দুই নেত্রীর ক্ষমতার লড়াইয়ে যোগ হয়েছেন রাজনীতির ‘অবলা’


ফরিদা আখতার || Tuesday 17 December 13

দেশের মধ্যে হানাহানি, সহিংসতা, অরাজকতা, হিংসা-বিদ্বেষ চলছে আগামি দশম সংসদীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে। সবাই দোষারোপ করছেন দুইটি প্রধান দলের দুই নেত্রীকে। তাঁরা হলেন শেখ হাসিনা আর খালেদা জিয়া। বলা হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে যে বিরোধ তারই প্রতিফলন ঘটছে সারা দেশে। এই কথা আমার নয়, নিরানব্বই দশমিক নয় ভাগ পুরুষ এই কথাই বলে। মেয়েদের কথা ভিন্ন। সমাজ অনেক বড় ব্যাপার। সেখানে সমাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ধর্ম, চিন্তা চেতনা, শিল্প সাহিত্য বহু কিছু নানান ভাবে নানান দিক থেকে কাজ করে। বিরোধ সমাজের মধ্যে, সেই বিরোধই রাজনৈতিক বিরোধ হয়ে বিষফোঁড়ার মতো পেকে ফেটে বেরুচ্ছে। মেয়েদের জন্য দুর্ভাগ্য হোল সেই বিরোধ হাজির হয়েছে দুই নেত্রীর বিরোধ হয়ে। রাজনীতি মীমাংসার অতীত হয়ে ওঠায় মেয়েরা উৎকন্ঠিত। কারণ পরিবারের দায় তারা বোধ করে। পুলিশের গুলিতে মরুক, কিম্বা হরতালকারীদের কর্মসূচির কারনে -- যে মানুষটি মারা যায় বা আহত হয় তা কারো না কারো সন্তান, ভাই, স্বামী কিম্বা পরিবারের কেউ। পরিবারের প্রতি মেয়েরা অতিরিক্ত দায় বোধ করে বলে আধুনিক নারীরা এই মূল্যবোধগুলোর প্রতি কখনও সঙ্গত, কিন্তু অধিকাংশ সময় অযৌক্তিক কারণে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করে। কিন্তু সমাজ এই ধরণের অদৃশ্য পারিবারিক ক্ষেত্রগুলোতে বন্ধনের মুহুর্তগুলোতে ধরে রাখে বলেই এক সময় সমাজ আবার দাঁড়ায়। তাই বলা হয় পুরুষতন্ত্র ভাঙতে জানে, গড়তে জানে না। যখন গড়নের গুণ দেখা যায় সেটা পুরুষের মধ্যে লক্ষ্যণীয় হলেও সেটা ভাঙনের বিপরীত অতএব নারীমূলক বলেই তা সার্থক হতে পারে।

সহিংসতা ও ভাঙনের রাজনীতিতে বিরক্ত হয়ে উঠছে মানুষ এই ধরণের নেতৃত্বের প্রতিও। মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই, তবুও মানুষ মেনে নিতো যদি এর মধ্যে গড়বার রাজনীতি থাকতো, কোন আদর্শ থাকতো যা নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখাতে পারে। কিংবা থাকতো জনগণের প্রতি কোন প্রকার দায়িত্ববোধ।

আজ সে কথা বেশী বলবো না, কারণ এই বিচার বিশ্লেষণ অনেকেই করছেন। আমার মতো একজন সাধারণ নাগরিক আর কতটুকুই বা যোগ করতে পারবে। জনগণ নির্বাচন নিয়ে শংকিত থাকলে তাতে কী? নির্বাচন কমিশন তার কাজ করেই যাচ্ছে সরকারকে সন্তুষ্ট করে, ১৫১টি আসনে একক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। বাহ। শুনতে মনে হয় খুব ভাল লাগছে। কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই সরকার গঠনে যাদের দরকার তাঁরা প্রায় সবাই নির্বাচিত হয়ে যাচ্ছেন। এঁরা নির্বাচিত হচ্ছেন জনগণের ভোটে নয়, দলীয় মনোনয়নের কারণে। এদের মধ্যে এমন অনেকে আছেন যাঁদের দলীয় লোক ছাড়া জনগণ ভোট দিত কিনা সন্দেহ, তারাও নির্বাচিত! অন্য দল এই নির্বাচন মানে না বলে প্রার্থী দেয় নি, তাই তারা একক প্রার্থী, অতএব নির্বাচিত। তাহলে কি এই ১৫১টি আসনের ভোটারদের নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচন করা থেকে বঞ্চিত করা হোল না? এই ১৫১ জন প্রার্থী কি নিজেদের জনপ্রতিনিধি বলে দাবী করতে পারবেন?

যখন আমরা এই সব বিষয় নিয়ে ভাবছি আর হাসিনা-খালেদার রাজনীতির সমালোচনা করছি ঠিক তখনই আর একটি নাম টেলিভিশনের স্ক্রলে দেখা যাচ্ছে, এবং সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে, সেই নাম হচ্ছে রওশন এরশাদ। দুই নেত্রীর নামের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনে যুক্ত হয়েছে আর একটি নারীর নাম। বর্তমানে মনে হচ্ছে তিনি খুব শক্তিধর একজন মানুষ। একশত একান্ন জন বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, তার মধ্যে নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ১৩২টি আসন, জাসদ ৩টি এবং ওয়ার্কার্স পার্টি ২টি এবং জাতীয় পার্টি মঞ্জু ১টি আসন (সাইকেল মার্কায়) এবং জাতীয় পার্টি (এরশাদ) ১৮জন। সংসদ হতে হলে বিরোধী দল চাই কিন্তু বড় বিরোধী দল যাদের নিজেদেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করার পরিস্থিতি আছে, সেই বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে আসবে না বলে যে আন্দোলন করছে তাতে সরকার বিচলিত নয়। বিএনপির প্রতীক “ধানের শীষ”। সরকার এখন আর তাদের তোয়াক্কা করছে না। তারা নৌকা নিয়ে পার হয়ে যাবে, তাতে ধান থাকুক বা না থাকুক। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ধান না হলেও ধান চাষ করার জন্য যা লাগে সেই ‘লাংগল’ তো অবশ্যই লাগবে। কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরি আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি সম্পর্কে খুব মুগ্ধ হলেও শেষ পর্যন্ত লাংগল নিয়ে টানাটানি করতে দেখা যাচ্ছে সরকারকে। আর সেখানেই আবির্ভুত হয়েছেন এই নারী, যার নাম রওশন এরশাদ।

হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ রাজনৈতিক ডিগবাজী খান বলে অনেক বলাবলি ও লেখালেখি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এরশাদ চমক দিয়ে দিলেন নির্বাচনে না যাবার এবং সর্বদলীয় সরকার থেকে পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়ে। কিন্তু তার আগের ডিগবাজীতে ইতিমধ্যে তাকে ত্যাগ করেছেন দলের একটি অংশ, কাজী জাফরের নেতৃত্বে। তবুও এখন পর্যন্ত এরশাদকে অনড় দেখা যাচ্ছে।

এরই মধ্যে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশের কয়েকজন নারী কূটনৈতিক সফর করে গেছেন। একমাত্র জাতিসংঘ একজন পুরুষ পাঠিয়েছে কিন্তু তিনি বিফল হয়ে মান বাচাবার হাসি মুখে নিয়ে ফিরে গেছেন। তবে উল্লেখ করার বিষয় হচ্ছে প্রতিবেশী দেশের এক নারী একদিনের সফরে এসে তার দেশের ক্ষমতা দেখাবার জন্যে এহেন নেতা-নেত্রী নাই (যার সাথে নির্বাচনের সংশ্লিষ্টতা আছে) তিনি দেখা করেন নি। এরশাদের নির্বাচনে না যাবার ঘোষণা তাকে বাধ্য করলো এরশাদকে একটু সরাসরি জানিয়ে দেয়া যে নির্বাচন না করলে তো দেশ মৌলবাদী হয়ে যাবে। এরশাদ তাঁর কথা শুনলেন না। মিডিয়া অপেক্ষা করছে কখন এরশাদ আবার ঘোষণা দেন হাসিনার কথা মতোই নির্বাচন করবেন, কিন্তু সেই ঘোষণা আসলো না। এরপর এরশাদ বারে বারে মিডিয়ার সামনে এসে বলতে থাকেন, ‘এই পাতানো নির্বাচনে যাবো না, যাবো না, যাবো না’।

সাধারণত বলা হয়, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বড় দল হলেও এখানে সিদ্ধান্ত হয় ‘একজনে’র কথায়; হাসিনা এবং খালেদার কথাই শেষ কথা। কিন্তু জাতীয় পার্টিও কি তাই নয়? এখানেও পার্টি চেয়ারম্যানের কথাই শেষ কথা। অমান্য করলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দলের মধ্যে দেশের স্বার্থে বা নীতিগত প্রশ্নে কাজী জাফরকে ভিন্ন অবস্থান নিতে দেখা গেলেও এবার দলের মধ্যে ভিন্ন মত সুবিধাবাদিতার প্রশ্নে কিংবা হয়তো সরকারের চাপে হচ্ছে। তবুও পার্টি চেয়ারম্যান যা বলবেন তাই হবে। তাহলে উপায় হচ্ছে এরশাদকে সামিয়িকভাবে হলেও পার্টি চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে রেখে অন্য কাউকে বসানো যার কথাই শেষ কথা হবে। তিনি কে? রওশন এরশাদ।

এরশাদ পাতানো নির্বাচন করবেন না, কিন্তু তার স্ত্রী রওশন এরশাদ, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, জিয়াউদ্দিন বাবলু ভিন্ন আচরণ করছেন। তাঁরা ক্ষণস্থায়ী নির্বাচন কালীন সর্বদলীয় সরকারের মায়া ত্যাগ করতে পারছেন না। পতাকাবাহী গাড়িতে চড়ার মজাই আলাদা। তাই তাঁরা রওশন এরশাদকে ঘিরে আর একটি ক্ষমতার বলয় তৈরী করেছেন, যেটা এরশাদের আপন ভাইকে দিয়ে করা যায় নি।

রওশন এরশাদ রাজনীতিতে নতুন নন। স্বৈরশাসক হিশেবে এরশাদ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাঁকে ফার্স্ট লেডি হিশেবে সবাই এরশাদের মতোই ভয় পেতো। তার একটি অফিস ছিল, কার্যক্রম ছিল। কাজেই ক্ষমতার রাজনীতি তিনি ভালই বোঝেন। সর্বদলীয় সরকারে তাঁকে স্বাস্থ্য মন্ত্রী করায় অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তবে এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রী হিশেবে নন, আগামি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণের জন্য তিনি খুব গুরুত্ব পুর্ণ হয়ে উঠেছেন। এরশাদ কার্যত বন্দী, তাই রওশন এরশাদের বাড়িতে নেতাদের আনাগোনা বেড়েছে। সেখান থেকে বেরিয়ে একেকজন একেক কথা বলছেন। তিনি নিজে ‘অবলা’ নারী হয়ে বসে আছেন। একবার মিডিয়াতে এসে বলে দিলেই হয় আসলে তিনি কি করছেন! এরশাদ অসুস্থ না হয়েও সিএমএইচ হাসপাতালে বন্দী, আর রওশন এরশাদ বন্দী না হয়েও নিজ ঘরে অসুস্থ ঘোষণা দিয়ে বসে আছেন। যারা এই অবস্থার সুবিধা নিয়ে নির্বাচনী দৌড়ে আছেন তাঁরা রওশন এরশাদের অনুসারী বলে নিজেদের দাবী করছেন। তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না, এই প্রশ্নের উত্তরে দলের মহা সচিব রুহুল আমীন হাওলাদার বলছেন, “রওশন এরশাদ দলের চেয়ারম্যানের স্ত্রী। ওনাকে তো আমরা শাসন করতে পারি না। ওনার বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত যা নেবার চেয়ারম্যানই নেবেন” [সমকাল, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৩]। অর্থাৎ দুই সবাক নারীর সাথে ক্ষমতার রাজনীতিতে এখন যুক্ত হয়েছেন যে নারী, তিনি ‘অবলা’। তাঁর বিরুদ্ধে দলের চেয়ারম্যান সিদ্ধান্ত দেবেন কিন্তু তা হবে স্বামী হিসেবে। পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতির এই চরম খেলা দেখার জন্যেই আমরা এখন বসে আছি।

নির্বাচন হবে কি হবে না, সে বিষয়ে আমরা সবাই উদ্বিগ্ন, কিন্তু তার পাশাপাশি এই সব খেলা কোন সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বলতে আমরা যা বুঝি এটা সে ক্ষমতায়ন নয়। পুরুষতন্ত্রের খেলায় নারীকে গুটি বানানো হচ্ছে।

খালেদা হাসিনার সাথে রওশন এরশাদকে যোগ করে তিন নেত্রী বলা যাচ্ছে না, বড় জোর বলতে পারি দুই যোগ এক। তবে পুরুষতন্ত্রের খেলায় গুটি হয়ে সকলে নারী আন্দোলনের অবমাননা করবেন এটা আশা করি না।

জনগণের ভোটের অধিকার দিন। আমরাই গুটি ঠিক করে দেবো।