সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরহাদ মজহার


Saturday 26 October 13

print

বেগম জিয়া ২৫ অক্টোবরের মহাসমাবেশে ঘোষণা করেছেন, আন্দোলন এবং সংলাপ দুই পথ ধরেই তিনি অগ্রসর হবেন। রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে এটা সঠিক অবস্থান। কিন্তু তিনি কী অর্জন করতে চাইছেন সেটা এখনও সাধারণ জনগণের কাছে অস্পষ্ট। তাঁর রাজনীতির এই দিকটি সবচেয়ে দুর্বল। যখন লিখছি তখন শোনা যাছিল তাঁকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফোন করবেন। শেষমেষ ফোন করেছেন হরতাল প্রত্যাহার করবার জন্য, আন্দোলন থেকে তাঁকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীনরা। তাঁকে গণভবনে নৈশ ভোজেও দাওয়াত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আরেকটি দারুন খবর তাঁর লালফোন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী তা ঠিক করে দেবেন বলেছেন। খুব সুন্দর! সংলাপ শুরু হয়েছে!!

শেখ হাসিনা করেছেন আন্তর্জাতিক চাপে, বেগম জিয়াকেও কথা বলতে হবে আন্তর্জাতিক চাপেই। প্রধানত দিল্লী ও ওয়াশিংটনের খবরদারি মেনে।

দুপুর সোয়া একটা থেকে প্রায় ১ ঘন্টা ( কেউ বলেন আধা ঘন্টা) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে লাল ফোনে নিজে চেষ্টা করেও পান নি। পরে জানা গেল এই লাল ফোন খারাপ হয়ে আছে। প্রধান মন্ত্রীর প্রেস সচিব এবং বিরোধী দলীয় প্রেস সচিবের বরাতে সারাদিন ইলেক্ট্রনিক সংবাদ মাধ্যম ব্রেকিং নিউজ প্রচার করেছে।

এর পর সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটে প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা গণ ভবনে বসে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিজের মোবাইল থেকে ফোন করেন। শেখ হাসিনা এটাকে মিডিয়া ইভেন্ট আকারে প্রচার করেছেন। অর্থাৎ মিডিয়ার সামনে কথা বলে সবাইকে তাঁর এই মহৎ উদ্যোগ জানান দিতে চেয়েছেন। উদ্দেশ্য হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহল, সুশীল সমাজ, দলবাজ গণমাধ্যম ও টকশোওয়ালাদের জানিয়ে দেওয়া যে তিনি তাদের উপদেশ মতো সংলাপ শুরু করেছেন। একে মিডিয়া ইভেন্ট করতে গিয়ে টেলিফোনের গুরুত্ব হালকা হয়ে গিয়েছে। তিনি বিরোধী দলীয় নেত্রীকে ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিলেন, সেটা পারেন নি। এ সময় তাঁর সামনে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমদ, এইচ টি ইমাম, ড. মশিউর রহমান প্রমুখ। শেখ হসিনা খালেদা জিয়াকে হরতাল প্রত্যাহার করার কথা বলেছেন, বিরোধী দলীয় নেত্রী রাজী হন নি। তাঁর সঙ্গে ভাত খাওয়ার যে ওয়াদা দিয়েছেন, সেটা তিনি কবুল করেছেন, তবে হরতালের পরে। রক্ত ও লাশের ওপর হেঁটে গিয়ে বিরোধী দলীয় নেত্রী রাজবন্দী ও অসংখ্য নেতাকর্মীকে কারাগারে রেখে এবং তাঁর সমর্থক কিম্বা নিরপেক্ষ সমস্ত সংবাদপত্রের বন্ধ অবস্থা মেনে নিয়ে বৈরী পরিবেশে শেখ হাসিনার সঙ্গে নৈশ ভোজে বসে কী সংলাপ করবেন? ফলে তাঁর অবিলম্বে উচিত সংলাপের জন্য রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরীর দাবি জানানো। উচিত যাঁরা আসলেই সংলাপ চান, তাদেরও শেখ হাসিনাকে পরিষ্কার বলা সংলাপের জন্য রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরী করুন। বিজেবি দিয়ে মানুষ গুলি করে শেখ হাসিনা হত্যা করতে থাকবে আর গণমাধ্যমে সংলাপের চিৎকার জঘন্য ব্যাপার। আওয়ামী গণমাধ্যমগুলো ক্রমাগত সংলাপের কথা বলছে, কিন্তু সংলাপের জন্য রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরী জন্য কোন দাবিই করছে না। এটা পরিষ্কার হয়ে যাওয়া উচিত যারা সংলাপের কথা বলছে তারা গণতন্ত্র দূরে থাকুক, লিবারের নীতিনৈতিকতাতেও বিশ্বাস করে না। এই সব ভণ্ডদের চিনে রাখা দরকার।

আমরা জানি, বাংলাদেশের মার্কিন রাষ্ট্রদূত দিল্লি গেছেন। তিনি দিল্লিকে যতোই বোঝান যে বাংলাদেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হোক, এবং দিল্লি তাতে সহযোগিতা করুক, দিল্লি শেখ হাসিনাকে ছাড়া অন্য কারো ক্ষমতায় আসা ভাবতে পারে না, ভাববেও না। নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য দিল্লি খালেদা জিয়াকে বিপজ্জনক মনে করে। মহাজোট কী করবে সেটা তারা জানে, বেগম জিয়া যাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে থাকেন তারা যে কোন মূল্যে তাঁকে নির্বাচনে নিতে আগ্রহী। যেন তাঁকে ওয়াশিংটন-দিল্লির পায়ে কোরবানি দেওয়া যায়। দরকার হলে হাসিনার অধীনে নির্বাচন হলেও এদের অসুবিধা নাই। তাদের স্বার্থের জন্য বেগম জিয়াকে বলি দিতে এদের অনেকের খুব একটা অসুবিধা হবার কথা নয়। এই পরিস্থিতিতে বেগম জিয়া বাংলাদেশে জনগণের সঙ্গে থাকবেন, নাকি দিল্লী-ওয়াশিংটনের পথে গিয়ে আম ও ছালা দুটোই হারাবেন সেটা তিনিই জানেন। আমরা বড় জোর তাঁর সুমতির জন্য হাত তুলে মোনাজাত করতে পারি।

কেন তিনি হারাবেন? এটা যে কেউ কাণ্ডজ্ঞানেই বোঝে যে যদি শেখ হাসিনা কোন মীমাংসা চান তাহলে তাঁকে তো কোন টেলিফোন করবার দরকার নাই। টেলিফোনের রাজনীতি আমদানি হয়েছে বেগম জিয়ার আন্দোলনের কর্মসূচি পণ্ড করারা জন্য। যে পদ্ধতিতে শেখ হাসিনা সংবিধান বদলিয়েছেন, সেই পদ্ধতিতেই তাঁকে এখন সংবিধান বদলাতে হবে। কিম্বা নিদেনপক্ষে, তাঁকে ক্ষমতায় রেখে নির্বাচন করবার অবস্থান থেকে তিনি সরে এসেছেন সেই সিদ্ধান্ত আগে জানাবেন। যদি তাও না চান, শুধু আলোচনা শুরু করতে চান, তাহলেও তো টেলিফোন লাগে না। দুই দলের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিরা বসে পড়লেই হয়। কিন্তু কিছু গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, ও অর্বাচীন লোকজন টেলিফোন করাকে বিরাট কিছুতে পরিণত করতে চাইছে। এখানে ফোন করার কিছু নাই। শেখ হাসিনা তাঁর প্রস্তাব তো নাকচ করেই দিয়েছেন। মহাজোটের লোকজন এখনও অঙ্গভঙ্গী ও অকথ্য ভাষা সহকারে তাঁকে সমালোচনা করছে। টেলিফোন করার পর তারা বলবে আমরা সমস্যা সমাধান করতে চেয়েছি, কিন্তু খালেদা জিয়ার জন্য সমাধান হয় নি। দিল্লী-ওয়াশিংটন প্রচার করে বেড়াবে, হাসিনা মহৎ, তিনি ফোনে করেছেন, নৈশ ভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, লাল ফোন ঠিক করে দেবেন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কিন্তু খালেদা কোন ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দিতে পারে নি। ক্ষমতাসীনদের তার বিরুদ্ধে প্রচারণার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছেন তিনি। খালেদার হাতে কোন গণমাধ্যম নাই, তিনি এই প্রচারে হেরে যাবেন। তাঁর হাতে কিছু ফেইসবুক ও সোশাল নেটওয়ার্ক থাকলেও থাকতে পারে।  অন্যদিকে সেটা টের পেয়ে সোশ্যাল নেটঅওয়ার্কগুলোও হাসিনা আইন করে গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যার চেষ্টা করছে।

এই সরকারকে খালেদা জিয়া অবৈধ সরকার বলেছেন। অবশ্যই তিনি ঠিক বলেছেন। তাঁর এই ঘোষণার পর জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে। আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত বেগ দানা বাঁধছে। বেগম জিয়ার উচিত যারা তার আন্দোলনের শক্তি তাদের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো। এই অবৈধ সরকারকে হঠিয়ে কিভাবে তিনি নির্বাচন করবেন তার রূপরেখা অবিলম্বে জনগণের সামনে হাজির করা। আন্তর্জাতিক ভাবে কিভাবে তিনি বাংলাদেশে গণতন্ত্র কায়েম করবেন এবং শান্তি ও শৃংখলা ফিরিয়ে আনবেন তার পরিষ্কার পথরেখা দাখিল করা। টেলিফোনের সময় শেষ হয়ে গিয়েছে। তিনি আল্টিমেটাম দিয়েছেন। প্রতিশ্রুত মোতাবেক ক্ষমতাসীনদের উত্তরের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া তার আর কোন কর্তব্য নাই। কিন্তু তিনি টেলিফোনের ফাঁদে পা দিয়ে উষ্ঠা খেয়ে পড়বার ব্যবস্থা করছেন। যে সকল গণমাধ্যম ও সুশীল লোকজন টেলিফোন করাকে গুরুত্ব দিচ্ছে্ন, তাদের ধারণা বাংলাদেশের মানুষ শিশু, তাদের হাতে তারা লজেন্স বা ললিপপ ধরিয়ে দিতে চাইছে!

এতদিন খালেদা জিয়া বলেছেন তিনি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চান। তারপর বলা শুরু করেছেন, তত্ত্বাবধায়ক নয়, নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারে তাঁর অমত নাই, এখন বলেছেন বা তাঁর দলের তরফে এই ধারণা দেওয়া হয়েছে যে নির্বাচন কালীন সরকার হলেই হবে, তবে শেখ হাসিনার অধীনে কোন নির্বাচনে যাবেন না। পালটা ক্ষমতাসীনরা বলেছে তারা সংবিধানের বাইরে কিছুই করবে না। শেখ হাসিনাই নির্বাচনের সময় ক্ষমতায় থাকবে। একুশে অক্টোবর তাঁর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে ছিলেন এমন ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সরকারের কথা বলেছেন। যেহেতু শেখ হাসিনা সংবিধানের বাইরে যাবেন না, অতএব তাদের ‘সাংবিধানিক’ ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করতে প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের নির্বাচনে পাশ করিয়ে আনার কথা বলেছেন। কারা করবে সেটা ? শেখ হাসিনা ও তার সংসদ? এগুলো অবাস্তব প্রস্তাব। দূতাবাসে তৈরী হওয়া প্রতিভাদীপ্ত রম্য রচনা। এতে খালেদা জিয়া জনগণের কাছে খেলো হয়েছেন এবং তাঁর ওপর জনগণের বিশ্বাস দুর্বল করে তুলছেন। যদি আন্দোলনের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতাসীনদের তাঁর কথা শুনতে বাধ্য করতে চান, তাহলে তাঁকে আন্দোলনই করতে হবে। তা করতে হলে যারা তাঁর মাঠের মিত্র, যাদের সমর্থনে পাঁচটি সিটি কর্পোরেশান নির্বাচনে তিনি জিতেছেন তাদের আস্থায় রাখতে হবে। তাঁকে আঠারো দলীয় জোটকে শক্তিশালী করতে হবে। তাদের ব্যবহার নয়, জোটের শরিক হিসাবে পূর্ণ মর্যাদায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় সঙ্গে রাখতে হবে। কিন্তু সবার আগে তাঁকে বলতে হবে তিনি ক্ষমতায় গিয়ে কী অর্জন করতে চান। গত নির্বাচনে তড়িঘড়ি করে তাঁর দল যেভাবে থার্ড ক্লাস নির্বাচনী ইশতেহার বের করেছিল -- কোন চিন্তা নাই, পরিকল্পনা নাই, প্রচারের কোন কৌশল নাই – রাজনৈতিক আদর্শ বিবর্জিত সে রকম কর্মসূচী দিয়ে আবারও যদি তিনি অল্প সময়ের ব্যবধানে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, তিনি নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারবেন। তিনি কী ভাবছেন বা তার লোকজন কি ভাবছে সেটা ২১ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে আমরা দেখেছি। এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তে বেগম জিয়ার বক্তব্য স্পষ্ট ও নির্দেশমূলক হওয়ার দরকার ছিল, কিন্তু তা হয় নি।

এ বিষয়ে আমি এর আগে মন্তব্য করেছি। আর পূর্বানুবৃত্তি করব না।

২৭ অক্টোবর ২০১৩। ১২ কার্তিক ১৪২০। শ্যামলী।

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : খালেদা, হাসিনা, সংলাপ, ফরহাদ মজহার, Farhad Mazhar

View: 3043 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD