সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

গৌতম দাস


Thursday 02 April 15

print

প্র থ ম  কি স্তি

দুনিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সাধারণত ‘গ্লোবাল ইকনমিক অর্ডার’ নামে আলোচনা করা হয়, সেই ব্যবস্থার মধ্যে রূপান্তরের চিহ্নগুলো বহুদিন ধরেই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছিল। গত সাত বছর ধরে সেই ব্যবস্থার মধ্যে একটা ‘মোচড়’-এর কথা বলে আসছিলাম আমরা। এই মোচড়ানি বিদ্যমান বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ঠিক ভেঙ্গে পড়ার অভিমুখি নয় বরং কাঁধ বদল অথবা আরেক কাঁধে মাথা রেখে পুরা ব্যবস্থার পাশ ফিরে শোয়া বলা যায়। এই পাশ ফিরে শোয়ার পরিণতিও নানান দিক থেকে  বিরাট বদল ঘটাতে পারে। এই প্রসঙ্গে এ বিষয়ে প্রথম কিস্তি পেশ করা হোল।

এক

চলতি শতকের শুরু থেকে চীনের প্রবল অর্থনৈতিক উত্থান সেই মোচড়ানি, চলতি ‘গ্লোবাল ইকনমিক অর্ডার’-এর মধ্যে আসন্ন বদলের আলামত ক্রমশ দৃশ্যমান করে তুলছিল। লক্ষণগুলো ক্রমান্বয়ে ফুটে উঠছিল, দেয়ালের লিখনের মতো পড়া যাচ্ছিল। সে ইঙ্গিত দেখে সম্ভাব্য বদলের চরিত্র আরও সুনির্দিষ্ট ভাবে জানতে আমেরিকান সরকারি সার্ভে, গবেষণা ষ্টাডি রিপোর্ট হয়েছে গত ২০০৮ সালে (Global Trends 2025: A Transformed World Final report 2008)। এই রিপোর্টটাকে বলা যেতে পারে ঘুর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস জানান দেওয়ার রিপোর্টের মতন। যেখানে আসন্ন ঘূর্ণিঝড়ের পুর্বাভাস মানে আমরা বুঝি এই তুফান আর আর পিছনে ফিরবে না, আঘাত হানবেই। আমরা তখন ঠেকানোর চিন্তা বাদ দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কত কি কম করা যায় করণীয় হিসাবে কেবল সেখানেই সব মনোযোগ নিবদ্ধ করি। এই রিপোর্টটাও ছিল তেমনি। আসন্ন ওলটপালট বদলের ঝাপ্টার অভিমুখ বিশ্লেষণ করে ঠিক করা হয়েছিল কি করলে এর ক্ষতি আমেরিকার উপর কমানোর চেষ্টা করা যায়, ঝড় আসার সময় কতোটা দেরি করিয়ে দেওয়া যায়, ইত্যাদি।

সেই মোতাবেক আমেরিকান বিদেশনীতিতে বদল  আনা হয়েছিল। আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব বাড়তে শুরু করেছিল। তার ঠেলা বাংলাদেশের ঘাড়েও এসে পড়েছিল, কারণ ইন্দো-মার্কিন সম্পর্কের অলিখিত শর্ত হয়ে উঠেছিল দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মুরুব্বিয়ানা ও আধিপত্যকে আমলে নেওয়া সেসব আমরা জানি। ঝড় আসন্ন বুঝা যাচ্ছিল ঠিকই কিন্তু আঘাত হানাটা কোনখান থেকে কেমন করে শুরু হবে তা স্পষ্ট হচ্ছিল না।

চলতি বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে চারটা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে: (১) আইএমএফ বা আন্তর্জাতিক মূদ্রা তহবিল, (২) বিশ্বব্যাংক (৩) আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিওটিও এবং (৪) জাতিসংঘ। ব্রেটন ঊডে গ্যাট হিসাবে জন্ম নিলেও আইএমএফ ও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এর সঙ্গে পরবর্তীতে আরও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিয়ে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের জন্য যুক্ত হয়। , জাতিসংঘ তার জন্মের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা ক্ষমতা ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ করছিল। বিশ্ব ব্যবস্থায় ” আঘাত হানা বলতে বুঝতে হবে যখন এই চারটা প্রতিষ্ঠানের কোন এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরভাবে চ্যালঞ্জ করবার কোন ঘটনা ঘটবার উপক্রম ঘটছে। এতদিন আসন্ন বলতে আমরা বুঝেছি প্রধানত তত্ত্ব আর ফ্যাক্টস ও ফিগারের প্রজেকশন দিয়ে। বাস্তব আঘাত বা চ্যালেঞ্জকারি পালটা প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছে কিনা সেদিক থেকে নয়।

আমাদের অপেক্ষার পালা সম্ভবত শেষ। আগামি দিনের ইতিহাসে মার্চ ২০১৫ সম্ভবত চিহ্নিত হতে যাচ্ছে নতুন আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থার শুরুর কাল হিসাবে।

দুই

পুরানা ব্যবস্থা আর সহ্য করতে না পেরে প্রথম গুলি ছোঁড়া বা ট্রিগার দাবানোর কাজটা করে বসলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের বৃটেন। গুলিটা তাক করলেন আমেরিকার দিকে। সেই আমেরিকা -বৃটেনসহ ইউরোপও যার নেতৃত্ব ও খবরদারি মেনে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গড়ে তুলেছিল। যার মাধ্যমে বিশ্ব পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার নবজন্ম শুরু হয়। এরপর বিগত ৭০ বছর ধরে দুনিয়াজুড়ে এই ব্যবস্থার রুস্তমিতে বৃটেন আমেরিকার ছোট পার্টনার হয়ে সাথে চলেছে। কিন্তু সম্ভবত আর নয়, এবার সেই তাল মিলিয়ে চলার ছন্দে পতনের সুর বেজে উঠতে শুরু করেছে। গত সত্তর বছরের ওস্তাদ-সাগরেদের আস্থার সম্পর্ক এই মুহুর্তে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায়।

গত ১২ মার্চ ২০১৫ বৃটিশ সরকার আমাদের জানাচ্ছেন যে, বৃটেন চিন প্রস্তাবিত ও নিয়ন্ত্রিত নতুন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (Asian Infrastructure Investment Bank বা সংক্ষেপে (AIIB) গড়ার উদ্যোগে সামিল হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ এবার কাঁধ বদলিয়ে আমেরিকার বদলে চিনের কাঁধে মাথা রাখতে চায় ব্রিটেন। তাই চিনের সঙ্গে মিলে নতুন এক বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পত্তনের পথে প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে AIIB ব্যাংক গড়তে সম্মতি জানিয়ে দিল। মাত্র পাঁচ মাস আগে গত বছর অক্টোবর ২০১৪ চিন সাংহাই শহরে যারা AIIB এর উদ্যোক্তা সদস্য হতে ইচ্ছুক এমন রাষ্ট্রগুলোর এক সম্মেলন ডেকেছিল । ঐ সম্মেলন থেকেই মূলত প্রাথমিকভাবে একাই ৫০ বিলিয়ন ডলার পুঁজি ঢালার ঘোষণা দিয়েছিল চিন, যেটা পরে ১০০ বিলিয়ন ডলার হবে। সেই থেকে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের স্বাক্ষর চলছে। উদ্যোক্তা-স্বাক্ষরের সুযোগ শেষ হবে এই মাসের শেষ দিন, ৩১ মার্চ ২০১৫ । তাই ব্রিটেনের সিদ্ধান্তের এই হুড়োহুড়ি ও আকস্মিকতা। বৃটেনের ১২ মার্চের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে আমেরিকার দিক থেকে বিরাট এক আচমকা ঘুষি খেয়ে পড়ে যাবার মত অবস্থা। গত সত্তর বছর ধরে সারা ইউরোপকে আমেরিকা ভাগ দেবার সময় সবার চেয়ে বৃটেনকে আলাদা চোখে দেখেছে, ভাগবিতরণে মাছের মাথাটাই বৃটেনের পাতে দিয়ে গেছে। ওদিকে চিন যে এমন পালটা প্রাতিষ্ঠানিক আঘাত করবে সেটা আমেরিকা অনুমান করেছিল। তার জন্য কিছু প্রস্তুতি ও তৎপরতা থাকলেও সে আঘাতের ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়ায় বিশেষ করে বৃটেন যে লীড নিয়ে পক্ষ বদল করতে পারে - এটা আমেরিকারও বিবেচনায় ছিল না। এটা বোঝা যায় এমন এমন কোন আলামত গ্লোবাল মিডিয়াতে কখনও চোখে পড়ে নাই। গত বছর প্রকাশ্যে চিনের AIIB উদ্যোগের আগে গত ২০০৯ সাল থেকেই ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া, সাউথ আফ্রিকা আর তাকে সহ পাঁচ রাইজিং ইকোনমিকে নিয়ে BRICS ব্যাংক গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছিল চিন। এটা সবার জানা। কিন্তু এই উদ্যোগের প্রতি আমেরিকার মতই সারা ইউরোপের আগ্রহ বা প্রতিক্রিয়া শুরু থেকেই শীতল, যেন এটা তাদের চায়ের কাপ না, সেই প্রকার নিরুৎসাহ। চিনের প্রচেষ্টার প্রতি ইউরোপ টলে যেতে পারে এই দিকটা আমেরিকা খাটো করে দেখেছে। বৃটেনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার চারদিন পরে জানা গেল যে এটা একা বৃটেনের সিদ্ধান্ত নয়। গত ১৭ মার্চ -জর্মন, ফ্রান্স ও ইটালীও বৃটেনের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ করার ঘোষণা জানায়। অথচ গত বছর অক্টোবরে যখন সাংহাইয়ে AIIB সম্মেলন ডাকা হয় আমেরিকা তখন প্রকাশ্যেই তৎপরতা চালিয়েছিল যাতে এশিয়ার অষ্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া মত দেশ যারা এশিয়া নীতিতে আমেরিকাকে অনুসরণকারি ও আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক শেয়ার পার্টনার, এরা AIIB উদ্যোগে যেন যোগ না দেয়। তবু সেসময় বৃটেন প্রকাশ্যে AIIB উদ্যোগের পক্ষে বা বিপক্ষে কোন বক্তব্য দেয় নাই। এখন বৃটেনের যোগ দেবার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর আমেরিকা প্রকাশ্যেই নিজের অখুশি, অস্বস্তি জানিয়েছে। বৃটিশ অর্থমন্ত্রী জবাবে মিডিয়াকে বলেছে, এটা বৃটেনের “জাতীয় স্বার্থে নেয়া সিদ্ধান্ত” এবং এমন সিদ্ধান্ত নেবার আগে এব্যাপারে তারা আমেরিকাকে জানিয়ে ও কথা বলে নিয়েছে। দুনিয়াজুড়ে রুস্তমিতে আমেরিকার নিজের একক নীতি সিদ্ধান্ত গুলোর মধ্যে প্রধানত অর্থনৈতিক বিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো ইউরোপের সাথে সমন্বয় করতে সাত শীর্ষ রাষ্ট্রপ্রধানদের একটা ক্লাব আছে যার নাম জি৭ বা গ্রুপ সেভেন। ইউরোপের মধ্যে বৃটেন ওর একজন। জি৭ থেকেও কোন প্রকাশ্য বক্তব্য আসে নাই। ওদিকে সাংহাই উদ্যোক্তা প্রস্তুতি সম্মেলনেই ২০ রাষ্ট্র প্রতিনিধি সদস্য স্বাক্ষর করে ফেলেছিল। বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী মাল মুহিতও তাদের একজন -গিয়েছিলেন, স্বাক্ষর করেছেন। এখন বৃটেনের ঘোষণার আগেই ইতোমধ্যে উদ্যোক্তা সদস্য সংখ্যা ত্রিশে গত ৩১ মার্চ এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ৪০) পৌচেছে। তবে এতদিন এরা সবাই ছিল কেবল এশিয়ার সদস্য। বৃটেনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর এশিয়ার অষ্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া -যাদের আমেরিকা ধমকিয়ে বিরত রেখেছিল অথচ এসব প্রত্যেক দেশের ব্যবসায়ী, একাডেমিসিয়ান, পরামর্শক এবং এমনকি কোন কোন মন্ত্রীও AIIB তে যোগ দেবার পক্ষে প্রকাশ্যে মত দিয়েছিলেন এবং বিতর্কে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এখন এমন সব রাষ্ট্রেই সে তর্ক আবার জোরাল হয়েছে, এবং যোগ দিবার পক্ষের লোক ও যুক্তি উভয়ই বেড়েছে।

গত ২০ মার্চ রয়টারের খবর, অষ্ট্রেলিয়া যোগদানের সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। জাপান দ্বিধাবিভক্ত। থিঙ্কটাংক এক্সপার্টরা বলছেন যদি জাপান যোগ দেয় তা হবে এশিয়ার সর্বশেষ দেশ, এবং বিশেষ শর্তে। দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে মিডিয়ায় ইঙ্গিতপুর্ণ খবর বেরিয়েছে যে তারা নাকি ৫% শেয়ার আর একটা ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের জন্য দরাদরি করছে। যদিও এক ক্যাবিনেট মিটিংয়ের শেষে অর্থমন্ত্রী এই জল্পনাকল্পনা স্বীকার করতে চান নাই। ওদিকে ইউরোপের মধ্যে বৃটেনের সাথে জর্মন, ফ্রান্স ও ইটালীর যোগ দেবার কথা আগে বলেছি। ইতোমধ্যে তা অনুসরণ করে আরও এগিয়ে যোগদানের ঘোষণা করেছে লুক্সেমবার্গ এবং সুইজারল্যান্ড।

তবে বৃটেনের সাথে জর্মন, ফ্রান্স ও ইটালী – এরা ইউরোপের কারা? এটা জেনে রাখা দরকার। আমেরিকার নেতৃত্বে এতদিনের গ্লোবাল মাতবর প্রতিষ্ঠানে আমেরিকার ক্ষমতায় সুখের ভাগ নিবার ভুমিকায় ইউরোপের মধ্যে চার রাষ্ট্র ছিল সবচেয়ে বড় সাগরেদ - চার ইউরোপিয়ান: বৃটেন, জর্মন, ফ্রান্স ও ইটালী। আমেরিকান নীতির প্রতি চোখবন্ধ রেখে সমর্থনের মাত্রা দিয়ে তাদের নামের ধারাবাহিকতাগুলো লিখা হয়েছে। সমর্থনের মাত্রা যার সবচেয়ে বেশী তাকে দিয়ে শুরু। এই চারের বাইরে ইউরোপের বাকি রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও আর কেউই প্রভাবশালী নয়। ইউনিয়নের বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৫। এখানে প্রভাবশালী কথার অর্থ বর্তমান বিশ্বব্যাংকে ইউরোপের টপ বড় মালিকানা শেয়ার হোল্ডার: এরাই সেই চার রাষ্ট্র। আবার যেমন, জি৭ – এই সাত রাষ্ট্রের গ্রুপের মধ্যে চার ইউরোপীয় সদস্য রাষ্ট্র হল - এই চার রাষ্ট্র। এই গ্রুপের সদস্য কে হতে পারে তা মানার ভিত্তি হল দুনিয়ায় সঞ্চিত সম্পদ কোন রাষ্ট্রের হাতে বেশি এমন তালিকার উপরের সারির প্রথম সাত রাষ্ট্র। এই সাত রাষ্ট্রের মোট সম্পদ দুনিয়ার মোট সম্পদের ৬৪ শতাংশ।

একটা ফুটনোট: যদিও এখানে জি৭ এর ক্রাইটিরিয়া বলার সময় শব্দটা ‘সম্পদ’ ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু এই শব্দের প্রকৃত অর্থ বিনিয়োগ ক্ষমতা অথবা বিশ্বব্যাংকের মত প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হোন্ডিং বা দাতা-মালিক। এছাড়াও মনে রাখতে হবে চিন জি৭ এর সদস্য নয়ঃ; হতেও চায়নি, অফারও করা হয় নাই। ফলে এই তিন রথীর বৃটেনের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ করার সারার্থ হল, ইউরোপের প্রধান চার মোড়ল আমেরিকাকে এতিম করে দিয়ে চিনের নেতৃত্বে AIIB উদ্যোগের পক্ষে চলে যাচ্ছে। এর ফলে সারা এশিয়া ও ইউরোপের মূল অর্থনীতিগুলো AIIB উদ্যোগের পক্ষে চলে যাচ্ছে বলা যায়। গত বছরের সাংহাই সম্মেলনের আগে আমেরিকান আমলা কুটনীতিকরা নিজেদের পিঠ চাপড়িয়েছিল এই বলে যে এই উদ্যোক্তা সম্মেলন মোট সদস্য সংখ্যা ২০ হয়েছে বটে, কিন্তু চিন ও ভারত বাদে এশিয়ার বড় অর্থনীতির কেউ এর সদস্য হতে আসেনি। ইউরোপ থেকেও কেউই আসেনি। এটা তাদের কূটনৈতিক লবির সাফল্য। অর্থাৎ চিন উদ্যোগের বিরুদ্ধে আমেরিকার কানপড়া দেয়া, ভাঙরি দেয়া, ভয় দেখানোর প্রচেষ্টাটা সফল। স্বভাবতই এই হিসাব এশিয়ার জাপানকে বাইরে রেখে বলা। কিন্তু মাত্র পাঁচ মাস পরে সে দৃশ্যপট একেবারেই বদলে গিয়েছে, আগামিতে আরও বদলে যাবে সে আলামত দেখা যাচ্ছে। দৃশ্যপট বদলে দিবার পিছনের ট্রিগার টানার মত কাজটা করেছে বৃটেন। নিজে একা শুধু নয় ইউরোপের বাকি তিন মুল মুরুব্বিদেরও সাথে আনার কাজ হয়ে গেছে সেটা। এটা এমন এক ঘটনা যা ১৯৪৪ সালের পর থেকে দুনিয়াতে ঘটতে দেখা এমনকি কল্পনা করাও খুব সহজ ছিল না।

ওদিকে অষ্ট্রেলিয়ার ঘনিষ্ঠ পড়শি, রাজনীতি-অর্থনীতিতে প্রায় সমনীতি অনুসরণকারি নিউজিল্যান্ডও আনুষ্ঠানিকভাবে AIIB তে যোগদান করেছে। তবে বৃটেনের পরের তিন ইউরোপীয় রাষ্ট্র ঠিক কী বলে তাদের যোগদানের আগ্রহের কথা জানিয়েছে সেটাও বেশ গুরুত্বপুর্ণ। বার্তা সংস্থা এসোশিয়েটেড প্রেস জর্মন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রচারিত তাদের তিন রাষ্ট্রের আগ্রহ-পত্রকে উধৃত করে জানাচ্ছে, “তিন ইউরোপীয় দেশ চলতি ডেভেলবমেন্ট ব্যাংকগুলোর অংশীদারির পাশাপাশি AIIB তে যোগদানের পরিকল্পনা করছে যাতে এশিয়ায় প্রচুর অবকাঠামো ঋণের চাহিদা মিটাতে AIIB তে ফান্ড সরবরাহ করে তাতে গুরুত্বপুর্ণ ভুমিকা রাখতে পারে”। “ফ্রান্স, ইটালি ও জর্মনি আন্তর্জাতিক ও ইউরোপীয় পার্টনারদের সাথে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রেখে AIIB এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়ে কাজ করতে আগ্রহী যাতে এমন এক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায় যাতে তার পরিচালনা, সুরক্ষা, ঋণ বিতরণ ও সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘বেষ্ট ষ্টান্ডার্ড ও প্রাকটিস’ অনুসরণ করতে পারে”।

তিন

এখানে শুরুতে চলতি “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার” কথা বলছি মানে একটা সিস্টেমের কথা বলছি। যেমন সাধারণ মানুষ বলে “একটা সিস্টেম করে নিয়েছি” – আসলে ঠিক তাই-ই বুঝাচ্ছি। অর্থাৎ এটা একটা সিস্টেম – এই অর্থে অর্ডার। আইন-কানুন, নিয়ম প্রটোকল, প্রভিশন, ম্যান্ডেট, ট্রিটি-সম্মতিচুক্তি ইত্যাদি সব মিলিয়েই – একটা ব্যবস্থা। গত ১৯৪৪ সালে এই ব্যবস্থার জন্মটাকে বলা হয় দুই বিশ্বযুদ্ধের সার ফলাফল। যার মাখন হল আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে জন্ম নেয়া এক বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। চারটা গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান – আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ডব্লিওটিও এবং জাতিসংঘের মাধ্যমে দুনিয়ায় তৎপর ও হাজির। এছাড়া আরও প্রতিষ্ঠান আছে যেগুলো মূলত আমাদের মত দেশগুলোর উপর ঐ গ্লোবাল চার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য আমেরিকার নেতৃত্বে বাকি প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের সমন্বয় করে। অর্থাৎ সেগুলো সরাসরি আমাদের মত দেশের স্বার্থের বিপরীত প্রতিষ্ঠান এবং সেখানে আমাদের মত দেশের সদস্যপদ নাই। যেমন G7, OECD। চার গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের জন্মের কথা বলছিলাম। না, ১৯৪৪ সালে এটা ঠিক বন্দুকের মুখে ফেলে সই করিয়ে নেয়া ঘটনা নয়। আর আমরা তখন কলোনি মাস্টারের বৃটিশ-ইন্ডিয়ার অধীনস্ত। ফলে আমাদের কথা বলার কিছু নাই। সব কলোনি মাস্টারের সারা ইউরোপের কাছে রুজভেল্টের আমেরিকা তখন হয়ে উঠেছিল একমাত্র ত্রাতা। সে এক অবজেকটিভ বাস্তবতা, পরিস্থিতি যেটা একদিক থেকে সবাই উপায়হীন এক অন্ধকার ভবিষ্যতে, অন্যদিকে একমাত্র আশা ভরসা রুজভেল্ট ও তার আমেরিকা। এবং আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধোত্তর ইউরোপকে বিশেষত ইটালিকে ত্রাণ দিবার ক্ষমতা বাস্তবতা একমাত্র আমেরিকার ছিল এবং দিয়েছিল। আর বিগত ১৯৪১ সালে বৃটেনকে নাকে খত দিয়ে আটলান্টা চার্টারে স্বাক্ষর করিয়ে নেবার পর থেকে ১৯৪৫ সালে যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত আমেরিকা স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের সবার যুদ্ধের সিংহভাগ রসদ ও খরচ যুগিয়েছে। আবার, যুদ্ধশেষে এরপরেও আবার পুনর্বাসন, পুনর্গঠন এর জন্য ঋণ, বিনিয়োগ সবই এসেছে ঐ আমেরিকা, একই উৎস থেকে। ১৯৩৩ সাল থেকে সারা ইউরোপের তাগিদ আমেরিকা যেন একটা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা” গড়ার উদ্যোগ নেয়। কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরু ১৯১৪ সালের পর থেকে ১৯৪৪ সালে পর্যন্ত এই ত্রিশ বছর ধরে কলোনি শাসনের হাত ধরে দুনিয়ায় খুবই সীমিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পণ্য বিনিমইয়ের যে ব্যবস্থা চালু ছিল তা একেবারেই প্রায় অকার্যকর হয়ে গেছিল। এই বাস্তবতার মধ্যেই ঐ চার গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে “নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা” গড়ে উঠেছিল।

চারটি প্রতিষ্ঠানের যে বাস্তব বন্দীত্বে সারা দুনিয়াকে আমেরিকার হাতে এনে দিতে পারার মুল চাবিকাঠি হল, আমেরিকার অর্থনীতির প্রবল উত্থান; একমাত্র অর্থনীতি যার ভিতর বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেও উদ্বৃত্ত্ব সম্পদ সঞ্চিত হয়েছিল। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আয়-ব্যয়ে টানাভাবে উদ্বৃত্ত্ব থাকছিল। যুদ্ধের আগে (১৯১৪) যার যত কলোনি দখলে আছে সে তত বড় সাম্রাজ্যের রাজা। আর যুদ্ধের পরে হল উলটা। ইউরোপের সব কলোনি বা পরদেশ দখলকারি খোদ মাস্টারেরা দেউলিয়া, আর সবাই আমেরিকার প্রজা, আমেরিকা একমাত্র দাতা। যেকথা বলছিলাম, আমেরিকার অর্থনীতির প্রবল উত্থান, একমাত্র উদ্বৃত্ত্ব অর্থনীতি - এটাই তার নেতৃত্বে যেকোন নতুন গ্লোবাল অর্ডার কায়েম হবার পিছনের শর্ত, অবজেকটিভ বাস্তবতা তৈরি করে। এই অর্থে চলতি একুশ শতকের শুরুর দ্বিতীয় দশক ১৯৪৪ সালের আশেপাশের সময়ের পরিস্থিতির সাথে তুলনীয়। নিশ্চয় সবটা হুবহু নয়, যেমন আমরা এখন কোন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে নাই। কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ যে দুনিয়ায় একমাত্র অর্থনীতি চিনের, যেখানে সবচেয়ে দ্রুত এবং বেশি উদ্বৃত্ত্ব সম্পদ সঞ্চিত হচ্ছে। এর তুলনায় কাছাকাছিও কেউ নাই। উদ্বৃত্ত সম্পদ মানেই আবার বিনিয়োগের ক্ষমতা। গ্লোবাল অর্থনীতিতে অবকাঠামো খাতে সবচেয়ে প্রভাবশালী বিনিয়োগ ক্ষমতা। তাই AIIB শুধু বিশ্বব্যাংক বা এশিয়ার এডিবিকে চ্যালেঞ্জ করছে না। প্রকারান্তরে আইএমএফকেও চ্যালেঞ্জ করবে। এখন চিনের নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যাবস্থা কায়েমের পথে প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক কাজ শুরু হবে।

গত ৩১ মার্চ উদ্যোক্তা স্বাক্ষরের সুযোগ শেষ হয়েছে, অর্থাৎ এর পরে যারা সদস্য হতে চাইবেন তারা AIIB এর গঠন, প্রকৃতি, ম্যান্ডেট বিষয়ক এখন এবছর ধরে যে নিগোশিয়েশন আলোচনা চলবে এমন টেবিলে বসবার যোগ্য বিবেচিত হবেন না। আগামি বছর থেকে AIIB কার্যকর হয়ে ততপরতা শুরু করতে চায়।

এই প্রসঙ্গে আরও বিস্তারিত যাব পরের কিস্তিতে…।

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : চিন, বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনীতি, বিশ্বব্যবস্থা, AIIIB

View: 2561 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD