সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

খোন্দকার রাকিব


Sunday 25 October 15

print

[ বর্তমান পৃথিবীতে যেসব প্রশ্ন আমাদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে এবং নতুন রাজনীতি নির্মাণে প্রধান প্রশ্ন আকারে সামনে এসেছে এর মধ্যে ‘শরিয়াহ’ অন্যতম। কিন্তু শরিয়া নিয়ে আলোচনা সহজ নয়। এর বাস্তব প্রয়োগ যেমন বিতর্ক তৈরি করে তেমনি ইসলামকে দানবীয় বর্বর ধর্ম হিসাবে হাজির করবার জন্য পাশ্চাত্য শরিয়ার বিরুদ্ধে  ব্যাপক প্রপাগাণ্ডা চালায়। ঐতিহাসিক ভাবে শরিয়ার উৎপত্তি ও বিবর্তন বোঝা এবং শরিয়াকে কেন্দ্র করে ইসলামে আইন, রাষ্ট্র, শাসন ব্যবস্থা, ক্ষমতা ইত্যাদি ধারণার উৎপত্তি ও বিবর্তন কিভাবে ঘটেছে সে সম্পর্কে বুদ্ধিবৃত্তিক নিষ্ঠার সঙ্গে শরিয়া পাঠ ও বিশ্লেষন ছাড়া গত্যন্তর নাই। সেই পাঠ একই সঙ্গে আধুনিক রাষত্রের পর্যালোচনাতেও সহায়ক হতে পারে।  চিন্তা পাঠচক্র বিষয়টিকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পাঠচক্র চলছে। পাঠচক্রে যে কেউই স্বাগতম। এ যাবত পাঠচক্রে যা আলোচনা হয়েছে তাকে খানিক ধরে রাখার জন্য খোন্দকার রাকিব পরিশ্রম করে এই নোট্টি তৈরি করেছেন। যারা ঢাকায় থাকেন না, দূরে আছেন তারা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো চিন্তা ওয়েবে তুলে দেবার অনুরোধ জানাচ্ছিলেন অনেক দিন ধরেই। আশা করি তাঁদের তৃষ্ণা খানিক মিটবে। আমরা বাংলাভাষীরা উচ্চারণের সময় ‘হ’ বাদ দিয়ে ‘শরিয়া’ বলি। উচ্চারণ অনুগত সেই বানানই এখানে করা হোল। আরবি শুদ্ধ উচ্চারণ বোঝাবার সময় উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। - সম্পাদনা বিভাগ ]

শরিয়া নিয়ে দুনিয়া জুড়ে নতুন আলাপ আবার শুরু হয়েছে। এটা ঘটছে বিশেষ করে ৯/১১ পরবর্তী দুনিয়ায় সাধারণ ভাবে ধর্ম এবং বিশেষ ভাবে ইসলাম প্রশ্ন সামনে চলে আসার কারনে। ধর্ম, দর্শন, রাষ্ট্র ইত্যাদি নতুন করে পর্যালোচনার অধীন হচ্ছে আবার, বিশেষত তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার জরুরী হয়ে উঠেছে। এই তাগিদে নতুন উৎসাহে ধর্ম নিয়ে নতুন পঠনপাঠন শুরু হয়েছে। টুইন টাওয়ার ও পেন্টাগনে উড়োজাহাজ হামলার পর থেকে ইসলাম সেই পঠন পাঠনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। ‘আধুনিকতা’, ‘প্রগতি’ ইত্যাদি ধারণা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে তার ছেদ ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে গিয়ে ‘উত্তর আধুনিক’ নামে নতুন ভাবে চিন্তার যে চেষ্টা শুরু হয়েছিল, সেটাও বাস্তব ও ব্যবহারিক প্রশ্নের কোন কার্যকর মীমাংসার প্রস্তাব করতে পারে নি। ব্যাক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ও ব্যবাহারিক প্রশ্নের উত্তর তারা দিতে পারবে বলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে অনেক আগেই। সেটা প্রকট ভাবে ধরা পড়ে ইসলাম নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে। সেটা দর্শন, রাজনীতি, আইন, সংস্কৃতি ইত্যাদি নানান দিক থেকে যেমন সত্য। শরিয়া নিয়ে আলোচনায় সেটা আরও প্রকট ভাবে ধরা পড়ে।

যে সকল জনগোষ্ঠির ধর্ম ইসলাম তাদের জন্য এই অভাব নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে হাজির হয়েছে। ধর্ম, দর্শন, সংস্কৃতি, রাজনীতি ইত্যাদির পর্যালোচনাকে সকলের জন্য প্রাসঙ্গিক করে তুলতে হলে ইসলাম নিয়ে আন্তরিক পঠন পাঠনের কোন বিকল্প নাই।

এই তাগিদ থেকে গত এপ্রিল মাস থেকে চিন্তা পাঠচক্রে আমরা ধারাবাহিকভাবে কিছু বই পড়ছি। তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ইয়াসের আওদার ‘মাকাসেদে শরিয়াহ’ (Auda, 2007), ইবনে তাইমিয়ার ‘সিয়াসা শারিয়া’ (Taymiyyah, 2006), হাশিম কামালির ‘শারিয়া ল’ (Kmali, 2008), বাবের জোহানসেনের ‘A Perfect Law in an Imperfect Society’ (Johansen, 2008), তালাল আসাদের ‘রিলিজিয়ন, ন্যাশন স্টেইট এন্ড সেক্যুলারিজম’ (Asad, 2003) ও ‘মুহাম্মাদ আসাদ ‘বিটুইন রিলিজিয়ন এন্ড পলিটিক্স’, ওয়ায়েল হাল্লাকের ‘ইম্পসিবল স্টেইট’ (B.Hallaq, 2013) ও ‘Can shariyah be restored?’, মোহাম্মেদ ফাদেলের ‘A tragedy of politics or an apolitical tragedy’, ওভামির আঞ্জুমের ‘Politics, law and community in Islam: Ibn Taimiyan Moment’ (Anjum, 2012) , ইত্যাদি। শরিয়া নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা ও তর্ক বিতর্কগুলো ঘনিষ্ঠ ভাবে অনুসরণ করাই আমাদের ইচ্ছা। সেসব আলোচনার কিছু সারসংক্ষেপ ধারাবাহিক তুলে ধরার চেষ্টা হিসাবে প্রথম কিস্তি পেশ করছি। আশা করি চিন্তার পাঠকদের কাজে লাগবে, এবং আগ্রহীরা চিন্তা পাঠচক্রে নিয়মিত যোগ দিতে আগ্রহ বোধ করবেন।

রাজনৈতিক ইসলাম

পলিটিক্যাল ইসলাম বলে পশ্চিমা দুনিয়ায় এখন যে ধারণাটা চালু আছে তার একেবারে গোড়া ধরা হয় ইবনে তাইমিয়া থেকে। বিশেষ করে বর্তমান দুনিয়ায় আল-কায়েদা, আইএস, মিলিট্যান্ট ইসলাম ও পলিটিক্যাল ইসলাম নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তারা এসব ধারণার উৎপত্তির একেবারে গোড়াতে গিয়ে যে মানুষটার খোঁজ পান, তিনি ইবনে তাইমিয়া। ফলে নানান দিক থেকে ইবনে তাইমিয়া আর তার চিন্তাকে নতুন করে পাঠ করাটা জরুরি।

আমরা ইবনে তাইমিয়ার ‘আস-সিয়াসা আস-শরিয়া’ নিয়ে আলোচনা করছিলাম; যাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে ‘পলিটিকাল শরিয়াহ’ নামে (Taymiyyah, 2006)। এরপর ইবনে তাইমিয়ার উপরে ওবামির আনজুমের করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ থিসিসটা নিয়ে আলোচনা করব। সেটাতে যাওয়ার আগে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, ইবনে তাইমিয়া নিয়ে আরো যারা আলোচনা করেছেন তাদেরকেও বুঝা দরকার। এজন্য বাবের জোহানসেনের লেখা "A Perfect Law in an Imperfect Society: IbnTaymiyya’s Concept of Governance in the Name of the Sacred Law" (Johansen, 2008) লাখাটির একটা সারসংক্ষেপ তুলে ধরব। উল্লেখ্য, বাবের জোহানসেন হার্ভার্ড ডিভাইনিটি স্কুলের ‘ইসলামিক স্টাডিজ’ বিভাগের নামকরা অধ্যাপক, জাতিতে জার্মান। ক্ল্যাসিকাল ও আধুনিক মুসলিম দুনিয়ায় ইসলাম ও আইন নিয়ে তার গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। বিশেষ করে হানাফী মাজহাবে সম্পত্তি ও আইনের ধারণা নিয়ে তার লেখা “Islamic Law on Land Tax and Rent (1988)” (Johansen, The Islamic Law on Land Tax & Rent: The Peasants' Loss of Property Rights as Interpreted in the Hanafite Legal Literature of, 1988) খুবই আলোচিত। এছাড়া ফিকহ শাস্ত্রে তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে “(1999)”. Contingency in a Sacred Law: Legal and Ethical Norms in the Muslim Fiqh (Johansen, Contingency in a Sacred Law: Legal and Ethical Norms in the Muslim Fiqh, 1999)

ইবনে তাইমিয়ার আবির্ভাব এমন একটি সময়ে যখন মোঙ্গলদের আক্রমণের শিকার হয়ে আব্বাসীয় খিলাফতের পতন ঘটে। পরবর্তীতে মামলুকরা ক্ষমতায় আসে। শাসন ব্যবস্থা নিয়ে ইসলামের আভ্যন্তরীণ চিন্তাভাবনায় খিলাফত ধারণার মধ্যে ইসলামী শাসন-চিন্তা নিয়ে তখন অনেকগুলো বিতর্ক ছিল। কিন্তু তখনও ইসমাই শাস্ন ব্যস্থার ধারণা হিসাবে যেমন তেমনি ব্যবাহারিক ক্ষেত্রেও খেলাফত ধারনার প্রতীকী তাৎপর্যও মুসলমান জনগোষ্ঠির জীবন যাপনে ভূমিকা রাখত। সেটা ভেঙ্গে যাওয়ার পরে শুরু হয় ‘সালতানাত’। তারপরে ‘মামলুক’। পরবর্তীতে বর্তমান তুরস্কে আরেকটা যে ব্যবস্থা তৈরি ঐটাও সালতানাত-ই ছিল। আমরা যদিও বলি ওসমানী খিলাফত, কিন্তু আসলে এটা খিলাফত ছিল না। এরপর যেসব আলেম ওলেমা নতুন করে রাজনৈতিক চিন্তা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন, তাঁদের একটা অংশ ‘শরিয়াহ’ নামক ধারণাকে পদ্ধতিগতভাবে গড়ে তুলছেন। শরিয়াহ আস্তে আস্তে নিজস্ব একটি পরিমণ্ডল ও যুগপৎ আইনী ও রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে গড়ে উঠেছে।

ইমামদের নিয়ে আলোচনায় ইসলামি শরিয়ার বিকাশের অনুসরণ ও তার পঠন পাঠনের মধ্য দিয়ে চিন্তা পাঠচক্রে যা স্পষ্ট হয়ে উঠছিলো তা হোল শরিয়া ক্ষমতাসীন শাসকদের ক্ষমতার বিপরীতে সমাজের সামষ্টিক স্বার্থ রক্ষার তাগিদে পাল্টা সামাজিক আন্দোলন হিসাবে গড়ে উঠেছিল। সেটা খিলাফত ব্যবস্থার মধ্যে যতটা না স্পষ্ট ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট হয়েছে সালতানাত বা সুলতানি ক্ষমতার পর্যায়ে। তখন আইনজ্ঞ বা তখন জুরিস্ট হিসাবে আলাদা করে ওলেমাদের মধ্যে যে অংশটা সক্রিয় ছিলেন তাঁরা আসলে ছিলেন মুফতি ছিলেন, অর্থাৎ ফতোয়া বা মতামত দেবার অধিকারী। এদের সাথে সবসময় সরাসরি বিচারক – অর্থাৎ কাজীর সম্পর্ক ছিল না। মুফতি মানেই কাজী ছিলেন ব্যপারটা এরকম নয়। কাজী হচ্ছে সরকার যাদের বিচারক হিসাবে নিয়োগ দিতেন।

বোঝা যায় কেলাফত থেকে সালাতানাতের পর্যায়ে করে কিছু ধারনার উৎপত্তি হল এবং এর ফলে একটা আইন, রাজনীতি ও ক্ষমতা এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্বন্ধে ইসলামি চিন্তায় নতুন দ্যান ধারণা শুরু হোল। তাইমিয়ার অবস্থান নিয়ে মোটা দাগে দুটো আলোচনা আছে।

১. ইবনে তাইমিয়া কেন খিলাফত ধারনার উপর ভিত্তি করে তাঁর ইসলামিক চিন্তা গড়ে তুললেন না?

২. তিনি কি খেলাফতের ধারণাকে বাতিল করে দিয়েছেন? নাকি তিনি ঐতিহাসিকভাবে খিলাফতকে যেমন পেয়েছেন তেমনি গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু পরবর্তীতে অন্য একটা বয়ান দিয়েছেন।

দুটো তর্কই গুরুত্বপূর্ণ।

কেম ছিল ইমাম তাইমিয়ার সময়? তাঁর জন্ম হারান শহরে। পরবর্তীতে সেখানে মোঙ্গলদের আক্রমণ হওয়ায় তিনি মিশরে চলে যান। এবং পরে আবার সিরিয়ায়। ফলে মিশর এবং সিরিয়ার মধ্যে তাঁর জীবনকালটা অতিবাহিত হয়। ঐ সময়টা মামলুকদের শাসনকাল ছিল। সেখানে মূল চারটা মাজহাব রাষ্ট্রিয়ভাবে স্বীকৃত ছিল। চার মাজহাব থেকে যেভাবে কাজী নিয়োগ করা হত, এর বাইরে এসে তাইমিয়ার চিন্তাটা কি ছিল? কেন তিনি এই আলোচনাটা শুরু করেছেন? কোন পর্যায়ে গিয়ে মামলুক শাসনের সাথে তার বিরোধ হয়ে তাকে কারাগারে যেতে হল? এবং সুফি ধারার সাথেও তার বিরোধের জায়গাটা কি? চিন্তা পাঠচক্রে এই সবই আমামদের আলোচনার মুখ্য বিষয় হয়ে উথেছিল।

একটা পরিচিত তর্ক আছে যে তিনি খুব সুফি বিরোধী ছিলেন, খিলাফত বিরোধী ছিলেন, দর্শন বিরোধী ছিলেন। বাবের জোহানসেনের আলোচনার ভারকেন্দ্র ছিল ইবনে তাইমিয়াকে নিয়ে এই পরিচিত তর্কগুলো বিচার করে দেখা।

জোহানসেনের আলোচনা

বাবের জোহানসেন প্রথম শুরু করেছেন ইবনে তাইমিয়া (১২৬৩ – ১৩২৮) কখন এবং কিভাবে ইবনে তাইমিয়া হয়ে উঠলেন। তিনি প্রথমে দেখিয়েছেন, তাইমিয়া যে সমাজে বেড়ে উঠেছেন সেটা ছিল মামলুক বংশ। ১২৫০ থেকে ১৫১৭ সাল পর্যন্ত এই সালতানাতের স্থিতি ছিল। মামলুক বংশের আগে আব্বাসীয় এবং উমাইয়া খিলাফত ছিল। মামলুকরা ককেশাশের কোনো এক জায়গার দাস ছিল। মিশরের মিলিটারিরা তাদেরকে নিয়ে এসেছিল, নিয়ে আসার পরে কোন এককালে তাদেরকে মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। আব্বাসীয় শাসন শেষ হয়ে যাওয়ার পরে সেই দাসরাই মিশর-সিরিয়া-লিবিয়ার বিশাল অঞ্চলে শাসন ক্ষমতা দখল করে। দখলের পর তারা প্রধান যে সমস্যায় পড়ল সেটা হচ্ছে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতা। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতা আদায় করে নেওয়া তাদের জইন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠল। চাইল। তাদের পূর্বসুরি উমাইয়া আর আব্বাসীয়রা আরবের সংস্কৃতি আর ধর্মীয় আবহে নিজেদের শাসনের যে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতা লাভ করেছিল, মামলুকদের সেরকম কোন বৈধতা ছিল না।

ক্ষমতাকে বৈধ করার জন্য তারা কয়েকটা কাজ করল। প্রথমত, তারা ক্রুসেডে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের এক ধরনের ধর্মীয় বৈধতা তৈরি করল। এরপর তারা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে মিশরকে একটা প্রধান কেন্দ্র করে ফেলল, যার ফলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মামলুকদের যত শিক্ষিত লোক ছিল তারা সবাই মিশরে চলে আসল। এরপর তারা প্রধান চারটা সুন্নী স্কুলের প্রত্যেকটা থেকে একজন করে কাজী নিয়োগ করল, যারা প্রধান বিচারপতির কাজ করত। মামলুকরা সেখানকার মাদ্রাসাগুলোতে প্রচুর পরিমাণে অনুদান দিল।

শেষতক তারা দুইভাবে সেখানে নিজেদের বৈধতা তৈরি করল। একটা হচ্ছে মিলিটারি বা সামরিক শক্তির মাধ্যমে সিরিয়া এবং মিশরকে ক্রুসেডের হাত থেকে রক্ষা। অন্যটি হল ধর্মীয় বৈধতা পাবার জন্য সুন্নী স্কুলের প্রধান চারজনকে কাজী হিসাবে নিয়োগ করা। এরকম পরিবেশের মধ্যেই ইবনে তাইমিয়ার বেড়ে ওঠা। সেই সময় মামলুক শাসকদের অনেকেই নিজেরা যখন বিভিন্ন ইস্যুতে বিভক্ত হয়ে যেত, ধর্মীয় কর্তৃত্বও শাসকদের সাথে সাথে বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে যেত। আবার পরবর্তীতে দেখা যেত, অনেক শাসক ধর্মীয় স্কুলগুলোকে কখনো সহায়তা দিচ্ছে,আবার কখনো দমন করছে।

ইবনে তাইমিয়ার জন্ম ১২৬৩ সনের দিকে হারানে। এই সময় মোঙ্গলরা হারানে চরম আক্রমণ করলে তাঁর পিতাসহ তিনি দামেস্কে চলে আসেন। দামেস্কে এসে তিনি হাদিসের উপর এত জ্ঞান অর্জন করেন যে, সেসময় ইবনে তাইমিয়া যেটাকে সহীহ হাদীস বলতেন ঐটাই সহীহ হাদিস হিসেবে সবাই মানত; আর যেটাকে সহীহ বলতেন না সেটাকে সবাই বর্জন করত। এক পর্যায়ে তাইমিয়া হাম্বলী স্কুলের প্রধান কর্তৃত্ব হয়ে গেলেন। সে সময় একজন খ্রিষ্টান ব্যক্তি মুহম্মদ(স) কে অবমাননা করলো। এ ঘটনায় ইবনে তাইমিয়া ফতোয়া দিলেন যে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু সিরিয়ার যিনি গভর্নর ছিলেন তিনি এটা মেনে নিতে পারেন নাই। গভর্নর ইবনে তাইমিয়াকে তার মত পরিবর্তন করতে বলেন। কিন্তু ইবনে তাইমিয়া কিছুতেই তার মত থেকে সরেন নি। শেষে ঐ অবমাননাকারী খ্রিষ্টান ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন এবং গভর্নরের পরামর্শে তওবা করার কথাও বললেন। ইবনে তাইমিয়া এরপরও বলছেন যে তাকে মৃত্যুদণ্ডই দিতে হবে। এবার তিনি নতুন করে ফতোয়া দিলেন, খ্রিস্টান হোক মুসলিম হোক মহানবীকে যে অবমাননা করবে তার শাস্তি মৃত্যুদন্ড। এটা সে-সময় বিশাল বিতর্ক তৈরি করল।

সেকালের জগতখ্যাত গাজাল খান যখন দামেস্কে আবার আক্রমণ শুরু করল, তখন ইবনে তাইমিয়া নিজে গাজাল খানের সামনে গিয়ে বললেন, তাকে কাজের একটা ফিরিস্তি দিলেন। বললেন, তোমার এই এই কাজগুলো করা উচিত। গাজাল খান যে সব মুসলমান সম্প্রদায়কে অধীনে নিলেন তাদের মধ্যে মারদানি সম্প্রদায় নিয়ে তাইমিয়া একটা ফতোয়া দিলেন। তিনি দেখলেন ঐ সম্প্রদায়গুলোর মুসলমাদের অধীনে হলেও সেখানে ইসলাম মোতাবেক শাসন চলছে না। তিনি বললেন, ‘দারুল ইসলাম’ হলো যেখানে মুসলিমরা শরিয়া দ্বারা শাসন কায়েম রয়েছে। আর ‘দারুল কুফর’ হলো যেখানে অন্য ধর্মের লোক শাসক করছে। এবং ‘দারুল হরব’ হলো যেখানে মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্মের মধ্যে লড়াই চলছে। মারাদানী সম্প্রদায়ে যেহেতু সবাই মুসলিম এবং তারা ইসলামী শাসন অনুযাযী চলছে না, সেখানে ইবনে তাইমিয়া এটাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করলেন। তখন তিনি এর নাম দিলেন ‘দারুন আহাদ’। এসব ঘটনার কারণে তাইমিয়া তখন আলোচনায় চলে আসলেন।

সেসময়ে অন্যান্য যেসব স্কুল ছিল -- বিশেষ করে মালেকি ও শাফি -- এদের সঙ্গে আল্লাহর ধারনা নিয়ে ইবনে তাইমিয়ার তর্ক হচ্ছিল। এজন্য তাঁরা তাইমিয়ার উপর একটু ক্ষেপে যায়। আমরা জানি যে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি চার পাঁচবার কারাবরণ করেছেন। এর মধ্যে একজন মাত্র শাসক ছিলেন যার সাথে তাইমিয়ার সম্পর্ক ভাল ছিল। তার নাম, কাওয়ান। কারণ কাওয়ান যাকে সরিয়ে নিজে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তাইমিয়া তার পক্ষে ক্রসেড নিয়ে ফতোয়া দিয়েছিলেন । তিনি ১৩০৯ সালে যখন জেল থেকে বের হলেন, তখন কাওয়ান আবার ক্ষমতা নিল। তাইমিয়ার বিখ্যাত গ্রন্থ পলিটিকাল শরিয়াহ ঐ সময়ের লেখা।

মামলুকদের আগে সিরিয়া ও মিশরে প্রধান কাজী ছিলেন শাফি মাজহাবের ওলামারা। যখন মামলুকরা এসে চার স্কুল থেকে চারজন কাজী নির্ধারণ করলেন শাফি মাজহাবের একচ্ছত্র ক্ষমতা কিছুটা খর্ব হল। শাফিদের একটা অংশ ছিল আশআরী; আল্লাহর ও সত্তার ধারণা নিয়ে তখন তাদের মধ্যে একটা ধর্মতাত্ত্বিক (থিওলজিক্যাল) তর্ক হচ্ছিল। কোন সত্তার নিত্যবস্তু (substance) কি সত্তার নিজের অংশ নাকি অন্য কোন কিছুর কারণে তা নির্ধারিত হয়। নির্ধারক সত্তাটা কি সত্তার মধ্য থেকেই, নাকি বাইরে থেকে তৈরি হয়?

তো এই তর্কে ইবনে তাইমিয়া বললেন যে, কোরানে আল্লাহ নিজেকে যেভাবে হাজির করেছেন, সেভাবেই বিশ্বাস করতে হবে, অর্থাৎ Anthropomorphic যে বয়ান আছে আল্লাহ ঠিক তেমনই। এটা বলার পরে তাঁর সঙ্গে শাফি স্কুলের কাজীদের তর্ক শুরু হল। তখন তাঁরা কাজীর কাছে তাঁর নামে আপিল করল। আপিলে প্রথমবার তিনি বেঁচে গেলেও পরের বার দুই বছরের মত তাঁর জেল হয়। এরপরে বার বার তিনি যখনই তাঁর বয়ান দিতে লাগলেন, সুন্নী আলেম-ওলেমা ও সুফিরা তাঁর উপর চটে গেলেন। আবার কাজী ডাকলেন; ডেকে বললেন আপনি বলেন যে, আপনি যে বয়ান দিচ্ছেন এটা আপনার নিজের না, এটা হাম্বলী মাজহাবের একটা চিন্তা। এতে আপনি শাস্তি থেকে মুক্তি পাবেন। কিন্তু তিনি তাদের প্রস্তাব খারিজ করে দেন এবং তাকে আবার কারারুদ্ধ করা হয়।

এরপর আসি ‘দ্যা মিনিং অফ সেকরেড ল’ সম্পর্কে যেটাকে আমরা আসমানী আইন বলি। ইবনে তাইমিয়া একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন, ‘আসমানি আইন অনুযায়ী শাসন ব্যবাস্থা’ (গভর্ন্যান্স একর্ডিং টু দ্যা সেকরেড ল। তিনি যখন এটা লিখছেন তার আগে একজন শাফি বিচারক ছিলেন যিনি তাইমিয়াকে অভিযুক্ত করেছেন উমাইয়া নামক একটা মতবাদের জন্য। তখন তাইমিয়া ফতোয়া দিলেন, বিচারকের কাজ হচ্ছে কারো মধ্যে যদি মতবিরোধ থাকে এটার নিষ্পত্তি করা। কোন ধর্মীয় মতবাদ নিয়ে আলোচনা করা একজন বিচারকের কাজ না।

এই বইটাতে তিনি আসমানী আইনকে তিনটা ভাগে ভাগ করেছেন। ১. স্বপ্রকাশিত বা প্রদত্ত আইন (revealed law): যেগুলো সুস্পষ্ট এবং কোন খুঁত নাই। ২. কোরান হাদিসের আলোকে বাস্তব সমস্যার ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে তৈয়ারি আইন (interpreted law): সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন নতুন সমস্যা আমাদের সামনে দেখা যায়, কোরানে যেগুলো নিয়ে সরাসরি কোন নির্দেশনা নাই, তখন বিচারক নিজের চিন্তা ভাবনা অনুযায়ী একটা রায় দেন কোরান-হাদীসের উপর ভিত্তি করে, এটাই হল ব্যাখ্যাজাত আইন। এটা মানাও ফরজ না, আবার ছেড়ে দেয়াও যাবে না। ৩. বিকৃত আইন (perverted law): বিচারক শরিয়াতে যা আছে তার একটা ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, এটা হল বিচ্যুত আইন। তাইমিয়ার ছাত্র ইবনে কাইয়ুম আল জাওজিয়াও পরবর্তীতে পবিত্র আসমানি আইন বলতে এই তিনটা জিনিসকেই ব্যাখ্যা করেছেন।

এখন গভর্নমেন্টের সাথে এই ‘সেকরেড ল’র সম্পর্ক কি? তাইমিয়া বললেন, গভর্নমেন্টের একটাই কাজ সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ। তিনি আরো বললেন, ধর্মীয় কাজের মধ্যে সবচেয়ে মহৎ কাজ হচ্ছে শাসন ব্যবাস্থা পরিচালনা বা সরকার চালানো। তিনি বললেন, সুশাসন ছাড়া ধর্মের কোন মূল্য নাই। এরপরে কাজী কে? কাজী হচ্ছে যিনি মানুষের মধ্যে বিরোধ মীমাংসা করবেন। ১২০০ সনের দিকে মালিকি মাজহাবের একজন বিখ্যাত বিচারক ছিলেন আল কারাফী। তিনি কাজী হবার কিছু শর্ত দিয়েছেন। তিনি বললেন, কাজী যে কেউ হতে পারেন। এমনকি সুলতানও কাজী হতে পারেন, উজীর মন্ত্রীরাও কাজী হতে পারেন, আর্মি অফিসার-ট্যাক্স অফিসার সবাই কাজী হতে পারেন। আরেকজন হাম্বলী স্কলার, ইবনে আকিল, তিনি বললেন, শাসন পরিচালনার রূপ রাসুলের (স) সময় যে রূপে দেখা গিয়েছিল এখন সেই রূপ আর নাই। তাহলে শাসন পরিচালনার অর্থ ডিভাইন আস্মানি নির্দেশে যেভাবে রসুলের আমলে হয়েছে সেভাবেই হতে হবে এটা ঠিক না। সরকার চালানোর সময় নতুন নতুন বিষয় হাজির হবে তখন নিজেদের মত করে রায় প্রদান করা যাবে। তাইমিয়া মনে করেন, শাসন করা ও সরকার পরিচালনার আগে আমাদের সবসময়ই কোরান হাদিসের ( ‘সেকরেড ল’ ) মাথায় রাখতে হবে। তাঁর মতে পবিত্র আসমানি আইন একটা নিখুঁত এবং স্বাধীন ব্যবস্থা। সে আইনের সবকিছু কোরানে একদম স্পষ্ট বলে দেওয়া আছে, এরপরে রাসুলের (স) সুন্নাহকে তাইমিয়া আরেকটু বৃহৎ পরিসরে ব্যাখ্যা রাসুল যা বলেছেন, করেছেন এমনকি রাসুলের সামনে যা কিছু করা হয়েছে, তিনি যা নিষেধ করেন নাই – সব সুন্নাহর অধীন। আমরা যাকে ‘ইজমায়ে উম্মত’ বলি, তাইমিয়া সেটা রাসুল পরবর্তী তিনটা প্রজন্মের মানুষকে বুঝিয়েছেন। তিনি ইজমায়ের উম্মত বলতে প্রথম তিন যুগের পরের কাউকে মেনে নিতে নারাজ ছিলেন।

এরপর তিনি সালতানাতের প্রধান উদ্দেশ্য নিয়ে বলেছেন। তিনি বলছেন, সালতানাতের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে জনগণের কল্যাণ সাধন বা গণকল্যাণ। ইসলামের বিজয়ের জন্য মানুষের পার্থিব জগতের উন্নয়ন করতে হবে। এরপর তিনি গুরুত্বপুর্ণ কিছু কথা বলেছেন। তিনি বলছেন, ধর্ম ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। যখন ধর্ম ক্ষমতা থেকে আলাদা হয়ে যায় তখন ধর্ম এবং ক্ষমতা দুটোর নীতিভ্রষ্ট হয়ে যায়। ইসলামের সবচেয়ে মহৎ কাজ হচ্ছে হচ্ছে গণশক্তির চর্চা করা। যেন ধর্ম চর্চা একই সঙ্গে জনগণের ক্ষমতাচর্চার সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন হয়ে বিকশিত হতে পারে। কিম্বা উলটা দিক থেকে ক্ষমতা চর্চা একই সঙ্গে ধর্ম চর্চার অঙ্গীভূত হতে হবে।

এরপর ইবনে তাইমিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতরণ করেন। তিনি মত দেন যে, ইসলামে কোনো আগাম নির্ধারণ করে রাখা রাজনীতির ছক বা শাসন পরিচালনার প্রকরণ নাই। অর্থাৎ শাসন ব্যবস্থার কোন একটি বিশেষ রূপকে ইসলামি শাসন ব্যবস্থার শ্বাশ্বত বা আদর্শ রূপ বলতে পারি না।কিন্তু অবশ্যই কিছু কিছু ইসলামি নীতি আছে শাসনের ধরণ যাই হোক, সেই নীতি আমাদের অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলে প্রশ্নটা হল নীতির; সেই নীতির আলোকে রাজনীতি বা শাসন ব্যবস্থার কী রূপ নিল সেটা না। যখন খিলাফত ভেঙ্গে পড়েছে, সালতানাত এসেছে, মামলুকরা শাসন করছে, ফলে খিলাফত বা সালতানাত নির্ভর আলোচনা তিনি তাইমিয়া করছেন না। তিনি বলছেন যে, রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ফর্মুলা আসলে ইসলাম নয়। বরং যে কোনো সরকার ইসলামের মূলনীতি মেনে চললেই তা ইসলামি হবে।

তিনি সুলতানের চারটা দায়িত্বের কথা বলেছেন। এক. যারা ইসলামের মূলনীতিগুলো পালন করবে না তাদেরকে সুলতান শাস্তি দিবেন, প্রয়োজনে মৃত্যুদন্ডও দিবেন। শাসককে ইসলামের ধারক ও বাহক হতে হবে। দুই. শাসকের কাজ হচ্ছে যুদ্ধ পরিচালনা। তিনি যুদ্ধকে মোটা দাগে তিনটা ভাগে বিভক্ত করেছেন। একটা হচ্ছে কুফরী ধারণার সাথে লড়াই করা, দ্বিতীয় হচ্ছে ধর্মদ্রোহীদের বিরুদ্ধে, আর তৃতীয় হচ্ছে যারা ডাকাত ছিনতাইকারী এদের বিরুদ্ধে। তিনি বলেছেন, সুলতানের উপর যখন অমুসলিম শাসক আক্রমণ করবে, তখন জনগণ সুলতানকে সাহায্য করবে। কিন্তু যখন এক মুসলিম শাসক আরেক মুসলিম শাসককে আক্রমণ করেব তখন জনগণ কার পক্ষে থাকবে? – এটা অবশ্য তিনি বলেন নাই।

এরপর তিনি বলছেন শাসক ব্যবসায়ীদের উপর চারটা ক্ষেত্রে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। যখন মজুদদার মাল মজুদ করে রাখবে। তারপর র্থনীতিতে যেন কারো একচেটিয়া গড়ে না ওঠে শাসক সে ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবেন। আরেকটা হচ্ছে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে এমন কোন লেনদেন যদি যা সার্বিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর শাসক সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন। তিনি তিনটা গ্রুপের কথা বলেছেন যারা ধর্মের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। ১. যারা শরিয়ার বিধিবিধান জানে কিন্তু এগুলো পূরণ করে না; ২. জনগণের প্রতি সদয় এবং আন্তরিক কিন্তু শরিয়ার বিষয়গুলো জানে না। ৩. সবকিছু জানে কিন্তু ক্ষমতায় গেলে সেটা পূরণ করতে না পারার ভয়ে গণক্ষমতা পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চাইছে না।

বাবের জোহানসেন এখানে প্রশ্ন তুলেছেন। তাইমিয়ার শাসন ব্যবস্থা বয়ান কতোটা ন্যায্য তার বিচার আমরা কিভাবে করব? তাইমিয়া যে সরকার ব্যবস্থার কথা বলেছেন আমাদের সময়ে এসে আমরা তাকে কিভাবে দেখব? তাঁর ‘সেকরেড ল’ নিয়ে কিভাবে ভাবব?

বাবের জোহানসেনের আলোচনা প্রসঙ্গে চিন্তার পাঠচক্রের পর্যালোচনাঃ

তাইমিয়াকে নিয়ে লম্বা সময় পর্যন্ত একটা কমন ধারণা ছিল। একটা সাধারণ ব্যাখ্যা ছিল। এ ব্যাখ্যাগুলো নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, নতুন নতুন গবেষণা হচ্ছে। তাইমিয়া সম্পর্কে বিশেষ কিছু ধারণা প্রচলিত আছে। যেমন একটা হচ্ছে এনথ্রোপোমরফিক ইন্টারপ্রিটেশন, যেটা একটা বিশেষ ঘটনায় একজন তাঁকে আল্লাহর অস্তিত্ব বা তিনি কিভাবে আছেন সে সম্পর্কে শুক্রবারের একটা জামাতে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন আমি যেমন এরকম দাঁড়িয়ে আছি আল্লাহ আরশে এরকমই আছেন। আসলে আল্লাহ সম্পর্কে তাইমিয়ার এটাই একমাত্র ধারণা না। এই কথা বলে তিনি আল্লাহ সম্পর্কে ধারণাকে মানবিক রূপকল্পনায় (anthropomorphic) জায়গায় নিয়ে আসছেন ব্যাপারটা তাও না। ইসলামের প্রস্তাবনার মধ্যে তাওহীদের ধারণাটা কি? কোনটা শিরক আরও কোনটা শিরক না—তা তাইমিয়ার না বুঝার কারণ ছিল না। এ বিষয়গুলো তিনি জানতেন এবং অন্য জায়গায় এ বিষয়গুলো আলোচনা করেছেন। তবুও এটা বললেন কেন তা নিয়ে অনেক আলোচনা আছে।

আমরা যে আলোচনাটা তার একটা ওইতিহাসিক পর্যালোচনা দরকার। তর্কগুলো কোন সময়কার তাও জানা দরকার। রাজনৈতিক চিন্তা আর আইনী চিন্তা মোটাদাগে এ দুটোকে মিলিয়েই ইসলামের শরিয়া। শরিয়া নিছকই আইন না আবার নিছকই রাজনৈতিক চিন্তা না। ইসলামী আইনের ভাবনা বা দর্শন তাইমিয়ার সময়কালে এসে নতুন করে কি ধরণের আলোচনা অথবা নতুন বাঁক নিয়েছে, তা জানা খুবই গুরুত্বপুর্ণ। সেক্ষত্রে তাইমিয়ার ভূমিকা-ই প্রধান ।

তাইমিয়ার পরে আসা ইসলামী আলেম ওলামাদের মধ্যে তাঁর প্রভাব কোন না কোনভাবে ছিল। আধুনিককালে যারা তাইমিয়ার ব্যাখ্যা করেছেন তারা মোটা দাগে দুইটা ভাগে বিভক্ত। একটা হল ট্র্যাডিশানালি যারা দেখাতে চেয়েছেন যে তাইমিয়া আসলে খিলাফত ধারণাটা বাতিল করে নতুন ধারণা নির্মানের চেষ্টা করেছেন। আরেকটা ধারণা আছে যে তাইমিয়ার চিন্তাটা অনেক বেশি ট্রাডিশনালিস্ট এবং এটা অনেক বেশি হামবলী চিন্তার মধ্যে পড়ে। এরকম অনেকগুলো বয়ান আছে। এ বয়ানগুলো সম্পর্কে শক্ত পর্যালোচনা যে কয়েকজন করেছেন তাঁর মধ্যে আইরা লেপিডাস এবং গিবসন-- এই দুইজন অন্যতম। এর পরবর্তীতে রয়েছেন ওবামির আনজুম।

আমরা ওবামির আনজুমের থিসিসটা নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করব। আসলে প্রাথমিক আলোচনাগুলো না করলে পরবর্তীতে যে তর্কগুলো রয়েছে সেগুলো বোঝা অনেক সময় কঠিন হয়ে যায়। আনজুম বেসিকালি একটা নতুন ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। আনজুমের কাছে তাইমিয়া হল এমন একটা মুহূর্ত যে মুহূর্তে ইসলামের রাজনৈতিক চিন্তার অনেকগুলো নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হয়েছে; পরবর্তীতে ইসলামী রাজনৈতিক চিন্তার মধ্যে এর গভীর ও ব্যাপকতর প্রভাব পড়েছে।

জোহানসেন এবং অন্য যারা পাশ্চাত্যের প[অণ্ডিতরা রয়েছেন আছেন ইসলামের রাজনৈতিক ইতিহাস ব্যাখ্যা করে একটা পর্যায়ে গিয়ে দেখান যে, ইসলামী রাজনীতি আভ্যন্তরীন দিক থেকে এক ধরণের সেকুলেরাইজেশানের মধু দিয়ে গিয়েছে। যাকে তাঁরা ইনার সেকুলারাইজেশন (inner secularization) বলেছেন। তবে তারা যখন ‘ইনার সেকুলারাইজেশনের’ কথা বলেন, তখন দেখান যে উলেমা শ্রেণির সাথে রাষ্ট্রের একটা পরিষ্কার তফাৎ ছিল; এবং এ দুইয়ের এখতিয়ারের জায়গাটাও আলাদা ছিল। কিন্তু তারা যে সংজ্ঞা ও অনুমানের উপর নির্ভর করে তা দেখান,সেটা পাশ্চাত্য অনুমান দ্বারা অনেক বেশি প্রভাবিত। এ অনুমানটা খুব বেশি শক্তিশালী না। পাশ্চাত্যের পণ্ডিতরা পরবর্তীতে আবার দেখাতে চান যে, তাইমিয়ারা এসে এ সেকুলারাইজেশনের পালটা আরেকটি আন্দোলন তৈরির চেষ্টা করেছেন। এগুলো হল মৌলিক বিতর্কের জায়গা, যেগুলো নিয়ে আমরা পরে কথা বলব।

আরেকটা বিতর্ক হল খিলাফত বনাম খেলাফতের পরের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে তর্ক। এর আগে পর্যন্ত ব্যাখ্যা দেয়া হত যে খিলাফতের ধারণাটাই হল ইসলামের সর্বশেষ গৃহীত রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা সরকারের ধারণা। এ কারণে পরবর্তীতে অনেকে এসে আবার খিলাফত ধারণাতেই ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। এক্ষেত্রে বলা হয় যে, তাইমিয়া ছিল ব্যতিক্রম। তিনি আর খিলাফতের ধারণাকে গুরুত্বপুর্ণ মনে করেন নাই।

খিলাফতের ক্ষেত্রে খুব গুরত্বপুর্ণ একটা তর্ক আছে। খিলাফতের দুটো ধারণা রয়েছে। একটা হল উমাইয়া পর্যন্ত যারা ছিলেন তদের ওপর আরব জাতিগত বৈশিষ্ট্যের (এথনিসিটির) অনেক বেশি প্রভাব ছিল, এবং কুরাইশ ধারণাটা অনেক প্রবল ছিল। তারপর আব্বাসীয়রা যখন আসছেন তখন তারা আরব গোত্রীয় কর্তৃত্বের যে বয়ান ছিল, সেখান থেকে বের হয়ে আসেন। কিন্তু তারপরও তারা এটা মোটা দাগে আরব বলয়ের মধ্যেই ছিলেন। তারপরও খিলাফতের দুটো ব্যাখ্যা আছে। একটা হল খলিফা কার? আল্লাহর খলিফা নাকি নবীর খলিফা? খলিফাতুল্লাহ না খলিফাতুল রসুল? শাসক যদি আল্লাহর খলিফা হন তাহলে তাঁর কর্তৃত্বে সঙ্গে ঐশ্বরিক বা আল্লার কর্তৃত্বের একটা অব্যবহিত সম্পর্কের প্রস্তাব করা হয়। আর যদি বলা হয় এটা নবীর তাহলে কর্তৃত্বের ন্যায্যতা ঐতিহাসিক, এবং প্রতিনিধিত্বমূলক।

আব্বাসীয়রা ব্যাখ্যা করেছেন যে, নবী এসেছেন নবুয়তের চুড়ান্ত ও শেষ হিসেবে। কিন্তু শাসন বা রাজনৈতিক ক্ষমতার সূচনা হল নবীর মৃত্যুর পর থেকে। ফলে নবীর সময়কালটা এবং তাঁর পরের সময়কালটাকে তারা দুই ভাগ করেছেন। এ দুই ভাগ নিয়ে একটা লম্বা তর্ক আছে; এবং এর উপর ভিত্তি করে ইসলামের রাজনৈতিক বয়ান দুটো ধারায় ভাগ হয়ে পড়ে। এরপরের ঘটনা হল, আব্বাসিয় শাসনকালটা যখন ভেঙ্গে পড়ে তখন খিলাফত ধারণাটাও ভেঙ্গে পড়ে। এই ভেঙ্গে পড়ার কালপর্বকে ইউরোপিয় পণ্ডিতরা ক্ষমতার বৈধতা নির্ণয়ের তর্ক বা ‘লেজিটেমেসির’ প্রশ্ন আকারে পাঠ করেন। নবীর সময়টাকে তারা বলেন যে, এটা ঐশ্বরিক বা আল্লার তরফ থেকেই বৈধ। লেজিটিমেট। তারপর রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈধতাকে ঐতিহাসিক ভাবে নির্ণয়ের তর্ক তাঁরা বুভিন্ন সূত্রের উল্লেখ করে ব্যাখ্যা করেন। এ তর্কগুলো আমাদের জন্য বোঝা গুরুত্বপুর্ণ।

খিলাফত যখন ভেঙ্গে গেল তখন নতুন ধরণের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা সালতানাত তৈরি হল এবং একটা নতুন সম্প্রদায় ক্ষমতায় আসল। মামলুকরা ককেশিয়ান জায়গা থেকে এসেছে; যুদ্ধই তাদের পেশা; সৈন্য হিসাবে সমরবিদ্যাই তাদের শক্তিচর্চার প্রধান ক্ষেত্র। আব্বাসীয় শাসন ভেঙ্গে পড়ার পর বিভিন্ন জায়গায় যে সকল সামরিক গভর্নর ছিল, তারা একত্রিত হয়ে ক্ষমতা দখল করে। ক্ষমতার বৈধতার জন্য একটা ব্যখ্যা একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়। যেহেতু তারা আরব না ফলে তারা নিজেদেরকে মুসলিম শাসক হিসাবে কিভাবে বৈধ দাবি করলেন? খিলাফত ধারণার বাইরে এসে যে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা করলেন, সে বয়ানটা কি? এ তর্কগুলো মাথায় রেখে পড়লে মনে হয়, ইবনে তাইমিয়া ও তাঁর অনুসারীরা বোধ হয় এই দুইটা প্রশ্নকে সামনে রেখেই তাঁদের বয়ানটা দাঁড় করাচ্ছিলেন। এটা একটা ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা অবশ্যই হতে পারে। আমরা যখন কোন পাশ্চাত্য পণ্ডিতের লেখা পড়ি তখন আমরা যে ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে কোন একটি বিষয় নিয়ে তর্ক চলছে সেই পরিস্থিতিকে আমলে নিয়ে তর্কগুলো পড়ি। তার সাথে ঐতিহাসিক ঘটনাঘটনের সম্পর্ক কি ছিল সেটা দেখি। ঐ সময়ের বাস্তবতাটা অতএব বোঝা জরুরী হয়ে পড়ে। ঐ তর্কে চিন্তা বা দার্শনিক তর্ক বিতর্কের যে ওইতিহ্য বা ধারা বজায় ছিল সেটা বোঝাটাও জরুরী। আমরা যখন যখন হবস পড়ি, আমরা মনে রাখি সে সময় একটা সিভিল ওয়ার হচ্ছিল, এনার্কি হচ্ছিল; তার মধ্যেই সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণা গড়ে উঠছে। কিন্তু হবসের রাজনৈতিক দর্শনটা এখানেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায় না। তারপরও রাজনৈতিক চিন্তার সিলসিলার মধ্যে সেটা গুরুত্বপুর্ণ রাজনৈতিক দার্শনিক প্রস্তাবনা। ইসলামী চিন্তার ধারার মধ্যে সেই কাজটা একইভাবে করতে হবে।

তিনটি বিষয় তাহলে গুরুত্বপূর্ণ। এক. যে বিষয় নিয়ে তর্ক বিতর্ক যে বিশেষ ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে সেই তর্ক চলছে তার খোঁখবর করা; দুই. চিন্তার নিজের বিবর্তনে তর্কবিতর্কে ভাষা ব্যবহার ও পরিভাষা তৈরির নিজস্ব ঐতিহ্য আছে এবং তিন. রাজনীতি, শাসন ব্যবস্থা কিম্বা ক্ষমতার বৈধতা বা চর্চার ধরণ সম্পর্কে ধারণা। এ চিন্তাগুলোর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি কি? এই তিনটা বিষয়কে নজরে রেখে যদি আমরা পড়ি তাহলে জোহানসেনের লেখায় দেখব যে, পাশ্চাত্য পণ্ডিতরা প্রথমটি নিয়ে আলোচনা করেন, দ্বিতীয়টি কিছুটা করে থাকে, কিন্তু বাকিটার বা তৃতীয় বিষয় নিয়ে প্রশ্নের কোন উত্তর দেন না। অথচ ইসলামী চিন্তার আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব ও তর্ক বিতর্কগুও কি তাদের মীমাংসার নিয়ম বা প্রকরণ কি সেই ভেতরের বিতর্ক সম্পর্কে যথেষ্ট হদিস নেওয়া হয় না। এসব বিতর্ক কি ধরণের ভূমিকা পালন করে, তা আমাদের বোঝা দরকার।

তাইমিয়ার ‘রাজনৈতিক শরিয়াহ’ কথাটা ইসলামি চিন্তার আভ্যন্তরীন বিবর্তনের দিক থেকে একটা নতুন ঘটনা। শরিয়াহ এবং সিয়াসাহকে একপদবদ্ধ করা, এটাকে একটা ধারণা হিসাবে আলোচনা করাটাকে ইসলামী চিন্তার মধ্যে নতুন ধরণের মোড় হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু ঐ সময়ে রেশনালিস্টদের বিপক্ষে তাইমিয়ার আরেকটা বিরোধের জায়গা ছিল। আমরা ধরে নিচ্ছি যে, সে আলোচনাগুলো কম বেশি মাজহাবের মধ্যে মীমাংসিত হয়ে গেছে। তাইমিয়া বলছেন যে, আলোচনার পদ্ধতি মাজহাব কেদ্রিক হবে না। বরং আমাদেরকে বুঝতে হবে প্রথমত কোরান, হাদীস এবং সুন্নাহ। সুন্নাহ মানে যা নবী করেছেন, সাহাবারা করেছেন, তাবেঈনরা করেছেন, এবং তারপরে তাবেতাবেঈনরা করেছেন। অর্থাৎ ইসলামের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে উনি একটা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বা ঐতিহ্যের পরম্পরাকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন। ঐতিহ্যের অনুগত চর্চাকে বিশেষ ভাবে মূল্যায়ন করতে চেয়েছেন।

এরপরে আছে পবিত্র আসমানি আইন বা সেকরেড ল এর ধারণা। প্র্যাকটিকাল জায়গা থেকে শরিয়ার তিনি তিনটা ক্যাটাগরি করেছেন। শরিয়া বলতে সাধারণ অর্থে যা বোঝা হয় তা আসলে তিন রকম। এ বিষয়ে আমরা ওপরে বলেছি। একটা হল রিভিল্ড, যা মানতে হবেই। এরপরে বড় অংশটা হল স্কলারলি ইন্টারপ্রিটিশন বেইজড অন উসুল। তিনি বলছেন, এটা হল ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যাটা পালনের ক্ষেত্রে কেউ যদি মানতে চায় মানবে; কিন্তু এটাকে কোনভাবে বাধ্য করা যাবে না। আরেকটা হল পার্ভাট। সাধারণ অর্থে এই তিনটাকে নিয়েই শরিয়ার একটা সাধারণ ধারণা কাজ করে। তার জায়গা থেকে প্রথম দুইটাকে গ্রহণ করা যায় বাকিটাকে যায় না। ফলে কেউ যেন আবার মনে না করে পার্ভাট ল’ কেও তিনি সেকরেড ল বলছেন।

আলোচনা শুরু করেছি মাকাসিদ থেকে। আইন বা রাজনীতির ইচ্ছা বা মাকসুদটা কি এটাই মাকাসিদের বিষয়। তাইমিয়া আলোচনা করেছেন একজন শাসক ইসলামের এই নীতির জায়গাগুলো মানবেন। তিনি অন্যদেরকে কিভাবে নিয়োগ দেবেন এবং অন্যদের ক্ষমতার চর্চার ধরণটা কি হবে, সেটা তিনি ঠিক করে দেবান। কিন্তু খোদ যিনি শাসক বা সরকার তাঁর নিয়োগ কিভাবে হবে কিম্বা কে তা নির্ধারণ করবে এই কঠিন প্রশ্নের তিনি কোন স্পষ্ট আলোচনা করেন নি। শাসন পরিচালনা সম্পর্কে আলোচনা আছে কিন্তু শাসন ব্যবস্থার রূপ কেমন হবে এবং এটা কিভাবে গঠিত হবে (ডিসাইডেড) হবে সেটা তাঁর আলোচনায় নাই। আধুনিক রাজনীতির জন্য গুরুত্বপুর্ণ প্রশ্ন হল সরকার কিভাবে নির্ধারিত হয়। ফলে জন পরিসর বা পাবলিক স্ফেয়ারটা কিভাবে গঠিত হয়, তার মানদণ্ড কি হবে, এবং কে সিদ্ধান্ত নেবে, তাইমিয়ার মধ্যে আমরা এ প্রশ্নটার সুরাহা পাচ্ছি না। যদিও আনজুমের দাবি হল এর একটা গাইডেন্স পাওয়া যায়।

বইপত্রের হদিস

Anjum, O. (2012). Politics, Law, And Community in Islamic Thought: The Taymiyyan Moment. Cambridge: Cambridge University Press.

Asad, T. (2003). Formations of the secular: Christianity, Islam, Modernity. California: Stanford University Press.

Auda, J. (2007). Maqasid Al-Shariah As Philosophy of Islamic Law: A Systems Approach. London: The International Institute of Islamic Thought.

B.Hallaq, W. (2013). The Impossible State. New York: Columbia University Press.

Johansen, B. (2008). In W. H. Peri Berman, The Law Applied: Contextualizing the Islamic Shariah (pp. 259 - 295). New York: I.B.Tauris & Co Ltd.

Johansen, B. (1999). Contingency in a Sacred Law: Legal and Ethical Norms in the Muslim Fiqh. Boston: Brill.

Johansen, B. (1988). The Islamic Law on Land Tax & Rent: The Peasants' Loss of Property Rights as Interpreted in the Hanafite Legal Literature of. New York: Croom Helm.

Kmali, M. H. (2008). Shariah Law: An Introduction. Oxford: One World.

Taymiyyah, I. (2006). The Political Shariyah. London: Dar ul Fiqh.

 

 

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : শরিয়াহ, শরিয়া, চিন্তা পাঠচক্র, ইসলাম, তাইমিয়া, আসাদ

View: 1852 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD