প্রক্সি যুদ্ধের টানাপড়েন


তুর্কিরা মার্কিনীদের দেয়া এফ-১৬ যুদ্ধ বিমান দিয়ে সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তে তুরস্কের আকাশ সীমায় মাত্র সতেরো সেকেন্ডের জন্য ঢুকে পড়া একটি ‘সুখয় এস ইউ ২৪’ রুশ যুদ্ধ বিমান ২৪ নভেম্বর গুলি করে ফেলে দিয়েছে। পাইলটরা যখন প্যারাসুট দিয়ে আকাশ থেকে নামছিলেন তখন সিরিয়া সীমান্তের ওপারে তুরস্ক সমর্থিত তুর্কমেন যোদ্ধারা তাদের গুলি করে। আকাশে গুলি করেই একজনকে হত্যা করা হয়, অন্য জন রাশিয়ায় ফিরতে পেরেছে।

রুশরা এতে ভয়ানক ক্ষিপ্ত হয়েছে। ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন: “সন্ত্রাসীদের সহযোগীরা আমাদের পিঠে ছুরি মেরে দিল, এছাড়া একে আর অন্য কোন ভাবেই ব্যাখ্যা করে বোঝানো যায় না”। খুবই কড়া কথা। পুতিন আরো বলেছেন, রাশিয়া আগেই প্রমাণ করে দেখিয়েছে কিভাবে ইসলামিক স্টেইটের দখলে থাকা ভূখন্ড থেকে তেল ও তৈলজাত দ্রব্য তুরস্কে ঢুকছে আর তেলের টাকায় আইসিস তাদের খরচ চালাচ্ছে। সিরিয়ার সংকট নিয়ে কথা বলার জন্য রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রী সার্জেই লাভরভের আঙ্কারা যাবার কথা ছিল, এই ঘটনার পর তাঁর যাত্রা স্থগিত হয়ে যায়।

সামগ্রিক ভাবে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি তো বটেই, বিশেষ ভাবে সিরিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন যে অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে তার প্রতি ঘনিষ্ঠ নজর রাখা বাংলাদেশে আমাদের জন্য জরুরী। সিরিয়ার ইতিহাস ও বাস্তবতা খুবই জটিল বিষয়। ফলে কোন বিষয়েই একাট্টা সরল সিধা উত্তর বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ সমীচন নয়। আসলে বিশ্বব্যাপী একটা তোলপাড় চলছে। আমাদের প্রথাগত চিন্তা ও অনুমান দিয়ে তা বোঝা যাবে না। কোন দেশই এখন নিজেকে বিচ্ছিন্ন গণ্য করতে পারে না। আমরাও বিচ্ছিন্ন নই। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে কী ঘটছে তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে আমাদের অবস্থার নির্ণায়ক এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। বাংলাদেশে আমাদের এই ন্যূনতম সতর্কতাটুকু থাকা দরকার যে সিরিয়ার যুদ্ধ ও ঘটনাপ্রবাহ আমাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার বাইরে দুনিয়াকে যেভাবে বদলে দিচ্ছে, তা আমাদের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। অন্যদিকে চলমান ঘটনাপ্রবাহকে আমরা যেভাবে বুঝি ও বিশ্লেষণ করি বাংলাদেশের জনমত তৈরিতে সেইসব ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেই সকল ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ প্রভাব বিস্তার করে সন্দেহ নাই। রুশ যুদ্ধ বিমান ভূপাতীত করা এবং পাইলটকে আকাশ থেকে নামার সময় হত্যা করাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যে তর্কগুলো চলছে সে সম্পর্কে অবহিত থাকবার জন্যই এই লেখা।

তুরস্কের যুক্তি

তুরস্ক দাবি করছে রুশ যুদ্ধ বিমান তার আকাশ সীমা লংঘন করেছে এবং নিজের আকাশ রক্ষা করার অধিকার তার আছে। রাশিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও সত্য হচ্ছে আসলেই সতেরো সেকেন্ডের জন্য রুশ যুদ্ধ বিমান তুরস্কের আকাশ সীমার ভেতরে ঠিকই প্রবেশ করেছিল। ঠিক বেরিয়ে যাবার সময়ই গুলিবিদ্ধ হয় এবং পাইলটরা পারাসুট দিয়ে নামতে গিয়ে সিরিয়ার ভূখণ্ডে গিয়ে পড়ে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান বলেছেন এ ব্যাপারে তারা অনেক আগেই সাবধান করেছিলেন, ফলে তুরস্ক এই ঘটনার জন্য দায়ী হতে পারে না। রুশরা ভূপাতীত বিমানের বেঁচে যাওয়া একজন বৈমানিকের দাবির ভিত্তিতে প্রচার চালিয়েছিল যে গুলি করবার আগে রুশ বিমানকে কোন হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় নি। তুর্কিরা তখন প্রমান হিসাবে রুশ পাইলটদের সাবধান করবার অডিও রেকর্ড প্রকাশ করে দিয়েছে। রুশ বৈমানিকদের হুঁশিয়ার করা হয় নি, এই প্রচার ঠিক নয়।

কিন্তু রুশ যুদ্ধ বিমান তুরস্কের আকাশ সীমায় প্রবেশ করেছে এই অভিযোগ সত্য হলেও তুরস্কের জন্য প্রশ্ন অন্যত্র। রাশিয়া কি তুরস্কের দুষমন? সেই ক্ষেত্রে তুরস্ক অবশ্যই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতে পারত বা কূটনৈতিক পথে প্রতিবাদও জানাতে পারত। কিন্তু তারা সেটা না করে গুলি করে বিমান ভূপাতীত করবার পক্ষে যে যুক্তি দিচ্ছে তা রুশ ও তুরস্কের সম্পর্কে অবনতি ঘটাবে। এ ধরণের অনাকাংখিত ঘটনা ঘটতেই পারে। ফলে তাকে কুটনৈতিক ভাবে অনাকাংখিত বলা ও ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশের মধ্যেই ব্যাপারটি চুকে যেতো। কিন্তু পুতিন এই অভিযোগও করেছেন যে তুরস্ক এই ঘটনার জন্য কোন অনুতাপ বা ক্ষমা প্রার্থনা করে নি। যদিও এরদোগান ঘটনা ঘটবার উত্তেজনার মুখে শুরুতে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন তুরস্ক এর জন্য কোন ক্ষমা প্রার্থনা করবে না, কিন্তু  রাশিয়ার সঙ্গে এই দুষমনি টিকিয়ে রাখা তুরস্কের নীতি নয়। সেটা বোঝা গিয়েছে কয়েকদিন পর ২৭ নভেম্বরে যখন এরদোগান আসলে ঘটনার জন্য দুঃখই প্রকাশ করলেন। তুরস্কের একটি শহরে বক্তৃতা দিতে গিয়ে এরদোগান বলেছেন, “আমরা আসলেই খুব বিষণ্ণ হয়েছি, আমরা চাই এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে। তিনি ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছেন। বোঝা যাচ্ছে তুরস্ক এ ঘটনা নিয়ে বাড়াবাড়িতে আগ্রহী নয়।

তুরস্কের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষূন্ন হচ্ছে কিনা অনেকে এই প্রশ্ন  তোলা অমূলক নয়। রুশ বিমান গুলি করবার কোন বাস্তবিক কারন আছে কি নাই, তর্কটা সেখানে নয়। প্রশ্ন হচ্ছে তুরস্কের অবস্থানের মধ্যে তুরস্কের আদৌ কোন জাতীয় স্বার্থ নিহিত রয়েছে তুরস্ক তা ঘটনা ঘটবার পর পর আদৌ প্রমাণ করতে পারছিল না। এর কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্য  ভেঙ্গে যাবার পর এই অঞ্চলের ইতিহাস সম্পর্কে পুনরায় হদিস নেওয়া হয়ে ওঠে না।  তুরস্কের স্বার্থ কোথায় তা স্পষ্ট না করবার কারনে বরং আইসিসকে কার্যত সমর্থন করছে বলে তুরস্কের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ নানান মহল থেকে উঠছে তুরস্ক তাকেই আরও বদ্ধমূল হবার সুযোগ করে দিয়েছে। তুরস্ক মুখে বলছে বটে যে তারা আসাদ ও আইসিস উভয়ের বিরুদ্ধে লড়ছে। কিন্তু তুরস্কের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে তুরস্ক আসলে আইসিসকেই সহায়তা করছে। তুরস্ক বলছে তারা জিহাদিদের মধ্যে যারা ‘মডারেট’, কিম্বা নরম পন্থী তাদের সমর্থন করে। কিন্তু রুশ প্রপাগান্ডা বাদ দিলে তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্ত কেন ঐতিহাসিক কারণে তুরস্কের জন্য সংবেদনশীল এলাকা সেটা বোঝা কঠিন কিছু নয়।

কিন্তু মডারেট কিম্বা উগ্র এই দুইয়ের সীমারেখা সিরিয়ার বাস্তবতায় চিহ্নিত ও বজায় রাখা খুবই কঠিন। মডারেট গ্রুপ গুলো তুরস্কের সাহায্য সহযোগিতা পায়। গুলিবিদ্ধ বিমান থেকে মাটিতে নেমে আসার সময় এই ধরণের একটি ‘মডারেট’ গ্রুপই রুশ পাইলটদের গুলি করে হত্যা করেছে। তুরস্ক-সিরিয়া বর্ডারে যারা লড়ছে এবং রুশ বৈমানিককে গুলি করে হত্যা করেছে সেই তুর্কমেন গেরিলারা তুরস্কের কাছ থেকেই সমর্থন পায়। যে গ্রুপ রুশ বৈমানিকদের গুলি করেছে ও একজনকে হত্যা করেছে তারা সুলতান আব্দুল হামিদ ব্রিগেড নামে পরিচিত, এদেরকে তুরস্কের গোয়েন্দা বাহিনীই সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ফলে তারা আসলে তুরস্কের প্রক্সি হয়েই সিরিয়ায় যুদ্ধ করছে। তুরস্কের হাতে তৈরি ও তুরস্কের পক্ষে যুদ্ধে নিয়োজিত ‘মডারেট জিহাদি’ আবদুল হামিদ ব্রিগেড গুলি করে আকাশ থেকে নেমে আসা বৈমানিককে হত্যা করে যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট জেনেভা কনভেনশান লংঘন করেছে। এখন এর দায় রুশরা তুরস্কের ওপর চাপাতে চাইছে। মনে হচ্ছে তুরস্ক নিজের ভাবমূর্তি পরিচ্ছন্ন রাখবার ক্ষেত্রে বেশ বড় ধরণের ঝুঁকি নিয়েছে। রুশ প্রপাগান্ডার বিপরীতে তুরস্ককে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে বেশ বেগ পেতে হবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিক থেকে রাশিয়া তুরস্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তুরস্ক রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটাবার ঝুঁকি কেন নিচ্ছে সেটা স্পষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত ন্যাটোভূক্ত দেশ হলেও রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক মৈত্রীমূলক হওয়ার মধ্য দিয়ে তুরস্ক নিজের যে স্বাধীন ভাবমূর্তি জারি রাখতে পারতো, তাকেই যেন তুরস্ক নষ্ট হতে দিচ্ছে। তাহলে তুরস্কের আচরণের একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে এই যে ন্যাটোর অধীন দেশ হিসাবে তুরস্ক নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলী দিয়ে মূলত ন্যাটোর সামরিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করবার জন্য ভাড়া খাটছে। মুসলিম প্রধান দেশগুলোর জনগণের মধ্যে তুরস্ক সম্পর্কে এই ধারণা বদ্ধমূল করে তুলবার শর্ত তৈরি করলে সেটা হবে তুরস্কের চরম অদূরদর্শিতা।

তুরস্ক ন্যাটোর হয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়াল। বিপদটা এখানে। তাহলে কি তুরস্ক চাইছে রাশিয়া এই ঘটনার পালটা কোন ব্যবস্থা নিক। সে রকম ব্যবস্থা নিলে, বলা বাহুল্য ন্যাটোর চুক্তি অনুযায়ী ন্যাটোভূক্ত সব দেশ ‘পারস্পরিক সহযোগিতার’ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তুরস্কের পক্ষেই দাঁড়াবে। রুশরা তা জানে, সে দিক থেকে তাদের প্রতিক্রিয়া স্বভাবিকতার মাত্রা অতিক্রম করে নি। যদি জর্দান, সৌদি আরব বা কুয়েতি কোন যুদ্ধ বিমান যদি আজ এই ঘটনা ঘটাত তাহলে রাশিয়ার দিক থেকে ততক্ষণে পাক্কা জবাব মিলত। তুরস্কের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোর ওপর প্রভাব পড়বে রাশিয়া আপাতত এই হুঁশিয়ারিটুকু দিয়ে রেখেছে।

কিন্তু, অনুমান করা যায়, রাশিয়া একটা জবাব দেবে। পরাশক্তি হিসাবে পুতিন রাশিয়াকে পুরানা গৌরবের জায়গায় নিতে চান। তাহলে তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটা জবাব তাকে দিতেই হবে। রাশিয়ার জনগণ তুরস্ককে একটি উপযুক্ত সামরিক জবাব দেওয়া হোক তাই চাইছে। রাশিয়াকে আভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য হলেও রাশিয়াকে কিছু একটা করতে হবে। তার বিভিন্ন সুযোগ রাশিয়ার রয়েছে। তবে রাশিয়া কোনটি বেছে নেয়, সেটাই হচ্ছে দেখার বিষয়।

সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্ত রুশ বোমাবাজি অযৌক্তিক

সিরিয়ার যুদ্ধে রুশরা একটি পক্ষ। তারা আসাদকে সমর্থন দিচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে রুশরা যে বিমান হামলা চালাচ্ছে তার টার্গেট আইসিস যতোটা নয় তার চেয়ে অনেক বেশী আসাদ বিরোধী অন্যান্য বিদ্রোহী গ্রুপ। সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তে রুশ যুদ্ধ বিমান পাঠানোর কারনও তাই। রুশ বিমান যেখানে হামলা করতে গিয়েছিল সেটা হোল সিরিয়ার দিক থেকে লাটকিয়া আর তুরস্কের দিক থেকে থেকে হাতায়ে অঞ্চল। লাটকিয়া সিরিয়ার খুবই গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী। এর লম্বা ইতিহাস আছে, যার সঙ্গে তুর্কিদের আবেগ ও জাতিগত সম্পর্ক নিবিড় ভাবে জড়িত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়ায় ওসমানিয়া সাম্রাজ্য ভেঙ্গে যাবার পর সিরিয়া সংক্রান্ত ফরাসি ম্যান্ডেট (the Mandate for Syria and the Lebanon (1923−1946) অনুযায়ী লাটকিয়া সিরিয়ার ভাগে পড়ে। একসময় আলাওয়াইটদের স্বশাসিত এলাকা হিসাবে এই প্রদেশ গড়ে উঠলেও এর মধ্যে যারা তুর্কি বংশোদ্ভূত তারা একে মেনে নেয় নি। সিরিয়া সীমান্তে এই তুর্কিরাই সিরিয়ার ‘তুর্কমেন’ নামে পরিচিত। মূলত আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে শুরু থেকেই এরা অস্ত্র ধরেছিল। তুরস্ক এদেরকে সবসময়ই সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে এসেছে। ফরাসি ম্যান্ডেট লীগ অব নেশান্স-এরই ম্যান্ডেট ছিল যার দ্বারা ওসমানিয়া সাম্রাজ্যকে ফরাসি ও ব্রিটিশরা ভাগ করে নেয়।

সাইকস-পাইকট চুক্তি অনুযায়ী বর্তমানের সিরিয়া, লেবানন ও আলেক্সান্দ্রিয়া ফরাসিদের ভাগে পড়ে। ফরাসি ম্যন্ডেট ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকে। তারপর সিরিয়া আর লেবানন দুটি ভিন্ন দেশ হিসাবে হাজির হয়। এই সময় লাটকিয়া পড়ে সিরিয়ার ভাগে আর হাতায় প্রদেশ ১৯৩৯ সালে তুরস্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। লাটভিয়ায় অনেক তুর্কি থেকে যায়।

তাহলে সিরিয়ার ‘সিরিয়ান টার্কম্যান’ বা টার্কি বংশোদ্ভূত সিরিয়ানদের প্রতি তুরস্কের দুর্বলতার সঙ্গত কারণ রয়েছে। সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই সিরিয়ান টার্কম্যানরা আসাদ সরকারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে লিপ্ত হয়েছিল এবং এখনও রয়েছে। তুরস্ক শুরু থেকেই এই বিদ্রোহে সাহায্য সহযোগিতা করেছে। জাতিগত বন্ধন তার প্রধান কারন হতে পারে। দ্বিতীয়ত সিরিয়ান গৃহযুদ্ধের শুরু থেকেই আইএস অথবা পরে আইএস নামের যাদের আমরা দেখছি তাদের কোনো তৎপরতা বা প্রভাব এই এলাকায় নাই। তাহলে এখানে রাশিয়ার বোমাবাজি করবার পক্ষে রাশিয়ার কোন যুক্তি নাই।

বিষয়টি গুরুতর

ব্যাপারটি আসলেই খুব গুরুতর। সিরিয়ার যুদ্ধ কেন্দ্র করে বিমান ভূপাতীত করবার ঘটনা নতুন নয়। দুই হাজার এগারো সাল থেকে যুদ্ধের বিস্তৃতির পর তুরস্কের নজরদারি বিমান আসাদ বাহিনী ২০১২ সালে ভূপাতীত করেছে। তুরস্কও সিরিয়ার যুদ্ধ বিমান ভূপাতীত করেছে। কিন্তু এই প্রথম ন্যাটোর একটি সদস্য দেশ সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তে রুশ যুদ্ধ বিমান ভূপাতীত করলো। তুরস্ক বিষয়টি ন্যাটো কাউন্সিলের কাছে নিয়ে গিয়েছে। ব্যাপারটা এখন ন্যাটো বনাম রাশিয়ার বিষয় হয়ে গিয়েছে। প্রায় এক দশক পরে এই প্রথম ন্যাটোর সদস্য একটি দেশ রাশিয়ার বিমান ভূপাতীত করেছে তা নিয়ে ন্যাটো কাউন্সিল বৈঠক করছে। বারাক ওবামা বলেছেন, নিজের আকাশ সীমা রক্ষার অধিকার তুরস্কের রয়েছে। বারাকা ওবামা সদস্য দেশ হিসাবে তুরস্ককে সমর্থন করছে। ন্যাটোর সদস্য অন্য দেশগুলোও তুরস্ককে সমর্থন করবে, বলাই বাহুল্য। রাশিয়া বিষয়টিকে রাশিয়া বনাম তুরস্ক হিসাবে নিয়েছে তা মনে হচ্ছে না। রাশিয়াও ন্যাটোর কৌশলের প্রত্যুত্তর হিসাবে একে রাশিয়া ও ন্যাটোর দ্বন্দ্ব হিসাবেই বিবেচনা করছে এবং সে ভাবেই তার প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। অন্তত দূর থেকে এতোটুকু সহজেই বোঝা যায়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে চিনাদের প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে সেটা ভেবে দেখার বিষয়। চিন ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্ক ঘনিষ্ট। উভয়েই মনে করছে ন্যাটো ইউরেশিয়াকে ঘিরে ফেলছে। দক্ষিণ চিন সমুদ্র নিয়ে উত্তেজনা প্রবল ভাবেই হাজির। ন্যাটোর সামরিক অভিলাষ কেন্দ্র করে একটা সামরিক মেরুকরণ রয়েছে যা রুশ বিমান ভূপাতীত করাকে কেন্দ্র করে আরও গভীর হবে।

প্যারিসে আইএস এর আক্রমণের পর ফরাসি যুদ্ধ জাহাজ শার্ল দ্য গল ভূমধ্য সাগর থেকে সিরিয়ায় আই সিস অবস্থানের ওপর বিমান হামলা করে যাচ্ছে। মার্কিনিরা তুরস্ক আর মধ্য প্রাচ্যের দেশগুলোর বিমান ক্ষেত্র থেকে বিমান হামলা চালাচ্ছে। সম্প্রতি জি-২০ দেশগুলোর যে সভা হয়েছে সেখানে সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে সকলে এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে আসলে মূল শত্রু হচ্ছে আইএস। আসাদকে নিয়ে আগে যে মত পার্থক্য ছিল সেটা এখন কৌশলের প্রশ্নে এসে ঠেকেছে। তাহলে আইসিসের বিরুদ্ধে পরাশক্তিগুলোর সহযোগিতার একটা সম্ভাবনা কিছুটা তৈরি হয়ে এসেছিল কিন্তু রুশ বিমান ভূপাতীত করার ঘটনা সব আবার এলোমেলো করে দিয়েছে।

পরিণতি কী হতে পারে?

অনেকে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ ঘটে যেতে পারে বলছেন। এটা অবশ্য খুবই অবাস্তব চিন্তা। তেল ও দাহ্য পদার্থের ওপর নির্ভরশীল সভ্যতা, পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়ন ও বাজার ব্যবস্থার ওপর প্রতিটি দেশের যে নির্ভরশীলতা তাতে যুদ্ধ পরাশক্তিগুলোর জন্য আত্মঘাতী হবে। তবে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে একটা প্রক্সি যুদ্ধ সম্ভব। সেটাই আসলে সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্য ব্যাপী ঘটছে। তাছাড়া রুশ ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ানোর পক্ষপাতী নয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিম্বা ন্যাটো। পাশ্চাত্যে থিঙ্ক ট্যাংক ও নীতি নির্ধারকদের কাছে এটা স্পষ্ট যে পাশ্চাত্যকে যুদ্ধে নামিয়ে আনা সব সময়ই আল কায়েদার দিক থেকে একটি পরিচিত কৌশল ছিল। সেই কৌশল বিফল হয়েছে দাবি করা যাবে না। ইতোমধ্যেই দেখা যাচ্ছে তুরস্ক ব্যাপারটিকে আর বাড়তে না দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রুশরা নিজেদের ভুল প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও সিরিয়া-সীমান্তে যুদ্ধ বিমান পাঠানো ছিল কৌশলগত ভুল সেটা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। তুরস্কের বিরুদ্ধে এখন যে সকল ব্যবস্থা রাশিয়া তা নিজের মুখ রক্ষার চেষ্টার অধিক কিছু নয়।

আমাদের জন্য শিক্ষণীয় দিক কী?

আইসিস আল কায়েদা নয়। একটি ভূখণ্ড দখল করে একজন খলিফার নেতৃত্বে গঠিত একটি দেশ হিসাবে হাজির হয়েছে। একে মোকাবিলার কোন স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন নীতি ও কৌশল পাশ্চাত্যের আছে বলে মনে হয় না। আমার এই মন্তব্য অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য না হতে পারে। কিন্তু তার মীমাংসা আজ নয়। এইটুকু আপাতত বুঝলে যথেষ্ট ইরাক আক্রমণ থেকে শুরু করে আজ অবধি পাশ্চাত্য নীতি ও কৌশলের ফল হয়েছে জিহাদি যুদ্ধ পরাজিত করা দূরের কথা, বরং এই যুদ্ধ আল কায়েদা থেকে আইসিসে রূপান্তরিত হয়েছে। জিহাদি মতাদর্শ ও কৌশলের গুণগত পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটেছে। একে উপেক্ষা করবার সুযোগ খুব কম। এবং দুনিয়াব্যাপী এই যুদ্ধ তরুণদের প্রবল আকর্ষণের জায়গা হয়ে উঠেছে।

দ্বিতীয়ত পরাশক্তিগুলো তাদের সামরিক পণ্য বিক্রি বা খালাস করবার কৌশল হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধকে আরও দীর্ঘস্থায়ী, বিস্তৃত ও চরম নিষ্ঠুরতার দিকে নিয়ে যাবে। যাচ্ছেও বটে। সিরিয়ায় নির্বিচারে সকল দেশ মিলে যেভাবে বোমা বর্ষণ করছে তা অবিশ্বাস্যই বটে। পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে ওঠার জন্য সমরাস্ত্রে বিনিয়োগ ও তার বাজার নিশ্চিত করা পাশ্চাত্যের রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছা অনিচ্ছার অধীন নয়। এটা একটি নৈর্ব্যক্তিক প্রক্রিয়া এবং সেটা ঘটতে থাকবে। ফলে মধ্য প্রাচ্যে যেভাবে যুদ্ধ চলছে সেই ধরণের যুদ্ধ চলতে থাকবে। আইসিসকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কি যাবে না, সেটা তর্ক নয়। অন্য কারো বিরুদ্ধে অন্য কোথাও এই যুদ্ধের বিস্তৃতি ঘটবে এবং খুনাখুনির কারবার ছড়াতে থাকবে। এই কাঠামোগত সংকট কাঠামোর ভেতর থেকে ভাঙ্গবার একমাত্র পথ ছিল পাশ্চাত্য দেশগুলোতে রাজনৈতিক সচেতনতার চর্চা, ইসলাম বিদ্বেষী বর্ণবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং নাগরিক ও মানবিক অধিকার নিঃশর্ত ভাবে কায়েমের নজির রাখা। কিন্তু প্যারিসের ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসাবে দেখা যাচ্ছে পাশ্চাত্যে বর্ণবাদী ঘৃণা বেড়েছে এবং তাকে মোকাবিলা করবার কোন শক্তিশালী আন্দোলন পাশ্চাত্য দেশগুলোতে আমরা দেখছি না।

তৃতীয়ত, প্যারিসের ঘটনায় পাশ্চাত্যের প্রতিক্রিয়া নেতিবাচক। উদার গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রগুলো আরও সংকুচিত করে ফেলা হচ্ছে। জরুরী অবস্থা ঘোষণা, নাগরিক অধিকার সংকীর্ণ করে ফেলা এবং ক্ষেত্র বিশেষে অস্বীকার – ইত্যাদি কারণে গণতন্ত্র ও প্রগতির যে দাবি পাশ্চাত্য করে, সেই দাবির ফাঁপা দিকগুলো বাতাসে ন্যাংটা হয়ে উড়তে শুরু করেছে। এর ফল মোটেও ভাল হবার কথা নয়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর আতংক তৈরির মধ্য দিয়ে শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার চেয়ে বোকামি আর কিছুই হতে পারে না। পাশ্চাত্য রাষ্ট্র ও শাসন ব্যাবস্থার ন্যায্যতা প্রমাণ এখন কঠিন হয়ে গিয়েছে। আগামিতে আরও কঠিন হবে।

চতুর্থত সিরিয়ার যুদ্ধের মধ্যে নতুন যে যুদ্ধ-শরণার্থি সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার ফলও সুদূর প্রসারী হবে। সিরিয়াসহ মধ্য প্রাচ্যের জনপদ গুলো যুদ্ধে বিধ্বস্ত ও ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এখন পাশ্চাত্য শরণার্থী নিতে রাজি নয়। তারা তাদের সীমান্ত বন্ধ করে দিচ্ছে। এর পরিণতি কী দাঁড়ায় এখনই বলা সম্ভব নয়, তবে তা ভালো হবে না একথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়।

যুদ্ধ বিমান ভূপাতীত করবার ঘটনা কেন্দ্র করে রাশিয়া ও ন্যাটোর মেরুকরণ এই ইঙ্গিত দেয় যে আইসিসের বিরুদ্ধে কোন ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরি হবার কোন আন্তর্জাতিক সম্ভাবনা নাই। প্রত্যেকে প্রত্যেকের প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে যাবে এবং অন্যান্য দেশ কিম্বা ভুখণ্ড অস্থিতিশীল হবে। বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনার মধ্যে পড়ে গিয়েছে।

২৭ নভেম্বর ২০১৫। ১৩ অগ্রহায়ণ ২০২৫। শ্যামলী।

( সম্প্রসারণ ৩০ নভেম্বর ২০১৪)

 

 

 

 

 

 

 

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।