সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরহাদ মজহার


Friday 20 November 15

print

‘We don’t do body counting’ - Gen. Tommy R. Franks, US Army

চিন্তার আলস্য এমন এক স্বোপার্জিত অসুখ যা সারিয়ে তোলা মুশকিল। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হচ্ছে তেমনি স্বেচ্ছায় চিন্তা করতে অক্ষম হবার সাধনা: যখন কোন ঘটনা বা বিষয় নিয়ে আমরা আর চিন্তা করতে চাই না। অলস হয়ে যাই। তখন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে আমরা আমাদের চিন্তার অক্ষমতা ঢাকতে চেষ্টা করি।

যেমন, আইসিস। আইসিস নিয়ে বাংলাদেশে যা কিছু পড়েছি তার সারকথা দুটা:

এক. আইসিস হচ্ছে সিআইএ আর মোসাদের ষড়যন্ত্র বা মার্কিন ও ইসরায়েলি কাণ্ড, তাদেরই সৃষ্টি। বাকি ব্যাখা সহজ। সিআইএ ও মোসাদ কোথায় কিভাবে ষড়যন্ত্র করেছে তার প্রমাণ দাখিল করা আর দেখানো যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতা ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইসিস নেতার সাক্ষাৎকারের ছবি। তালেবানদের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও আমরা একই প্রকার আলস্যের চর্চা দেখেছি।

দুই. আইসিস একটি ইসলামি সন্ত্রাসী দল। ধর্ম সেকুলারদের কাছে খুবই খারাপ জিনিস, আর ইসলাম হলে অবশ্য আরও খারাপ। আইসিস প্রমাণ করে ইসলাম কতো খারাপ ধর্ম। এই ধর্মের কারণেই আইসিস ধরনের সংগঠন গড়ে ওঠে ও নিরীহ মানুষকে নির্বিচারের গুলি করে বোমা মেরে কিম্বা আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়ে হত্যা করে।

তো মোটামুটি এই হচ্ছে আইসিস এবং মধ্য প্রাচ্যের ঘটনাবলী সম্পর্কে আমাদের চিন্তার দৌড়। ষড়যন্ত্র তত্ত্বের সুবিধা হচ্ছে নিজেদের এই বলে সান্ত্বনা দেবার ক্ষেত্র তৈরি করা যে এখন আর আমাদের কিছুই করণীয় নাই। সিআইএ আর মোসাদ এতোই শক্তিমান ও দানবীয় যে এদের ‘ষড়যন্ত্র’ ঠেকিয়ে দেবার মতো হিম্মত বা কেরামতি আমরা অর্জন করিনি। অতএব আমরা এখন গুরুগম্ভীর সবজান্তা ভাব নিয়ে ঘরে বসে থাকি। সিএনএন আর আল জাজিরা দেখে ষড়যন্ত্রের কী ফল দাঁড়ায় তা আরামে অবলোকন করি। ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বামপন্থিদের বিশেষ আনন্দ। একসময় দেখতাম তারা নির্বিকার ভাবে সাম্রাজ্যবাদকে ষড়যন্ত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করছে। ওয়াশিংটনে, ব্রাসেলসে, লণ্ডনে বসে একদল ষড়যন্ত্রকারী গোপনে শলাপরামর্শ করে দুনিয়াব্যাপী শোষণ লুন্ঠন চালিয়ে যাচ্ছে। এটাই সাম্রাজ্যবাদ।

ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আমাদের বিস্তর পরিশ্রম থেকে বাঁচিয়ে দেয়। কি ধরণের পরিশ্রম থেকে আমাদের অব্যাহতি দেয় তার একটা তালিকা তৈরি করা যাক। তালিকার বানাবার সুবিধা হচ্ছে চিন্তার আলস্য কাটিয়ে তুলতে হলে কোন্‌ কোন্‌ বিষয় নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে সে ব্যাপারেও একটা দিক নির্দেশনা আমরা পেয়ে যাবো।

এক. চিন্তার আলস্যের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের জনগণের ইতিহাস, বিশেষত তাদের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, সংকল্প, প্রতিজ্ঞা ইত্যাদি সম্পর্কে আর জানবার প্রয়োজন পড়ে না। তাদের চাওয়া বা প্রত্যাশা ন্যায্য কিনা সেটা বিচার করে বোঝারও দরকার পড়ে না। বুঝতে হয় না পাশ্চাত্যের যে সকল দেশ গণতন্ত্র বলতে মুখে ফেনা তুলতে থাকে তারা চরম নিপীড়মূলক রাজতন্ত্র কিম্বা সামরিক সরকারকে সে দেশের জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে টিকিয়ে রাখে কেন? দমন পীড়নের পরিণতি কী দাঁড়ায় তার দায় কাদের সেই সকল দিক জানার কিম্বা বোঝার আর কোন দরকার পড়ে না।

দুই. জ্বালানি বা দাহ্য পদার্থের অর্থনীতি সম্পর্কেও আমাদের সাড়ে ষোল আনা অজ্ঞ থাকলে চলে। অথচ যার বিচার ছাড়া বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার কিছুই বোঝা যায় না। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে বিশ্ব রাজনীতি ব্যাখ্যা করলে আমাদের এতোসব ঝামেলার দরকার পড়ে না। কোন্‌ বহুজাতিক কোম্পানি কোথায় কিভাবে তেল, গ্যাস বা খনিজ পদার্থ আহরন করছে, কোন দেশের ভেতর দিয়ে কিভাবে তেলের পাইপ নিয়ে যাচ্ছে, কোথায় কিভাবে তেল পরিশোধিত হচ্ছে এবং সর্বোপরী তেলের আন্তর্জাতিক বাজার দর কে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে, ইত্যাদি জানবার ধৈর্য কার আছে? ফলে চিন্তার আলস্যই জিন্দাবাদ।

তিন. মত প্রকাশের স্বাধীনতা বা তথাকথিত গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও মাথা ঘামাবার প্রয়োজন পড়ে না। নিপীড়িত ও নির্যাতীত মানুষ যখন তাদের ক্ষোভ বিক্ষোভ পৃথিবীর মানুষকে জানাবার সকল সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় এবং ক্রমাগত তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি কারো কোন মনোযোগ বা নজর গণমাধ্যম সম্পূর্ণ অদৃশ্য করে দেয় তখন কেন দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নিপীড়িত ও নির্যাতীত মানুষ ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করতে বাধ্য হয় সেই ব্যাপারেও কিছু জানতে হয় না। ষড়যন্ত্র দিয়ে রাজনীতি ব্যাখ্যা করলে এই সবের সম্ভাব্য পরিণতি ও কুফল বিশ্লেষণ করবারও কোন প্রয়োজন পড়ে না।

চার. যুদ্ধের কৃৎকৌশল ও যুদ্ধ বিদ্যার ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন এবং যুদ্ধে সাধারণ ও নিরীহ মানুষকে হত্যা আন্তর্জাতিক ভাবে গ্রহণযোগ্য হবার বাস্তবতার পরিণতিও ব্যখ্যা-বিশ্লেষণ করবারও কোন প্রয়োজন পড়ে না। যুদ্ধে নিরীহ, শান্তিপ্রিয় ও সাধারণ মানুষ হত্যা ন্যায্য করবার আধুনিক পরিভাষা হচ্ছে ‘কোলেটারাল ডেমেজ’। এই খুনলিপ্সু আধুনিক পরিভাষাটির বাংলা অনুবাদ করা কঠিন। তবে এর মানে হোল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্তযুদ্ধে বিমান বা ড্রোন হামলায় সাধারন মানুষ মারা যাবে। এটা একটা স্বাভাবিক অপচয়, স্বাভাবিক ক্ষতি। এই ক্ষতি আমাদের মেনে নিতে হবে। এটা কোলেটারাল হত্যা। পাশাপাশি ঘটে। যাকে মারতে চাওয়া হয়েছে সে একজন হলেও তার সঙ্গে যদি আরও একশজন নারী পুরুষ নিরীহ মানুষ খুন হয় তাহলে তাতে কোন দোষ নাই। এটাই যুদ্ধ। এটাই যুদ্ধের নিয়ম।

যদি তাই হয় তাহলে পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করছে তাদের হাতে সাধারণ মানুষ নিহত হলে তাকে আমরা কিভাবে বিচার করব? কোলেটারাল ডেমেজ হিসাবে? নিজের বেলায় যুদ্ধের অনিবার্য ক্ষতি, আর অন্যের বেলায় সেটা ‘সন্ত্রাস’। এই ডবল স্টান্ডার্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সহজ কাজ নয়। তাই চিন্তা এই সকল চরম ডিফিকাল্ট ক্ষেত্রে স্বেচ্ছায় অলস হয়ে থাকতে পরমানন্দ লাভ করে। এই অবস্থা খুব আরামের। এই সেই আনন্দ যখন আমরা তারস্বরে প্রচার করতে থাকি আইসিস হচ্ছে সিআইএ ও মোসাদের ষড়যন্ত্র, চিৎকার করি আইসিস হচ্ছে ইসলামের বিকৃতি, কারণ কোরান কিম্বা হাদিসে নিরীহ মানুষ হত্যার কোন বিধান নাই, আইসিস এটাই প্রমাণ করে যে ইসলাম বর্বর ও অসভ্যদের ধর্ম,‌ ইত্যাদি। চিন্তার আলস্যের নানান রূপ আছে। সেকুলার, ইসলামি, হিন্দুত্ববাদী, জায়নিস্ট, জাতীয়তাবাদী ইত্যাদি নানান ভাষ্যে এই প্রকার চিন্তার আলস্য ফেরি করতে দেখা যায়। আপনার রসবোধ প্রখর হলে এই সব থেকে প্রভূত মজা নিতে পারবেন। নিজেকে বঞ্চিত করবেন কেন? নিতে থাকুন।

কোলেটারাল ডেমেজ: নিরীহ মানুষ হত্যার পাশ্চাত্য ন্যয্যতা

চিন্তার আলস্য ভাঙবার প্রথম ধাপ কি হতে পারে? প্রথম ধাপ হচ্ছে আইসিসকে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করে আলোচনা করবার অভ্যাস পরিত্যাগ করা। একে যদি ইসলামের সমস্যা আকারে গণ্য করা চরম বিভ্রান্তি মাত্র। যারা যুদ্ধ শুরু করেছে তাদের নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে বিচ্ছিন্ন ভাবে আইসিস, আল শাবাব বা বোকো হারামকে কোরান, হাদিসের ভাল ভাল ব্যাখ্যা শুনিয়ে সুপথে আনার চেষ্টা বড় জোর ক্যারিকেচার হতে পারে, কিন্তু কোন কাজ হবে না। যুদ্ধের এক পক্ষের সন্ত্রাসকে সভ্যতা ও গণতন্ত্র রক্ষা আর অপর পক্ষকে সভ্যতা ও গণতন্ত্রের দুষমণ গণ্য করে আসল যুদ্ধবাজদের আড়াল করবার নীতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যদি আমরা হত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই তাহলে জাতি, রাষ্ট্র বা ধর্মের নামে হত্যার বিরুদ্ধে এক সঙ্গেই দাঁড়াতে হবে। যারা আইসিসকে চরম সন্ত্রাসী সংগঠন এবং তাদের কাজ মানবতার চরম লংঘন হিসাবে প্রমাণ করে নিজেকে নৈতিকভাবে মহান প্রমাণ করবার চেষ্টা করছেন, তারা তা করতেই পারেন। এতে নিজের পক্ষের লোকজন বাহাবা দেবে। অপরপক্ষ তামাশা গণ্য করবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না। কারণ যুদ্ধ তার চরিত্রের কারণেই যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে তাকে ‘মানুষ’ গণ্য করতে পারে না। করলে হত্যা করা সম্ভব নয়। কুকুরকে মারতে হলেও তাকে ‘কুত্তা’ নাম দিতে হয়। ফলে যুদ্ধকে যুদ্ধ হিসাবেই বুঝতে হবে এবং সবার আগে তাদেরই বিরোধিতাই করতে হবে যারা এই যুদ্ধ শুরু করেছে। তাদের প্রপাগান্ডার হাতিয়ার না হওয়াটাই এখন দরকারী কাজ। নিজেকে জোকার বানাবার কোন অর্থ নাই।

কোলেটারাল ডেমেজ বা নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষ হত্যা আধুনিক যুদ্ধবিদ্যা ও যুদ্ধ নীতির পরিণাম। সে হিসাবেই একে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। আধুনিক যুদ্ধ নীতি যদি কোলেটারাল ডেমেজকে স্বাভাবিক বলে গণ্য করে – অর্থাৎ নিরীহ নির্দোষ সাধারণ মানুষ হত্যাকে নৈতিক বা আইনগত বৈধতা দেবার চেষ্টা করে -- তাহলে আইসিস কর্তৃক একই হত্যা নীতির প্রয়োগ আধুনিক যুদ্ধনীতিরই প্রয়োগ ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। একে ইসলামের সঙ্গে যুক্ত করা বুদ্ধির বিকার মাত্র। এতে আইসিস বর্বর আর কোলেটেরাল ডেমেজের প্রবক্তারা সভ্য হয়ে যায় না।

একটা ছোট পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করা যাক। বিলাতের একটি সংগঠন ২০১০ সালে ইরাক যুদ্ধে কতো লোক মারা গিয়েছে ‘লাশ গণনা’ করে তার হিসাব দিয়েছিলো। যুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করেছে তাদের মধ্যে মারা গিয়েছে ২৮,৭৩৬ জন। কিন্তু সাধারণ নিরীহ নিরস্ত্র মানুষ মরেছে ১৩,৮০৭ জন। এগুলো কনজারভেটিভ অর্থাৎ খুব সাবধানে করা হিসাব। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি দুই জন সশস্ত্র যোদ্ধার হত্যার পাশাপাশি একজন নিরীহ ইরাকি মরেছে। যদি ২০ মার্চ ২০০৩ থেকে ১৪ মার্চ ২০১৩ সময়কাল হিসাবে মধ্যে ধরি তাহলে মোট মানুষ মারা গিয়েছে এক লাখ চুয়াত্তরহাজার (১৭৪,০০০)। এদের মধ্যে সশস্ত্র যোদ্ধা ছিল মাত্র উনচল্লিশ হাজার (৩৯,০০০)। ভয়ানক হিসাব। অর্থাৎ প্রতি একশ জন নিহত মানুষের মধ্যে সাতাত্তর জনই ছিল নিরীহ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ। এই হচ্ছে ‘কোলেটারাল ডেমেজ’ বা কিভাবে নিরীহ মানুষ হত্যাকে পাশ্চাত্য জায়েজ করে তার পরিভাষা। অনেকের দাবি নিরীহ মানুষের সংখ্যা আসলে বেশী হবে, কারন ‘সশস্ত্র যোদ্ধা’র (combatant) ধারণা কিভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় তার সঙ্গে ‘বডি কাউন্ট’ বা লাশ গণনার পরিসংখ্যান যুক্ত।

‘বডি কাউন্ট’ কথাটাকে সহজ ভাবে নেবার উপায় নাই। ইরাক ও আফগানিস্তান আগ্রাসনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লেফটেনান্ট জেনারেল টমি ফ্রাঙ্ক। তার একটি কথা বিখ্যাত হয়ে আছে। সেটা হোল, ‘উই ডোন্ট ডু বডি কাউন্ট’ – অর্থাৎ কয়টা লাশ পড়ল আমরা গুনে দেখি না। কতোলোক যুদ্ধে মারা গেল তার কোন হিসাব আধুনিক যুদ্ধ বিদ্যা করে না। আধুনিক যুদ্ধ নীতি থেকে এই হিসাব বাদ হয়ে গিয়েছে। জর্জ বুশের যুদ্ধ নীতি আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নীতির সঙ্গে এখানে মৌলিক ফারাক ঘটে গিয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে প্রতিদিন কতজন ভিয়েতনামী যোদ্ধাদের মার্কিন সেনাবাহিনী হত্যা করেছে তা ঘোষণা করা হোত। পরে দেখা গেল, এদের প্রায় অধিকাংশই ছিল ভিয়েতনামের নিরীহ নারী ও পুরুষ। অতএব এখন জর্জ বুশের আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের নীতি হচ্ছে লাশ গণনা বাদ দেওয়া। উই ডোন্ট ডু বডি কাউন্ট। মানে আমরা এখন কতো নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষ হত্যা করেছি তা আর হিসাব করি না। পাশ্চাত্যের যুদ্ধ নীতি ও নৈতিক পরিমণ্ডলে নিরস্ত্র মানুষ হত্যা কোন সমস্যাই নয়। ইরাকে আজ অবধি চার হাজার মার্কিন সৈন্য নিহত হয়েছে। কিন্তু কতো লক্ষ ইরাকি নিহত হয়েছে তার কোন হদিস রাখাও পাশ্চাত্য জরুরী মনে করে না। যুদ্ধের পরিণতি আরও কতোকাল আফগানিস্তানে ও মধ্যপ্রাচ্যে সাধারণ মানুষ নিহত হবে তার কোন খবর কেউ রাখবে না। এই গণনা বাদ হয়ে গিয়েছে।

কিন্তু প্যারিসের ক্ষেত্রে সেটা হবে না...

কিন্তু প্যারিসের ক্ষেত্রে উই ডোন্ট ডু বডি কাউন্ট নীতি চলবে না। এখানে যাদের বিরুদ্ধে আইসিস তাদের যুদ্ধ নীতির অংশ হিসাবে হামলা চালিয়েছে ও হত্যা করেছে তারা বৈরুত কিম্বা বাগদাদের নাগরিক কিম্বা অধিবাসী নয়। এরা খোদ প্যারিসের অধিবাসী। বৈরুত এবং বাগদাদের কথা উঠছে কেন? কারন ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে এই তিনটি শহরেই আইসিস তাদের অপারেশান চালিয়েছে এবং দায় স্বীকার করেছে। নভেম্বরের ১২ তারিখে বৈরুতে আত্মঘাতী বোমায় ৪৩ জন নিহত ও কমপক্ষে ২০০ জন আহত হয়েছে। বাগদাদে নভেম্বরের ১৩ তারিখে রাস্তার পাশে রাখা বোমা ও আত্মঘাতী হামলায় ২৬ জন মারা গিয়েছে। তবে আহাজারি হয়েছে ১৩ তারিখে প্যারিসে নিহত ও আহতদের জন্য। যেন বৈরুত আর বাগদাদের মানুষগুলোর জীবনের কোন মূল্য নাই।

আহ্‌। কিন্তু প্যারিসের মর্যাদা আলাদা। আমরা প্যারিসের জন্য শোকার্ত হয়ে পড়ি। ফেইসবুক বাগদাদ কিম্বা বৈরুতে নিহতদের প্রতি সহানুভূতি জানানোর কোন দায় বোধ করে না। জুকারবার্গ ফ্রান্সের জাতীয় পতাকার রঙ দিয়ে ফেইসবুক ফিল্টার সরবরাহ করে এবং প্যারিসে বন্ধুবান্ধব নিরাপদ আছে কিনা সেটা জানানোর জন্য নতুন সেইফটি চেক বা নিজেকে নিরাপদ আছি জানান দেবার এপ্লিকেশান যুক্ত করে। পৃথিবীর মানচিত্রে বৈরুত বা বাগদাদ নামে কোন শহর আছে কিনা সেটা আমরা আর খোঁজ নেবার দরকারও বোধ করি না। আমরা প্যারিসের লাশ গনি, আহতদের সংখ্যা নিয়ে চিন্তিত হই। কিন্তু প্যারিস বা পাশ্চাত্য শহরগুলোর বাইরে অন্য দেশের শহরে কালো, বাদামি বা হলুদ মানুষের লাশ গণনা করার প্রয়োজন বোধ করি না। বৈরুত ও বাগদাদ তাই বাদ পড়ে যায়। আমরা আমাদের ফেইসবুকের আইডিতে ফরাসী রাষ্ট্রের পতাকার রঙ্গে রঙিন হয়ে ফরাসিদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করি এবং সাম্রাজ্যবাদী, যুদ্ধবাজ ও বর্ণবাদী রাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়িয়ে যাই। যাতে তারা তাদের যুদ্ধ বিমান দিয়ে আইসিস ঘাঁটির ওপর হামলা চালাবার পক্ষে আন্তর্জাতিক সম্মতি পেতে পারে।

এখানে হত্যাকারী আইসিস। ইসলামিক স্টেট। ইসলামি স্টেট যখন নিজেদের আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিচ্ছায়া হিসাবে নিজেকে সাফ সাফ ‘স্টেইট’ বা রাষ্ট্র হিসাবে দাবি করল তখন এই দাবির মধ্য আধুনিক রাষ্ট্রের কিছু চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য নিজেদের ক্ষমতা চর্চার মধ্যে দিয়ে আত্মস্থ করতে চাইছে। যেমন, সাইকস-পাইকট বর্ডার বুল ডোজার দিয়ে সমান করে দেওয়া। আইসিস সিরিয়ার আসাদ আর ইরাকের নূর আল মালেকির সরকারের বিরুদ্ধে মরণ পন যুদ্ধ চালাচ্ছে। এরই মধ্যে তারা বুঝিয়ে দিল ঔপনিবেশিক শক্তি ওসমানিয়া সাম্রাজ্যের পতনের পর তাদের নিজেদের মধ্যে সন্ধি ও সমঝোতার ভিত্তিতে আরব ভূমিকে যেভাবে মানচিত্রের ওপর পেন্সিলের দাগ দিয়ে ফরাসি ও বৃটিশরা তাদের আধিপত্যের সীমারেখা হিসাবে ভাগ করে নিয়েছিল সেটা তারা বুলডোজার দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারে। দ্বীতিয়ত পাশ্চাত্য রাষ্ট্রগুলো যদি বডি কাউন্ট না করার নীতি এতো অনায়াসে গ্রহণ করতে পারে, তাহলে তারাও বলতে পারে, উই ডোন্ট ডু বডি কাউন্ট। এটা যুদ্ধ। অতএব সাধারণ, নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষ কতোজন কোথায় কিভাবে মরল এটা একালে কোন পক্ষই কাউন্ট করে না। আইসিস পাশ্চাত্য শক্তির জন্য ভীতিকর। কারণ এই শক্তি মানুষের তৈয়ারি কৃত্রিম মানচিত্র মানে না। সারা দুনিয়াকে আইসিস যুদ্ধ ক্ষেত্র গণ্য করে। ফলে প্যারিস সহ কোন শহরই নিরাপদ নয়। দ্বিতীয়ত, তারা কোলেটারাল ডেমেজের সুবিধাটুকু পুরাপুরি নেবার জন্য তৈরি। পাশ্চাত্য নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা কে যেমন বৈধ গণ্য করে, আইসিসও মনে করে যুইদ্ধে কোন ‘প্রিসিসশান টার্গেট’ নির্ধারণ করবার নৈতিক বা আইনী ভীত্তি নাই। পাশ্চাত্যের নীতি পাশ্চাত্যের শহরগুলোতে চর্চার জন্য আইসিস চরম ভীতির কারন হয়ে উঠেছে।

এই যুদ্ধে ফরাসি রাষ্ট্রের পতাকার রঙে নিজের ফেইসবুক আইডি যারা রাঙিয়েছেন তারা যুদ্ধের একটি পক্ষ মাত্র। তারা তাদেরই পক্ষে দাঁড়িয়েছেন যারা যুদ্ধে নিরীহ মানুষের লাশ গণনা না করাকে ঘোষিত নীতি হিসাবে গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে আইসিসও জেনারেল টমি ফ্রাঙ্কের নীতিই প্রয়োগ করছে মাত্র। নতুন কিছু যোগ করছে না। এই যুদ্ধের মাত্রা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে কেন? দুই হাজার এক সালের নয় সেপ্টেম্বরের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ শুরু করে। পালটা প্রতিক্রিয়া হিসাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিপরীতে অ-রাষ্ট্রীয় শক্তির পালটা আঘাত বৃদ্ধি পায়। আফগানিস্তান ও ইরাক হামলার পর থেকে এই পালটা আঘাত ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই পাল্টা আঘাতের সংখ্যা ও তীব্রতার মাত্রা আরও প্রবল বেগে বৃদ্ধি পেতে থাকে। বৈরুত, বাগদাদ ও প্যারিসের হামলার মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্ট যে পালটা আঘাত সম্প্রসারিত হয়েছে এবং পালটা আঘাত করবার দক্ষতাও বেড়েছে।

বাংলাদেশের জন্য এখনকার শিক্ষণীয় কি হতে পারে? আমার ধারণা জনগণকে শেখানো ও সচেতন করবার পর্যায় আমরা অনেক আগেই অতিক্রম করেছি। আই সিস বাংলাদেশে এসে গিয়েছে কিনা এখন তা নিয়ে তর্ক চলছে। আসে কি আসে নাই সেটা অবশ্য গোয়েন্দারাই ভাল বলতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা আমাদের জন্য খুব ইতিবাচক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেয় না। এতোটুকু বুঝতে পারি যে ইরাকে আইসিসকে নির্মূল বা উৎখাত করার পরিণতি হবে বিশ্বের অন্যন্য দেশে তার ছড়িয়ে যাওয়া। সেই দিক থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এই ধরণের সংগঠনের উৎপত্তি ও বিকাশের উর্বর ক্ষেত্র হয়ে রয়েছে বহু আগে থেকেই। সেটা কেন ঘটে নি তাকে একমাত্র আল্লার ইচ্ছা ছাড়া আর অন্য কোন ভাবে ব্যাখ্যা করা যায় বলে আমার মনে হয় না।

এই সাবধান বাণীটুকু দিয়ে এতোটুকুই শুধু বলতে পারি, চিন্তার আলস্য কাটিয়ে তুলুন। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে আর ইসলামকে দোষারোপ করে প্রলয় ঠেকানো যাবে না। আজকের মতো এতোটুকুই।

২০ নভেম্বর ২০১৫। ৬ অগ্রহায়ন ১৪২২। শ্যামলী, ঢাকা

 

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(1)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : ফরহাদ মজহার, নিরস্ত্র মানুষ হত্যা, আইসিস, কোলেটারাল ডেমেজ

View: 1491 Leave comments-(1) Bookmark and Share

1

nice,thoughtful writing

Tuesday 22 December 15
shahabuddin


EMAIL
PASSWORD