আসুন গোড়ার সংকট নিয়ে ভাবি


জাতীয় ক্ষেত্রে বেশ কিছু বড় বড় ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক কেলেংকারি, নিরাপত্তা বিশ্লেষকের গুম হয়ে যাওয়া, ব্যাংকের ভেতর থেকেই টাকা পাচারের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি এবং গভর্নরের পদত্যাগ; ধর্ষণ, নির্যাতন ও মেয়েদের খুন করে ফেলার ভীতিকর প্রবণতা বৃদ্ধি ও তনু ধর্ষণ ও হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা, যার প্রতিবাদ সারা দেশে হচ্ছে। কিন্তু একই সাথে লক্ষণীয় সামগ্রিক ভাবে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদের চেয়েও যা ঘটেছে তা হোল বিষয়টিকে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচারণার বিষয়ে পরিণত করার চেষ্টা এবং শেষমেষ তার কোন কুল কিনারা না পাওয়া। ইতোমধ্যে তনুর এক বন্ধুও নিখোঁজ। চট্টগ্রামের বাঁশখালিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের প্রতিবাদ ও তাদের গুলি করে হত্যা; আর, অস্বাভাবিক ইউ পি নির্বাচন ও তার চেয়েও অস্বাভাবিক নির্বাচনের ফল তো আছেই এবং আছে গ্রামে গ্রামে সংঘর্ষ, খুন ও দ্বন্দ্বের আশংকাজনক বৃদ্ধি। বাংলাদেশ বহু স্বার্থে এবং বহু প্রকার দ্বন্দ্বে বিভক্ত, বিক্ষিপ্ত এবং ক্রমে ক্রমে ছত্রভঙ্গ হয়ে এক আত্মঘাতী পরিণামের দিকে ধাবিত হয়ে চলেছে। এরই মধ্যে আরেকটি বাংলা বছর ১৪২২ শেষ হোল। এসেছে ১৪২৩।

আমি বেশ কিছুদিন ধরে গ্রামে। এমন একটি গ্রাম যেখান থেকে ইন্টারনেট সংযোগ পাওয়া কঠিন এবং নিয়মিত পত্রিকা পাওয়া এখনও সাধনার ব্যাপার। কিছু বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে মনে হয় বিষয়টি সম্পর্কে যা জানার তা গ্রামে থাকার কারণে পুরাপুরি বুঝে ওঠা হয়ে উঠছে না। এটা আসলে কতোটা শহুরে অভ্যাসের ফল আর কতোটা তথ্যের অভাবের উপলব্ধি সেটা বোঝা মুশকিল। বিভিন্ন পত্রিকা নিজ নিজ নীতির ছাঁকনিতে ছেঁকে খবর পরিবেশন করে। খবর পড়া আর কোন বিষয় সম্পর্কে জানা দুটো ভিন্ন বিষয়। কোন বিষয়ের খবর পড়লেই সেই বিষয়টি জানা হয়ে যায় না। কোন বিষয় ‘জানা’ অনেক বড় পরিসরের দাবি। সে সম্পর্কে নিশ্চত হওয়াও সহজ নয়। কিন্তু উপলব্ধির মধ্যে যখন ঘাটতির বোধ থেকে যায় তখন ফলপ্রসূ কোন লেখা কঠিন হয়ে পড়ে।

পত্রিকায় সাধারণত লেখালিখি করি। বেশ কিছুদিন ধরে লিখছি না। ভাবছিলাম গ্রামে থাকা তার কারন কিনা। কিন্তু আসলে তা নয় মোটেও। আমরা অনুমান করি শহর আমাদের ভাবতে শেখায়, কিন্তু ভাববার ক্ষমতার সঙ্গে শহর ও গ্রামের কোন ভেদ আছে মনে হয় না। অনেক সময় বরং উলটা মনে হয়। শহর এমন সব বিষয়ের প্রতি আমাদের ব্যস্ত রাখে যা একান্তই শহরকেন্দ্রিক – যার সার্বজনীন চরিত্র নাই, ফলে সকলের বা সমষ্টির প্রসঙ্গ শহর অনায়াসেই আড়াল করে ফেলে। এর সঙ্গে গণমাধ্যমের গিমিক যুক্ত করলে বলা যায় গণমাধ্যমগুলো বিশেষ বিশেষ খবরের প্রতি প্রাধান্য দেবার মধ্য দিয়ে আমাদের চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে। স্বাধীন ভাবে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ক্ষমতা আমরা হারাই। বাহ্যিক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি, কোন কিছুর গভীরে যাবার ফুরসত আমরা আর পাই না। শহর আমাদের অন্ধ করে রাখে।

কিন্তু গ্রামে থাকলেই আমরা চিন্তা করতে পারব তারও কোন যুক্তি নাই। নানান জনের কাছে চিন্তা করতে পারার নানান অর্থ। চিন্তার হিম্মত সকলের এক রকম নয়। চিন্তা সম্পর্কে যার যার অনুমানও ভিন্ন। যেমন কাকে স্রেফ ‘মত’ বলা হয় আর কাকে সক্রিয় ও সজীব চিন্তা এই দুইয়ের  ফারাক অধিকাংশের কাছেই স্পষ্ট নয়। নিজের মতের সঙ্গে অন্যের মতের বিরোধ ঘটলেই ভিন্ন মতের মানুষকে আমরা দুষমন ভাবতে শুরু করি। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে কোন কিছুতে প্রতিক্রিয়া প্রবন না হয়ে যে কোন মত বা বিষয় নিয়েই আমাদের চিন্তা করা জরুরী হয়ে পড়েছে। কিন্তু চিন্তা করতে পারা খুব সহজ কাজ নয়। চিন্তা এমন একটি গুণ যা প্রবৃত্তিগত সম্ভাবনা হিসাবে  জন্মসূত্রে আমাদের থাকলেও প্রতিভা হিসাবে খুব কম মানুষের মধ্যেই তার বিকাশ ঘটে। মানুষ রূপে জন্ম নিলেও আমরা সারাজীবন জীবের চরিত্রের মধ্যেই জীবন কাটিয়ে দেই, সীমা অতিক্রম করতে পারি না। কিভাবে সমাজে চিন্তা চর্চা করা যায় তা সহজে শেখানো যায় না। তবে এটা বলা যায়  চিন্তাশীলতা চর্চার প্রাথমিক লক্ষণ হচ্ছে অন্যের মত ধৈর্য ধরে শোনা; যে মানুষটি 'মত' প্রকাশ করছে, সেটা যতোই ব্যাক্তিগত ও সীমিত হোক,  তাকেও সামাজিক-ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে বোঝার চেষ্টা করা। এই প্রাথমিক পর্যায়টিও আমরা এখনও অতিক্রম করতে পারি নি।

অনেকে আজকাল দেখা হলে বলেন, বহু বছর আগে থেকেই বাংলাদেশ সম্পর্কে যে সকল কথা বলেছিলাম তা এখন দৃশ্যমান হচ্ছে। যেমন, বাংলাদেশে কৃষি, পরিবেশ ও প্রাণ ব্যবস্থার বিপর্যয়, বাঙালি জাতীয়তায়তাবাদ এবং তথাকথিত ধর্ম নিরপেক্ষতার ফ্যাসিবাদী বিকার, মানুষের জৈবিক প্রবৃত্তির অতিরিক্ত অথচ অবিচ্ছিন্ন স্বভাব হিসাবে ধর্মকে জানা ও বোঝার চেষ্টা না করে ধর্মের একাট্টা বিরোধিতার বিপদ, বিশেষত জাতীয়তাবাদীদের মতোই জাতিবাদী পরিচয়ের নিশানা হিসাবে ধর্মকে ব্যবহারের কারণে সহিংসতা ও হানাহানি বেড়ে যাওয়া, ইত্যাদি। ঠিক।  এসব নিয়ে আমি লেখার চেষ্টা করি। সেটা করি বাস্তব সমস্যা মোকাবিলার জায়গা থেকে। কোন অনুমান, কল্পনা বা মতাদর্শে অন্ধ হয়ে নয়। বিশ্ব রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বাংলাদেশের টিকে থাকার কর্তব্যের জায়গা থেকেই সেটা করি। মনে করি, একাত্তর রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশ্বিক ঘটনা। মনে রাখা দরকার বাঙালিবাদীরা যতোই চিৎকার করুক, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ বা সামাজিক ন্যায়বিচার কায়েমের জন্য। স্বাধীনতার ঘোষণায় যা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা রয়েছে। কোন জাতিবাদী অহমিকা বা ধর্ম বিদ্বেষ কায়েমের জন্য বাংলাদেশের জন্ম হয় নি। কিন্তু জাতিবাদীরা জনগণের ইচ্ছা ও সংকল্পকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। যে কারণে আজ অবধি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে বাংলাদেশের পরিগঠন অসম্পূর্ণ এবং স্ববিরোধী হয়ে রয়েছে। এখন ইসলামকে  বাঙালিত্ব ও ধর্ম নিরপেক্ষতার বিপরীতে দাঁড় করিয়ে একটা ভূয়া বিভেদ সজ্ঞানে চর্চা করা হচ্ছে। এর ফলে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে বাংলাদেশের জনগণের উপলব্ধির মারাত্মক ক্ষয় ঘটেছে। সমাজকে দুই ভাগে ভাগ করে এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ কায়েমের লড়াইয়ে জনগণকে আমরা ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারি নি। রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে বাংলাদেশকে নতুন ভাবে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ কাঁধে নিতে হলে সকল প্রকার জাতিবাদীওয়ালা ও সাম্প্রদায়িক শক্তির খপ্পর থেকে জনগণকে মুক্ত করা জরুরী। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফের ভিত্তিতে নতুন রাষ্ট্র গড়া ছাড়া জনগণের আর কোন বিকল্প নাই এ কথাটা বারবার বোঝাতে হবে।

প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসাবে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির নামে বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিম্বা ইসলামের নামে মুসলমান জাতীয়তাবাদের পর্যালোচনা জরুরী হয়ে পড়েছে। জাতিবাদিতা -- সেটা ভাষা হোক কিম্বা ধর্ম - উভয়ের কোনটির সঙ্গেই  বাংলাদেশের জনগণের ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশ কিম্বা ইসলামের দার্শনিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য বিচারের কোন সম্পর্কই নাই। দুটোই আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার অসুখ মাত্র। আধুনিকতা ও আধুনিক রাষ্ট্রের স্ববিরোধিতা। জাতিবাদিতার বিপদ সম্পর্কে আমাদের হুঁশিয়ার হওয়া খুবই জরুরী। বিশ্ব রাজনীতিতে ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমাদের অবশ্যই নতুন ভাবে ভাবতে হবে। সে কারনে জাতিবাদিতার বয়ানের বাইরে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহাসিক অভজ্ঞতার আলোকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নৈতিক ও আদর্শিক ভিত্তিগুলো নতুন ভাবে শনাক্ত করতে হবে। একাত্তরকে যদি আমরা আমাদের ঐক্যের ক্ষেত্র হিসাবে মানি তাহলে তা মোটেও কঠিন কাজ নয়। আমাদের যার যা মত বা বিশ্বাস থাকুক, আমরা এই মর্মে ঐক্যের চেষ্টা চালাতে পারি যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফই আমাদের  রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি হবে। এর ভিত্তিতেই আমরা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে নিজেদের বিভেদ ও বিরোধের ক্ষেত্রগুলোর মীমাংসা করতে পারব। এর ভিত্তিতেই আমরা নতুন ভাবে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হবো। এই পরিপ্রেক্ষিতেই 'রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি’ হিসাবে নিজেদের সজ্ঞান ও সচেতন গঠন ও উপলব্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আমি নানান সময়ে সকলের সঙ্গে নিজের চিন্তা বিনিময়ের চেষ্টা করি।

ধর্মের নামে হোক কিম্বা হোক ভাষা বা সংস্কৃতির নামে – জাতীয়তাবাদ একটি ভয়ানক অসুখ। নিপীড়িত জনগোষ্ঠি জালিমের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ কবার জন্য একটি আত্ম-পরিচয়ের নিশানা খাড়া করে। সেই ঐতিহাসিক পরিস্থিতি ও লড়াই সংগ্রামের অনুষঙ্গের বাইরে যখন নিজেদের জাতি পরিচয়কে তারা শাশ্বত ও চিরায়ত ভাবতে শুরু করে তখনই অসুখ শুরু হয়,  অন্য জনগোষ্ঠিকে ঘৃণার চর্চা শুরু হয় তখন থেকেই। অন্যে যখন আমার পরিচয়কে চিরায়ত বা শাশ্বত মানতে রাজি না হয়ে নিজেদের ভিন্ন পরিচয় খাড়া করে তখন তা একটি দেশে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করে। পাহাড়ি ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ক্ষেত্রে আমরা তা দেখেছি।

মুশকিল নানান দিক থেকেই । বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা মনে করে তারা ধর্মের – বিশেষত ইসলামের মোকাবিলা করছে। আসলে তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদকেই ধর্মে পরিণত করে। ইসলামের বিপরীতে বাঙালি জাতিবাদী চিন্তাকেই এরা ধর্ম হিসাবে গ্রহণ ও চর্চা করে। ফলে ইসলাম তাদের দুষমন হয়ে ওঠে। অন্যদিকে যারা বলেন আমরা আগে মুসলমান পরে বাঙালি তারা ‘মুসলমান’ প্রত্যয়টিকে একটি জাতিবাদী পরিচয়ের বর্গ হিসাবে হাজির করতে চান। জাতীয়তাবাদী ইসলামপন্থিদের ধারণা তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের মোকাবিলা করছে, আসলে তারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জাতিবাদী পরিচয় হিসাবে ইসলামকে ব্যবহার করছে মাত্র। জাতিবাদীদের মতোই ‘মুসলমান’ হয়ে উঠেছে আরেকটি আধুনিক জাতিবাদী পরিচয়ের নাম, যার কাছে অমুসলিমরা ঘৃণার পাত্র। অথচ ইসলামে জাতীয়তাবাদের কোন স্থান নাই। এই দুই প্রকার জাতিবাদ বা সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশে আমাদের ক্রমাগত বিভক্ত ও রক্তাক্ত করে চলেছে।

গোড়ার এই সংকটই জাতীয় ক্ষেত্রে নানান রূপ নিয়ে হাজির হয়। নতুন বাংলা বছরে সেই গোড়ার সংকট যেন আমরা মীমাংসা করতে পারি সেই দিকে যেন মনোযোগী হই।

২ বৈশাখ, ১৪২৩, আরশীনগর

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।