নেপালের নতুন গঠ্নতন্ত্র, নারী অধিকার ও ভারতের কাণ্ড


নেপাল আমাদের একটি অতি ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী রাষ্ট্র। প্রাকৃতিকভাবেও আমাদের সম্পর্ক অনেক গভীরে - হিমালয় থেকে বরফ গলে পানি আমাদের নদ নদী পার হয়ে গড়িয়ে বঙ্গোপসাগরে যাচ্ছে। কাজেই এখানকার যে কোন পরিস্থিতি আমাদের ভাবায়, আমাদের আন্দোলিত করে। নেপালে যখন ভুমিকম্প হয়েছিল তখন বাংলাদেশও কেঁপে উঠেছিল কয়েকবার। অন্যদিকে আমাদের আর একটি প্রতিবেশী দেশ হচ্ছে ভারত; যা আমাদের তিনপাশ ঘিরে আছে। সম্পর্ক ভাল কি মন্দ যাই হোক, সীমান্তে কাঁটা তার আছে আর যখন তখন নানা অজুহাতে সীমান্ত রক্ষীবাহিনী আমাদের মানুষ মারছে। এখানেও পানির সম্পর্ক আছে, ৫৪টি নদীর সাথে আমাদের সম্পর্ক। পানি নিয়ে টানাপোড়েন চলছেই। কাজেই আমাদের জনগণ ভারতের ব্যাপারে সবসময় নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন না, যদিও এপারের অনেকের আত্মীয় স্বজন ওপারে আছে, আর ওপারের অনেকের স্বজন এ পারে আছে। নেপালকে বলা হয় ল্যান্ডলকড দেশ, যা অন্য দেশের সীমান্ত দিয়ে পরিবেষ্টিত, আর সেখানে বাংলাদেশ এক হিশেবে ওয়াটার-লকড দেশ, কারণ তিনপাশে ভারতের নদীর পানি আর একদিকে বঙ্গোপসাগর। এই পরিস্থিতি এখন রাজনৈতিক সম্পর্কের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়ে গেছে। আমরা নেপালের সমস্যা অনেকখানি বুঝতে পারি।

নেপালে সম্প্রতি যে ঘটনা ঘটেছে তা আমাদের চমকে দিয়েছে। একটি ছোট দেশ। তারা নিজের মতো করে একটি গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করেছে। আমাদের দেশে যারা গণপরিষদের মাধ্যমে গঠনতন্ত্র প্রণয়নের ব্যাপারে আগ্রহী, তাঁরা এতে খুশি হয়েছেন কারণ অনেক তর্ক-বিতর্ক, আলোচনার পর শেষ পর্যন্ত একটি গঠনতন্ত্র ঘোষিত হয়েছে গত ২০ সেপ্টেম্বর তারিখে। এই তারিখটি নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত হয়ে থাকবে। গঠনতন্ত্র হঠাৎ করে কেউ ঘোষণা দেয়নি, নির্বাচিত গণপরিষদের ৫৯৮ জন গঠনতন্ত্র প্রণেতার মধ্যে ৫০৭ জন সম্মতি দিয়েছেন। এর আগে ১৯৪৮ সালে প্রথমবারের মতো গঠনতন্ত্র প্রণীত হয়েছিল, কিন্তু তখন সেখানে রাজতন্ত্র কায়েম ছিল। নেপালে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন ১৯৯০ সাল থেকেই শুরু হয়েছে। এরপর রাজনৈতিক অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যে নেপালের জনগণকে পার হতে হয়েছে। এবং অনেক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নেপালের নারী-পুরুষ মিলে অংশগ্রহণ করেছে। বছরের পর বছর তারা সংগ্রাম করে আজ একটি অবস্থান করে নিয়েছে তারা বিশ্বের কাছে। তাদের সালাম জানাই। আর এখন তাদের বড় একটি অর্জন হচ্ছে একটি নির্বাচিত গণপরিষদের দ্বারা একটি গঠনতন্ত্র প্রণয়ন, অনুমোদন ও গ্রহণ। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেই এটা এক বিরাট ঘটনা।

কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশের মধ্যে অন্য কেউ নেপালের সাথে খুব সরাসরি যুক্ত না হলেও ভারতের স্বার্থ নেপালে অনেক বেশী। গঠনতন্ত্র ঘোষণায় ভারতের ভারী রাগ হয়েছে এবং তারা অতি দ্রুত সেটা প্রকাশও করে ফেলেছে। তারা অলিখিতভাবে অর্থনৈতিক আবরোধ দিয়ে সেখানে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় পণ্যের এমন কি ওষুধ পত্রের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার! একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ তার নিজের দেশ কেমন করে কোন নীতির ওপর চলবে তা ঠিক করবে কিন্তু ভারত তা হতে দেবে না! অবরোধ এমনই যে এর ফলে নেপালে অনেক সমস্যা হচ্ছে কারণ তারা ভারতের স্থলপথ দিয়ে নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর আমদানীর ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে জ্বালানী তেল, যেমন ডিজেল, পেট্রোল, রান্নার জন্যে গ্যাস ১০০ ভাগ আমদানী করতে হয়। অনেক নারী অভিযোগ করেছেন যে তাদের রান্না বান্না করাই এখন কঠিন হয়ে পড়ছে। তাহলে ভারত জেনেশুনেই এমন অবরোধ দিয়েছে যাতে জনজীবনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

আমরা বাংলাদেশের নাগরিক হিশেবে ভারতের এই আচরণের নিন্দা জানাই। ইতিমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার নারীবাদী সংগঠনের পক্ষ থেকেও নিন্দা এবং অবিলম্বে অবরোধ তুলে ফেলার দাবী জানানো হয়েছে। আমরাও বাংলাদেশ থেকে এই দাবী জানাচ্ছি, কারণ অন্য দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে এভাবে হস্তক্ষেপ করা কোনমতেই কাম্য হতে পারে না। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক নীতিমালা রয়েছে বিশেষ করে ল্যান্ড-লকড দেশের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবার জন্যে ভারত সরকারের কাছে আমরা আহবান জানাচ্ছি।

ভারতের এই নাখোশ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে যখন নতুন গঠনতন্ত্রের বিরুদ্ধে ভারত নেপাল সীমান্তের জনগোষ্ঠি মাধেসীরা বিরোধিতা করতে শুরু করলো। তাদের অভিযোগ হচ্ছে তাদের সাথে কোন আলোচনা করা হয়নি। সীমান্ত এলাকার অধিবাসী হিশেবে মাধেসীদের সাথে ভারতের বেশ কিছু রাজ্যের বিশেষ করে বিহারের সম্পর্ক আছে। তাদের অনেকেই ভারত-নেপালের নারী-পুরুষ বৈবাহিক সম্পর্কেও আবদ্ধ। এটা অস্বাভাবিক নয়। মাধেসীদের দাবী অনেক, তারা স্বায়ত্বশাসন ও নীতি নির্ধারণে তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে চায়। নতুন গঠনতন্ত্রে বিতর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ এখনো বন্ধ হয়ে যায় নাই। আশা করি নেপাল এই সমস্যা কাটিয়ে উঠবে। কিন্তু তার আগেই ভারতের এতো ত্বরিৎ গতিতে অবরোধের মতো আমানবিক পদক্ষেপ নেয়া গণতন্ত্রমনা মানুষদের অবাক করেছে। সার্কের একটি দেশ হিশেবে ভারতের এই আচরণের বিরুদ্ধে অবশ্যই অন্যান্য সার্ক দেশের এগিয়ে আসা উচিত।

আমার জানা মতে এই গঠনতন্ত্র প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সাথে অনেক নারী জড়িত ছিলেন এবং অনেক নারী সংগঠন তাদের মতামত দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও নারীরা বসে ছিলেন না। গেরিলা যুদ্ধেও অনেক নারী পুরুষের বেশে যুদ্ধ করেছেন এবং দীর্ঘদিন বনে জঙ্গলে থেকে নেপালের রাজনীতিতে অসামান্য অবদান রেখেছেন। কাজেই গঠনতন্ত্রে নারী অধিকার কতখানি থাকবে তা নারীরা তাদের প্রাপ্য হিশেবেই পাবে। এখানে কারো দয়া দেখাবার বিষয় নয়। গঠনতন্ত্রে একটি আলাদা অনুচ্ছেদে (৩৮ নং) নারী অধিকার নামেই যুক্ত হয়েছে যা নেপালে আগে কখনোই দেখা যায় নি, এমনকি অন্য দেশের গঠন্তন্ত্রেও নয়। গঠনতন্ত্র নেপালী ভাষায় রচিত হয়েছে, তবে এর একটি আন-অফিসিয়াল ইংরেজী অনুবাদ পাওয়া যাচ্ছে, যা নেপালে আমাদের বন্ধু-সংগঠন থেকেই আমরা সংগ্রহ করেছি, ইন্টারনেটে খুঁজলেও পাওয়া যায়। সেই সুত্রেই আমি এখানে কথা বলছি, মুল গঠনতন্ত্র পড়ে নয়।

গঠনতন্ত্রে ভাষার কথা বলা হয়েছে যে নেপালে যতো ভাষায় কথা বলা হয় তার সবই রাষ্ট্র ভাষা হিশেবে স্বীকৃতি পাবে। আরো অনেকগুলো অনুচ্ছেদ আছে যাতে দেখলে বোঝা যায় যথেষ্ট হয়েছে সব ধরণের বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করার জন্যে। দলিতদের প্রশ্ন আছে। নারী অধিকার প্রশ্নে এই গঠনতন্ত্রের সব কিছুর সাথে একমত হওয়া না হওয়ার বিষয় অবশ্যই আছে, কিন্তু একটি কথা অবশ্যই বলা যায়, তা হচ্ছে দীর্ঘদিন রাজতন্ত্রের অধীনে থেকে এবং ঘোষিতভাবে হিন্দু রাষ্ট্র হয়ে গণতন্ত্রের জন্যে বছরের পর বছর লড়াই করে নেপালের জনগণ আজ যে জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে সেটা বিরাট এক অগ্র পদক্ষেপ। তাতে তাদের পাশে আমাদের দাঁড়াতেই হবে এবং তাদের লড়াইয়ের সাথে হাত মেলাতে হবে। নেপালের জনগণ এবং বিশেষ করে নারী সংগঠনের সাথে আমাদের সংহতি প্রকাশ করতে হবে। বিশেষ দিকগুলো নিয়ে আমাদের সমালোচনা থাকতে পারে কিন্তু একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে নেপাল যেভাবে নিজেদের গড়বার জন্য লড়ছে তাতে আমরা অনুপ্রাণিত হচ্ছি, এতে কোন সন্দেহ নাই।

নারী অধিকারের প্রশ্নে অনেক নারী সংগঠন মনে করে এই গঠনতন্ত্র এখনো পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত নয়। যদিও গঠনতন্ত্রের ৩৮ নং অনুচ্ছেদে নারী অধিকারের কথা বলা আছে। প্রথমেই বলে দেয়া হয়েছে কোন প্রকার লিঙ্গ বৈষম্য থাকবে না। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সনদ সিডোকে এখানে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৩৮ নং অনুচ্ছেদের মধ্যে মোট ৬টি ধারায় লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা, নিরাপদ মাতৃত্ব ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, মানসিক শারীরিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে ধর্মীয়, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কারণে হলেও তার বিরুদ্ধে শাস্তিমুলক ব্যবস্থা নেয়া, এবং প্রয়োজনে ক্ষতিপুরণ দেয়া বিধান রাখা, রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে তাদের প্রতিনিধিত্ব ও অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সম্পত্তিতে সমান অধিকার থাকার বিষয়টি উল্লেখ আছে। এখানে সমালোচনার দিক থেকে যায় যে নারী অধিকার অনুচ্ছেদে কেন অবিবাহিত নারীর ক্ষেত্রে পৈত্রিক সম্পত্তিতে অধিকার থাকবে কিনা সেই উত্তরাধিকারের প্রশ্ন গঠনতন্ত্রে পরিষ্কার করে বলা হয় নি। সম্ভবত নেপালের নারী আন্দোলনের চেয়ে বেশী সক্রিয় ছিল নেপালের এনজিও নারী নেতৃত্ব, যারা শুধু সেই বিষয়েগুলো এনেছেন যা আন্তর্জাতিক ভাবে গ্রহনযোগ্য কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোকে আঘাত করে না।

তাই নেপালে রাষ্ট্রের পুরুষতান্ত্রিক চরিত্র থেকে এতো লড়াই-সংগ্রামের পরেও দ্রুত বের হওয়া যায় নি। কিন্তু এতে হতাশ হবার কিছু নেই। নারীদের সংগ্রাম নিশ্চয়ই থেমে থাকবে না। রাজনৈতিকভাবে নারীদের প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসলেই এর বিহিত করা যাবে। হিন্দু রাষ্ট্র ও সমাজের নিয়ম কানু্নের বাধা কাটিয়ে উঠে নেপালের নারীরা এগিয়ে যাবেন এই আশা করি। নেপালের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা নিজেরাও নারী অধিকার প্রশ্নে আমাদের সংবিধানের স্ব-বিরোধিতা ও কিছু ক্ষেত্রে নারীর প্রতি অন্যায্যতা আরও প্রকট ভাবে চোখে পড়ছে। সেই সব কাটিয়ে ওঠার দাবী তোলার সময় হয়েছে। অন্যের ব্যাপারে বলতে গিয়ে বারে বারে নিজেদের ত্রুটিগুলোও আমাদের চোখে পড়ছে। কাজেই নেপালের সংগ্রাম দক্ষিণ এশিয়ার নারীদের সংগ্রামেরই অংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় নারীরা সমাজে স্বাধীন ব্যাক্তিত্ব এবং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে পূর্ণ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবেন, এই আশা করছি।

তাই নেপালের জনগণ এবং বিশেষ করে নারীদের পাশে আমরা আছি। একই সাথে নেপালের ব্যাপারে ভারতের কাণ্ড দেখে আমরা অবাক হচ্ছি, তার প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং তাদের আচরণ ঠিক করার আহবান জানাচ্ছি।