সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরহাদ মজহার


Sunday 23 August 15

print

ক্ষমতাসীনদের প্রতিপক্ষ যেখানে নির্জীব এবং দমন পীড়নে পর্যুদস্ত তখন হঠাৎ রাজনীতি আবার অস্থির হয়ে উঠেছে। বাইরে থেকে দেখেএকে ক্ষমতাসীনদের নিজেদের ভেতরকার বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব বলে পত্রিকায় কেউ কেউ বলেছেন -- এরফকমই সন্তবত দেখেছি। এই মূল্যায়ন অবশ্য সস্তা, কারণ একথা ক্লাস সেভেনে পড়া ছেলেটিও বলতে পারে। বিরোধী দলের সাড়াশব্দ নাই, এই ফাঁকে নিজেদের মধ্যে গণ্ডগোল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে -- এই সস্তা ব্যাখ্যায় আমাদের বিশেষ আগ্রহ নাই। কীসে আগ্রহ সেই প্রশ্নে যাবার আগে ক্ষমতাসীনদের অন্তর্দ্বন্দ্ব কিভাবে প্রকাশিত হচ্ছে আমরা তার একটা তালিকা করবার চেষ্টা করি।

প্রথমে হাজারীবাগের ছাত্রলীগ নেতা আরজু ও মাগুরায় সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আজিবরের ‘ক্রসফায়ার’-এ নিহত হবার ঘটনা। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে দমন পীড়নে ছাত্রলীগ-যুবলীগ সব সময়ই আইনশৃংখলা বাহিনীর সহযোগী হিসাবে ভূমিকা রেখেছে। পত্রপত্রিকায় সেইসব খবর ছাপাও হয়েছে। ক্রসফায়ারে মানুষ হত্যা র্যা বের জন্য নতুন অর্জিত কোন প্রতিভা নয়। তবে ক্ষমতাসীনদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় নেতাকে মেরে ফেলা নতুন ঘটনা। এই বিরোধের চরিত্র ও মাত্রা বাইরে থেকে অনুমান করা কঠিন হলেও একে র্যা বের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের বিরোধের লক্ষণ হিসাবে দেখা ভুল নয়।

এমনকি ছাত্রলীগ কর্মীকে ক্রসফায়ারে হত্যার প্রতিক্রিয়া দলের অভ্যন্তরেও দ্বন্দ্বের অভিপ্রকাশ হয়ে উঠেছে। মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘একশান’ শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত সেটা মানতে রাজি নন; তিনি বলেছেন, দল ক্ষমতায় থাকতে ছাত্রলীগ নেতা ক্রসফায়ারে মারা যাবে- এটা ঠিক না। হাজারীবাগে ‘ক্রসফায়ারে’ ছাত্রলীগ নেতা আরজু নিহতের ঘটনা সেই এলাকার (ঢাকা-১০) সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসও মেনে নিতে পারছেন না। আরজুকে ‘নিরীহ ছেলে’ উল্লেখ করে তিনি দৈনিক যুগান্তরকে জানিয়েছেন, “বন্দুকযুদ্ধে আরজুর নিহতের ঘটনা তদন্ত করে জড়িত র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বন্দুকযুদ্ধ র‌্যাবের গৎবাঁধা গল্প। নিরীহ-নিরাপরাধ কর্মীকে ধরে নিয়ে গেল আর মেরে ফেলল! কোথায় বন্দুকযুদ্ধ? এর দায় র‌্যাবকেই নিতে হবে। আরজু দোষী হলে আইনে তার ব্যবস্থা নেয়া হতো”। দেখুন, ‘টাকার বিনিময়ে আরজুকে হত্যা করেছে র‌্যাব", ২০ অগাস্ট, ২০১৫)।

এতদিন বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মীরাই র‌্যাবের বন্দুক যুদ্ধের গল্পের বিরুদ্ধে দেশে বিদেশে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন। ক্ষমতা হারাবার পরে বিএনপি-জামাত কর্মীদের যখন হত্যা ও গুম শুরু হোল, তখন তারা সকাতরে তার বিরোধিতা শুরু করে। এখন ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগের শক্তিশালী নেতারা র‌্যাবের বিরুদ্ধে বলছেন। এটা অবশ্য নতুন ঘটনা। ‘বন্দুকযুদ্ধ র‌্যাবের গৎবাঁধা গল্প’ – শেখ ফজলে নূর তাপস মানবাধিকার কর্মীদের কথাই এখন ক্ষোভে বিড়বিড় করলেন। তবে অনেক দেরিতে। এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির দেয়াল নতুন ভাবে লিখা হচ্ছে কিনা কে জানে!

দ্বিতীয়, প্রবীর সিকদার ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের দ্বন্দ্ব। খন্দকার মোশাররফ হোসেন আওয়ামি লীগের দলীয় মন্ত্রী নন; বলা যায়, প্রধান মন্ত্রীর পারিবারিক সম্পর্ক সূত্রে মন্ত্রী। তিনি শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদের শ্বশুর। ফলে ফেইসবুকে প্রবীর সিকদারের স্টেটাস ও গ্রেফতার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাপন্থি আওয়ামি লীগ বনাম শেখ হাসিনার পরিবারের দ্বন্দ্ব হিসাবে হাজির হয়েছে। খন্দকার মোশাররফ হোসেনের পিতা খন্দকার নুরু মিয়া শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন, অর্থাৎ তিনি রাজাকার ছিলেন। রাজাকারের পুত্রও রাজাকারই হবে, এই সূত্রে ও যুক্তিতে আওয়ামি লিগের একটি প্রভাবশালী অংশের কাছে খন্দকার মোশাররফ হোসেন গ্রহণযোগ্য নন। ফরিদপুরে খন্দকার নুরু মিয়ার নামে একটি সড়কও রয়েছে। প্রবীর সিকদার রাজাকার পুত্রের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের ঝাণ্ডা নিয়ে দাঁড়িয়েছেন। একাত্তরে তিনি তাঁর পরিবারের ১৪ জনকে হারিয়েছেন, এটা বড় একটি ট্রাজেডি, সন্দেহ নাই। এই ঘটনার সমবেদনা তিনি ভাল ভাবে ব্যবহার করতে পেরেছেন। নিজে সংখ্যালঘু এবং সংখ্যালঘু পরিবার হিসাবে যে অপূরণীয় ক্ষতি ও দুঃসহ স্বজন হারানোর বেদনা তিনি বহন করছেন তার প্রতি বাংলাদেশের জনগণের সংবেদনাও এই ক্ষেত্রে বিপুল ভাবে প্রবীর সিকদারের পক্ষে কাজ করেছে। তাছাড়া তিনি রাজাকারদের বিরুদ্ধে লেখালিখির জন্য আক্রান্ত হন ও একটি পা হারান। এই ঘটনাও তার পক্ষে প্রচারে কাজে লেগেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবই তিনি প্রয়োগ করেছেন খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বিরুদ্ধে। তীব্র রাজাকার বিরোধী চেতনা নিয়ে দাঁড়াতে গিয়ে তিনি যে দ্বন্দ্বের কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছেন সেটা হোল একদিকে শেখ হাসিনার সম্প্রসারিত পারিবারিক গুষ্ঠি ও তাদের স্বার্থ আর অন্যদিকে আওয়ামি লীগ ও রাজাকার বিরোধী চেতনাবাদী ধারা। তবে ঘটনাদৃষ্টে বোঝা যাচ্ছে সংসদীয় ও ভোটের রাজনীতিতে যে সকল সমীকরণ নানান বাস্তব কারনে কাজ করে প্রবীর সিকদার তা মেনে নিতে পারছেন না। সেটা ঠিক আছে। কিন্তু বাইরে থেকে তাকে আবেগী রাজাকার বিরোধী মনে হলেও তিনি যে অস্ত্র ব্যবহার করেছেন সেটা হোল সংখ্যালঘুর তীব্র সাম্প্রদায়িকতা। গোড়ায় রয়েছে হিন্দুর সম্পত্তি দখল সংক্রান্ত বিবাদ। এটা এমন এক অস্ত্র যাতে খন্দকার মোশাররফ হোসেন কাবু হবার জন্য যথেষ্ট। অন্যদিকে নিছকই সামাজিক কারণ বা স্রেফ দুর্ঘটনা বশে শেখ হাসিনার পরিবারকে খন্দকার নুরু মিয়ার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক সূত্র গড়তে হয়, প্রবীর সিকদার সেই সকল সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও মেনে নিতে রাজি না। তিনি সংখ্যালঘুর ব্যাথা ও রাজাকার বিরোধী চেতনা প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে শেখ হাসিনার পরিবর্ধিত পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। বাংলাদেশের বর্তমান অনিশ্চিত রাজনৈতিক মূহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষতি করবেন বলেই যেন তিনি পণ করেছেন। প্রবীর সিকদারের রাজাকার বিরোধী চেতনা শেষাবধি অপরিণামদর্শী প্রমাণিত হয় কিনা আমরা জানি না। এটা বোঝা যাচ্ছে শেখ হাসিনাকে তিনি ‘বোন’ ডেকে বই লিখলেও, বোনের সামাজিক সম্বন্ধগুলো তিনি মেনে নিতে পারছেন না। সে যাই হোক প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে ঘোষণা দিয়ে পাতানো ভাই হিসাবে তার অন্য কোন অভিমানের কারণ থাকতে পারে কিনা সেটা আমরা জানি না।

ফেইস বুকে দেওয়া প্রবীর সিকদারের স্টেটাসটি ছিল মারাত্মক। এটা শাঁখের করাতের মতো। দুই দিকেই কাটে। প্রবীর সিকদার হুমকি পেয়ে থানায় জানাতে গিয়েছিলেন, কিন্তু থানা তা গ্রাহ্য করে নি। তখন তিনি ফেইসবুকে জানান যে তার যদি কিছু হয় তবে তার জন্য দায়ী থাকবেন মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মুসা বিন শমশের এবং মওলানা আবুল কালাম আজাদ। স্পষ্টই যে এই স্টেটাস ছিল সুস্পষ্ট উসকানি আর উসকানিতে মন্ত্রী প্রবীর সিকদারের পাতা ফাঁদে পা দিলেন। খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘প্রবীর সিকদারের অভিযোগ পাগলামি’ (দেখুন, দৈনিক যুগান্তর ১৭ অগাস্ট)। এই পাগলামিকে মন্ত্রী উপেক্ষা করলেন না। পঁচা শামুকে পা দিলেন। এর পরের নাটক সকলেরই জানা।

গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে বাংলাদেশের মানবাধিকার কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে লড়ছেন। তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রবীর সিকদারের গ্রেফতার এবং নাটকীয় জামিনের পর এ নিয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। এগুলো হয়তোবা নগদ লাভ। প্রবীর সিকদারকে রিমাণ্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয় নি, এবং সরকার দলীয় মন্ত্রীদের চাপে তিনি অনায়াসে মুক্তি পেয়েছেন। এতে আনন্দিত হওয়া যায়। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে সমাজে শুধু প্রবীর সিকদার নয়, যে কোন নাগরিকের বিরুদ্ধে অন্যায় হলে ন্যায়বিচার পাবার অধিকার আছে, সেই সত্য স্বীকার নয়, বরং অস্বীকার করা হয়েছে। কারণ একজন প্রবীর সিকদার রাষ্ট্র ও আইনের যে প্রশ্রয় পেয়েছেন সেটা অন্য নাগরিকদের ভাগ্যে জোটে না। ট্রাজেডি হচ্ছে প্রবীর সিকদার ন্যায়বিচারের প্রতীক হয়ে উঠতে পারলেন না। রাষ্ট্র ও বিচার বিভাগ বিচারের ক্ষেত্রে নাগরিকদের প্রতি যে অসম আচরণ করে তার নজির হয়ে রইলেন। ক্ষমতা ও বিচার ব্যবস্থার সুবিধাভোগী হিসাবে নগ্ন উদাহরণ হয়ে থাকবেন তিনি। তাঁকে যে আইনে ও যেভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে আমি তার ঘোর বিরোধী। তাঁকে যেভাবে ও যে প্রক্রিয়ায় মুক্ত করা হয়েছে সেটাও আগামি দিনে সমালোচিত হবে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। তাঁর মুক্তি ঘটেছে আইনী প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে। তাঁর কিছু হলে মন্ত্রী খোন্দকার মোশাররফ হোসেন দায়ী থাকবেন এই ভয়ানক অভিযোগ রেখে তিনি যে কাজ হাসিল করতে চাইছেন তাকে বলা হয়, নিজের কান কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা। তিনি মন্ত্রীকে অপদস্থ করতে চান, কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে যে পথ নিয়েছেন তাকে সমর্থন করবার কোন যুক্তি নাই।

এবার আমরা তৃতীয় দ্বন্দ্বের কথায় আসি। এর সঙ্গে নাগরিকতা ও রাষ্ট্রের চরিত্রের প্রশ্ন জড়িত। তাই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আজ শুধু প্রসঙ্গটি উল্লেখ করে রাখব। এ বিষয়ে আমাদের সময়মতো ফিরে আসতে হবে।

দুই

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রানা দাশগুপ্ত জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংসদে সংখ্যালঘুদের জন্য আসন চেয়েছেন একটি দৈনিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। পত্রিকা জানাচ্ছে, ‘বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও সম্পত্তি জবরদখলের প্রেক্ষাপটে’ তাঁর এই ইন্টারভিউ নেওয়া হয়েছে। রানা দাশ গুপ্ত জানিয়েছেন, সংখ্যালঘুদের দাবিদাওয়া নিয়ে তাঁরা আগামী ২৭ নভেম্বর বেলা একটায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক লাখ লোকের মহাসমাবেশ করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেই সমাবেশ থেকে তাঁরা কেবল প্রতিবাদই জানাবেন না, সংখ্যালঘুদের পক্ষে জাতীয় ঐকমত্যের দাবি পেশ করবেন।

কী সেই দাবি? তিনি বলছেন, “জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংসদে সংখ্যালঘুদের আসন সংরক্ষিত থাকতে হবে। তবে সেটি পৃথক নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, যুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যেভাবে নারী কমিশনারদের ভোট নেওয়া হয়, সেভাবেই সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা যায়”। সংখ্যালঘুদের জন্য তিনি আলাদা আসন চান।

পুরা উপমহাদেশেই সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যার মতো অন্যায় ও অপরাধ ঘটে এতে কোন সন্দেহ নাই। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থার পক্ষে ওকালতি করতে গিয়ে অনেকে ভারতের উদাহরণ দিয়ে থাকেন, যা অমানবিক ও অযৌক্তিক। অত্যচারের মাত্রা বা পরিমাণ দিয়ে কোন নাগরিকের নিরাপত্তাবোধের অনিশ্চয়তা পরিমাপ করা যায় না। এই ধরনের ঘটনা কঠোর ভাবে দমন এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে যে কোন প্রকার অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক, রাজনৈতিক, ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোন বিকল্প নাই। এটা শুধু রাষ্ট্র, আইন বা আইন শৃংখলা বাহিনীর কর্তব্য নয়, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের দায় ও দায়িত্ব। প্রশ্ন হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের জন্য আলাদা আসন কি তার সমাধান? রানা দাশগুপ্তের সঙ্গে আমরা একমত যে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তা বোধ করেন না। এই নিরাপত্তা বোধের অভাব বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মোটেও অনুকুল নয়। বাংলাদেশকে অবশ্যই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই হবে।

কিন্তু রানা দাশগুপ্ত যে দাবি তুলতে চাইছেন তাতে নিরাপত্তা কিম্বা স্থিতিশীলতা অর্জন দূরে থাকুক তা বরং বাংলাদেশের জনগণের মনে গভীর সংশয় ও সন্দেহ তৈরি করবে। তিনি জেনেশুনে সংখ্যালঘুদের আরও বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন। যদি গণতন্ত্র আমাদের আদর্শ হয়, তাহলে বুঝতে হবে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বোধের অভাব গণতন্ত্র কায়েমের ব্যর্থতার মধ্যে। গণতন্ত্র কায়েমের জন্য রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ছাড়া আর কোন বিকল্প নাই। সেখানে হিন্দু কি মুসলমান সেই বিচার ও ভেদবুদ্ধি পরিহার করে গণতন্ত্রের প্রশ্নে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। রানা দাশগুপ্ত ঐক্য নয়, বিভেদ টিকিয়ে রাখতে চান। না, আমি ঠিক বলি নি, তিনি আসলে বিভেদকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চান। বলতে চাইছেন হিন্দুর স্বার্থ একমাত্র হিন্দু, কিম্বা একান্তই হিন্দুর স্বার্থ রক্ষা করে তারাই শুধু নিশ্চিত করতে পারে। যদি তাই হয় তাহলে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, গণতান্ত্রিক সংবিধান ইত্যাদির গালগল্প করে আর লাভ কি?

সাম্প্রদায়িকতার চর্চা এবং তার শর্ত টিকিয়ে রাখার মধ্যে সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা কিম্বা স্থিতিশীলতা অর্জন অসম্ভব। বরং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে নিরাপোষ সংগ্রামের মধ্য দিয়েই আমাদের সকলকে তা অর্জন করতে হবে। আমাকে, রানা দাশগুপ্তকে – সকলকে। আমরা ধর্মীয় জীবনে, এমনকি সামাজিক জীবনেও হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, মুসলমান কিম্বা নিরীশ্বরবাদী হতে পারি। কিন্তু রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় জীবনে আমাদের পূর্ণ নাগরিক ও মানবিক অধিকার দাবি ও আদায় করে নিতে হবে। এটাই আমাদের প্রধান রাজনৈতিক সমস্যা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ভাবে লড়বার প্রধান শর্তই হচ্ছে, আমাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক বা সামাজিক পরিচয় যাই থাকুক, আমরা প্রত্যকেই রাষ্ট্রের নাগরিক এবং অন্যদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে রাষ্ট্র ও আইন দ্বারা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আমার ও অন্য সকলের নাগরিক ও মানবিক অধিকার। আমি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, নিরীশ্বরবাদী, কিম্বা নাস্তিক হতে পারি, কিন্তু রাষ্ট্র আমাকে আমার বৈশিষ্ট্যের জন্য আলাদা ভাবে বিবেচনা করতে পারবে না। ভিন্ন আচরণ করতে পারবে না। আমার অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারবে না। আর সকলের মতো আমার নাগরিক ও মানবিক অধিকার আছে, এবং তার সুরক্ষা রাষ্টের কর্তব্য। রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতেই হবে। একই সঙ্গে সেটা সমাজেরও দায়। আমি সংখ্যালঘু হিসাবে নির্যাতীত হলে রাষ্ট্রকেই তার দায় নিতে হবে। তার প্রতিকারও করতে হবে রাষ্ট্রকেই। যদি রাষ্ট্রের এই গণতান্ত্রিক রূপান্তর আমরা ঘটাতে না পারি তাহলে রানা দাশগুপ্ত কি ভাবছেন যে তিনি জাতীয় সংসদে প্রতিনিধি হলেই সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ হয়ে যাবে, কিম্বা তিনি বন্ধ করতে পারবেন!

বহুকে বা অনেককে নিয়েই গণতন্ত্র। গণতান্ত্রিক সমাজে সকলেরই পরিচয় এক, সকলেরই একই আশা, একই চর্চা, একই বিশ্বাস একই সংস্কৃতি হতে হবে তার কোন কথা নাই। বৈচিত্র ও বহুত্ব সমাজের শক্তি এবং তাকে ধারণ করার হিম্মত দিয়েই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্রের মাত্রা নির্ণয় করা যায়। বহু ও বিচিত্র হলেও রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকারের দিক থেকে গণতন্ত্রে প্রত্যেকে সমান এবং রাষ্ট্র কোন নাগরিকের অধিকার যেমন ক্ষুণ্ণ করতে পারে না, তেমনি সংখাগরিষ্ঠ বলে সমাজের একাংশের জন্য বিশেষ সুবিধা বা বিশেষ প্রিভিলেজও দিতে পারে না। সমাজ জীবনে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ হিসাবে মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক পরিচয়কেই যদি তাদের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় গণ্য করে তাহলে তার মধ্যে যে পরিমান সাম্প্রদায়িকতা ও বিপদ নিহিত থাকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ যদি তাদের ধর্মকেই রাজনৈতিক পরিচয় গণ্য করে তার জন্য আলাদা সুবিধা দাবি করে তাহলে তা একই ভাবে সাম্প্রদায়িক এবং নিন্দনীয়। রানা দাশগুপ্তের দাবি অগণতান্ত্রিক এবং সাম্প্রদায়িক। এই ধরণের দাবি উসকানিমূলক এবং সংখ্যালঘুদের জন্য বিপজ্জনক।

রানাদাশ গুপ্তের সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হচ্ছে এই প্রথম তাঁর মতোন নেতৃস্থানীয় একজন হিন্দু স্বীকার করলেন সংখ্যালঘুদের জমিজমা বাড়িঘর শুধু বিএনপি-জামাত লুট বা দখল করেছে এটা ঠিক নয়, কোন প্রকার বিচার বিবেচনাহীন ভাবে তাঁরা আওয়ামি লীগকে সমর্থন করলেও বাংলাদেশে সংখ্যা লঘুদের ওপর নির্যাতন ও তাদের ধনসম্পত্তি লুটপাটের ক্ষেত্রে আওয়ামি লীগের ভূমিকা কোন অংশেই গৌণ নয়।

কিন্তু এরপরও রানা দাশগুপ্ত "স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি", "মৌলবাদী জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী"র কথা বলছেন। ঠিক আছে। আসলে কারা এইসব করছে সুনির্দিষ্ট ভাবে তাদের নাম ঠিকানা চিহ্নিত না করে হাওয়ায় তলোয়ার ঘুরাতে থাকলে তার আঘাত নিজের গায়ে এসে লাগে। প্রশ্নকর্তা তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন-- "বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও তাদের সম্পত্তি দখলের সঙ্গে কয়েকজন সাংসদ-মন্ত্রীও জড়িত আছেন..." । প্রশ্নকর্তার এই অভিযোগের ভিত্তি কিন্তু রানা দাশ গুপ্ত নিজে। তিনিই কিছুদিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামি লীগ ও ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলেছিলেন। ফলে তাঁকে স্বীকার করতে হোল, সরকারী "দলের সাংসদ ও প্রভাবশালীদের দ্বারাই সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর বা সম্পত্তি দখলের ঘটনা" ঘটছে। "স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি", "মৌলবাদী জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী"র ঢাকনি দিয়ে তা আর ঢেকে রাখা যাচ্ছে না।

যিনি সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনি আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন বলে পরিচিত আওয়ামী ওলামা লীগের দাবির কথা তুলেছেন। তারা সমাবেশ করে বলেছে, পুলিশসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আনুপাতিক হারের চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যায় সংখ্যালঘুদের পদায়ন করা হয়েছে। এতে সংখ্যাগুরু মুসলমানরা বঞ্চিত হচ্ছেন। রানা দাশ গুপ্ত আওয়ামি ওলামা লীগকে ‘অন্ধকারের শক্তি’ বলছেন, কিন্তু এরা আওয়ামি লীগের সমর্থক, যে দলের তিনি সুবিধাভোগী এবং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ যে দলকে সমর্থন করে। আওয়ামি ওলামা লীগের মধ্য দিয়ে সমাজের একটি চাপা ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে। যাকে হাল্কা ভাবে নেবার সুযোগ নাই। অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না।

রানা দাশ গুপ্ত স্বীকার করেছেন আওয়ামি ওলামা লীগের সভায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও যান। যে কথা হেফাজতে ইসলাম, জামায়াতে ইসলামি বা অন্য ইসলামপন্থি দল বলে নি, সেই কথাই ওলামা লীগ সেটিই বলছেত: চাকরিবাকরিতে সংখ্যলঘুদের অযৌক্তিক আধিক্য। একটি ইসলামি দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের পাঁচ দফা চুক্তির কথাও তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, “ ৬৮ বছর ধরেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা বঞ্চিত। মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের উপযুক্ত পদ দেওয়া হয়নি। তাই বর্তমান সরকারের আমলে যখন যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে কিছু ক্ষেত্রে (সব ক্ষেত্রে নয়) সংখ্যালঘুদের পদায়ন করা হচ্ছে, তখনই অন্ধকারের শক্তি শোরগোল তুলছে”।

ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আওয়ামি ওলামা লীগের দ্বন্দ্ব হোল আওয়ামী রাজনীতির অভ্যন্তরের চতুর্থ দ্বন্দ্ব। এর পরিণতি কী হতে পারে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ক্ষমতাসীনদের জন্য এগুলো নতুন চ্যালেঞ্জ। আমার আশংকা রানা দাশগুপ্ত এই সময়ে এমন কিছু বিষয় উসকে দিতে চাইছেন যা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে সংখ্যালঘুদের দূরত্ব তৈরি করবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা ও অসহনশীলতাকেও উসকে দেবে। তার দায় প্রবীর সিকদার, রানা দাশ গুপ্তদেরও নিতে হবে।

আশা করব, ২৭ নভেম্বর লক্ষ লোক সমাবেশের আগে তাঁরা তাদের দাবি নিয়ে আরও ভাববেন। যেন আমরা বাংলাদেশকে নতুন কোন সংকটের মধ্যে ঠেলে না দেই।

২১ অগাস্ট ২০১৫। ৬ ভাদ্র ১৪২২। শ্যামলী।

 

 

 

 

 

 

 

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(1)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : Farhad Mazhar, Communalism, Rana Das Gupta, Minorities

View: 1998 Leave comments-(1) Bookmark and Share

opinion1

wonderful.a timely article reflecting present political crisis caused by asphyxia due to strangulation of throat of democracy by a timid Government.


Monday 24 August 15
Md. Rezaul karim


EMAIL
PASSWORD