মোদির ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (১)


পুঁজির গোলকায়ন দুনিয়ার অর্থব্যবস্থায় মৌলিক রূপান্তর ঘটিয়েছে ও ঘটাচ্ছে এ কথা সবসময়ই বলা হচ্ছে। কথাটা সত্যও বটে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের দিক থেকে এর তাৎপর্য উপলব্ধির জায়গাগুলো বুঝব কী করে? এই প্রশ্ন মনে রেখে নরেন্দ্র মোদির ভারত নিয়ে এই লেখা। দুনিয়াব্যাপী বিস্তৃত পুঁজিতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থায় ভারকেন্দ্র এশিয়া – বারাক ওবামার ভাষায় এশিয়ার থিয়েটার বা নবোদ্ভূত এশিয়ার রঙ্গমঞ্চ। এই থিয়েটারে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যারা জয়ী হবে তারাই বিশ্বের নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হবে। এই পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক শক্তি হিসাবে ভারতের পরিবর্তনের অভিমুখগুলো ঠিক ঠিক বুঝতে হবে বাংলাদেশের কথা ভেবে। একই সঙ্গে নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের  চিন, ভারত ও আমেরিকা নীতি কি হতে পারে তা মাথায় রেখেই লেখাটি তৈরি; অনুমান হচ্ছে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগামি দিনে চিন্তাশীল ও সবলেরাই নেতৃত্ব দেবেন, বর্তমান পরিস্থিতি টিকবে না। বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের নেতৃত্ব অক্ষূণ্ণ রাখতে যে সূক্ষ্ম দড়ির ওপর তাঁদের হাঁটতে হবে তারই কিছু ধারণা দেবার চেষ্টা হয়েছে এখানে। ভারত প্রসঙ্গ এখানে ভারি হওয়া সেই উদ্দেশ্য মনে রেখেই।

নিরাপত্তা বনাম অর্থনীতিঃ ভারতের বিদেশ নীতির দুই মুখ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ক্ষমতায় আসীন হওয়ার প্রায় সাত মাস পার হতে চলল। মোদীর জয়লাভ ও সরকার গঠন আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় পরিসরে নানান পরিবর্তন ও ছাপ ফেলেছে। আর এতে বাংলাদেশের উপর সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে, কী নতুন সম্ভাবনা হাজির হচ্ছে সেসব নিয়ে আগের কিছু লেখায় আমরা আলোচনা করেছিলাম। সেখানে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় ছিল আগের কংগ্রেস সরকারের বিদেশনীতিতে মোদীর নতুন সরকার মৌলিক কিছু পরিবর্তন নিয়ে আসার সম্ভাবনা এবং তার সম্ভাব্য প্রভাব। ।

বিগত কংগ্রেসের নীতির মূল ফোকাস ছিল “নিরাপত্তা”। একে কংগ্রেস নীতির ভারকেন্দ্র গণ্য করলে ভুল হবে না। এর পরিবর্তে মোদির নীতির মুল ফোকাস “অর্থনীতি”। ভারতের বিদেশ নীতির অভিমুখ কোথায় বদলাতে পারে সেটা বোঝার জন্য এভাবে ভাবা যেতে পারে। মোদি এই নির্বাচনের প্রচারের সময় থেকেই তার নীতির ভারকেন্দ্র অর্থনীতি এই ধারনা দিচ্ছিলেন।

কংগ্রেস নীতির “নিরাপত্তা” ধারণাটিকে ভেঙ্গে অর্থ করলে সেটা দাঁড়ায় পড়শীদের উপর আগ্রাসী বা হকিস নীতি যা চিন অবধি বিস্তৃত; আর ভারতের ভিতরেও যেকোন বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুতে সেকুলারিজমের আড়ালে সামরিক জবরদস্তির পথে চাপিয়ে দেয়া সমাধানের উপর অতি নির্ভরতা।

একে অন্যভাবেও আমরা বলতে পারি। কোন রাষ্ট্রের সামরিক-বেসামরিক আমলা -- বিশেষত গোয়েন্দা বাহিনী যদি সরকার চালায়, কিম্বা সরকারের নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নির্ধারক ভূমিকা রাখে, তাহলে দেশের ভেতর বাইরের যে কোন সমস্যা ও অসন্তোষকে রাজনৈতিক দিক থেকে দেখা ও সমাধানের ক্ষমতা হ্রাস পায়, উপেক্ষিত থেকে যায়। এর কারনে মারমুখি (hawkish) বা হকিস সমাধানই সাধারণত মুখ্য হয়ে ওঠে। ‘নিরাপত্তা’ কংগ্রেসের নীতির ফোকাস বা ভারকেন্দ্র বলার মানে এটাই । অর্থাৎ ধর-মারো দিকটা প্রাধান্যে নিলে স্বভাবতই অন্য অপশনগুলো -- যেমন, রাজনৈতিক সমাধান অথবা অর্থনৈতিক-উন্নয়ন ঘটিয়ে সমাধান – ইত্যাদি পদ্ধতিগত দিক গৌণ কিম্বা অকেজো হয়ে যায়। কিম্বা তাদের অকেজো করেই রাখা হয়। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এখানে কাজ করে না, আমলাতান্ত্রিক সমাধান সে কারনে ধরো আর মারো জাতীয় সমাধানে পর্যবসিত হয়। এ ছাড়াও যে যে ভিন্ন পথ হতে পারে সেটা উপেক্ষিত থাকে। অথবা একেবারে উপেক্ষিত যদি নাও হয় তবে বড়জোর সেকেন্ডারি অপশান হয়।

আগের কংগ্রেসের ইউপিএ জোট সরকার একনাগাড়ে দুই টার্ম অর্থাৎ ১০ বছর (২০০৪-২০১৪) ক্ষমতায় ছিল। একে আমরা বলতে পারি বড় দাদাদের যুগ। সেটা কেমন? এর শুরুটা ছিল আমেরিকার যুদ্ধবাজ জর্জ বুশের ‘ওয়ার অন টেররের’ অনুরূপ নীতি, নাইন-ইলেভেন পরবর্তি যুগ। বলা বাহুল্য এটা কংগ্রেসের “নিরাপত্তামুখি” নীতি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রধান প্রভাবক এবং সহায়কও ছিল। বুশেরও আট বছরের দুই টার্মের সেই যুগে (২০০১-২০০৯) ভারতের ওপর আমেরিকার প্রভাব-সম্পর্ক তৈরি হবার যুগ। দাদা বুশ ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। আর তাতে ভারত কোন পরাশক্তি না হয়েও পরাশক্তির ভাব ধরেছিল। ভারতের পরাশক্তি হয়ে ওঠার বাসনা এই সময়টাতেই দানা বেঁধেছিল। দাদা বুশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তিগত যাঁতাকাঠি ভারতকে সাময়িক ব্যবহার করতে দিয়েছিল। যদিও ইউপিএ সরকারের শেষ দুই বছর আমেরিকার সাথে “নিরাপত্তা” বিষয়ক সহযোগিতার মধুচিন্দ্রমা আর টিকে থাকে নি। শুধু তাই নয়, উল্টা ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক প্রকাশ্যে চরম তিক্ততায় স্থবির হয়ে পড়েছিল। কংগ্রেসের “নিরাপত্তামুখি” নীতিকে এভাবেই দাদার জোরে বুক ফুলিয়ে চলার নীতি বলেও বোঝা যেতে পারে।

বিপরীতে মোদীর নীতিতে “অর্থনীতি” মুল ফোকাস। সরকারের মুখ্য কর্তব্য কাজ সৃষ্টি আর সেটা অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়েই সম্ভব, পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় সেটা বহুজাতিক বিনিয়োগের মধ্য দিয়েই হতে হবে – মোদির অর্থনীতিবাদকে ভেঙে বুঝতে চাইলে এভাবেই আমাদের বুঝতে হবে। কাজ সৃষ্টিকে অর্থনৈতিক উন্নতির কেন্দ্রবিন্দু মানার অর্থ অবকাঠামো ও আনুষঙ্গিক বিষয়সহ উন্নয়নের দিকে মুল মনোযোগ ধাবিত করা, তাকেই চালিকাশক্তি মেনে পরিচালনা করা ।

যে কথাটা এই ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার সেটা হোল এতে নিরাপত্তা বিষয়টাকে অবশ্যই ভুলে যাওয়া হয়েছে সেটা বলা হচ্ছে না। কিম্বা কংগ্রেসের কোন উন্নয়ন নীতি ছিল না, সেটাও নয়। মূল বিষয় হচ্ছে ভারতের ‘নিরাপত্তা’ কথার আড়ালে দেশের ভিতরে বাইরে সবাইকে দাবড়ে বেড়ানোর আগ্রাসী নীতি এটা নয়। দিল্লী নিজের খাসিলত ছেড়ে দিয়েছে সেটা বলা হচ্ছে না। এখন কিন্তু সেটা মারমুখী নয়। নিরাপত্তার সামরিক দিক তো থাকবেই, কিন্তু আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বসঙ্ঘাতের সমাধান কিম্বা প্রতিবেশীর সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক অবসানের জন্য মারমুখী নীতি ছাড়াও অন্যান্ন রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক দিক এক্সপ্লোর করে দেখার প্রবণতা নরেন্দ্র মোদির রাজনীতি থেকে পাঠ করা যায়। এই অর্থেই কংগ্রেসে ‘নিরাপত্তা’ নীতির বিপরীতে মোদির নীতি “অর্থনীতি” নির্ভর। আর মোদির পপুলার ভাষায় এটা হল উন্নয়ন বা হিন্দীতে “বিকাশ”।

ভারতের বিদেশ নীতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি

আবার আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে, মোদির নীতি বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে খুবই সামঞ্জস্যপুর্ণ। এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। দুনিয়ায় গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এক অর্ডারের মধ্যে ১৯৪৪ সালের পর থেকে আমরা যে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছিলাম এশতাব্দীর শুরু থেকে -- বিশেষ করে গত দশ বছরের বেশি সময় ধরে তার বিন্যাসের মধ্যে ক্রমশ স্পষ্ট দৃশ্যমান রূপান্তর দেখা দিতে শুরু করেছে । এটা শুধু বিশ্ব অর্থনীতির অভিমুখ পশ্চিমমুখিতার বদলে পুর্ব দিকে ঢলে পড়া নয়; কিম্বা শুধু চিনের উত্থান কিম্বা চিনসহ অন্তত পাঁচটা ‘রাইজিং ইকোনমির’ উত্থানও নয়, এটা একই সাথে এক কেন্দ্রিক দুনিয়ার ক্রম অবসানের ইঙ্গিত। আমেরিকান পরাশক্তিগত ক্ষমতার শাসনের বদলে চিনকে মুখ্য করে অন্তত আরও চার-পাঁচটা রাষ্ট্রের পরাশক্তিগত উত্থানে তা ভাগ হওয়া আসন্ন। এর ফলে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের চরিত্রে বদল হবে সেটা ভাবার কোন কারন নাই। এর যে আগ্রাসি, দখলদারি বা রুস্তমিও দুনিয়া থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে না।ভুমিকম্পের পর ভুগর্ভের ওজন কে অথবা কে কে বহন করবে তেমনি ভূগোলে প্লেট চেঞ্জ ঘটনার মত। এতে বিশ্ব ব্যবস্থা রক্ষার ভার অন্যের কাঁধে চলে যাতে পারে। কাঁধ-বদলের মত ঘটনাগুলো শুরু হয়েছে ইতোমধ্যে।

NDTV

বুট, বুলেট ও রাইফেল ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই সবই অভাব আছে!  বলছে এনডিটিভি। পার্লামেন্টের স্টান্ডিং কমিটির এক প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে অস্টশস্ত্রের অভাব ভারতের পক্ষে দীর্ঘস্থায়ী কোন যুদ্ধে টিকে থাকবার সম্ভাবনা নাই।


এতদিন অবধি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য আমরা বহাল দেখে এসেছি। ১৯৪৪ সাল থেকে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যংক এর মত প্রতিষ্ঠান খাড়া করে এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিধি বিধানের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের ষ্ট্রাটেজিক অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষূণ্ণ রাখতে পেরেছে। আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্ব অর্থনীতি পশ্চিমের দিকে কান্নি মেরে সাজানো হয়েছিল; তা এবার ভেঙ্গে পড়ার আলামত শুরু হয়েছে, নতুন নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্ম হচ্ছে, নতুন ভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিন্যাস ঘটছে। ধারনা করা যায় পরিশেষে নতুন ধরণের এক বিশ্ব অর্থনৈতিক শৃংখলার জন্ম হবে। সেই শৃংখলার নতুন বিধি বিধান আইন কানুনও থাকবে। এটা আসন্ন, চারদিকে আলামত ফুটে উঠছে।

নতুন বিশ্ব অর্থনৈতিক শৃংখলায় আমাদের মত দেশগুলো জন্য শ্বাস নেবার তুলনামূলক বড় জায়গা মিলবে, এটাই কমবেশী অধিকাংশ অর্থশাস্ত্রবিদদের ধারণা। যেকোন আন্তর্জাতিক চুক্তি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য তুলনামূলক ভাবে বেশি ফেভারবল হবে। প্রতীকিভাবে বললে, অবকাঠামোগত ঋণ পাবার ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ডব্যাংক আর একছত্র কর্তৃত্ব খাটানোর প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে না, থাকছে না। শুরু হয়েছে সমান্তরাল অবকাঠামো ঋণ পাবার প্রতিষ্ঠান। সেটা বোঝা যায় Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB), এবং BRICS ব্যাংকের আবির্ভাব দেখে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আইএমএফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এই দুই প্রতিষ্ঠানের আলাদা আলাদা ভুমিকা রয়েছে। BRICS অবশ্য শুরুতে আপাতত একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ডাবল ভুমিকা পালন করে দুটোরই বিকল্প হতে চাইছে। আইএমএফ মূলত মুদ্রামান নির্ধারণ ও যাচাই এবং তাদের নির্দেশিত মূদ্রানীতি আমাদের মতো দেশকে মানতে বাধ্য করা এবং অন্যদিকে কোন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবের ঘাটতিতে ঋণ দেওয়া – এই দুই কাজ পালনকারি প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করেছে। এই প্রতিষ্ঠানটিও আর মূদ্রা্মান ব্যবস্থাপনা ও ব্যলান্স অফ পেমেন্টে ভারসাম্য রক্ষা করবার একচ্ছত্র ও একমাত্র কর্তৃত্ববান প্রতিষ্ঠান হিসাবে টিকে থাকতে পারছে না। চলতি হিসাবের ঘাটতিতে ঋণ পাওয়ার বিকল্প উৎস হিসাবে BRICS আইএমএফের মতই ভুমিকা নিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার চলতি হিসাবের ঘাটতিতে ঋণ বিতরণ করবে, সেটা ইতোমধ্যেই জানিয়েছে। সবমিলিয়ে ক্রমশ বিদ্যমান বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের বিকল্প দুনিয়ায় হাজির হবার ঘোষণা এসেছে। এতে বর্তমান আইএমএফ-ওয়ার্ল্ডব্যাংক কার্টেলের নিগড় থেকে আমাদের মত দেশের অন্তত তুলনামূলক অর্থে কিছুটা মুক্তি মিলবে।

আর সবচেয়ে বড় কথা, গ্লোবাল অর্থনীতির এই পাশ ফেরা মোচড় দেয়া যেটা শুরু হয়েছে সেই অভিমুখের আর উল্টাপথে চলার সম্ভাবনা নাই। এটা এখন এমনই একমুখী ফেনোমেনা। চীনের অর্থনীতি ক্রমশ বড় থেকে আরও বড় উদ্বৃত্ব অর্থনীতির দেশ হচ্ছে, ফলে চিনের এই বিশাল বিনিয়োগ সক্ষমতার কারণে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যংক টাইপের বিকল্প নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার শর্ত হাজির হয়েছে। দুয়ার সহজেই খুলে গেছে। ওদিকে এমন বিনিয়োগ সক্ষমতার ক্ষেত্রে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পশ্চিমের সক্ষমতা ততই কমছে। অর্থাৎ আমেরিকা চাইলেও রূপান্তরের এই অভিমুখ নিকট আগামিতে উল্টাতে পারবে না, উদ্বৃত্ব অর্থ তেমন জমা হচ্ছে না বলে চিনের সাথে প্রতিযোগিতায় নামার কথাও তাদের চিন্তার অতীত, অবাস্তব। দুনিয়া জুড়ে এই এক নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

তাহলে এখন প্রশ্ন, আমেরিকা কি নিজের কবর খননের এই ফেনোমেনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে? স্বভাবতই এই জবাব হল না। প্রচলিত আইএমএফ-ওয়ার্ল্ডব্যাংক কার্টেল সংস্কার করে ভিতরে চিনেরকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে পুঁজিতান্ত্রিক চিনকেও একই পাত্রে ধারণ করতে পারত হয়ত কিন্তু তাতেও বিশাল সক্ষমতার ভলিউমের কারণে কর্তৃত্ব চলে যেত চিনেের হাতে। ফলে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ডব্যাংক কার্টেলের সংস্কার পথ পরিহার করে মরণ কামড়ে যতটা এই রূপান্তরের গতিকে শ্লথ রাখা যায় সে চেষ্টায় রত হয়েছে আমেরিকা। এতে গতির হয়ত সাময়িক কিছু হেরফের ঘটাতে পারে।

আমেরিকা এর জন্য অনেকখানি নির্ভর করছে ভারতের উপর। ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের উপর। কিভাবে? তা আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, আমেরিকা চায় ভারত ঢলতি বা পুরান গ্লোবাল অর্ডারের প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যংকের আয়ু লম্বা করুক, সেজন্য AIIB , এবং BRICS ধরণের বিকল্প প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে চিনেের সাথে সক্রিয় উদ্যোক্তার ভুমিকা না নেক। এভাবে ঢলে পড়া পুরান প্রতিষ্ঠানগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার হাত থেকে বাঁচাক। বিনিময়ে আমেরিকা কি অফার করতে পারে? বা কি দেখিয়ে ভারতকে প্রলুব্ধ করছে?

ভারতের লোভ কিম্বা বাসনাঃ সামরিক অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের লজিস্টিক

আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের পাবার সবচেয়ে লোভনীয় দিকটি হচ্ছে ভারতের সামরিক বাহিনীকে সক্ষম করবার জন্য আমেরিকান সহযোগিতা পাওয়া। রাজনৈতিক দিক থেকে আকাংখা দিল্লী-ওয়াশীংটন সম্পর্কের অনেক খানি নির্ধারণ করে। বুশের আমলের ভারত-আমেরিকার সখ্যতার শুরুতে সেই সম্পর্ক রচনার একটি প্রধান উপাদান ছিল ভারতে অস্ত্রের সরবরাহকারি হিসাবে উৎস হিসাবে আমেরিকার প্রবেশ। পারমাণবিকসহ সবকিছুতেই সামরিক সহযোগিতা চুক্তি হয় ২০০৫ সালে। কয়েক যুগ ধরে অস্ত্রের ক্ষেত্রে ভারত মুলত রাশিয়া নির্ভর হয়ে ছিল।এই চুক্তিগুলো ২০০৫ সালে যখন হয় তখন আমেরিকার উস্কানিতে এবং ভারতেরও মনে মনে যে চিন নিয়ে ভীতি ছিল এই পটভুমিতে ঘটেছিল। সামরিক সক্ষমতা থাক আর না থাক ভারতীয় মিডিয়া বলে থাকে ১৯৬২ সালের চিন-ভারত যুদ্ধের অভিজ্ঞতাটা ভারতের কাছে এখনও একটি ট্রমা হয়ে থেকে গেছে। কিন্তু পুরানা মনের টেনশনে নয় এখন চিন-ভারতের স্বার্থ সংঘাতের প্রধান ইস্যু চিন-ভারতের দীর্ঘ সীমান্তের অনেক জায়গা অচিহ্নিত বা বিতর্কিত থেকে যাওয়া। সম্ভাব্য স্বার্থ-বিরোধের জায়গাটা এটাই। কিন্তু ইতোমধ্যে এই ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতিও সাধিত হয়েছে।


 

Hindu

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনান্ট জেনারের বিনয় শংকর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় লিখেছেন দেশের ভেতরে অস্ত্রশস্ত্র তৈয়ারিতে ক্ষেত্রে ভারতকে আরও দক্ষ হতে হবে। বিনয় শংকরের নিবন্ধ থেকে বোঝা যায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা– বিশেষত অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধের সাজসরঞ্জাম তৈয়ারির ক্ষেত্রে ভারত ্নিজে সফল হয় নি। এখনও দেশটি নির্ভর। এই বাস্তবতা ভারতের বিদেশ নীতির ওপর প্রভাব ফেলতে বাধ্য


 

গত ২০১৩ সালটা ছিল চিন-ভারত দুপক্ষের সরকার প্রধানের পালটা পালটি সফর বিনিময়। এবং সফর শেষে একটি সীমান্ত বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরে উপনীত হবার বছর। ঐ চুক্তির সারকথা হল, সীমান্ত অচিহ্নিত থাকার সুত্র ধরে কোন ছোটখাট টেনশন থেকে বড় কিছু যেন না হয়ে যায়। যেন কোন পক্ষই ইচ্ছা অনিচ্ছায় যুদ্ধের উস্কানি তৈরি না করে বসে বরং সংযত থাকার যথাসাধ্য চেষ্টা করে; ফ্লাগ মিটিং, হট লাইনে কথা বলা ইত্যাদির মাধ্যমে টেনশন কমানো, এসব উপায় আরো বিস্তৃত করা ইত্যাদি বিষয়ে একমত হয়ে ঐ চুক্তি। আর যত দ্রুত সম্ভব বিতর্কিত সীমান্ত চিহ্নিত করার ব্যাপারে দুপক্ষই সক্রিয় উদ্যোগ নেবার অঙ্গীকার করেছে। সীমান্ত সমঝোতার উপর দাঁড়িয়ে এরপর পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও বিরাট উল্লম্ফনে নেবার এক ঘটনা ঘটানো হয়। তা হল, BCIM-EC বা BCIM ইকোনমিক করিডরের ব্যাপারে জোট গঠনে উভয়ে উদ্যোগী হতে একমত হওয়া।

এই ইকোনমিক করিডর মানে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ ও মায়ানমার হয়ে চিনেের কুনমিং পর্যন্ত যোগাযোগ বাড়ানো, পণ্যের চলাচলের ব্যবস্থা করা, আর বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর তৈরি ইত্যাদি। গত বছর ২৩ অক্টোবর ২০১৩ মনমোহনের ফিরতি চিন সফরে যৌথ ঘোষণায় বিষয়টা প্রথম সামনে আসে। ইকোনমিক করিডর প্রসঙ্গে এমাসের শুরুতে আমাদের কক্সবাজারে BCIM জয়েন্ট ইকোনমিক ষ্টাডি গ্রুপের দ্বিতীয় মিটিং হয়েছে।

কিন্তু এতকিছুর পরও চিন-ভারতের সীমান্ত বা যুদ্ধ বিষয়ক টেনশন বা ট্রমা যাই বলি সেটা যায় নি। চুক্তি ও করিডরের আলাপে অগ্রগতির পরেও তা ভারতের পাবলিক মাইন্ডও একই রকম জায়গায় রয়ে গেছে। আসলে বলা উচিত ভারতের মিডিয়া জগতে একই রকম রয়ে গিয়েছে। সম্পর্কের নতুন অগ্রগতি সত্ত্বেও চিন প্রসঙ্গে ভারতীয় গণ মনোভাবে কোন পরিবর্তনের ছাপ পড়েনি। ফলে জন মনে এর কোন প্রভাব নাই। ওদিকে সীমান্ত চুক্তি বিষয়ক অগ্রগতির পরে কংগ্রেস সরকারের স্বাভাবিক আয়ু আরও ছয়মাস ছিল। ফলে বিগত দশবছর ধরে কংগ্রেস সরকারের “নিরাপত্তা” কেন্দ্রিক চিন্তা বা মারমুখী যে নীতি ছিল সেখানে বিশেষ বদল ঘটে নি। চিনের সঙ্গে সীমান্ত সংক্রান্ত টানাপড়েন হ্রাস করার প্রয়াসের কোন ছাপ দেখা যায় না। সবসময় ভারতের চিন বিরোধি রেঠরিক বা কথার যে যুদ্ধ চলছিল কোন বদল বা ছাপ পাবলিকলি প্রদর্শন না করে তার আগেই কংগ্রেস সরকার ক্ষমতা ছেড়ে যাবার সুযোগ নেয়। এদিকে চুক্তি সইয়ের দিক থেকে দেখলে এরপর একবছর হয়ে গেছে, ইতোমধ্যে মোদীর অর্থনীতি কেন্দ্রিক নীতিও এসে গেছে তবু ভারতের কোন পক্ষের মিডিয়ার অবস্থানে কোন বদল হয়নি, বরং মিডিয়ায় চিন প্রসঙ্গে সন্দেহ ছড়ানো যেমন ছিল এখনও তেমনই আছে। যেন সীমান্ত চুক্তি বা করিডর এসব ইস্যুতে অগ্রগতি চিন-ভারত সম্পর্কের জন্য কোন নতুন উপাদান নয়, যেন এসব কিছুই ঘটেনি বা ঘটলেও তার প্রভাব শূন্য।

এর সম্ভাব্য একটা কারণ, আমেরিকা। গত দশ বছরে ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সিয়া --জনমত বা পলিসি অবস্থান যারা তৈরি ও প্রভাবিত করে-- তাদের করা গবেষণা, থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি যা কিছু হয়েছে তা গড়ে উঠেছে আমেরিকার হাত ধরে অথবা কোন না কোন কোন ধরণের মার্কিন সহযোগিতায়। ধরণ হিসাবে সেগুলো যেমন মার্কিন কোন থিঙ্কট্যাংক প্রতিষ্ঠানের অধীনে ভারতীয় একাডেমিকের পিএইচডি বা গবেষণা অথবা কোন মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক জয়েন্ট কোলাবরেশনে যেমন, Carnegie Endowment for International Peace এর মত প্রতিষ্ঠানের সাউথ এশিয়া বিভাগকে আমেরিকার তত্ত্বাবধানে ইন্ডিয়ান স্কলার দিয়ে চালানো। অথবা বড়ভাই পিঠে হাত রাখায় যে পরাশক্তির সুখবোধ হচ্ছিল সেটাই ভারতের জন্য আদর্শ এই বোধের প্রাক্তন সামরিক-বেসামরিক আমলাদের দিয়ে চালানো কোন ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক। এসবের সাধারণ তাৎপর্য হল, আমেরিকান চোখ দিয়ে চিন-ভারতের সম্পর্ককে দেখা। এককথায় বললে, এর ফলে চিন বিষয়ে যে সকল ভারতীয় একাডেমিক এক্সপার্ট তৈরি হলেন বা যাদের মিডিয়ায় হাজির হতে দেখা যাচ্ছে তারা প্রায় সবাই আমেরিকান প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, কিম্বা তাদের তত্ত্বাবধানে অথবা মার্কিন স্বার্থ সুরক্ষার চিন্তার কাঠামো বা ওরিয়েন্টেশনে গড়ে উঠেছেন। তারা ভারতের বিদেশ নীতি নিয়ে যা ভাবেন বা ভাবছেন সেখানে আমেরিকা যেভাবে ভারতকে দেখতে চায় তারই ছাপ প্রবল ভাবে হাজির দেখা যায়। চিন-ভারত সম্পর্কের কিছু অগ্রগতি সত্ত্বেও ভারতীয় মিডিয়ায় এর কোন ছাপ না পড়ার কারণ সম্ভবত এটাই। এর ফলে চিনের প্রতি ভারতের জনমতে বিশেষ বদল ঘটে নি। যার প্রভাব মোদির বিদেশ নীতিতে পড়তে বাধ্য।

তো এটা গেল একটা কারণ। কিন্তু মূল কারণ নয়। তাহলে আসল কারণ কি?


 

Economist

'ভারত একটি পরাশক্তি হয়ে উঠতে পারবে কি?' --  ইকনমিস্ট পত্রিকার প্রশ্ন। ভারতের দরকার একটি পেশাদার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা কর্মী যাতে তারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারে। দরকার তাদের ক্ষয়িষ্ণু রাষ্ট্র পরিচালিত ডিফেন্স ইন্ড্রাস্ট্রিতে বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো। রাষ্ট্র পরিচালিত প্রতিরক্ষা খাত সব স্ময়ই এই ধরণের সমালোচনার মুখে রয়েছে।


 

সামরিক বিষয় কিম্বা প্রতিরক্ষা ব্যয় উভয় ব্যাপারে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত বা প্রগতিশীলদের মনে বিরাট অনীহা কাজ করে। বঞ্চিত মধ্যবিত্তের ক্রোধ ছাড়া এই নব্য গড়ে ওঠা শ্রেণির মধ্যে রাষ্ট্র সম্পর্কে বিশেষ কোন ধারণা এখনও গড়ে ওঠে নি। প্রতিরক্ষা ও আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থা তাদের কাছে খুব দূরের একটি বিষয়। এর সঙ্গে যেহেতু সেনাবাহিনীর সম্পর্ক সরাসরি তাই এর বিরোধিতাই তারা সঠিক বলে মনে করে। সামরিক মানে সব অপচয় অথবা একটা ট্যাঙ্কের টাকায় কয়টা স্কুল করা যেত ধরণের তর্কে এরা নিজেরা বুঁদ হয়ে থাকে আর সমাজেও শ্রেণিগত কারণে তার প্রভাব আছে। ফলে সামরিক শাসন বা সামরিক শাসনের বিরোধিতা করা, কিম্বা সামরিক অফিসারদের দুর্নীতি ও গরিব দেশের তুলনায় অন্যায় ও অতিরিক্ত সুবিধাভোগের তর্ককে তারা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তর্কে পর্যবসিত করে ফেলে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ আন্তর্জাতিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় টিকে থাকতে হলে উপযুক্ত সামরিক প্রতিষ্ঠান বা সুস্পষ্ট প্রতিরক্ষার নীতি কী করে প্রণয়ন করা যায় সে বিষয়ে চিন্তা ভাবনা এদের শূন্যই বলা যায়।

মূলত এমন ধারণার সুত্রপাত করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, কোল্ড ওয়ারের যুগে আমেরিকাকে ঘায়েল করতে প্রপাগান্ডা হিসাবে। আমরা সবাই জানি, সেকালে সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজ সামরিক খাতে ব্যয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে কোন অংশে পিছিয়ে ছিল না। ফলে স্পষ্টত কথাটা রাশিয়ানরা নিজে বিশ্বাস করার জন্য নয় অথবা পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থায় রাষ্ট্র গঠন ও তা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসাবে হাজির হয় নি। তৃতীয় বিশ্বের সেনা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তার অবস্থান স্নায়ুযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রপাগাণ্ডার প্রয়োজন মনে রেখে সাজানো হয়েছিল। বাস্তবে তৃতীয় বিশ্বের সেনাবাহিনী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ধারক ও কমিউনিজম মোকাবিলার প্রথম সারির মিত্র ছিল অবশ্যই। বিপ্লবোত্তর কোন রাষ্ট্র নির্মাণের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক নিয়ে তাত্ত্বিক-ব্যবহারিক আলোচনা রয়েছে। যার মূল্য অনস্বীকার্য। কিন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সেনাপ্রতিষ্ঠান ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক অবস্থান নেওয়ার অর্থ কোনভাবেই পুরানা স্নায়ুযুদ্ধের আমলের চিন্তাভাবনা বয়ে বেড়ানো হতে পারে না। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা সেই ওজনের ভার বয়ে বেড়াচ্ছি।

ফলে একালে গণপ্রতিরক্ষার আলোকে সৈনিকতা, সেনাবাহিনী, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সম্পর্কে নতুন ভাবে ভাববার দরকার আছে, একাট্টা সৈনিকতা, সামরিকতা বা প্রতিরক্ষার চিন্তাকে গৌণ করে ভাবার কোন উপায় নাই। একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি শুধু অর্থনৈতিক শক্তির জোরে টিকে থাকে না, একালে কেউই বিশ্বাস ভরে জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা বিরোধী কোন ধারণা গ্রহণ করবে না। সেটা হবে কঠিন বাস্তবতায় পা না নামিয়ে হাওয়ায় ঘুরে বেড়ানো।

কারণ, কঠিন দিকটা হল, বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রতিরক্ষার শক্তি ঘনিষ্ঠ। তাকে আলাদা করারা কোন উপায় নাই। প্রদত্ত বাস্তবতায় ভারতের মতো একটা রাষ্ট্র অর্থনৈতিক দিক থেকে যতই সক্ষম ও সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে, তার প্রভাবে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্তরে ষ্ট্রাটেজিক চিন্তা ভাবনায় বদল ঘটাতেই হবে বা ঘটবে। আর এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণভাবে সামরিক সক্ষমতায় সমৃদ্ধ হতেই হবে। সামরিক খরচ বাড়াতে হবে, নইলে ছাগলে সব মুড়ে খাবে। সামরিক ব্যয়টা আবার এমন জিনিষ যা নিজস্ব রাজস্ব আয় থেকেই হতে হবে, বাণিজ্যিক বিষয়ের মত এজন্য বিদেশি লোন পাওয়া যাবে না। এছাড়া অস্ত্রের সোর্স কে হবে মনমত তা খুঁজে পাবার সমস্যা তো আছে। তবে বড় জোর কিস্তিতে অস্ত্রের মুল্য পরিশোধ করার সুবিধার চেষ্টা করা যেতে পারে। ফলে পুরা বিষয়টা হল, একদিকে সামরিক সক্ষমতা যেমন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সমৃদ্ধির উপর নির্ভর করে আবার ঐ অর্থনীতিকে প্রটেক্ট করার জন্যই সামরিক সক্ষমতা জরুরি।

ব্লু ওয়াটার বলে একটা ধারণা আছে। এর অর্থ হল, নিজ রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে সমুদ্রে আমার পণ্যবাহী জাহাজ অবাধে চলাচল করতে পারার সুযোগ থাকবে কি না। থাকলে তা আমার জন্য ব্লু ওয়াটার। যদি না থাকে, কেউ ইচ্ছা-অনিচ্ছায় যদি বাধা সৃষ্টি করে তা মোকাবিলার উপায় বের করার সামরিক সক্ষমতা অর্জন একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিকাশের গুরুত্বপুর্ণ উপাদান। ফলে নিজ সামরিক সক্ষমতা বা ব্যয় বাড়াব কি বাড়াব না সেটা কোন রাষ্ট্রের সুবোধ ইচ্ছাধীন ব্যাপার নয়। আবার সামরিক সক্ষমতা থাকা মানেই অস্ত্র হাতে সবাইকে দাবড়ে বেড়ানোও না। সেটা বিশুদ্ধ মাস্তানি হতে পারে, যার কোন রাষ্ট্রিক বা অর্থনৈতিক তাৎপর্য নাই। কারও সাথে নিজের বা পারস্পরিক স্বার্থ প্রসঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের মাঠে চলে যাওয়া সবসময়ই যে কোন রাষ্ট্রের জন্যই বিপজ্জনক। কিন্তু টেবিলে বসে আলোচনা করার সময় আমার পকেটে যে পিস্তল আছে সেটা জানিয়ে পকেট উচা করে রাখলে আমার গলার স্বর একরকম গুরুত্ব পাবে আর না থাকলে স্বর অন্য রকম হবে। হয়ত কথা গুরুত্বই পাবে না, পাত্তা পাবে না। এই খুটিনাটি দিক থেকে চিন্তা করলে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানেই আমরা সামরিক ব্যাপারটা কিছুটা বুঝতে পারব।

ভারতের এসব সাধারণ হুঁশজ্ঞান সবসময়ই ছিল, না থাকার কোন কারণ নাই।। কিন্তু সেই সাথে নেহেরুর আমল থেকে ভারতের একটা নীতি হল, ইন্ড্রাস্টিয়াল পণ্য বিদেশ থেকে সরাসরি আমদানি না করে বরং সরবরাহ কোম্পানীর সাথে ভারতীয় কোম্পানীর যৌথ উদ্যোগে লোকালি ঐ পণ্য বানানোর কারখানা করা। ভারতের জনসংখ্যা বড় ফলে বাজারও বড় বলে এই ধরণের নীতি সফল হয়েছে কমবেশি। কিন্তু অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম উড়োজাহাজ নৌজাহাজ সংগ্রহ করার বেলায় একই নীতি অনুসরণ করতে গিয়ে ভারতের অসফলতা সীমাহীন। এগুলো হাইটেক বলে শুরুতে তাদের পরিকল্পনা ছিল স্পেয়ার পার্টস তৈরি আর এসেম্বল দিয়ে শুরু করে আস্তে আস্তে পুরা জিনিষটা তৈরির দিকে যাওয়া হবে। আর সে অনুপাতে তৈরি পণ্য আমদানি কমিয়ে আনা হবে। কিন্তু তা ঘটে নাই। অসফলতার কারণ বিবিধ। ভারতীয় স্টিলের কোয়ালিটি, অথবা ম্যানেজমেন্টের অক্ষমতা, সামরিক বিষয়ক সবকিছুই সরকারি মালিকানাধীন কারখানা প্রতিষ্ঠান বলে ইত্যাদির অদক্ষতাসহ জানা অজানা সম্ভাব্য কারণ যাই হোক -- শেষ কথায় ভারতের সামরিক সরঞ্জাম স্থানীয় ভাবে উৎপাদনের প্রজেক্ট ফেল করেছে।

সেকথার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় গত ২৪ জুন ২০১৪ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকার এক রিপোর্টে থেকে। রিপোর্ট বলছে, “The problem is with technology, quality as well as cost and delivery schedules”। গত ৩০ মার্চ ২০১৩ প্রভাবশালী ইকোনমিষ্ট একই বিষয়ে আলোকপাত করে বলছে, “The defence ministry is chronically short of military expertise”। ভারতে সামরিক হার্ডওয়ার সংগ্রহ অর্জনের দুর্বলতার বিষয়টা নীতি বিষয়ক কাগজপত্রে সামরিক খাতে “আত্মনির্ভরতা” বা “সেলফ রিলায়েন্স” শব্দে আলোচনা করা হয়। গত বছর ১৪ মে ২০১৩ দি হিন্দু পত্রিকা লিখছে, “The government has finally started taking small steps to change procurement policy but what is required is to free it from the inefficient public sector”। অর্থাৎ অদক্ষ সরকারি মালিকানাধীন সামরিক উৎপাদক কারখানাগুলোকে সব সমস্যার গোড়া মনে করছে। এছাড়া কোন সামরিক কারখানায় আগে ২৬% পর্যন্ত বিদেশি মালিকানা থাকতে পারত যা বাডিয়ে ২০১৩ সালে ৪৯% করাতে এটাকে সামরিক হার্ডওয়ার সংগ্রহ বা প্রকিউরমেন্ট নীতিতে খুবই “সামান্য পদক্ষেপ” বলে বর্ণনা করছে। সামরিক উতপাদন খাতে “আত্মনির্ভরতার” বুলির ভারে ভারতের সামরিক সক্ষমতা কিভাবে ধুঁকছে তা ধারণা করা যায় এসব রিপোর্ট থেকে।

সামরিক উড়োজাহাজ আকাশেই দুর্ঘটনায় পড়া অথবা সাবমেরিন নিজেই মৃত্যুকুপ হয়ে উঠায় এগুলো ইতোমধ্যেই ভারতের বাহিনীর কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। গত সপ্তাহে ভারতের এনডিটিভির আলোচনা থেকে জানা যাচ্ছে সেখানে সংসদীয় কমিটিতে আলোচনার ইস্যু হল বাহিনীর পায়ের বুটের অভাব, রাইফেল ও অস্ত্রের বুলেটের অভাব আর বাহিনীর ক্ষোভ।

 না ভারতীয় বাহিনীকে খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নাই। সেই ভাবনা উস্কে দেওয়াও বাতুলতা। বরং সমস্যার মাত্রার গভীরতা এখান থেকে বুঝতে হবে। অর্থাৎ হাইটেক বিষয়াদি থেকে বুট বুলেট সরবরাহ পর্যন্ত এই অব্যবস্থাপনা বিস্তৃত। ভারতের সামরিক সক্ষমতার দুর্দশার গভীরতার চিত্র এগুলো। অর্থাৎ ভারতের জন্য এটা স্রেফ বিদেশ থেকে সামরিক সহযোগিতা পেলেই হচ্ছে না বরং কেমনভাবে সে সহযোগিতা নিব সে প্রশ্নও বটে।

আজকের দুনিয়ায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আইডিওলজি বা অন্যকিছুর যতোই ভিন্নতা বা বিরোধ থাকুক, সারা দুনিয়া একই গ্লোবাল পুজিতন্ত্রের অন্তর্গত হয়ে, পরস্পরের সাথে পরস্পর গভীর থেকে গভীরতর নির্ভরশীলতায় পুঁজির চলন ও বিচলনের সুত্রে বিনিময় লেনদেনে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। নতুন বাস্তবতায় সহসাই রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধ বড় আকারে যুদ্ধের দিকে মোড় নেবে এমন সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কমে এসেছে। এমনকি চিন-আমেরিকার ক্ষেত্রেও এটা সত্য। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর তাদের আধিপত্য কায়েম রাখবার চেষ্টা অবশ্য অব্যাহত রাখবে।

তবু এক সিনারিও ধরে নেয়া যাক। যদি দুর্ঘটনাবশত যুদ্ধের পরিস্থিতি হাজির হয়ে যায় এই কল্পনায়, ভারতের সাথে স্বার্থবিরোধে সম্ভাব্য যেসব রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ হতে পারে সে তালিকায় এক নম্বরে যে থাকবে, যার সাথে যুদ্ধে ইজ্জত রক্ষা করা বা অন্তত ইজ্জতের সাথে যার মুখোমুখি দাড়ানোটা সম্ভবত সম্ভব এবং খুবই জরুরি সেই রাষ্ট্র হল চিন। তাতে সে বাস্তবতায় চিন-ভারত সম্পর্ক গভীর সহযোগিতামূলক কোন গ্লোবাল এলায়েন্সে যুক্ত থাকুক আর না থাকুক অথবা আজকের মত সম্পর্কে থাকুক – এখন এটাই বাস্তবতা। আগামি দু-তিন যুগেও এই অবস্থার সহসা বদল হবে না।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের অস্ত্র সরঞ্জাম পাবার নির্ভরযোগ্য সম্ভাব্য প্রধান উৎস আমেরিকা এমন ইমাজিনেশনের বাইরে অন্য কিছু কল্পনা করাও ভারতের সংশ্লিষ্ট লোকেদের জন্য খুব সহজ নয়। সম্প্রতি চিনের প্রেসিডেন্টের ভারত সফরে মোদী জাপানের সাথে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে চিনের বিনিয়োগ হাসিল করেছেন। ফলে বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক মূলক গভীর সম্পর্ক চিনের সাথে ভারতের অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু সামরিক সহযোগিতার দিকটা বাদে। অস্ত্র, অস্ত্রের টেকনোলজি, হাইটেক ইত্যাদির ক্ষেত্রে ভারত চিনের ওপর নির্ভর থাকবে না, কিম্বা থাকতে চাইবেও না।  আগামিতে ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে সামরিক সক্ষমতার যে প্রয়োজন দেখা দিবে তাতে কোন সামরিক সহযোগিতার বিষয় চিনের সাথে ঘটা অসম্ভব। কারণ সামরিক সংঘাত চিনের সাথে ঘটবার সম্ভাবনা থাকায় চিনের সাথেই আবার ভারতের সামরিক সহযোগিতা হবার সম্ভাবনা সেটা নাকচ করে। সামরিক ইস্যুর এই বাস্তবতার দিকটার জন্য ভারতের রাজনৈতিক দল, নেতা, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় যুক্ত যে কেউই আমেরিকান সহযোগিতা পাবার আশা ত্যাগ করে অন্য কিছু ভাবতে পারে না। তাদের লোভের জায়গাতা এখানে। ফলে মার্কিন সামরিক সহযোগিতা --- এটাই আমেরিকার কাছে ভারতীয়দের মনোবাসনা। মোদিরও বটে।

এই কামনা পূরণে ভারত কতদুর আমেরিকার কাছে ধরা দিতে পারে? কামনা পূরণের বিনিময়ে ভারত আমেরিকার কাছে নিজের কোন স্বার্থ এবং কতটা ছাড় দেয়া সঠিক গণ্য করবে। এই মাত্রা নির্ণয়ও ভারতের জন্য খুবই জটিল ও গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। আজ অথবা সামনে আমেরিকান নেতৃত্বের পুরান বা চলতি গ্লোবাল অর্ডারটা আর চলতে পারবে না, তা ভেঙ্গে না পড়লেও ঢলে পড়া শুরু হয়েছে। আলামত ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। আর বিকল্প চ্যালেঞ্জকারি সম্ভাব্য প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তব হতে শুরু করে দিয়েছে। আগামি গ্লোবাল অর্ডারের প্রতিষ্ঠানগুলো আকার নেয়া শুরু করে দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে যত দেরিতে ভারত যোগ দিবে, যতই (covenant) উদ্যোক্তা হতে দ্বিধা করবে, নানান কৌশলে এড়িয়ে থাকার চেষ্টা করবে, এসব প্রতিষ্ঠানগুলো জন্ম নেবার গতি কমিয়ে রুদ্ধ করতে অংশ নিয়েও ক্রমাগত ওজর আপত্তি তুলে দেরি করাবে অথবা অংশগ্রহণই করবে না ততই ওসব প্রতিষ্ঠানে শুরুর দিকে আকার নেবার ক্ষেত্রে ভারতের ভুমিকা কমে যাবে বা থাকবেই না।

যেমন BRICS ব্যাংকের জন্মের লক্ষ্যে প্রথম সামিট হয় ২০০৯ সালে। কিন্তু নানান ওজর আপত্তিতে এখনও এটা কাতরাচ্ছে। স্পষ্ট আকার নিতে পারে নাই। আপাতভাবে ভারত আছে ভিতরে কিন্তু গতি কমানোর ভুমিকায়। বিপরীতে AIIB এর ক্ষেত্রে, আইডিয়াটা চিন প্রকাশ বা হাজির করেছে মাত্র গত বছর অক্টোবরে ২০১৩ তে, আর এবছরই তা আকার নিয়ে ফেলেছে। BRICS গড়ার ক্ষেত্রে গড়িমসি দেখে এটা চিনের বিকল্প পথ বা পালটা চাপ ও ক্ষমতা দেখানোর ব্যবস্থা। ভারতও AIIB তে অন্তর্ভুক্ত না থেকে পারে নাই। আমেরিকার নিউইয়র্ক টাইমস ০৯ অক্টোবর ২০১৪ এব্যাপারে একটা বিশ্বস্ত সুত্রের খবর ছেপেছে। অনুবাদ করে বললে তা হল, AIIB এর বিষয়ে, “চিনা উদ্যোগের সাথে সম্ভাবনায় ইচ্ছুক পার্টনার যারা তাদের সাথে নিরবে ঢিলেঢালা আলাপের পরিবর্তে এই ব্যাংকের বিরুদ্ধে আমেরিকান কর্মকর্তারা সচরাচর আশা করা হয় না এমন প্রত্যয়ের সাথে ব্যাংক প্রজেক্ট যাতে ঝুলে যায় সেজন্য প্রচার ও বুঝানোর কাজে নেমে পড়েছে – সিনিয়র আমেরিকান কর্মকর্তা ও অন্যান্য সরকারের প্রতিনিধিদের তরফে এটা জানা গেছে”।

এই রিপোর্টের এক সপ্তাহ আগে মোদী পাঁচ দিনের আমেরিকা সফরে ছিলেন। এর প্রথম তিনদিন কাটিয়েছেন নিইয়র্কে জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলির মিটিংসহ, শেষের দুদিন আসলে ছিল ওয়াশিংটনে ওবামার সাথে দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে সফর। দ্বিপাক্ষিক বিষয়গুলোর মধ্যে ক্রুসিয়াল ছিল বিগত দশ বছরের সামরিক চুক্তির নবায়ন। যেটা স্বাক্ষর হয়েছিল ২০০৫ সালে, শেষ হচ্ছে আগামি বছর। এই সফরে সেই চুক্তি আরও দশ বছর নবায়ন করার ব্যাপারে নীতিগতভাবে উভয়ে একমত প্রকাশ করেছেন। এতে কি কি বিষয় নতুন যুক্ত হবে বা বাদ পড়বে, বদলাবে এসব খুটিনাটির ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টের খসড়া তৈরির কাজ চলছে। ভারতের সামরিক সংগ্রহ ও ক্রয়ের ৩০ ভাগ নিজেরা করতে পারে, বাকিটা আমদানি। আবার সামরিক হার্ডওয়ারের নির্ভরতার ৭০ ভাগই উৎস রাশিয়া। বাকি ৩০ ভাগে মূলত আমেরিকা, তবে ফ্রান্সও আছে। গত দশ বছরে আমেরিকার সাথে ডিফেন্স প্যাক্টের আওতায় ১০ বিলিয়ন ডলারের আমদানি ঘটেছে। ভারী কিছু তুলে বহন করার হেলিকপ্টার ও এট্যাক হেলিকপ্টার এবং এন্টি-ট্যাংক মিশাইলের সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের ক্রয় নিয়ে আলোচনা চলছে।

কিন্তু এপর্যন্ত এগুলোতে ভারতে স্থানীয়ভাবে যৌথ উৎপাদন, যৌথ উন্নয়ন ও ডিজাইন কাজ অথবা টেকনোলজি হস্তান্তর বিষয়ক কোন কিছুই ঘটেনি। যদিও কোন যৌথ মালিকানা সামরিক প্রজেক্টে ২৬ ভাগ বিদেশি মালিকানায় করার আইনি সম্মতি আগে দেয়া ছিল যেটা সম্প্রতি ৪৯ ভাগে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এসত্ত্বেও। এই তথ্যগুলোর বেশির ভাগই নেয়া হয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ভারতের আইবিএনলাইভ ওয়েবসাইট থেকে। অর্থাৎ ভারতের আমেরিকার কাছ থেকে কাম্য বহু কিছুই পাওয়া হয়নি, ফলে ভারত আকাঙ্খী। আবার উপরে চিনের AIIB ব্যাংক এর বিষয়ে, সম্ভাব্য রাষ্ট্রগুলোকে এর উদ্যোক্তা সদস্য হওয়া ঠেকাতে আমেরিকার মরিয়া প্রচেষ্টা সম্পর্কে নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে তাতে মিডিয়া জগতে এই অনুমান শুরু হয়েছে যে ওবামা-মোদীর আলোচনায় ওবামা মোদীকে AIIB এবং BRICS ধরণের উদ্যোগে সামিল হতে নিরুৎসাহ হবার শর্ত না হলেও পরামর্শ রেখেছিলেন। শর্ত এই অর্থে যে আমেরিকার সাথে হবু সামরিক চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট ফাইনালি কি দাঁড়াবে, কি কি অন্তর্ভুক্ত হবে তা সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তর বিষয়ে কতটা কি থাকবে এরই বিনিময় শর্ত। যদিও টাইমসের রিপোর্টে কোন কোন রাষ্ট্রকে কান ফুসলানি দিয়ে AIIB থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে বলে লিখেছে কিন্তু ওসব রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট নাম দেয়া হয়নি। শুধু বলা হয়েছে ব্যাংক বিষয়ে “China’s potential partners” এবং আমেরিকার “important allies” এভাবে। যদিও অন্যান্য কিছু মিডিয়া রিপোর্টে দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অষ্ট্রেলিয়ার নাম সুনিদিষ্ট করে এসেছে। এদের মধ্যে প্রথম দুদেশ AIIB এর উদ্যোক্তা স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণই করেনি। আর অষ্ট্রেলিয়াও অনুপস্থিত ছিল তবে পরের মাসে আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছে। তবে ওবামা মোদীকে যাই বলে থাকুক পরের মাসে ২৪ অক্টোবর ২০১৪ AIIB এর উদ্বোধনে গিয়েছে এবং উদ্যোক্তা সদস্যরা স্বাক্ষর করেছে। তবে ওবামা-মোদীর আলোচনায় AIIB এবং BRICS প্রসঙ্গটা কিভাবে এসেছে তা জানতে একাডেমিক মিডিয়া লেভেলে জল্পনা কল্পনা শুরু হয়েছে। ওবামা মোদীকে শর্ত অথবা পরামর্শ যাই দিয়ে থাকুক অথবা না AIIB বিষয়টা এমনই যে BRICS ব্যাংকের মত গতি কমানোর ভুমিকা নেবার সুযোগ ভারতের এখানে নাই। শুধু তাই না আমেরিকার কাছ থেকে সামরিক সহযোগিতা পাবার লোভে ভারত AIIB তে যোগ না দিলে ভারতেরই আবার অন্য নগদ কিছু স্বার্থ হারাবার সম্ভাবনা আছে। কারণ AIIB তে অংশগ্রহণকারির সংখ্যা এবং তাদের আগ্রহ আর সর্বোপরি এশিয়াতে অবকাঠামো খাতে ঋণ প্রাপ্তির চাহিদার ৯০ ভাগই ঘাটতি, অর্থাত পুরণ হয় নাই। এশিয়ায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবির হাত দিয়ে প্রাপ্য যোগ্য ঋণ বা প্রতিষ্ঠান দুটোর সক্ষমতা এদের সদস্য দেশগুলোর চাহিদার দশভাগের একভাগ মাত্র। অর্থাৎ কাড়াকাড়ি ধরণের ঘাটতি আছে এখানে।


Time

 

টাইম পত্রিকায় মোদি। বহুজাতিক কর্পোরেশান ও ধনি দেশগুলো মোদিকে কিভাবে দেখছে ও বিচার করছে এই প্রচ্ছদ থেকে সেতা বোঝা যায়


এশিয়ায় এডিবির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অবকাঠামোগত ঋণের চাহিদা কত এ বিষয়ে এক ষ্টাডি বলছে আগামি আট বছরের প্রজেকশন অনুযায়ী এর মোট চাহিদা বছরে এক ট্রিলিয়ন করে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের চলতি প্রেসিডেন্ট কিম তাই এই পরিস্থিতিকে "massive need" বলে উল্লেখ করে AIIB এর আগমনকে স্বাগত জানিয়েছেন। অর্থাৎ তিনি পেশাদার থাকতে চেয়েছেন, রাজনৈতিক বা কোন রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে দাড়াতে চান নাই। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ম্যান্ডেট অনুসারে এর কর্মিদের কোন মন্তব্যে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরাসরি কোন রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে অথবা এর রাজনৈতিক বিষয়াদিতে জড়িত হতে নিষেধ করা আছে। এই অর্থে পেশাদার কথাটা পড়তে হবে। অতএব সারকথা দাড়াল আমেরিকার ভাল লাগুক আর নাই লাগুক, এশিয়া চিনেের উদ্যোগের AIIB এর আগমনকে প্রত্যেক সদস্য রাষ্ট্র নিজ নিজ স্বার্থে স্বাগত জানায়। যদিও ওবামার আমলা প্রশাসন ২৪ অক্টোবর AIIB এর উদ্যোক্তা সদস্য সামিট শেষ হবার পর নিজেদের জন্য এক সান্ত্বনা প্রকাশ করেছে। বলছে এশিয়ায় ভারত ছাড়া বড় অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো AIIB তে যোগ দেয় নাই। যেসব রাষ্ট্র যোগ দিয়েছে তাদের সংখ্যা ২২ আর সর্বসাকুল্ল্যে এদের ঋণ চাহিদা পুরণ করতেই ৫০ বিলিয়ন ডলার যথেষ্ট বলেই চীন AIIB তে ৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু করেছে। অর্থাৎ যেন তাদের ভাঙড়ি দেবার কুটনৈতিক তৎপরতা সফল। এশিয়ায় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এডিবির মিলিত ঋণ বিতরণের থলে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলারের। এর তুলনায় চীনের একা ৫০ বিলিয়ন কম নয়। কিন্তু এরচেয়ে বড় কথা এই সংখ্যাটা চিনেের সামর্থের প্রকাশ নয়। বলা যায় ঋন নিতে আগ্রহিরা তাদের চাহিদা মিটাতে কেমন এগিয়ে আসে তা দেখার। ফলে এটা প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি। কারণ চিনেের সক্ষমতা এখনকার দুনিয়ার যে কোন রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। এছাড়া AIIB ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে এর বীজ-পুঁজি সরবরাহের উৎস হবার ক্ষমতা অর্থাৎ উদ্বৃত্ব অর্থনীতির কোন রাষ্ট্র আছে এই প্রশ্নে চিন অপ্রতিদ্বন্দ্বি, একচেটিয়া। এক হিসাবে দেখা যায় AIIB বা BRICS ধরণের প্রতিষ্ঠানে (অর্থাৎ বাণিজ্যিক বাজার মুনাফার প্রজেক্ট নয়) এই মুহুর্তে চিনেের বিনিয়োগের ক্ষমতা তিন ট্রিলিয়ন ডলারের মত। অতএব এখানে আলোচ্য প্রসঙ্গের জন্য মুলকথা হল AIIB তে যোগ না দিলে বা গরিমসি করলে অবকাঠামো ঋণ গ্রহিতা হিসাবে ভারতের ক্ষতি। ফলে এখানে ভারতের (covenant) উদ্যোক্তা হতে দ্বিধা দেখানোরও সুযোগ নাই। বরং এখানে নিজ অর্থনীতির সাইজ হিসাবে চিনেের পরেই দ্বিতীয় ষ্টেকহোল্ডারের গুরুত্ত্ব ও সে অনুযায়ী প্রভাব সে রাখতে পারবে, যা না নিলে সে সুযোগ হারাবে। অনুমান করা যায় এসব বিবেচনা থেকে ওবামা যাক বলে থাকুক ভারত বিনাবাক্যে কোন মিডিয়া নিউজ তৈরি না করেই AIIB তে যোগদান করেছে।

 

এবিষয়ে আর একটা উদাহরণ হলঃ আমেরিকার কাছে ভারতের তুলনায় অনেক কাছের রাষ্ট্র অষ্ট্রেলিয়া, সাউথ-ইষ্ট এশিয়ার জগতে অস্ট্রেলিয়া সবার আগেই আমেরিকার পক্ষে পতাকা তুলে আছে , দেশটি আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার। চিনকে প্রাথমিক কথা দিয়েও সে আমেরিকার প্ররোচনায় AIIB তে উদ্যোক্তা সদস্য হবার খোঁড়া অজুহাত তুলেছিল যে সে অপেক্ষা করে দেখতে চায় এই প্রতিষ্ঠানটা স্বচ্ছ হয় কি না। অষ্ট্রেলিয়ার আভ্যন্তরীণ প্রচন্ড বিতর্কের মুখে এবং AIIB সামিট শেষে পরের সপ্তাহে চিনেের সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক চুক্তির পর আর দ্বিধা টিকাতে পারে নাই। এখন সদস্য হবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আসলে এমন কিছু অবজেক্টিভ বাস্তবতা তৈরি হয় যেটা কোন একটা রাষ্ট্র অন্য সব রাষ্ট্রের উপরে অধিক সুবিধা পেয়ে যায়, ক্ষমতা পড়ে পাওয়া বাস্তবতা হিসাবে আসে যেটা কেউ চাইলেই অস্বীকার করতে পারে না। যেমন ১৯৪৪ সালে আইএমএফ গঠনের সময় ডলারকে আইএমএফের এর একমাত্র আন্তর্জাতিক বিনিময় মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করা ছাড়া অন্য সদস্য রাষ্ট্র কারও উপায় ছিল না। ফ্রান্স তবু আপত্তি তোলার বা এড়ানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু টিকাতে পারে নাই। কারণ বিশ্বযুদ্ধের সেকালে নিজ অর্থনীতির ব্যালেন্সশীটে উদ্বৃত্ব অর্থনীতির রাষ্ট্র ছিল একমাত্র আমেরিকা। আর বিপরীতে উদ্বৃত্ব দূরে থাক আমেরিকার কাছে ক্যাশ ও কাইন্ডের ঋণে অনুদানে আকন্ঠ নিমজ্জিত ছিল এককালের কলোনি সাম্রাজ্য রুস্তম-রাষ্ট্রগুলো বৃটেন, ফ্রান্সসহ সবাই। কমবেশি তেমনই “উদ্বৃত্বের” বাস্তবতায় এখন আমেরিকায় জায়গায় চিন হাজির হয়েছে। চিনেের এমন উদ্বৃত্ব এখন তিন ট্রিলিয়ন ডলার।

ভারতের দিক থেকে দেখলে, চিনেের এই “উদ্বৃত্ত্ব বাস্তবতার” পরিস্থিতি আরও প্রায় সব জায়গায় পড়ছে। যেমন BRICS অথবা করিডর কেন্দ্রিক BCIM এর গঠনে। এখানে চিনেের সাথে সে নিজেকে সমমর্যাদা ও সমগুরুত্ত্বের স্বার্থের সদস্য হিসাবে তুলে ধরতে চাইছে। কিন্তু বিনিয়োগ সক্ষমতার প্রশ্নে যে বিনিয়োগ আবার বাণিজ্যিক বাজার মুনাফা ধরণের বিনিয়োগ নয় অর্থাৎ এই বিনিয়োগে সুদ ফিরে আসবে খুবই কম ১% এর নীচে, এমন বিনিয়োগ সক্ষমতার দিক থেকে চিনেের সাথে সে কোনভাবেই তুলনীয় নয় বরং সে ঐ বিনিয়োগের গ্রহিতা দেশ, দাতা নয়। এই বাস্তবতায় চিন কেন বেশি বিনিয়োগের সক্ষমতার জোরে কোনও কোনও বিষয়ে বেশি সুবিধা পাবে এগিয়ে থাকবে এপ্রশ্ন তুলে লাভ নাই, এমনকি ঈর্ষা করেও লাভ নাই। তবে চিনেের সাথে কোন উদ্যোগে জড়িয়ে গিয়ে তাতে নিজের মারাত্মক বা পার্মানেন্ট ক্ষতি হয় অথবা ভবিষ্যতে বড় কোন সমস্যায় না পড়ে এগুলো দেখে বুঝে নেবার, নিশ্চিত করার দরকার আছে। কিন্তু সেগুলোও বুঝে নেবার অন্য মেকানিজম বের করতে হবে। কিন্তু নিজের বিনিয়োগ সক্ষমতার মাপে BRICS প্রতিষ্ঠানে সবার সমান বিনিয়োগের মাপ-মাত্রা হতে হবে এমন আবদার ধরে বসে থাকলে BRICS প্রতিষ্ঠান এমন ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান হিসাবে থেকে যাবে, গ্লোবাল অর্থনীতিতে এমন ক্ষুদ্র প্রভাবের প্রতিষ্ঠান হবে যে তা জন্ম হওয়া আর না হওয়ার কোন ফারাক থাকবে না। BRICS প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্দেশ্যই এখানে মাটি হয়ে যাবে। একই ধরণের সমস্যা হচ্ছে করিডর কেন্দ্রিক BCIM এর গঠনে। এসব নিয়ে আরও বিস্তারে এদিক আবার ফিরে আসব। এছাড়াও মোদীর “অর্থনীতি” মুল ফোকাস নীতি এটা কিভাবে প্রথম চার মাস জুন-সেপ্টেম্বর মোদী পার করল সেদিকে কথা আগাতে হবে। পরের কিস্তিতে যাব সেদিক নিয়ে। কিন্তু চলতি কিস্তির সারাংশ হল, একদিকে চিনেের শক্তি “উদ্বৃত্ত্ব বিনিয়োগ ক্ষমতার” এই বাস্তবতার ক্ষমতা অন্যদিকে আমেরিকার কাছে থেকে ভারতের কাম্য সামরিক সহযোগিতা ইস্যুগুল্লো আদায়; এই দুইয়ের টানাপোরেনেতে সামরিক চাহিদার কামনা পূরণ করতে বিনিময়ে ভারত আমেরিকার কাছে নিজের কোন স্বার্থ এবং কতটা ছাড় দেয়া সঠিক হবে - এই মাত্রা নির্ণয়ও ভারতের জন্য একটা খুবই জটিল ও গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। এটা ভারতের দিক থেকে চিনেের প্রতি রাগ বা ঈর্ষা করে আমেরিকার দিকে হাটা দিবার মত সিম্পল নয়। আর আজ অথবা কাল গ্লোবাল অর্থনীতিতে আসন্ন নতুন অর্ডার কেবল সাধারণভাবে সারা দুনিয়ার আগামি ভবিষ্যত বলে শুধু সেটাই নয়, রাইজিং ইকোনমির ভারতের কাছেও এটা আরও গুরুত্বপুর্ণ, ভারতের নিজ অর্থনীতিরও ভবিষ্যত। আমেরিকার প্ররোচনায় চিন ঠেকানোর মেতে উঠার খেলার সোজা মানে হবে ঢলে পড়া পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটাকে জোর করে আয়ু দেয়া। নতুনের আগমনকে দেরি করিয়ে দেয়া মানে নিজের রাইজিং ইকোনমির ভবিষ্যতের পায়ে কুড়াল মারা। রাইজিং ইকোনমি কথাটার অর্থ তখনই মেলে ধরে ফুটে উঠতে পারে যখন এর অর্থ পুরান অর্ডারের স্বাভাবিক বিনাশ আর নতুন অর্ডারের মধ্যে নিজের প্রভাবের জায়গাগুলো যতটা সম্ভব নিশ্চিত করা। গ্লোবাল অর্থনীতির অবজেকটিভ ট্রেন্ড এটাই। আবার তা এমন নয় যে ভারত চাইলেই রুপান্তরের এই ট্রেন্ডকে থামিয়ে দিতে পারে বা গতি কমাতে পারে। বরং ঢলে পড়ছে বলেই ভারতের অর্থনীতি রাইজিং, নইলে নয়। আবার এর অর্থ দিকবিদিক হারিয়ে চিনেের কোলে ঝাপিয়ে পড়াও নয়। ভারতের এখন এই সুক্ষ্ম দড়ির উপর দিয়ে সামলিয়ে এক ব্যালেন্সিং এক্টে করে আমেরিকা-চিনেের সাথে সম্পর্কে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি করে এগিয়ে যাওয়ার সময়। কিন্তু সেক্ষেত্রে একটাই বিবেচ্য গ্লোবাল অর্থনীতির অবজেকটিভ ট্রেন্ড, পুরান অর্ডারটার ঢলে পড়া এটাকে স্বাভাবিক রাখা, নতুন আয়ু না দেওয়া। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টা সমান সত্য।

৩০ ডিসেম্বর ২০১৪

 

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।