সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরহাদ মজহার


Sunday 24 November 13

print

এক

মার্কিন কংগ্রেসে গত বৃহস্পতিবার (বাংলাদেশ সময় ২১ নভেম্বর ২০১৩)বাংলাদেশের ওপর একটি শুনানি হয়েছে। এর প্রতি বাংলাদেশে আগ্রহ রয়েছে প্রচুর। বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা ছাড়াই একপক্ষীয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটি নির্বাচনের পথে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। জনগণ উদ্বিগ্ন ও উৎকন্ঠিত। বাংলাদেশে তো বটেই, আন্তর্জাতিক ভাবে এই নির্বাচন অগ্রহণযোগ্য হবে।

তবে দিল্লী ব্যাতিক্রম। শেখ হাসিনাকে দিল্লী সমর্থন করছে ও করবে। ভারতের প্রভাবশালী সাংবাদিকদের লেখালিখি থেকে স্পষ্ট বাংলাদেশে সংঘাত ও রক্তপাতের জন্য দিল্লী তৈরী। শেখ হাসিনাকে যে ভাবেই হোক ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে হবে। নইলে বাংলাদেশের কাছ থেকে একতরফা নিজের মত করে সাজানো নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সুবিধা ছাড়াও দিল্লী যে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে সেখানে ঘাটতি পড়বে; একতরফা বাংলাদেশ থেকে শুধু নেবার যে আরাম দিল্লী ভোগ করছিল সেই আরাম আর থাকবে না। দ্বিতীয়ত দিল্লীর দাবি, বিরোধী দল ক্ষমতায় এলে ইসলামী জঙ্গীবাদ বাড়বে। অতএব যেভাবে হোক হাসিনা ছাড়া অন্য কেউ অর্থাৎ খালেদা জিয়ার সম্ভাব্য ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন রুখে দিতে হবে। ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে হবে শেখ হাসিনাকেই। বাংলাদেশের জনগণ কাকে চায় না চায় তাতে কিছু যায় আসে না।

মার্কিন কংগ্রেসের শুনানিতে বলা হয়েছে সংঘাত বাঁধলে বাংলাদেশ সহ এই অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে,সহিংসতা বাড়বে এবং মানবাধিকারের লংঘন চরম রূপ নেবে। নির্বাচনোত্তর সহিংসতার সম্ভাব্য পরিণতি মারাত্মক হতে পারে। এইসব বক্তব্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্বিগ্ন ও শংকিত করে তুলেছে। কংগ্রেসে ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সাব-কমিটি অন এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক এই শুনানির আয়োজন করেছে। ওয়াশিংটন দিল্লীর প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে নাকি এ অঞ্চলে নিজের স্বার্থ দেখবে সেটাই হচ্ছে মূলত এখনকার আদত প্রশ্ন। প্রকারান্তরে আরেক ভাবে বলা যায় বাংলাদেশের জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে ওয়াশিংটন আদৌ কোন মূল্য দেবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া । অর্থাৎ ওয়াশিংটনের দিক থেকে নিদেনপক্ষে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানো। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বারবার এতদিন একথাই বলে আসছেন। তাহলে ওয়াশিংটনের উচিত যারা দক্ষিণ এশিয়াকে অস্থিতিশীল করতে চায় তাদের কাছ থেকে দূরত্ব তৈরী করা। একমাত্র তাহলেই অন্তত নির্বাচনী ধরণের রাজনীতির জন্য কিছু খোলা জায়গা বাংলাদেশে থাকে। বাংলাদেশের জনগণকে তাদের সমস্যা তাদের মতো করে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সমাধানের কিছুটা সুযোগ তাতে অন্তত নষ্ট হয় না।

ওয়াশিংটন যদি দিল্লীর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখে তাহলে অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতার আশংকা অমূলক। যদি হাত মেলায় তাহলে পরিস্থিতি দাঁড়াবে ভয়াবহ । বাংলাদেশের জনগণ সংঘাত ও রক্তপাত চায় না। সংঘাত ও অশান্ত পরিস্থিতি এই মুহুর্তে দিল্লীর স্বার্থ রক্ষা করবে, আন্দোলন এখনও বিরোধী জোটের অধীনে, আর বিরোধী দলীয় জোট নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি ও নির্বাচনে বিশ্বাস করে। অথচ এই ভারসাম্য নষ্ট করতে চায় দিল্লী। যে কারনে পরিকল্পিত ভাবে সংঘাতের দিকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এই ফাঁদে পা দেওয়া ওয়াশিংটনের উচিত কি উচিত না,এই শুনানিতে যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা পরিষ্কার করে কিছুই বলেন নি। ফলে শুনানি একাডেমিক আলোচনার মাত্রা অতিক্রম করে নি। এতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। পুরানা কাসুন্দিই নাড়াচাড়া করা হয়েছে। পরিস্থিতি সম্পর্কে ফলপ্রসূ কোন অবস্থান গ্রহণ করতে এই শুনানি খুব একটা সহায়ক হবে না।

শুনানিতে যেসব আশংকা ব্যক্ত করা হয়েছে সেইসব নতুন কিছু নয়। শুনানির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি তাদের নীতি নির্ধারণ করবে ব্যাপারটা তাও নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সংকটে ভূমিকা রাখবার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সেটাই এই শুনানির তাৎপর্য।

যারা শুনানিতে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিয়ে আলাদা আলোচনা হতে পারে। তাদের আদর্শ এবং বাংলাদেশকে তারা যেভাবে দেখেছেন সেই জায়গা থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কী করতে পারে সেই পরামর্শও দিয়েছেন। এই অঞ্চলে সামগ্রিক ভাবে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির বিবর্তন ও পরিবর্তন ঘটছে সেই সামগ্রিক দিক বিবেচনায় না নিয়ে কারও বিশ্লেষণ বা পরামর্শ বিচ্ছিন্ন ভাবে আলোচনা করা সুবিচার হবে না। এ বিষয়ে আমি লিখছি। ফলে এখানে আর তার পূর্বানুবৃত্তি করব না। যদিও এ লেখা আগের লেখারই ধারাবাহিকতাও বটে । (দেখুব, “সুবীর ভৌমিক কি দক্ষিণ এশিয়ায় আগুন লাগিয়ে দেবেন?”)।

তবে শুনানিতে সঙ্গত কারনেই প্রচণ্ড সংঘাত ও রক্তপাতের আশোংকা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও ইসলামী জঙ্গিবাদের উত্থানের ভয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতা নেবে কিনা সেটা একটা সম্ভাব্য পরিস্থিতি হিসাবে আলোচনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে সেনাবাহিনীর নিজের এ ধরণের কোন ভূমিকা পালনের অভিলাষ নাই। তবে বাধ্য হলে এই ভূমিকা সেনাবাহিনী পালন করতেও পারে --এই ধরণেরই ইঙ্গিতই দেওয়া হয়েছে। এটা হতে পারে, নাও হতে পারে। সম্ভাবনার কথা যারা বলছেন তারা বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতকে নিছকই ক্ষমতাসীন ও বিরোধী জোটের সংঘাত আকারে দেখছেন। এটা আংশিক সত্য। আসলে বর্তমান বাস্তবতাকে বাংলাদেশের বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম হিসাবেই দেখতে হবে। জনগণের ক্ষোভ, আকুতি ও সংবেদনা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট নানা কারনে ধারণ করতে ব্যর্থ বলে এই আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহণ করছে না। কিন্তু সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করলে এর রূপ কী দাঁড়াবে আমরা জানি না। এই পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী নিজে কি ভূমিকা নিবে তা নিয়ে জল্পনা কল্পনা করাকে আমরা সঠিক মনে করি না।

তবে এই ধরনের পরিস্থিতিতে কী ধরণের রাজনীতি পরাশক্তি সমর্থিত সেনা শাসন চাইতে পারে সে বিষয় নিয়েই এখানে বরং খানিক আলোচনা করব। সেই শাসনের বাইরের রূপ বেসামরিক হোক কিম্বা নগ্ন সামরিক শাসন হোক তাতে কিছুই আসে যায় না। এই রাজনীতিকে আমরা নির্দলীয় নিরপেক্ষতার রাজনীতি বলতে পারি। জনগণ বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার বদল চায়। সকল অগণতান্ত্রিক ও গণবিরোধী শ্রেণি ও শক্তিকে পরাস্ত করে রাষ্ট্রকে নতুন গণতান্ত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায়। এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে তথাকথিত নিরপেক্ষ রাজনীতির মর্ম নিয়েই আমরা আলোচনা করব। খোদ সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য ভূমিকা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়।

দুই

বাংলাদেশের রাজনীতি সম্পর্কে যেসমস্ত লেখালিখি দেখি কিম্বা টেলিভিশানে যেসকল মন্তব্য শুনি তাকে শুরুতেই তিন ভাগে ভাগ বা বাছাই করা যায়। প্রথম ভাগে আছে দলীয় বক্তব্য বা পক্ষপাতদুষ্ট দলবাজি কথাবার্তা, আলোচনা বা দৃষ্টিভঙ্গী। রুচি বহির্ভূত ও বিবেকহীন। এরা দলবাজ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় ভাগে আছেন তারা যারা দল করেন, অথচ দলবাজ নন; নিজের রুচি ও বিবেক বিসর্জন দেন নি। দলের স্বার্থের জায়গা থেকে কেউ কথা বললে সাধারণ মানুষ আপত্তি করে না, কারন সব দলের কথা সকলেই শুনতে চায়। বাংলাদেশে দশ জনের মধ্যে সাত জনই প্রধান দুই রাজনৈতিক ধারার কোন না কোন পক্ষকে সমর্থন করেন। কিন্তু যখন আযৌক্তিক ভাবে কেউ কোন দলের পক্ষে দাঁড়ায় কিম্বা বিরোধী দলকে অন্যায় বা অরাজনৈতিক ভাবে সমালোচনা করে তখন রুচি আর বিবেকের প্রশ্ন ওঠে। নিম্ন রুচির দলবাজিতা কেউই পছন্দ করে না।

দলবাজির বাইরে বিবেক ও রুচিবোধ না হারিয়ে যারা রাজনৈতিক আলোচনা করেন তারা নিজ নিজ দলের সমর্থকদের কাছে অনেক বেশী গ্রহণযোগ্য – এতে সন্দেহ নাই। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে দলীয় রাজনীতি যদি আমাদের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটের সমাধান করতে না পারে তখন এ আলোচনাগুলোও কোন ফায়দা দেয় না। কে আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের পক্ষে ভাল বললেন বা কার কথা বিএনপি বা আঠারো দলের পক্ষে গেল তাতে রাজনীতির জেরজবরে বিশেষ হেরফের হয় না। কিন্তু তারপরও দলবাজিতা না করে কিম্বা নিজের রুচি ও বিবেক বিসর্জন না দিয়ে যারা নিজের দলের পক্ষে কথা বলেন, তাদের সাধারণ মানুষ শ্রদ্ধাই করে। নীতিবর্জিত চরিত্র পছন্দ করে এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। এই ক্ষেত্রে নীতির অর্থ হচ্ছে, কেউ যদি কোন দলের সমর্থক বলে চিহ্নিত থাকেন তাহলে তাঁর উচিত নিজের দলের প্রতি অনুগত থাকা, কিন্তু বিবেক বিসর্জন দিয়ে নয়। তিনি তার দলের পক্ষে সম্ভাব্য রাজনৈতিক যুক্তি হাজির করবেন – এটাই স্বাভাবিক। সমালোচনা থাকলে দলকে শোধরাবার জন্য সমালোচনাও করবেন। দলীয় আনুগত্য কিন্তু বিচারবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে নয় -- একেই নৈতিক অবস্থান বলেই সাধারণ মানুষ গণ্য করে। নিজ দলের পক্ষে দাঁড়াবার জন্য নীতিবান কাউকেই সাধারণ মানুষ দলবাজ বলে নিন্দা করে না। যেখানে যুক্তি খাটে না, বা দলের ভূমিকা সমর্থনের সুযোগ নাই সেখানে বাড়াবাড়িটাই সাধারণ মানুষের অপছন্দের।

বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যখন দুই দলের নেতৃত্বাধীন দুই শিবিরের রাজনীতির পক্ষে দুই ভাগ হয়ে আছে সেখানে সবচেয়ে করুণ অবস্থা হচ্ছে তাদের যারা নিজেদের খামাখা ‘নিরপেক্ষ’ গণ্য করেন। এই অর্থে যে তাদের এই ‘নিরপেক্ষতা’ কৃত্রিম। এই কৃত্রিমতা সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে, গ্রহণ করে না। নিরপেক্ষতাবাদীরা কোন আদর্শগত বা নীতিগত জায়গা থেকে অবস্থান নেন না। তাদের অবস্থান কৌশলগত সুবিধাবাদিতা। এটাতেও আছি, ওটাতেও থাকি – এই হাল তাদের। রাজনীতিতে তারা কোন নৈতিক বা আদর্শিক উপাদান যোগ করেন না। কৌশলগত কারনেই তারা মনে করেন তাদের এমনভাবে কথাবার্তা বলা উচিত যেন তাদের রঙ ধরা না পড়ে। রঙ লুকানোর কারনে তাদেরকে নিরপেক্ষ মনে হয়।

যেহেতু রঙহীন নিরপেক্ষ ভঙ্গী আদর্শগত নয় ফলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার কিম্বা রূপান্তরের জন্য তাদের চিন্তা বা পরামর্শ খুবই ভাসা ভাসাই থাকে। এদের চিন্তা জাতীয় রাজনীতির জন্য খুব ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়ায়। যেমন তাদের কথাবার্তায় এটাই নিরন্তর প্রতিষ্ঠা করা হয় যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের কারণ হচ্ছে বেগম জিয়া আর শেখ হাসিনার পরস্পরের সঙ্গে কথা না বলা। তারা জানেন ও বোঝেন যে বাংলাদেশের সংবিধানের কারনেই সকল ক্ষমতার ‘মালিক’ প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সংসদ মুলত নাম কা ওয়াস্তে একটি সভা, আদতে এই সংসদ প্রধানমন্ত্রীর খায়েসমুলক সিদ্ধান্তকে সংবিধান সম্মত করতে বা আইনে পরিণত করবার হাতিয়ার – এর বেশী কিছু নয়। তারপরও এরা বিরোধী দলকে সংসদে যাবার জন্য আবেগাপ্লূত আহ্বান জানিয়ে কাহিল হয়ে যান। সমাজের দ্বন্দ্ব সংঘাত রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে যেভাবে হাজির তার নিরসনের সম্ভাব্য পথ বা পদক্ষেপ নির্ণয় করতে হলে সংকটের গোড়ায় যাওয়া খুবই দরকার, কিন্তু সেদিকে যাবার কোন ইচ্ছা তাদের নাই। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে সংবিধানিক আমুল সংস্কার -- চাই কি রূপান্তর দরকার। এছাড়া সাংবিধানিক ভাবে প্রধানমন্ত্রীর একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা বদলাবার আর উপায় কি? নিদেন পক্ষে জাতীয় সংসদকে জাতীয় সংসদই হতে হবে, প্রধানমন্ত্রী সকল সিদ্ধান্ত জায়েজ করে নেবার জ্বী-হুজুর মার্কা দলীয় সভা হবে না। এইসব জানার পরেও নিরপেক্ষ থাকার জন্য নিরপেক্ষতাবাদীরা সারাক্ষণ বিরোধী দলকে সংসদে যাবার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। কথাটা শুনতে ভাল লাগে। সংসদে যান, সংসদে যান যা বলার সংসদে বলুন! কিন্তু একই কথা আওয়ামি লীগও বলে। বললে কোন পয়সা খরচ হয় না। বিরোধী দল সংসদে কথা বললেও এর কোন ফায়দা নাই। সিদ্ধান্ত যা নেবার শেখ হাসিনাই নেবেন। এর আগে ক্ষমতাসীন থাকার সময় বেগম খালেদা জিয়া সিদ্ধান্ত নিতেন। শেখ হাসিনার দল তখন সংসদে যেত না, এখন বিরোধী দল যায় না। এটাই স্বাভাবিক।

পঞ্চদশ সংশোধনীর পর রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি হারিয়েছে, রাষ্ট্র নতুন করে গঠন ছাড়া আর কোন পথ নাই। এই কথা তো এখন আরও বেশি বেশি করে বলতে হবে। এইসব বিষয়ে কিছু না বলে নিরপেক্ষতাওয়ালারা এক ধরনের সুশীল বা ভদ্রলোকী ভাব ধরে থাকেন। বাংলাদেশকে যদি নতুন ভাবে গঠন ছাড়া অন্য কোন উপায় না থাকে তাহলে নতুন ভাবে গঠন করবার পথ, পদ্ধতি ও পদক্ষেপের কথা বলাই তো এখন দরকার। এটাই সত্যিকারের নিরপেক্ষ রাজনৈতিক অবস্থান যা একই সঙ্গে গণমানুষের আশা আকাংখাকে ধারণ করে।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে নতুন রাষ্ট্র গড়তে চাইলে গণমানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা ইচ্ছা সংকল্প ইত্যাদি আমরা কিভাবে ধারণ করব? তার রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কি হবে? বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতিতে এই সবই মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়। দুইনেত্রীর কথা বলা কিম্বা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য নির্বাচনকালীন সরকারের ফর্মুলা বের করা প্রসঙ্গ। শেখ হাসিনা একতরফা নির্বাচনের সিদ্ধান্ত এখন নেননি, নিয়েছিলেন ২০১১ সালে যখন পঞ্চদশ সংশোধনী এনেছিলেন। তখনই তিনি জানতেন তিনি একতরফা নির্বাচনইকরবেন। সম্ভব হলে বিএনপিকে বাদ দিয়ে। তিনি এখনও তাই করছেন। এটা জানার পরও নিরপেক্ষতাবাদীরা আপোষ ফর্মুলার কথা তোতাপাখির মতো বলে যাচ্ছে। এখন নির্বাচনী দল হয়েও খালেদা জিয়ার পক্ষে বাধ্য হয়ে আন্দোলন করা ছাড়া আর কোন পথ খোলা নাই, নিরপেক্ষতাবাদীরা এই বাস্তব পরিণতির কথা বলে না। কিম্বা কথার কথা হিসাবে বললেও বিরোধী জোটের আন্দোলন যে ন্যায্য সেটা স্বীকার করে না। ফলে কার্যত তারা ক্ষমতাসীনদেরই পক্ষাবলম্বন করে। বেগম জিয়া এখনও নির্বাচনী অবস্থান থেকে তত্ত্বাবধায়কের দাবি ছাড়া আর কোন দাবি দেন নি। যদিও আন্দোলনে জনগণকে সম্পৃক্ত করবার জন্য তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা সম্বলিত সুচিন্তিত দাবির অনুপস্থিতি আন্দোলনের জন্য বিপজ্জনক। বিরোধী জোটের সঙ্গে এখানেই জনগণের প্রধান রাজনৈতিক পার্থক্য ঘটে যায় । এই দূরদৃষ্টির অভাবে আন্দোলনে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের সম্ভাবনা দ্রুত কমে যাচ্ছে। প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে কর্মসূচিতে সহিংসতা ও অর্থনীতির ক্ষতি সাধনের অভিযোগ শুনতে হচ্ছে।

নিরপেক্ষতার ভান গ্রহণের রাজনীতিটা আসলে কী? এই ক্ষেত্রে রাজনীতির দুই প্রতিপক্ষ জোটের রাজনীতি আর নিরপেক্ষতার রাজনীতির মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নাই। মূল উদ্দেশ্য আলাদা কিছু না: বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে যতোই ভাঙন ও বিকৃতি ঘটুক নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনীতির দোহাই দিয়ে তাকে টিকিয়ে রাখা। জাতীয় রাজনীতির দুই পক্ষ যা টিকিয়ে রাখতে চায়, নিরপেক্ষতাবাদীরাও তাই চায়। রাষ্ট্রের এই বিকৃত ও ভঙ্গুর পর্বের অবসান ত্বরান্বিত না করে টিকিয়ে রাখার অর্থ জনগণের দুর্দশাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করা; বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠা।

কিন্তু নিরপেক্ষতাবাদীরা দুই রাজনৈতিক পক্ষের বিরোধিতাও করে। সুস্পষ্ট ভাবেই। কেন করে সেটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এটা নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য দরকারী নয়। বরং রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ও প্রক্রিয়ার বাইরে রাজনৈতিক দলগুলোকে খারিজ করে দিয়ে তারা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরী করতে চায় যাতে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে বহাল রেখেই অরাজনৈতিক শক্তির ক্ষমতা দখল সহজ হয়। এই রাজনীতি ‘বিরাজনীতিকরণের রাজনীতি’ বলে পরিচিত। সুশীল সমাজ বা শহুরে ভদ্রলোকরা এই রাজনীতিতে তুমুল আগ্রহী। কারন এতে জাতীয় রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরী হয়।

বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সুশীল সমাজ কিভাবে পুরষ্কৃত হয়েছে আমরা দেখেছি। মূলত ৯০ দিন একটি দেশে অনির্বাচিত ও অরাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকুক সুশীল সমাজ সেটা পছন্দই করে। তথাকথিত ‘তত্ত্বাবধায়ক’ সরকার বা বিশেষ নির্বাহী ক্ষমতার ধারণা শহুরে সুশীল শ্রেণী বা ভদ্রলোকদের মজার রাজনীতি। এই রাজনীতি তাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার স্বাদ নেবার সুবিধা তৈরী করে দেয়। এই দিকটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে সুশীল সমাজের তৎপরতার পেছনে এই সুবিধাটুকু ভোগের আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার সুবাদে সুশীল শ্রেণির প্রতিনিধিরা রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর তিনটা মাস ছড়ি ঘোরাবার জন্য ক্ষমতায় যেতে পারে; এতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ ভাবে ক্ষমতা চর্চার বাহাদুরি দেখানোর ভালো একটা প্রদর্শনীও হয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ থাকার রাজনীতি মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি থেকে আলাদা কিছু নয়।

নির্দলীয় ও তথাকথিত ‘নিরপেক্ষতা’র সঙ্গে ‘তৃতীয় শক্তি’র ধারনা অঙ্গাঙ্গী যুক্ত। যারা নিরপেক্ষতার কথা বলেন তারা একই কন্ঠে তৃতীয় শক্তির কথাও বলেন। নির্দল ও নিরপেক্ষ শক্তি হিসাবে তৃতীয় শক্তির ধারণা আদতে পরাশক্তির মতাদর্শ; এই মতাদর্শ বাংলাদেশে বেসামরিক সমর্থনপুষ্ট সেনাশাসন ছাড়া ভিন্ন কোন অর্থ বহন করে না। এর কারন হচ্ছে তথাকথিত তৃতীয় শক্তি গণ-আন্দোলন গণসংগ্রামের ফল হিসাবে হাজির হয় না। রাজনৈতিক দলগুলোর অক্ষমতা ও ব্যর্থতার পরিণতি হিসাবেই ‘তৃতীয় শক্তি’ ক্ষমতায় আসে। তৃতীয় শক্তি এমন এক সেনা শাসন যা পরাশক্তির সমর্থন নিয়েই ক্ষমতা আসতে পারে। কারণ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমর্থন ও স্বীকৃতি ছাড়া এই শক্তির পক্ষে ক্ষমতায় থাকা অসম্ভব। বাংলাদেশে ক্ষমতার এই বিশেষ রূপের চর্চা আমরা এর আগে দেখেছি। সেটা সেনা সমর্থিত বেসামরিক বা সুশীল সরকার। গণমাধ্যমের একটি শক্তিশালী অংশ, বাংলাদেশের এনজিও বা বেসামরিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পরিচিত প্রতিনিধি এবং অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও ব্যবসায়ীদের একাংশকে সামনে রেখে সেনাবাহিনী নির্দলীয় নিরপেক্ষতার ফাঁকফোকর দিয়ে আবা্র ক্ষমতায় আসবে কিনা জানিনা, তবে তৃতীয় শক্তি ক্ষমতায় আসার আরেকটি বিকল্প হচ্ছে রাখঢাক না করে সেনা শাসন। একেও নিরপেক্ষতাবাদীরা কার্যত সমর্থন করবে। সেনা শাসনকে সুশীল সমাজের পেছন থেকে সমর্থন অবশ্যই একটি সম্ভাবনা।

নিজেদের নিরপেক্ষ প্রমাণ করবার জন্য যারা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর আচার আচরণের সমালোচনা করে, কিন্তু রাজনৈতিক সংকটের মর্মে প্রবেশ করে না, তাদের সম্পর্কে সাবধান হওয়া দরকার। এতোটুকু যদি বুঝি তাহলে আপাতত যথেষ্ট।

২২ নভেম্বর ২০১৩। ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২০। আরশিনগর।

 

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : মার্কিন কংরেস, শুনানি, নিরপেক্ষ, বাংলাদেশ, বাংলাদেশের রাজনীতি, ফরহাদ মজহার, Farhad Mazhar

View: 2628 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD