‘এক এগারোর কুশীলবরা আবার সক্রিয়’ - শেখ হাসিনা


ফরহাদ মজহার || Sunday 05 January 14

শেখ হাসিনা দারুন! তাঁর দলের সন্ত্রাসীরা পুলিশের সহায়তায় যখন লাঠি হাতে প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের ওপর চড়াও কিম্বা সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে পুলিশের প্রশ্রয়ে গেইট ভেঙে ঢুকে আইনজীবীদের নির্দয় ভাবে লাঠি দিয়ে পেটাচ্ছে, আর পেটাচ্ছে নারী আইনজীবীদের -- শেখ হাসিনা তখন বলছেন, “এক এগারোর কুশীলবরা আবার সক্রিয়। এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী অসাংবিধানিক সরকারকে ক্ষমতায় আনতে চান”। তখন তাঁকে বেশ গুরুগম্ভীর বুদ্ধিজীবীর মতোই মনে হচ্ছিল।

দারুন যে খালেদা জিয়াকে কোন কর্মসূচীই পালন করতে হয় নি। তিনি ‘সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র’ রক্ষার জন্য অভিযাত্রার ডাক দিয়ে যে রাজনৈতিক ফল পাবার আশা করেছিলেন তারচেয়ে দশগুন বেশী ফল পেয়ে গিয়েছেন ক্ষমতাসীনদের কারনে। তিনি আন্দোলনের ধরণ বদলাতে চেয়েছেন, কারন ধর্মঘট ও অবরোধ কর্মসুচী পালন করতে গিয়ে যে অনিবার্য সহিংস পরিস্থিতি তৈরী হচ্ছিল বারবার সেই অবস্থা থেকে তিনি বেরিয়ে আসতে চেয়েছেন। খালেদা জিয়া যেখানে হরতাল বা অবরোধ ধরনের কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন, সেখানে শেখ হাসিনা বিরোধী দলের চেয়েও আরও কড়া অবরোধ আরোপ করলেন। খালেদা জিয়ার কর্মসূচিতে কিছু কিছু গণপরিবহন নামত, রিক্সা টেম্পু চলত, মানুষ হাঁটত। এবার হাঁটতেও বাধা দিয়েছে পুলিশ। দুর্দান্ত অবরোধ কর্মসূচী পালন করলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। খালেদা জিয়া তাঁর গণতন্ত্রের অভিযাত্রা চালিয়ে যাবেন, শেখ হাসিনার অবরোধও চলবে। শেখ হাসিনার আইন শৃংখলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী ক্যাডাররা এই দিক থেকে খুবই সফল। এতোটাই সফল যে বেগম খালেদা জিয়া তাঁর বাসা থেকে বেরুতেই পারেন নি। তাঁকে পুলিশ গেইটের বাইরে এক কদমও অগ্রসর হতে দেয় নি। শেখ হাসিনা যে-ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তুলনায় বাকশালী শেখ মজিবর রহমান শুকনা আমসত্ত্বের মতো প্রাচীন হয়ে গিয়েছেন।

ফলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বিরোধী দলের কর্মসূচি ‘ব্যর্থ’ বললেও তাতে বিশেষ কিছুই আসে যায় না। ব্যাপারটা কর্মসূচির সফলতা-ব্যর্থতার মামলা নয়। কর্মসূচি দেওয়া সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ফল লাভের জন্য। সেই দিক থেকে খালেদা জিয়ার জয়ই হয়েছে। খালেদা জিয়ার জয় হয়েছে যদি সেই কূটতর্কে যেতে না চাই তাহলে নিদেনপক্ষে এটা অনায়াসেই মেনে নেওয়া যায় যে ২৯ তারিখে গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় ক্ষমতাসীনদের নির্লজ্জ পরাজয় হয়েছে। আজ একই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। থাকুক। এই ফাঁকে আমরা এক এগারোর কুশীলবদের কথা বলি।

শেখ হাসিনা বলেছেন, “এক এগারোর কুশীলবরা আবার সক্রিয়। এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী অসাংবিধানিক সরকারকে ক্ষমতায় আনতে চান”। কারেক্ট। কিন্তু তারা শুধু এখন সক্রিয় হয়ে উঠেছে তা নয়, তারা বরাবরই সক্রিয় ছিল। আমাদের মনে আছে এক এগারোর সময় ক্ষমতাসীন বিএনপির বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার সক্রিয়তার পাশাপাশি এখনকার কুশীলবরাই সক্রিয় ছিলেন। শেখ হাসিনাও এক এগারোর সরকারকে স্বাগত জানিয়েছিলেন, এটা ভুলে গেলে চলবে না। এক এগারোর কুশীলবরা দাবি করেছিলেন তাঁদের কারণেই সেনা সমর্থিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এই সফলতায় তাঁরা গর্ব প্রকাশ করেছিলেন। সন্দেহ নাই সেই কুশীলবরা বাংলাদেশে বহাল তবিয়তেই আছেন। তারা তাঁদের সক্রিয়তা মোটেও কমান নি। এটাও শেখ হাসিনাকে ভুলে গেলে চলবে না যে এক এগারোর কুশীলবদের সক্রিয়তার সাড়ে ষোল আনা সুফল ভোগ করেছেন তিনি নিজে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর জয় এক এগারোর কুশীলবদের ভূমিকা ছাড়া কখনই সম্ভব হোত না।

এক এগারো সম্পর্কে সাধারণ অনুমান হচ্ছে এটা একটা ষড়যন্ত্র। রাজনীতিতে সবসময় ষড়যন্ত্র থাকে, এই অর্থে যে কাউকে না কাউকে কিছু ঘটনা ঘটাতে হয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র দিয়ে রাজনীতি বোঝা অসম্ভব। আসলে যখন রাজনীতির গতি প্রক্রিয়া কেউ আর ব্যাখ্যা করতে পারে না তখন সেই রহস্যময় জায়গাটাকেই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে বুঝ দেবার শর্টকাট পথ গ্রহণ করা হয়। এক এগারোকে বুঝতে হলে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে নয়, বুঝতে হবে বাস্তব অবস্থার বাস্তব বিশ্লেষণ দিয়েই।

বাংলাদেশের রাজনীতির একটা সংস্কার দরকার এর পক্ষে একটা জনমত আছে। সেই সংস্কার শুধু রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সংস্কার নয়, জনগণের দিক থেকে তাগিদটা খোদ রাষ্ট্রের সংস্কার, এমনকি সম্ভব হলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর। এই আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ রয়েছে বলে সেই অভাবের জায়গায় 'এক এগারোর কুশীলব'রা তৎপর থাকতে পারে।  তাদের পক্ষে সমাজে শহুরে মধ্যবিত্তের সমর্থনের এই জায়গাটা সে কারনে বারবার তৈয়ার হয়। কিন্তু এক এগারোর কুশীলবদের রাজনীতি জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ নয়, বিদ্যমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখবার জন্য সে আকাংখাকে বিপথগামী করা। বুঝতে হবে তারা আসলে ঠিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক রূপান্তরে আগ্রহী নয়, এমনকি সংস্কারেও নয়। সংস্কার করতে হলেও বাংলাদেশের বাস্তবতায় নিদেনপক্ষে এমন এক গণক্ষমতা তৈয়ার করা দরকার যা সংস্কার করতে সক্ষম। এই কাজটাও কম কঠিন বা কম রেডিকেল নয়। কিন্তু সে গণক্ষমতা তৈরিতে তারা রাজি নয়। ফলাফল দাঁড়ায় রূপান্তর দূরে থাকুক, তাদের সুশীল রাজনীতি সংস্কার করতেও অক্ষম; আসলে এক এগারোর কুশীলবরা কোন সংস্কারেই আগ্রহী নয়। তাদের বাগাড়ম্বর ভূয়া বিজ্ঞাপনের মতো, বিশ্বাস করলে ঠকতে হয়। বকোয়াজি কোন কাজের কথা নয়।

বরং সুশীলদের মুল লক্ষ্য রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা এবং তাদের দুর্নীতি ও কুকীর্তির বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করা দরকারী কাজ। ফলে যারা এ কাজ করেন তারা জনগণের পক্ষেই কাজ করেন। এক এগারোর কুশীলবরাও এ কাজ করেন। কিন্তু একই কাজ করার পরেও এক এগারোর কুশীলবদের আমরা চিনতে পারি যখন সুযোগ পেলেই তারা খোদ রাজনীতিরই নিরাকরণ ঘটাতে চায়। তাদের এই ‘রাজনীতি’ সাধারণত ‘বিরাজনীতিকরণ’ বলে পরিচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর কুকীর্তিতে বীতশ্রদ্ধ জনগণ রাজনৈতিক দল বাদ দিয়ে বা রাজনীতি বাদ দিয়ে যদি শান্তিতে থাকতে পারে সে আশায় বিরাজনীতিকরণে আগ্রহী হয়ে ওঠে। এক এগারোর কুশীলবদের রাজনীতিতে ভূমিকা পালনের শর্ত এভাবেই তৈরী হয়। বিরাজনীতিকরণের রাজনীতি দানা বাঁধবার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোই প্রধানত দায়ী। কিন্তু একক ভাবে দায়ী করা যাবে না। সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতি নিয়ে সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার ঘাটতিও কম নয়। তদুপরি রয়েছে গণমাধ্যমের ভূমিকা।

এই দিক থেকে এক এগারোর কুশীলবরা বাংলাদেশের একটি বিশেষ রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিনিধি বটে। যারা এই চিন্তা ধারণ করেন তারা দলীয় রাজনীতিতে বিতৃষ্ণ, প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য তারা প্রায়ই দিবাস্বপ্ন দেখেন। এই দিবাস্বপ্নের নাম তৃতীয় শক্তি। তাদের মনের গোপন বাসনা এই যে তাঁরাই হবেন সেই তৃতীয় শক্তি। কিন্তু বিদ্যমান দলগুলোর বাইরে তাদের নিজেদের কিছু করবার ক্ষমতা নাই। ক্ষমতার লড়াই কখনই খুব আরামের কাজ নয়, বাংলাদেশের মতো দেশে সেটা সহিংস রূপ নেয় বাস্তবতার কারণেই। কিন্তু যারা রাজনৈতিক সংস্কার চান তারা চান সেটা শান্তিপূর্ণ ও অহিংস হোক। অথচ দুই দলের ক্ষমতার বাইরে জনগণের ক্ষমতা বিকাশের পথ কঠিন ও বন্ধুর। এক এগারোর কুশীলবরা কন্টকাকীর্ণ ও কঠিন পথে যেতে নারাজ। ফলে তারা ঢোঁক গিলে বাস্তবিক কারনেই মেনে নেন যে তৃতীয় শক্তি আসলে ‘সেনাবাহিনী’। কারণ সশস্ত্র ও সহিংস রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে সশস্ত্র ক্ষমতা হিসাবে একমাত্র সেনাবাহিনীকেই তারা বাস্তবে দেখতে পায়। আর আসলে এটাই বাস্তব পরিস্থিতি। তৃতীয় শক্তি হিসাবে এক এগারোর কুশীলবরা ক্ষমতাধর হয়ে সমাজে হাজির হবার একমাত্র সম্ভাবনা সেনা সমর্থন; এ ছাড়া তাদের বাসনা চরিতার্থ করা কঠিন। কিন্তু সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে যুক্ত করতে হলে আন্তর্জাতিক পরাশক্তির সমর্থন ছাড়া সম্ভব নয়। এই গুপ্ত বাসনার পরিণতিতে সমাজের বিশেষ এই শ্রেণি, সেনাবাহিনী ও পরাশক্তির মধ্যে একটা ত্রিভূজ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আগেই বলেছি ওর পেছনে থাকে বিদ্যমান রাজনীতির সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা। এতটুকুই মাত্র এর ইতিবাচক দিক। সেই আকাঙ্ক্ষার আর্থ-সামাজিক কারন হিসাবে হাজির থাকে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির গতিশীল বিকাশের সম্ভাবনা। বিদ্যমান রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর কুকীর্তির কারনে যে সম্ভাবনা নষ্ট হবার বিপদ তৈরী হয়। যেমন, বলা হয়, বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হবার সম্ভাবনায় টইটুম্বুর। কিন্তু সে সম্ভাবনা বানচাল হতে বসেছে রাজনৈতিক দলগুলোর কুশাসনের জন্য। কথাটা উড়িয়ে দেবার মতো নয়। সে কারনেই কুশাসনের জায়গায় আমরা প্রায়ই সুশাসনের কথা শুনি। একটা শক্তিশালী শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের বলয়ে ধুকে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতির মধ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ দেখতে শুরু করে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করবার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। বিরাজনীতিকরণের রাজনীতির তাই তারা তাদের শ্রেণি স্বার্থের কারণেই আগ্রহ বোধ করে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সমর্থন দিয়ে থাকে।

এই বিপদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ‘দুর্নীতি’। রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে এক এগারোর কুশীলবদের রাজনৈতিক প্রপাগাণ্ডায় সবচেয়ে প্রধান অস্ত্র ছিল দুর্নীতি। একে আমি উদ্ধৃতি চিহ্ন দিয়েছি। এ কারনে যে অর্থশাস্ত্র দুর্নীতি মাত্রই মন্দ এই নীতিবাদী বাচালতার কারবার করে না। দুর্নীতি ছাড়া পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের বিকাশ ও বিস্তার চিন্তাই করা যায় না। পুঁজিতন্ত্র চাই, কিন্তু দুর্নীতি চাই না, এটা তো হতে পারে না। প্রশ্ন হচ্ছে দুর্নীতির দ্বারা উপার্জিত অর্থ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে যাচ্ছে, নাকি পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে। নাকি সেই দুর্নীতি নির্লজ্জ ভাবে সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে যেমন।

বাংলাদেশের দুর্নীতিকে বুঝতে হলে এখানে পুঁজি গঠন এবং পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক গড়ে ওঠার বিশেষ ধরন বিচার করা দরকার। সেটা করতে হলে বহুপাক্ষিক ও দ্বিপাক্ষিক দাতা সংস্থাগুলোর ভূমিকা, কাঠামোগত সংস্কার, অবাধ বিনিয়োগ ও অবাধ বাজার ব্যবস্থা, রপ্তানিমুখী উন্নয়ন নীতি সহ আরও নানান দিক পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত ভাবে নীতিবাদী কায়দায় ‘দুর্নীতি’র মূল্যায়ন বালখিল্যতা ছাড়া কিছুই নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের হাড় মাংস মজ্জা পানি করা যে-পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক আমাদের চোখের সামনে গড়ে উঠেছে ও বিস্তার ঘটছে সেই অসহনীয় ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট চরিত্র বোঝার দিকে মনোযোগ নিবিষ্ট করাই এই ক্ষেত্রে আসল কাজ। অর্থাৎ দুর্নীতি থেকে মুক্তি পেতে হলে সংস্কার করতে হবে আসল জায়গায়। এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে গণক্ষমতা তৈরির কাজ। সেটা না করে এক এগারোর কুশীলবরা দুর্নীতির চরিত্র বিচার করে শুধুমাত্র জনগণের ‘উপলব্ধি’র মাত্রা দিয়ে। পুলিশ, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনগণের উপলব্ধি দিয়ে দুর্নীতি পরিমাপ করা হয়। এখন রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতির তথ্য প্রকাশিত হয়ে পড়ায় সেটা মুখ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সেটা ভাল। এক এগারোর কুশীলবদের রাজনীতি বুঝতে হলে বুঝতে হবে তারা রাজনীতি বা রাষ্ট্র ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারে কিম্বা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার পর্যালোচনাতে মোটেও আগ্রহী নয়। তারা বরং বিদ্যমান ব্যবস্থায় জনগণের ক্ষোভ আশ্রয় করে তাকে ততোটু্কুই প্রশমন করতে রাজি যতোটুকু বিদ্যমান ব্যবস্থাকে সহনীয় করে তুলতে কাজে লাগে।

রাজনীতিতে এক এগারোর কুশীলবরা রাজনৈতিক দল ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অনিশ্চিত ও সংঘাতপূর্ণ প্রক্রিয়া এড়িয়ে বাংলাদেশে ‘সুশাসন’ কায়েম করতে চায়। এই অর্থে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েমের চেয়ে আন্তর্জাতিক পুঁজি এবং বহুজাতিক কর্পোরেশানের জন্য একটি স্থিতিশীল ও ঝামেলামুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। এ কারণেই ‘বিরাজনীতিকরণ’ (depoliticisation) কথাটা চালু হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে তথাকথিত ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের বিরোধের জায়গাটা হচ্ছে স্থিতিশীলতা বহাল রাখার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা। সেনাবাহিনীর ভূমিকার কথাটা এই স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়োজনেই ওঠে। সেটা জনগণের স্বার্থ পাহারা দেবার জন্য নয়, আন্তর্জাতিক পুঁজি ও বহুজাতিক কম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও মুনাফা নিশ্চিত করবার জন্য। অতএব ‘বিরাজনীতিকরণ’ কথাটা বুঝতে হবে আক্ষরিক অর্থে নয়, বরং সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক অর্থে। বিরাজনীতিকরণেরও রাজনীতি আছে। বুঝতে হবে লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক শক্তি অর্জনের বিপরীতে বিদ্যমান ব্যবস্থার টিকিয়ে রাখবার রাজনীতি হিসাবে।

একারনে ‘সুশাসন’ বলাবাহুল্য গণতন্ত্র নয়, কর্পোরেট শাসন। গুড গভার্নেন্স। প্রথমেই এই দিকটাই সবচেয়ে পরিষ্কার বুঝতে হবে। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি পলাশীর যুদ্ধের পর ধীরে ধীরে এদেশের ‘শাসনভার’ তাদের নিজেদের হাতে তুলে নেয়। সেটা ছিল ঔপনিবেশিক শাসন। কিন্তু সেটাও ছিল ইংরেজদের দিক থেকে ‘সুশাসন’। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসন আজ আর নাই, বা নৈতিক ভাবে বহাল রাখা অসম্ভব। সেই জায়গায় বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থে ‘সুশাসন’ কায়েম জরুরী হয়ে পড়েছে।

দ্বিতীয়ত ঔপনিবেশিকতা পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠবার উঠতি সময়। এখন দুনিয়া জোড়া বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে। আমরা সেই ব্যবস্থার প্রান্তে আছি, কেন্দ্রে নয়; আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাগের যে-অবস্থানে আমরা রয়েছি সেখানে আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র পথ হচ্ছে সস্তা শ্রম বেচা – দেশের ভেতরে বা বাইরে। এমন এক শ্রম যার জীবসত্তার কোন মূল্য নাই। একে পুড়িয়ে মারা যায়, বিল্ডিং ভেঙ্গে চাপা দিয়ে জ্যান্ত কবর দেওয়া যায়, মধ্য প্রাচ্যের মরুভূমিতে সূর্যের দাহনে দগ্ধ করা যায়, কিম্বা মালয়েশিয়ার রাবার বাগানে সাপের কামড়ে মরতে পাঠানো যায়, ইত্যাদি।

নিরন্তর পুঁজির পুঞ্জিভবন ও আত্মস্ফীতি ঘটছে, সেটা একটি বৈশ্বিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়াকে অবাধ রাখতে বাজার ব্যবস্থার ওপর রাষ্ট্রের কোন প্রকার হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হয় না। রাষ্ট্রকে একাজ করতে না দেওয়াও ‘সুশাসন’-এর অন্তর্গত। বিনিয়োগ ও উন্নয়নের একমাত্র এজেন্ট বা চালিকা শক্তি হচ্ছে বহুজাতিক কর্পোরেশান ও বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা। এই প্রক্রিয়ায় রাজনীতির মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে পুঁজির দৃশ্যমান আন্তর্জাতিক ধরণ, যাকে আমরা সাধারণত বহুজাতিক কর্পোরেশান বলি। বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাজ হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নিরন্তর তৈরী হওয়া অর্থনৈতিক অসাম্য, দারিদ্র ও সামাজিক অসন্তোষ সামাল দেওয়া। বাংলাদেশে সেনা সমর্থিত সরকার কায়েম করাই এক এগারোর কুশীলবদের প্রধান কাজ ছিল না। তাদের কাজ ছিল পুঁজির অবাধ বিনিয়োগ ও মুনাফা কামাবার জন্য প্রয়োজনীয় ‘রাজনৈতিক’ স্থিতিশীলতা ও শান্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ হলে, বলা বাহুল্য, সবসময়ই স্থিতিশীলতার জন্য সুশীল সমাজ, সেনাবাহিনী ও পরাশাক্তির আঁতাত অনিবার্য ভাবেই গড়ে ওঠে। এখানে কোন ষড়যন্ত্রের দরকার পড়ে না।

বাংলাদেশে আবার সেই পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। আর এবার এই অবস্থা তৈরিতে প্রধান ভুমিকা নিয়েছেন শেখ হাসিনা। এটা পরিষ্কার। অবস্থা দৃষ্টে দেখা যাচ্ছে এক এগারোর কুশীলবরা সংবিধানের মধ্যে থেকে কিভাবে শেখ হাসিনাকে মোকাবিলা করা যায় তার ফর্মুলা বের করবার জন্য প্রাণান্ত হয়ে যাচ্ছেন। সে সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ফলে এক এগারোর পরিস্থিতি তৈরী হলে অবাক হবার কিছু নাই। শেখ হাসিনার নাসিকা প্রখর। তিনি ধরে ফেলেছেন কিছু একটা পরিকল্পনা চলছে।

এবার এক এগারোর ঘটনা ঘটলে জনগণের দিক থেকে হয়ত এই মুহূর্তে কোন ইতরবিশেষ বা ক্ষতিবৃদ্ধি নাই। দেখা যাক কি হয়!!

৩০ ডিসেম্বর ২০১৩