সংকট পেরুবো কিভাবে?


ফরহাদ মজহার || Tuesday 03 March 15

বিভাজন, বিভক্তি ও নির্মূলের রাজনীতির বিপদ

অন্ধ হয়ে রাজনৈতিক বিভাজন ও বিভক্তি রেখা যেভাবে আমরা পরস্পরের বিরুদ্ধে টেনে দিচ্ছি এবং ভিন্ন চিন্তাকে দুষমণ গণ্য করে তাকে নির্মূল ও কতল করবার জন্য পরস্পরের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছি তার পরিণতি সহিংস ও আত্মঘাতী হতে বাধ্য। বাংলাদেশের জন্য সেটা ইতোমধ্যেই মারাত্মক হয়ে উঠেছে। শুনতে অনেকের ভাল নাও লাগতে পারে -- এই বিভাজন ও বিভক্তি একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশকে বিলয়ের দিকে নিয়ে যাতে পারে। অবশ্য বিশ্বে আমরা এখন টিকে আছি শুধু সস্তা দাসের দেশ হিসাবে। সেটা একদিকে পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জীবনের বিনিময়ে -- তাদের পুড়িয়ে কিম্বা জ্যান্ত কবর দিয়ে আমরা জিডিপি বৃদ্ধির বড়াই করি; আর অন্যদিকে আনন্দের সঙ্গে নিজের দেশের নাগরিকদের নিজেরা দাস বানিয়ে অন্য দেশে চালান করে দেওয়ার মধ্যে আমাদের বিপুল আনন্দ ও গৌরব। এই রেমিন্টেসের ওপর উচ্চবিত্ত ও ধনিদের একটি গণবিচ্ছিন্ন শ্রেণিকে টিকিয়ে রাখাই আমাদের প্রধান জাতীয় কর্তব্য হয়ে উঠেছে।

গত দেড়দশক ধরে আমি বিভাজন, বিভক্তি ও নির্মূলের রাজনীতির বিপদের কথাগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলবার চেষ্টা করেছি। কোথাও জাতীয় ঐক্যের কোন ক্ষেত্র তৈয়ার করা যায় কিনা সেটাই আমি সন্ধান করেছি। আমি বিশেষ ভাবে জোর দিয়েছি দুটো ক্ষেত্রে। এক. মুক্তিযুদ্ধ; কারন একাত্তর হচ্ছে সেই সন্ধিবিন্দু যাকে বাদ দিলে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে আমাদের কোন অস্তিত্ব আর থাকে না। দুই. ইসলাম প্রশ্ন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্ন বাদ দিয়ে যেমন বাংলাদেশের কথা ভাবা যায় না, ঠিক তেমনি ইসলাম প্রশ্ন বাদ দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মানসিক ও সাংস্কৃতিক ভূগোলের কোন কুলকিনারা পাওয়া যাবে না। একে উপেক্ষা করার অর্থ বাংলা ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বাইরে ইসলামকে একটি প্রতিপক্ষ শক্তি হিসাবে দাঁড়াতে বাধ্য করা যার ফল অনতিক্রম্য বিভক্তি ও বিভাজন। কার্যত তাই হয়েছে, যার মধ্যে নিরন্তর খাবি খাচ্ছি আমরা। এখন ডুবে যাচ্ছি কিনা সেই আশংকা দেখা দিয়েছে।

এই বিপদের কথা বোঝাতে আমি সফল হয়েছি দাবি করি না। কারন এখন টের পাচ্ছি আমরা সেই স্তরে পৌঁছে গিয়েছি যার পরে রয়েছে বড় ও বিশাল একটি খাদ বা গহ্বর। এই গহ্বরে বাংলাদেশের পড়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। এই অবস্থায় আমার এখনকার লেখালিখির উদ্দেশ্য একটাই। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার শেষ চেষ্টাটা চালিয়ে যাওয়া। লেখালিখির মধ্য দিয়ে সেই ধরণের মানুষগুলোর কাছে প্রাণপণ পৌঁছানোর চেষ্টা করা যারা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণকে একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে জানপ্রাণ রক্ষা করবার চেষ্টা চালিয়ে যেতে পারে। ঐক্য ও সন্ধির ক্ষেত্রগুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে পারে এবং চূড়ান্ত পতন রোধের জন্য বাস্তবোচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান বিভাজন ও বিভক্তির মধ্যে এই কাজ রীতিমতো জীবন বাজি রেখে করবার মতোই কাজ। কারন বিভাজনের দুই তরফ থেকেই হামলার সম্ভাবনা প্রচুর। কিন্তু কিছুই করারা নাই। কাউকে না কাউকে তো কোন একটা জায়গা থেকে কাজটি করতেই হবে।

বাইরের কেউ বাংলাদেশের সংকটের সমাধান করে দেবে না

বাংলাদেশের জন্মের গোড়াতেই রয়েছে বিভাজন ও বিভক্তির রক্তাক্ত চিহ্ন। তবে গত দুই দশকের মধ্যে বাংলাদেশের রূপান্তর বীভৎস রূপ নিয়েছে। এটা ঠিক যে এই রূপান্তরের সঙ্গে বিশ্বব্যবস্থার অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের সম্পর্ক আছে। একে অনেক সময় নিউ-লিবারেলিজম বলা হয়। এই ধারণাটি দিয়ে বিশ্বব্যবস্থার রূপান্তরের ঠিক কোন দিকটির ওপর বিশেষ নজর দেওয়া হয় সে বিষয়ে বাংলাদেশে আমরা যথেষ্ট আলোচনা করি নি। ফলে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ অবস্থা কিভাবে বিশ্বব্যবস্থার নৈর্ব্যক্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও বদ্ধমূল চিন্তাচেতনার আধিপত্যের কারনে ঘটেছে সে সম্পর্কে সমাজে কোন তর্কবিতর্ক বা স্পষ্ট ধারণা গড়ে ওঠে নি। এই ধরণের প্রভাব বা আধিপত্যের প্রসঙ্গ এলে আমরা একে ষড়যন্ত্র আকারেই গণ্য করি। একথা ভেবে আমরা হাহুতাশ করি যে বাংলাদেশ একটি দুর্বল দেশ। গরিবের বউ সকলের ভাবি। তাই গরিব দেশ বলে আমাদের নিয়েও আঞ্চলিক আর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে। অথচ আমরা খুবই ভালো, এতো নির্দোষ যে ভাজা মাছ উল্টিয়ে খেতে জানি না। বিদেশিদের ষড়যন্ত্রের কারনেই বাংলাদেশের এই দুর্দশা। নইলে আমরা ব্লাহ ব্লাহ ব্লাহ...ইত্যাদি।

আসলে এই ব্লাহ ব্লাহ ঠিক না। বাংলাদেশ যদি কিছু আসলেই করতে চায় সেটা বাংলাদেশকেই করতে হবে, বাইরের কেউই সেটা করে দেবে না। ওপরের মনস্তত্ত্বের উলটা পিঠ হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান সংকট থেকে মুক্তির জন্য আমাদের নিজেদের কোন চেষ্টা নাই। আমরা ভাবছি ওয়াশিংটন কি করল, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কি করছে, যুক্তরাজ্যের কি অবস্থা, ইত্যাদি।  অনেকের অভিমান তারা কেন শেখ হাসিনাকে চাপ দিয়ে বাংলাদেশে একটি নির্বাচন করিয়ে দিচ্ছে না। এই যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে তা বন্ধ করবার জন্য কোন হিউমেনিটারিয়ান ইন্টারভেনশান হচ্ছে না কেন? কিম্বা খালেদা জিয়াকে থামাচ্ছেনা কেন তারা। ইন্টারেস্টিং দিক হোল নিজেদের দুর্দশার জন্য আমরা বিদেশিদের দোষ দেই। আবার সেই দুর্দশা থেকে মুক্তির জন্য আমরা আবার বিদেশিদের হস্তক্ষেপই কামনা করি। নিজেদের ভাগ্য নিজেরা নির্ণয় করবার জন্য যে আত্মমর্যাদা বোধ ও হিম্মত দরকার সেটা আমরা অনেক আগেই সম্ভবত হারিয়েছি।

তাহলে এই পরিস্থিতিতে আমাদের দুটো কর্তব্য রয়েছে। এক. বিভাজন ও বিভক্তির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটা ঐক্যের রাজনীতি গড়ে তুলবার চেষ্টা করা; দুই: নিজেদের হীনমন্যতা কাটিয়ে উঠে নিজেদের আত্মমর্যাদা উপলব্ধি ও নিজেদের হিম্মতে নতুন ধরণের রাজনীতির সম্ভাবনা তৈরি করা। না, আমি কোন তৃতীয় ধারার রাজনীতির কথা বলছি না। সমাজের দ্বন্দ্বসংঘাত নিজের অন্তর্গত প্রক্রিয়ার কারনেই দুটো প্রধান রাজনৈতিক ধারা হিসাবে হাজির হয়। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিও দুটি ধারায় বিভক্ত। এই দুই অধিপতি ধারাকে মেনে ও তাদের পরিমণ্ডলে থেকে মাঝখানে কোন তৃতীয় ধারা গড়ে তোলা যায় বলে আমি মনে করি না। যা গড়ে উঠবে তা বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বদ্ধমূল ধ্যানধারণাকে ভেঙ্গে নিজেই জাতীয় হয়ে উঠবে। অর্থাৎ জনগণের মধ্যে নতুন চিন্তা এবং দেশ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলবার নতুন পরিকল্পনা ও ছক কিঞ্চিত দানা বেঁধে উঠতে থাকলেই তা রাজনীতির প্রধান জাতীয় ধারা হিসাবে দানা বাঁধতে শুরু করবে। তাকে ঠেকানোর শক্তি কারুরই থাকবে না।

এর আগে আমি আমার একটি লেখায় বলেছি যারা আমার এই পর্যালোচনা মানতে রাজি নন, তারা তৃতীয় ধারা বা তৃতীয় শক্তি বলতে মূলত রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর ভূমিকাই বুঝিয়ে থাকেন। তাদের বাসনা রাজনীতির প্রধান দুই পক্ষ ছেড়ে সেনাবাহিনী তাদের সমর্থন করুক, তাদের খায়েশ সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে তারা ক্ষমতায় যাবেন। রাজনীতির কঠিন ও বিপদসংকুল পথকে সংক্ষেপ করবার জন্যই তারা এভাবে ভাবেন। এটা বালখিল্য চিন্তা। ভুল পথ ও বিপজ্জনক।

রাজনীতিতে বলপ্রয়োগের ভূমিকা

রাজনীতিতে বল প্রয়োগের ভূমিকা আছে। সমাজের শক্তিশালি শ্রেণিগুলো তাদের প্রতিপক্ষ শ্রেণি ও শক্তিকে দমন ও নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ, আইন আদালত ও সশস্ত্র বল প্রয়োগের প্রতিষ্ঠান সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে, রাষ্ট্র বিজ্ঞানে এই তত্ত্ব নতুন কিছু নয়। রাষ্ট্র শ্রেণি শোষণের হাতিয়ার -- লেনিনের এই বাক্য শুধু বামপন্থিদের মুখস্থ তা নয়, ধনি শ্রেণিও মনে করে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমর্থন থাকে বলেই তারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকতে পারে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই মৌলিক তত্ত্ব মেনেই শোষক যেমন শোষন ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে, একই ভাবে সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরের পথও এই তত্ত্বের মধ্যে থেকেই রূপান্তরটি ঘটায়, ভিন্ন কিছু হয় না। লেনিন সহজেই বুঝেছিলেন বিপ্লবী গণ অভ্যূত্থানের রাজনীতির কাজ সশস্ত্রতার বন্দনা গাওয়া নয়, কিম্বা সেনাবাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় যাওয়াও নয়। মজলুম সব সময়ই তার হাতের কাছে যা আছে তাই দিয়ে জালিমের বিরুদ্ধে লড়ে। মজলুমের লড়াই হাতে ইট বা লাঠি থাকলেও তা সবসময়ই সশস্ত্র। এর সঙ্গে সৈনিকের কাঁধে ঝোলানো বন্দুকের সঙ্গে গুণগত ফারাক থাকলেও চরিত্রগত পার্থক্য নাই। কিন্তু লাঠি আর বন্দুক তো এক নয়। জনগণও সেনাবাহিনীর মতো একটি সুশৃংখল বাহিনী নয়। কিন্তু তারপরও জনগণ কেন জাগে? কেন গণঅভ্যূত্থান হয়? কেন জালিম ব্যবস্থার পতন ঘটে?

সেনাবাহিনী সমাজ ও জনগণেরই অংশ, তারা আকাশ থেকে প্যরাসুট দিয়ে নেমে আসে নি। সমাজ ও রাষ্ট্রের দুঃখকষ্টে তারাও আন্দোলিত হয়। অতএব বিপ্লবী রাজনীতির প্রধান কাজ হচ্ছে বন্দুকের নল উল্টা দিকে ফিরিয়ে দেওয়া। শোষক এই নল তাক করে রাখে জনগণের দিকে, হত্যা করে সাধারণ মানুষকে। তাহলে সেই রাজনৈতিক সচেতনতা ও উপলব্ধি জনগণের মধ্যে সঞ্চারিত করা দরকার যাতে সেই নল শোষকের পাহারাদার না হয়ে জনগণের মুক্তির হাতিয়ার হয়ে ওঠে এবং নিমেষে গণশক্তির রূপ পরিগ্রহণ করে। শুধু ক্ষমতার হাত বদল নয়। সেই শক্তি্কেই গড়ে তোলা দরকার যাতে বন্দুকের সেই নল – এতদিন যা শোষককে রক্ষা করেছে -- তা জনগণকে রক্ষা করবার জন্য শোষকের বিরুদ্ধেই উল্টে যায়। ষড়যন্ত্র নয়, রাজনীতি ও গণ সচেতনতাই এখানে প্রধান কাজ। ইতিহাসের যে কোন বৈপ্লবিক রূপান্তরের সার কথা হচ্ছে সৈনিক ও জনগণের বৈপ্লবিক মৈত্রী। এই মৈত্রীই যুগে যুগে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশেও সাতই নভেম্বর খানিক ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসাবে দেখা দিয়ে হারিয়ে গিয়েছে। আমরা এই মৈত্রীর রাজনীতির সুফল পরিপূর্ণ ভাবে ভোগ করতে পারি নি। কারন সৈনিক আবার শোষকের পাহারাদারিতে নিয়োজিত হতে বাধ্য হয়েছে।

ফলে শোষক শ্রেণির রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান চেষ্টা থাকে বলপ্রয়োগের প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাগুলোকে যে কোন মূল্যে নিজেদের হুকুম তামিল করবার অবস্থায় রাখা। সেখানে গড়বড় হয়ে গেলে ক্ষমতা চলে যাওয়া মুহূর্তের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু এ স্রেফ ক্ষমতার হস্তান্তর সমাজ, রাজনীতি বা সংস্কৃতির মৌলিক কোন পরিবর্তন ঘটায় না। ক্ষমতার চরিত্রে, সমাজের কাঠামোতে এবং সর্বোপরি সমাজের চিন্তাচেতনায় পরিবর্তন ঘটাতে পারে না বলে ক্ষমতার হাত বদল সমাজের দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতকে আরো দীর্ঘস্থায়ী করে মাত্র। সেই দ্বন্দ্ব সংঘাত যদি সমাধানের অতীত অবস্থায় চলে যায় তা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে।

সামরিক শাসক হুসেন মোহাম্মদ এরশাদ কেন ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন সেই বাস্তব সত্য আমাদের মনে রাখা দরকার। ঠিক যে তার বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। কিন্তু গণ আন্দোলনের বিজয় হয়েছে বলে তিনি ক্ষমতা ছেড়েছেন সেটা সত্যি নয়। তিনি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন কারন প্রতিষ্ঠান হিসাবে সেনাবাহিনী তার পেছনে থাকতে আর রাজি ছিল না। রাজনৈতিক ক্ষমতার পেছনে বলপ্রয়োগের হিম্মত না থাকলে সেটা মূহূর্তে ভেঙ্গে পড়ে। হুসেন মোহাম্মদ এরশাদের ট্রাজেডি তার ভাল উদাহরণ। দীর্ঘকাল সেনা শাসন একটি দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনে না, এই বিবেচনাটুকু সৈনিক ও সেনাপতি সকলের মধ্যে কাজ করেছে। রাজনীতির এই বাস্তব সত্যকে আমরা ক্লিশেমার্কা কথাবার্তা বা নীতি কথার ভাঁড়ামি দিয়ে আড়াল করতে পারি না। এটা সত্যি যে সেনাবাহিনী এক এগারোর ঘটনাবলীর জন্য চরম ভাবে নিন্দিত হলেও বিএনপির ক্ষমতাচ্যূতি এবং বর্তমান অবস্থাকে আমরা একই ভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি। জাতীয় পর্যায়ের দুইটি প্রধান দলের ক্ষমতায় থাকা না থাকা একান্তই সেনাবাহিনীর সমর্থন দেওয়া না দেওয়ার ওপর এখন নির্ভর করছে। এর জন্য বিশাল রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হবার প্রয়োজন নাই। কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট যতোই তীব্র হচ্ছে সেনাবাহিনীর প্রশ্ন ততোটাই স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিণত হচ্ছে। শেখ হাসিনা খামাখাই ‘উত্তরপাড়া’ নিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে কটাক্ষ করেন নি। পরিস্থিতিই তাঁকে এই ধরনের মন্তব্য করতে বাধ্য করেছে। তিনি বলেছেন,

‘উত্তরপাড়ার দিকে তাকিয়ে থেকে লাভ নেই। খালেদা জিয়া মনে করছেন, সেখান থেকে কেউ এসে তাঁকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবেন। তিনি যাদের নিয়ে ভাবেন, তারাও জানে এভাবে ক্ষমতায় এলে পরিণতি কী হয়। অতীতে যারা অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল, তাদেরও খারাপ পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। অনেককে দেশ ছেড়ে যেতে হয়েছে। সংবিধান লঙ্ঘন করে কেউ ক্ষমতায় এলে সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। তাই এভাবে আগুনে কেউ পা দিতে আসবে বলে মনে করি না।’

তিনি খেয়াল করেন নি, তাঁর তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য খুবই স্পর্শকাতর হয়েছে কারন তা সেনাবাহিনীর মর্যাদাকেও হেয় করেছে।

ঐক্যের ক্ষেত্র

গুমখুন, আইন বহির্ভূত হত্যাসহ নাগরিক ও মানবিক অধিকার লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রের ভেঙে পড়ার লক্ষণগুলো আমাদের ভাঙনের বাহ্যিক বা দৃশ্যমান দিক। ভেতরের দিক হচ্ছে প্রগতি, আধুনিকতা, গণতন্ত্র ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের নানান মনগড়া অনুমান ও ধারণা। আধুনিক হওয়া বলতে আমরা পাশ্চাত্যের অর্জন বাছবিচারের মধ্য দিয়ে গ্রহণ-বর্জন বুঝি না; বরং পাশ্চাত্য আধুনিকতার নির্বিচার গ্রহণই বুঝি, যা আসলে দাসত্বেরই নামান্তর। শুধু ধর্ম নিরপেক্ষতা নয়, আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার ধারণার মধ্যে ধর্ম সম্পর্কে পাশ্চাত্যের অনুমান ও অভিজ্ঞতাকে আমরা সার্বজনীন মনে করি। যে কারনে  ইসলাম বিদ্বেষী তত্ত্ব ও ইসলামের বিরুদ্ধে আতংক ছড়ানোর হাতিয়ার হিসাবে বাংলাদেশে শুধু 'ধর্ম নিরপেক্ষতা' (?)  জারি বলা যাবে না, একই সঙ্গে প্রগতি, আধুনিকতা, গণতন্ত্র ইত্যাদি ধারণার মধ্য দিয়েও ইসলাম বিদ্বেষ ও ইসলামোফোবিয়ার আমরা চর্চা করি। প্রগতির নামে যা সাম্প্রদায়িকতা, রেসিজম বা বর্ণবাদ ছাড়া কিছুই না। মুসলমানদের -- বিশেষত আলেম ওলামা ও বিশ্বাসীদের দানবীয় ভাবে হাজির করা এবং কোন কিছুর সঙ্গে ইসলামযুক্ত থাকলে তার প্রতি ভীতি ও আতংকের দৃষ্টিতে দেখা ও সে আতংক প্রচার করার কারনও এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে।

এ কালে ইসলামসহ যে কোন ধর্মেরই আলোচনা ও পর্যালোচনা জরুরী কাজ। ধর্মের বিচার ছাড়া মানুষ, মানুষের সমাজ ও মানুষের ইতিহাস বোঝা অসম্ভব – রাজনীতি তো দূরের কথা। বিশ্বাসের বিপরীতে বুদ্ধিকে কিম্বা বুদ্ধির বিপরীতে বিশ্বাসকে হাজির করবার বাইনারি পুরানা ও প্রাচীন অভ্যাস যা বিশ্বাস কিম্বা বুদ্ধি কোনটিকেই বুঝতে আমাদের সহায়তা করে না। মানুষ যেমন বুদ্ধিসর্বস্ব প্রাণী নয়, তেমনি বিশ্বাস মানেই বুদ্ধিহীনতা নয়। বিশ্বাসীর ধর্মচর্চা কারো অনুকরণীয় না হতে পারে, কিন্তু তাই বলে ধর্মকে দর্শন, ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব কিম্বা রাজনীতির বাইরে রাখাবার কোন কায়দা নাই। ফায়দাও নাই। ধর্ম নিজেকে ঐশ্বরিক ভাবুক অসুবিধা নাই, কিন্তু রাজনীতি ও সমাজতত্ত্বের জন্য মুশকিল হচ্ছে ধর্ম একই সঙ্গে সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যেভাবেই হোক রাজনীতির নির্ণায়কও বটে। তার মানে সেটা সব সময় ধর্মীয় রাজনীতি হবে এমন কোন কথা নাই, কিন্তু রাজনীতি ও রাষ্ট্র মাত্রই ধর্মতাত্ত্বিক প্রকল্পের বাইরের কিছু নয়। মানুষের নিজের জীবনের অর্থ নিরন্তর নিজে সন্ধান করবার নানান অবলম্বনের মধ্যে ধর্মের স্থান সর্বাগ্রে। সেই সন্ধানের সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ আছে। এই ব্যাপারগুলো একালে এতোই স্পষ্ট যে ধর্মকে রাজনীতি থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলা অবাস্তব ও বালখিল্য চিন্তা ছাড়া কিছু না। বরং রাজনীতির দিক থেকে প্রশ্ন হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বর্তমান দিগন্ত অতিক্রম করে যাবার অনিবার্য তাগিদে ধর্মসহ আধুনিকতা ও তথাকথিত প্রগতিশীল রাজনীতি যে সকল ক্ষেত্র সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে অক্ষম সেই ক্ষেত্রগুলো নিয়ে আমরা ভাবব কিভাবে? তাদের বৈপ্লবিক ও গঠনমূলক সম্ভাবনা চিহ্নিত করবার চিন্তাশীল চর্চা ও তৎপরতা কি হবে? ধর্মের বৈপ্লবিক ও গঠনমূলক সম্ভাবনার যে দাবি একালে উঠেছে চিন্তা ও তৎপরতার চর্চার মধ্য দিয়ে তার বাস্তব প্রমাণ হাজির করব কিভাবে? , কোন অর্থে সেই সম্ভাবনার দাবি আমরা করতে পারি? সর্বোপরী তার চর্চার ধরণই বা কী হবে?

এ কারনে যারা একাট্টা ধর্মীয় রাজনীতির বিরোধিতা করেন, আমি তাদের বিরোধী। কারন প্রতিটি রাজনৈতিক চর্চার – ধর্মের নামে হোক কিম্বা হোক প্রগতির নামে – পর্যালোচনা দরকার। প্রগতিবাদীরাও চরম প্রতিক্রিয়াশীল ও সমাজের সামনে এগিয়ে যাবার পথে বাধা হয়ে উঠতে পারে। ধর্মীয় রাজনীতিও পারে, সেটা তো আমরা জানি। তাহলে দরকার যে কোন অনুমান ও চর্চার নির্মোহ পর্যালোচনা বা যে কোন চিন্তা ও রাজনীতির সম্ভাব্য গঠনমূলক ভূমিকা, যদি থাকে, চিহ্নিত করা। আমি এ কারণেই ধর্ম নিরপেক্ষতা ও প্রগতিশীলতার নামে ধর্ম ও ধর্মপন্থী রাজনীতি -- বিশেষত ইসলামের বিরুদ্ধে খেয়ে না খেয়ে একাট্টা বিরোধিতা করার বিরোধিতা করে এসেছি। এই অর্বাচিন বালখিল্যতা থেকে দ্রুত মুক্তি দরকার। এর জন্য আমাকে ইসলামি মোজাদ্দিদ হবার প্রয়োজন পড়ে নি। মার্কস ও লেনিন মনোযোগের সঙ্গে পাঠই আমার জন্য যথেষ্ট ছিলো। এই কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট যে ‘রাজনীতি’ বা রাজনীতির পরিসর বলতে বোঝায় অন্যের বা অপরের কন্ঠস্বরকে অন্তর্ভুক্ত করা, অপরের কথা শোনা এবং তার সঙ্গে কথোকথনে নিযুক্ত হওয়া। যারা রাজনীতির পরিসর থেকে ভিন্ন চিন্তা ও তার নিজের আদর্শের বিরোধী মানুষগুলোর কন্ঠস্বর নীরব করে দেয়, তারা রাজনীতির জন্য বিপদ ডেকে আনে এবং সমাজকে এমন এক বিভাজন ও বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয় যা ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায় হোক গৃহযুদ্ধের রূপ পরিগ্রহণ করে। বাংলাদেশে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে পাশ্চাত্যে খবর হচ্ছে। তার জন্য প্রগতি ও আধুনিকতার নামে নির্মূলের রাজনীতিই দায়ী। ইসলাম প্রশ্ন মীমাংসার কাজ সহজ বা সরল বলে আমি মনে করি না। কিন্তু রাজনৈতিক পরিসর থেকে জনগণের বিশাল একটি অংশকে বাদ দেবার ধারণাটাই অবাস্তব ও বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের বড় একটি কারন।

রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য লড়াইয়ে জয়ী হওয়া এক কথা আর জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় ধারণ করতে সক্ষম একটি রাষ্ট্র গঠন করার ঐতিহাসিক কর্তব্য আলাদা। কিন্তু এই ফারাক আমরা অনুধাবন করতে পারি না। জনগণের অভিপ্রায় ধারণ করা গঠনতন্ত্র বা কন্সটিটিউশান ছাড়া কোন গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র গঠন করা যায় না। অথচ এখনও আমরা বলি বাংলাদেশের সংবিধান জনগণ নয়, এর প্রণেতা ডক্টর কামাল হোসেন। একই মুখে বলি সংবিধান হচ্ছে ‘জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি’। সংবিধানে শেষের কথাটাই লিখা আছে, কামাল হোসেন সংবিধান লিখেছেন সে কথা লিখা নাই। সংবিধানে কারো নাম লেখা থাকে না। সংবিধান প্রণেতা হিসাবে ডক্টর কামাল হোসেন নিজের নাম এভাবে উচ্চারিত হওয়া এনজয় করেন কিনা জানি না, কিন্তু টেলিভিশানে তাঁকে যখন এভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, তিনি কখনও প্রতিবাদ করেন নি। সংবিধান প্রণেতা হিসাবে ডক্টর কামাল হোসেনের অবদান থাকতেই পারে। কিন্তু তাঁর লিখনিতে ‘জনগণের পরম অভিপ্রায়’ ব্যক্ত হয়েছিল সেটা ঠিক না। ফলে গোড়ার প্রশ্ন আজও থেকে গিয়েছে যে আমরা স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধ করেছি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে এই রকম একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। তাহলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র সংবিধানে কোন যুক্তিতে যুক্ত করা হয়েছিল? মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে দলীয় কর্মসূচি সংবিধানে যুক্ত হোল কেন? আইনের দিক থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা গাঠনিক বা ফাউন্ডেশনাল হলেও পরবর্তীতে সংবিধান প্রণয়ণের সময় তাকে অস্বীকার করা হোল কেন?

এই পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা একটি ঐক্যের ক্ষেত্র চিহ্নিত করবার জন্য বলতে পারি স্বাধীনতার ঘোষণা এমন একটি ঐতিহাসিক দলিল যাকে আশ্রয় করে আমরা বিভাজন ও বিভক্তির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার একটা শেষ চেষ্টা করতে পারি। যদি সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ কায়েম করা যায় এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের কর্তব্য সংখ্যাগরিষ্ঠের মধ্যে সঞ্চারিত করা যায় তাহলে জাতীয় রাজনীতির প্রধান দুই ধারাকে অক্ষূন্ন রেখে মাঝখানে আমাদের কোন দুর্বল তৃতীয় ধারা তৈয়ারির জন্য বেগার খাটতে হবে না। নতুন বাংলাদেশ গঠনের কর্তব্য পালনের অভিপ্রায়ই রাজনীতির পরম অভিব্যক্তি হিসাবে হাজির হবে। এটাই রাজনীতির প্রধান ধারা হতে বাধ্য। সামরিক কিম্বা বেসামরিক, সৈনিক কিম্বা নাগরিক সকলের মনের ইচ্ছার কথা যদি আমরা জাতীয় ইচ্ছায় রূপ দিতে পারি তাহলে জাতীয় রাজনীতিতে কারো সমর্থন স্কাইপে বা ভাইবারে কাউকে চাইতে হবে না, বিপদেও পড়তে হবে না। জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের গুণে এই দেশের মানুষকে যারা ভালবাসে তারা আপনাতেই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। ইতিহাস তো তাই বলে। এই ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে আমরা কাজে লাগাতে পারি। জনগণের ইচ্ছা বা অভিপ্রায়ই নিজের শক্তি ও গতির কারনে সকলকে ভাসিয়ে নিতে সক্ষম।

এই বিশ্বাসটুকুই আমাদের এখন সবচেয়ে বেশি দরকার।

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, ১৪ ফাল্গুন ১৪২১। শ্যামলী।