সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরিদা আখতার


Tuesday 21 April 15

print

অনেকদিন পর ঢাকা শহরে নির্বাচন হচ্ছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এতে শুধু মেয়র নয়, প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর নির্বাচনও করা হচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে এখন যে পোস্টার, ব্যানার দেখছি তা শুধু মেয়রদের জন্য নয়, ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মধ্যেও বেশ সাড়া জাগিয়েছে। নারী প্রার্থীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে কাউন্সিলর হওয়ার বিধান আছে, যদিও সাধারণ কাউন্সিলর হিসেবে কোনো নারীর প্রার্থী হবার ক্ষেত্রে আইনগতভাবে কোনো বাধা নেই। নারীদের মধ্যে অনেক যোগ্য প্রার্থী আছেন, যারা নাগরিক সেবা দেয়ার জন্য কাজ করতে চান। কিন্তু নারী প্রার্থীদের এবার প্রতীক বরাদ্দের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যে পশ্চাৎপদ, পুরুষতান্ত্রিক ও নারীর প্রতি অবমাননাকর আচরণের পরিচয় দিয়েছেন তার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে।

নারীরা যখন সংরক্ষিত আসনে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করছেন তখন তারা আর সব কাউন্সিলরের মতো করেই জনগণের ভোটে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। তারা জনগণের সেবা করার জন্যই এ পদে জনগণের ভোট নিয়েই নির্বাচিত হতে চান। ভোট চাইতে গেলে বিধান অনুযায়ী প্রতীক নিয়েই তা চাইতে হয়, তাই প্রার্থীর নিজের নাম নয়, প্রতীক বড় হয়ে ওঠে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম নির্বাচন সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের যেসব প্রতীক দিয়েছে তা দেখে মনে হচ্ছে এরা নির্বাচনের জন্য নয় পাত্রী, গৃহি্নী, মা হওয়ার জন্যই যেন প্রতিযোগিতা করছেন। এ প্রার্থীদের বড় পরিচয় হচ্ছে তাঁরা নারী। এটিই আসল বিধিমালা তফসিল-৩ অনুসারে সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর পদের ১০টি প্রতীকের তালিকার মধ্যে রয়েছে কেটলি, গ্লাস, পানপাতা, পিঞ্জর, টিস্যু বক্স, বৈয়ম, মুলা, মোড়া, শিলপাটা, স্টিল আলমারি। একইসঙ্গে বিধিমালার ১৯(৩) অনুসারে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সংরক্ষিত আসন কাউন্সিলর পদের অতিরিক্ত প্রতীকগুলোর তালিকায় আছে আরও আটটি যেমন ঝুনঝুনি, প্রেসার কুকার, ভ্যানিটি ব্যাগ, দোলনা, ফ্রাইংপ্যান, হারমোনিয়াম ও বাঁশি। সব একসঙ্গে করলেই বোঝা যায়, নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি ঘরের বাইরে এককদমও এগোয়নি। নির্বাচন কমিশন নারীদের নিজেদের বাড়ির স্ত্রী, কন্যা ও মায়ের ভূমিকার বাইরে ভাবতে অক্ষম। বাড়িতে ছেলেরা বাবা, স্বামী, কিম্বা ভাই, কিন্তু ছেলেদের পারিবারিক ভূমিকাকে সামাজিক ভূমিকা সমার্থক গণ্য করা হপ্য না।। কিন্তু মেয়েদের ক্ষেত্রে ঘটে ঠিক উল্টাটা। তাদের যেন পারিবারিক ভুমিকার বাইরে কোন সামাজিক ভূমিকা থাকা নিষিদ্ধ। সেটাই ধরা পড়ে প্মেয়েদের প্রতীক বরাদ্দের ক্ষেত্রে।


proteek

প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনের পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ধরা পড়ে।


প্রতীক শুধু একটি ছবি নয়। নির্বাচনের সময় প্রতীকের সঙ্গে মিলিয়ে প্রার্থী তার ভূমিকার ব্যাপারে ভোটারকে বোঝান। ভাগ্যে যে প্রতীক পড়ুক তিনি তার একটি ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হন ভোটারের কাছে। তাই প্রতীক ভালো হওয়া তার জন্য খুব জরুরি। এখন নারী কাউন্সিলর প্রার্থীরা এসব প্রতীক নিয়ে ভোটারের কাছে কি বলবেন? তিনি কেটলিতে যেমন ভালো চা বানান, তেমনি কাজ করবেন? বা দোলনায় বাচ্চাকে যেভাবে দুলিয়ে ঘুম পাড়ান সেভাবে তার ওয়ার্ডের মানুষকে আরামে ঘুমের ব্যবস্থা করবেন ? প্রেসার কুকারের মতো ঝটপট মাংস সেদ্ধ করে দেবেন? মাইকে মাইকে আমাদের কেটলি, ভ্যানিটি ব্যাগ ইত্যাদির কথা শুনতে হবে? এতে আমরা প্রার্থী সম্পর্কে কতটুকু ধারণা করতে পারব? নির্বাচন কমিশন কি দয়া করে ব্যাখ্যা করবেন? তারা কি চিন্তা করে এ প্রতীকগুলো বরাদ্দ করেছেন? তারা কি বলবেন যে, তারা আসলেই জানেন কিনা নারী প্রার্থীরা কারও দয়ায় নয়, সরাসরি জনগণের ভোট নিয়ে নির্বাচিত হওয়ার জন্য নির্বাচন করছেন। যদি দয়া দিয়েই কাজ হতো নারীদের জন্য কোনো প্রতীকের দরকার হতো না। যেমন জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের মহিলা আসনের এমপিদের জন্য কোনো প্রার্থীকে নির্বাচন করে আসতে হয় না। তারা প্রয়োজনীয় এবং প্রভাবশালী নেতা ও শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে ডাইরেক্ট কানেকশন করেই মনোনীত হতে পারেন। কিন্তু স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলের প্রভাব থাকলেও এটি যেহেতু নির্দলীয়, এখানে প্রার্থীদের সরাসরি ব্যক্তি পর্যায়ে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা খুব জরুরি এবং সে ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতীক তার জন্য সহায়ক কিংবা বাধাও হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের এহেন দায়িত্বহীন ও পশ্চাৎপদ আচরণ তাদের অযোগ্যতাই প্রমাণ করে, প্রার্থীদের নয়।

এ আচরণের মাধ্যমে নারীদের দৃষ্টিতে কয়েকটি দিক রয়েছে, যা আমাদের বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার বা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ রাখছে না। যেমন নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনের এ প্রতীক বরাদ্দ বিপরীতমুখী। তারা নারীকে শুধু ঘর-কন্না বা ছোট শিশুর মা, ফ্যাশন ও গান-বাজনার বেশি ভাবছে না। নারী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে যখন কাজ করতে চান তখন তাকে এবং ভোটারদের মনে করিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, তিনি যতই নির্বাচন করুন না কেন শুধুই ঘরের কাজের বাইরে তার আর কোনো যোগ্যতা নেই। এ ধরনের মিথ্যে একটি মনোভাব জাগিয়ে তুলে নারীকে ক্ষমতাহীন করে দেয়ার কোনো অধিকার নির্বাচন কমিশনের নেই। শুধু তাই নয়, নির্বাচন কমিশন এর মাধ্যমে সরাসরি নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছেন, যা দেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। পুরুষদের প্রতীকের মধ্যে যা আছে নারীদের বেলায় কেন পার্থক্য করা হলো তার ব্যাখ্যা অবশ্যই দিতে হবে।

নির্বাচন কমিশন জেনে হোক বা না জেনে হোক নারীর অবমাননা করেছে, শুধু প্রার্থীদের নয়, সব নারীকেই। এমন নির্বাচন কমিশন আদৌ নির্বাচন পরিচালনার জন্য যোগ্য কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয় না হলেও ক্ষমতাসীন দল বনাম ক্ষমতার বাইরের দলের প্রার্থীদের মধ্যে সমপর্যায়ের সুযোগ আছে কি নেই তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষমতাসীন দল যাকে চায় শেষ পর্যন্ত তারাই নির্বাচিত হবেন এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে। সুষ্ঠু নির্বাচন আদৌ হবে কিনা সেই ভয় রয়ে গেছে। অনেক প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য যত কাজ করার সবই করবেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাল গাছটি পাবেন কিনা সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। এত গেল রাজনৈতিক দলের সমর্থিত নারী-পুরুষ সব প্রার্থীর মধ্যে সমস্যা। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ডের অভাবের কথা একই দলের ভেতরেই নারী ও পুরুষ প্রার্থীদের বেলায়ও করা যায়। নির্বাচন কমিশন আগেভাগেই নারী প্রার্থীদের গুরুত্বহীন করে দিচ্ছেন, কারণ তারা সংরক্ষিত আসনের। খেলার ভাষায় ‘দুধভাত’। যেন ওরা মূল নির্বাচনের জন্য কোনো কিছু নয়। ওরা বাড়তি। শুধু মেয়েদের বিষয় দেখার জন্যই আছেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, নারী ওয়ার্ড কমিশনারদের কাজ অনেক বেশি থাকে এবং তাদের কাজ অনেক ব্যাপক। যদি তাদের কাজ গুরুত্বপূর্ণ না হয় তাহলে এ আসন রাখারই বা দরকার কী ছিল? তবে অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে তাদের কাজ অনেক বেশি জনগণের কাছে পৌঁছায়, বিশেষ করে নারীদের জন্য খুব তাৎপর্য বহন করে এবং তারা যথেষ্ট অবদান রাখতে পারেন।

সবচেয়ে বেশি আপত্তির বিষয় হচ্ছে এ প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি চরম অবমাননা করা হয়েছে। এ অবমাননার দায় নির্বাচন কমিশন কীভাবে এড়াবেন আমরা জানি না। আমাদের দাবি হচ্ছে অবিলম্বে প্রতীক বরাদ্দের ক্ষেত্রে এ বৈষম্য সৃষ্টি এবং এর মাধ্যমে নারীর অবমাননা কেন করা হয়েছে তা নিয়ে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেবেন। নইলে এ নির্বাচন কমিশনের যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তারা নারী প্রার্থীদের ব্যাপারে সমানভাবে কাজ করবেন না তা এখনই বোঝা যাচ্ছে। আমরা আশা করব নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে যথাযোগ্য ব্যবস্থা নেবেন।


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : Farida Akhter, পুরুষতন্ত্র, নির্বাচন, প্রতীক

View: 1613 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD