রওনক জাহানের গণতান্ত্রিক উত্তরণ (!)


সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ২২ তারিখের ‘দৈনিক প্রথম আলো’য় চোখ বুলাচ্ছিলাম। উপসম্পাদকীয়র পাতায় রওনক জাহানের একটা লেখা চোখে পড়ল। লেখার শিরোনাম 'গণতান্ত্রিক উত্তরণের ২৫ বছর’। রওনক জাহান আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ওপর তাঁর ভাল কাজ আছে বলে শুনেছি। তিনি ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ’-এর সম্মানীয় ফেলো। পড়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। তাঁর পুরো লেখায় তিনি নব্বইয়ের ত্রিদলীয় জোটের রূপরেখাকে তাঁর ভাষায় গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটা ভিত্তিমুল ধরে নিয়েছেন এবং সে রূপরেখার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করায় আক্ষেপ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সমালোচনা করেছেন। বোঝা গেলো বাংলাদেশের রাজনীতির সমস্যাকে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি পূরন, পালন ও ব্যর্থতা হিসাবেই দেখেন। এর অধিক কিছু না।

লেখাটি পড়ে মনে হল একটা জবাব লেখা দরকার। ব্যক্তি রওনক জাহানকে সমালোচনা করা এ লেখার মুল উদ্দেশ্য নয়। ব্যক্তি রওনকের মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্র, গণতন্ত্রিক ব্যবস্থা, সংবিধান সম্পর্কে সমাজের একটা অংশের চিন্তার-ই প্রতিফলন ঘটছে। এই চিন্তাটা এখনও ভূয়া আশা তৈরি করার দিক থেকে বেশ প্রভাবশালী চিন্তা আকারেই সমাজে হাজির আছে। এই চিন্তার আধিপত্য ভাঙতে না পারলে সংবিধান, রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এসবের গোড়ার প্রসঙ্গে প্রবেশ করা কষ্টসাধ্যই রয়ে যাবে। তাই এখানে রওনক জাহানের লেখার সুত্র ধরে কিছু প্রসঙ্গ আলোচনা করব।

সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা

রওনক জাহান তিন জোটের রূপরেখার চারটা প্রতিশ্রতি এবং সে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেছেন চারটা উপশিরোনামে। কিন্তু তিনি ঐ রূপরেখার প্রথম যে প্রতিশ্রুতি সে ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করেন নি। সেটা হল-‘এরশাদ ও তার সরকারের শাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় দেশে পূর্ণ গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকল্পে সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রেখে’ ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা। র্থাৎ ত্রিদলীয় জোতের রূপরেখার মূল প্রস্তাব হচ্ছে সংবিধান এবং রাষ্ট্রের এতদিনকার চরিত্র যা ছিল তার ধারা অব্যাহত রাখা হবে, শুধু ক্ষমতা থেকে এরশাদকে সরতে হবে। একটু বিস্মিত হলাম, রূপরেখার ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’র এ বিষয়টির কোনো উল্লখে রওনক জাহানের লেখায় নেই। অথচ সেই স্ময় ত্রিদলীয় জোতের রূপ্রেখাকে যাঁরা কঠোর ভাবে সমালোচয়া করেছিলেন তঁদের সমালচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই ‘সাংবিধানিওক ধারাবাহিকতা’র ধারণা। যার দ্বারা ত্রিদলীয় জোট আসলে একটি অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক ও গণবিরোধী চরিত্রের ‘ধারাবাহিকতা’ রক্ষার প্রস্তাব করেছিলেন। রওনক জাহানও দেখছি এই প্রতিশ্রুতি রক্ষার ব্যাপারে সন্তুষ্ট তাই গণতন্ত্র ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা’ নিয়ে তার কোনো অভিযোগও নাই। কিন্তু জনগণের অভিপ্রায় ধারণকারী নতুন রাষ্ট্রগঠন ও গঠনতন্ত্র (Constitution) প্রণয়নের প্রশ্ন পাশ কাটিয়ে আন্দোলনকে নিছকই এরশাদ হটানোয় পর্যবসিত করা করা কি জনগণকে ধোঁকা দেয়া নয়? এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতার চরিত্রে ও কাঠামোতে রূপান্তরের যে গণ আকাঙ্ক্ষা মূর্ত হয়ে উঠেছিল ত্রিদলীয় জোতের রূপ্রেখা কি তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ছিল না? রওনক জাহানের চোখে নিশ্চয় নয়, সেটা তাঁর তিন জোটের রূপরেখাকে ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের প্রতি অঙ্গীকার’ হিসাবে মুল্যায়নের মধ্য দিয়ে বুঝা যায়। তাই “সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা” কেন রক্ষা করতে হবে এনিয়ে কোনো কথা তাঁর নেই। আসলে নতুন রাষ্ট্রগঠন বা কনষ্টিটিউট করার ব্যাপারটা কেন কেন্দ্রীয় বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় সেটার গুরুত্ব বুঝার ব্যর্থতাটাই প্রকাশিত হয়ে পড়েছে তথাকথিত “সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রতিশ্রুতির” বাকোয়াজগিরির মধ্যে। ফলে তিনি সহজেই ভুয়া আশা তৈরি ও বিলি করতে পেরেছেন এই বলে যে এতে নাকি আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা হবে।

আমরা এবার যে প্রতিশ্রুতিগুলো ভঙ্গের জন্য রওনক জাহান চিন্তিত সেগুলোর ওপর নজর দিব।

সার্বভৌম সংসদ

‘আমাদের এখন একটি ‘সার্বভৌম’ সংসদ আছে, কিন্তু এটি কার্যকরভাবে একটি দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে না—১৯৯০ সালের রূপরেখায় আমাদের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল।’

রওনক জাহান উল্লেখ না করলেও তিনি এক আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোর পুর্বানুমানের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, আমরা সবাই বুঝতে পারি। বাংলাদেশের ইতিহাস ও বাস্তবতার সঙ্গে তার কোন যোগ নাই। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই কাঠামোর মধ্যে সার্বভৌম সংসদের ধারণাটি একটা গণবিরোধী এবং স্বৈরতান্ত্রিক ধারণা। এ ধারণা এমন একটি সংসদের প্রস্তাব করে যেটা কারো অধীন হবে না। এমনকি জনগণেরও না। জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে নাকচ ও নস্যাৎ করে তার ওপর সার্বভৌম সংসদের ধারণা আরোপ করা হয়। সংসদ নিজেকে সার্বভৌম বলে দাবি করার অর্থ এটাই। সার্বভৌম কথাটির মানে এটাই। যার ওপর অন্য কারো কতৃত্ব বা অধীনতা নাই। এই দিকটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানের বোঝাবুঝির বাইরে তা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক স্তর বোঝার জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সমাজতাত্ত্বিক সিম্পটম। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কি সংসদ, সরকার বা খোদ রাষ্ট্র কি সার্বভৌম হতে পারে? গণতন্ত্রের মুল কথাই যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি বা নাগরিক হচ্ছে সার্বভৌম সেখানে সংসদ কিভাবে সার্বভৌম হয়? সার্বভৌম সংসদের ধারণা আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিকের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন করে সংসদকে যা খুশি তা করার অধিকার ও ক্ষমতা দেয়ার তত্ত্ব। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ যদি মনে রাখি তাহলে তার অর্থ দলের নেতা বা নেত্রীর হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা অর্পন। জগণের ইচ্ছা এবং অভিপ্রায়ের তোয়াক্কা না করে সংসদে গিয়ে যা খুশি তা আইন করার তত্ত্ব হল এই সার্বভৌম সংসদের ধারণা।

সংসদকে অবশ্যই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে। জনগণের কাছে জবাবদিহিতার উর্দ্ধে কোন সার্বভৌম সংসদের ধারণা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে থাকতে পারে না। জনগণ এমন একটা সংসদের জন্য ভোট দিতে পারে না যে সংসদ সার্বভৌম, অর্থাৎ জনগণের ইচ্ছা অনিচ্ছার বাইরে যা খুশি আইন প্রণয়ন করতে পারে এবং তার জন্য তাকে কারো কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। ফলে নিজের একনায়ক্তান্ত্রিক ক্ষমতা পাকাপোক্ত করবার জন্য জনগণের মৌলিক অধিকার হরণকারী যেকোন আইনও সে পাশ করতে পারে। যারা সংসদের সার্বভৌমত্বের কথা বলেন তারা মৌলিক অধিকার খর্ব করার ক্ষমতা সংসদের হাতে কুক্ষিগত করার জন্যই কথাটা বলেন। এই সার্বভৌম ক্ষমতার বলেই বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নানান গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী আইন প্রণয়ন করেছে। সর্বশেষ পঞ্চদশ সংশোধনী তার উদাহরণ। ‘সার্বভৌম সংসদ’ কখনো জনগণের আকাঙ্ক্ষা হতে পারে না। রওনক জাহান ‘আমাদের আকাঙ্ক্ষা’ বলতে কাদের আকাঙ্ক্ষা বুঝাচ্ছেন? জনগণের যে নয় তা আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।

দায়বদ্ধতা

ইতিবাচক অর্থে যদি ধরি, রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ যেন সংসদের কাছে দায়বদ্ধ থাকে সে অর্থে তিনি সার্বভৌম সংসদের কথা বলছেন। আবার সেই সংসদকে তিনি কার্যকরভাবে একটি দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান হতে বলছেন। কার কাছে দায়বদ্ধ ? কিভাবে দায়বদ্ধ? এ ব্যাপারে রওনক নিশ্চুপ। যদি সংসদ কারো কাছে দায়বদ্ধই থাকে তাহলে সেটা আবার ‘সার্বভৌম’ সংসদ হয় কিভাবে? রওনক জাহান সার্বভৌম সংসদের গোমর ধরতে না পারলেও রূপরেখায় যারা এ ধারণার প্রণয়ন করেছিলেন তারা ঠিকই ধরতে পেরেছেন। তার মজাটাও তারা পুরোপুরি নিয়েছেন। তারা ভালো করেই জানেন যে সার্বভৌম সংসদ আসলে তাদের যা খুশি তা করতে দেয়ার ক্ষমতা এবং এ ক্ষমতার চর্চা তারা রওনক বর্ণিত গণতান্ত্রিক উত্তরণের ২৫ বছরে করে দেখিয়েছেনও।

অন্যদিকে তিনি সংসদ কার্যকর না হওয়ার জন্য বিরোধীদলের সংসদ বয়কটকে দোষারোপ করছেন। তিনি লিখছেন, ১৯৯৪ সাল থেকে বিরোধী দল (যে দলই হোক না কেন) সংসদ বয়কট শুরু করে, সংসদের বদলে তারা রাজপথেই নিজেদের দাবিদাওয়ার কথা বলতে শুরু করে। প্রতিবাদ জানানোর জায়গা হিসেবে রাজপথকেই বেছে নেয় তারা। ফলে সংসদে ক্ষমতাসীন দল ও জোটের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়—সংসদের কার্যকর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই। সরকারের নির্বাহী বিভাগের হাতে সব ক্ষমতা চলে আসে। এর ফলে সব সরকারই সংসদে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা ব্যতীত আইন পাস ও সংবিধান সংশোধন করেছে।

সার্বভৌম ক্ষমতা ও সার্বভৌম সংসদ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তর্ক বাদ দিলেও রওনক জাহান ও তাঁর প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সমাজের একটি সাধারণ সমালোচনা রয়েছে। তাঁরা নিজেরা সেটা বুঝতে বা উপলব্ধি করতে সক্ষম কিনা বলা কঠিন। তাঁরা এক “সুশীল রাজনীতির” পক্ষে কথা বলেন, এই রাজনীতির পক্ষে সবাইকে রাজি করানোর ব্যাপারে চেষ্টা করেন। সাধারণভাবে সুশীলগণ লিবারেলিজম, উদার, সহনশীল ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি্র পক্ষে দাঁড়াতে চান। এটা কোন সমস্যা নয় কিন্তু একটা বিষয় ছাড়া। অথচ এই বিষয়টি হচ্ছে সবচেয়ে মারাত্মক, ফলে ছোট কোন বিষয় নয়। তা হল, রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করতে গিয়ে, তাদের তু্লাধূনা করতে গিয়ে সমাজের খোদ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ারই বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বসা। বুদ্ধিজীবীতার অহমিকায় রাজনৈতিক দলের বাবা-মা অভিভাবক হয়ে যাবার চেষ্টা করা। এর ফলে সুযোগ পেলে কাকে মাইনাস করবেন তারা তার নির্ধারক হয়ে যান। রওনক জাহানকেও তার ব্যতিক্রম দেখলাম না।

এখানে রওনক জাহানের মুল কথাটা হল, রাজনৈতিক দলগুলো যেন গর্দ্ধবের গর্দ্ধব।। তারা বুঝতেই পারল না “সংসদ বয়কট” করার জন্যই “সরকারের নির্বাহী বিভাগের হাতে সব ক্ষমতা চলে আসে”। এজন্যই নাকি “সংসদে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা ব্যতীত আইন পাস” হয়ে যাচ্ছে। যেন রাজনৈতিক দলগুলো এতই বোকা যে সংসদের এসিরুম যে বাইরের রোদের চেয়ে আরামদায়ক একথাটাই বুঝল না! আসলে ব্যাপারটা ঘুরে ফিরে সেই রাশনালিটির সাথে ক্ষমতার সম্পর্ক, যেন এক মাস্টারনি দুই দুস্ট ছাত্রকে বকা দিচ্ছেন কেন তারা রাশনাল না হয়ে খালি মারামারি করে!

বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সংসদে কেউ কি প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো সিদ্ধান্ত আদৌ নিতে পারেন? তার ওপর ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকারী দলের সংসদ সদস্যরা তার নিজের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পা্রেন না। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর আনীত যে কোনো বিল দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠের জোরে অবলীলায় পাশ তো হবেই। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো জানে ক্ষমতা দখলটাই হল আসল কথা। এর পর যা খুশি তা করা যায়। এজন্য তারা তাই করে ক্ষমতা দখলের জন্য যা করা প্রয়োজন। তার মানে বিরোধী দলের সংসদে থেকে আলাপ-আলোচনার কোনো দরকার নাই তা বলছি না। কিন্তু একইসাথে যদি সংবিধানের অগণতান্ত্রিক দিক তুলে না ধরে শুধু ভাল ভাল নীতিকথা আওড়াতে থাকি তাতে তো চিড়া ভিজবে না।

মৌলিক অধিকার

‘তাঁরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন,জনগণের মৌলিক অধিকার,বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য আইনের শাসন বজায় রাখা হবে’।

আগেই বলেছি সার্বভৌম সংসদ মানেই হচ্ছে নাগরিক মৌলিক অধিকারের তোয়াক্কা না করে সংসদকে যা ইচ্ছা তা করার ক্ষমতা দেওয়া। যাক সে কথা না হয় বাদ দিলাম। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হরণকারী ধারা নিয়ে কোনো বক্তব্য নাই রওনক জাহানের! শুধু যেনবা মুখ রক্ষা হয় সেজন্য এতটুকু বলছেন, “যদিও সংবিধানে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই অধিকার লঙ্ঘনের সঠিক প্রতিকার পাওয়া যায় নি।” সেই বাহাত্তরের সংবিধান থেকে ১৪২ অনুচ্ছেদ নামক একটা অনুচ্ছেদ বাংলাদেশের সংবিধানে আছে। যে অনুচ্ছেদে বলা হচ্ছে – “এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে,তাহা সত্ত্বেও-(ক)সংসদের আইন-দ্বারা এই সংবিধানের কোন বিধান সংযোজন,পরিবর্তন,প্রতিস্থাপন বা রহিতকরণের দ্বারা সংশোধিত হইতে পারিবে”। আবার সংবিধানের মৌলিক অধিকার অনুচ্ছেদের শেষে বলা আছে –“২৬(৩) সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীন প্রণীত সংশোধনের ক্ষেত্রে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই প্রযোজ্য হইবে না।” এখানে স্পষ্টতই সংবিধান সংসদকে দুই তৃতীয়াংশ ভোটের জোরে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করার আইনি অধিকার দিচ্ছে।

তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী মানবিক ও নাগরিক অধিকার হরণের ক্ষমতা সম্পন্ন সংবিধানের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাই তো রক্ষা হচ্ছে, নাকি? একদিকে তিন জোটের রূপরেখা মানবেন অন্যদিকে মৌলিক অধিকার হরণের জন্য গোস্বা করবেন তা কি হয়? যদিও রওনক জাহান পরক্ষণেই আবার দলগুলোর পিঠচাপড়ে দিচ্ছেন- যদিও বেসরকারি গণমাধ্যমের উত্থান ও তাদের মধ্যে কারও কারও সাহসী ও স্বাধীন ভূমিকার কারণে নাগরিকেরা এখন সামরিক শাসনামলের তুলনায় কিছুটা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছেন। গণতন্ত্রের বিভিন্ন মানদণ্ড মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, নাগরিকদের কথা বলার জায়গাটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উজ্জ্বল ও ইতিবাচক একটি জায়গা।

আশা করি পাঠক ইতিমধ্যেই বুঝে গেছেন তিন জোটের রূপরেখার মাজেজা কি। তাই রওনক জাহানের অপর দুই পয়েন্ট- অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং আচরণবিধি নিয়ে কোনো কথা খরচ করলাম না।

নতুন বোতলে পুরানো মদ

এমন নয় যে রওনক জাহান ২০১৫ সালে বসে নব্বইয়ের তিন জোটের রূপরেখা নিয়ে একটা স্মৃতিচারণমুলক লেখা লিখছেন। বরং বাংলাদেশের এখনকার সংকট থেকে উত্তরণের জন্যও তিনি সেই একই প্রেসক্রিপশনই আবার দিচ্ছেন। কিন্তু এখন নব্বই সাল নয়। ইতিমধ্যে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। রওনকও সেটা বুঝেন। ১৯৯০ সালে দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের ওপর চাপ প্রয়োগ করার মতো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল। ‘বাম দলগুলো শক্তি হারিয়ে ফেলেছে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছে।’ বিএনপিরও চাপ সৃষ্টি করার মত অবস্থা নাই। তো এখন কি করা যাবে? ক্ষমতাসীনদের কে বোঝাবে যে নিজেদের মধ্যে এমন কামড়া কামড়ি করলে ক্ষমতার মোয়া অন্য কেউ নিয়ে ফেলতে পারে? তাই রওনক জাহান নতুন বোতলে পুরানো মদের মত ফর্মুলা দিচ্ছেন- ‘এই পরিস্থিতিতে স্রেফ আওয়ামী লীগের নেতা শেখ হাসিনা যদি মনে করেন, বিএনপির কিছু দাবি মেনে নিলে তাঁর আলোকিত স্বার্থ সংরক্ষিত হবে, তাহলেই কোনো ঐকমত্য হতে পারে। এ পর্যায়ে তুরুপের তাস তাঁর হাতেই।’ এখন একমাত্র শেখ হাসিনার সদিচ্ছাই পারে বাংলাদেশ নতুন করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও মুল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে। শেখ হাসিনা এখন এই ইচ্ছা ব্যক্ত করে করে কি জাতিকে উদ্ধার করবেন? এই প্রশ্ন রেখে রওনক তাঁর লেখা শেষ করেছেন।

রওনক জাহানের কাছে আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এ দেশের জনগণের ভুমিকা কি? গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কি নিছকই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের মামলা? শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া একসাথে বসে মিটমাট করে ফেললেই দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে? জনগণের ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা ও অভিপ্রায়ের জায়গা কই এখানে? জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি(যদি সে প্রতিশ্রুতি দেয়) রক্ষা না করলে কি হবে? জনগণ একই চক্রে বারবার কেন পড়বে? ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়।

গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই কারো একার নয়। সমাজের সবাইকেই এর জন্য লড়তে হয়। এটা এমন কোনো মোয়া নয় যেটা হাসিনা-খালেদা এনে দিবে আর আমরা সেটা বসে বসে খাব। জনগণের দিক থেকে এখন প্রধান কর্তব্য হল একটা কার্যকর রাজনৈতিক পরিসর কায়েম করা যেখানে সকলে মিলে জনস্বার্থের বিষয়টি মাথায় রেখে একটা ঐকমত্যে পৌছানো যাবে। জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় ধারণকারী একটা ব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য এছাড়া আর কোন রাস্তা খোলা নাই।

বাংলাদেশে ক্ষমতা, রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে চিন্তার দৈন্যের দৃশ্যমান সিম্পটমগুলো বোঝার জন্য রওনক জাহান ইন্টারেস্টিং সন্দেহ নাই। সাধারণ জনগণের দিক থেকে বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে এই যে সুশীল চিন্তা ও রাজনীতি থেকে তাদের পাবার কিছু নাই, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ না রাখা। অনেক লম্বা পথ পাড়ি দিতে হলে নিজেদের ভাবতে শিখতে হবে।

২৩ ডিসেম্বর ২০১৫


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।