আধুনিকতা, প্রগতি ও সহিংসতা


বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মানুষের গুম হয়ে যাওয়া, কারো কারো লাশ হয়ে প্রত্যাবর্তন আর অনেকের চিরতরে হারিয়ে যাওয়া, পুলিশি হেফাজতে অহরহ হত্যা ইত্যাদি বাংলাদেশে দৈনন্দিনের চিত্র হয়ে উঠেছে। এই ধরণের পরিস্থিতিতে কিছু লেখালিখি করা বিপজ্জনক। একটি অবস্থান হচ্ছে মানবাধিকার রক্ষার দাবি। এই অবস্থানের অনুমান হচ্ছে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও নিরাপত্তার ছায়ায় দাঁড়িয়ে এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা। মানবাধিকার ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত রয়েছে। মানবাধিকার রক্ষার জন্য বিবিধ আন্তর্জাতিক ঘোষণা, সনদ ও অঙ্গীকারও কম নাই; ফলে মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্ন কমবেশী আন্তর্জাতিক বিধিবিধান হিসাবে স্বীকৃত। মানবাধিকার কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বিধানাবলী কিছুটা বর্মের মতো কাজ করে। যার সুবিধা মানবাধিকার কর্মীরা সঙ্গত কারণেই নিয়ে থাকেন।

কিন্তু ব্যক্তির অধিকারকেন্দ্রিক রাজনীতি একই সঙ্গে ব্যাক্তির অধিকার ও সমষ্টির স্বার্থের মধ্যে বিরোধ তৈরি করে। সমষ্টির চেয়েও ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার চেয়েও ব্যাক্তির সার্বভৌম অধিকার নিরংকুশ রক্ষার দাবি প্রবল হয়ে ওঠে। কিভাবে উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যায় তা এ কালের রাষ্ট্র ও নাগরিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এর সমাধান ব্যাক্তিতান্ত্রিকতার মহিমা কীর্তনে যেমন নাই, তেমনি সকল প্রকার জবাবদিহিতার উর্ধে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের মধ্যেও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

আরও তর্ক উঠেছে যে ব্যক্তির অধিকার কেন্দ্রিক রাজনীতি হিউমেনিটারিয়ান ইন্টেরভেনশানের শর্তও তৈরি করে; যার ফলে গোলকায়নের বর্তমান যুগে বিশ্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে সামষ্টিক রাজনৈতিক সত্তা হিসাবে দুর্বল দেশগুলোর টিকে থাকা কঠিন হয়ে উঠেছে। অন্যদেশের নাগরিকদের সেই দেশের সরকার ও রাষ্ট্রের হাত থেকে রক্ষার জন্য পরাশক্তিগুলো নিজেরা ‘দায়িত্ব’ বোধ করে এবং প্রয়োজনে তাদের সিদ্ধান্তে তারা যে কোন দেশ আক্রমণও করতে পারে। ‘দায়িত্ববোধের তত্ত্ব’ (responsibility to protect) এই ধরণের বহিরাগত আগ্রাসনকে ন্যায্য প্রমাণ করবার জন্য ব্যবহার হয়। বলা হচ্ছে, ‘সার্বভৌমত্ব এখন কোন রাষ্ট্রকে পরদেশী আগ্রাসন থেকে নিরংকুশ রক্ষা করে না; রাষ্ট্র তার জনগণের ভাল দেখছে কিনা সেই দায়িত্ব আছে বলে রাষ্ট্র জবাদিহিতার অধীন’। অল্প কয়েকটি শক্তিশালি দেশ যদি মনে করে দুর্বল কোন রাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের ভাল দেখছে না, অথচ তাদের ভাল্মন্দ দেখা রাষ্ট্রের কর্তব্য, তাহলে তারা সেই দেশ আক্রমণ করতে পারে। যে সরকার ক্ষমতায় তাকে হটিয়ে নতুন কাউকে ক্ষমতায় বসিয়েদিতে পারে। মানবাধিকার রক্ষার নামে পরাশক্তির যুদ্ধ পরিচালনার নজির বাড়ছে বলে ‘দায়িত্ববোধের তত্ত্ব’ মানবাধিকার আন্দোলনে নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা এবং তার উদ্ভবের ইতিহাস পর্যালোচনা ছাড়া এই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কাজটি অনেক বড়, বলাবাহুল্য, এখানে তার অনুপুংখ আলোচনা কিম্বা পর্যালোচনা সম্ভব নয়। আজ সেই আলোচনা ও পর্যালোচনার গুরুত্বটুকু খানিক বোঝাবার চেষ্টা করব।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বিষয়টি উপস্থাপনের চেষ্টা করা যাক। আমরা লক্ষ্য করলে দেখব যে  আইন শৃংখলা বাহিনী নাগরিকদের হত্যা করছে। এটা  রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও সন্ত্রাস; এতে অস্বস্তি আছে, কিন্তু তার বিরুদ্ধে রাজনীতির অভিমুখ নির্ণয় করতে পারে তেমন কোন সংখ্যাগরিষ্ঠ মত গড়ে ওঠে নি। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আইন বহির্ভূত ভাবে কাদের হত্যা করছে সেটাই প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র যদি ধর্মপন্থী – বিশেষত ইসলামপন্থিদের হত্যা করে তাহলে অসুবিধা নাই। কারণ ধর্মান্ধদের হত্যা সভ্যতা ও প্রগতির জন্য জরুরী, আধুনিকতার বিকাশের জন্য ন্যায্য। এই হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের বিরোধী বলে অস্বস্তি তৈরী হতে পারে, কিন্তু প্রগতিবাদীদের কাছে এটা আদর্শিক ও রাজনৈতিক উভয় ভাবেই ন্যায্য। এরই অনুষঙ্গ হিসাবে দাবি করা হয় ধর্ম মাত্রই সন্ত্রাস ও সহিংসতার কারণ। অতএব কোন প্রকার ধর্মপন্থি – বিশেষত ইসলাম অনুসারী রাজনীতি বাংলাদেশে বরদাশত করা যাবে না। মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিধি বিধান থাকা সত্ত্বেও দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক ভাবে ইসলাম্পন্থিদের হত্যা, গুম করে ফেলা ও পুলিশি হেফাজতে নিয়ে পঙ্গু করে ফেলা ইত্যাদির বিরুদ্ধে দেশের ভেতরে বা বাইরে প্রবল কোন জন্মত গড়ে না ওঠার বড় একটি কারণ হচ্ছে আধুনিকতা ও প্রগতি সম্পর্কে বিদ্যমান বদ্ধমূল অনুমান। সেটা হোল ইসলামপন্থিদের হত্যা সভ্যতা ও প্রগতির জন্য ন্যায্য। সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে হলে এটা দরকারি কাজ।

রাষ্ট্র যখন তার নিজের নাগরিকদের হত্যা করে এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস যখন বিরোধীদের নির্বিচারে দমনপীড়ন করে তখন তাকে প্রগতির জন্য জরুরী গণ্য করার ইতিহাস নতুন নয়। আধুনিক সেকুলার রাষ্ট্রের বয়ানের মধ্যেই নিহিত রয়েছে যে আধুনিক রাষ্ট্র প্রগতিশীলতার পক্ষে, সভ্যতাকে এগিয়ে যাবার জন্য জরুরী এবং এই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যারা লড়ে তারা আদতে সন্ত্রাসী, পশ্চাতপদ এবং সভ্যতাবিবর্জিত। ধর্মান্ধরাই সেকুলার আধুনিক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে। জাতি, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য জীবন দান মহৎ কাজ, কিন্তু ধর্ম রক্ষার জন্য লড়াই প্রতিক্রিয়াশীল।  ইতিহাসে ধর্মের নামে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে অতএব এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠির হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য সেকুলার আধুনিক রাষ্ট্রের পক্ষেই দাঁড়াতে হবে নইলে সেকুলার ও প্রগতিবাদী ইমান ঠিক থাকে না। মানবেতিহাসের প্রগতির জন্যই রাষ্ট্রের দ্বারা বাংলাদেশ ইসলামপন্থিদের হত্যা ন্যায্য। এটাই প্রগতি, এটাই সভ্যতা।

অথচ আমরা একটু সজ্ঞানে ইতিহাস পড়লে ও ঐতিহাসিক তথ্য সামনে নিয়ে বসলে দেখব যে খুব বেশি দিন হয় নি আমরা পুরা একটি  শতাব্দি পার হয়ে এসেছি যে শতাব্দি যে শতাব্দি সন্ত্রাস ও সহিংসতার দিক থেকে অভূতপূর্ব। অথচ প্রগতি ও আধুনিকতার দিক থেকে অনন্য বলে পরিগণিত। মানুষের জানা ইতিহাসের যে কোন শতাব্দির চেয়ে পার হয়ে আসা এই একশ বছর ছিল দুটো ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, বিপ্লব, প্রতিবিপ্লব ও ঔপনিবেশিক দখলদারির কারণে লাশে ও রক্তে পাহাড় তৈরি করা শতাব্দি। মানুষের মাথার খুলি, হাড় ও করোটির ওপর প্রগতি ও আধুনিকতার নিশান ওড়ানো হয়েছে। সহিংসতা ও সন্ত্রাস যদি সভ্যতা বিচারের মাপকাঠি হয় তাহলে আধুনিকতা ও প্রগতি এই ক্ষেত্রে শীর্ষ স্থানেই রয়েছে। যদি তাই হয় তাহলে আধুনিকতা ও প্রগতির ইতিহাসকে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও গণহত্যার ইতিহাস থেকে আলাদা করে ভাববার কোন যুক্তি নাই। ঐতিহাসিক তথ্যও তার প্রতিকুল।

গত শতাব্দির ইতিহাস এটাই প্রমাণ করে যে তথাকথিত আধুনিকতা ও প্রগতি তার অন্তর্গত বৈশিষ্টের গুণে হোক, কিম্বা তার দৃশ্যমান বাস্তবতায় -- সন্ত্রাস, সহিংসতা ও হত্যাযজ্ঞকে তার সমার্থক করে তুলেছে। ধর্ম নয়, ধর্মান্ধতাও নয়। অনস্বীকার্য যে ধর্ম কিম্বা ধর্মান্ধতার মধ্যেও সন্ত্রাস, সহিংসতা ও যুদ্ধবিগ্রহ আছে। কিন্তু সেকুলার যুদ্ধে জেতার জন্য গণহত্যায় সক্ষম মারণাস্ত্র নিয়ে হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানুষদের পারমানবিক বোমা মেরে ভস্মে পরিণত করা কোন ধর্মীয় বা ধর্মান্ধতার কাণ্ড নয়। কিম্বা গ্যাস চেম্বারে ইহুদিদের হত্যাও কি কোন ধর্মীয় বা ধর্মান্ধদের কাজ ছিল? সেটা ছিল হিটলারের সেকুলার জাতীয়তাবাদী হত্যাকাণ্ড। বর্ণবাদ যখন আধুনিক রূপ পরিগ্রহণ করে এবং পরিণতিতে যীশুর নিজ শরীরে সকলের পাপ ধারণ করে সকলকে ক্ষমা  করবার শিক্ষার বিপরীতে জাতিবোধ ও জাতীয়তাবাদকে প্রবল করে তোলে তখন গ্যাস চেম্বার তৈরি হয় ও মানুষের পোড়া গন্ধ ইতিহাস আকুল করে তোলে। বলাতো যায় যে খ্রিস্ট ধর্মের শিক্ষা থেকে বিচ্যুতি, জাতিবাদী চেতনা ও জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব ইহুদি নিধনের কারন।

বাংলাদেশের ইতিহাসের ক্ষেত্রে একাত্তরের গণহত্যা সঙ্গত কারণেই ধর্ম বিশেষত ইসলামকে প্রশ্নের মুখোমুখি করে। প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয়তাবাদ বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও ইসলামের জাতীয়তাবাদী বয়ান এবং মুসলমানদের 'জাতি' হিসাবে ভাবনার ভূমিকাকে আমরা ঐতিহাসিক পর্যালোচনা থেকে বাদ দেই কেন? গণহত্যার ক্ষেত্রে একই সঙ্গে ভুমিকা রেখেছে ইংরেজ চলে যাবার পর একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তান গড়ে তোলার প্রতি তখনকার অধিপতি শ্রেণির সংকল্প এবং তাদের নিপীড়নমূলক কেন্দ্রীয় সামরিক-আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রকল্প। এই পর্বগুলোর ব্যাখা বাংলাদেশের জনগণের আছে এখনও অপরিচ্ছন্ন রয়ে গিয়েছে। পাশ্চাত্যের আদলে আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার বিপদ এবং আধুনিকতা ও প্রগতির অন্তর্নিহিত অনুমানগুলোকে প্রশ্ন করতে না পারাটা এই অপরিচ্ছন্নতার একটি কারণ।

তথ্য ও যুক্তি হিসাবে কথাগুলো বলছি। কিন্তু এটা আমার মূল তর্কের বিষয় না। ধর্ম ও ধর্মপন্থি রাজনীতির বিপরীতে প্রগতি ও আধুনিকতাকে স্থাপন এবং প্রগতির প্রতি আমাদের নির্বিচার প্রীতি ইতিহাসের প্রতি ভয়াবহ বিরাগ ও অমনস্কতা সেটি শুধু খানিক ধরিয়ে দিতে চাইছি।  আধুনিকতা ও প্রগতিকে বুঝতে হলে তাদের ঔপনিবেশিকতা, পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা কিম্বা সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসের অঙ্গীভূত রাখা দরকার। অর্থাৎ সন্ত্রাস, সহিংসতা, অপর জাতিদের নির্বংশ ও নির্মূল করার ইতিহাস থেকে আধুনিকতা ও প্রগতিকে আলাদা করা অসম্ভব। এই কথা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের কালে আমাদের বারবার উল্লেখ করা উচিত। কারন মোটা দাগে  ইতিহাস মনে রেখেই ধর্মের পর্যালোচনার পাশাপাশি আধুনিকতা ও প্রগতির পর্যালোচনা জরুরী। বিচ্ছিন্ন বা বিক্ষিপ্ত ভাবে নয়।

যারা সন্ত্রাস বা সহিংসতার চরিত্র ও মাত্রা দিয়ে ধর্ম ও ধর্মীয় সহিংসতাকে বুঝতে চান তারা ধর্ম কিম্বা তথাকথিত প্রগতির কোনটিই বুঝতে পারেন না, কারণ প্রগতির হিংসাকে ন্যায্য প্রমাণ করবার জন্য ধর্মীয় সহিংসতার নিন্দা ঐতিহাসিক মূর্খতার অধিক কিছু হতে পারে না। দুটোর একটিকেও এভাবে বোঝা যাবে না। বোঝা যায় না। আমরা শুধু এটাই প্রমাণ করতে চাই যে ধর্ম কিম্বা ধর্মান্ধতার সঙ্গে সন্ত্রাস ও সহিংসতার কোন অবিচ্ছেদ্য যোগ নাই। যদি থাকে তবে সেটা আছে আধুনিকতা ও প্রগতির সঙ্গে। অথচ আমরা প্রগতিবাদিদের বিকট প্রপাগাণ্ডার কারনে উল্টাটাই অনেকে নির্বিচারে বিশ্বাস করি। সেখানেই ঘোরতর গলদ।

বলাবাহুল্য ধর্মের ইতিহাসকে আমরা আমাদের পর্যালোচনার বাইরে রাখতে চাই না। অবশ্যই ধর্ম বা ধর্মান্ধতার বাস্তব ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনা জরুরী। প্রগতির বিপরীতে ধর্ম সংস্থাপন বা নির্বিচারে ধর্মবাদী হয়ে যাওয়া আমাদের উদ্দেশ্য মোটেও নয়। কিন্তু বাংলাদেশে প্রগতি, ধর্ম নিরপেক্ষতা, মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা, মুক্ত মনা নামে যেসকল ধর্ম বিদ্বেষীরা রয়েছে তাদের হাতে ‘প্রগতি’র ধারণার বিকট দুর্দশা ঘটেছে। সেই দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য আমাদের বিভিন্ন বিষয়ের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা খুবই জরুরী। ধর্মের জায়গায় দাঁড়িয়ে নির্বিচারে আধুনিকতার নিন্দা যেমন আমাদের পথ হতে পারে না, তেমনি তথাকথিত আধুনিকতা ও প্রগতির ঘাড়ে বসে খেয়ে না খেয়ে ধর্ম ও ধর্ম বিশ্বাসীদের বিরোধিতাও কোন কাজের কাজ নয়। আমাদের মন ও বুদ্ধিকে খোলাসা করতে হবে। বাস্তবে সমস্যাগুলিকে বোঝা ও তার সমাধানের জন্য ধর্ম, আধুনিকতা, প্রগতি সবকিছুকেই ধারণা হিসাবে যেমন তেমনি তাদের নিজস্ব ইতিহাসের জায়গা থেকে জানা দরকার। সেভাবেই পর্যালোচনা করতে হবে। সেটা খুব সহজ কাজ ভাবা উচিত নয়। কারন নিত্য আমরা আমাদের মাথায় যে সকল অনুমান নিয়ে চলি ফিরি তাদের পর্যালোচনার অধীন করা ছাড়া সেটা সম্ভব না। এটা একটা প্রক্রিয়া। অনেকটা নিজের সঙ্গে সর্বক্ষণ তর্ক করার মতো ব্যাপার। সেই দক্ষতা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। ব্যাক্তির মধ্যে যেমন, সমাজেও।

দুই

আজ তাহলে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক কর্তব্য নির্ধারণের জন্য একটি অনুমানকে প্রশ্ন করতে শেখা যাক। একে আধুনিক রাজনীতির বদ্ধমূল অনুমান বলা যায়। এর গোড়া মূলত বর্ণবাদ বা রেসিজমে। অনুমানটা হচ্ছে এই যে সন্ত্রাস ও সহিংসতা ঐতিহাসিক প্রগতির জন্য জরুরী ও  আধুনিকতার অধিষ্ঠানের জন্য ন্যায্য। আধুনিক হতে হলে অসভ্য ও বর্বরদের দমন করা দরকার। ঔপনিবেশিকতার বিস্তার ঘটতে পেরেছে এই বিশ্বাসের কারণে যে ইউরোপের বাইরের জনগোষ্ঠিগুলো বর্বর।  সভ্যতার পত্তন ও বিস্তার ঘটানোর জন্যই তাদের নির্বংশ কিম্বা জবরদস্তি সাদাদের দাসত্ব মানতে বাধ্য করা জরুরী। আধুনিকতা ও প্রগতির ইতিহাসকে যে কারণে বর্ণবাদ বা রেসিজম থেকে আলদা করা অসম্ভব। একই অনুমানে ধর্মপন্থিদের হত্যাও ন্যায্য, কারণ একটি দেশকে সভ্যতা ও প্রগতির দিকে নিয়ে যেতে হলে ইসলামপন্থিদের দমন, পীড়ন, হত্যা, গুম করে ফেলা কিম্বা পুলিশি নির্যাতনে মেরে ফেলা বা পঙ্গু করা ন্যায্য। বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষও তথাকথিত আধুনিকতা ও প্রগতির ধারণার মধ্যে নিহিত রেসিজম থেকে মুক্ত নয়।

ফরাসি বিপ্লবের সময় থেকেই আমরা শুনে আসছি যে হিংসা ইতিহাসের ধাত্রী। যারা তরুণ, হিংসার পক্ষে এই পাঠ তাদের দারুন আন্দোলিত করে। কার্ল মার্কস ও এঙ্গেলসের বরাতে এই সূত্রের চল থাকলেও ইতিহাস জন্ম দেবার দাই মা হিসাবে হিংসা একান্তই আধুনিক কালের ইতিহাসের ক্ষেত্রে সত্য হতে পারে, কিন্তু চিরকালের সত্য নয়।  যারা বামপন্থি মানদণ্ডে ঐতিহাসিক চেতনায় নিজেদের 'সমৃদ্ধ' মনে করেন, তাদের বিশ্বাস তারা  'অগ্রসর চিন্তার অধিকারী'। অন্যেরা যেহেতু অনগ্রসর, পশ্চাতপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল তাহলে তাদের প্রতি হিংসা ন্যায্য।  তাদের হত্যা ন্যায়সঙ্গত। অর্থাৎ এই প্রকার বামপন্থা  রেসিজম থেকে মুক্ত  দাবি করা কঠিন। ব্যাতিক্রম তো আছে, অবশ্যই। রাজনৈতিক দার্শনিক হান্না আরেন্ডট তাঁর কোন একটা বইয়ে এই বলে তর্ক করেছিলেন যে মার্কস ঠিক বলেন নি। হিংসা ইতিহাসের ধাত্রী বলে মার্কস হিংসার যে মহিমা কীর্তন করেছেন তাতে তো তিনি কথাসম্পন্ন মানুষের ভূমিকাকেই অস্বীকার করেছেন। মানুষ কথা বলতে পারে এবং অনেক ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব সংঘাত কথার মধ্য দিয়ে যেমন সমাধান হয়েছে, তেমনি অনেকের কথা ইতিহাস তৈরিও করেছে। মার্কসের কথাও তো ইতিহাস তৈরি করেছে। মানুষের ইতিহাস থেকে মার্কস তাঁর নিজের কথা বা তত্ত্বকে কিভাবে বাদ দেবেন? তো তিনি ঠিক বলেন নি।

হান্না আরেন্ডট আসলে কথা ও যুক্তির ঐতিহাসিক ভুমিকা যেন রাজনীতি বা রাষ্ট্রনীতির পর্যালোচনা থেকে বাদ না পড়ে তার জন্য আপত্তিটা তুলেছেন। বাংলাদেশে কথা বলা বা সংলাপের জন্য আমাদের কাতরতার কথা মাথায় ভর করে আছে বলে হান্না আরেন্ডটের কথা মনে পড়ল। তাছাড়া তাঁর যুক্তিও ছিল। ধরা যাক সমাজে আর কোন শ্রেণি নাই;  যেহেতু শ্রেণি নাই তাহলে কি সহিংসতাও থাকবে না? সহিংসতা যদি না থাকে তাহলে কি ইতিহাসও থাকবে না? ধাত্রীর কাজ করবে কে? তাতো হতে পারে না। নিশ্চয়ই ইতিহাস থাকবে, কিন্তু ভায়োলেন্স থাকবে না। ইত্যাদি। এই আলোচনা থেকে যে সত্য বেরিয়ে আসে সেটা হোল ভায়োলেন্স আধুনিক ইতিহাসের ধাত্রী এবং শ্রেণি বিভাজিত আধুনিক সমাজে এটা সমাজেরই বৈশিষ্ট্য। এর সঙ্গে ধর্মের কোন যোগ নাই।

এতোটুকু বুঝলেও আধুনিকতা ও প্রগতির ধারণার প্রতি অন্ধদের আমরা ভালভাবে বুঝবো না। আমরা বুঝবো না কেন তারা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও সহিংসতার পক্ষে নির্লজ্জ ভাবে দাঁড়ায়। সেইদিক থেকে বাংলাদেশ ভারি ইন্টারেস্টিং একটা জায়গা। কিছু কিছু গণমাধ্যম রাষ্ট্রের সহিংস কর্মকাণ্ড চোখের পলক বিন্দুমাত্র না ফেলে কী অনুমানে নির্বিচার সমর্থন করে তার পুরাপুরি ব্যাখ্যা এদের ‘সরকারের দালাল’ গালি দিয়ে পাওয়া যাবে না। কারণ এদের সরকারী দালাল বললে সামাজিক বাস্তবতার ব্যাখ্যা হয় না। মানবাধিকারের শক্ত বয়ান তাদের ডিসকোর্সে নাই সেটাও বলা যায় না। আছে। অথচ এমন নেতৃস্থানীয় মানবাধিকার কর্মী তো আমরা দেখি যারা রাষ্ট্রকে ‘যে কোন মূল্যে’ ইসলামপন্থিদের দমন করবার, রুখে দেবার কথা প্রকাশ্যে বলেন। তারপরও নিজেকে মানবাধিকার কর্মী বলে দাবি করতে পারেন। ধর্ম ও মতাদর্শ নির্বিশেষে কোন নাগরিকের মানবাধিকার লংঘিত হলে তা রক্ষার অঙ্গীকার থাকে বলেই মানবাধিকার কর্মীর গুরুত্ব দেশে বিদেশে আলাদা। কিন্তু সহিংসতা ও সন্ত্রাসের জন্য একতরফা ও একাট্টা দোষী করে যে কোন মূল্যে বিরোধী চিন্তার কাউকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দিয়ে মোকাবিলার দাবি অভূতপূর্ব ঘটনা। তাৎপর্যপূর্ণ।

সন্ত্রাস-সহিংসতার প্রতি প্রগতি ও আধুনিকতার বলয়ে গড়ে ওঠা মন বা চিন্তার সংবেদনা বিচার না করলে এই দিকটা আমরা বুঝবো না। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার আবির্ভাব ঘটেছে ভায়োলেন্সের মধ্য দিয়ে, তার রক্ষাও ভায়োলেন্স ছাড়া সম্ভব না। একটি সর্বগ্রাসী ভায়োলেন্সের মধ্যে এই ব্যবস্থা নিত্যদিন রক্তাক্ত হচ্ছে। দেশে বিদেশের ঘটনা, বিশেষত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের নৃশংসতা ও হত্যাযজ্ঞ আমাদের চোখের সামনেই ঘটছে। আধুনিক ও প্রগতিবাদীদের চোখে এইসব যারপরনাই জায়েজ বা ন্যায্য। অতএব এই উদ্দেশ্যপূর্ণ সন্ত্রাস ও সহিংসতা আমাদের বিপন্ন করে না, আমরা অস্বস্তি বোধ করি না। আমাদের প্রবল অনুমান বা বিশ্বাস যে এই ভায়োলেন্স প্রয়োজনীয়। সভ্যতা ও প্রগতির জন্য দরকারি। এই ভায়োলেন্স ছাড়া অসভ্য ও বর্বরদের কাছ থেকে সভ্যতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে না। অতএব ধর্মবাদী – বিশেষত ইসলামপন্থিদের হত্যা সভ্যতা রক্ষার জন্যই জরুরি। অতএব তাদের ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হোল কি হোল না সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না। সভ্যতা ও প্রগতি রক্ষার জন্য নিত্য সন্ত্রাস, সহিংসতা বা যুদ্ধবিগ্রহে কোন অসুবিধা নাই।

কিন্তু ভায়োলেন্স অনেক সময় গভীর নৈতিক সংকটও তৈরি করে। সে কারণে অসুবিধা ও অস্বস্তিও ঘটে, বিশেষত যখন ভায়োলেন্সকে মনে হয় উদ্দেশ্যহীন। ধর্মের নামে ভায়োলেন্স নিয়ে প্রগতিবাদীদের কোন সমস্যা নাই। কারণ সেটা এই অর্থে উদ্দেশ্যহীন যে সভ্যতা ও প্রগতির সুরক্ষা তার উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু মুশকিল ঘটে আধুনিকতা ও প্রগতির বলয়ে যখন কোন সন্ত্রাস ও সহিংসতা ঘটে। প্রগতিবাদিরা তাকে কিভাবে দেখে? বিশেষত যদি কোন প্রগতির বয়ান দিয়ে তাকে আর সহজে ন্যায্য প্রমান করা যায় না। এই ধরণের ঐতিহাসিক উদ্দেশ্যহীন ভায়োলেন্সকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। খুবই ইন্টারেস্টিং। যেমন বলা হয় এর কারণ আধুনিকতার অনুপস্থিতি। যার কারণে সমাজের পশ্চাতপদ, অনাধুনিক ও বর্বর অংশই এই ধরণের সহিংসতায় লিপ্ত হয়। বর্বর বলেই তারা এই ধরণের সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত হয়। তো এদের মোকাবিলার পথ হচ্ছে ফৌজদারি। আইন শৃংখলাবাহিনী দিয়ে দমন। আইন বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, পুলিশি হেফাজতে মেরে ফেলা একটা পথ। এদের মধ্যে যারা ফৌজদারি মোকাবিলার সীমাবদ্ধতা টের পায় তারা সমাজের আধুনিকীকরণ, উন্নয়ন কর্মসূচি জোরে সোরে চালা্লে সন্ত্রাস ও সহিংসতা কমবে। সকল সামাজিক সম্পর্ককে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কে রূপান্তর, বাজার ব্যবস্থার বিকাশ এবং সম্পত্তির সুষম বন্টনের কথাও বলা হয়। এর কোনটিই আধুনিকতা ও প্রগতির ধারণার বাইরে নয়। পাশাপাশি মাদ্রাসা বিশেষত কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস আধুনিক করা কেন জরুরী তার মাসালা দেওয়া হয়। আধুনিক শিক্ষালয় – স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাস ও সংঘাত কোন সমস্যা তৈরি করে না, আধুনিক শিক্ষার কারিকুলামের মধ্যে সন্ত্রাস ও সহিংসতা অন্তর্ভূক্ত কিনা সেটা প্রশ্ন হিসাবেও তোলা হয় না। কিন্তু দাবি করা হয় মাদ্রাসা শিক্ষার কারিকুলামই নাকি সন্ত্রাসী তৈরী করে। অনুমান হচ্ছে অসভ্য ও বর্বরদের সভ্য করে তোলা গেলে সন্ত্রাস ও সহিংসতা মোকাবিলা করা যাবে। উদ্দেশ্যহীন অসভ্য ও বর্বরদের সঙ্গে আধুনিকতা ও প্রগতির সন্ত্রাস ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ার একটা বৈশ্বিক নামও আছে। ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশান’। সভ্যতার সংঘাত।

ধর্ম এবং ধর্মপন্থি রাজনীতিই সন্ত্রাস ও সহিংসতার কারণ এই ফর্মূলায় মুশকিলটা বাঁধে ইউরোপের ইহুদি হত্যাযজ্ঞ নিয়ে। এই হত্যাযজ্ঞের ক্ষেত্রে আধুনিক ও প্রগতিবাদীদের ব্যাখ্যা কি হবে? এই কুকাণ্ড তো কোন ধর্মপন্থি করে নি? করেছে বিজ্ঞান ও টেকনলজিতে অগ্রসর আধুনিক সেকুলার ইউরোপ। এই ক্ষেত্রে প্রগতিবাদিদের বয়ান কিভাবে বদলায় তার পর্যালোচনা করলে আমরা আধুনিকতা ও প্রগতিবাদিদের নতুন ভাবে বুঝতে পারব। আগামি কোন লেখায় সে বিষয়ে আলোচনা করবার চেষ্টা করব। মাহমুদ মামদানি তাঁর ‘গুড মুসলিম, ব্যাড মুসলিম’ বইতে এই ধরণের বিষয় নিয়ে ইউরোপীয় আধুনিকতা কিভাবে চিন্তা করে তার কিছু নমুনা দিয়েছেন। নোক্তা হিসাবে এখানে কিছু উল্লেখ করে রাখছি।

১. ইউরোপে ইহুদিদের হত্যাযজ্ঞ আধুনিকতা বা প্রগতির কোন সমস্যা নয়। এটা শয়তানের কাজ। হিটলার একটা খারাপ লোক, এর সঙ্গে আধুনিকতা ও প্রগতি কিম্বা তার মতাদর্শের কোন সম্পর্ক নাই। কিম্বা হোলকস্ট আধুনিকতা ও প্রগতির আভ্যন্তরীন চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ও পরিণতি নয়। (হিটলার যেন হঠাৎ আকাশ থেকে পড়েছে)।

২. এটা ইউরোপের ইতিহাসের কোন ধারাবাহিকতা নয়, একটা অভিক্ষেপ – অর্থাৎ আকস্মিক ঘটনা মাত্র। ইউরোপীয় ইতিহাসের বাইরের ঘটনা। একে আধুনিকতা ও প্রগতির ইতিহাস থেকে আলাদা ভাবতে হবে।

৩. হিটলার ইউরোপীয় আধুনিকতা ও প্রগতির ইতিহাসের কোন অংশ নয়। তাই সে শয়তান, ইভিল; ইতিহাসের বাইরের চরিত্র। শয়তানের আলোচনা তো ধর্মতত্ত্বের আলোচনা। হিটলার নিয়ে আলোচনা সেই দিক থেকে কার্যত ধর্মতাত্ত্বিক আলোচনাতেই পর্যবসিত হয়।

হিটলার ও হোলকস্টের নজির দিয়ে মাহমুদ মামদানি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছেন। আধুনিক সমাজে রাজনৈতিক সহিংসতার আলোচনা অধিকাংশ সময় ধর্মতত্ত্বের রূপ পরিগ্রহণ করে। আধুনিকতা ও প্রগতির ইতিহাস থেকে হিটলারকে বাদ দেওয়া আধুনিক সভ্যতার নৈতিক চরিত্র বহাল রাখবার জন্য জরুরী। হিটলার মহা ভুল করেছেন, যদি তিনি ইউরোপের বাইরে অসভ্য ও বর্বরদের নির্বংশ করতেন, যদি আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ল্যাটিন আমেরিকায় যেভাবে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়ে নির্বংশ করা হয়েছে তিনি সেই একই কাজ করতেন তাহলে ইউরোপের জন্য কোন সমস্যা ছিল না। তিনি ইউরোপের মধ্যেই তার নির্বংশকরণ অভিযান চালিয়েছিলেন। ঠিকই। হিটলার আসলে শয়তান, তার আবির্ভাবের সঙ্গে ইউরোপীয় আধুনিকতা বা প্রগতির কোন সম্পর্ক নাই। ধর্মতত্ত্বের শয়তান বাস্তবে হিটলার হয়ে কিভাবে ইউরোপীয় ইতিহাসে হাজির থাকে হিটলার তার ভাল একটি নজির। তাই তাকে ইউরোপ প্রগতি ও সভ্যতার ইতিহাসের বাইরের চরিত্র বলে ইউরোপ মনে করে। আমামদেরকেও সেভাবেই বোঝানো হয়। হিটলারে ব্যাখ্যা অতএব থিওলজিকাল কায়দায় দেওয়া হয়, আধুনিকতা ও প্রগতির ইতিহাস হিসাবে নয়। নাৎসিদের গণহত্যার ঐতিহাসিক কারণ অনুসন্ধানের বিরুদ্ধে নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ ইউরোপে এখনও প্রবল।

আবারও বলি, ইতিহাস বিচার ও আমাদের বদ্ধমূল অনুমানের পর্যালোচনা ছাড়া আমরা সামনে অগ্রসর হতে পারবো না। ধর্ম ও ধর্মপন্থি রাজনীতির মধ্যে সন্ত্রাস ও সহিংসতা নাই, এটা আমাদের দাবি না। কিন্তু আলোচনাকে ধর্ম বনাম প্রগতির বাইনারি থেকে বের করে এনে আমাদের বুঝতে হবে আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার উদ্ভব, বিস্তার ও সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্বসংঘাত কিভাবে সন্ত্রাস ও সহিংসতার জন্ম দিয়েছে এবং এখনও নিরন্তর তার পুনরুৎপাদন ঘটাচ্ছে তাকে ঐতিহাসিক ভাবে বোঝার জন্য মন মুক্ত করতে হবে। এটাই বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানের ঠিক পথগুলো বাতলিয়ে দেবে। ধর্ম বা ধর্মবাদী রাজনীতিকে খেয়ে না খেয়ে বিরোধিতা বা নিন্দা করে নয়।

১৩ মার্চ, ২০১৫/ ২৯ ফাল্গুন, ১৪২১; শ্যামলী

 

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।