জয়শঙ্করের সফর


দুটো ইস্যু

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট কোনদিকে সে অভিমুখের পরের স্তর শুরু হতে যাচ্ছে আগামি দুই মার্চ। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুব্রাহ্মনিয়াম জয়শঙ্কর আগামি দুই মার্চ একদিনের বাংলাদেশ সফরে আসছেন। কুটনৈতিক পাড়ার জোর অনুমানের ওপর তৈরি খবর হল জয়শঙ্কর যা বয়ে আনছেন তা কেবল ভারতের কথা নয় বরং তা একই সাথে আমেরিকা ও ইউরোপের সাথে ভারতের অবস্থান মিলিয়ে সমন্বিত অবস্থান। সে অবস্থানেরই বাহক তিনি। এর মানে হল, জয়শঙ্করের সফরটা ভারত-বাংলাদেশের রুটিন সফর বা অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে কোন আলোচনা নয়। বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে আসার ছলে সাইড টক হিসাবে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে পশ্চিমের সাথে মিলিয়ে এক “সমন্বিত বার্তা” পৌছে দেওয়া।

এমন অনুমানের পিছনে আরও বড় কারণ হল, ভারতের সাথে বাংলাদেশের রুটিন কূটনৈতিক ইস্যু নিয়ে কথা বলার অবস্থা এখনও তৈরি হয় নি। সেটা অপরিপক্ক অবস্থায় আছে যা এমাসের শেষে পাকতে পারে। উভয় দেশের ঘোষিত অমীমাংসিত ইস্যু হল, ল্যান্ড বাউন্ডারি আর তিস্তা। তিস্তা ইস্যুতে সর্বশেষ অবস্থা বুঝবার জন্য প্রথম আলোতে ১ মার্চ প্রকাশিত নয়াদিল্লীর সৌম্য বন্দোপাধ্যায়ের রিপোর্ট পড়লেই জানা যায় বিষয়টি এখনও কতো অপরিপক্ক অবস্থায় সাত হাত পানির নিচে পড়ে আছে। এনিয়ে এখনই কথা বলার জন্য ভারতের পক্ষ থেকে কারও আসার মত পরিস্থিতি নাই। সর্বশেষ হল, কেবল মমতার নো অবজেকশন পাওয়া গেছে। কিন্তু একে বাস্তব রূপ দেওয়ার কথা চিন্তা করতে গিয়ে ভারতের আমলারা অস্বস্তিতে পড়েছেন। সৌম্য বন্দোপাধায়ের ভাষায়, “ভরসা রাখার পরামর্শ দিয়ে মমতা তাঁদের (মানে আমলাদের) দুশ্চিন্তাও যেন কেড়ে নিয়েছেন”। এছাড়া আরও লিখছেন, “ভারতের জলসম্পদ মন্ত্রণালয়কে এখন তা করতে হবে। কীভাবে, তা নিয়ে এই বিভাগের মন্ত্রী উমা ভারতী এখনো মাথা ঘামাননি। এই চুক্তির মূল কারিগর তাঁরই মন্ত্রণালয়”। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও মন্ত্রণালয় যেখানে এখনও “মাথা ঘামানো” শুরুই করেন নি সেখানে তা নিয়ে জয়শঙ্করের বাংলাদেশের কাছে আসার কোন কারণই তৈরি নাই। সারকথায় এই ইস্যুতে সফরের সময় এটা নয়, অপরিপক্কতার অর্থ এটাই।

এছাড়া দ্বিতীয় ইস্যু ল্যান্ড বাউন্ডারি – এটা নিয়েও বাংলাদেশের সাথে কথা বলার কিছু নাই, সব কথাই শেষ। বাকি আছে ভারতের করে দেখানো, সংসদে ভারতের কনস্টিটিউশানে আইনী সংশোধনী আনা। যেটা চলতি আহূত সংসদে এমাসের ২৩ মার্চের মধ্যে মোদি সরকারকে পাশ করিয়ে আনতে হবে। অর্থাৎ ২৩ মার্চের আগে আইন পাশ করানোর আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের সাথে এটা নিয়ে কথা বলার কিছুই নাই। ঐ এক্টের আগে এখন কথা বলতে আসাটা অপরিপক্কতাই হবে। মোদির সাধারণ রুটিন আকাঙ্খাও তাই ছিল যে ঐ আইন পাশ করার পরই তিনি বীরের বেশে বাংলাদেশ সফরে আসতে চান। মোদির এই মনোভাব বুঝতে দেখুন সৌম্য বন্দোপাধ্যায়ের ১৩ ফেব্রুয়ারির রিপোর্ট

তাহলে  দুই অমীমাংসিত ইস্যুর দিক থেকে দেখলে সারকথা দাঁড়ালো জয়শঙ্করের এই সফর করতে চাওয়া অসময়ের। অথবা অন্যভাবে বলা যায় এই দুই ইস্যুর বাইরে অন্য জরুরি রাজনৈতিক বিষয়াবলির আবির্ভাব ঘটেছে তাই সে প্রেক্ষিতে “সঠিক সময়েই” ঘটছে জয়শঙ্করের এই সফর। অর্থাৎ উপরে যেটাকে “সমন্বিত বার্তা” বাহকের “সাইড টক” বলেছি সেটাই এই সফরের মুখ্য ইস্যু।

খালেদা জিয়ার সাথে কি দেখা হবে?

ওদিকে বক্সিবাজারের বসানো বিশেষ জেলা জজ আদালতের মামলার আদালত থেকে বিচারক খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি করেছেন গত ২৫ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু তা এখনও তামিল হয়নি। আদালতের হুকুম তামিলের ব্যাপারে আমরা অদৃশ্যপুর্ব বিশেষ পরিস্থিতি দেখছি। বলা হচ্ছে পরওয়ানা আদালতের প্রসিকিউশন শাখা থেকে সবার আগে পুলিশের সদর দপ্তরে যাবে। সেখান থেকে পুলিশ প্রশাসনের কাঠামো ধরে নিচে নেমে সরাসরি সংশ্লিষ্ট থানার ওসির কাছে যাবে। এরপর ওসির হুকুমে নির্দেশপ্রাপ্ত এক এস আই গ্রেফতারের হুকুম তামিল করতে খালেদার অবস্থানে আসবেন। কিন্তু আদালতের প্রসিকিউশনের শাখার পর থেকে এই পরওয়ানা এখন কোথায় কতদুর গিয়ে অবস্থান করছে সে খবর পাবলিকলি কেউ দিতে পারছে না, অজ্ঞাতই থেকে গেছে। অর্থাৎ একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রুটিন বিষয়টিকে আটকে বা দেরি করিয়ে রেখেছে, তা অনুমান করা যায়। এব্যাপারেও একটা অনুমিত খবর বাজারে চালু আছে। তা হল, জয়শঙ্কর সম্ভবত খালেদার সাথে দেখা করতে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন আর সেই অনুরোধ ক্ষমতাসীনরা আমল করেছেন। ফলে জয়শঙ্করের সাথে খালেদার সাক্ষাতের পরেই কেবল গ্রেফতার বিষয়টা আবার সচল হতে পারে। যদিও সাক্ষাতের পরে মানে কোন অনির্দিষ্টকাল ভাবার সুযোগ নাই। আদালত মামলার শুনানির পরের তারিখ ফেলেছেন ৪ মার্চ। অর্থাৎ খালেদা জিয়াকে ৪ মার্চ সকালের আগেই গ্রেফতার না করলে ঐদিন আদালতের কাঠগড়ায় তাঁকে হাজির করার বাধ্যবাধকতা সরকার পালন করতে পারবে না। আদালতের হুকুম তামিল করতে ব্যর্থ হলে সরকার আদালত অবমাননার দায়ে পড়ার কথা। আদালত সরকারকে এই বাধ্যবাধকতার মধ্যে ফেলেছে। এসবের সোজা মানে ৪ মার্চ ভোরের আগে খালেদা গ্রেফতার হতে যাচ্ছেন, যদিও গ্রেফতার হওয়ার পর আবার জামিন পেয়ে আগের মতই বাইরে খালেদা জিয়া থাকবেন কি না, সেই ব্যাপারটা আইনি নয় পুরাপুরি রাজনৈতিক বিষয়।

কিন্তু “সমন্বিত বার্তা বাহক” জয়শঙ্করই বা কেন? কিম্বা মার্কিন আধিপত্যের সীমাবদ্ধতা

কিন্তু “সমন্বিত বার্তা” বাহক কেন জয়শঙ্কর? কারণ হিসাবে এমন ধারণা করা ভুল হবে যে জয়শঙ্করের ভারত এখন পশ্চিমা দেশ, চীন বা রাশিয়া ইত্যাদি পরাশক্তি ছাড়িয়ে বাংলাদেশে হাসিনার উপরে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব রাখে, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। অনুমান করা যায় যে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটে কূটনৈতিক সব পক্ষের (ভারত আমেরিকা ও ইউরোপ) দিক থেকে সবার সমন্বিত উদ্যোগটা জয়শঙ্করের মাধ্যমে হাসিনার সামনে উপস্থাপিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু সেটা জয়শঙ্করেরই মাধ্যমে কেন? বলা যায় এমন পরিস্থিতিটা হাসিনাই তৈরি করে ফেলেছেন। আমাদের পুরানা অভিজ্ঞতা বলে যে বাংলাদেশের এরকমের পরিস্থিতিতে সাধারণত আমেরিকাই লিড নিয়ে থাকে, আর বাকিরা থাকে সহযোগী ভুমিকায়। কিন্তু সেই পুরানা অভিজ্ঞতা পাঠ করেই গত কয়েক বছর আগে থেকেই হাসিনাএই ধারণা চালু রেখেছেন যে তিনি আমেরিকাকে অমন লীড ভুমিকায় দেখতে চায় না। মার্কিন বিরোধী একটা ভাবমূর্তি গড়তে চাইছেন হাসিনা। গত ছয় বছরে হাসিনা প্রথম পাঁচ বছর মূলত ঐ প্রভাবশালী লীড ভুমিকায় আমেরিকার বদলে ভারতকে রেখে চালিয়ে গেছেন। আর সেই সুযোগে আমেরিকাকে সেকেন্ডারি করে রাখা বা দূরে রাখার সুবিধা হাসিনা নিয়ে চলেছেন। আবার আমেরিকার এমন দুর্দশার জন্য খোদ আমেরিকাই দায়ী। তবে আরও স্পষ্ট করে বললে ঠিক ওবামা প্রশাসন নয়, তাঁর আগের বুশ প্রশাসন দায়ী। হাসিনার ক্ষমতার আসবার আগের সময় ২০০৮ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট বুশ নিজেই আমেরিকার বদলে ভারতকে লীড অবস্থান দিয়েছিলেন। যেটাকে প্রায়ই দক্ষিণ এশিয়ায় ‘আমেরিকান যাঁতাকাঠি ভারতের হাতে’ ধার দেয়ার নীতি বলা হয়। এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন করে দেওয়াটা মার্কিন নীতিরই অন্তর্গত ছিলো। আজ আমেরিকা সেজন্য নিজের হাত কামড়াচ্ছে অবশ্য, কারন চাইলেই এই ব্যবস্থা রাতারাতি বদলানো যাচ্ছে না। এ ব্যাপারে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে পারে, এর বেশি কিছু না। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বছর খানেক আগে থেকে হাসিনা রাষ্ট্রদুত মজিনাকে দেখা দেওয়ার এপয়মেন্ট না দেয়া থেকে মার্কিন যুক্রাষ্ট্রের প্রতি তার রাগ প্রকাশ্যেই প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রদূতের বিদায়লগ্নের রেওয়াজ হল দেখা দেয়া, সেটাও তিনি করেন নাই। দিল্লীকে দিয়ে বাংলাদেশ নিয়ন্ত্রণের কাফফারা আমেরিকাকে এখনও গুনতে হচ্ছে। সারকথা হচ্ছে কোন বিদেশী কূটনীতিকের সাথে আলোচনায় আকার ইঙ্গিতেও হাসিনা আর ক্ষমতায় নাই এমন সিচুয়েশন কল্পনায় যারা আনতে পারে বা আনবে তাদের সাথে শেখ হাসিনা আর নাই – এটাই যেন নির্ণায়ক হয়ে গেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের পরিস্থিতির ইস্যুতে কথা বলার জন্য হাসিনার কাছে আমেরিকার প্রবেশাধিকার বা এই ইস্যুতে আলোচনার সুযোগ রহিত হয়ে আছে। এই ইস্যুতে শেখ হাসিনার কাছে মার্কিন যুক্ত্রাষ্ট্রের একসেস নাই। ফলে জয় শঙ্কর! অর্থাৎ জয়শংকরই ভরসা!

বর্তমান আমেরিকান রাষ্ট্রদুত বার্নিকোট বাংলাদেশ মিশনের দায়িত্ব পেতে ওয়াশিংটনে সিনেট অনুমোদনের শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কিনা পরীক্ষা দিতে গিয়ে গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ‘প্রতিনিধিত্বমূলক’ হয়নি বলেছিলেন। সেই বলার সময় থেকেই বাংলাদেশে আওয়ামি লীগ মহাসচিব সৈয়দ আশরাফ বার্নিকোটের প্রকাশ্য সমালোচনা শুরু করেছিলেন। ফলে সেই অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশে এসে দায়িত্ব নেবার পর থেকে বার্নিকোট বেচারা বুঝেছেন মুখবন্ধ রাখাই তার জন্য এখনকার জন্য বাধ্যতামূলক কূটনীতি। এখনও মিডিয়া এড়ানো টাইট লিপড মুখবন্ধ আর রুটিন কথাবার্তা্র মধ্যেই তিনি তার তৎপরতা সীমাবদ্ধ রেখেছেন। শুধু বাংলাদেশ এম্বেসি নয়, সামগ্রিক ভাবে আমেরিকান পররাষ্ট্র বিভাগের আত্ম-সংযম দেখে খামাখা খুশি হবার কিছু নাই কারণ এটা আবার ভারতমুখি হাসিনার আমেরিকাকে নাক দেখানো মাত্র। আসলে সেটাও এখানে মুখ্য কথা নয়। আসল কথা হল, মার্কিনী আত্ম-সংযমকে ব্যাখ্যা করব কি করে? সম্ভবত এর ব্যাখ্যাটা হবে এরকম যে আমেরিকান সিদ্ধান্ত হল রাষ্ট্রদূতের সাথে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যক্ষ বা মুখোমুখি বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া, সংঘাত এড়িয়ে চলা। হাসিনার দ্বারা সবই সম্ভব -- যার চরম দিকটা হয়ে যেতে পারে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বা সরকারে হস্তক্ষেপ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এমন অভিযোগ তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রলে বিব্রত করা। আর এমন চরম পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রদূতকে ‘পারসন ননগ্রাটা’ বা অ-অনুমোদিত ব্যক্তিত্ব ঘোষণা করে বসতে পারে সরকার। আর তাতে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে উপস্থিত থাকলেও মিশনের বাহ্যিক ফাংশনাল তৎপরতাকে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আধিপত্য খাবার বলয় সংকুচিত হয়ে যাবার সম্ভাবনা ঘটতে পারে। সম্ভবত এতদুর বিচার করলে সংযম কথাটার ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব। বরং এর চেয়ে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে আমেরিকার যা বলার সেটা ওয়াশিংটনের ষ্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকেই করা হবে, যেটা তারা বর্তমানে চালু করে দিয়েছে ইতোমধ্যে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রদুত বার্নিকোট তাঁর মুখ হাজির রাখতে পারছেন আর তার অফিসের রুটিন কাজের মধ্যে ফাংশনাল থাকার সুযোগ পাচ্ছেন – মার্কিন কূটনৈতিক তৎপরতার দ্বিবিভাগ ঘটেছে, এটা বাইরে থেকেই বোঝা যায়। তবে এ্মন অনুমান করা ভিত্তিহীন হবে যে সরকারের ধরন যাই হোক, আজকের পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার ভিতরে বসবাস করে কোন বিদেশি হস্তক্ষেপ সরকার এড়াতে পারলেও বিদেশী স্বার্থের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্য একেবারেই এড়িয়ে চলা এককথায় অসম্ভব। বিশেষত সেই সরকারের পাবলিক রেটিং বা পপুলার জনসমর্থন যদি না থাকে, হাসিনার মত হয়। এসব কিছু মিলিয়ে জয়শঙ্করের সফর – আমেরিকা ও ইউরোপের অবস্থানের সাথে ভারতীয় অবস্থান মিলে সমন্বিত উপস্থাপন।

নরেন্দ্র মোদি আর প্রণব মুখার্জির এপ্রোচে ফারাক

তবে আরও কিছু কথা আছে। আমেরিকাকে হাসিনার এই উন্নাসিক নীতি তৈরির পটভুমিটা তৈরি হয়েছিল প্রেসিডেন্ট বুশের সাথে তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের বুঝাপড়া ও সম্পর্কের ভিত্তিতে, তারই ফলাফলে। কিন্তু প্রণবের সেই কংগ্রেস সরকার আর এখন ক্ষমতায় নাই, গত হয়েছে। আর মোদি কোন বিবেচনাতেই প্রণব নন। ব্যক্তিগতভাবে প্রণবের সাথে হাসিনার সম্পর্ক যে পর্যায়ে ছিল মোদি ঠিক তেমন ভাবের কোন সম্পর্ক চান বলে মনে হয় না, প্রমাণ নাই। যেমন বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে অর্থনৈতিক করিডর বা কুটনৈতিক ভাষায় ভারত যেটাকে “কানেক্টিভিটি” বলে তা মোদিও অবশ্যই চান। কিন্তু এর অর্থ প্রণব করেন এভাবে যে এটা হাসিনার সরকারের কাছ থেকে আদায় করা বিনাপয়সায় ট্রানজিটের মালামাল নিবার একটা কাগুজে অনুমতিপত্র হিসাবে। কিন্তু মোদি এই পেটি মনোভাব থেকে ব্যাপারটাকে দেখেন না। তিনি ট্রানজিট করিডোর বা কানেক্টিভিটি বলতে বুঝেন কোন অনুমতির কাগজ নন বরং বাংলাদেশে করিডোরের জন্য রাস্তা ঘাট ব্যবস্থার ফিজিক্যাল ইনফ্রাষ্ট্রাকচার। ফলে স্বভাবতই সেটার বিস্তারিত অর্থ হল, একাজে বিনিয়োগের লক্ষ্যে দেশি-বিদেশী অর্থ যোগাড়, যৌথ প্রকল্প হাতে নেয়া আর পরে বাস্তব ইনফ্রাষ্ট্রাকচার রাস্তা ঘাট ইত্যাদি। অর্থাৎ এক বিশাল অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক কারবার হবে, যার মধ্যে দুপক্ষের লাভালাভ দেখতে পাওয়া, বাংলাদেশের হাত মুচড়ে তা আদায়ের পথেরও বাইরে এই প্রজেক্টের নিজস্ব বাণিজ্যিক ভায়াবিলিটি থাকবে। ফলে চাপে পড়ে নয় এরপর বাংলাদেশের সক্রিয় উদ্যাগ, অংশগ্রহণ এবং ভারতের টোল দিয়ে ব্যবহার করার ব্যাপার হবে। কারণ প্রশ্নটা হাত মুচড়ে নেবার নয়, প্রজেক্টের নিজস্ব বাণিজ্যিক ভায়াবিলিটি তৈরি করা । সহজ করে বললে ব্যাপারটা হল ঢাকা-চাঁটগা যাবার পথে আপনি রাস্তায় খাবেন কোথায় সেবিষয়ে নিজেকে বুদ্ধিমান ভেবে এর দায় চলার পথে পড়ে এমন বন্ধু বা আত্মীয়ের মাথায় চাপিয়ে দেবার কথা ভাবতে পারেন। কিন্তু এটা প্রাকটিক্যাল, প্রফেশনাল, সিরিয়াস ব্যবসায়ীর এপ্রোচ হল না। কারণ প্রতিবার সফরে আপনাকে খেতে গিয়ে খাওয়ার মান, সার্ভিস, সঠিক সময়ে না পাওয়া ইত্যাদির মুখোমুখি হতে হবে। অসন্তুষ্ট হতে হবে। আপনার ব্যবসার ক্ষতি হবে কিন্তু তাতে বন্ধু বা আত্মীয়ের কোন মাথাব্যাথা নাই, তাকে উদাসীন দেখবেন। ফলে এটা হল একটা গুরুত্বপুর্ণ বিষয়কে পেটি-মন থেকে দেখা সমাধানের এপ্রোচ। এমন ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীর সমাধানটা হবে ঐ বন্ধু বা আত্মীয়ের জমি ভাড়া নিয়ে আবার তার সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে পথের ধারে একটা হোটেল খুলে বসা। যাতে নিজে পয়সা দিয়ে প্রফেশনাল খাওয়া পাওয়া যাবে, সার্ভিসের মানের জন্য হোটেল ম্যানেজারকে ধমক দেয়া যাবে আবার ঐ হোটেল ব্যবসার লাভের অংশীদারি দু্টোই পাওয়া যাবে। অর্থাৎ ট্রানজিট ইস্যুতে এখানে প্রণবের এপ্রোচটা হল হাসিনার কাছ থেকে একটা পার্মানেন্ট দাওয়াতপত্র যোগাড় করা ধরণের। অথচ হাসিনাকে ক্ষমতায় রাখা বা নিঃশর্ত সমর্থনের বিনিময়ে বাংলাদেশ থেকে একটা কাগজ যোগাড়ের বিষয়ই নয় এটা। ভারতীয় ট্রাক যাবার ব্যাপারটি শুধু অনুমতির বিষয় নয়; সেই লং-হুইল ট্রাক যাবার “রাস্তা” কি হবে সে প্রশ্নে চুপ থেকে প্রকারন্তরে সেটা বাংলাদেশ নিজ রাজস্ব আয় দিয়ে “যেভাবে পারে” যুগিয়ে যাবে ধরে নিতে পারে একমাত্র পেটি চিন্তার মন। কোন সিরিয়াস ব্যবসায়ির চোখে এটা কোন অর্জন নয়। “যেভাবে পারে” অবস্থার রাস্তার দশা কেমন হবে সেটা যে কোন সিরিয়াস প্রফেশনাল ব্যবসায়ি বুঝে, ফলে এটা ব্যবহার করে কোন ব্যবসার সম্ভাবনা তিনি দেখবেন না। ফলে প্রণবের চোখে ট্রানজিট ইস্যুটা হল রাজনৈতিক, একটা তাঁবেদার সরকার বসিয়ে অনুমতির কাগজ যোগাড়ের আর মোদির চোখে সেটা অর্থনৈতিক, বাস্তব ইনফ্রাষ্ট্রাকচারের। বাংলাদেশে নিজের পছন্দের হাসিনা ধরণের সরকার সেখানে কোন ইস্যুই নয়। আবার ওদিকে ভারতের পুর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা ইস্যুটাও বাংলাদেশের তাবেদার সরকার বসালেই সমাধান হবে বলে প্রণব দেখেন। কিন্তু ব্যাপারটা ঠিক এমন নয়। আসল সমাধান ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের রাজস্ব থেকে রিসোর্স বন্টনে পিছিয়ে পড়া পুর্বাঞ্চলকে মনোযোগ দেয়া। মোদি এভাবে ব্যাপারটাকে দেখেন বলে নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই জানিয়েছেন। সারকথায় প্রণবকে হাসিনা যা বিক্রি করেছিলেন মোদির বেলায় মোদি তা কিনে ভারতের কোন লাভ আছে বলে মনে করেন না। ফলে তিনি হাসিনার গ্রাহকই না। হাসিনাকেই ক্ষমতায় রাখতে হবে এমন বাসনা বা গরজ তাই মোদির নাই। অন্তত প্রণবের মত তো নয়ই।

গত ২০১১ সাল থেকে ওবামা বাংলাদেশের উপর দিল্লির মধ্যস্থতায় ব্যবহারের যাঁতাকাঠিটা ভারতের থেকে ফিরিয়ে নিজের কব্জায় নিয়েছেন। এতে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়ে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা নাখোশ হয়েছেন বেশি। অন্য দেশের উপর প্রভাব খাটানোর অনিবার্য ক্ষমতা একটি দেশ অর্জন করে মূলত নিজ অর্থনীতির সক্ষমতাকে দুনিয়ার প্রধান দু-তিনটা অর্থনীতির একটা হিসাবে হাজির করতে পাবার উপর। ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা সেটা করে দেখানোর মুরোদ অর্জন করবার কষ্টকর কাজটা করে দেখানো ছাড়াই আমেরিকার যাঁতাকাঠি চায়। কংরেসের বিদেশনীতির ভারকেন্দ্র ছিল এখানে। গত ২০০৭ থেকে ২০১১ এই কয়েক বছর সেটা ব্যবহারের জমিদারি সুখ ভোগের পর সেটা ফিরে পাওয়া তাদের এখনকার একমাত্র আরাধ্য, সেটা পেলেই কেবল তারা সন্তুষ্ট হবে। কিন্তি বাস্তবতা পালটে গেছে কিন্তু তাঁরা সে বাস্তবতা মেনে ভিন্ন চিন্তা করতে চায় না। গত বছর মোদি জিতে আসার আগে পর্যন্ত ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক স্থবির হয়ে পড়ে ছিল। আগেই বলেছি ভারতের সমস্যাকে দেখার এপ্রোচ মোদির ভিন্ন। ফলে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ত্ব নিজের মতো মোদি ঢেলে সাজিয়ে নিতে পারলেও এর পক্ষে সমতালে আমলা-গোয়েন্দাদের উদ্যোগ সামিল করতে পারছিলেন না। একাজে ভারতের পররাষ্ট্র বিভাগ থেকে সবার আগে মোদির এপ্রোচের পক্ষে সক্রিয় সাড়া ও সহায়তা তিনি পান জয়শঙ্করের কাছ থেকে, তিনি তখন ছিলেন আমেরিকায় ভারতের রাষ্ট্রদুত। সেই থেকে মোদির চোখে জয়শঙ্করের গুরুত্ব ও ঘনিষ্ঠতা। আর ঠিক সমান বিপরীত মাত্রায় তখনকার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের প্রতি মোদির দুরত্ব সৃষ্টি ও অসন্তুষ্টি। পদের স্তর হিসাবে সার্ভিস আয়ুকালের দিক থেকে জয়শঙ্কর সুজাতার চেয়ে সিনিয়ার হলেও সুজাতার অধীনের পদে ছিলেন জয়শঙ্কর। গত জানুয়ারিতে ওবামার ভারত সফরের সময় এই পরিস্থিতি এতই মিসম্যাচ হয়ে উঠেছিল যে ঐ সফরের আয়োজনে উপলক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের আমলাদের কাজের দায়িত্ব বন্টনে সুজাতাকে কোন বিশেষ দায়িত্বের বাইরে রাখা হয়েছিল বলে ভারতীয় মিডিয়ায় খবর এসেছিল। জমতে থাকা এসব টেনশনের ফলাফলে ওবামার ভারত ত্যাগের ৪৮ ঘন্টার মধ্যে সুজাতার বরখাস্ত আদেশ আসে। আর জয়শঙ্করের সরকারি চাকরি জীবন শেষ হবার মাত্র দুদিন আগে তাঁকে পররাষ্ট্র সচিব বলে ঘোষণা করেন মোদি। জয়শঙ্করের বিশেষত্ব হল, তিনি বুশের থেকে তুলনায় বদলে যাওয়া ওবামার নীতি সহজে মেনে নিয়ে এরপর আমেরিকান স্বার্থ আর ভারতের স্বার্থের কমন জায়গা কি হতে পারে তা এক্সপ্লোর করে ভায়াবল ও কার্যকর পথ বের করতে সমর্থ একজন কারিগর হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন। এমন কাজ সফল করতে গিয়ে জয়শঙ্কর এক বিশাল সুবিধা অর্জন করেছেন। ভারতের সাথে আমেরিকার অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে ঐক্যমতের জায়গা বের করার জন্য আমেরিকাও মুখিয়ে ছিল। কারণ চ এশিয়া নীতিতে সাফল্য আসার ক্ষেত্রে ভারতের সাথে সম্পর্ককে আমেরিকা খুবই নির্ধারক বিষয় মনে করে। ফলাফলে আমেরিকার কাছেও জয়শঙ্কর একজন গভীর আস্থার ব্যক্তিত্ব হয়ে হাজির হলেন, যিনি আমেরিকার চাওয়া-পাওয়াগুলোর দিকগুলোর পজিশনের সম্যক খবর রাখেন। এসব কিছু মিলিয়ে আমেরিকার আস্থার জয়শঙ্কর – যিনি আগামি ২ মার্চ বাংলাদেশ সফরে আসছেন।

সফরের গ্রাউন্ড প্রস্তুতি

কিন্তু জয়শঙ্করের এই সফরের গ্রাউন্ড প্রস্তুত করতে মোদির স্টাইল খুবই চমকপ্রদ। মোদি চমক দিয়ে কাজ করতে দেখাতে ভালবাসেন। তিনি কোনভাবেই জয়শঙ্করের বাংলাদেশ সফরকে হাই প্রোফাইলে দেখাতে রাজি না। অর্থাৎ জয়শঙ্কর মূলত কেবল ভারতের নয় একটা সমন্বিত বার্তা নিয়ে আসছেন। ফলে এমন হাই প্রোফাইল সফর হওয়া সত্বেও মোদি সেটা লো প্রোফাইলে হাজির করতে চান। কারণ তাতে সফলতার সম্ভাবনা অনেক বেশি এবং তা সফরের লক্ষ্যের সাথে ফিট করে। মোদি একে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের রুটিন সার্ক-দেশগুলো সফর বলে হাজির করতে চাইলেন। জয়শঙ্করের এই সফরের অফিশিয়াল নাম তাই “সার্ক-যাত্রা”, অর্থাৎ কেবল বাংলাদেশ নয়।

কিন্তু দাওয়াতের একটা ব্যাপার আছে। এখানে দাওয়াত মানে ইজি মুলাকাত, আপোষে, নো টেনশন। জয়শঙ্কর একটা দাওয়াতে, যা মুলত সম্মতি্তে, বাংলাদেশে আসছেন সেটা দেখানোর দিকটাও জরুরি। তাই মোদি এবার ক্রিকেট-কূটনীতি ব্যবহার করলেন। তখন ওয়ার্ল্ড কাপ শুরু হচ্ছে, ফলে মোদি ঐ খেলার আয়োজনে সার্কের সদস্য যারা বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছেন এমন সরকার প্রধানদেরকে স্ব স্ব দেশকে তাঁর সাফল্য কামনা জানাতে মোদি ফোন করেছিলেন। ক্রকেট ছিল উছিলা। মোদি হাসিনাকে ফোন করেন গত মাসের ১৩ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ এর আগে থেকেই জয়শঙ্কর যে সমন্বিত বার্তাবাহক হিসাবে আসবেন তা সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। ঐ ফোন কল থেকে মোদির যা পাওয়ার ছিল তা হল, জয়শঙ্করকে তিনি পাঠাচ্ছেন এই সফরের পক্ষে হাসিনার সম্মতি আদায় বা জানিয়ে রাখা। তবে এজেন্ডা কি হবে তা নিয়ে খুব বিস্তারিত কিছু আলাপ তিনি তুলেন নাই; সেটা অনুমান করতে পারি আমরা। মোদির ফোনের পরে হাসিনার সাথে কি বিষয়ে কথা হয়েছে তা নিয়ে ভারতের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিনকে প্রেস প্রশ্ন করেছিল। প্রশ্নের জবাবে তিনি জানিয়েছিলেন – ক্রিকেট শুভেচ্ছার বাইরে অনেক কিছু নিয়েই আলাপ হয়েছে।

এরপর ভারতের পররাষ্ট্র বিভাগ থেকে সার্ক-যাত্রার ঘোষণা আসে। কিন্তু কবে আসবেন, কি এজেন্ডায় জয়শঙ্কর বাংলাদেশ আসছেন এর সিডিউল গত ২৫ ফেব্রুয়ারির আগে জানানোই হয় নাই। মিডিয়ায় যেখানে যতটুকু প্রকাশিত হয়েছে তা অনুমান নির্ভর, ইনফরমাল উৎসের, আনুষ্ঠানিক নয়। এর কারণ কি? ভারতের “দি হিন্দু” পত্রিকার সুহাসিনী হায়দার জানাচ্ছেন, এর কারণ । তিনি লিখছেন, “জয়শঙ্কর আমেরিকা সফরে আছেন। তিনি ফেরত আসার পরই ২৬ ফেব্রুয়ারি শিডিউল জানানো হতে পারে”। অনুমান করা যায় “সমন্বিত বার্তা” তৈরি ফাইনাল করতে জয়শঙ্করের আমেরিকা সফরের সম্ভবত একটা উদ্দেশ্য। এটা ভারতের একার ইস্যু নয়। সম্ভবত তাই ঠিক করে জয়শঙ্কর যাবার জন্য রেডি হবেন, বার্তার ড্রাফট রেডি হবে এসব বিষয় ছিল তাই আগে জানাতে পারছিলেন না। বাংলাদেশের পত্রিকা ও ভারতের পত্রিকার অনুমিত খবরে তাই বাংলাদেশ সফরের তারিখ কেউ জানাচ্ছিলেন ১ মার্চ, কেউ বা ২ মার্চ।

সমন্বিত বার্তা বাহকের ভুমিকার কথা ভারত তার মিডিয়ার বাইরে রাখতে পেরেছেন বলেই মনে হচ্ছে। যেমন ভারতের হিন্দু পত্রিকার সুহাসিনী ২৮ ফেব্রুয়ারি জয়শঙ্কর বাংলাদেশে কি নিয়ে মেতে থাকবেন সে প্রসঙ্গে লিখছেন, In Dhaka, he is expected to discuss the issues of the Land Boundary Agreement, which is expected to be tabled in Parliament for clearance, as well as the Teesta water settlement, given the nod by West Bengal Chief Minister Mamata Banerjee during her visit to Dhaka last week. Prime Minister Modi is understood to have told Sheikh Hasina about his intention to visit Dhaka “very soon” when he spoke to her ahead of the Foreign Secretary’s visit. অর্থাৎ একেবারেই রুটিন অমীমাংসিত ইস্যু কেন্দ্র করে লেখা রিপোর্ট। অথচ আগেই বলেছি এসব ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের সাথে পেন্ডিং কোন বিষয়ই নাই। বিষয়টা ভারতের দিক থেকে একশনের, করে দেখানোর। এসব তো হাসিনা ভালই জানতেন। তাহলে মোদির ক্রিকেট কূটনীতির ফোনালাপে জয়শঙ্করকে মোদির সফরে পাঠানোর ইচ্ছাকে হাসিনা সাড়া দিলেন কেন? কি বুঝে?

এটা বোঝা কঠিন নয় যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের বিষয়ে বিদেশী কারও সাথে ডায়লগে আগ্রহী না, ফলে কোন কূটনৈতিক সফরে তা এজেন্ডা রাখতেই রাজি না। এই “বিদেশ” বলতে ভারতও অন্তর্ভুক্ত। এই বিচারে হাসিনার আগানোর কৌশলের দিক থেকে তিনি ধরা খেয়েছেন, বলতে হবে। তবে হতে পারে তখনও তিনি জানতেন না জয়শঙ্করের এই সফর আসলে “সমন্বিত বার্তা” বাহকের সফর। অনুমান করা যায় আজ সফরের দিনে এতক্ষণে তিনি যথেষ্ট জেনে গিয়েছেন। কিন্তু ব্যাপারটা স্রেফ হাসিনার জানা অজানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ভাবে দেখলে ভুল হবে। জয়শঙ্করের সফরকে সাড়া দেবার পিছনে হাসিনার মূল ভাবনা হল, ভারতের সমর্থন লাভের প্রয়োজন ও লোভ।এই লোভের জায়গাতেই তিনি ফেঁসেছেন। ফলে জয়শঙ্করের সমন্বিত বার্তা ধৈর্য রেখে শুনতে এখন তাকে হবেই। কিন্তু স্বভাবতই তিনি বিরক্ত হবেন। ভারতকেও দেখা হয়ে গেল ধরণের একটা শ্বাস ফেলবেন হয়ত। কিন্তু মনে করা ভুল হবে যে তিনি এতটুকু টলবেন। ভারতসহ বিদেশী কারো সমর্থন ছাড়াই তিনি কোন আলোচনা ডায়লগ সংলাপ ছাড়াই আগের মত ক্ষমতার থেকে যাবার পথেই দৃঢতা দেখাতে থাকবেন। অর্থাৎ সারকথা হল, জয়শঙ্করের সফরটা হতে যাচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে সর্বশেষ আলাপ আলোচনা, মধ্যস্থতা ইত্যাদির সিভিল ও কূটনৈতিক পথে কোন সুরাহা পাবার শেষ সুযোগ। তবে এটা সুযোগ হলেও কোন পক্ষের ভোগে লাগছেনা, অকামের সুযোগ হয়ে থাকছে।

তাহলে কি হবে? কোন বলা কওয়ার সুযোগ না নিয়ে দেশি-বিদেশীরা যার যার একপক্ষীয় এক্ট, যে যা তারা দেখাতে পারবে তাই দেখাতে থাকবে, সেই পথেই বাংলাদেশ যাচ্ছে।

এই সফর পুরাটাই মূলত একটা অঘোষিত এজেন্ডার সফর। সাইড টকের ভিতর আছে আসল এজেন্ডা। আর সাইড টকে কি আসবে তা ঘোষিত এজেন্ডায় আনার দরকার থাকে না। এছাড়া এখনও যেমন, খালেদার সাথে জয়শঙ্করের সাক্ষাত কি এজেন্ডা বা শিডিউলে আছে? উত্তর হল যে না নাই। কিন্তু তবু তিনি যে দেখা করতে যাবেন সে সম্ভাবনা জিইয়ে থাকছে। সেটা শুধু খালেদাকে গ্রেফতারের পরোয়ানা এখনও তামিল হয় নাই সেজন্য নয়। এছাড়া আরও দুটো উদ্যোগ আমরা গতকাল দেখেছি। খালেদা এখন যে অফিসে থাকছেন তা তল্লাসির পক্ষে আদালতের অনুমতি যোগাড় করা হয়েছে। আর গতকাল থেকে বাড়ীর সামনের সব পুলিশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। অর্থাৎ জয়শঙ্কর যদি আসেন যেন দেখে মনে না হয় যে একজন “গ্রেফতারের পরোয়ানা পাওয়া আসামি” খালেদার সাথে তিনি দেখা করতে এসেছেন। একজন কূটনীতিক জন্য এটা খুবই বিব্রতকর। আবার জয়শঙ্করের ঢাকা ত্যাগের পরেই যে অভিযান শুরু হতে পারে তার ইঙ্গিতও হাজির রাখা হয়েছে।

হাসিনার অপছন্দের কাজ

কিন্তু একটা অনুমান এখানে করা যায়। জয়শঙ্করের এই সফরে হাসিনার অপছন্দ হবে এমন দুইটা কাজ তাকে করতেই হচ্ছে। এক, “সমন্বিত বার্তা” শুনানো আর দুই খালেদার সাথে (সম্ভাব্য) দেখা করা। এই দুটোর মধ্যে প্রথমটা করতেই তাঁর এখানে আসা। আর দ্বিতীয় অপছন্দের কাজটা তিনি যদি করেনও তবে সম্ভবত তিনি তা করবেন হাসিনার সাথে সাক্ষাতের পরে, আগে নয়। শোনা যাচ্ছে এমন তিন ঘন্টা সময় তার সফরসুচির মাঝখানে আছে। যদিও সাধারণভাবে বললে এটা জয়শঙ্করের “অবগতিকরণ” সফর, ঠিক কারো কাছ থেকে কিছু বার্তা আদায় করার সফর নয়। বাকিটা দেখা যাক।

১ মার্চ ২০১৫


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।