আমাদের এখনকার সংকট


বাংলাদেশ কোন দিকে যাচ্ছে এই প্রশ্ন প্রায় সকলের। রাজনীতি নিয়ে যে সকল আলোচনা দেখি তার অধিকাংশই হচ্ছে যার যার মনের বাসনার প্রতিফলন। সেটা হাজির হয় কোন দিকে যাচ্ছে তাকে নৈর্ব্যক্তিক বা ইচ্ছা অনিচ্ছার বাইরের একটি বাস্তব প্রক্রিয়া হিসাবে দেখবার চেষ্টা না করে ঔচিত্যবোধের জায়গা থেকে দেখবার বাসনা থেকে। অর্থাৎ কোন দিকে যাচ্ছে সেই আলোচনা না করে আমরা কোনদিকে যাওয়া উচিত সেই দিক নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে তুমুল তর্ক করতে শুরু করি। এর ওপর রয়েছে সঠিক তথ্যের প্রচণ্ড অভাব। কৃষি, খাদ্য ব্যবস্থা, শিল্পকারখানা, শ্রমিকের হাল হকিকত, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, জাতীয় আয় ব্যয়ের সঠিক হিসাব ইত্যাদির তথ্য-পরিসংখ্যানের সঠিকতা নিয়ে সন্দেহ। এই এক অদ্ভূত দেশ যেখানে শাসক শ্রেণী সারাক্ষণই সুশাসন নিয়ে কথা বলে, কিন্তু সেটা পর্যবসিত হয় দুঃশাসনের চর্চায়। কোটি কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে উন্নয়ন সাহায্যের নামে, কিন্তু আসলে তার ফল কি হচ্ছে তার কোন অব্জেক্টিভ বা নৈব্যার্ক্তিক মূল্যায়ন নাই বললেই চলে। যে যার জায়গা থেকে নিজ নিজ বাসনা অনুযায়ী নিজের কৃতিত্বের দাবি করছে। এর জন্য উন্নয়ন সাহায্য দাতারা অবশ্য পনেরো আনাই দায়ী।কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে?

সাংবিধানিক ও নৈতিক উভয় দিক থেকে একটি অবৈধ সরকার বাংলাদেশে ক্ষমতায়। নৈতিক অবৈধতার সত্য ক্ষমতাসীনরা নিজেরাই স্বীকার করে। সাংবিধানিক ভাবে অবৈধতার তর্কে তারা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার যুক্তি খাড়া করে। নির্বাচনের একটা বাধ্যবাধকতা ছিল। অতএব সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হয়েছে। বিএনপি সেই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করে নি, সেটা তাদের সমস্যা তার জন্য তো ক্ষমতাসীনদের দোষারোপ করা যায় না। এই হচ্ছে নিজেদের পক্ষে ক্ষমতাসীনদের বয়ান। অর্থাৎ সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথাই ক্ষমতাসীনরা বলে। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার কথা আমরা এই প্রথম শুনছি না। আগেও শুনেছি। বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কারের দাবি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে একনায়কতান্ত্রিক এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলনকে ‘এক দফা এক দাবি এরশাদ তুই কবে যাবি’র দাবিতে কিভাবে পর্যবসিত করা হয়েছিল সেটা আশা করি আমর ভুলি নি। সে এক ইতিহাস বটে। রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার কোন প্রকার সংস্কার ছাড়া তাপ্পি মেরে কাজ চালাবার কুফল আমরা এখন পদে পদে ভোগ করছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার হচ্ছে কাপড়ে তাপ্পি মেরে কাজ চালিয়ে যাবার মতো ব্যাপার। সেই তাপ্পিও যখন ছিঁড়ল আমরা বীরত্বের সঙ্গে এখন নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের মতো একটা ভোটাভুটির অনুষ্ঠান দেখিয়ে দাবি করছে, নির্বাচনে লোক আসুক বা না আসুক নির্বাচন নামক একটা লোক দেখানো অনুষ্ঠানই হচ্ছে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা। ফলে সংসদে অনির্বাচিতদের সংখ্যা নিয়ে ক্ষমতাসীনরা বিব্রত নয়। কিন্তু রাষ্ট্র ও সরকারের প্রথম ও প্রধান কর্তব্য হচ্ছে জনগণের ভোট দেবার অধিকার সুনিশ্চিত করা। ভোটারবিহীন নির্বাচন জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে নিয়েছে। ক্ষমতাসীনদের সাংবিধানিকতার দায়টা এখানেই। এই দায় পূরনে ক্ষমতাসীনরা ব্যর্থ বলেই তারা সাংবিধানিক অর্থে অবৈধ সরকার। নির্বাচনের ছলনা করা হয়েছে, ফলে সরকার আসলে অনির্বাচিত। এই সরকার সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও স্বাভাবিক নির্বাচনের ফল নয়। মোটকথা, এই সরকার সংবিধান সম্মত নয়। এই সমালোচনা লিবারেল বা উদারবাদী রাজনীতি যারা করেন তারা করছেন।

নিয়মতান্ত্রিক ভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর বা সরকার বদলের সম্ভাবনা বাংলাদেশে অবশিষ্ট আছে কিনা এখন অনেকেই সেটা সন্দেহ করে, কিন্তু বাস্তবতার বিচার করেই সেটা বুঝতে হবে। কারন এই সিদ্ধান্তের বিপজ্জনক ইঙ্গিত পরিষ্কার। ইঙ্গিত হচ্ছে ব্যক্তিকে অপসারন করলেই বুঝি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে। সেটা তো পঁচাত্তরেই আমরা একবার দেখেছি। ব্যাপারটা একজন ব্যাক্তিকে অপসারণের ব্যাপার নয়। যে রাজনৈতিক অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, যুক্তিহীন আবেগ ও মিথ্যার ওপর ব্যাক্তির রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে ওঠে তাকে দূর করার কাজটা রাজনৈতিক কাজ। সেটা রাজনৈতিক ভাবে সম্পন্ন না করলে ব্যক্তি ভূতের মতো পুরা জনগোষ্ঠির মাথার ওপর চেপে বসে। নামিয়ে ফেলা কঠিন কাজ হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ আমি শুধু সহিংসতা আর রক্তক্ষয়ের কথা ভাবছিনা। বিপদটা শুধু ওখানে নয়। ধরা যাক ক্ষমতাসীনদের অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কেউ না কেউ উৎখাত করল, একটা সাময়িক সরকার এল, তারা নির্বাচন দিয়ে লাইনচ্যূত ট্রেনকে আবার নিয়মতান্ত্রিক পথে তুলল। তারপর কী? এক এগারোর সময়ও ভিন্ন ভাবে রক্তপাত ছাড়া সেটা ঘটার ঘটনা আমরা দেখেছি। সেবার অবশ্য বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা উভয়কেই রাজনীতি থেকে অপসারিত করার চেষ্টা হয়েছিল। সেই সময়ের মাইনাস টু ফর্মূলা এখনও জারি রয়েছে। এর ফল হয়েছে লাইনে ট্রেন তোলা দূরে থাকুক, খোদ ট্রেন লাইনই গায়েব হয়ে গিয়েছে। এখন আমরা লাইনই খুঁজে পাচ্ছি না। ফলে আমরা এখন কোথায় এসে পড়েছি তার বিচার আমি পাঠকদের ওপরই ছেড়ে দিতে চাই। চেষ্টা এখনও চলছে। দেখছি। হয়তো সকলে কাঁধে ঠেলে ট্রেন খাড়া করবেন। কিন্তু লাইনটাই তো এখন আর নাই।

বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি এমন যে নিয়মতান্ত্রিক আইনী পরিমণ্ডলে থেকে রাজনীতির সুযোগ এখন খুবই সংকীর্ণ। যারা এখনও মাইনাস টু ফর্মুলা অনুযায়ী চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তাদের অনুমান হচ্ছে বাংলাদেশের সমস্যা রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে। খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাই সমস্যা। এটা সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক চিন্তার দুর্দশা নয়। আমরা না, দোষ দুই মহিলার। বলা বাহুল্য এই অপরিণামদর্শী চিন্তার কোন ভবিষ্যৎ নাই। ট্রেন লাইনের মেটাফোর আমাদের এটাও বলে -- যে-পথে দেশ চলছিল সেই পুরানা পথেই ঝক্কর ঝক্কর পুরানা রেলগাড়ি চলবে। না, এটাও মেনে নেওয়া যায় না। সাংবিধানিক, আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ও তার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত তৈয়ারির চেষ্টা ছাড়া অন্য শর্টকাট পথ বিপজ্জনক। সেটা নাই বলেই ক্ষমতাসীনরা সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের এদেশীয় সহযোগীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছে কিনা জানি না, কিন্তু সংস্কারের কোন সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ছাড়া সরকার পরিবর্তনের কথা জনগনও ষড়যন্ত্রের অনুমান দিয়েই বিচার করে। দেশীবিদেশী ষড়যন্ত্র ছাড়া অন্য কিছু জনগন ভাবতে পারে না। ভাবতে পারার সুযোগও নাই।

বর্তমান পরিস্থিতিতে অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা বদলের বিপদ ভয়ংকর। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি তুলনামূলক ভাবে এখন অনেক জটিল। বাস্তবায়নযোগ্য সংকল্প ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বসংঘাতের সম্ভাব্য মীমাংসা সম্পর্কে কমবেশী পরিচ্ছন্ন ধারণা ছাড়া অনিয়মতান্ত্রিক পথে বাংলাদেশে ক্ষমতার বদল পুরা উপমহাদেশ ব্যাপী যে নৈরাজ্য, সহিংসতা ও হানাহানির উৎপত্তি ঘটাবে তাকে সামাল দেওয়া গোলকায়নেরএই কালে অসম্ভব। মধ্য প্রাচ্যের দিকে তাকালেই আমরা তা বুঝব।

এখানে পূর্ণাঙ্গ বিচারে না গেলেও এটাতো আমরা বুঝি যে অর্থনৈতিক সম্পর্কের যেমন গোলকায়ন ঘটেছে একই ভাবে অস্ত্র, যুদ্ধবিগ্রহ, সশস্ত্রতা ও সহিংসতারও গোলকায়ন ঘটেছে। বাংলাদেশে এমন কোন ব্যাক্তি বা চিন্তাশীল গোষ্ঠি আমার নজরে পড়ে নি যারা এইসব বাস্তব পরস্থিতি বোঝেন, জানেন এবং একটা পরিণামদর্শী তুফান ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ষোল কোটি মানুষকে নিয়ে কুলে তরী ভেড়াবার বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞা ধারণ করেন। বিশেষত যে দেশের মানুষ ইসলাম ও সেকুলারিজম প্রশ্নে এমন ভাবে বিভক্ত যে সুযোগ পেলে একে অপরকে নির্মূল করবার ক্ষেত্রে দুই পক্ষই পরম উৎসাহী। কাকে দোষ দেব? এটাই এখনকার বাস্তবতা।

দুই

এই বিভক্তির ঐতিহাসিক ও মতাদর্শিক কারণ রয়েছে। উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছাড়া এ সমস্যা পুরাপুরি বোঝা যাবে না। এখানে ধর্ম নিরপেক্ষ ও ইসলামপন্থি রাজনীতিরও নিজস্ব ইতিহাস আছে। মুশকিল হচ্ছে আমাদের কাছে ইতিহাস মানে নয় মাসের ইতিহাস। কেন শিক্ষিত ও ধর্ম নিরপেক্ষ মধ্যবিত্ত শ্রেণি নয় মাসের বাইরে ভাবতে পারে না সেটা এক সমাজতাত্ত্বিক বিস্ময় বটে। খুব কম বাংলাদেশী বুদ্ধিজীবিকেই আমরা দেখি যারা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, বাংলাদেশের কৃষক, বঙ্গভঙ্গ, শেরে বাংলা ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির ইতিহাস মনে রেখে এই দেশের সাধারণ মানুষের ‘মুসলমান’ মানসিকতাকে বোঝার জন্য আন্তরিক চেষ্টা করেন। এই শ্রেণির ধারণা একাত্তরে আমরা এর মীমাংসা করে ফেলেছি, ইসলাম নিয়ে আমাদের আর নতুন করে ভাবার কিছুই নাই। এটাই আসলে চরম বিপদের জায়গা।

ইতিহা্সের সদর রাস্তায় না হয় উঠলাম না। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক দিক থেকেও যদি প্রশ্ন করি তো প্রশ্ন জাগে নজরুলের মতো একজন কবিকে কেন ইসলামি গান লিখতে হয়। আমরা বুঝতে চেষ্টা করি না বাংলাদেশের ফকির ফ্যাকড়া বাউল বয়াতিদের গানে ও বয়ানে ধর্ম কিভাবে হাজির থাকে। তারা ধর্মকে নাকচ করে না, কিন্তু যে বয়ান হাজির করে সেটা ধর্মতাত্ত্বিক নয়, বরং দার্শনিক। অথচ সাধারণ মানুষের চিন্তা ও প্রজ্ঞার এই সমৃদ্ধ ধারার কোন খোঁজই আমরা করি না। আমাদের রাজনৈতিক দ্বন্দ সংঘর্ষ মীমাংসার কোন সূত্র এখানে পাওয়া যায় কিনা সেটা আমরা সন্ধান করি না। ধর্ম ও ধর্ম নিরপেক্ষতার ইউরোপীয় বিভাজন বাংলাদেশের ফকির ফ্যাকড়া বাউল বয়াতিদের মধ্যে অনুপস্থিত, কারন তাদের চিন্তা ও সাংস্কৃতিক চর্চার ভিত্তি ইউরোপীয় রাজনীতি ও ইতিহাস থেকে তৈরি না। যদি গণমানুষের সংস্কৃতির জায়গায় আমরা দাঁড়াই তাহলে তারা কিভাবে ভাবুকতা ও সংস্কৃতির দ্বন্দের মীমাংসা করে তার মেধাবি ও সৃষ্টিশীল চর্চাগুলো আমরা শনাক্ত করতে পারতাম। কিন্তু সেই দিকে আমাদের মনোযোগই নাই। বাউলদের হাতে ডুগডুগি আর গায়ে বিবেকানন্দের হলুদ পোশাক ও পাগড়ি পরিয়ে নাচাতেই আমাদের পরম আনন্দ। নাচ, গান আর ভাবের কথায় আহা উহু ছাড়া এদের শহুরে ধর্ম নিরপেক্ষ মধ্যবিত্ত শ্রেণি কখনই সিরিয়াসলি গ্রহণ করে না। পাশ্চাত্যের গোলাম থাকার মধ্যে যে আরাম ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলস্য উপভোগ করা যায় সেখানেই তারা তাদের জীবনের পরমার্থ খুঁজে পায়। যে কারনে বাংলাদেশের ধর্ম নিরপেক্ষতাকে আমরা ইতিবাচক অর্থে ইউরোপীয় সেকুলারিজম বলতে পারি না। ধর্মকে ধর্ম নিরপেক্ষতা্র বিপরীতে বসিয়ে তাকে স্রেফ একটা দানবীয় ব্যাপার বা ইভিল শক্তি ভাবা বাংলাদেশের ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদীদের মধ্যে এমন এক ফানাটিক রূপ নিয়েছে যে এর বাইরে তারা আর কিছু ভাবতে পারে না। এই ফানাটিসিজম তথাকথিত ধর্মীয় 'মৌলবাদী'দের চেয়েও ভয়ংকর। ভয়ানক বিপজ্জনক। অনিয়মতান্ত্রিক পথে বাংলাদেশে যে কোন পরিবর্তনের চেষ্টা এখানে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও প্রতিহিংসার রূপ নেবে তাকে সামাল দেওয়া ধর্মবাদী বা ধর্ম নিরপেক্ষ কারো পক্ষেই এ কারনে সম্ভব নয়। বাংলাদেশে ধর্মবাদী বা ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদি  কোন পক্ষই এই বিপদ সম্পর্কে ভাবতে সক্ষম তারও কোন নিদর্শন পাওয়া যায় না। এই অভাব একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে।

পাশ্চাত্য আধুনিকতা ও সভ্যতাকে বাংলাদেশ গঠন ও সমাজ নির্মাণের একমাত্র মানদণ্ড হিসাবে গ্রহণ করবার নির্বুদ্ধিতা এর পেছনে যেমন পুরামাত্রায় কাজ করে, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সমাজে দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ অস্বাভাবিক কিছু নয়, সেটা থাকবে। কিন্তু তা সমাধানের সাধ্য সমাজের আছে কিনা তার ওপর একটি সমাজের এগিয়ে যাওয়া বা পিছিয়ে পড়া নির্ভর করে। বাংলাদেশে চিন্তার অনগ্রসরতা ও বিরোধী পক্ষকে নির্মূল করবার তীব্র বাসনা যে-বাস্তবতা তৈরী করে রেখেছে সেখান থেকে বেরিয়ে না এলে যে কোন সংঘাতই চরম রূপ পরিগ্রহণ করতে পারে।

অনিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা পরিবর্তনের বিপদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে আমি এখনকার রাজনীতির নামে দুর্বৃত্তপনা বা দুর্নীতিপরায়নতা নিয়ে আলোচনা করছি না। এর কারন এ নিয়ে আমি খুব একটা চিন্তিত নই। কারণ এটা পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্তর্গত সংকট। যারা ক্ষমতাসীন আর যারা ক্ষমতার বাইরে এদের কেউই আমাদের সামনে এগিয়ে যাবার পথ দেখাতে পারবে না। কারন দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তপনা থেকে কেউই মুক্ত নয়।

আদর্শিক বা নৈতিক যেদিক থেকেই বিচার করি না কেন আসলেই কি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কাছে এদের কোন নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা অবশিষ্ট আছে? নাই। তাহলে পরিবর্তন ঘটছে না কেন? কিসের পরিবর্তন? কি করব সেটাই তো আমাদের জানা নাই। যদি আমার কথা পাঠকদের বোঝাতে পারি তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটা শুধু রাজনৈতিক দলের নয়, সামগ্রিক ভাবে এটা আমাদের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যতার মামলা। যে জনগোষ্ঠি বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক কাজকে জরুরী রাজনৈতিক কাজ হিসাবে মান্য করে না, তাদের চেয়ে দুর্ভাগা আর কেউই হতে পারে না। দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতিবাজরা আমাদের শাসক হয়ে বসে কেন? কারন কোন না কোন মৌলিক নীতি ও বিধিবিধানের ওপর রাষ্ট্র গড়তে হয় সেটাই তো আমরা বিশ্বাস করি না। শেখ হাসিনা পঞ্চদশ সংশোধনী দিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে নিয়ে ক্ষান্ত থাকেন নি -- সম্প্রচার নীতি মালা, বিচারকদের সংসদে অভিশংসনের বিধান ইত্যাদি একের পর এক করে করে যাচ্ছেন বা করে যাবার উদ্যাগ নিচ্ছেন। পারছেন তো! নইলে ক্ষমতায় আছেন কিভাবে? কাকে দোষ দেবেন? আমরা নিজেদের এর চেয়ে যোগ্য কারো দ্বারা শাসিত হবার উপযুক্ত হই নি। কিভাবে গণমাধ্যমগুলো এই ধরণের একটি অনৈতিক ও অবৈধ সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে সেই দিকে নজর দিলেই আমরা বুঝব ভূতটা আসলে সর্ষের মধ্যেই।

এই সংকট এতো সহজে কাটিয়ে ওঠা যাবে বলে আমি মনে করি না। বাংলাদেশের সমস্যা আরও কতো গভীর সেই বিষয়ে একটি ইঙ্গিত দিয়ে আজ শেষ করব। পরে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত লেখা যাবে।

‘মাফিয়া রাষ্ট্র’ বলে একটি নতুন ধারণার চল হয়েছে। এই ধারণাটি তৈরী হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারক মহলে। কোন একটি দেশে অভিযান চালাতে হলে তাকে ‘মাফিয়া রাষ্ট্র’ হিসাবে চিহ্নিত করা জরুরী হয়ে পড়ে। এর মূল কথা হচ্ছে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংকটের কারনে আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল বা মাফিয়া সংঘগুলোর জন্য দারুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। যেসব মাফিয়া গ্রুপ অবৈধ পন্থায় টাকা বানিয়েছে তারা খুব কম দামে অর্থনৈতিক সংকটে পড়া কম্পানি কিনে নিচ্ছে। অন্যদিকে অর্থ সংকটের জন্য পুলিশ ও আইন শৃংখলা বাহিনী ও বিচার ব্যবস্থার পেছনে বিভিন্ন দেশের সরকার আগের মতো খরচ করতে পারছে না। অনেককেই চাকুরি থেকে অবসর দিতে হয়েছে। অন্যদিকে মাফিয়া সংঘগুলোর কাছে অঢেল টাকা থাকার কারনে তারা দক্ষ ও প্রতিভাবান আইনজীবী, কারিগর, হিসাব রক্ষক, প্রযুক্তিবিদ নিয়োগ দিতে পারছে। অর্থাৎ সমাজের বুদ্ধিমান ও কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন দক্ষ জনবল কাজ করছে মাফিয়া গোষ্ঠির জন্য। এই গোষ্ঠিগুলো এখন আরও সাহসের সঙ্গে আইন ভাঙতে পারে এবং তাদের দুর্বৃত্তপনাকেও একটা দক্ষ অপারেশানে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে।

অন্যদিকে বেসরকারী ক্ষেত্রে যারা উন্নয়ন সহায়তা দিত তারাও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র বিমোচন ইত্যাদি খাতে অর্থ সাহায্য কমিয়ে দিয়েছে। এই খাত গুলোতেও মাফিয়া গোষ্ঠি ঢুকে পড়েছে। মুনাফার কামাবার জন্য এটা তাদের জন্য বড় সুযোগ। অন্যদিকে তাদের পক্ষে জনসমর্থনের ভিত্তি তৈরির জন্যও এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ তাদের পক্ষে যায়। কোন দেশ উন্নয়ন খাতে টাকা চাইলে এদের কাছ থেকে এখন উচ্চ সুদে মূদ্রা বাজার থেকে টাকা ঋণ নিতে পারে। সেই সুবাদে এই গোষ্ঠিগুলো ঋণগ্রহিতা দেশগুলোতে প্রবেশের সুযোগও পায়। তাদের কাছে তরল টাকা বিস্তর। এই সুযোগটা তারা পুরা মাত্রায় গ্রহণ করে।

মূল কথা হচ্ছে গ্লোবাল অর্থনৈতিক সংকট একই সঙ্গে দুনিয়া ব্যাপী রাষ্ট্রের বাইরে এমন শক্তিশালী মাফিয়া চক্র তৈরী করেছে যে অনেক ক্ষেত্রে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী। যেসকল দেশে গণতান্ত্রিক বিধিবিধান ও আইনের শাসন অনুপস্থিত, বিরোধী মতের বিরুদ্ধে সরকার যে সকল দেশে সবসবময়ই তলোয়ার হাতে খাড়া --- সেইসব দেশ মূলত কোন না কোন মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কাছে যতোই নিন্দিত ও অগ্রহণযোগ্য হোক এই মাফিয়া কানেকশানের জন্য এই ধরনের সরকারকে তাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। নিয়মতান্ত্রিক বা অনিয়মতান্ত্রিক কোন ভাবেই না। আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বাইরে এই নতুন মাফিয়া কানেকশান রাজনীতি ও রাষ্ট্রের সংস্কারের জন্য নতুন ধরণের বাস্তব জটিলতা তৈরী করেছে।

বলা বাহুল্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিউমেনিটারিয়ান ইন্টারভেনশান বা কোন দেশে মানবিক কারনে সশস্ত্র বা নিরস্ত্র হস্তক্ষেপের পক্ষে যুক্তি খাড়া করবার জন্য মাফিয়া রাষ্ট্রের ধারণা আমদানি করা হয়েছে। ব্যর্থ রাষ্ট্রের ধারণার সঙ্গে মাফিয়া রাষ্ট্রের ধারণা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। কিন্তু যে অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা বলা হয়, সেটা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। সেই দিক থেকে বাংলাদেশ একটি মাফিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে কিনা সেটা আসলেই ভাবার বিষয়।

এ কারনে এটাও পরিষ্কার ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারনেশনাল মার্কা সুশীল রাজনীতিও বর্তমান পরিস্থিতি উত্তরণে আমাদের কোন কাজে আসে না। ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ভূমিকার আরও অনেক সমালোচনা হতে পারে, তবে মাফিয়া কানেকশান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারক মহলের দিক থেকে বিচার করলে আমরা ট্রান্সপেরেন্সির সীমাবদ্ধতা সহজেই বুঝতে পারি। বাস্তবতার চিত্র অনেক গভীর। দ্বিতীয়ত রাজনীতিতে দুর্বৃত্তপনা ও দুর্নীতি একমাত্র বাংলাদেশের সমস্যা না, এই সমস্যা আন্তর্জাতিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ইংলন্ড সব দেশেই এই সমস্যা রয়েছে। তার মানে দুর্নীতি বা দুর্বৃত্তপনার বিরুদ্ধে আমরা লড়ব না তা নয়, কিন্তু রাষ্ট্র গঠন, সংস্কার ও পরিচালনার যে সংকটের মধ্যে আমরা পড়েছি তার সমাধান শুধু দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তপনা সম্পর্কে জনগণের পারসেপশান প্রচার নয়। এতে কোন ফায়দা হবে না। ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারনেশনাল মার্কা সুশীল রাজনীতি বাস্তবতার সমাধান সঠিক বিশ্লেষণ দিতেও অক্ষম।। ট্রান্সপেরেন্সি আপদ হয়ে ওঠে কারন রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নকে এরা ভিন্ন খাতে নিয়ে যায়। জনগণের পারসেপশানকে ভিত্তি ধরে সরকারের নৈতিক সমালোচনার ধোঁয়াশা ছাড়া অধিক কিছুই  তারা প্রস্তাব করতে পারে না। ফলে শেষাবধি দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তনার অজুহাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হিউমেনিটারিয়ান ইন্টারভেনশানের সহযোগীর ভূমিকাই তারা পালন করে।

অর্থাৎ আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার বাইরে যে বাস্তব প্রক্রিয়া ঘটছে এবং তার ফলে আমাদের রাজনীতি ও রাষ্ট্র যেভাবে বদলে যাচ্ছে তাকে বাস্তব ঘটনা হিসাবে বোঝা ও অনুধাবনের জন্য দরকারী যথেষ্ট গবেষণা আমাদের নাই। বাস্তবের প্রতি এই অনীহাকেই আমি এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক মনে করি। বর্তমান সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে এটাই প্রধান বাধা।

কী ঘটছে আমরা যেমন জানি না, নতুন বাস্তবতায় কি করতে হবে তার হদিস নেওয়াও আমরা জরুরী মনে করি না। কি করা উচিত সেই ঔচিত্যের জায়গা থেকে নিজ নিজ সংকীর্ণ পরিসর থেকে খালি চিৎকার করে যাচ্ছি।

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪। ২১ ভাদ্র ১৪২১। শ্যামলী, ঢাকা

 

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।