সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরহাদ মজহার


Monday 24 March 14

print

এক

লেখাটি এ বছর চৌদ্দই ফেব্রুয়ারির জন্য তৈরি করেছিলাম, যদি সেদিনই বেরুতো ভাল লাগতো। কিন্তু পাঠাতে পারি নি। আজ পনেরো তারিখে পাঠাচ্ছি। অতএব কাল ষোল ফেব্রুয়ারিতে বেরুবে।

তবে যে বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাইছি, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে ১৪ ফেব্রুয়ারি খুবই গুরুত্বপূর্ণ দিন। স্বাধীনতার পরে তরুণদের সবচেয়ে গৌরবের তারিখ। কিন্তু এই দিনটি নানান কারনে ম্লান হয়ে গিয়েছে। সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে তরুণদের গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামের এই কালপর্বটার ইতিহাস ধরে রাখার ও তার তাৎপর্য বিচারের সময় এসেছে । এর ব্যর্থতা ও সাফল্যের একটা খতিয়ান টানা দরকার। এই দিকটা সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে গণ অভ্যূত্থানের সম্ভাবনা পুরা মাত্রায় হাজির ছিল।তরুণ নেতৃত্বের বিপ্লবী অংশের চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও এর সঙ্গে শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন ও কৃষক সংগঠনগুলোর মোর্চাকে একত্র করা যায় নি। এটা সম্ভব হোত যদি বামপন্থিদলগুলো এই একত্রীকরণের রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা ও কৌশলগত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারত। বামপন্থার ভাষায় যাকে সাধারণত ‘রণকৌশল’ বলা হয়। সেখানে সঠিক পদক্ষেপ ও বিচ্যুতিগুলো বিচার করবার একটা কর্তব্য এখনও রয়ে গিয়েছে। জনগণের আশা আকাংখা বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ‘রণনীতি’ (strategy) যদি গণতন্ত্র কায়েম হয়ে থাকে তাহলে তা বাস্তবায়ন করবার ‘রণকৌশল’ (tactics) নিয়ে ভাবনা চিন্তা তর্কবিতর্কের কোন সুস্থ ও সচেতন ধারা বাংলাদেশে গড়ে ওঠে নি।

ছাত্র সংগ্রম পরিষদ শুরু থেকেই সমাজের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক শ্রেণি ও আন্দোলনের মধ্যে ঐক্যের কথা ভেবেছিল। কারণ এই গণতান্ত্রিক ঐক্য নির্মাণের ওপর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সীমা ও সম্ভাবনা নিহিত ছিল। কিন্তু গণবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনগুলোর আন্দোলনকে কাছাকাছি করবার চেষ্টার বিপদ ঠিকই উপলব্ধি করেছিল। দ্রুত তারা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হাত থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব নিজেদের কব্জায় নিতে যারপনাই কোশেশ শুরু করে এবং সফলও হয়।

অনেকে তখন বলেছিলেন বামদলগুলো ছিল ছোট ও দুর্বল। অতএব ছাত্র আন্দোলন বড় দলগুলোর অধীনে চলে যাওয়াটা ছিল অনিবার্য। এটা ঠিক নয়। কারণ দল হিসাবে বাম দল তখন দুর্বল হলেও বামপন্থী ছাত্র দলগুলো ছিল মূলত এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের প্রধান প্রাণশক্তি। এই ক্ষেত্রে বামপন্থি নেতৃত্বের ব্যর্থতাই ছিল প্রকট। আন্দোলনের নেতৃত্ব যদি আন্দোলনের মূল হোতা ও গণতান্ত্রিক ভ্রূণশক্তির হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলে তার দুর্দশা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তার একটি জ্বলজ্বলে উদাহরণ। এর জন্য কে দায়ী আর কে দায়ী নয় সেই দোষারোপের রাজনীতি বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে না। বরং এই সময়ের বিচার হওয়া উচিত ব্যাক্তিকে দোষারোপ করবার মন্দ অভ্যাস পরিহার করে আসলে আন্দোলনের মর্ম ও তা পরিচালনার দূরদৃষ্টি বাম আন্দোলনের মধ্যে কতোটুকু ছিল তা খতিয়ে দেখা।

বলাবাহুল্য, সেখানে অবশ্যই ঘাটতি ছিল। কিন্তু সেটাও দোষের নয়। কারণ আগেই বলেছি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের রণ্নীতি ও রণকৌশল নিয়ে আমাদের সমাজে তর্কবিতর্ক বিপজ্জনক ভাবে অনুপস্থিত। আজ বহু বছর পর বরং প্রশ্ন হচ্ছে সে ঘাটতি কি বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনীতি কাটিয়ে উঠতে পেরেছে? এটাই এখনকার , ২০১৪ সালে, মূল কথা। বোঝা দরকার কিভাবে সেই সময়ের ‘তরুণ প্রজন্ম’ একটি অসাধারণ আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল, কিন্তু তার ব্যর্থতার ফলে বাংলাদেশ আজ কোথায় গিয়ে ঠেকেছে। ‘তরুণ প্রজন্ম’ কথাটা উদ্ধৃতি চিহ্নের মধ্যে রেখেছি যাতে এই ধারণাটির মর্মার্থের যে রূপান্তর ঘটেছে, সেই ডীকে আমরা পর্যালোচনামূলক নজর ফেরাতে পারি।

চৌদ্দই ফেব্রুয়ারির মধ্য দিয়ে ‘তরুণ প্রজন্ম’ যে আন্দোলন শুরু করেছিল এক দিক থেকে তার মর্যাদা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের অধিক না হলে নিদেন পক্ষে সমান গুরুত্বের। তবে আন্দোলনের মর্ম ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার কারনে দুটো আন্দোলনের তাৎপর্য আলাদা। বায়ান্নর আন্দোলন ভাষা ও সাংস্কৃতিক সচেতনতা ও আত্মপরিচয়কে প্রবল করে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে জাতিবাদী চেতনার জন্মের শুরু এখান থেকে। যার পরিণতি ঘটে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতায়। তুলনায় চৌদ্দই ফেব্রুয়ারির ডাক ছিল গণতন্ত্রের। লক্ষ্য ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে আভ্যন্তরীণ গঠনের দিক থেকে গণতান্ত্রিক করে গড়ে তোলা।

শেষের লক্ষ্য পূরণ হয় নি। তার নানান কারণের মধ্যে একটি কারণ – যাকে আমি প্রধান কারণ বলে মনে করি – ওপরে উল্লেখ করেছি। অনেককে বলতে শুনি ব্যর্থতারসবচেয়ে বড় বা প্রধান কারণ তিরাশির ছাত্র আন্দোলনের প্রথম সারির নেতাদের কারও কারও রাজনৈতিক আপস অথবা অক্ষমতা। এটা একটি কারন হতে পারে। অবশ্যই। তবে ব্যক্তি পর্যায়ের নৈতিক স্খলন বা অক্ষমতার চেয়েও সামগ্রিক ভাবে সমাজে আমরা বিভিন্ন বিষয় মীমাংসা করতে কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছি সে আলোচনাই এখন বেশি দরকার। ব্যক্তি যখন সমাজে আপস বা সমঝোতা করে সেটা রাজনৈতিক বা আদর্শগত স্খলনের কারনে ঘটতে পারে, কিন্তু কোন্‌ আদর্শ আমরা কে কিভাবে বুঝি সেখানে সুস্থ তর্কবিতর্কের ঐতিহ্যই গড়ে ওঠে নি, ঐক্য দূরের কথা। শব্দগত ব্যবহারের ফানুস ও ফাঁকা বকোয়াজগিরি ছাড়া। ফলে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের রণনীতি ও রণকৌশলের ক্ষেত্রে সমাজে অপরিচ্ছনতা থেকে গিয়েছে। এই অপরিচ্ছন্নতার কারণে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে ভুল করা ব্যক্তির দোষ নাও হতে পারে।

শ্রমিক সংগঠনগুলো সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হবার পরে দশ দফার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে দ্রুত আন্দোলন সামাজিক ও রাজনৈতিক ন্যায্যতা পায়। তখন আন্দোলনের চরিত্র ও পদ্ধতি নিয়ে একটা তর্ক শুরু হয়। শুরুতে আন্দোলনের ওপর দলীয় নিয়ন্ত্রণ ছিল না। দুই একটি ছোট সংগঠন ছাড়া ছাত্র সংগঠনগুলো মূলত রাজনৈতিক দলেরই সম্প্রসারণ ছিল। তবুও ছাত্র নেতারা স্বাধীন ভাবেই আন্দোলন চালিয়ে যাবার পক্ষপাতী ছিলেন, ঠিক যে বড় দলগুলোর প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া কঠিন ছিল। কিন্তু অচিরেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারা দেশে তাদের ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করে ফেলতে সক্ষম হয়। বামপন্থী তরুণ বিপ্লবীদের নেতৃত্ব বিকাশের সমূহ সম্ভাবনাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্দোলনের চাবিকাঠি ছিল মূলত তাঁদেরই হাতে। আন্দোলন যখন তীব্র হয়ে উঠল তখন বড় দলগুলো দেখল আন্দোলন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর বিপদ না বোঝার মতো বোকা তারা ছিল না। তারা তাদের ছাত্র সংগঠনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করবার চেষ্টা চালাতে লাগল। এর কুফল আন্দোলনের মধ্যেও এসে পড়ল। কিন্তু ছাত্র নেতারা আন্দোলনকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছিলেন এটা কম কৃতিত্বের কথা নয়। আন্দোলন তাদের হাতছাড়া হয়ে যাবার পর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দশ দফা পরিণত হয় এক দফার দাবিতে। বড় দলগুলো শ্লোগান দেওয়া শুরু করে, ‘এক দফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি’। এরশাদ গিয়ে খালেদা এলেন, হাসিনা এলেন, মাঝখানে ফখরুদ্দিনরাও এলেন গেলেন। কিন্তু ‘এক দফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি’র কি হোল? এরশাদ কি আসলে গিয়েছে? যায় নি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বৈরতন্ত্রের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে তিনি বহাল তবিয়তেই আছেন। এখন তিনি গণতন্ত্রের মানস্কন্যা শেখ হাসিনার উপদেষ্টা। তুলনায় বামদলের নেতাদের দেখুন। তারা কোথায় রয়েছেন, সেই বিবেচনা আমরা তাঁদের ওপরই ছেড়ে দিতে পারে। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে স্বাধীন ভাবে বিকশিত করা গেলে নগদ লাভ ছিল বামপন্থিদের। এটা বড় দল এবং তাদের ছাত্র সংগঠনগুলো পরিষ্কারই বুঝত। আন্দোলন যতো বেশী ছাত্রদের নেতৃত্বে স্বাধীন ভাবে বিকশিত হতে থাকল ততোবেশী তার প্রতি শ্রমিক ও কৃষক সংগঠনগুলো সংহতি বোধ করতে শুরু করল। জানালোও তারা। বাম ঘেঁষা ছাত্র সংগঠনগুলো আন্দোলনের শ্রেণি চরিত্রে গুণগত পরিবর্তন আনবার জন্য এর প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করল। তারা কিছুটা সফলও হয়েছিল। যতোদূর মনে আছে, আন্দোলনের শুরুর দিকে ছাত্ররা দশদফা দাবি নামা প্রণয়ন করে। গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামের মর্ম নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রথম দশ দফা একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে ভূমিকা রাখে। কিন্তু বড় দলগুলো তা পুরাপুরি গ্রহণ করে নি। পরে দশ দফার পরিবর্তন আনা হয়। দশ দফার পরিবর্তনের অর্থ ছিল বামপন্থি ছাত্রদলগুলো আন্দোলনকে যেখানে নিয়ে গিয়েছে তার ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করা। বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর হাত থেকে আন্দোলন কেড়ে নেওয়া। অর্থাৎ বড় দলগুলো শুরুর দিকে অমনোযোগী থাকলেও ক্রমে ক্রমে তারা এর ওপর প্রভাব খাটাতে শুরু করে। দফা ভিত্তিক আন্দোলন থেকে সরিয়ে তারা একে ‘এক দফা’ দাবিতে পরিণত করে। আন্দোলনের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় এরশাদকে সরিয়ে দেওয়া এবং বড় দলগুলোর ক্ষমতায় যাবার ব্যবস্থা করা। ‘এক দফা’ দাবিই শেষ তক বহাল থাকে। সংবিধান বদল করা হয় এবং এরশাদ সরে দাঁড়ান। এমন ভাবে বদল করা হয় যাতে সংবিধান ও রাষ্ট্র যেমন আছে তেমনি রেখে দিয়ে ‘ত্রিদলীয় জোটের রূপরেখা’র ভিত্তিতে ক্ষমতার হাত বদল হয় মাত্র। গণ অভ্যূত্থানের সম্ভাবনা বিনষ্ট করে দিয়ে সমাজের ক্ষমতাবান শ্রেণী রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্রকাঠামোর চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে শুধু এরশাদকে সরিয়ে দেয়। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনা অংকুরেই বিনষ্ট হয়। এই ক্ষেত্রে বড় দলগুলোর পরম সহযোগী হিসাবে বাম দলগুলো কাজ করে, এবং বাংলাদেশে তাদের ঐতিহাসিক বিলয়ের রাস্তাঘাট তারা নিজের হাতে নিজেরাই তৈরী করে। এরই ধারাবাহিকতায় জামায়াতে ইসলামির কেয়ার টেকার সরকারের ধারণা অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের গোড়া এখন যে তর্কে এসে ক্রমাগত এখন খাবি খাচ্ছে।

এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বহু প্রাণ অমর হয়ে আছে । শহীদ জাফর, জয়নাল, দীপালি সাহা, মোজাম্মেল, আয়ুব সহ আরও অনেক। অনেকের নাম এখনও অজানা রয়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ এইভাবে সর্বদাই অলিখিত থেকে যায়। আরও রয়েছে সেলিম, দেলোয়ার, ও বসুনিয়ার নাম। আমাদের ভোঁতা ইতিহাস বোধ বারবার আমাদের অন্ধকারে নিক্ষেপ করে।

গণ আন্দোলন ও গণ অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং গণবিরোধী অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রশক্তি ও রাষ্ট্র কাঠামো যা আছে তেমনি বহাল রেখে শুধু শাসক পরিবর্তন বা সরকার পরিবর্তনের মধ্যে ফারাক আসমান জমিন। সরকার আর রাষ্ট্র এক কথা নয়। রাষ্ট্র যদি সমরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী হয় তাহলে তার গণতান্ত্রিক রূপান্তর গণ অভ্যূত্থান ছাড়া অসম্ভব। সেই ক্ষেত্রে গণ আন্দোলন বা গণ অভ্যূত্থানে যারা জনগণকে নেতৃত্ব দেয় তারাই বিজয়ী হতে পারলে জনগণের গণতান্ত্রিক ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার গণতান্ত্রিক প্রতিনিধি হিসাবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে। এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের ধ্রুপদি মডেল। বিজয়ী অন্তবর্তী সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ হচ্ছে একটি সংবিধান সভা বা রাষ্ট্র গঠন সভা (Constituent Assembly) আহ্বান এবং তার জন্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। রাষ্ট্র গঠন সভার নির্বাচনের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একটি গণতান্ত্রিক ‘গঠনতন্ত্র’ (Constitution) প্রণয়ন করে এবং গঠনতন্ত্র প্রণয়ণের পরপরই নিজেদের বিলুপ্ত করে। এরপর নতুন সংবিধান অনুযায়ী নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদের নির্বাচন ও সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে গৃহীত হলে তার নির্বাচন ভিন্ন হতে পারে। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সমূহ সম্ভাবনা থাকলেও গণ অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদের পতন ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনাকে অংকুরেই বিনষ্ট করা হয়েছিল। ফলে, এরশাদ আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামনের সারিতে হাজির রয়েছেন। বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের বাস্তবতা মনে রাখলে আমরা বুঝব, সামরিকতন্ত্র ও স্বৈরতান্ত্রিকতার রাজনৈতিক গুরুত্ব বাংলাদেশে কমে নি।

মূল প্রশ্ন অবশ্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদের বহাল তবিয়তে থাকা নয়। বরং বড় দলগুলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রূপান্তর দূরের কথা, তাকে আরও অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট চরিত্র কিভাবে দান করেছে সেই দিকে নজর রাখা। অতএব দোষ শুধু একা এরশাদকে দিলে হবে না। এর জন্য সকলেই দায়ী। একজনকে একা দোষী বানিয়ে আমরা যার যার ভূমিকা থেকে খালাস পাবার চেষ্টা করতে পারি বটে, তবে ইতিহাস এতো সহজে কাউকে ছাড় দেয় না।

তবে এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক মনে হয় আমাদের স্মৃতি বিনষ্টির প্রক্রিয়া। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন, তার ফলাফল এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়ে একটা নিরপেক্ষ ও নির্মোহ পর্যালোচনার দরকার আছে। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে গৌরবের দিন ১৪ ফেব্রুয়ারিকে বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার যে নীরব চক্রান্ত চলছে সেটাই ভীতির। এটা কিভাবে সম্ভব হোল? এটাই আমাদের সবার আন্তরিক প্রশ্ন হওয়া উচিত। এই সময়ের ইতিহাস আবার জাগ্রত করা খুবই জরুরী।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে অনেকেই জড়িত ছিলেন, আমিও ব্যতিক্রম ছিলাম না। আজ যখন পেছন ফিরে তাকাই তখন সামরিক শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্মের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের সূচনা দিনটি অসাধারণ তাৎপর্য নিয়েই হাজির হয়। সে সময় তারুণ্যের অর্থ ছিল সামরিক শক্তি আর স্বৈরশাসনের সামনে মাথা নত না করবার দিন। সশস্ত্রতা ও মৃত্যু উপেক্ষা ও তুচ্ছ করবার দিবস। মৃত্যু্র মুখে তুড়ি দিয়ে প্রাণের জয়গান গাইবার দুঃসাহস। গৌরবের এই ইতিহাস আজ নানা কারণে ম্লান। এই গৌরবের ইতিহাস তরুণদের স্মৃতি থেকে মুছে দেবার কারবার চলছে পরিকল্পিত ভাবে। যার ফলে ক্ষমতাসীনদের প্রশ্রয়ে আন্দোলন আর ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক লড়াই-সংগ্রামের ফারাক বোঝা যায়। যারা নিজেদের ‘তরুণ প্রজন্ম’ মনে করেন তাদের এই ফারাক বোঝা খুবই দরকার।

দুই

কবি হিসাবে এই সময় অনেকের জন্যই অসাধারণ স্মৃতি। এই লড়াই সংগ্রামকে ভেতর থেকে কবিরা দেখেছেন। অংশ গ্রহণ করেছেন। লিখেছেন। এই সময় ‘লিপ্ত কবিতার ধারা’ হিসাবে কবিদের একটি আন্দোলন শুরু হয়। যার সরল অর্থ হচ্ছে জালিমের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামে কবি স্বয়ং যেমন লিপ্ত থাকেন, তেমনি কবিতাও লিপ্ত হয়ে পড়ে। যে কবির এই সংবেদনা নাই, তাদের নাম হয়ে গিয়েছিল, ‘ভেজিটেবল’। বাইরের কোন দায় বা ইতিহাস বানাবার অহংকারে নয়, কবিতার নিজের গরজেই এই সংবেদনা, নইলে কবিতা বাঁচে না।

সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব আন্দোলনের এই ইতিহাস মুছে ফেলা এবং তার ব্যর্থতা দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিকারের জন্ম দেয়। রাজনৈতিক দিক থেকে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কায়েম হবার শর্ত দ্রুত পূরণ হতে শুরু করে। শিল্প সাহিত্যের দিক থেকে ‘ভেজিটেবল যুগ’-এর শুরুও এরপর থেকেই। তবে কবিতা ফুলকপির বাজার হয়ে গিয়েছে বলা অন্যায়, কারণ প্রতিভাবান আছেন অনেকেই। তবে সামাজিক, রাজনৈতিক বা দার্শনিক বিষয়ে তরুণ কবিদের অনাগ্রহ চিন্তার উদ্রেক করে বৈকি। কবি বা কবিতাকে সরাসরি রাজনীতি করতে হবে এটা আমার দাবি না। কোন কবিরই সেটা দাবি নয়। কবিতা রাজনীতির হাতিয়ার হবে কিনা সেইসব অতি বাসি ও প্রাচীন তর্ক।কিন্তু কবিতা যখন পাঠকের দরবারে হাজির হবার বাসনা করে তখন জ্ঞানে কি অজ্ঞানে কবি কবিতাকে সামাজিক-রাজনৈতিক সম্পত্তি হিসাবেই হাজির করেন। তাঁর ব্যক্তিগত কামনা-বাসনা কিম্বা তার গুরুগম্ভীর নান্দনিক চিন্তা ভাবনা সেখানে গৌণ। তখন কবিতার মাথায় ঘোমটা থাকে না, কিম্বা কবিতার লজ্জাস্থান ঠেকেও কোন লাভ হয় না। রাজনীতি লুকাবার কোন অবগুন্ঠন কবিতার জন্য আজ অবধি আবিষ্কৃত হয়েছে কিনা আমার জানা নাই। অতএব কবিতাকে বিভিন্ন শ্রেণি ও শক্তি তাদের নিজ নিজ দরকারে ব্যবহার করে, করবেই। এই ক্ষেত্রে কবির দায় হচ্ছে ভাব ও চিন্তার নতুন দিগন্ত আবিষ্কার করার দিকেই বরং মনোযোগী থাকা যাতে অন্যের রাজনীতি, সমাজনীতি কিম্বা নীতিনৈতিকতার অধীন না থাকে কবিতা নতুন জগত নির্মাণের সূত্র ও সম্ভাবনা হাজির করতে পারে। নিদেন পক্ষে হাজির হবার ইঙ্গিত ও ইশারাগুল্লো দিয়ে যাবার হিম্মত অর্জন করতে পারে।

কবিতা সেটা নানা ভাবে করে। কবিতা তারস্বরে রাজনীতি করে না। বক্তব্য দিয়ে কবিতার বিচারও কবিতার প্রধান মানদণ্ড নয়। কিন্তু সময় কবিতার আঙ্গিকের মধ্য দিয়ে ঠিকই নিজেকে জানান দিয়ে যায়। সেটা ধরতে ও বুঝতে পারা কবিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বক্তব্য বাদ দিয়ে যদি শুধু আঙ্গিক নিয়ে সাম্প্রতিক পরীক্ষা নিরীক্ষার কথা বলি তাহলে বলা যায় তথাকথিত প্রমিত বা ভদ্রলোকের ভাষাকে ভেঙ্গে চুরে যারা ঝুঁকি নিয়ে লিখেছেন সম্ভবত তাঁরাই এই সময়কে কবিতার জায়গা থেকে ধরেছেন  এবং ধরে রেখেছেন। এই ধরণের ভাষার ভাঙন ও কবিতা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার প্রতি আমার রাজনৈতিক পক্ষপাতের কথা অনেক লেখায় উল্লেখ করেছি। এটা করবার সাহস যারা দেখিয়েছেন, তারা বাংলা ভাষা ও ভাবের ক্ষেত্রে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রেখেছেন এবং রাখবেন এ ব্যপারে কোন সন্দেহ নাই। এই দিক থাকে ব্রাত্য রাইসুর ‘আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি’ বাংলা ভাষা ও কবিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আমি এর আগে এ ব্যাপারে নানান সময়ে মন্তব্য করেছি। কাব্যভাষার এই আবির্ভাবের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক আছে বলেই আমি মনে করি। আশির দশকে তরুণদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় যে-পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে তার লক্ষণগুলো এই ধরণের লেখালিখির মধ্য দিয়ে হাজির হতে শুরু করেছে। এই ক্ষেত্রে আমার আপত্তি যদি কিছু থেকে থাকে সেটা হচ্ছে তরুণদের বড় একটি অংশ যারা প্রমিত ভাষার বিপরীতে লেখালিখি করেন তারা ভাষার এই পরীক্ষা নিরীক্ষায় বিশ্বাস করেন না, যে কারনে ভাষাটির সম্ভাবনা এতে উদাম না হয়ে একটা ফাজিল বা ফাজলামির ব্যাপারে পর্যবসিত হয়। সাহিত্যে ফাজলামি চলে না, বা সাহিত্য মাত্রই সবসময় সিরিয়াস আর গুরুগম্ভীর, ব্যাপারটা তা না। কথা হচ্ছে ভাষার ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে যুগপৎ ভাষা ও ভাবের যে সম্ভাবনা তৈরি হয় তাকে চেনা ও কাজে লাগাবার নিষ্ঠা ছাড়া সেই সম্ভাবনার বিকাশ সম্ভব না। এই নিষ্ঠার প্রকাশটা বাইরে থেকে নিছকই নান্দনিক মনে হলেও, মূলত তা রাজনৈতিক। 'প্রথম বিপ্লবের খুন' ভাষা থেকেই প্রথমে ঝরতে শুরু করে।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় আমরা কবিতা লিখে ইশতেহারের মতো বিতরণ করেছি। সেটা কবিতার জন্য ভাল কাজ ছিল দাবি করি না, কিন্তু রাজনীতিতে কবির লিপ্ত থাকবার এই চিহ্নগুলো আমি সযত্নেই বহন করি। এরশাদ বিরোধী সংগ্রামে পদ্য কোন ভূমিকা পালন করেছিল কিনা জানি না। তবে ট্রাকের চাকায় তলায় পিষে এরশাদের ট্রাক যখন সেলিম ও দেলোয়ারকে হত্যা করল তখন সেই খবরে ক্রুদ্ধ হয়ে একটি কবিতা লিখেছিলাম, অনেকেরই তা মনে থাকতে পারে: লেফটেনান্ট জেনারেল ট্রাক।

লিখেছিলাম:

হে সামরিক পোশাক পরিহিত শাহানশার মতো ট্রাক

এই মিছিল

        তোমার মতো বহুত শাহানশা’কে উলঙ্গ করে ছেড়েছে

তারপর প্রস্রাব করতে করতে

      প্রস্রাব করতে করতে

           প্রস্রাব করতে করতে

সামরিক আইন প্রশাসকের দফতরগুলো

      পরিণত হয়েছে মিউনিসিপ্যালিটির

              প্রস্রাবখানায়।

অনেক কবিতাই হারিয়ে ফেলেছি। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারিতে এই দিনটি স্মরণ করা হোত। কাগজপত্র ঘেঁটে ১৯৮৭ সালের দুটো কবিতা পেলাম। একটির নাম ‘এরশাদ তোমাকে দেখা মাত্রই গুলি করবে’। তখন মিছিলে দেখা মাত্রই গুলি করবার একটা নির্দেশ জারি হয়েছিল।

“বন্দুকের নলগুলো তারা তাক করেছে তোমার হৃদপিণ্ডের দিকে

তাজা রক্তের ওপর পিছলে যাচ্ছে সামরিক বুট

সারি সারি খাকি পোশাক যন্ত্রের মতো স্থির

     নির্দেশের অপেক্ষায় এটেনশান

আজ এরশাদ তোমাকে দেখা মাত্রই গুলি করবে।

 

ধ্বংস ও হিংসার ভেতর একদা আমি রোপন করেছি

     নির্মাণের বীজ আর রূপান্তরের শিল্পকলা

     সন্তানের মতো ইতিহাস তাকে গর্ভে ধারণ করেছে

পলিমাটির লজ্জাশীলা কাদাকে যেভাবে স্পর্শ করে অভিভূত চাষা

    তোমার জননী ধরিত্রীকে আমি সেভাবে আলিঙ্গন করেছি

তারপর

ষোলবছর ধরে তোমাকে আমি লালন করেছি

     ষোল বছর...

           কিন্তু আজ এরশাদ তোমাকে দেখা মাত্রই গুলি করবে... ইত্যাদি।

কবিতাটি হাতে নিয়ে ভাবছি, দেখা মাত্রই গুলির নির্দেশ তো কার্যত এখনও বহাল আছে। নির্দেশ সামরিক শাসক নন, দিচ্ছেন নির্বাচিত সরকার।

আমরা কোথা থেকে কোথায় এসে পড়েছি?

তাই স্মরণ করছি জাফর, জয়নাল, দীপালি সাহা, মোজাম্মেল, আয়ুব সহ জ্ঞাত ও অজ্ঞাত সব শহিদদের। স্মরণ করছি সেই সময়ের তরুণ ছাত্র নেতাদের যারা তাদের দলের নিয়ন্ত্রন উপেক্ষা করে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে মতাদর্শিক ভিন্নতাকে প্রধান গণ্য না করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পেরেছিলেন।

আন্দোলনের শুরুর দিকে সেটাও কম অর্জন ছিল না।

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪/ ২ ফাল্গুন, ১৪২০ শ্যামলী, ঢাকা


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : ফরহাদ মজহার

View: 4656 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD