পিল্লাই সতর্ক করলেন...


এক

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত হাইকমিশনারের অফিসের (Office of the United Nations High Commissioner for Human Rights) কার্যক্রম, এখতিয়ার ও ভূমিকা সম্পর্কে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা কতোটা জানেন বলা মুশকিল। রাজনীতিবিদরা তাদের কর্মকাণ্ডের দায় বহন করতে না চাইলেও নিজের দেশের নাগরিকদের মানবাধিকার লংঘন করলে তার দায় আন্তর্জাতিক ভাবে এড়িয়ে যাবার সুযোগ নাই বললেই চলে। পার পেয়ে যাবার সম্ভাবনা কম। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত হাই কমশনার নাভি পিল্লাই সেটাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে মনে করিয়ে দিয়েছেন। এভাবে বলেন নি যে আপনারা ভাল ভাবে চলুন, হিংসা বিবাদ কম করুন। বরং সুনির্দিষ্ট ভাবে ধরিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ রোম চুক্তির (Rome Statutes) সদস্য রাষ্ট্র। রোম চুক্তি হচ্ছে ইনটারনেশানাল ক্রিমিনাল কোর্ট বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠিত করবার আন্তর্জাতিক চুক্তি। গৃহীত হয়েছিল ১৯৯৮ সালে এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক রাষ্ট্র এতে স্বাক্ষর দেবার পর ২০০২ সাল থেকে কাজ করতে শুরু করেছে। আজ অবধি বাংলাদেশ সহ ১২২টি দেশ এই চুক্তির অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য রাষ্ট্র (State Party) । তার মানে তারা এই চুক্তি ও আদালতের বিধিবিধান এবং তার সিদ্ধান্ত ও রায় মেনে চলবে। ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বাক্ষর করলেও ইনটারনেশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের ক্ষমতা ও এখতিয়ার মেনে নিতে সম্মত হয় নি। সেটা তারা জাতিসংঘকে জানিয়ে দিয়েছে যে, তাদের প্রতিনিধি এই চুক্তি স্বাক্ষর করলেও তাদের ওপর এর কোন আইনী বাধ্যবাধকতা থাকবে না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কোন এখতিয়ার ও ক্ষমতা মানতে তারা সম্মত নয়। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আদালত গঠিত হোক, তাতে তাদের আপত্তি নাই, তাদের কোন কাজে তারা বাধা দেবে না, কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেউ কোথাও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করল কি করলোনা সেই কার্যকলাপের ওপর কোন খবরদারির এখতিয়ার এই আদালতের থাকবে না। ভারত প্রথম থেকেই এই চুক্তি স্বাক্ষর করে নি, পার্টি বা সদস্য রাষ্ট্র হওয়া তো দূরের কথা।

চুক্তিতে সম্মতি দেওয়া (ratify) এবং আদালতের ক্ষমতা ও এখতিয়ারের পরিমণ্ডলে প্রবেশের (accede) অর্থ হচ্ছে সদস্য রাষ্ট্রের অধীন এলাকায় কোন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আপনাআপনি সেই অপরাধকে আমলে নিতে ও বিচার করতে পারবে। বাংলাদেশ চুক্তিতে সম্মতি ও আদালতের এখিতিয়ার মেনে নিয়েছে ২৩ মার্চ ২০১০ তারিখে এবং তা কার্যকর হতে শুরু করেছে ১ জুন ২০১০ তারিখ থেকে। বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইন সংশোধিত হয় ৯ জুলাই ২০০৯ তারিখে। ট্রাইবুনাল গঠিত হয় ২৫ মার্চ ২০১০ সালে। অর্থাৎ রোম চুক্তির বলে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সম্মতি ও তার এখতিয়ারের পরিমণ্ডলে প্রবেশের দুই দিন পর। নাভি পিল্লাই বাংলাদেশকে সে কারনেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে বাংলাদেশ রোম চুক্তির সদস্য রাষ্ট্র। তারা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এখতিয়ার মানতে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ।

রোম চুক্তির কথা মনে করিয়ে দিয়ে সুনির্দিষ্ট ভাবে তিনি বলেছেনঃ “In other situations, we have seen cases of political or election related violence where the perpetrators of such acts - including political leadership - have faced prosecution”। এটা কূটনৈতিক ভাষায় সাবধান ও সতর্ক করে দেওয়া। সহজ বাংলায় বোঝার মতো করে অনুবাদ করলে দাঁড়ায়: এর আগে অন্য অনেক দেশে রাজনীতি বা নির্বাচন কেন্দ্র করে সহিংসতার জন্য অভিযুক্তদের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। রাজনৈতিক নেতারাও বাদ যান নি। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদের ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম হবে এমন ভাববার কোন কারন নাই। বেশ কড়া কথা। কথাটা সকলেরই ভেবে দেখা দরকার।

অনেকে বলছেন, পিল্লাই সম্ভবত কেনিয়ার ছয় মন্ত্রীর কথা বলছেন। তাদের মধ্যে আছে ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার উহুরু কেনিয়াত্তা, শিল্পমন্ত্রী হেনরি কগসে, শিক্ষা মন্ত্রী উইলিয়াম রুটো, ক্যাবিনেট সেক্রেটারি ফ্রান্সিস মুতাহাওরা, পুলিশ কমিশনার মহাম্মদ হোসেন আলী এবং একজন আমলা জোসুয়া আরব সাং। কেনিয়ার এরা ‘ওকাম্পো সিক্স’ নামে খ্যাত। ক্ষমতায় থেকে এরা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে যাতে কমপক্ষে ১২০০ মানুষের জীবন ঝরে গিয়েছে। রাজনৈতিক নেতা, আমলা ও পুলিশ অফিসার কেউই দায় এড়াতে পারে নি। বাংলাদেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন তারাও দায় এড়াতে পারবেন এটা ভাবার কোন কারন নাই।

সংঘাত ও সহিংসতায় প্রাণহানি কোনভাবেই গ্রহণ করা যায় না। পিল্লাই উল্লেখ করেছেন যে গাড়ি থেকে আরোহীদের নেমে যাবার বা আত্মরক্ষার সুযোগ না দিয়ে আগুন দেওয়া হচ্ছে। আগুনে মানুষ পুড়ছে, মানুষ মরছে। এভাবে নিরীহ মানুষের মৃত্যু কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই ধরণের ঘটনা ঘটছে প্রধানত ঢাকায়। যারা আন্দোলন করছেন তারাও এই দায় থেকে মুক্ত নন। কিন্তু কারা আসলে এভাবে আগুনে পুড়িয়ে মারছে তার তদন্ত হওয়া দরকার। বিরোধী দল বার বার বলছে এই ধরণের নাশকতার সঙ্গে তারা জড়িত নয়। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তারা সরকারকে অভিযুক্ত করছে। আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকেও বারবার একই কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু সরকারপক্ষীয় গণমাধ্যমগুলো তথ্য প্রমাণ ছাড়া বিরোধী দলকেই দায়ী করতে চাইছে। কিন্তু কোন তথ্যই শেষ পর্যন্ত গোপন থাকে না। গোপন রাখা যায় না।

দুই

গত কয়েক দশকে রাষ্ট্র ও সরকারের ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণায় বড়সড় পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্ববাস্তবতা এমন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিম্বা ন্যাটো বাহিনী অন্যায় যুদ্ধে কতো লক্ষ মানুষ হত্যা করল তাতে কিছুই আসবে যাবে না, কিন্তু বিশ্বব্যবস্থার প্রান্তসীমায় বাংলাদেশের মতো একটি দেশের রাজনীতিবিদরা যদি তাদের দেশের জনগণের নাগরিক ও মানবিক অধিকার ভঙ্গ করেন, তাহলে লিবিয়া বা সিরিয়ার মতো তাদের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠানো হতে পারে। সেটা হতে পারে শান্তি বাহিনী, কিম্বা আন্তর্জাতিক শক্তি সমর্থিত সশস্ত্র পেশাদার সৈনিক – তথাকথিত বিদ্রোহী, যাদের কাজ ক্ষমতাসীনদের পতন ঘটানো। আন্তর্জাতিক পরাশক্তি বাংলাদেশকে কিভাবে মূল্যায়ন করছে তার ওপর সেইসব নির্ভর করে। একে বলা হয় মানবাধিকার রক্ষার জন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ। এর একটা মধুর পরিভাষা আছে ‘হিউমেনিটারিয়ান ইনটারভেনশান’। জাতিসংঘের হিউমেন রাইট হাইকমিশনার নাভি পিল্লাইয়ের সতর্ক বাণী শুনে মনে হচ্ছে আমরা বিপদের সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছি।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির গতিবিধির ওপর প্রখর নজর না রাখলে বাংলাদেশ আসলেই গভীর খাদে নিক্ষিপ্ত হতে পারে। এই কথা আমি আজ নয়, কম পক্ষে গত এক দেড় দশক ধরে বলে আসছি। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এদেশে রাজনীতি করতে হলে প্যালেস্টাইন, ইরাক, আফগানিস্তান, কসোভো, চেচনিয়া, তিউনিসিয়া, মিশর, ইরান, পাকিস্তান সহ মুসলিম দেশগুলোর আভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব সংঘাতের চরিত্র ও ফলাফল গভীর মনোনিবেশের সঙ্গে পাঠ করা দরকার। বিশেষত ইসলাম সম্পর্কে বদ্ধমূল বিরূপ ধারণা, মুসলিম দেশ ও মুসলমানদের প্রতি পাশ্চাত্যের সাধারণ বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গী এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সংঘাতে পরাশক্তির রাজনৈতিক ও সামরিক ভূমিকা সম্পর্কে সজাগ, পরিপূর্ণ ও প্রাজ্ঞ ধারণা ছাড়া বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর সংস্কার কিম্বা উন্নতির রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়া কঠিন। এতোই কঠিন যে রীতিমতো হিমালয় মাথায় নিয়ে চলার শামিল। কিন্তু কঠিন হলেও কখনই অসম্ভব ছিল না, এখনও নয়। কিন্তু আমরা সেই রাজনীতির বিকাশ চাই নি।

আমরা সমাজের বিভাজন ও বিভক্তির কারণ নিরপেক্ষ ও নির্মোহ জায়গা থেকে বোঝার চেষ্টা করিনি। পুরা ক্ষতকে আরো বাড়তে দিয়েছি। একাত্তরে রক্তাক্ত ও তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে ধর্ম বিশেষত ইসলামের রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদেরখুবই সঙ্গত ভীতি আছে। কিন্তু একে মোকাবেলা করবার সঠিক পথ কি হবে তা নিয়ে মুক্ত ভাবে আলাপ আলোচনার পরিবেশ আমরা আজও তৈরী করতে পারে নি। আত্মপরিচয়, ধর্ম ও রাজনীতির জটিল সম্পর্ক বোঝা ও তাদের দ্বন্দ্ব মীমাংসার জন্য সমাজে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত তৈরীর জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞার দরকার আমরা তা অর্জন করা দূরে থাক, তার প্রয়োজনীয়তাটুকুও বুঝি নি। এখনও বুঝি না। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে।

তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গত কয়েক দশকে রাষ্ট্রের ‘সার্বভৌমত্ব’ সম্পর্কে ধারণার ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন। একদিকে রাষ্ট্র নিজে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তার সার্বভৌম এখতিয়ারে ছাড় দিচ্ছে, নিজের এখতিয়ারের পরিমণ্ডল সংকীর্ণ করে আনছে কিম্বা এখতিয়ার তুলে দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার হাতে। তদুপরি টিকফার মতো দ্বিপাক্ষিক চুক্তি তো আছেই। যার অর্থ হচ্ছে ‘রাষ্ট্র’ ও ‘সরকার’ বলতে আমরা এতকাল যা বুঝে এসেছি সেই সার্বভৌম রাষ্ট্র আর সরকার আর নাই। অর্থনৈতিক ক্ষেত্র থেকে রাষ্ট্রের সার্বভৌম এখতিয়ার বহুজাতিক কোম্পানি ও পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের যুগে অনেক আগেই গত হয়েছে। রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ভাবে যেসকল বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বন্ধনে নিজেকে বন্দী করেছে তার বাধ্যবাধকতার কারনে চাইলেও কেউ গণমানুষের স্বার্থে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে কিনা সন্দেহ। সবচেয়ে সৎ ও জনপ্রিয় কাউকে ক্ষমতায় বসালেও সেটা ততোটুকুই সম্ভব যতোটুকু পুঁজির নৈর্ব্যক্তিক লজিক বা ‘অর্থনৈতিক’ ক্ষমতার বিরুদ্ধে জনগণের ‘রাজনৈতিক’ ক্ষমতা তৈয়ার করা যায়। জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতাই আসলে সার্বভৌম ক্ষমতা, যার আরেক নাম গণশক্তি। তার মানে হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এই কালপর্বে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা নতুন ভাবে গঠন না করা গেলে অর্থনৈতিক বিকাশও সম্ভব নয়। আজ পর্যন্ত যতোগুলো দেশ পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিগড় কিছুটা ভাঙতে পেরেছে তারা পরাশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গণক্ষমতার চর্চা করেছে। অর্থাৎ নতুন বাস্তবতায় বিদ্যমান রাষ্ট্র বহাল রেখে অত্যন্ত সৎ ও যোগ্যদের ব্যক্তিরা ক্ষমতায় আসলেই জনগণের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন সম্ভব হয় নি। দরকার হয়েছে পরাশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবার শক্তি ও সাহস, জনগণের সার্বভৌম শক্তির ওপর নির্ভরশীল দৃঢ়চিত্ত নেতৃত্ব।

এই হোল অর্থনৈতিক দিক। অন্যদিকে ‘সার্বজনীন মানবাধিকার’ সংক্রান্ত ঘোষণা, সনদ, চুক্তি বা প্রস্তাবে স্বাক্ষর ও সম্মতি দিয়ে রাষ্ট্র মেনে নিয়েছে নাগরিকদের নাগরিকতা ও আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার তারা মেনে চলবে। তার নিশ্চ্যতা বিধান করতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু সেই নিশ্চয়তা বিধানের দায় রাষ্ট্রের একচেটিয়া নয়। অর্থাৎ নাগরিক অধিকার মানব কি মানবোনা কিম্বা মানলে কতোটুকু মানব সেইসব এখতিয়ার পুরাপুরি রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত নয় আর। বরং রাষ্ট্র কিম্বা ক্ষমতাসীন সরকার আদৌ তার নাগরিকদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষা করছে কিনা সেটা আন্তর্জাতিক ভাবে দেখভাল করা যাবে রাষ্ট্র তা মেনে নিয়েছে। আসলে দেখভাল করবে আন্তর্জাতিক শক্তি এবং সেই শক্তির তরফে জাতিসংঘের মানবাধিকার রক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ধনি ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের হাত মোচড়ানো কঠিন, তাদের ওপর জোর খাটানো অসম্ভব। কিন্তু ছোট ও দুর্বল দেশকে শায়েস্তা ও নিয়ন্ত্রণ করার জন্য দেখা যায় শক্তিশালী দেশগুলো প্রায়ই ‘হিউমেনিটারিয়ান ইণ্টারভেনশান’-এর অস্ত্র ব্যবহারে সদাই ব্যগ্র থাকে। রেজিম চেইঞ্জ বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সরকার উৎখাত বা বদল, কিম্বা ‘নেশান বিল্ডিং’ বা যুদ্ধে একটি জনগোষ্ঠিকে বিধস্ত ও ধ্বংস করে দিয়ে তাদের ‘জাতি’ হিসাবে গড়বার তামাশা এই হস্তক্ষেপের নীতি ও কৌশলেরই সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী জড়িত। আমরা তো চোখের সামনেই দেখছি কিভাবে অন্য দেশের নাগরিকদের ‘মানবাধিকার’ রক্ষার জন্য পরাশক্তি সামরিক অভিযান চালিয়েছে, সরকারের পতন ঘটিয়ে তাদের সরকার বসিয়েছে, তারপর যুদ্ধবিধ্বস্ত সমাজকে তাদের মতো করে রাজনৈতিক ভাবে গঠন করবার জন্য নেশান বিল্ডিং-এ তৎপর হচ্ছে। যদি এই বাস্তবতা আমরা বুঝি তাহলে নাভি পিল্লাই-এর বক্তব্যকে গভীর দূরদৃষ্টি নিয়ে পাঠ করতে হবে। এখন, দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাই আশু কর্তব্য হয়ে উঠেছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের এই হুঁশিয়ারির রাজনৈতিক তাৎপর্য কি সেটা এই মুহূর্তে নির্ধারণ করা যাবে না। এর মধ্য দিয়ে তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকেও সতর্ক করলেন, সজাগ হতে বললেন। জাতিসংঘ কিছু করুক বা না করুক, বাংলাদেশের পরিস্থিতি সরাসরি এখন দিল্লির ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে আন্দোলন এখন বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দিল্লির হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সংগ্রামে রূপ নিচ্ছে। এ লড়াই আসলে সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হতে চলেছে। ভারতের পত্রপত্রিকায় ক্রমাগত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচারণা চলছে। তাদের লেখালিখি থেকে বোঝা যায় ভারতের শাসক শ্রেণি বাংলাদেশের জনগণ কাকে নির্বাচিত করতে চায় বা চায় না সেটা তাদের কাছে বিবেচ্য নয়, তারা যেভাবেই হোক শেখ হাসিনাকেই ক্ষময় বহাল রাখতে চায়। যার কুফল আমরা ভোগ করতে শুরু করেছি। জনগণের আত্মমর্যাদা বোধ ও স্বাধীন সত্তা আরও অপমানিত হলে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে শুধু দিল্লীর নয় আন্তর্জাতিক মাথাব্যথার কারন হবে। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দিল্লির হস্তক্ষেপ বন্ধ করাই এর প্রাথমিক সমাধান। নইলে এ লড়াই চরিত্রের দিক থেকে সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে রূপ নিতে বাধ্য।

নবনেথেম “নাবি” পিল্লাই মানবাধিকার কর্মীদের কাছে পরিচিত ব্যাক্তিত্ব। তিনি তামিল, কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষ। দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টে তিনিই প্রথম নারী বিচারক, যিনি বর্ণে সাদা নন। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে (ইনটারনেশানাল ক্রিমিনাল কোর্টে) তিনি বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের কাছে তিনি তখন থেকেই পরিচিত। রোয়ান্ডার গণহত্যা বিচারের জন্য গঠিত ইনটারনেশানাল ক্রিমিনাল ট্রাইবুনালের তিনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের হাইকমিশনার হিসাবে তিনি চারবছরের জন্য যোগ দিয়েছিলেন ২০০৮ সালে; মেয়াদ ২০১২ সালে শেষ হয়েছে, কিন্তু তারপর আরও দুই বছরের জন্য তাঁর দায়িত্বের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

নবনেথেম “নাবি” পিল্লাই-এর সতর্ক বাণী আমরা ইতিবাচক হিসাবেই নিচ্ছি। বাংলাদেশের জনগণ একে ইতিবাচক নজরদারি হিসাবেই দেখবে। কিন্তু একই সঙ্গে এই আশংকার কথাও তাঁকে জানিয়ে দেওয়া দরকার যে এই সতর্ক বাণী বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক নজরদারি্র অধীনে নিয়ে গিয়ে পরাশক্তির হস্তক্ষেপের শর্ত তৈরি করার পদক্ষেপ যেন না হয়। সত্যকার অর্থেই তাঁর হুঁশিয়ারি যেন মানবতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে যারা অপরাধ করছে তাদের জন্য হুঁশিয়ারি হয়।

কিন্তু তা যেন কোন ভাবেই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর কোন আঘাত না হয়। এই আশাই করি।

২ ডিসেম্বর ২০১৩। ১৮ অগ্রহায়ন ১৪১২০। আরশিনগর।

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।