণ্য করা হয়।

মুসলমানরা এখন ‘কুফরি’ বা ‘কাফের’ শব্দটি বিধর্মী বোঝাতে ব্যবহার করে, অন্য ধর্মের প্রতি ঘৃণা ও হিংসা প্রকাশের জন্য অধিকাংশ সময় এর ব্যবহার হয় বলে ইসলামের ইতিহাসে শব্দটি যে-দার্শনিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়েছিল সেটা এখন হুমকির মধ্যে পড়ে গিয়েছে কিম্বা প্রায় হারিয়ে গিয়েছে। কুফরি হচ্ছে সত্য লুকানো, কাফের মানে যে সত্য লুকায়। সে একজন মুসলমানও হতে পারে। তো প্রচলিত ‘গণতন্ত্র’ -- আপনি প্রশ্নে ‘প্রচলিত’ কথাটি ব্যবহার করেছেন -- ইসলামের দিক থেকে ‘কুফরি’ মতবাদ। এর অর্থ কী?

ইসলাম কখনও ইতিহাস অস্বীকার করে না, যে কারণে আখেরি নবী ও আগের সকল নবী তো বটেই এমনকি আল্লাহ দুনিয়ার সকল জাতির জন্য যতো পথপ্রদর্শক প্রেরণ করেছেন তারা সকলেই আল্লার তরফে এসেছেন বলে স্বীকার করে। তাদের ইতিহাস জানতে চেষ্টা করে এবং সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। প্রথমত প্রচলিত গণতন্ত্র পাশ্চাত্যের ঠিক কোন বাস্তবতায় উদ্ভব ঘটেছিল সেই ইতিহাসকে লুকায়, সেই বাস্তবতা থেকে গণতন্ত্রের ধারণাকে বিচ্ছিন্ন করে তাকে এক সার্বজনীন ধারণা আকারে আমাদের ওপর দেশকালপাত্র ভেদে সর্ব কালের সত্য ব্যবস্থা হিসাবে চাপিয়ে দিতে চায়, অতএব এটা ‘কুফরি’।

দ্বিতীয়ত, গণতন্ত্রের প্রচলিত ধারণার সারকথা হচ্ছে নির্বাচনই গণতন্ত্র, অথচ এটা যে একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা সেই সত্যও তারা লুকায়। এখন যেমন দেখুন, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নয়, বাংলাদেশের গঠনতন্ত্র নাগরিকদের মৌলিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার নিশ্চিত করে না, রাষ্ট্র যা খুশি তাই আইন প্রণয়ণ করতে পারে, তারা রাতের অন্ধকারে আলেম ওলামাদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলতে পারে মানুষগুলো লাল রং মেখে শুয়ে ছিল, পুলিশ দেখে পালিয়েছে। এই জালিমদের ক্ষমতায় রেখে এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা অক্ষুন্ন রেখে তারা এখন বিরোধী দলসহ নির্বাচন চাইছে। তো কী হোল? রাষ্ট্রব্যবস্থা তার নিজ দেশের নাগরিকদের এভাবে নির্বিচারে মারতে পারে সেটা কি গণতন্ত্র? নির্বাচন করলে বা শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলেই এই রাষ্ট্র জায়েজ হয়ে যাবে? এটাও ‘কুফরি’। তাহলে বুঝতে পারছেন গণতন্ত্র ‘কুফরি’ মতবাদ কথাটার বাস্তব অর্থ কি। এই রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ধ্বংস করে মজলুমের অধিকার প্রতিষ্ঠা না করলে তো পাশ্চাত্য অর্থেও গণতন্ত্র হবে না। এখানেই দেখুন ‘কাফের’ – অর্থাৎ যারা সত্য লুকায়- তাদের কাণ্ড! এই ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতার বাইরের রাজনৈতিক দল উভয়েই অন্তর্ভূক্ত।

যে দিকটি বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে গণতন্ত্র একটি পাশ্চাত্য ধারণা বলেই ইসলাম একে ‘কুফরি’ মতবাদ বলে না। বরং প্রচলিত গণতন্ত্রে সত্য লুকানো হয় বলেই একে ‘কুফরি’ বলে। পাশ্চাত্যের বাস্তবতায় মানুষের যে দুর্দশা মোচন ঘটাবার লক্ষ্যে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার আদর্শ হিসাবে কী কায়েম করবার লক্ষ্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল-- ইসলাম তাকে অবশ্যই জানতে চেষ্টা করবে। ‘ইহুদি-নাসারা’-দের ব্যবস্থা বলে তাকে নাকচ করে দেবে না, এগুলো মানসিক সংকীর্ণতা। লড়াইটা ছিল জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের, অতএব ইসলাম অবশ্যই এ লড়াইয়ে নীতি, কৌশল ও ফলাফল জানতে আগ্রহী। মজলুম কী ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল আর শেষমেষ কী দাঁড়াল? জানতে হবে। ভালমন্দ বিচার করার চেষ্টাই মোমিনের কাজ। পাশ্চাত্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মুসলমানদের মধ্য থেকে গড়ে ওঠেনি, ফলে তার মধ্যে ইসলামের নীতি ও আদর্শের অভাব থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ মুসলমান না হোক তাদের মধ্যেও আল্লার রসুলদের অনুসারী আছে। তারা হযরত মুসা, কিম্বা হযরত ঈসার কাছ থেকে তাদের মতো করেই শিক্ষা নিয়েছেন। মহান আল্লাহ তা’আলা কাকে বঞ্চিত করেছেন আর কাকে দান করেছেন সেটা তো আমরা জানি না। আখেরি নবীর উম্মত হিসাবে সেটা অনেকের কাছে যথেষ্ট নাও মনে হতে পারে, সেটা আমাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতাও বটে। তিনিই ভালো জানেন। কিন্তু ইসলামপন্থিদের কাজ হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব এবং প্রচলিত গণতন্ত্রের ধারণার ইতিহাস যথাসম্ভব সঠিকভাবে জানার চেষ্টা করা। যেন তার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলাম আরও উন্নত অর্থাৎ জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম চালিয়ে যাবার উপযুক্ত ক্ষমতা কাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।

পাশ্চাত্য গণতন্ত্র পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থারই আরেক দিক। এই জাহেলি ও জালেমি ব্যবস্থা থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্নভাবে ইসলাম গণতন্ত্রকে বিচার করে না। করবেও না। এই কারণেও গণতন্ত্র একটি ‘কুফরি’ মতবাদ। সোজা কথা, প্রচলিত গণতন্ত্র মানুষের মুক্তি বা স্বাধীনতার কথা বলে – কিন্তু এর আড়ালে সে মানুষকে ভোগী, স্বার্থপর ও পুঁজির গোলামে পরিণত করে। গণতন্ত্র এই সত্য লুকায়, অতএব ইসলাম আরও উন্নত ব্যবস্থা কায়েমের জন্য এই কুফরির বিরুদ্ধে লড়বে।

কিন্তু অন্ধ ভাবে নয়। ইতিহাসের দিক থেকে বিচার করলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভাল দিক যেমন আছে, তেমনি তার সীমাবদ্ধতাও আছে। ইতিহাস বাদ দিয়ে শুধু ‘ধারনা’ হিসাবে বিচার করলে সেটা হয়ে যায় ‘কুফরি’; কারন উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় গণতন্ত্রের আসল মর্ম লুকিয়ে রাখার চেষ্টা।

প্রশ্ন: গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদ্ভবের মধ্যে যে সত্যটুকু আছে ইসলাম কিভাবে তার হদিস নেবে?

একটু সরলীকরণ হলেও সংক্ষেপে বলি। ইউরোপের পুরানা সামন্ত সমাজ যখন ভেঙ্গে পড়তে শুরু করে তখন জালিম সামন্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিপীড়িত মজলুম জনগণ বিপ্লবী গণ অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে এই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলে। পাশ্চাত্যে সামন্ত শ্রেণির বিরুদ্ধে মজলুমরা ছিল শ্রমিক, কৃষক আর গায়ে গতরে খেটে খাওয়া মানুষ। কিন্তু যারা এই বিপ্লবে নেতৃত্ব দেয় তারা ছিল ধনি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী। কিন্তু তারা যখন মানুষের মুক্তি, সাম্য, আইনের শাসন ইত্যাদির কথা বলল তখন মজলুম শ্রেণি তাতে উদ্দীপিত ও উজ্জীবিত হোল এবং তাদের নেতৃত্বে সামন্ত শ্রেণিকে উৎখাত করতে লড়াইয়ে নামল। এই লড়াইয়ের সারকথা ছিল মানুষ জন্ম থেকেই স্বাধীন, মানুষ কারও গোলামি করে না, তাকে অতএব অন্য কোন মানুষ নিজের দাস হিসাবে পরাধীন করে রাখতে পারে না। মানুষও কোন ব্যাক্তিকে তার প্রভু হিসাবে মেনে নিতে পারে না, তবে সমাজে বাস করতে হলে সকল মুক্ত ও স্বাধীন মানুষের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় অনুযায়ী সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অতএব রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এমন ভাবে গড়ে তুলতে হবে যা প্রতিটি মানুষের স্বাধীন সত্তা বজায় রেখেও জনগণের সামষ্টিক ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে ধারণ করে। স্বাধীন ও মুক্ত মানুষের ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার রক্তক্ষয়ী চেষ্টার মধ্য দিয়ে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। তার কতোটুকু এখন অবিশিষ্ট আছে সেটা ভিন্ন বিতর্ক। ইসলাম অবশ্যই মজলুমের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকে স্বীকৃতি দেয়।

মানুষ জন্মসূত্রে স্বাধীন এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মানুষের দাসত্ব সে স্বীকার করে না, এখানে গণতন্ত্রের সঙ্গে ইসলামের কোন বিরোধ নাই। এই ইতিহাস থেকে ইসলামের শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে যে-ব্যবস্থা মানুষকে অন্যের দাস হিসাবে শৃংখলিত রাখে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ মোমিনের কাজ। ঈমানি কর্তব্য। এই দিক থেকে ইসলামকে বিপ্লবের ধর্ম বলা যায় বা বলা যায় বৈপ্লবিকতার আরেক নাম ইসলাম। আমাদের দেশের ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিত থেকে গণতন্ত্রের ধারণাকে আরেকটু বোঝার চেষ্টা করা যাক।

পাশ্চাত্যে সামন্ত ব্যবস্থায় কৃষক ছিল সামন্ত প্রভূ বা জমিদারদের ভূমি দাস। ইংরেজ বেনিয়া ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৭৯৩ সালে চার্লস কর্নওয়ালিসকে দিয়ে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় এই রকমই একটি ভূমি দাসত্ব প্রথা প্রবর্তন করেছিল, যা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থা (Permanent Settlement) হিসাবে পরিচিত। এক কলমের খোঁচায় জমিদাররা জমির মালিক হয়ে গেলেন। কৃষকেরা এর বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করেছে যার পরিণতি ৪৭ সালের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা। ইংরেজ বেনিয়াদের সঙ্গে হিন্দু জমিদারদের আঁতাত এবং বৃহত্তর কৃষক সমাজের ওপর অকথ্য জুলুম নির্যাতনের ভিত্তি হয়ে ওঠে এই ব্যবস্থা। এই জমিদা্রী ব্যবস্থার ফল হিসাবেই শহর ও সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল হিসাবে কলকাতা গড়ে ওঠে। আধুনিক বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সূতিকাগার হিসাবে হিসাবে যে শহর পরিচিত। আধুনিক কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির পরিচয়কে প্রধান গণ্য করেই ‘বাঙালি’ পরিচয় গড়ে উঠেছে।

ইংরেজ বেনিয়াদের প্রবর্তিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা ভুমিদাসত্ব প্রথার বিরুদ্ধে কৃষক লড়েছে, রক্ত দিয়েছে। এই কৃষকরা প্রধানত ছিল ইসলাম ধর্মালম্বী আর সেইসব গতর খাটা নিম্ন বর্ণের মানুষ যারা বর্ণাশ্রম প্রথায় জর্জরিত । এই লড়াইয়ে ইসলাম অধিকাংশের মধ্যে প্রেরণা ও শক্তির উৎস হিসাবে কাজ করেছে। তাদের রক্তে এসে মিশেছে সাঁওতাল, রাজবংশীসহ আরও অনেক আদিবাসীর রক্ত। তীতুমির, হাজি শরিয়তুল্লাহ’র কথা কি এখন আমরা বলি? কিম্বা আদিবাসীদের? বীরসা মুন্ডার বীরত্বপূর্ণ লড়াই সম্পর্কে কতোটুকুই বা আমরা এখন জানি?

পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য ইংরেজের বিরুদ্ধে দেশব্যপী লড়াই-সংগ্রাম থেকে এই লড়াই বিচ্ছিন্ন ছিল না। ইংরেজের বিরুদ্ধে আলেম-ওলামাদের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের কথা বাংলাদেশে আমরা কতোটুকুই বা জানি? কতোটুকু লেখা হয়েছে তাদের অকাতরে শহিদ হবার ইতিহাস? সিপাহি বিদ্রোহের কথা কি আমরা ভুলে যাই নি? আমরা কি কেউ আর অনুমান করতে পারি যে বুড়িগঙ্গার পাশে কোন গাছের ডাল শূন্য ছিল না যেখানে সিপাহিদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয় নি। আজ পুরানা ঢাকায় যাকে ভিক্টোরিয়া পার্ক বলা হয় সেই জায়গাগুলোই কি ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়াকু সৈনিকদের ফাঁসির দেবার মঞ্চ ছিল না? কারা এই ইতিহাস স্মরণ করে সেখানে যাই, সদরঘাটে বুড়িগঙ্গার পাড় ধরে ফাঁসিতে প্রাণ দেওয়া শহিদদের জন্য কাতর হই? যারা ঔপনিবেশিক শক্তির পরাধীনতা থেকে মানুষের মুক্তির এই লড়াইয়ের ইতিহাস লুকায় তারাই ইসলামের চোখে কাফের – বিধর্মীরা নয়। আর, মনে রাখবেন এই ইতিহাস মুসলমানরাই বেশি লুকায়, অন্য ধর্মাবলম্বীরা তুলনায় অনেক কম।

পরাধীনতা থেকে মানুষের মুক্তির কিম্বা আত্মনিয়ন্ত্রণ লাভের অধিকারের লড়াই হচ্ছে গণতন্ত্রের মর্ম। মানুষ স্বাধীন – তার স্বাধীনতা কেউ হরণ করতে পারে না – এই আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসাবে গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। গণতন্ত্রের এই বৈপ্লবিক ইতিহাসকে ভুলে গিয়ে কিম্বা অস্বীকার করে প্রচলিত গণতন্ত্রের যে ধারণা আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে সেটা কুফরি মতবাদ – ইসলাম তা প্রত্যাখ্যান করে।

কিন্তু ইসলামের সঙ্গে প্রচলিত গণতন্ত্রের অসঙ্গতির আরও গভীর জায়গা আছে। প্রথমত এই ইতিহাসকে চেপে রাখা, ভুলিয়ে দেওয়া ও অস্বীকার করার কারণে ‘স্বাধীনতা’ বলতে প্রচলিত গণতন্ত্র ব্যাক্তির স্বাধীনতা বা ব্যক্তিতান্ত্রিকতাকেই বোঝে। প্রচলিত গণতন্ত্র ধরে নেয় ব্যক্তিই সমস্ত রাষ্ট্রীয় কর্তব্য নির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু। এমন ভাবে ব্যক্তির মহিমা কীর্তন করা হয় যার অনুমান হয়ে ওঠে ব্যক্তি বুঝি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোন জীব। পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার উত্তুঙ্গ ভোগবাদিতা ও ব্যক্তিলিপ্সা গণতন্ত্রের ক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করে। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তির বিকাশ ঘটবার কথা যাতে ব্যক্তি বুঝতে পারে সমষ্টির স্বার্থ রক্ষিত হলেই ব্যাক্তির স্বার্থ রক্ষা হয়। অর্থাৎ সমাজের স্বার্থ আগে, ব্যাক্তির স্বার্থ সমাজের মধ্য দিয়েই বাস্তবায়নের পথ অনুসন্ধান করতে হবে। কিন্তু প্রচলিত গণতন্ত্রে ব্যক্তির বিকাশ ঘটে না বরং এখানে ব্যাক্তির বিকার ও অধঃপতন ঘটলো । ব্যক্তি হয়ে উঠল স্বেচ্ছাচারী, ভোগলিপ্সার দাস, অপরের প্রতি দয়া মমতাশূন্য, চরম স্বার্থপর, মোনাফেক এবং যে কোন ছুতায় নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে সমষ্টির স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে উদগ্রীব। ইসলাম এদেরকেই নফসের দাস হিসাবে ঘৃণা করে। এদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বা নিরাপোষ জেহাদ পরিচালনাকে মানুষকে বাস্তবিক অর্থেই স্বাধীন বা মুক্ত মানুষ হিসাবে বিকাশের লড়াই বলে গণ্য করে।

খেয়াল করুন যে নফসের দাস, সে কিন্তু দাস বা সামন্ত ব্যবস্থায় কোন প্রভুর অধীনস্থ ভূমিদাস নয়। সে তো আসলেই আধুনিক সমাজে ‘স্বাধীন’। যদি মুসললান হয় তো সে কথায় কথায় নিজেকে আল্লার বান্দা বলে পরিচয় দেয়। আমরা ভাবি, ঠিকই তো যে সে অন্যের দাসত্ব করে না। কিন্তু এটা তার বাইরের দিক। এতে তার সুবিধা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে দাসত্ব করে নিজের নফসের, নিজের ভোগলিপ্সার। নফসের এই দাসত্বের ওপর দাঁড়িয়ে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা আরও মজবুত ও আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে। কারণ তথাকথিত স্বাধীন মানুষ স্বেচ্ছায় এই ‘দাসত্ব’ মেনে নেয়। এই ক্ষেত্রে মুসলমানবা অমুসলমানে ভেদ নাই। ‘মুসলমান’ বলে কেউ ভাল আর অমুসলমান বলে অন্যেরা খারাপ তা না। পুঁজিতন্ত্র এই ক্ষেত্রে সকল ভেদাভেদ মূছে দেয়, একাকার করে ফেলে। এই অবস্থায় এই নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ করা তখন মোমিনের জন্য ফরজ হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা হয়ে ওঠে এক কথায় পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম রাখবার একটি বিকৃত মতাদর্শ। পুঁজির বিশ্বব্যাপী স্ফীতি ও পুঞ্জিভবনকে ত্বরান্বিত করবার জন্য দুনিয়াব্যাপী পুঁজি নতুন ধরণের ক্ষমতাব্যবস্থা ও তা কার্যকর করবার জন্য নানান রকমের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। পুঁজির প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রব্যবস্থারও রূপান্তর ঘটে। ব্যক্তিতন্ত্র ও ব্যক্তির ভোগবাদিতা এতে আরও গভীর ও সম্প্রসারিত হয়। গণতন্ত্রের বিপ্লবী আদর্শের মধ্যে মানুষের রূহানি কর্তাসত্তার যে-স্বীকৃতি আমরা দেখি আধুনিক গণতন্ত্রে সেটা পর্যবসিত হয় নফসানিয়াতে – অর্থাৎ ব্যক্তির ভোগ ও ব্যক্তি স্বার্থ পূরণে। মানুষ মুক্ত, স্বাধীন এবং আল্লার দাসত্ব ছাড়া সে অন্য কারো দাসত্ব মেনে নেবার জন্য দুনিয়াতে আসে নি – এই ঘোষণার মধ্যে মানুষকে দ্বীনের পথে নিয়ে যাবার যে সম্ভাবনা আমরা গণতান্ত্রিক বিপ্লবে দেখি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পাকাপাকি গড়ে ওঠার পর তার সম্ভাবনার আর থাকে না, গণতন্ত্রের ক্ষয়ও ত্বরান্বিত হতে দেখি। এই সত্য লুকায় বলেও প্রচলিত গণতন্ত্র একটি কুফরি মতবাদ। ইসলামের সঙ্গে তার সম্পর্ক সাংঘর্ষিক।

রহমত : ইসলামী রাজনীতি বলতে আপনি কী বোঝেন?

ফরহাদ মজহার : শুরুতেই বলে রাখি রাজনৈতিক আদর্শ হিসাবে ইসলাম অন্য যে কোন রাজনৈতিক আদর্শের মতোই একটি আদর্শ। একে আলাদাভাবে ইসলামি রাজনীতি না বললেও ক্ষতিবৃদ্ধি কিছু হয় না। সেই রাজনৈতিক আদর্শের মূল কথা হচ্ছে, মানুষ এক। মানুষের সঙ্গে মানুষের কোন ভেদাভেদ থাকতে পারবে না। দুনিয়ার মানুষকে ‘এক’ হতে হবে। মানুষের সঙ্গে মানুষের কিম্বা ইহলৌকিক জগতের সঙ্গে সম্পর্ক কোন গোত্র, গোষ্ঠি, রক্ত, পরিবার, জাত, পাত, দেশ, ভূখণ্ড, ভাষা বা অন্য কোন ইহলৌকিক ‘চিহ্ন’, মুর্তি, বা ‘ইলাহ’র মাধ্যমে হবে না, হবে নির্লৌকিক নিরাকারের এবাদত এবং তার সালাত কায়েমের মধ্য দিয়ে – অর্থাৎ আল্লাহ বা নির্লৌকিক দিব্যসত্তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক রচনা ও তার মধ্যস্থতায় মানুষসহ সমস্ত সৃষ্টিজগতের সঙ্গে সম্পর্ক বিকাশের মধ্য দিয়ে।

খেয়াল করবেন, ইসলামে অনেক কথা আছে যা অন্য ধর্মেও আছে। আপনাকে ভাবতে হবে ইসলামের বৈশিষ্ট্যসূচক দিক কী। কি কথা ইসলাম বলে যা অন্যেরা বলে না বা অন্য কোথাও আপনি পান না। যদি তা বুঝতে পারেন ও ধরতে পারেন তাহলে ইসলামপন্থী রাজনীতির আদৌ কোন ভবিষ্যৎ আছে কিনা সেটা আপনি বুঝতে পারবেন। তখন সেই রাজনীতির দর্শন, আদর্শ ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। নইলে ইসলামের রাজনীতি বড়জোর মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার রাজনীতিতে পর্যবসিত হবে। জাতি, ধর্ম, শ্রেণি, লিঙ্গ নির্বিশেষে মানুষের রূহকে আপনি নাড়া দিতে পারবেন না।

যেমন ধরুন, ইসলাম বলে, দুনিয়ায় মানুষ এসেছে আল্লার ‘খলিফা’ হয়ে। ফেরেশতারা যে সম্মানে ভূষিত নয়, মানুষ সেই সম্মানের ও রূহানি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত। খলিফার মানে এটা নয় যে মানুষ সৃষ্টি জগতের প্রভু, কিম্বা মালিক বা সৃষ্টি জগতের ওপর মানুষের কর্তৃত্ব কায়েম করবার জন্য মানুষকে দুনিয়ায় পাঠানো হয়েছে। বরং সৃষ্টির হেফাজত করবার জন্য তাকে পাঠান হয়েছে। সৃষ্টিকে ‘জয়’ বা ‘জয়’ করার নামে ধ্বংস করবার জন্য নয়। এটা ইসলামের খুবই বৈশিষ্ট্য সূচক একটি দিক। আল্লার খেলাফতির দায় যে বিশেষ রুহানি শক্তি সম্পন্ন সত্তা নিজের সুরতের গুনে বহন করে তাকে না বুঝলে তো ইসলামি রাজনীতির আসল ক্ষেত্রটাই ধরা যাবে না। অন্যরা ‘মানুষ’ বলতে যা বোঝে, ইসলাম সেভাবে মানুষকে বোঝে না। দর্শনের দিকে থেকে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা আছে, আরও বিস্তর গবেষণার দরকার আছে।

সারকথায় ইসলামি রাজনীতির মূল কথা হচ্ছে মানুষকে ‘এক’ করা ও মানুষের ‘উম্মাহ’ কায়েম করা। রাজনীতি ইহলৌকিক ব্যাপার। অতএব মানুষকে তার ইহলৌকিক কর্তব্য সম্পাদনের জন্য মানুষের মধ্যে রূহানি কর্তাসত্তার বিকাশ ঘটিয়ে দুনিয়ার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করাই (ইসলামি) রাজনীতির কাজ। ইসলাম এই অর্থেই বিপ্লবী। কারণ যখনই মানুষ বিপ্লবের কথা ভেবেছে, তখনই জাতিধর্ম নির্বিশেষে এই রূহানি ঐক্যের ডাকই মানুষ দিয়েছে। মুসল্মান হোক বা না হোক। একজন মানুষ অন্য মানুষ থেকে আলাদা, কিন্তু আত্মার এই দিব্যশক্তির সূত্রে মানুষ মানুষকে আলিঙ্গন করতে ছুটে গিয়েছে, জালিমের বিরুদ্ধে লড়েছে, যে সমাজ বা রাষ্ট্রব্যবস্থা মানুষকে বিভক্ত, বিভাজিত রেখেছে মানুষ সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে।

অতেব এটা বুঝতে হবে ‘উম্মাহ’ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ধারণা। একই সঙ্গে ধর্মীয়, দার্শনিক ও রাজনৈতিক। এটাও মনে রাখতে হবে ‘মুসলিম উম্মাহ’ বলে কোন উম্মাহ নাই। এটা সাম্প্রদায়িক ধারণা। এতে ইসলামকে হীন করা হয়। ইসলাম শুধু মুসলমানদের জন্য আসেনি সকলের জন্য এসেছে। ইসলামকে সকল প্রকার সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে রাখতে হবে।

সংক্ষেপে বললে আমি (ইসলামি) রাজনীতি বলতে একবাক্যে বুঝি মানুষের রূহানি শক্তির বিকাশের জন্য ব্যাক্তি, পারিবারিক ও সমাজ জীবনে নফসানিয়াতের বিরুদ্ধে আপোষহীন ও নিরন্তর জেহাদ।

প্রশ্নঃ একটু ব্যাখা করে বলুন

নবি-রসুলদের জীবন দেখুন, সেখানে সব সবসময়ই দেখবেন লড়াইটা আগে নিজের নফসের বিরুদ্ধে। জীবের প্রবৃত্তি ও আমিত্ব যতো দ্রুত তারা ত্যাগ করতে পেরেছেন ততো দ্রুত তারা তাদের কর্তব্যকর্ম সম্পর্কে সজ্ঞান হয়েছেন। এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই মানুষের মধ্যে যে বিশেষ কর্তাশক্তির আবির্ভাব ঘটে তাকে রূহানি কর্তাশক্তি বলতে পারি। কর্তাশক্তি হচ্ছে সেই শক্তি যা দিয়ে আমি ব্যাক্তি জীবন, সমাজ জীবন বা পারিবারিক জীবনে আমরা ভূমিকা রাখি। যদি আপনি নিজের নফস দ্বারা তাড়িত থাকেন, তাহলে আপনার ভূমিকাও হবে ব্যাক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করে যাওয়া। আপনি অনেক বড় বড় কথা বলবেন বটে, কিন্তু আপনার নফসের খাসলতি যাবে না। যদি আপনি নিজের নফসকে জয় করতে পারেন তাহলে আপনার ভূমিকা হবে সত্যকার অর্থে ‘আল্লার খলিফার’ ভুমিকা । আপনার খেলাফতি আল্লার তরফেই ধার্য হবে, আপনাকে কারো মুখাপেক্ষি হতে হবে না। সেই খেলাফতির প্রধান কাজ হচ্ছে মানুষসহ সৃষ্টি জগতে হেফাজত করা। কারন এর জন্যই আপনাকে দুনিয়ায়া পাঠান হয়েছে। শুধু মানুষ নয় -- গাছপালা, পশুপাখী, কীটপতঙ্গ, মাছ-জলজ প্রাণী নদি, খাল, বিল, সমুদ্র, আকাশ, বাতাস – অর্থাৎ সব কিছুর হেফাজত আপনার কর্তব্য। রাজনীতি হচ্ছে ক্ষমতা চর্চা। আপনার ইচ্ছা ও সংকল্পের মধ্যে অন্যেরাও যেন তাদের ইচ্ছা ও সংকল্পের প্রতিফলন দেখে এবং আপনার ইমামতি ও খেলাফতি স্বেচ্ছায় মেনে নেয়, ইসলামি রাজনীতির গোড়ার সত্য এখানে। ইসলামে নেতা ভোট দিয়ে নির্বাচিত হয় না। যিনি আল্লার ওয়াস্তে নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন, নিজের বলে কিছু নাই, কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তি নাই, জাকাত কত ও কী পরিমাণ দিতে হবে এই চিন্তায় যাঁকে পেরেশানি হতে হয় না, কারণ তিনি যা আয় করেন সবই লিল্লাহে বিতরণ করেন, তিনি যখন সৃষ্টি জগতের কল্যাণে তাঁর কর্তাশক্তির ক্ষমতা প্রদর্শন করে তাঁর রূহানি শক্তির আলো মানুষের মধ্যে ছড়াতে পেরেছেন পঙ্গপালের মতো মানুষ তাঁর দিকে ছূটে যাবেই। পৃথিবীর কোন শক্তি নাই তাঁকে দমন করে। ইসলামি রাজনীতিতে রূহানি কর্তাশক্তির বিকাশ এ জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ধারণা।

এবার তাহলে সংক্ষেপে তালিকার মতো করে ইসলামি রাজনীতি বলতে আমি কি বুঝি তা ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করা যাক।

১. নফসানিয়াতের বিরুদ্ধে নিরন্তর জেহাদ – অর্থাৎ রূহানি কর্তাসত্তার আবির্ভাব ঘটানোর জন্য ব্যাক্তিগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ে মানুষের ভেতরে বাইরের নিরন্তর লড়াই-সংগ্রাম ও তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ দর্শন, ভাবচর্চা, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণ রপ্ত করার রাজনৈতিক শর্ত ও পরিবেশ রক্ষার জন্য লড়াই।

অন্য ভাবেও আরও সহজে বলা যায়। সকল প্রকার ‘আমি’ বা ‘অহং’ বোধ থেকে মুক্ত থাকার লড়াই চালিয়ে যাওয়া। বাস্তবে যার অর্থ দাঁড়ায় সকল প্রকার ব্যক্তিতান্ত্রিক, ব্যাক্তিকেন্দ্রিক কিম্বা স্বেচ্ছাচারী মতাদর্শ পরিহার করা এবং ভোগবাদিতা, ভোগ লিপ্সা বা জীবপ্রকৃতির কাছে মানুষের অসহায় আত্মসমর্পনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের প্রবৃত্তিকে রূহানি শক্তিতে পরিণত করা। একমাত্র মানুষের পক্ষেই সেটা সম্ভব।

২. জীবনের সকল স্তরে ও সকল পর্যায়ে জেহাদি – অর্থাৎ বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গী বহাল রাখা এবং তাকে সক্রিয় রাখবার জন্য সম্ভাব্য নানান ধরণের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা। এর সাধারণ নীতি হচ্ছে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের পক্ষাবলম্বন করা এবং ইসলামের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফের ধারণাকে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা।

৩. পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক মানুষের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। নফসানিয়াত কিম্বা ভোগলিপ্সা বা আত্মকেন্দ্রিকতাকেই মানুষের স্বভাবে পরিণত করে এবং মানুষকে পুঁজির গোলামে পরিণত করে। মানুষ টাকার দাসে পরিণত হয়। অতএব পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই ছাড়া ইসলামি রাজনীতি নামক কোন রাজনীতি হতে পারে না। এর কোন অর্থ হয় না। পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক হচ্ছে জাহেলি সম্পর্ক, অজ্ঞানতার সম্পর্ক। এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার অর্থ হচ্ছে আইয়ামে জাহেলিয়াকে টিকিয়ে রাখা। ইসলামি রাজনীতির অর্থ হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিরাপোষ লড়াই চালিয়ে যাওয়া। পাশ্চাত্য সভ্যতার সঙ্গে ইসলামের বিরোধের জায়গাটাও এখানে।

রহমত : আপনার দৃষ্টিতে মোমিন ও মুসলমান বলতে কাদেরকে নির্দেশ করবেন?

ফরহাদ মজহার : যাদের কাছে ইসলাম শুধু একটি ধর্ম, ইমান-আকিদার বিষয় তাঁরা তো অবশ্যই মুসলমান, ইসলাম ধর্মাবলম্বী, এই অর্থে। আর মোমিন ইসলামকে শুধু ধর্ম আকারে দেখে না। ইমান-আকিদা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সে সেটা আমল করে। কিন্তু সে নিজেকে কোন সম্প্রদায়গত পরিচয়ের মধ্যে সংকীর্ণ করে না। বরং নিজের নফসের বিরুদ্ধে নিরন্তর জিহাদের মাধ্যমে আল্লার সন্তুষ্টি বিধানের জন্য জীবন উৎসর্গ করে। দোজখের ভয় বা বেহেশতের লোভের পরোয়া করে না। বেহেশতে যাবে বলে শাহাদত কামনা করে না, আল্লাহকে ভালবাসেন বলে আল্লার এশকে তাঁর সৃষ্টি রক্ষার কাজ করতে গিয়ে বা তাঁর খেলাফতি পালন করতে গিয়ে যিনি নিজেকে ইহলোকে বিলীন করে দেন তিনিই মোমিন। তাঁর রূহের সঙ্গে আল্লার কোন ফারাক আর থাকে না। যে নামেই ডাকুক, মোমিন যে কোন ধর্মেই থাকতে পারে, এবং একমাত্র আল্লাই মানুষের ভূমিকা বিচারের অধিকারী।

রহমত : ইসলামী আন্দোলন ও মুসলমানদের আন্দোলনের স্বরূপ ও ধরণ কী ও কেমন হতে পারে?

ফরহাদ মজহার : প্রচলিত অর্থে ধর্ম বলতে আমরা যা বুঝি তার সঙ্গে ইসলামের পার্থক্য রয়েছে। ইসলামের আবির্ভাবই ঘটেছে একটি রাজনৈতিক আদর্শকে বাস্তবায়িত করবার জন্য। তার দুষমনেরা এটা খুবই ভাল বোঝে। তাই তারা ইসলামকে দুইভাগে বিভক্ত করবার চেষ্টা করে। এক ভাগকে তারা বলে ‘রাজনৈতিক ইসলাম’। এটা তাদের চোখে খারাপ। কারণ ধর্ম হবে প্রাইভেট ব্যাপার, সেটা নিয়ে আবার রাজনীতি হবে কেন? আরেক ভাগে আছে ধর্মীয় ইসলাম। যারা শুধু ধর্মকর্ম করে আর রাজনীতি এড়িয়ে চলে। তারা সাম্রাজ্যবাদী পাশ্চাত্য শক্তির চোখে ভাল। কারন তারা জর্জ বুশ বা বারাক ওবামার মাথাব্যথার কারণ হয় না। পাশ্চাত্যের চোখে যারা ‘ভাল মুসলমান’, ফোঁসফাঁস করে না, তাদের মসজিদ মাদ্রাসা মক্তব ইস্কুল বানাবার জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার পাউণ্ড খরচ হয়। সরাসরি কিম্বা মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলো পেট্রো ডলার দিয়ে ‘ভাল মুসলমান’ বানাবার একটা চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চালু রেখেছে। এর ফলে ইসলাম সম্পর্কে মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাখ্যা বা বয়ান এখনও ইসলামি রাজনীতির প্রধান বয়ান হয়ে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া – বিশেষত বাংলাদেশে ইসলামের নিজস্ব ইতিহাস আছে। সেই লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস বাদ দিয়ে ইসলামি রাজনীতি বাংলাদেশে দানা বাঁধবে না।

দেখুন ইংরেজের বিরুদ্ধে এই দেশের জনগণ যেভাবে লড়েছে সেই ইতিহাস বাদ দিয়ে এই উপমহাদেশে ইসলামি রাজনীতি গড়ে তুলবেন কিভাবে? বিশেষত দেওবন্দী আলেম ওলামাসহ অন্যান্য ধারার ইসলামপন্থীদের ইনসাফ কায়েমের জন্য লড়াইয়ের ইতিহাস তো আপনাকে জানতে হবে। শাহ ওয়ালী উল্লাহ, শাহ আব্দুল আযীয, সৈয়দ আব্দুস শহিদ, হাজী শরিয়তুল্লাহ, দুদু মিয়া, নেসার আলী (তীতুমীর) – এঁদের লড়াই-সংগ্রাম সম্পর্কে আপনাকে অবশ্যই জানতে হবে। জানতে হবে সিপাহী বিপ্লব ব্যর্থ হবার পর কিভাবে দেওবন্দ গড়ে উঠল, দেওবন্দের উলামায়ে কেরামদের সঙ্গে জানতে হবে, শায়খুল হিন্দ, হুসাইন আহমদ মদনী আরও অনেকের। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে বাদ দেওয়া যাবে না। তিনি কমিউনিস্টদের সঙ্গে কাজ করেছেন বলে তাঁর অবদান অস্বীকার করা যাবে না। তিনিও দেওবন্দী। সেটা করা হলে শক্তিশালী ইসলামী রাজনীতি গড়ে উঠবে না। সেটা মুসলমানদের সংকীর্ণ ও সাম্প্রদায়িক আন্দোলন হয়ে থাকবে। জাতিধর্ম নির্বিশেষে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই হবে না। যুগে যুগে ইসলাম যখনই এই লড়াইয়ের ডাক দিয়েছে তখনই মানুষ জাতিধর্ম নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

ইসলামি আন্দোলন ও মুসলমানদের আন্দোলনের মধ্যে প্রধান পার্থক্য হচ্ছে সম্প্রদায়গত। মুসলমান যখন মুসলমান পরিচয়ে লড়ে তখন সে তার সম্প্রদায় হিসাবে নিজের স্বার্থের জন্য লড়ে। সেটা ন্যায়সঙ্গত হতে পারে। অসুবিধা নাই। মুসলমান যখন মজলুম তখন তার পক্ষে ইসলাম অবশ্যই দাঁড়ায়। কিন্তু ইসলাম শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, যে কোন মজলুমের পক্ষেই ইসলাম দাঁড়ায় বা দাঁড়াবে বলে ইসলাম দায়বদ্ধ। না দাঁড়ালে, ইসলাম নিজেকে মানুষের মুক্তির আদর্শ হিসাবে হাজির করতে পারবে না। দাবিও করতে পারবে না। কিম্বা একজন মুসলমান যদি বলে সে একজন মুসলমানের ওপর অন্যায় হলে লড়বে, কিন্তু হিন্দু, খ্রিস্টান, নাস্তিক বা অন্য কোন ধর্মাবলম্বির ওপর জুলুম হলে সে সেই জুলুমের প্রতিবাদ করবে না, তাহলে ইসলামের মহান শিক্ষা থেকে মুসলমান নিজেকে নিজে বঞ্চিত করবে। একেই ইসলাম বলে জাহেলি বা অজ্ঞানতা। সম্প্রতি বৌদ্ধ জনপদ ও তাদের উপাসনালয় কিম্বা একইভাবে হিন্দু সম্প্রদায় ও তাদের উপাসনালয় জ্বালিয়ে দেওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের মুসলমানদের কপালে কলংক লেপন করেছে।

মুসলমানদের স্বার্থ বা আত্মমর্যাদাবোধ নানাভাবে ক্ষুণ্ণ হতে পারে এবং তার বিরুদ্ধে মুসলমান হিসাবে লড়াই সংগ্রাম হবে। যেমন দেখুন, বাংলাদেশে এখন ‘নাস্তিক’ ব্লগারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। এটা কোথায় গিয়ে পরিণতি লাভ করবে আমরা জানি না। রসুলকে অপমানিত করা এবং তাঁকে অপমানিত করে মুসলমানদের আত্মমর্যাদায় যে আঘাত দেওয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে মুসলমানরা লড়ছেন। এই পরিস্থিতিতে মুসলমানরা তাদের ইমান-আকিদা রক্ষার ক্ষেত্রে নিরাপদ বোধ করছেন না। ইমান-আকিদা রক্ষার দিক থেকে ১৩ দফা দাবি পেশ করা হয়েছে, এবং এই দাবি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে অনেকে শাহাদত বরণ করেছেন। খেয়াল করবেন সমাজে এই রাজনীতির ঘোর বিরোধিতাও আছে। যারা বিরোধিতা করছেন তারা একে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন বলে গণ্য করছেন এবং যে সকল দাবি দাওয়া পেশ করা হয়েছে সেটা আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মনে করছেন না। এই আন্দোলন তীব্র হলে, সমাজ আরও বিভক্তি ও বিভাজনের দিকে চলে যাবে। যারা বিরোধিতা করছে তারা পাশ্চাত্য শক্তির সাহায্য চাইবে। এবং তাদের সহায়তায় এই আন্দোলন নিষ্ঠুর ও নির্মমভাবে দমন করা হবে। এই পরিস্থিতি থেকে যদি আমরা উত্তরণ চাই তাহলে একে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার আন্দোলন হিসাবে সীমাবদ্ধ না রেখে একে ইসলামী আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। সেটা হবে কিনা আমরা জানি না। কিন্তু ভাবতে তো দোষ নাই। সেই রাজনীতির আদর্শগত দিক আগে উল্লেখ করেছি। এখন কিছু কৌশলগত দিকের কথা বলতে পারি, যাতে আপনার প্রশ্নের কংক্রিট উত্তর দেওয়া সম্ভব হয়।

খেয়াল করবেন, এখন যে লড়াই শুরু হয়েছে তার তিনটি স্তর আছে। আগামি দিনে যদি এই আন্দোলন চলে তাহলে তার মধ্য দিয়ে এই স্তরগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

প্রথম স্তরে রয়েছে এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইমান-আকিদা রক্ষার জায়গা থেকে লড়াই। রসুলের ইজ্জত রক্ষা এখানে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জায়গা থেকে জনগণের ধর্মপ্রাণ অংশকে একত্রিত রাখবার চেষ্টা চলতে থাকবে। বাংলাদেশে মুসলমানদের ইমান-আকিদা নিরাপদ নয়, এই উপলব্ধি, বিস্ময়কর মনে হলেও অনেকের মধ্যে বদ্ধমূল হয়েছে। ফলে তারা ক্ষুব্ধ।

যাঁরা ধর্মপ্রাণ তাঁরা এ কারণে শুরুতে প্রাথমিক স্তরেই এই লড়াইয়ের সঙ্গে বিপুল সংখ্যায় সম্পৃক্ত হয়েছেন। ফলে ইসলামি আন্দোলনের প্রথম কাজ হচ্ছে মুসলমান হিসাবে যারা নিজেদের ‘মজলুম’ ভাবছেন, তাদের আত্মমর্যাদার হানি হয়েছে মনে করছেন, তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি মনোযোগী থাকা। আত্মমর্যাদার হানি তো অবশ্যই হয়েছে, তাতে কোনই সন্দেহ নাই। তাদের ইমান-আকিদা রক্ষার সংগ্রামে সমর্থন দেওয়া তাহলে এই স্তরে ইসলামি রাজনীতির একটা কর্তব্য আকারে হাজির হয়েছে। মুসলমানদের ইমান-আকিদা রক্ষার সংগ্রাম সে কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে এই আন্দোলন মুসলমানদের করতে হচ্ছে সেটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই বাস্তবতা।

কিন্তু আমরা নিশ্চয়ই জানি যে শুধু ইসলামের নবীকে অপমান করা হয় নি, যারা এই কুকাজ করেছে ও করে তারা খ্রিস্ট ধর্মের হজরত ঈসা (সা.), হিন্দু ধর্মের কৃষ্ণ সম্পর্কেও অকথা কুকথা বলেছে। তাহলে ইসলামি রাজনীতি সকল ধর্মপ্রাণ মানুষের ইমান-আকিদা, কিম্বা বিশ্বাস ও চর্চার মর্যাদা রক্ষার জন্য ইসলামি আন্দোলনকে সমর্থন করবে। এখানে মুসলমানদের আন্দোলন আর ইসলামি আন্দোলনের মধ্যে পার্থ্ক্য ঘটে যায়। কিন্তু খেয়াল করবেন, ইসলামি আন্দোলন শুধু মুসলমানদের জন্য আন্দোলন করবে না। সকল ধর্মাবলম্বীর জন্যই করবে। এখানে ইসলাম শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, সকলের জন্য।

দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে যাদের কাছে ইসলাম ধর্ম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু একই সঙ্গে তা এদেশের জনগণের সংস্কৃতি। যাকে সুনির্দিষ্ট করা না গেলে স্বাধীন সার্বভৌম রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে বাংলাদেশ তার স্বাতন্ত্র স্পষ্ট করতে পারবে না। তা না হলে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের অস্তিত্বমান থাকার যুক্তি দুর্বল হবে। রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে বাংলাদেশের জনগণের যদি স্বতন্ত্র কোন বৈশিষ্ট্য না থাকে তাহলে রাষ্ট্র হসাবে বাংলাদেশের দাবির বৈধতা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অতএব ইসলাম বাংলাদেশের সংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি গাঠনিক উপাদান ও নির্ণায়ক এটা প্রতিষ্ঠা করা জরুরী। এরা ধর্মীয় জায়গা থেকে নয়, সাংস্কৃতিক জায়গা থেকে ইসলামকে বাংলাদেশের স্বাতন্ত্র নির্ণয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড মনে করেন। এরা হেফাজতের ১৩ দফার সব কয়টিকে মেনে না নিলেও তাদের আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইমান-আকিদার সংগ্রাম, রসুলের ইজ্জত এবং আকিদা বা ধর্মচর্চার নিরাপত্তা বিধানের লড়াই তাঁরা নিঃশর্তভাবে সমর্থন করেন, কিন্তু সঙ্গত কারণেই তাঁরা মনে করেন বাংলাদেশকে একটি ধর্মরাষ্ট্র বা ইসলামি রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে চাইলে তা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি মেনে নেবে না। বাংলাদেশের জনগণের জন্য তা সমূহ বিপদ ডেকে আনবে। সর্বোপরি ইসলামি আন্দোলনের লক্ষ্য আদৌ একটি ‘আধুনিক রাষ্ট্র’ গড়ে তোলা কিনা সেটাও ওলামায়ে-কেরামদের ভেবে দেখতে হবে। ইসলামী আন্দোলনের লক্ষ্য বরং বিশ্বব্যাপী ইসলাম কায়েম এবং ‘আধুনিক’ রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিলয় ও নতুন জীবন বিধান। এই তর্কগুলো ইসলামি আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের জনগণকে খুবই সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। হেফাজতের ধর্মকেন্দ্রিক দাবির সীমাবদ্ধতার কারণে আন্দোলনে এই স্তরের জনগণের অংশগ্রহণে দোদুল্যমানতা রয়েছে। কিন্তু হেফাজতে ইসলাম খুবই সতর্কতার সঙ্গে বারবার তাদের আন্দোলনকে ধর্মীয় আন্দোলন বলেছেন। এই দিক থেকে তাঁদের নেতৃত্বের বিচক্ষণতা প্রশংসনীয়।

এই দোদুল্যমানতার অবশ্য শ্রেণিগত কারণও রয়েছে। তবুও শুধু শ্রেণি দিয়ে তাকে পুরাপুরি বোঝা যাবে না। আমরা দ্বিতীয় স্তরে যাঁদের কথা বলছি তাঁরা এই আন্দোলনকে শুধু ধর্মীয় আন্দোলন হিশাবে দেখতে চান না, একে জাতীয় আন্দোলন হিশাবে গড়ে তোলা জরুরী বলে মনে করেন। হেফাজতে ইসলামের শক্তি হচ্ছে নিজেকে তাঁরা সুস্পষ্ট ভাবে ধর্মীয় আন্দোলন হিশাবে হাজির করেছেন এবং বারবার বলেছেন, তাদের কোন রাজনৈতিক অভিলাষ নাই। জনগণ তা বিশ্বাস করে এবং গণমাধ্যমের অপপ্রচারেও এই বিশ্বাসে ভাটা পড়ে নি। বিপুল জনসমর্থন রয়েছে হেফাজতের পেছনে। এই চরিত্র বজায় রেখেও ইসলামি আন্দোলন স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিশাবে বাংলাদেশের জনগণের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে। বিশেষত বাংলাদেশের জন্য এখন কী ধরণের রাষ্ট্র লড়াকু, অগ্রসর ও প্রগতিশীল হবে সেটা ইসলামের দিক থেকে বিচার করে দেখবার, দেখাবার ও বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরী হয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় আন্দোলনের চরিত্র নিয়ে সেটা সম্ভব নয়। এই স্তরের জনগণ ইসলামি আন্দোলনের কাছ থেকে গঠনমূলক ভূমিকা প্রত্যাশা করে। সেই ক্ষেত্রে যারা ইসলামি আন্দোলন করতে চাইছেন তাদের নেতৃত্বকে দূরদর্শী ও বিচক্ষণ হতে হবে। বাংলাদেশকে শুধুমাত্র মুসলমানদের দেশ বা শুধু মুসলমানদের ধর্মরাষ্ট্র হিশাবে না ভেবে ভাবতে হবে এই দেশ ১৬ কোটি মানুষের দেশ যারা ইসলামের লড়াকু, অগ্রসর ও প্রগতিশীল চিন্তাচেতনায় সমৃদ্ধ। যাদের কাছে পাশ্চাত্য সভ্যতাকে নির্বিচারে গ্রহণ করবার দিন শেষ হয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ কারো গোলামি করে না। তারা এমন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চায় যেখানে দাঁড়িয়ে তারা সাম্রাজ্যবাদের পতন ও বর্তমানের পচা ধচা বিশ্বব্যবস্থার মৃত্যু ও দাফনকাফন ত্বরান্বিত করবার হিম্মত রাখে। বিশ্বের যে কোন বিদ্যমান রাষ্ট্রের চেয়েও বাংলাদেশকে অতএব অগ্রসর হতে হবে। বাংলাদেশকে স্বপ্ন দেখতে জানতে হবে।

মনে রাখা দরকার, ইসলাম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে না, কিন্তু ওপরে যে রাজনৈতিক চেতনার কথা বলছি তাকে বিপ্লবী রাষ্ট্রবিজ্ঞান রণনৈতিক দিক থেকে অপরিহার্য গণ্য করে। বিভিন্ন স্তরের আশা আকাঙ্ক্ষার সাধারণ সারবস্তুর প্রতি মনোযোগী থেকে বিভিন্ন স্তরে সমন্বয় বজায় রেখে শত্রুর বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখার এই প্রক্রিয়া গণশক্তি পরিগঠন প্রক্রিয়ার অংশ। ‘জাতীয়তাবাদী’ শক্তি নয়। এর সফলতার ওপর বাংলাদেশে ইসলামি রাজনীতির ভবিষ্যৎ সফলতা (কিম্বা ব্যর্থতা) নির্ভর করছে। বাংলাদেশের ইসলামি আন্দোলন বিভিন্ন সময় একেই ‘তৌহিদী জনতার শক্তি’ বলে চিহ্নিত করে এসেছে।

সারকথা হচ্ছে, দ্বিতীয় স্তরের জনগণ মনে করে হেফাজতে ইসলাম ধর্মীয় আন্দোলন হলেও জাতীয় তাৎপর্য অর্জন করতে পারে অনায়াসে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইমান-আকিদার সংগ্রাম তাদের ইমান, রসুলের ইজ্জত এবং আকিদা বা ধর্মচর্চার নিরাপত্তা বিধানের লড়াই জারি রেখেও সেটা সম্ভব। সেটা সম্ভব সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিসরে একে শুধু মুসলমানদের লড়াই হিশাবে পর্যবসিত না করে ইসলামের লড়াকু, অগ্রসর ও প্রগতিশীল ভূমিকাকে বিকশিত করবার সার্বজনীন সংগ্রাম হিশাবে হাজির করার মধ্যে। ধর্ম চেতনা এই ভাবেই ‘জাতীয়’ চেতনা হয়ে ওঠে (‘জাতীয়তাবাদী’ চেতনা নয়) এবং গণশক্তির বিকাশকে ত্বরান্বিত করে। সমাজ এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে ধর্ম প্রতিবন্ধক হয় না। এই ধরণের চিন্তার যাঁরা ধারক তাঁরা কোন একটি বিশেষ দলের সঙ্গে যুক্ত বা কোন একটি সুনির্দিষ্ট দলের সমর্থক বলা যাবে না। সব রাজনৈতিক দলেই এই চেতনার পক্ষের মানুষ আছেন। এই চেতনার সঙ্গে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির কোনই বিরোধ নাই। মূলত বাংলাদেশে জাতীয় চেতনা সম্পন্ন প্রগতিশীল শ্রেণি বলে যদি কিছু থাকে তাঁরা এই স্তরেই রয়েছেন। তবে হেফাজতে ইসলামের প্রতি তাঁদের দোদুল্যমানতার সঙ্গত ভিত্তি আছে। তাঁরা বাংলাভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামের লড়াকু, অগ্রসর ও প্রগতিশীল ভূমিকার কোন বিরোধ আছে বলে মনে করেন না বটে, তবে ইসলামপন্থিরাও তা মনে করে কিনা সেটা তারা নিশ্চিত হতে চান। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক দিক থেকে গণশক্তির আবির্ভাবের যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তার স্বরূপ ‘জাতীয়’ চৈতন্য বা ‘জাতীয়তাবাদী’ রূপ নেবে নাকি ইসলামি রূপ নেবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। সাধারণ ভাবে গণশক্তির পরিগঠন ও তার সম্ভাব্য আবির্ভাব নিয়ে আমাদের সমাজে আলোচনা কম বলে এই দিকগুলোর মীমাংসা এখনও হয় নি। রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিশাবে বাংলাদেশে গণশক্তির বিকাশের শর্ত তৈরীর জন্য এই মীমাংসাগুলো জরুরী।

তৃতীয় স্তরে রয়েছে গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষ। সমাজের নিপীড়িত বঞ্চিত মজলুম জনগোষ্ঠি। এই শ্রেণির সমর্থনের বড় কারণ হচ্ছে হেফাজত নিজেও এই শ্রেণি থেকেই আসা। যে ভাই বা বাবা লং মার্চে বা অবরোধে ঢাকা এসেছে তারই বোন, ভাই, কন্যা কিম্বা পুত্র পোশাক তৈয়ারির কারখানায় কিম্বা মধ্যপ্রাচ্যে বা মালয়েশিয়ায় শ্রমিক। কিম্বা গ্রামে কৃষক, কিম্বা ঘরগৃহস্থালির মধ্য দিয়ে কোনমতে টিকে আছে। হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন গড়ে উঠেছে কিছু পুরাপুরি বুঝে ওঠার আগেই, দ্রুত গতিতে। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করবার পক্ষে হেফাজত সমর্থন দিলেও ইমান-আকিদার লড়াইয়ের সঙ্গে শ্রেণির দাবিদাওয়া অন্তর্ভূক্ত করা কেন জরুরী সেটা অল্প সময়ের মধ্যে স্পষ্ট করা যায় নি। তবে এটা অনায়াসেই অনুমান করা যায় আগামি দিনগুলোতে ইমান-আকিদার ক্ষেত্রের বাইরে নিজ শ্রেণীর দাবি দাওয়া বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আগামি দিনে জোরালো ভাবেই তুলবে। সেটা নির্ভর করবে মজলুমের পক্ষে লড়বার নৈতিক শক্তি দৃঢ় করবার ক্ষেত্রেও ইসলামের ভূমিকা আরও স্পষ্ট ভাবে দেখানোর রাজনৈতিক প্রজ্ঞার ওপর।

এই তিনটি দিক ছাড়াও সামগ্রিক ভাবে আরেকটি দিকও হাজির রয়েছে। সেটা হচ্ছে শহরের বিরুদ্ধে গ্রামের মানুষের লড়াই। ঢাকায় গণবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্রীভবন ঘটেছে তাকে উৎখাত করতে না পারলে গ্রামগুলো শহরের শোষণের ক্ষেত্র হয়ে থাকবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের কোন মীমাংসা হবে না। গ্রামের মানুষরা হাজার বছর ধরেই ধর্মকর্ম করে, গ্রামীণ সমাজে মাদ্রাসা-মক্তবের ভূমিকা আছে। শহরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের প্রতি যে বৈষম্য এবং অবহেলা দেখিয়ে আসছে, শোষণ, বঞ্চনা করে আসছে তার সঙ্গে ধর্মের অসম্মান কিম্বা রসুলের ওপর কদর্য ও কুৎসিত ভাষায় লেখালেখিকে তারা শহুরে মানুষের উগ্রতা ও ধর্মহীনতার সংস্কৃতি হিসাবে বুঝেছে। হেফাজতের মধ্য দিয়ে শহরের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে তারা, নিজেরা সংগঠিত হতে পারছে।

এটা তো স্পষ্ট যে শ্রেণী ও শক্তির বিন্যাসে একটি নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছে। তবে ওপরে যে তিনট স্তরের কথা বলেছি সেখানে সম্পর্ক নির্মান ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রেগুলো এখনও স্থিত হয়নি। ফলে শ্রেণি হিসাবে মজলুম শ্রেণি তাদের শক্তিকে এখনও অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে পারে নি। কিন্তু তার সমূহ সম্ভাবনার হদিস তারা দিয়ে গেছে। বিপদের চিহ্ন বুঝতে ক্ষমতাসীন শ্রেণি ভুল করেছে বলে মনে হয় না। যে কারনে হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাবের পরে তাড়াহুড়ো করে একটি নির্বাচন করবার চাপ বাড়ছে। সমাজের ক্ষমতাশালী শ্রেণি শুধু চাপ দিচ্ছে না, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোও চাপ দিয়ে যাচ্ছে। তাদের ধারণা বাংলাদেশে এখনকার যে সঙ্কট, সেটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার করা না করার সঙ্কট। যদি বাংলাদেশ নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তা সমাজের নীচের তলার মানুষগুলোকে আরও সাহসী করে তুলবে।

দেশের বর্তমান সঙ্কট এখন আর শুধু তত্ত্বাবধায়কে থেমে নেই। এই সঙ্কটে অনেক বিষয় জড়িত হয়ে পড়েছে। এ সঙ্কটগুলো কে কিভাবে উত্তরণের পথ দেখাবে সেটা নির্ভর করছে সংকটকে কে কিভাবে দেখছে ও বিচার করছে তার ওপর। কোন ধারায় তার বিচার হতে পারে তার কিছু ইঙ্গিত আগের কথায় দিয়েছি। ইসলাম ও ইসলাম বিরোধী মতাদর্শ ও শক্তির দ্বন্দ্বকে এখন আর পাশ কাটিয়ে যাওয়া যাবে না। পাশ কাটিয়ে যাওয়া যাবে না জালিমের বিরুদ্ধে গরিব-নিপীড়িত মজলুমের সংগ্রামের প্রশ্নকেও। বাংলাদেশে ইসলামি আন্দোলন এই তিনটি স্তরের সমন্বয় রক্ষা করে বিদ্যমান জালিম রাষ্ট্রব্যবস্থা উৎখাত করতে পারবে কিনা সেটা আমরা ভবিষ্যতেই দেখব।

এ কারণেই আমি বার বার বলি মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার রাজনীতি আর ইসলামি রাজনীতি এক কথা নয়।

রহমত : প্রচলিত অর্থে আধুনিকতা প্রকৃতপক্ষে কতটা কল্যাণকর ও প্রগতিশীল?

ফরহাদ মজহার : ‘আধুনিকতা’ আসলে সাম্রাজ্যবাদেরই আরেক নাম। ইসলামের সঙ্গে এর ধারণা সাংঘর্ষিক। এটা এক ধরণের জাহেলি বা অজ্ঞানতা। সাধারণত ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজের মহিমা কীর্তনের জন্যই আধুনিক/অনাধুনিক বিতর্ক টেনে আনা হয়। কিম্বা সমাজে শ্রেণি ভেদ ও অসাম্য টিকিয়ে রাখার জন্যও এই ধারণার প্রয়োগ করা হয়। যেমন মাদ্রাসার একটি ছেলে বা মেয়ে ‘আধুনিক’ নয়, আধুনিক হওয়া যায় শুধু ইস্কুল কলেজে পড়লে। তবে আধুনিকতা’ বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছেন তা ধরিয়ে না দিলে এ বিষয়ে আরও আলোচনা করা কঠিন।

কিছু ব্যাপার কাণ্ডজ্ঞান থেকেই বোঝা যায়। যেমন, ‘আধুনিকতা’র ধারণার মধ্যে সময়ের একটি ধারণা আছে। সাধারণত দাবি করা হয় অধুনা বা এখন যেভাবে আমরা চলছি, যেভাবে আমরা ভাবছি, সেটা ভাল। আর যা পুরানা, প্রাচীন বা অতীত সেটা খারাপ। যদি তাই হয় এখনও আধুনিকেরা প্লেটো এরিস্টটল কেন পড়ে? তারা তো প্রাচীন মানুষ। বাস করতেন দাস ব্যবস্থার ওপর দাঁড়ানো একটি সমাজে। কিভাবে তারা এতো অগ্রসর চিন্তা করতে পারলেন?

কিম্বা নিউটনের পদার্থ বিজ্ঞান পড়ার দরকার কি? কিম্বা ইউক্লিডের জ্যামিতি? এর পরেও তো পদার্থ বিজ্ঞান ও জ্যামিতির উৎকর্ষ ঘটেছে। জগত যে নিউটন আর ইউক্লিডের নিয়ম মেনে চলে না সেটাও আমরা এখন জানি। তাহলে পড়ি কেন?

তবে ইসলামের দিক থেকে গুরুতর কিছু সংকটের দিক আছে। যেমন দার্শনিক অস্পষ্টতা। গ্রিক দর্শনের সঙ্গে ইসলামের দার্শনিক বিরোধ আছে, এটা আমরা জানি বা আন্দাজ করতে পারি। কিন্তু দর্শনের পরিমণ্ডলে সেটা এখনও স্পষ্ট করা যায় নি। ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায় ধর্মতত্ত্বে যতোটা মনোনিবেশ, দর্শনে ততোটা নয়। এর ফলে ইসলাম তার আবির্ভাবের যুগে নতুন কোন কথা বলেছে কিনা সেটা নির্ণয়ের কোন পদ্ধতি বা প্রকরণ গড়ে ওঠে নি। ইসলামের নতুন কোন প্রস্তাবনা থাকলেও তাকে ধর্মীয় বরাত না দিয়ে সাধারণ সত্য কিম্বা দার্শনিক সত্য হিসাবে হাজির করার চেষ্টা ক্ষীণ, শক্তিশালী নয়। ফলে ‘আধুনিকতা’কে ইসলামের বিপরীতে অনায়াসেই প্রতিস্থাপন করে প্রমাণ করা সম্ভব হয় ইসলাম অনাধুনিক ওপশ্চাতপদ একটি ধর্ম। কারণ এই ধর্ম তার নিজের ভেতর থেকে চিন্তার বিকাশের ধারাকে শক্তিশালী করতে সক্ষম হয় নি। কিভাবে সেটা করা সম্ভব সেটা ‘খলিফা’, ‘উম্মাহ’ ইত্যাদির উদাহরণ দিয়ে আগে খানিক বোঝাবার চেষ্টা করেছি। তেমনি ‘তৌহিদ’, ‘শেরেকি’, নফসানিয়াত, রূহানিয়াৎ -- ইসলামের এই সকল ধারণাও দর্শনের দিক থেকে খুবই মৌলিক জিনিস। ইসলাম এসবকে ধর্মতত্ত্বে হিসাবে আলোচনা করে, সাধারণত সেটা মুসলমানদের ইমান-আকিদা চর্চার পরিমণ্ডল অতিক্রম করে না বা করতে পারে না। দরকার তাদের দার্শনিক ভাবে বোঝা বা ধর্ম বা বিশ্বাস নির্বিশেষে এই ধারণাগুলো নিয়ে সকলের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়।

এর সমাধান ইসলামি দর্শন চর্চা নয়। বরং খোদ দর্শন চর্চা। দর্শনের কোন বিশেষণ নাই। ইসলামি দর্শন যতদিন স্রেফ দর্শন না হয়ে উঠবে, এই সমস্যার সমাধান হবে না।

রহমত : কমিউনিজমের অনুসারীদের মধ্যে বিভিন্ন ধারা ও উপধারা লক্ষ্য করা যায়। তাদের কেউ কেউ ধর্মহীনতাকে আদর্শিক ভিত্তি মনে করেন। এক্ষেত্রে তাদের সাথে আপনার বক্তব্য সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই মতবাদে বিশ্বাসীদের মধ্যে এই পার্থক্য কিসের ভিত্তিতে?

ফরহাদ মজহার : ধারা-উপধারা অস্বাভাবিক কিছু না, এর চেয়ে বেশী ধারা উপধারা ইসলামী আন্দোলনেও আছে। যে কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ববিরোধ থাকবে। এতে অবাক হবার কিছু নাই। বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতিতে অনেক সম্মানিত ব্যক্তি আছেন। তাঁরাও তো ভাঙাভাঙি কম করেন নি। তাদের মধ্যেও বা মিলও-মহব্বত কই। মতাদর্শিক সংগ্রাম বা চিন্তার লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই মানুষ জাহেলি থেকে মুক্ত হয়, অজ্ঞানতা কাটিয়ে আল্লার দিদার লাভ করে।

দেখুন, ‘ধর্ম’ কথাটা আমি যেভাবে বুঝি তার সঙ্গে কমিউনিস্টদের সঙ্গে বিরোধ আছে, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের অনেক শ্রদ্ধাভাজন আলেম-ওলামাদের সঙ্গেও আছে। ইসলামকে আমি দার্শনিক দিক থেকে বুঝতে চাই, ওলামা মাশায়েখরা ধর্মতত্ত্বের দিক থেকে বুঝবেন, সেখানে আমি তাদের ছাত্র মাত্র। আমি নিজের বিবেক বুদ্ধি অভিজ্ঞতা দিয়ে যা বুঝেছি তা সরল ভাবে ও সততার সঙ্গে প্রত্যেকের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলে যেতে চাই। যদি আমি ঠিক কথা বলি তাহলে কমিউনিস্ট হোক কিম্বা ওলেমা মাশায়েখ হোক কিম্বা হোক ইসলামি বিপ্লবের কোন সৈনিক -- তাহলে তারা ঠিকই আমার কথা বুঝবেন। অবশ্য যদি তারা মজলুমের স্বার্থ রক্ষা ও সৃষ্টির হেফাজত করাকে তাদের রাজনীতির মর্ম বলে মনে করেন।

আমি মনে করি কমিউনিস্টরা ব্যর্থ হলেও কমিউনিজম – বা মানুষের সঙ্গে মানুষের সাম্য ও একটি ঐক্যবদ্ধ বিশ্ব সমাজ গড়ে তুলবার ইচ্ছা ও স্বপ্নের কোনই ছেদ ঘটে নি। ইসলাম যাকে ‘উম্মাহ’ বলে। সাম্রাজ্যবাদীরা এক সময় সোভিয়েত রাশিয়া ও চিনের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে মুসলমানদের দিয়ে কমিনিউস্টদের বিরোধিতা করেছে, এখন তথাকথিত বাম ও প্রগিতিশীলদের দিয়ে ইসলামের বিরোধিতা করছে। এখন সোভিয়েত রাশীয়াও নাই, চিনকেও আর কমিউনিস্ট চিন বলা কঠিন। স্নায়ু যুদ্ধের এই প্রাচীন ও সাম্রাজ্যবাদী মানসিকতা উভয়পক্ষকেই পরিহার করতে হবে।

নতুন ধরণের সমাজ ও নতুন ধরনের মানুষ গড়বার যে চেষ্টা কমিউনিস্টরা করেছিলেন তাদের সফলতা ও ব্যর্থতা উভয় দিক থেকে বহু কিছু শেখার আছে। তারা কেন শেষাবধি ব্যর্থ হলেন সেটা বিচার করলে কয়েকটি বিষয় অনায়াসে ধরা পড়ে:

১. মানুষ সম্পর্কে তাদের ধারণা। মানুষকে তারা অন্য যে কোন প্রাকৃতিক জীব বলে গণ্য করেছিলেন। মানুষ যে আসলে স্বাধীন ও অনন্ত সম্ভাবনাময় সত্তা সেই দিকে যথেষ্ট মনোযোগ তারা দেন নি। ইসলাম মানুষকে ‘আল্লার খলিফা’বলার মধ্য দিয়ে মানুষের এই বিশেষ চরিত্রের দিকে ইঙ্গিত করে।

২. মানুষের ইতিহাসকে তারা প্রাকৃতিক ইতিহাস হিসাবে দেখেছেন। মানুষের রূহানি তাগিদ বা বিপ্লবী কর্ত্তাসত্তাকে যে যান্ত্রিক প্রাকৃতিক বিজ্ঞান দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়, সেই সত্যকে তারা বিশেষ আমনে নেন নি।

৩. মানুষ যেহেতু প্রাকৃতিক জীবের মতোই জীব অতএব তারা ধরে নিয়েছিলেন মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বাসস্থান নিশ্চিত করতে পারলেই মানুষ তাদের বশ হয়ে যাবে। সেটা যে হয় নি বা হয় না, ইতিহাসই তার প্রমাণ।

৪. নতুন ধরনের মানুষ তৈরীর চেয়েও তারা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পুঁজিতন্ত্র মানুষকে যেভাবে ভোগ্য পণ্য সরবরাহ করে কৃৎকৌশলের নিত্যনতুন বিকাশ ঘটায় তারা তার চেয়েও ভাল ভাবে মানুষের সেই চাহিদা মেটাবেন। অর্থাৎ তাঁরা মানুষকে একেকজন ব্যক্তি ও ভোগের কর্তার অধিক কিছু ভাবেন নি। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের কাঠামোতেও তারা পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা মেটাতে চেয়েছিলেন।ব

তবু আমি মনে করি ইতিহাসে যখনই যেখানে জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই হয়েছে এবং যারা সেই লড়াইয়ে মজলুমের পক্ষাবলম্বন করেন তারা ইসলামের মিত্র। দুষমন নয়। তাদের কাছ থেকে ইসলামি রাজনীতির বহু কিছু শেখার আছে।

মাসিক রহমতে আগস্ট ২০১৩, বর্ষ ২১, সংখ্যা ২৪৮ এ প্রকাশিত।

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : ইসলাম, গণতন্ত্র, রহমত, কুফরি, কওমি মাদ্রাসা, ফরহাদ মজহার, Farhad Mazhar

View: 3894 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD