একালে এগিয়ে যাবার পথ


ফরহাদ মজহার || Monday 18 August 14

আমি ‘আধুনিক’ নই। এর মানে এই নয় যে আমি অনাধুনিক। কিম্বা আমি অনাধুনিকতাকে মহিমান্বিত করতে চাই। আধুনিক যুগের আবির্ভাবের আগে প্রাক-আধুনিক যুগ নামক যদি কিছু থাকে সেখানে প্রত্যাবর্তন করার ইচ্ছা বা সংকল্প কোনটিই আমার রাজনীতি না। আমি কোথাও প্রত্যাবর্তন করছি না, ফিরছি না; বরং আধুনিকতা/অনাধুনিকতার বিভাজন অতিক্রমের চেষ্টা করছি। যে কারনে আমি আধুনিকতা বনাম অনাধুনিকতা এই দুইয়ের একটিকে মহিমান্বিত করে অপরটির বিরুদ্ধে দাঁড়াই না। বরং চিন্তা ও চর্চার যে অভ্যাস এই ধরণের বিভাজন তৈরি করে, সেই অভ্যাস থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে চাই। চিন্তা যেন সপ্রাণ ও সজীব থাকার চেষ্টায় বিরতি দিয়ে কোন একটা ‘মত’ বা বদ্ধমূল সিদ্ধান্তে পর্যবসিত না হয় বিভাজনের ফাঁদে পা না দেওয়া তার একটা শর্ত। এ ধরনের বিভাজনের মধ্যে নিজের তৈরি কাদাজলে খাবি খেতে চাই না। সেই বিপদ থেকে নিজেকে সন্তর্পনে রক্ষা করে ভাবতে চেষ্টা করি মানবেতিহাসের গন্তব্য ভিন্ন কোন জায়গা থেকে ভাবা সম্ভব কিনা। গন্তব্য আগাম নির্ণয় করে নিচ্ছি না, বর্তমানে বসে বর্তমানের মধ্যেই সম্ভাবনা বিচার করতে চাইছি। আমরা যা হয়েছি আর যেদিকে যাচ্ছি, সেটা তো বুঝতেই পারছি। পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে কী হয়েছি, আর কোন দিকে ইতিহাস গড়াচ্ছে  সেটা বোঝার পরও যারা মনে করেন বর্তমান বিশ্বব্যবস্থাই মানুষের একমাত্র সম্ভাবনা আমি তাদের কাতা্রের কেউ না। এটাই আমাদের নিয়তি নির্দিষ্ট পরিণতি হবার কথা ছিল না। অতএব আমি ভাবতে চেষ্টা করি, কেন এটা হোল। তারপর ভাবি, কিভাবে এই অবস্থা থেকে বেরুনো যায়। মানুষের অবশ্যই ভিন্ন পথ নেবার সম্ভাবনা ইতিহাসের সর্বকালেই থাকে। এখনও আছে।

বর্তমান ‘আধুনিক’ যুগই মানুষের শেষ গন্তব্য, আর এখানেই ইতিহাসের শেষ ইস্টিশান – এটা আমি মানি না। কিন্তু ‘না’ বললে সমস্যা মেটে না, বাড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে এই যুগকে অতিক্রম করে যাবার ক্ষেত্রগুলো শনাক্ত করব কিভাবে? সেটা করতে হলে প্রথমেই দরকার পুরানা চিন্তার অভ্যাস ত্যাগ করা। পুরানা চিন্তার অর্থ হচ্ছে নতুন বাস্তবতাকে বোঝা ও বিচারের ক্ষেত্রে পুরানা, অনুপযোগী ও ব্যর্থ মতাদর্শ আঁকড়ে ধরা থাকা। যেমন, আধুনিক ও অনাধুনিকতার বিভাজনকে বিচারের মানদণ্ড জ্ঞান করে নির্বিচারে আধুনিকতার পক্ষে সাফাই গাওয়া। পরীক্ষা-নিরীক্ষার, উদ্ভাবনের কিম্বা নতুন ভাবে চিন্তা করবার কোন দায় পুরানা মতাদর্শের নাই। জালিম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াই যদি নিজের  মতাদর্শিক খাপের সঙ্গে না মেলে তাহলে নতুন ভাবে চিন্তা না করে খোদ বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হচ্ছে পুরানা চিন্তার বদ্ধমূল অভ্যাসের লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য। মজলুমের রাজনীতির জন্য তা প্রবল ও প্রকট বাধা হয়ে ওঠে। অতএব  নতুন ভাবে চিন্তা নিছকই দর্শনের প্রশ্ন নয়। সরাসরি রাজনীতিরও প্রশ্ন। এই পরিস্থিতিতে কখন কি করতে হবে তার হদিস নতুন ভাবনাই দিতে সক্ষম। কোন আগাম বানানো মতাদর্শ, ছক বা পাথরে খোদাই করা কর্মসূচি নয়।

যারা গন্তব্য আগাম নির্ণয় (teleology) করে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবাকে দার্শনিক কারণে গ্রহণযোগ্য মনে করেন না, তাদের কাছে একই প্রশ্ন ভিন্ন ভাবে তোলা যাতে পারে। যেমন, নিজেদের বিগত ইতিহাসের ফল হিসাবে আমরা এখন যেভাবে নিজেদের দেখছি, জানছি বা বুঝছি—এটাই মানুষের সর্বশেষ রূপান্তর কিনা। পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বাইরে আমাদের নিরন্তর তৈয়ারি করছে। পুঁজির ইচ্ছা হয়ে উঠছে আমাদের ইচ্ছা ও সংকল্প। টেলিভিশানের বিজ্ঞাপন হয়ে উঠছে আমাদের কামনা-বাসনার ইঞ্জিন, ইত্যাদি। আমাদের অজান্তে টেকনলজি আমাদের ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি ও চিন্তার ধরণ বদলে দিচ্ছে; ক্ষমতা কখনও রাষ্ট্রের রূপ নিয়ে, কখনও মতাদর্শের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে মাথা ধোলাই করছে; দৈনন্দিন জীবনের আরও নানান কারিগরি ও কারবারের মধ্য দিয়ে আমরা বদলে যাচ্ছি। আমরা কি টের পাই? বুঝি? এই পরিস্থিতিতে ‘মানুষ’ নামক ভিন্ন কোন কর্তাসত্তার চিন্তা সম্ভব কি? যে 'কর্তা' ব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে ইতিহাস ও বর্তমানকে বিচার করতে পারে? কী ‘আছে’ আর কী করা ‘উচিত’ এই দুইয়ের মধ্যে ফারাক করতে সক্ষম হয় যেন বর্তমান থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন বর্তমা্ন নির্মান করা মানুষের পক্ষে সম্ভবপর এটা প্রমাণ করতে পারে।

কাজটি সহজ নয়। কথাগুলো তুলছি এ কারনে যে অনেকে এটা মানতে রাজি না। তাদের দাবি, হয় কেউ আধুনিক অথবা অনাধুনিক। হয় কেউ প্রগতির পক্ষে অথবা প্রতিক্রিয়াশীলতার। এই দুই খাপের বাইরে নাকি যাওয়া নিষেধ। তো এই নিষেধ আমি অমান্য করে চলেছি। তাদের কাছে ‘প্রগতি’র অর্থ বর্তমানকে মেনে নেওয়া। বর্তমানের বিরুদ্ধে তাদের নালিশ বা আপত্তি নাই তা নয়, কিন্তু তারা আধুনিকতার পরিমণ্ডলে সেই নালিশের মীমাংসা খোঁজে। যেখানে যেখানে আপত্তি আধুনিকতার সেই জায়গাগুলো শুদ্ধ করে নিতে চান তারা। সেটা হতে পারে সংস্কারমূলক, কিম্বা পদ্ধতির দিক থেকে বৈপ্লবিক; কিন্তু আধুনিকতার গোড়ার ভিত্তি ঠিক রেখে। অর্থাৎ আধুনিকতার মধ্যে আধুনিকতার প্রকল্প বাস্তবায়ন।


childquran

ধর্ম ও ধর্মতত্ত্বের পর্যালোচনার অর্থ  ইসলামকে শুধু সমাজতত্ত্ব বা ইতিহাস হিসাবে পাঠ করা নয়। বলাবাহুল্য এই উপমহাদেশে ইসলামের নিজস্ব ইতিহাস আছে যা  মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা অন্য দেশের ইতিহাসের মতো নয়। এমনকি আরব দেশের মতোও নয়। এইসব দেশের ইসলামের সঙ্গে বাংলাদেশের ইসলামের সম্পর্ক আছে, বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই উপমহাদেশে তার ইতিহাস ভিন্ন। এমনকি বাংলাদেশে ইসলামের ইতিহাস ভারত ও পাকিস্তানের ইসলাম থেকে আলাদা। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য বোঝা জরুরী।

কিন্তু সবচেয়ে বেশী জরুরী একটি শিশু কোরান বা অন্য যা কিছুই পাঠ করুক জগতকে বোঝা ও প্রশ্ন করবার ক্ষেত্রে যে অনুমান ও উপলব্ধি নিয়ে বেড়ে উঠছে তার পর্যালোচনা। তার বিশ্বাসের ক্ষেত্রগুলোকে প্রশ্ন করার সীমা ও এখতিয়ার সম্পর্কে সে তার শিক্ষার পরিমণ্ডল ও সমাজ থেকে  কী শিক্ষা লাভ করছে, কারন এর মধ্য দিয়ে তার যে বিশ্বাস ও নানান অনুমান দানা বাঁধে তার সঙ্গে একটি জনগোষ্ঠির বেড়ে ওঠার সম্ভাবনা ও সীমা অনেকাংশেই নির্ণিত হয়ে যায়।  সেটা একই ভাবে তথাকথিত আধুনিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ছেলেবালা থেকেই আমরা কী শিক্ষা নিচ্ছি, কি পড়ছি ও কিভাবে পড়ছি এবং তা কিভাবে ব্যাখ্যা করছি, সেটা সতর্কতার সঙ্গে বোঝা দরকার।  বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা যে অনুমানগুলোর ওপর গড়ে উঠেছে তাকে প্রশ্ন করবার ও নতুন করে নির্মানের ক্ষেত্রে ইসলাম আদৌ কোন দিশা হতে পারে কিনা সেটা 'বিশ্বাস' হিসাবে নয়, চিন্তার নিজের শক্তির জায়গা থেকে বুঝতে হবে।


ফলে আমি যে রাজনীতির কথা বলি সেখানে প্রগতিবাদীদের সঙ্গে যেমন মেলে না, তেমনি স্বঘোষিত প্রগতিবাদীদের মানদণ্ডে যারা প্রতিক্রিয়াশীল চিহ্নিত হয়েছেন তাদের সঙ্গেও নয়। কারন আধুনিকতার বিরুদ্ধে অনাধুনিকতা কায়েম আমার রাজনীতি না। যে অনুমান, জ্ঞানগত ভিত্তি ও ঔচিত্যবোধ ‘আধুনিকতা’ নামক বর্তমানকে পয়দা করেছে, তাকে আমি মানুষের কাম্য জ্ঞান করিনা, শেষ গন্তব্য তো নয়ই -- আমার কাজ তাকে বদলে দেওয়া। নিদেন পক্ষে আদৌ তা সম্ভব কিনা সেটা যাচাই করে দেখা। তার জন্য কাজ করা। অতএব ধর্ম, দর্শন, কাব্য, শিল্পকলা, গান, সিনেমা, নাটক ইত্যাদির প্রতি আমার আগ্রহ তুমুল। একই সঙ্গে বর্তমানের মুখে তুড়ি মেরে যে জীবন একা, নিঃসঙ্গ ও দ্রোহী তাদের প্রতি আমি একাত্ম বোধ করি। যদিও চোর থালা চুরি করে নিয়ে গিয়েছে বলে চোরের ওপর রাগ করে থাকা আমার পথ নয়: সমাজ আমাকে সমাজছাড়া করতে চাইলেও আমি সমাজত্যাগী হতে চাই না। বরং যে-সমাজে মানুষ একই সঙ্গে ব্যক্তি ও সামাজিক সেই সমাজের সন্ধান আমি করি। ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে পাল্টা লড়ি। ব্যাক্তির নিরাকরণ ঘটাবার জন্য নয়, তাকে সামাজিক করে তোলার জন্য। সমাজের প্রান্তে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে যে মানুষগুলোকে সমাজ, আইন ও রাষ্ট্র অদৃশ্য ও অবাঞ্ছিত করে রাখে -- আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যাদের মেরে ফেলতে আমাদের নীতিনৈতিকতায় বাঁধে না -- তাদের প্রতি আমার আগ্রহও চরম। কারণ রাষ্ট্র ও আইন কিভাবে আমদের জীবমাত্রে পরিণত করে, ফাঁসিতে ঝোলায়, গুলি করে লাশ বানায় – আইন ও জীবব্জীবনের এই মাঝখানের জমিনটুকু আমি চিনতে চাই– মানুষ যদি শুধু জীব না হয়, তাহলে কী সে আসলে? এটা আমি বুঝতে চাই। অন্বেষণই আমার ধর্ম।

ঠিক। আমার বিরুদ্ধে প্রগতিবাদীদের অভিযোগের প্রধান একটি কারন হচ্ছে ধর্ম। আমি ধর্মে উৎসাহী, আগ্রহী। ধর্ম আমার কাছে পরিত্যাগের বিষয় নয়। আধুনিকতার কালে এসে ধর্ম বা ধর্মতত্ত্ব তার গুরুত্ব হারিয়েছে, তার কিছু দেবার নাই -- এমন আমি মনে করি না। নিজেকে যেমন নিজে ত্যাগ করতে পারি না, ধর্ম ও ধর্মতত্ত্বও তেমনি। তবে আধুনিকতার কালে ধর্মের উপস্থাপন ও তাৎপর্য ভিন্ন । ভিন্ন বলে তা ধর্ম বা ধর্মতত্ত্ব কিনা নাকি নিছকই মতাদর্শ তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। কিন্তু ধর্ম, ধর্মতত্ত্ব বহাল তবিয়তেই আছে। থাকবে। একসময় দাবি করা হোত আধুনিকতার প্রাবল্যে ধর্মের লয় ঘটবে। আধুনিক হলে মানুষ বিভিন্ন কুসংস্কার থেকে মুক্ত হয়ে ধর্মের কুপ্রভাব থেকে মুক্ত হবে। এই ধারণার পেছনে অনুমান হচ্ছে আধুনিকতার মানে ধর্মহীনতা। কিন্তু ধর্ম লোপ পাওয়া দূরে থাকুক – ফিরে এসেছে আরও শক্তি নিয়ে। এখন পাল্টা অভিযোগ উঠেছে খোদ ‘আধুনিকতা’ই কুসংস্কার। সংস্কারের মধ্যে কোনটা ‘কু’ আর কোন্‌টা ‘সু’ সেই তর্ক আমার জন্য অর্থহীন। নীতিবাগীশগিরি আমার কর্তব্য না। নীতিবাদিতা ক্ষমতা চর্চার অংশ। ক্ষমতার বিচার ছাড়া নীতির মর্ম ঠাহর করা মুশকিল। আর সেটা করতে হলে আমাকে দর্শনে ফিরে আসতেই হয়। নতুন করে বর্তমানকে পর্যালোচনার দরকারে। মানুষের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে আমরা নিজ নিজ অবস্থান ও কর্তব্য নির্ণয় করি। কিভাবে সেটা নির্ণয় করা হোল, তার অনুমান ও ভিত্তি নিয়ে আমি প্রশ্ন তুলি। কারণ বিদ্যমান অনুমান বা চিন্তার ভিত্তির বাইরেও ভিন্ন অনুমান ও ভিত্তি তাকতেই পারে। আমার অন্বেষণ এই প্রশ্ন দিয়েই শুরু হয়।

আমার কাছে ধর্ম দার্শনিক অন্বেষণের বিষয় তো বটেই একই সঙ্গে রাজনীতিরও। এছাড়া বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলাম সম্পর্কে আমার আগ্রহ থাকা খুবই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের মানুষকে বুঝতে গেলে ইসলাম বোঝা আমার কাছে খুবই গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। আমি মনে করি, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ইসলামের উপস্থিতির চরিত্র ও চর্চার ধরণই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ণয় করবে। সেটা আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না। প্রশ্ন হচ্ছে এই চর্চার চরিত্রে আমরা এমন কিছু ছাপ ফেলতে পারি কিনা যা বর্তমানকে অতিক্রম করে যাবার অনুকুল হবে। সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংস ও পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিনাশের পরে যে নতুন জগত গড়ে উঠবে এবং উঠতে বাধ্য – সেই জগতের নির্মাণে ইসলামের কোন ভূমিকা থাকবে কি? তার আবির্ভাব মূহূর্তে চিন্তার এমন কোন প্রকাশ ছিল কিনা যার হদিস নেওয়া ছাড়া সেই জগতের কল্পনা অসম্ভব হয়ে ওঠে? ইসলামের রাজনৈতিক প্রস্তাবনা ও সংকল্পে বৈশ্বিক ও সার্বজনীন কী ছিল, যার পাশে আধুনিকতার সার্বজনীনতা ও বৈশ্বিকতাকে প্রাদেশিক মনে হয়?  কী সেই উপলব্ধি, অভিজ্ঞতা বা সত্য যা সকল প্রকার নিহিলিজমকে অসম্ভব করে তোলে? ইসলাম কিসের ‘সাক্ষ্য’ দেয়? মানুষের জীবনের যদি কোন কোন অর্থই না থাকে তাহলে কীসের সমাজ? কীসের ইতিহাস? কীসের রাজনীতি?

এই প্রশ্নগুলো গোলকায়নের এই কালে আমরা আগের চেয়েও আরও তীব্র ভাবে শুনতে পারছি, আগে প্রশ্নগুলোর তাৎপর্য এখনকার মতো স্পষ্ট ছিলনা? নিজের ইতিহাস কিম্বা ঐতিহ্য থেকে ইসলাম এই সকল প্রশ্নের মীমাংসার ক্ষেত্রে কিছু যোগ করতে পারবে কিনা – কিম্বা নতুন নির্মাণের ভিত্তি চেনা ও বিকশিত করে তোলার ক্ষেত্রে ইসলাম আদৌ নতুন চিন্তার সহায়ক কিনা সেটা খোলা মনে আমি খুঁজে দেখতে বদ্ধ পরিকর। সংক্ষেপে, আধুনিক/অনাধুনিকের বিভাজন অতিক্রম করে বাংলাদেশে ইসলাম আদৌ কোন নতুন চিন্তা ও চর্চার দিশা দিতে পারবে কিনা সেটা নিরীক্ষণ করা, বোঝা প পর্যালোচনার কোন বিকল্প নাই। আমি আমার চিন্তা ও তৎপরতার র জায়গা থেকেই এটা জরুরী কর্তব্য গণ্য করি। এতে কোনই সন্দেহ নাই।

আমি কার্ল মার্কসের ছাত্র। তাঁর গুরু হেগেলের কাছ থেকেই আমি শিখেছি যে ধর্ম বা ধর্মতত্ত্বের মধ্য দিয়ে যার আবির্ভাব ও  চর্চা সেটাও চিন্তা। মানুষেরই ভাবনা।ধর্মতত্ত্ব দর্শনের মতই সমান গুরুত্ত্বপুর্ণ চিন্তা। অবশ্যই। দর্শনের সঙ্গে তার পার্থক্য হচ্ছে তার উপস্থাপনার রূপে। অর্থাৎ মানুষের নিজ নিজ অভিজ্ঞতাকে হাজির করবার ক্ষেত্রে চিন্তার নিজের একটা বিশেষ ধরণ আছে; চিন্তা নিজের স্বরূপে নিজেকে হাজির না করলে শুধু ধর্ম কেন বিজ্ঞান, নীতিবিদ্যা বা রাষ্ট্রতত্ত্ব কোনকিছুকেই ‘দর্শন’ বলা যায় না। হেগেল প্রটেস্টান্ট ধর্মকে দার্শনিক জায়গা থেকে পাঠ করেছেন। তাহলে ইসলামকে দর্শনের জায়গা থেকে বোঝার একটা কর্তব্য বাংলাদেশের জনগণের রয়েছে। সে কর্তব্যে আমি লিপ্ত আছি, থাকতে চাই।

অর্থাৎ ধর্ম ও ধর্মতত্ত্ব অবশ্যই দর্শন ও রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মার্কস, লেনিন বা এঙ্গেলস কিভাবে ধর্মের মোকাবিলা করেছেন সেটা আমি ‘মোকাবিলা’ বইতে দেখাবার চেষ্টা করেছি। একে মোকাবিলা না করে সমাজের কোন মৌলিক রূপান্তর অসম্ভব। একে কিভাবে আমরা মোকাবিলা করছি ও আমাদের ঐতিহাসিক ভুমিকা নির্মানে আত্মস্থ করছি তার ওপর আগামি দিনের বাংলাদেশের রাজনীতি নির্ভর করবে। কিন্তু প্রগতিবাদীরা পরিশ্রমে আগ্রহী নন। তাদের ফতোয়া হচ্ছে, আমি এককালে কমিউনিস্ট ছিলাম, এখন ইসলামপন্থী হয়েছি। আমি দোষী! ঘোড়াও হাসে!!! তাই না?


workers

অনেক দেশে বামপন্থিরা মুসলমানদের তাদের পতাকার নীচে আহ্বান করে। 'উই ওয়েলকাম মুসলিমস হিয়ার' কিন্তু সেটা তাদের রাজনীতিকে মোকাবিলার আহ্বান নয়, কিম্বা চিন্তার কোন আদান প্রদানও নয়। এই আহ্বান সেই বদ্ধ অনুমানকে প্রশ্ন করে না যার আধিপত্যের কারনে ভাবা হয় মুসলমান নিজেকে 'মুসলমান' পরিচয় দিয়ে নতুন কিছু ভাবতে পারে না। ইসলাম সম্পর্কে জানা, পর্যালোচনা ও একালে তার কোন ভূমিকা থাকতে পারে কিনা সেই চিন্তা তো অনেক দূরের ব্যাপার। পুরানা বামপন্থী চিন্তার অধীনে মুসলমানদের স্রেফ দলে ভেড়ানোই এখানে উদ্দেশ্য।  বাংলাদেশেও অনেকের লেখায় ফিলিস্তিনে বা অন্যত্র 'মুসলমান' নির্যাতীত বলে কাউকে কাউকে পলিটিকালি কারেক্ট থাকার চেষ্টা করতে দেখি। 'মুসলিম পরিচয়' তখন 'বিপন্নতার সেকুলার ডাকনাম' হয়ে ওঠে। এইসব সেকুলারদের মুসলমান দরদী হওয়া কোন নতুন উপলব্ধির  ইঙ্গিত নয়। গত রাতের বাসি ভাত সকালে ভাজি করে খাওয়া যেমন নতুন রান্না নয়, এটাও তেমন।  মতান্ধতার ছক না ভেঙ্গে বহু সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের আবাহন প্রত্যকের নিজ নিজ জায়গার মতান্ধতাকেই মজবুত করে। উদারনৈতিক রাজনীতির ধারক সেকুলারদের এই উদার সহনশীলতা চর্চা  পাবলিক প্রদর্শনীর অধিক কিছু হয় না।


মজার ব্যাপার হচ্ছে, ইসলামপন্থিদের মধ্যে যারা ধর্ম/অধর্মের বিভাজন দিয়ে জগত বিচার করেন তারাও তাই মনে করেন। কমিউনিজম নাস্তিক্যবাদীদের দর্শন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর কার্ল মার্কস সহ নাস্তিক্যবাদীদের জগত ভেঙে গিয়েছে। কমিউনিজমের ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে গিয়েছে। তাদের অনেকে মনে করেন, আমি এককালে কমিউনিস্ট ছিলাম। কমিউনিজমের এই দুর্দশা দেখে আমি ধর্মে প্রত্যাবর্তন করেছি। তাদের সামনে কবি আল মাহমুদের উদাহরণ আছে। তারা এর বেশী ভাবতে সক্ষম নন। তাদের আমি দোষ দেই না। আল মাহমুদকেও নয়। কারন এর বেশী বাংলাদেশে আমরা এখনও ভাবতে শিখি নি।

আমার দুর্ভাগ্য, দুই পক্ষই ভুল করেন, ভুল বোঝেন। সাধারণ ভাবে বাংলাদেশের চিন্তার দৈন্যতাই এর জন্য দায়ী। আধুনিকতা ও অনাধুনিকতার যে বিভাজন আমি পরিহার করি সেই একই তাগিদে ধর্মতত্ত্ব বনাম দর্শনের বিভাজনও আমি পরিহার করে চলি। অর্থাৎ চিন্তার যে অভ্যাস এই বিভাজনকে ন্যায্যতা দেয়, আমি তা স্বীকার করি না।

তাহলে আধুনিকতা ও ধর্ম নিয়ে বিস্তর কথা বলার আছে। বিষয়গুলো জটিল নয়। মুশকিল হোল, দৈনিক পত্রিকা্র উপসম্পাদকীয় সেইসব আলোচনার প্রশস্ত ক্ষেত্র নয় (লেখাটি আগে দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছিল)। তবে প্রথাগত চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসার অভ্যাস চর্চা না করলে এই বিষয়ে অগ্রসর হওয়া কঠিন। নিজের কৈফিয়ত হিসাবে এই কথাগুলো বলে রাখা আপাতত যথেষ্ট। তবে আধুনিকতা নিয়ে আরও দুই একটি কথা এখানে বলা দরকার।

দুই

‘আধুনিক’ হওয়ার অর্থ নিয়ে অনেক আলোচনা হতে পারে। তবে যে-অর্থের প্রতাপ সবচেয়ে বেশী সেটা হচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতাকে নির্বিচারে গ্রহণ করা এবং যারা এর বিপরীতে দাঁড়ায় তাদের অসভ্য ও পশ্চাতপদ গণ্য করা। মুখে বলি বা না বলি ‘প্রগতি’র অর্থ দাঁড়ায় ইংরেজ, ইউরোপীয় বা মার্কিন হওয়ার সাধনা; তবে এই দেশগুলোর মধ্য একাট্টা একপ্রকারের সংস্কৃতি ও সভ্যতার চর্চা চলে, ব্যাপারটা তা না। কিন্তু সেভাবেই এদের দেখতে আমরা অভ্যস্ত। এই দেশগুলো বাংলাদেশের মতো অনাধুনিক (?) দেশে আধুনিকদের চিন্তাচেতনা, কল্পনা ও সংকল্পের মডেল হয়ে হাজির থাকে। চিন্তাচেতনা, পোশাক পরিচ্ছদ, গান বাজনা, খাওয়া দাওয়া, বাড়িঘর সবকিছুই পাশ্চাত্য আধুনিকতার ছকে মেনে বা মডেল অনুসরণ করে গড়ে ওঠে। এমনকি নীতিনৈতিকতা, রাষ্ট্রব্যবস্থা ইত্যাদি সবকিছুরই প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায় পাশ্চাত্য।

আধুনিকতার সাধনা দেশে থেকে করি, কিম্বা বিদেশে পাড়ি দিয়ে তাতে বিশেষ কিছুই আসে যায় না। যারা নানান কারনে সচেতন হয়ে এর বিরোধিতা করেন, তারা আধুনিকতা, সভ্যতা ও প্রগতির ধারণা থেকে বেরিয়ে আসেন সেটা বলা যাবে না। তারা নিজের একটা ভিন্ন পরিচয় নির্মাণের চেষ্টা করেন। তার ভিত্তি হতে পারে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম, ঐতিহ্য বা অন্য কিছু। নিজেকে বিদ্যমান ব্যবস্থা থেকে আলাদা ভাবা ও নিজের ভিন্ন পরিচয় নির্মাণ ও আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করেন তারা। তবে আধুনিকতার পরিমণ্ডলের মধ্যে থেকেই আত্ম-পরিচয় নির্মান, জাতীয়তা নির্ণয় বা শত্রুমিত্র নির্ধারণ আধুনিকতার বাইরের কোন ব্যাপার না। আধুনিকতারই অন্তর্গত বিষয়।


চার্লি চ্যাপলিন দেখুন। আধুনিকতার সমালোচনা শুধু যান্ত্রিকতার সমালোচনা নয়। কিন্তু যান্ত্রিকতার দিকটা বোঝাও জরুরী।


আধুনিকতার মধ্যে নিজেকে ভিন্ন ভাবা ও নিজের আলাদা আত্ম-পরিচয় নির্মাণের দুটো সম্ভাব্য পরিণতি হতে পারে। এক. আধুনিকতার পরিমণ্ডলের মধ্যে নিজের স্বার্থের জায়গা হাসিল করবার কাজেই সেটা ব্যয় করা। নিজের ভিন্নতা নিয়ে ‘আধুনিক’ হয়ে থাকা যাতে আধুনিকতার মধ্যে নিজের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্বার্থ রক্ষা করা যায়। এটা পাশ্চাত্য সভ্যতাকে নির্বিচারে গ্রহন করবারই ধারাবাহিকতা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আধুনিকতা ও পাশ্চাত্যের একাট্টা বিরোধিতা। সেটা অসহায়ের আর্তি হয়ে গুমরে মরতে পারে, অথবা হান্টিংটন মার্কা সভ্যতার দ্বন্দ্ব তত্ত্বের ওপর দাঁড়িয়ে পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে লড়াই হয়েও উঠতে পারে। ‘রাজনৈতিক ইসলাম’ নাম দিয়ে যার বিরুদ্ধে পাশ্চাত্য সকল শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ হিসাবে একালে যা আমাদের সামনে দৃশ্যমান। ইসলামের পতাকা নিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও পাল্টা আঘাত হানার চেষ্টাও চলছে।

প্রথম ধারাকে আমরা অনায়াসেই শনাক্ত করতে পারি। যেমন, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আধুনিক করে তোলা ও আধুনিক পরিমণ্ডলের মধ্যে স্বীকৃতি আদায়। আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও আধুনিক বাংলা গান যেমন দৃষ্টান্ত। তেমনি, ধর্মের আধুনিকায়ন। দাবি করা যে ধর্মের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞান, প্রগতি, গণতন্ত্র, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ইত্যাদির কোন বিরোধ নাই। দরকার ধর্মের সঙ্গে আধুনিকতার সংঘাতের ক্ষেত্রগুলো দূর করা। আধুনিকতাকে নয়, আধুনিকতার আলোকে ধর্মের সংস্কার করা। ইসলামকে ‘আধুনিক’ ও ‘যুগোপযোগী’ করে তোলা যেমন। তথাকথিত ‘ইসলামি সভ্যতা’র কল্পনা ও তার আধুনিক নির্মাণ; কিম্বা, আধুনিকতার আলোকে হিন্দু সভ্যতার ধারণা নির্মাণ; দাবি করা যে ‘হিন্দুত্ববাদ’ পাশ্চাত্যসভ্যতার স্বাভাবিক মিত্র (natural ally) -- ইত্যাদি।

বিভিন্নতা ও বৈচিত্রের জগত থেকে তথাকথিত ‘সভ্যতার’ কাল পর্বে প্রবেশের পেছনে অনুমান হচ্ছে যারা সভ্যতার দাবিদার তারা অপরকে ‘অসভ্য’ বলে চিহ্নিত করতে ও তাদের অধীনস্থ করতে পারে এবং তা ন্যায্য। দেখা যাচ্ছে ‘সভ্যতার’ ধারনার মধ্যেই গোলমাল আছে। একে পরিহার করে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

এটা মনে রাখতে হবে তথাকথিত ‘সভ্যতা’র ধারণা আসলেই একটি আধুনিক ধারণা। এর সঙ্গে দখলদারি, উপনিবেশ স্থাপন, সাম্রাজ্যবাদ এবং এক জনগোষ্ঠির দ্বারা অন্য জনগোষ্ঠির দমন পীড়নের ইতিহাস জড়িত। সেই রক্তাক্ত ইতিহাস বাদ দিলে ‘পাশ্চাত্য সভ্যতা’ নামক কোন সার্বজনীন সভ্যতার অস্তিত্ব নাই। ইতিহাস ভুলে গেলে ‘সভ্যতা’ কথাটার কোন অর্থই দাঁড়ায় না। নিজেকে অন্যদের চেয়ে ‘সভ্য’ দাবি করার অর্থ অন্যকে বা অপরকে সামরিক ভাবে কিম্বা সার্বজনীন আইন, বিধিবিধান, নীতিনৈতিকতা কিম্বা সার্বজনীন সাংস্কৃতিক মানদণ্ডের দোহাই দিয়ে অধীনস্থ রাখার ধারাবাহিক ইতিহাস অক্ষুণ্ণ রাখা এবং তা ন্যায্য বলে দাবি করা। সার কথা হচ্ছে যে কোন জাতিবাদী কিম্বা সভ্যতাবাদী আত্ম-পরিচয় কিম্বা নিজের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দাবি করার রাজনীতি আধুনিকতার বাইরের কিছু না। এইসব আধুনিকতারই অন্তর্গত প্রক্রিয়ার অংশ।

আধুনিকতা বা পাশ্চাত্য সভ্যতার একাট্টা বিরোধিতার আদৌ কোন ভবিষ্যৎ আছে কিনা আমি সন্দেহ করি। বিদ্যমান কোন ব্যবস্থার পর্যালোচনা, বিদ্যমান ব্যবস্থা থেকে নিজের দূরত্ব অনুভব করা এবং সেই ভিন্নতার উপলব্ধির (intuition) তাগিদে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে নতুন করে জানা, বোঝা, বিশ্লেষণ করার চেষ্টা এবং তাকে রাজনৈতিক ও সামরিক ভাবে প্রতিরোধ খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া থেকে অবশ্যই মানুষের ভবিষ্যৎ চলার পথ কি হতে পারে তার বহু কিছুরই মীমাংসা হবে। কিন্তু সেটা বিদ্যমান ‘সভ্যতা’ বিলুপ্তি ও বিনাশ ঘটিয়ে বিদ্যমান সভ্যতা যাদের ‘অসভ্য’ ও ‘বর্বর’ বলে চিহ্নিত করে তাদের অধিষ্ঠিত করা কিনা সে বিষয়ে আমি সন্দেহ পোষণ করি। কারন এই বিভাজন অতিক্রম করাই কাজ, তাকে প্রতিষ্ঠিত করা নয়। ইতিহাসের অভিমুখ সেই দিকে নয়। আধুনিকতার পক্ষ বা বিপক্ষ হয়ে আমরা একালে আধুনিকতার এই কালপর্ব অতিক্রম করে যেতে পারবো না। আধুনিকতার ধারণা মাথায় রেখে কোন নতুন প্রণোদনার আবির্ভাব অসম্ভব। অথচ বিশ্বব্যবস্থার রূপান্তর নিয়ে চিন্তা ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক নীতি ও কৌশল নিয়ে ভাবনার মানে হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন ভাবে চিন্তা করবার ক্ষমতা অর্জন করা, যে সকল বিষয় এতোকাল মীমাংসিত বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল সেইসব কিছুকে নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে শেখা। বলাবাহুল্য, এটাই একালের রাজনীতি।

এই কাজকে যদি চিন্তার পরিমণ্ডলে আমরা সীমিত রাখি তাহলে আধুনিকতার পরিমণ্ডল ভাঙা কঠিন বলেই আমরা মনে হয়। সেই দিক থেকে জালিম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াইয়ের ক্ষেত্রের প্রাধান্য অনস্বীকার্য। আমার লেখায় বারবার এই দিকটির ওপর এ কারনেই আমি জোর দিয়ে থাকি। অর্থাৎ বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েই মানুষ নতুন ভাবে ভাবতে শেখে, অর্থাৎ সেই ভাবনারই দরকার হয়ে পড়ে যা একই সঙ্গে লড়াইকে তীব্র ও পরিবর্তনকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে। নতুন চিন্তা স্রেফ নতুন বলেই সমাজ বদলাতে পারে না, বিদ্যমান ব্যবস্থা রূপান্তরের তাগিদই মানুষকে নতুন চিন্তার প্রতি আগ্রহী করে তোলে।

তিন

এককালে সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক অসাম্যের বিরুদ্ধে কমিউনিস্টরা লড়েছিলেন। এখনও লড়েন। কিন্তু এ লড়াই আধুনিকতার বিরুদ্ধে নয়। এমনকি কমিউনিজমের জন্যও নয়। সমাজতন্ত্রের জন্য। কিম্বা বলা যায়, আরও আধুনিক হয়ে ওঠার জন্য। বাস্তবে তার যে রূপ ও নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা সেই পর্বের (actually existing socialism) পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এখন সেই পর্ব আবার ফিরে আসার আর কোনই সম্ভাবনা নাই। এটা ঠিক যে এতে কার্ল মার্কস বা বিপ্লবী রাজনীতির শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা বাতিল হয়ে যায় নি। মার্কস পুরা মাত্রায় তাঁর অর্থশাস্ত্র নিয়ে বহাল আছেন। প্রশ্ন ওঠে, তিনি মানবেতিহাসের যে অনিবার্য ভবিষ্যৎ অনুমান করেছিলেন সেটাও কি তাহলে বাতিল করে দিতে হবে?

আধুনিকতার অর্থনৈতিক ভিত্তি হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্ক। কিন্তু এই সম্পর্কই আবার উৎপাদন শক্তির বিকাশের পথে বাধা। এ কারণে মার্কস পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার দ্বন্দ্ব নিরসনের কথা বলেছিলেন। এর উপরই তাঁর কেন্দ্রীভূত নজর নিবদ্ধ ছিল। বাস্তবের সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার কথা বাদ দিলে আজও কমিউনিস্টদের লড়াই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই কেন্দ্রীভূত। সংস্কৃতি ও নীতিনৈতিকতা  প্রশ্ন গৌণ। আধুনিকতার বাইরের কোন রাজনীতির সম্ভাবনা তারা স্বীকার করেন না। অর্থাৎ আধুনিকতার বিরোধী তারা নন, আধুনিকতার অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব নিরসনের মধ্যেই তারা তাদের কর্তব্য নির্ধারণ করেন। এর জন্যই তারা লড়েন। যে কারনে বলা হয় কমিউনিস্ট আন্দোলন তার অনেক ইতিবাচক অর্জন সত্ত্বেও শেষ বিচারে আধুনিকতার অসম্পূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের চেষ্টা মাত্র। তার অর্থনৈতিক ভিত্তির মুশকিল আসান। এটাই কমিউনিজমের ঐতিহাসিক রূপ – এটাই আমরা এ যাবত দেখেছি। আরও নানান কারনের মধ্যে বাস্তবে চর্চিত সমাজতন্ত্রে কমিউনিজমের পতনের দুঃসংবাদ এখানেও সম্ভবত নিহিত ছিল। ইতিহাসের যে অনিবার্য অভিমুখের কথা তরুণ কার্ল মার্কসের কাছে শোনা গিয়েছিল যে একদিন মানুষের সঙ্গে মানুষের আর ভেদ থাকবে না, এক ও অবিভাজ্য মানুষের ‘সমাজ’ একদিন গঠিত হবে – এই প্রতিশ্রুতিই সকলকে উজ্জীবিত করেছিল। এখনও করে। কিন্তু পরবর্তীতে অর্থনৈতিক তত্ত্বের ভারে তরুণ স্বপ্নদর্শী মার্কস চাপা পড়ে গিয়েছেন। ফলে উৎপাদন শক্তির নির্বিচার বিকাশ মানবেতিহাসের পরমার্থ – এই দাবি নিয়ে বাস্তবে গড়ে ওঠা কমিউনিজম নিয়ে একালে নানান দিক থেকে প্রশ্ন উঠেছে। উৎপাদন শক্তির নির্বিচার বিকাশই কার্ল মার্কস চেয়েছেন কিনা তা নিয়ে তর্ক হতে পারে, কিন্তু বাস্তবের কমিউনিস্ট আন্দোলন এই দেয়ালের বাইরে যেতে পারে নি।

প্রশ্নগুলো নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা এখানে করবোনা। দুই একটি উল্লেখ করে রাখছি মাত্র। প্রথম প্রশ্ন উঠছে নারীদের দিক থেকে। নারী যেভাবে উৎপাদনের উপায় হিসাবে গরু, ঘোড়া, জায়গা জমির মতো ইতিহাসে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে উৎপাদন শক্তির বিকাশের প্রকল্পের মধ্যে নারীর ওপর জুলুমের মীমাংসা কি শুধু উৎপাদন শক্তির বিকাশের মধ্য দিয়ে সম্ভব? নারী সন্তান জন্ম দিতে না চাইলে তার জন্য জন্মনিরোধকই কি পথ? নাকি একমাত্র উপায় হচ্ছে প্রজাতি পুনরুৎপাদনকে প্রযুক্তির কারিগরিতে পর্যবসিত করে পুরা নারীজাতিকে মনুষ্য প্রজাতি রক্ষার দায় থেকে মুক্তি দেওয়া। টেস্টটিউব বেবি, কিম্বা ল্যাবরেটরির মধ্যে কারখানার মতো মানুষ পয়দা হবে। অসুবিধা কি? ইত্যাদি। নারী-পুরুষের যে-সম্পর্কের ভিত্তিত প্রজাতি পুনরুৎপাদন নিশ্চিত করা সম্ভব তাকে কি শুধুই উৎপাদন সম্পর্ক?  নাকি ইচ্ছা-আকাংখা-প্রেম-ভালবাসা ইত্যাদিকে আমলে নিয়ে মানুষ নামক ব্যাপারকে উৎপাদনের বাইরেও চিন্তা করা দরকার। এ ছাড়া গত্যন্তর নাই।

আরেকটি প্রশ্ন ওঠে প্রাণ, পরিবেশ, প্রাণ বৈচিত্র রক্ষা ইত্যাদির দায়বোধ থেকে। প্রাণ হিসাবে যদি মানুষ বেঁচে থাকতেই না পারে তাহলে উৎপাদন কার জন্য? কিসের জন্য? প্রকৃতি, প্রাণ ও পরিবেশের যে ধ্বংসযজ্ঞ চলছে তার পরিপ্রেক্ষিতে উৎপাদন শক্তির বিকাশই প্রগতি এটা মেনে নেওয়া কঠিন। প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ শুধু পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের কারণে ঘটেছে তা নয়, ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় বাস্তবের সমাজতন্ত্র যেসব দেশে একদা কায়েম হয়েছিল সেইসব দেশেও ঘটেছে।

Marx

এটা এখন পরিষ্কার যে কমিউনিজম ডাকনামে ঐতিহাসিক যে আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে আমরা পরিচিত সেটা আধুনিকতাকে তার গোড়াসুদ্ধ চ্যালেঞ্জ করতে পারে নি। সমাজকে নতুন কোন্‌ ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যায় তা নিয়ে নতুন চিন্তা ভাবনা অনেক দিন ধরেই চলছে। মাওজে দং নতুন মানুষ তৈয়ারির কথা বলেছিলেন বটে, কিন্তু চিন পুঁজিতান্ত্রিক পথ পরিগ্রহণের ফলে সেই চিন্তা অপরীক্ষিত রয়ে গিয়েছে। চিন বলি কি ভারত বলি আধুনিকতার যে রূপ আমরা ইউরোপে বা আমেরিকায় দেখেছি তার চেয়ে ভিন্ন কিছু এই নব্য ধনি দেশগুলো প্রদর্শন করতে পারবে সেটা ঘোরতর সন্দেহের বিষয়। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক দুনিয়া জোড়া যে পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিদ্যমান সেখানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বদল আসন্ন। এইবদল একটা বিশাল ঝড় ও তাণ্ডবের মধ্যেই ঘটবে। এর ফলে পুরা ব্যবস্থায় ধস নামতে শুরু করলে দুনিয়ার আন্দোলন সংগ্রামে নতুন চিন্তার আবির্ভাব, পরীক্ষা নিরীক্ষার উদয় ঘটতে পারে। অসম্ভব নয়। কিন্তু আধুনিকতার গোড়ার ভিত্তিকে প্রশ্ন করতে না পারলে এটা শুধু বিশ্বব্যবস্থার ক্ষমতার ভারকেন্দ্রের বদল ঘটবে। মৌলিক কোন রূপান্তর ঘটবে না।

এই সকল কারনে অর্থনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসার পাশা পাশি ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রশ্ন একালে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নতি ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব সমাধানের গুরুত্ব কমে নি, কিন্তু তুলনায় ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রশ্ন অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রশ্নকে আগে যেভাবে গুরুত্বহীন মনে করা হোত তারা যে আসলে মোটেও গৌণ বিষয় নয় সেটাই সামনে চলে এসেছে। আগের মতো এটা ভাববার কোন কারন নাই যে অর্থনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসা হলে সবকিছুরই সমাধান হয়ে যাবে। না, তা হবে না, এটা নিশ্চিত। পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার অন্তর্গত প্রক্রিয়া হিসাবে যে আধুনিকতা ও আধুনিক সংস্কৃতির মধ্যে আমাদের বসবাস তার অনুমানগুলো আমাদের মেনে নেবার কোনই কারন নাই। এখন আধুনিকতার জগত বা তার পরিমণ্ডল থেকে বেরিয়ে যাবার লড়াই চালিয়ে যাওয়া অনেক বেশী জরুরী

একালের রাজনীতিতে এটাই প্রধান বিষয়। যাঁরা এটা টের পেয়েছেন, তাঁরা আধু্নিকতা/অনাধুনিকতার বিভাজন ভেঙে নতুনকে সহজে শনাক্ত করতে শিখবেন।

একালে এটাই এগিয়ে যাবার পথ।

১৫ আগস্ট, ২০১৪, ৩১ শ্রাবণ, ১৪২১, শ্যামলী, ঢাকা