সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরিদা আখতার


Thursday 23 April 15

print

একজন নয়, দুইজন নয় অনেক নারী একত্রে বিবস্ত্র ও শ্লীলতাহানীর শিকার হয়ে এবারে নতুন বছর শুরু হয়েছে। তাও হয়েছে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে, টিএসসি এলাকায়, রাজু ভাস্কর্যের কাছাকাছি। এখানে পয়লা বৈশাখ উদযাপনের অনেক আয়োজন ছিল, তাই জনগণের ভিড় ছিল। ঢাকাবাসীরা নিরাপত্তা দেয়া আছে জেনে পরিবার নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে নারীদের ওপর যে বর্বর হামলা হয়েছে তার জন্য ঘৃণা প্রকাশের ভাষাও আমরা হারিয়ে ফেলেছি। পুলিশের বেস্টনীর মধ্যেই এমন ঘটনা ঘটেছে, নির্জন কোন জায়গায় নয় শত শত মানুষের ভিড়ে । এই ধরণের কুৎসিৎ ও নির্লজ্জ ঘটনা ঘটার পরও নীরব দর্শক হয়ে থেকেছেন অনেকেই, যারা বাঁচাতে এসেছেন তাদের ওপরও হামলা হয়েছে। হাত ভেঙ্গেছে, চোট লেগেছে। তবে শুরুতেই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নারীদের রক্ষার জন্য যেসব তরুণ এগিয়ে গিয়েছেন নিজে একজন নারী হিসাবে তাদের শুধু ধন্যবাদ কিম্বা কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই না, তাদের প্রশংসা না করে পারছি না। তাদের কর্তব্যবোধ ও সাহসের জন্য শুধু নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ কারনের জন্য। সমাজে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে সমাজকে যেভাবে নারী ও পুরুষে ভাগ করবার সহজ চল রয়েছে সেটা ভেঙে ফেলার জন্য। নারী নির্যাতনের বিরোধিতার দায় শুধু মেয়েদের নয়, একই সঙ্গে এটা পুরুষদেরও – এই সত্য প্রতিষ্ঠা জরুরী। লিটন নন্দী এবং তার সহযোগীদের প্রশংসার প্রয়োজন বিশেষ ভাবে এ জন্যই। দিনাজপুরের ইয়াসমিনের ঘটনায় আমরা তেমন ঘটনা দেখেছি। একটি গরিব খেটে খাওয়া মেয়েকে পুলিশি নির্যাতন করে হত্যার ঘটনা প্রতিবাদ করতে গিয়ে ছেলেরা জীবন দিয়েছে – এ ঘটনা সম্ভবত বাংলাদেশেই সম্ভব। এখনও তার জের দেখছি। শত অন্ধকারের মধ্যেও তাই এই আলোটুকু ঠিকরে বেরিয়ে আসে। শিক্ষিত ও ভদ্র সমাজের তুলনায় এই বোধ গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষের মধ্যে অধিক কিনা জানি না, কিন্তু বুঝতে পারি এই বোধের অভাব থাকলে সমাজের নীচের তলার মেয়েদের দৈনন্দিনের জীবন দুঃসহ হয়ে উঠত।

পহেলা বৈশাখে যে ঘটনা ঘটেছে তাকে এর আগে নানান সময়ে ঘটা ঘটনার মতোন শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা ছিল প্রবল। এই অপচেষ্টা জানিয়ে দেবার এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যে সাক্ষীর ভুমিকাও পালন করেছেন তারাই যারা তৎক্ষণাৎ এই ধরণের ঘটনা প্রতিরোধ করেছেন।

একটি ইংরেজি দৈনিকে (ডেইলী স্টার ১৯ এপ্রিল, ২০১৫) দেখেছি প্রথম পাতায় ছাত্রদের এক প্রতিবাদ মানববন্ধনে এক তরুনের হাতে লেখা একটি প্লাকার্ড। এতে লেখা আছে “ ধর্ষক তুই জেনে রাখ, কখনও ভুলে যাস না, তোমার জন্যে লজ্জা পায় এক নারী, তোমার মা”। কোন পুরুষ কি নারী ছাড়া আছে? তার ঘরে স্ত্রী, কন্যা, বোন এবং সর্বোপরি মা আছেন। ধর্ষক ও নারী লাঞ্ছনাকারী যদি বিবাহিত হয় তাহলে এই নির্যাতন তার ওপর দ্বিগুন বোঝা বয়ে আনে। বোন এবং কন্যা কোথাও মুখ দেখাতে পারেনা। তার ভাই বা বাবা নারী নির্যাতনকারী! আর মা? তার এই দুঃখ ও লজ্জা বহন করা দশ মাসের গর্ভে ধারণ করার চেয়েও কঠিন হয়ে পড়ে। মানুষ সমাজে বাস করে এবং প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যেই একটা দায় ও কর্তব্য থেকে যায়।

কিন্তু কেন চুপ করে আছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে? তিনি নারী হয়ে কি করে মেনে নিচ্ছেন এমন অনাচার? কেন চুপ করে আছেন রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হয়েছেন সরকারের এমন উচ্চ পর্যায়ের নারী নেত্রীরা? কেন? জাতীয় সংসদের সদস্যদের কি কিছু বলার নেই? দেশে নারীদের এমনভাবে নির্যাতন করা হবে অথচ ক্ষমতায় যারা আছেন তাঁরা কিছু বলবেন না এটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। নারীর ক্ষমতায়নের জন্যে পুরুষ্কার পাওয়া সরকারের দেশে নারীর ওপর এ লাঞ্ছনা কি বৈপরীত্য নয়?

এই নির্যাতন কিসের আলামত? প্রথম থেকে টিভি ও দৃশ্যমান ব্রেকিং নিউজ দেয়ার মিডিয়ার নিশ্চুপ ভূমিকা প্রমান করে এর সাথে যারা জড়িত তাদের সমাজের এই অনৈতিকতা ও বীভৎসতার রূপ তুলে ধরতে চান না। থুতু মারতে গেলে নিজেদের গায়ে এসে পড়ে। বৈশাখের বর্ষবরণের সাংস্কৃতিক উদযাপনের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক দুর্বলতার লক্ষণ এটা। একে তুলে ধরা কঠিন। তাদের জন্যে অ-লিখিত নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু প্রিন্ট মিডিয়া একেবারে চেপে যেতে পারেনি। তারা ছোট হোক, বড় করে হোক -- খবরটি ছেপেছে এবং শেষ পর্যন্ত বিস্তারিত ঘটনাও বর্ণনা দিয়েছে। কারণ জলজ্যান্ত সাক্ষী রয়ে গেছে। মানুষ দেখেছে। আশে পাশে মেয়েদের হোস্টেল আছে। সেখানে গিয়েও আশ্রয় নিয়েছে এমন খবরও পত্রিকায় এসেছে। ক্ষমতাসীন দলের নারী কর্মীরাও দুইএকজনকে সহযোগিতা করেছেন, জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টরকেও।

বর্ষবরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশের কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বেস্টনি থাকার ঘোষনা দেয়া হয়েছিল বলেই পরিবারের সকলকে নিয়ে নিশ্চিন্ত হয়েই মানুষ ঘুরতে বের হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ নাকি কিছুই দেখে নি? এ কেমন করে সম্ভব? যদি আসলেই না দেখে থাকেন তাহলে নিরাপত্তা বেস্টনীর ঘোষনা শুনে কি আগামিতে কেউ বিশ্বাস করবে? ঢাবি এলাকার নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু টিএসসিতেই সীমাবদ্ধ নয়, শাহবাগ থেকে শুরু করে প্রবেশ পথগুলোর মধ্যে তিন নেতার মাজার, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, চান খাঁর পুল, নীলক্ষেত ও পলাশীর মোড়ে দিনে রাতে পুলিশি চেকপোস্ট থাকে। তাছাড়া ভিসির বাস ভবন, কলা ভবন সহ বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে ৫০ জন পুলিশ থাকে। উৎসবকে ঘিরে নিরাপত্তা বেস্টনি বাড়ানো হয়, যার মধ্যে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা স্থাপন করে আইন শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী (যুগান্তর, ১৭ এপ্রিল, ২০১৫)। দৈনিক প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী পুলিশের ১৩১টি ক্যামেরায় সব ধারণ করা হয়েছে। এবং পুলিশ সেখানে গিয়ে লাঠিপেটাও করেছে (প্রথম আলো, ১৯ এপ্রিল, ২০১৫) । এতো আয়োজনের মধ্যেও পুলিশ কোন নারীকে রক্ষা করতে পারেনি, কিংবা করেনি। তারা বলতে গেলে নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করেছে।

প্রশ্ন উঠছে, কেন? তাঁরা কি তাহলে জানেন কারা এসব কাণ্ড ঘটিয়েছে? যারা করেছে তাদের হাতে ক্ষমতা আছে বলে কি পুলিশের সাহস নেই তাদের ধরার। চাকুরী রক্ষার ভয়? পুলিশ এখনও মনে হচ্ছে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না তারা প্রকৃত দোষীদের ধরবেন কিনা, নাকি প্রতিবাদের মুখে যে-কাউকে ‘দোষী” বানিয়ে ধরলেই হয়ে যায়। সে সুযোগ তারা তৈরি করতে চাইছে। পুলিশের কথার মধ্যেই অনেক ফাঁক আছে যাতে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে তারা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করতে চাচ্ছেন না। ডিএমপির মুখপাত্র যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে বলছেন, “ভিডিও ফুটেজে দু-একটি স্থানে তরুণীদের লক্ষ্য করে অশ্লীল অঙ্গভঙ্গী এবং একটি স্থানে হাতাহাতির দৃশ্য দেখা গেছে।” কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে মিডিয়ায় প্রকাশিত রাজু ভাস্কর্যের সামনে ছয় তরুণীকে বিবস্ত্র করার মতো কোন দৃশ্য সিসি ক্যামেরায় ফুটেজে পাওয়া যায়নি বলে তিনি দাবী করেছেন।(যুগান্তর, ১৯ এপ্রিল, ২০১৫)। ঘটনার পর এতোদিন কেটে গেল তাও ডিএমপি কমিশনারের কাছে বিষয়টি ধোয়াশে কেন রয়ে গেছে তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়। তিনি কি কোন পর্নো ভিডিও দেখবার আশায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখছিলেন? হাতাহাতি পর্যন্ত দেখলেন, অথচ সরাসরি বিবস্ত্র করার দৃশ্য দেখেননি বলে একটু যেন হতাশ হয়েছেন মনে হোল।

পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তা বিষয়টি না দেখা বা দেখার পর ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা করাও নারী নির্যাতনকারীদের পরোক্ষ সহযোগিতা করা নয় কি? সেদিন শুধু রাজু ভাস্কর্যের কাছেই নয় একই সাথে টিএসসি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে ২৫ থেকে ৩০টি শ্লীলতাহানীর ঘটনা ঘটেছে। শুধু একা যাওয়া কোন মেয়ে নয়, স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে টেনে নিয়ে, বাচ্চার কাছ থেকে মাকে টেনে নিয়ে শ্লীলতাহানী ঘটানো হয়েছে। টেনে হিঁচড়ে নিতে গিয়ে পরনের কাপড় ছিড়ে গেছে। এটা কি বিবস্ত্র করা নয়?

সবচেয়ে বিপজ্জনক হচ্ছে পুলিশ তার দায়িত্বের অবহেলা ঢাকতে গিয়ে এখন নতুন তত্ত্ব ও তথ্য হাজির করছে। তারা বলছে যারা পয়লা বৈশাখের বিরুদ্ধে প্রচার করেছে তারাই পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। তাই যদি হয় তাহলে পুলিশ বাড়তি সতর্কতা কেন গ্রহণ করেনি? তাদের কাছে কয়েকজনকে ধরিয়ে দেয়া হলেও কেন ছেড়ে দেয়া হোল? কেন কয়েকজন হামলাকারীর ছবি প্রকাশিত হলেও তাদের ব্যাপারে কোন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না? কাকে বাঁচানোর চেষ্টা পুলিশ করছে? তবে কি যারা পয়লা বৈশাখের বিরোধিতা করেছে পুলিশ নিস্ক্রিয় থেকে তাদেরই সহযোগিতা করেছে। এটাই কি পুলিশের আচরণে প্রমান হয় না?

এর আগে পয়লা বৈশাখে বোমার ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু এভাবে নারীদের ওপর আক্রমনের ঘটনা কোন দিন শোনা যায়নি। কারণ এই দিনটিকে মনে করা হয় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি দিন। বছরে সব কাজে ইংরেজী মাসকে গুরুত্ব দিলেও পয়লা বৈশাখে সকলে একাকার হয়ে যান। বাড়াবাড়ি কিছু থাকতে পারে, কিন্তু সেটা কখনোই নারীর প্রতি অবমাননা, নির্যাতন, শ্লীলতাহানীর পর্যায়ে যায়নি। এই প্রথম এমনটি ঘটেছে বলা যাচ্ছে না। প্রথম ঘটনা ঘটবার পর থেকে একে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে কি? ভেবে দেখতে হবে। যা এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে।

ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার ভুমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। তারা প্রথমে কি করে এড়িয়ে গেল, তা কোন ব্যাখ্যা দিলেও মেনে নেয়া যায় না। প্রিন্ট মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে শেষ পর্যন্ত তারা সিসি ক্যামেরার ছবি দেখাচ্ছে আর ইনিয়ে বিনিয়ে এই ঘটনার ব্যাখ্যা হিশেবে নানা ধরনের বিভ্রান্তিমুলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। যারা আসলে এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের কিভাবে বাঁচানো যায় তার চেষ্টা করা হচ্ছে। আর কিভাবে অন্যদিকে মোড় ঘোরানো যায় তারও চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু একই সাথে কয়েকটি চ্যানেলে আলোচনা শুনলে বোঝা যায় আসল বখাটে কারা? শাক দিয়ে মাছ ঢাকা কষ্ট হবে এই ক্ষেত্রে।

এদেশের নারীদের ওপর বর্বর হামলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ্বের সময়। সেটা মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে অন্যতম প্রধান অপরাধ। কিন্তু স্বাধীন দেশে কোন যুদ্ধের পরিস্থিতি ছাড়াই, আনন্দের দিনে এভাবে ব্যাপক সংখ্যক নারীর ওপর আক্রমণ সম্ভব হয়েছে এমন এক সময় যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির দাবিদাররা ক্ষমতায়। তারা অশ্লীল ক্ষমতারই প্রদর্শন করেছে। আর কিছু নয়। তারা বোঝাতে চেয়েছে তারা যা করতে চায় তাই পারে, এটা তাদের আনন্দ-উল্লাসেরই অংশ। এটা করলে তাদেরকে কেউ কিছু করতে পারবে না। তারা সব বিচারের উর্ধে। পুলিশ থাকলেও নিস্ক্রিয় থাকবে। এখানে নারীকে দুর্বল ভেবে নয়, বিশেষ অবস্থায় তাদের নিজেদের ক্ষমতা অশ্লীলভাবে প্রদর্শন করেছে। পুরুষতন্ত্রের প্রকাশ শুধু ঘটনার মধ্যে নয়, এই ধরণের ঘটনা ঘটার পরেও যে ক্ষমতা ঘটনাকে ন্যাক্কারজনক ভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে, ক্ষমতার চরিত্রের মধ্যেই পুরুষতন্ত্র প্রকট চেহারা নিয়ে হাসে। তামাশা করে।

নারী আন্দোলনের কাজ কি তাহলে পিছিয়ে পড়া? প্রথম কাজ হচ্ছে এটা স্পষ্ট ভাবে বোঝ যে এই ধরণের ঘটনা ব্যাপক ভাবে ঘটতে পারে রাষ্ট্রের জবাদিহিতার অভাব ও ক্ষমতাসীন সরকারের প্রশ্রয়ে। পুলিশের ভূমিকার মধ্য দিয়ে যা প্রকট ভাবেই ধরা পড়ে। যারা একে পোশাকের তর্কে পরিণত করতে চাইছেন তাঁদের সঙ্গে এ কারণে একমত হবার কোন কারণ দেখি না। কারণ তর্কটা তাঁরা রাষ্ট্র ও সরকারের চরিত্র বিচার ও তাকে মোকাবিলার প্রশ্নে পরিণত না করে দায়টা নারীর ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছেন। মজার ব্যাপার হোল এটা শুধু ধর্মপন্থিরা করছেন তা কিন্তু নয়, অনেক 'প্রগতিশীল'কেও এই যুক্তি দিতে দেখা যাচ্ছে। অথচ এটা নারী কি পোশাক পরবে বা পরবে না সেই তর্ক না। পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যররথতার তর্ক। অন্যদিকে আবার কিছু নারী দাবি করছেন পোষাক পরা না পরা -- অর্থাৎ নারী কী পোষাক পরবে বা না পরবে সেটা নাকি একান্তই নারীর ব্যাক্তিগত ব্যাপার। এ ধরনের উগ্র ব্যাক্তিতান্ত্রিক যুক্তির সঙ্গে অবশ্য নারীবাদের কোনই সম্পর্ক নাই -- তার সম্পর্ক ব্যাক্তিবাদের সঙ্গে, সমাজের বিপরীতে ব্যাক্তির মহিমা প্রতিষ্ঠা করে সমাজকে ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতার অধীনস্থ করা যার আদর্শ। পোষাক পরা না পরা স্রেফ ব্যক্তিগত ব্যাপার না, সামাজিক ব্যাপারও বটে।  কিন্তু এখানে বিষয় হচ্ছে এই ধরণের ঘৃণ্য অপরাধে জড়িতদের সরকার, পুলিশ ও চিহ্নিত কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রশ্রয় দান এবং শহরের সবচেয়ে শিক্ষত ও ভদ্রজনদের জন্য নির্ধারিত স্থানে নারীর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ একটি রাষ্ট্রের মোকাবিলা নারী কিভাবে করবে সেই তর্ক। নারীদের জন্য প্রশ্নটা এখানেই।

আমরা যারা এই স্তরে লড়তে তৈরি হই নি তাদের দরকার নিজেদের নিজেরা আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিসাবে তৈরি করা। মহিলা পুলিশের কাছে নারী হিসাবে আরো সংবেদনা আশা করি। তারা আরও সক্রিয় ভাবে নারীদের রক্ষার জন্যে প্রশিক্ষণ নেবেন, এবং নিজের কর্তব্যবোধ জাগ্রত রাখবেন। নারী পুলিশ হতে পারে, কিন্তু নারী হিসাবে তার সংবেদনাকে নিহত করে নয়। এখন নারী পুলিশদের দেখা যায় বিরোধী রাজনৈতিক নারী কর্মীদের মারপিট করতে, গ্রেফতার করে নিয়ে যেতে এবং খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকতে। এটা তাদের মূল কাজ নয়। তাদের নারী বান্ধব পুলিশ হতে হবে, এবং নারীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে।

জরুরী হচ্ছে সাধারণ নারীদের মনোবল আরও বাড়ানো। সেটা নারী হিসাবে শুধু নয়, এই দুঃসময় পেরিয়ে যাবার ক্ষেত্রে তারা গুরুত্বপূর্ণ রাজনোইতিক ভূমিকা রাখতে পারে সেটা দেখাবার দরকার আছে। এই ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের জনসমক্ষে হাজির করা এবং দোষিদের শাস্তি দেওয়া দরকার। পুলিশের ব্যর্থতার জন্যে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আর, শেষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বলবো, দাবা খেলার সময় অনেক পাবেন, কিন্তু যে ক্ষতি আপনাদের গাফিলতির কারণে ঘটে গেল তার খেসারত আপনাদের দিতেই হবে।

২১ এপ্রিল ২০১৫


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(1)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : ফরিদা আখতার, বর্ষবরণ, নারী নির্যাতন, নারীবাদ

View: 1860 Leave comments-(1) Bookmark and Share

হায়েনারা আজ সংঘবদ্ধ1

সংখ্যালঘু মেয়েরা যখন অত্যাচারিত হল তখন মধ্যবিত্ত টিভি দেখতে দেখতে বলল, ওদের দেশতো ভারত, ওরা ভারত যায় না কেন!!!

বোরকা পড়া ছাত্রীরা যখন লাঞ্ছিত হল, গরম মাগে ফু দিতে দিতে আমরাই বললাম, এরা অশিক্ষিত, প্রতিবাদের ভাষা জানে না, নির্যাতন তো সহ্য করতেই হবে।

হঠাথ করে আধুনিক স্কুলে পড়া মেয়েগুলিও লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে গণহারে আত্মহত্যা শুরু করে দিল, আমরা একটু উঠে পায়চারি করে বললাম মেয়েগুলিরও দোষ আছে, একহাতে তালি বাজে নাকি!!!

এরপর যখন স্কুলে স্কুলে পরিমলদের খুজে পাওয়া যেতে লাগল, তখনো আমরা চটুল হাসি দিয়ে তাকে মিউচুয়াল সেক্স বলে কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলাম।

প্রতি বছরই মেলায়, কনসার্টে বিচ্ছিন্ন ভাবে মেয়েরা লাঞ্ছিত হত, আমরা চোখ বুঁজে থাকতাম, কেউবা আড় চোখে উপভোগও করতাম আর নিজেদের হাত পরিষ্কার রাখার জন্য মেয়েটাকে দোষ দিতাম। কিন্তু এবার কিন্তু হায়েনারা সংগঠিত, অনেক স্মার্ট। এবার তাই ঘটল গণ লাঞ্ছন।

যথারীতি আমরা, দ্বিধাবিভক্ত, কেউ মেয়েদের দোষ খুঁজছি, কেউ বা নিপীড়ন বলে একে হালকা করে দিচ্ছি। কিন্তু একটি ব্যাপার কিন্তু আমরা দেখেও দেখছি না, ভীড়ের মাঝে হায়েনার মত দল বেধে নিরীহ মেয়েদের উপর ঝাপিয়ে পড়া ছেলেদের সংখ্যা কিন্তু বেড়েই চলেছে, আর একি সথে অপরাধ হিসেবে এর গুরুত্ব কমছে প্রতিদিন, যেন এ এক স্বাভাবিক ঘটনা। লিটন নন্দীদের সংখ্যা কমছে একই হারে। হায়েনা মানসিকতা আজ ছড়িয়ে গিয়েছে মহামারী আকারে। সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন সোহরাওয়ার্দীর গেটে নয়, নয় কন্সার্টে, কি বাজারে, কি বাসে, হায়েনারা হামলে পড়বে আপনাদের নিরাপদ বাসস্থানেও। কারন দলবদ্ধ হায়েনার থেকে হিংস্রপ্রাণী আর নেই।

মানসিকতার পরিবর্তন করুন, এদের হাত দিয়ে বাধা দিন, না পারলে মুখে প্রতিবাদ করুন তাও না পারলে মনে মনে ঘৃনা করুন, যদিও এটা দুর্বল ঈমানের কাজ। কিন্তু মেয়েটার দোষ খুঁজে হায়েনা ভাইরাস ছড়াতে সাহায্য করবেন না দয়া করে । আর যারা বলবেন এরা পথভ্রষ্ট, এর সাথে রাজনীতিকে মিশাবেন না, যেই মুহূর্তে আ্পনি এই কথা বলবেন সেই মুহূর্তে আপনি এদেরই একজন হয়ে যাবেন, কারন আপনাদের ছত্রছায়াতেই এরা আজ এত পরিপুষ্ট।

Sunday 26 April 15
রেজা


EMAIL
PASSWORD