সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরহাদ মজহার


Tuesday 29 October 13

print

এক

দুই নেত্রী সংলাপ করলে ও আগামি নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে একটি আপোষ রফা হয়ে গেলেই বাংলাদেশের সংঘাত-সংকুল রাজনীতি শান্ত হয়ে যাবে এই অনুমান নিয়ে পত্রপত্রিকা ও গণমাধ্যমে অনেকের নিরর্থক কথাবার্তা এখন বিরক্তিকর কোলাহলে পরিণত হয়েছে। পত্রপত্রিকা, টেলিভিশান ও ওয়েবপোর্টাল এমন সব অন্তঃসারশূন্য তর্ক করছে, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোন সম্পর্ক নাই।

‘সুশীল’ কথাটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিন্দার্থে ব্যবহার শুরু হয়েছে এক এগারোর পর থেকে। কিন্তু আমরা প্রশ্ন করতে পারি বাংলাদেশে সুশীল রাজনীতির কি কোনই ইতিবাচক ভূমিকা নাই? সুশীল রাজনীতি বলতে আমি সেই রাজনীতির কথাই বলছি যা সাধারণত ‘লিবারেল’ বলে পরিচিত। আমি মনে করি আছে। তাদের ভূমিকা কি রাজনৈতিক দলগুলোর নিন্দা করা এবং রাজনীতি দিয়ে কিছু হবে না এই মহৎ শিক্ষা নসিহত করে বাংলাদেশের আইনশৃংখলার অবনতি রোধ ও উন্নয়নের পথে কদম কদম অগ্রসরের জন্য সেনাবাহিনীকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়া? আমি মনে করি অবশ্যই না। অনেকেই ‘তৃতীয় শক্তি’কে ক্ষমতায় এনে রাজনৈতিক দলগুলোকে শায়েস্তা করতে চান। সেটা হবে চরম আহাম্মকি। গত কয়েকদিন ধরে দেখছি গণমাধ্যমগুলো সহিংসতার খবর সরকারের তরফেএকপক্ষীয় ভাবে ছাপছে; তারা কী চাইছে সেটা বুঝতে খুব কষ্ট হবার কথা নয়। তারা এমন পরিস্থিতি চাইছে যাতে পরাশক্তির সমর্থনে তাদের প্রাণপ্রিয় ‘তৃতীয় শক্তি’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে। এটা ঠিক নয়। এটা ভুল পথ।

গণমাধ্যমের দিক থেকে বিচার করলে দেখি বিরোধী দলের কথা বলে এমন কোন গণমাধ্যম নাই। এ এক আশ্চর্য অসাম্য। অন্যদিকে কয়েকটি টেলিভিশান চ্যানেল ক্রমগাত মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। যার টার্গেট সবসময়ই বিরোধী দলসমূহ বা ক্ষমতাসীনদের প্রতিপক্ষ। সরকার অবৈধ ভাবে বল প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধী কন্ঠস্বরগুলো বা বিরোধী দলগুলোর পক্ষে কথা বলতে পারে এমন সব মিডিয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এ ব্যাপারে সুশীলদের কোন মাথাব্যথা নাই। যদি সত্য সত্যই সুশীল সমাজ রাজনৈতিক সংলাপ চাইতো তাহলে তাদের প্রথম কাজ ছিল সংলাপের পরিবেশ তৈরীর জন্য দাবি তোলা। কিন্তু তারা সেটা করে নি। তারা দুই নেত্রী কেন পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে না, এর মুখ অপরে দেখে না ইত্যাদি নানান মুখরোচক গালগল্প নিয়ে লম্বা লম্বা প্রবন্ধ ফেঁদেছে। টক শতে দুই নারীর নিন্দা করে তুফান তুলেছে। আর এইসবকেই তারা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হিসাবে হাজির করেছে নিরন্তর। ব্যতিক্রম ছিল অবশ্যই। কিন্তু সুশীলতা এই ধরণের গাল্গল্প দিয়েই রচিত হয়েছে।

অথচ সুশীলদের কর্তব্য ছিল সমাজে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বিতর্কে বিভিন্ন পক্ষ যেন অংশগ্রহণ করতে পারে তার জন্য নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করা। যেমন, অবিলম্বে আমার দেশ, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি, চ্যানেল ওয়ান-এর উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার। আমার দেশ সম্পাদক, মাহমুদুর রহমানের মুক্তি। কিম্বা মুক্তি চাইতে অসুবিধা বোধ করলে জামিন। নাগরিক হিসাবে জামিন পাবার অধিকার তাঁর আছে। যদি তাও কেউ না চান তাহলে নিদেন পক্ষে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার স্বার্থে বেআইনী ভাবে তালা দিয়ে আটকে রাখা দৈনিক আমার দেশ-এর ছাপাখানা অবিলম্বে খুলে দেয়া। এগুলো অবশ্যই লিবারেল রাজনীতির অংশ। কিন্তু সুশীলরা মুখে বাক ব্যাক্তি মত চিন্তা ইত্যাদির স্বাধীনতার কথা বলে, কিন্তু আসলে তলে তলে অধিকাংশই বিরোধী মতকে দমন পীড়িন নির্যাতনেই খুশি হয়। এমন অনেকে আছে যারা বিরোধী মতাবলম্বীদের দমন-পীড়নে পৈশাচিক আনন্দ লাভ করে। রাজনৈতিক সহিংসতা ও বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তারাই আবার খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে দায়ী করে। অথচ মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ ও বিরোধী কন্ঠস্বর দমন প্রথম ভায়োলেন্স বা রাষ্ট্রীয় সহিংসতা -- যা আজ হোক কাল হোক রাজপথে সহিংস রূপ নিয়ে ফিরে আসে। যে কন্ঠস্বর সুশীলেরা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিঃশব্দ করে দিয়েছে সেটাই রাজপথের শক্তি হয়ে তাদের বিরুদ্ধে এখন রুখে দাঁড়াতে চাইছে। যাদের তারা কথা বলতে দিতে চায় না, তারা যে-ভাষা জানে সেই ভাষাতেই রাজপথে কথা বলছে। এখন কিছু বিপদ টের পেয়ে অনেকে সহিংসতার বিরুদ্ধে চিৎকার জুড়ে দিয়েছে। সহিংসতার কারন যে তারাই সেটা তারা জানে না। কিম্বা জানলেও স্বীকার করতে চায় না। কথা বলতে না দেওয়ার সন্ত্রাস ও সহিংসতাই রাস্তায় গণবিদ্রোহ ও গণপ্রতিরোধ হয়ে প্রত্যাবর্তন করে। এটাই ইতিহাসের নিয়ম।

ইন্টারনেটে ছেলেমেয়েরা কিছু কথা বলতে পারত। অথচ আইসিটি আইন-এ বাক, ব্যক্তি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিরোধী কালো ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এই ধারা বলেই অধিকার সম্পাদক এডভোকেট আদিলুর রহমান খান,নাসিরুদ্দিন এলান-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। সম্প্রতি সংশোধিত তথ্য প্রযুক্তি আইন ২০১৩-তে আরও দমন-পীড়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আজ ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী প্রতিদিন কতোজন বাংলাদেশীদের গুলি করে হত্যা করছে, কতজনকে ধরে নিয়ে গিয়েছে, কতোজন মহিলাকে ধর্ষণ করেছে তার কোন নিয়মিত তথ্য আমরা জানতে পারছি না। মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে নির্ভয়ে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। হয়রানি চলছে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও সন্ত্রাসের কারনে কতোজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে তার নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য পাবার উপায় সীমিত হয়ে গিয়েছে। সুশীলদের কর্তব্য ছিল জনগণের মত প্রকাশের অধিকার ও তথ্য জানার অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানো। সংলাপ দরকার ছিল সমাজে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুধু নয়। যদি সামাজিক ক্ষেত্রে সংলাপে আমরা সফল হতে পারতাম, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সফল হবার সম্ভাবনা বাড়তো। কিন্তু বিরোধী মত ও চিন্তাকে রুদ্ধ করে দিয়ে কিছু সুশীল এখন চাইছে হাসিনা আর খালেদা টেলিফোন করে আর ডিনার খেয়ে দেশের সমস্যা সমাধান করুক। এটা হাস্যকর।

বিরোধীদলের বিরুদ্ধে দমন-নিপীড়িনের উদ্দেশ্যে তাদের নেতা কর্মীদের আটক করে রাখা, দেশব্যাপী দায়েরকৃত লক্ষাধিক মানুষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়ের করা মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে সুশীল সমাজ অবশ্যই দাঁড়াতে পারত। কিন্তু তাদের কর্তব্য তারা পালন করে নি। লিবারেল মতাদর্শ বা রাজনীতির পক্ষে তারা দাঁড়ায় নি, মুখে বেহুদা বড় বড় কথার খৈ ফুটিয়েছে।

শাপলা চত্বরে গত ৫ মে অনুষ্ঠিত হেফাজতে ইসলামির সমাবেশে সংঘটিত গণহত্যার সঠিক তথ্য ও আহত ও নিহতদের অনুসন্ধানের জন্য নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন সুশীল সমাজ দাবি করতে পারত। এর মানে হেফাজতে ইসলামের মতাদর্শ বা কর্মকান্ড সমর্থন করা নয়। তার বিরোধিতা করলেপ অসুবিধা নাই। কিন্তু যে ন্যূনতম নীতিগত আদর্শ বজায় রাখলে একজন সুশীল সুশীল হতে পারে তার পরীক্ষা। নিহত এবং আহতদের যথাযোগ্য ক্ষতিপূরন প্রদান ও আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তারা সমাজের নিপীড়িত অংশের কাছে প্রমাণ করতে পারত তারা উদার রাজনৈতিক নীতিতে আসলেই বিশ্বাসী। তারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নাগরিক ও মানবি্ক অধিকার রক্ষা করা্র কর্তব্য অস্বীকার করে না। সমাজে ভায়োলেন্স ও নিরূপায় সহিংসতা এতে অবশ্যই কমত। তবে পুরাপুরি কমত না। যে দ্বন্দ্ব কাঠামোগত সেই দ্বন্দ্ব টিকে থাকত। টিকিয়ে রাখলে সহিংসতার সম্ভাবনা কখনই উবে যেত না, কিন্তু কমত, এতে সন্দেহ নাই।

দুই

বাংলাদেশে প্রতি পাঁচবছর পরপর কিভাবে নির্বাচন হবে শুধু সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে রক্তপাত কম হয় নি। এরপর তো নির্বাচনকালীন সময়ের রক্তপাত ও সহিংসতা আছেই। কিন্তু এখনকার সংকট নিছকই নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্পর্কে মতৈক্য প্রতিষ্ঠার সমস্যাও নয়। স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। তার বিস্তর সমালোচনা করা যায়, হয়েছেও। কিন্তু তার পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক সমঝোতা ছিল। এর বৈধতা জনগণের সম্মতির মধ্যে, যার ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে তাকে নস্যাৎ করে দেওয়ার কারণে একটা ভয়াবহ রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের পরামর্শে জাতীয় সংসদে আইন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাকচ করে দেওয়ার ফল অতএব ভালো হয় নি। ‘আইনী’ সিদ্ধান্তে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে জাতীয় সংসদ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও আইন প্রণয়নের এখতিয়ারের জোরে বাতিল করতে পারে, কিন্তু সমাজে রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ‘বৈধতা’তাতে নাকচ হয়ে যায় না। আইনী (legality) সিদ্ধান্ত মানেই বৈধ (legitimate) সিদ্ধান্ত নয়। বৈধতার শূন্যতা আইন পূরণ করতে পারে না। নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈধতাকে আইন দিয়ে মোকাবিলা করা যায় না। এগুলো রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইনশাস্ত্রের পুরানা কথা। বিদ্যমান নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈধতাকে নতুন নৈতিকতা, সামাজিকতা ও বৈধতা তৈরির রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হয়।

অন্যান্য বহু কারন বাদ দিলেও নির্বাচনকেন্দ্রিক বর্তমান সংকটের কারন কিভাবে নির্বাচন হবে সে-সম্পর্কে সমাজে গড়ে ওঠা অভিপ্রায়কে ক্ষমতাসীনদের অস্বীকার। যাঁরা সুশীল ও উদারনৈতিক রাজনীতির পক্ষাবলম্বনকারী তাহলে তাদের প্রথম কাজ হচ্ছে এই শূন্যতা তৈরীর জন্য যারা দায়ী তাদের সমালোচনা করা।কিন্তু দুই একজন ব্যতিক্রম ছাড়া সুশীলরা ক্ষমতাসীনদের নয়, দায়ী করছে বিরোধী দলীয় জোটকে।

ক্ষমতাসীনরা যেহেতু ক্রমাগত সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে তাই আজ (২৭ অক্টোবর ২০১৩) দেখছি বদিউল আলম মজুমদার দৈনিক প্রথম আলোয় প্রশ্ন তুলেছেন ‘কোন্‌ সংবিধান, কার সংবিধান?’। ঠিকই। সুশীল রাজনীতি যদি তদের উদার রাজনৈতিক মতাদর্শের জায়গা থেকে বর্তমান সংকটে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে চায় তাহলে তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট ও শক্ত করতে হবে। মজুমদার পঞ্চদশ সংশোধনীর ইতিহাস ব্যাখ্যা করে লিখেছেন, “এ ইতিহাস থেকে পাঠকেরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কি বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনগণের অভিপ্রায়ের, না প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার প্রতিফলন! বলাবাহুল্য যে এ সিদ্ধান্তের কারনেই আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, হানাহানি ও নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা”। তিনি অবশ্যই ঠিক বলেছেন। শেখ হাসিনা তাঁর ইচ্ছা দেশের জনগণের চাপিয়ে মতো স্পষ্ট ভাবেই বলতে হবে।

বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতির কাঠামোগত সমস্যা অনেক গভীর। সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি ও শক্তির স্বার্থের দ্বন্দ্ব এতো বিকট ও ভয়াবহ যে তার মীমাংসা দুইপক্ষের পরস্পরের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ ছাড়া অন্য কোন ভাবে সমাধান অসম্ভব। তারপরও বহু সুশীলের হুঁশ হয় না যে এটা লাল ফোন কিম্বা মোবাইলে টেলিফোনের বাতচিতের ব্যাপার নয়, কিম্বা ভাত খাবার দাওয়াত গ্রহণ করে দুই নেতার পটল ভাজি বা বেগুন ভর্তা খেতে খেতে সমাধানের বিষয়ও নয়।

সমাধান দুই নেত্রীর হাতেও কি আছে? ডেন মজিনা একবার দিল্লি যান, এখন হয়তো ওয়াশিংটন না গিয়ে বেইজিং যাবেন। এই পরিস্থিতি একদিনে তৈরী হয় নি। কোন দৈব হুকুমে নির্বাচন হলেও এই পরিস্থিতির মীমাংসা সহজে হবে না।

বাংলাদেশ সংঘাতের রাজনীতিতে ঢুকেছে বহু আগে। তারপরও তর্কের খাতিরে মেনে নেওয়া যাক সমাজ ও রাজনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের সমস্যা বা গোড়ার গোলমালের সমাধান সহসা সম্ভব নয়, কিন্তু বিপদ তো এখন মাথার ওপর এসে পড়েছে। ‘বদলে দাও বদলে যাও’ বলে কাজ হচ্ছে না। ‘যেখানে আছে দিন বদল সেখানেই আছে...’ বললেও সামনে ডোরাকাটা হলুদ শেয়ালের মুখব্যাদান ভেসে ওঠে, সবুজ বাংলাদেশ ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে। সমাধান বিপ্লবে না সংস্কারে সেই তর্ক থেকেও আমরা বহুদূর পিছিয়ে এসেছি।

এই পরিপ্রেক্ষিতেই, আমি মনে করি, সুশীল রাজনীতির একটা ভূমিকা আছে। আসলেই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র দূরে থাক এই সকল দেশে ন্যূনতম লিবারেল বা উদারনৈতিক নাগরিক ও মানবিক অধিকার সম্পন্ন সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্র কায়েম করতে হলেও বিপ্লব ও রক্তপাত ছাড়া কোন শান্তিপূর্ণ পথ খুঁজে পাওয়া রীতিমতো অসম্ভব। এই দিকটির উপলব্ধি জরুরী।

কিন্তু সুশীলদের মধ্যে অধিকাংশের মধ্যে এই উপলব্ধি নাই। বাংলাদেশের বাস্তবতা বুঝেও প্রায় প্রত্যকেই শান্তিপ্রিয় ভদ্রলোক সাজতে চান। তারা সংঘাত চান না, শান্তি চান, সেটা ভাল। অশান্তি কেউ শখ করে চায় না। শান্তিপূর্ণ ভাবে কোন সংকটের মীমাংসা হলে সহিংসতা ও রক্তপাত কেউই চায় না। কিন্তু বাস্তব রাজনীতির আলোচনা পাতিবুর্জোয়া নৈতিকতা প্রদর্শন করে নিজেকে শান্তিপ্রিয় ‘সুশীল’ হিসাবে হাজির করার চেয়ে বিরক্তিকর কিছুই হতে পারে না। সেই ক্ষেত্রে টেলিফোন, আলাপ সংলাপ, ডিনার ভাত খাওয়া খাওয়ি নিয়ে কোন কিছু লিখতে বা বলতে হলে কিছু কাণ্ডজ্ঞান খরচ করা দরকার। স্রেফ কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই বিবাদমান দুই পক্ষকে বোঝার চেষ্টা করা উচিত।

পার্লামেন্টের শেষ অধিবেশন বসবে নভেম্বরের ৭ তারিখে। হাতে সময় আছে এক সপ্তাহেরও কম। শেখ হাসিনা যদি কোন সিদ্ধান্ত নিতে চান তাহলে তাঁকে জাতীয় সংসদেই নিতে হবে, সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। খালেদা জিয়া একটি প্রস্তাব দিয়েছেন, আমি যার কঠোর সমালোচনা করেছি (দেখুন www.chintaa.com)। তবু ছহি সুশীল রাজনীতির বরাতে মেনে নিচ্ছি হাজার হোক একটা প্রস্তাব তো বিরোধী দলের তরফে এসেছে এবং জাতীয় সংসদে সেটা পেশ করা হয়েছে। শেখ হাসিনার সর্বদলীয় সরকারের প্রস্তাব তো আছেই। কোন সমাধান এই দুই প্রস্তাবের মধ্য থেকে বের করতে হবে, অথবা নতুন প্রস্তাব পেশ করতে হবে। এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দল হরতাল প্রত্যাহার করে লাশের ওপর হেঁটে ডিনার খেতে যেতে চায় না। এতে আন্দোলনে ছেদ পড়বে, যারা রাস্তায় আন্দোলন করতে গিয়ে নির্যাতিত হয়েছেন তাদের ব্যাপারে কিছু না করে শেখ হাসিনার ওপর ন্যায়সঙ্গত দাবির চাপ কমিয়ে দিলে তারা আম ও ছালা দুটাই হারাবে। বদিউল আলম মজুমদারের বিশ্লেষণের সঙ্গে যদি আমরা একমত হই তাহলে এ্টা পরিষ্কার বেগম খালেদা জিয়া ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত ছাড় দিয়ে ফেলেছেন। আরও ছাড় আত্মঘাতী হবে, এতে রাস্তার আন্দোলনে ছেদ পড়লে আন্দোলনমুখী জনগনের আস্থাও বিএনপি হারাবে। অথচ এই সময় এরাই খালেদা জিয়ার প্রধান রাজনৈতিক ভিত্তি ও সমর্থক। সুশীলরা নয়। জনগণ মাঠে নেমে পড়েছে, কিন্তু পুরাপুরি নেমে গিয়েছে বলা যাবে না। এর কারন আন্দোলনে শরিক হতে চাইলেও বিএনপির শ্রেণি চরিত্র ও দোদুল্যমানতার জন্য বিএনপি কী করতে চায় সে বিষয়ে অনেকে এখনও সন্দিহান। বেগম জিয়া হরতাল প্রত্যাহার করে ডিনার খেতে গেলে সাধারণ মানুষের বিশাল একটি অংশ নির্বাচনে তাঁকে ভোট দিতেও ইতস্তত করবে। ফলে হরতাল প্রত্যাহার ও ডিনার খাওয়ার সিদ্ধ্বান্ত নেয়ার বিষয় খালেদা জিয়ার একার নয়। তাঁকে তাঁর নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

এই মুহূর্তে ন্যূনতম আপোষের জায়গা হচ্ছে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ুক, তার অধীনে নির্বাচন হবে না। তাঁর দলেরই কেউ নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হোক। শেখ হাসিনার পক্ষে কি আসলেই এই ন্যূনতম জায়গাটুকুও মেনে নেওয়া সম্ভব? মেনে নিলে সেটা হবে নৈতিক পরাজয়। এই নৈতিক পরাজয় মেনে নেওয়া এবং তার পরিণতিতে রাজনৈতিক ভাবে নিজের পতনের আরম্ভের আবাহন শেখ হাসিনার পক্ষে কিভাবে সম্ভব? ‘শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে’ -- আওয়ামী লীগের নেতাদের দাম্ভিক ও রুচিহীন কথা বার্তা বাদ দিয়ে যদি বিবেচনা করি তো দেখি, শেখ হাসিনার অবস্থানও নাকচ করা কঠিন। দুই পক্ষের অবস্থান এখনে যেখানে সেখানে আপোষ বা সমঝোতা কিভাবে হবে?

এ কারনেই আমি এর আগের লেখায় বলেছি যদি কোন সমাধান হয় তো দুই পক্ষের বল প্রয়োগের মধ্য দিয়েই হবে। এ নিয়ে হাহুতাশ করে কিছু লাভ হবে বলে আমি মনে করি না। সুশীলদেরও বলি, হা-হুতাশ না করে আসুন, বরং কারও মত বা চিন্তা যতো খারাপ হোক তাকে তার কথা বলার অধিকারের পক্ষে দাঁড়াই। সহিংসতাকে যদি সংলাপে পরিণত করতে চাই, তাহলে এটা হচ্ছে প্রাথমিক পদক্ষেপ। অন্যায় ভাবে বন্ধ করে দেওয়া পত্রিকা টিভি খুলে দেবার দাবি জানাই। সমাজে সকল পক্ষের কথা আমরা শুনতে চাই, সে দাবি তুলি।

সুশীল সমাজ ইতিবাচক ভূমিকা চাইলেই পালন করতে পারে। অবশ্যই। যদি তাঁরা যে নীতি বা আদর্শের কথা বলে, যদি সেই নীতি ও আদর্শে তারা আদৌ বিশ্বাস করে।

করে কি?

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৩/১৩ কার্তিক, ১৪২০

শ্যমলী, ঢাকা

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : সুশীল সমাজ, বাংলাদেশ, সহিংসতা, ফরহাদ মজহার

View: 3470 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD