নূরজাহান বেগম নাই, ‘বেগম’ থাকবে তো?


ফরিদা আখতার || Monday 23 May 16

আজ ২৩ মে সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে সবার শ্রদ্ধেয় ‘নূরজাহান আপা’ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।

সকল বয়সের নারীদের কাছেই তিনি ছিলেন নূরজাহান আপা। বাইরে তাঁর পরিচয় উপমহাদেশে প্রথম নারীদের পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে। পত্রিকার নাম ‘বেগম’। এই পত্রিকাটিকে বলা যায়, প্রথম ও একমাত্র সচিত্র নারী সাপ্তাহিক। তাঁর বাবা মোহাম্মদ নাসিরুদ্দীন সওগাত পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন, মেয়েকে দিয়ে শুরু করেছিলেন নারীদের সাহিত্য ক্ষেত্রে এগিয়ে নেয়ার জন্যে পত্রিকাটি। বেগম পত্রিকাটি ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় বেগম। ১৯৫০ সাল থেকে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে। বলা যায়,এখন নারীদের অনেক পত্রিকা প্রকাশিত হলেও শুধু নারীদের জন্য এবং নারীদের দ্বারা প্রকাশিত পত্রিকা 'বেগম'-ই থাকবে। এই রেকর্ড কেউ ভাঙতে পারবে না। কিন্তু নুরজাহান বেগম চলে যাবার পর পত্রিকাটির ভবিষ্যৎ কি হবে, তার চরিত্র বজায় থাকবে কিনা এটাই এখন দেখার বিষয়।

তিনি অসুস্থ জানতাম। তাঁর বয়স ৯১ বছর হয়েছে, সেটাও অজানা নয়, কাজেই তাঁর মৃত্যু আকস্মিক কিছু নয়। কিন্তু বড় শূন্যভাব লাগছে। মনে হচ্ছে একটি বড় বট বৃক্ষ উপড়ে পড়ে গেছে। বট গাছের অনেক ঝুরি হয়,আমরা কি সেই ঝুরি হতে পারবো? তাঁর মৃত্যুর খবর টিভি স্ক্রলে দেখে যারা আমায় জানিয়েছে তাদের সাথে ছুটে গিয়েছিলা্ম স্কয়ার হাসপাতালে। তখনও তাঁর মৃত দেহ ছিল সেখানে।এক ঝলক মুখ দেখার সুযোগ দিয়েছিলেন চিকিৎসক। সাদা কাপড়ে ঢাকা নিথর শরীরে মুখটিকে বড় জীবন্ত মনে হচ্ছিল। ঠোটের কোণের হাসিটা মৃত্যু কেড়ে নিতে পারে নি। মনে হচ্ছিল তিনি বলছেন “তুমি এসেছো?” । তাঁর কাছে গেলে এভাবেই তিনি জিজ্ঞাসা করতেন। নারিন্দায় তাঁর বাড়ীতে লাশ নেয়া হলে পাড়া প্রতিবেশীদের ভিড় জমে যায়। চোখের জলে সবার মুখে এক কথা, কতো অমায়িক ছিলেন তিনি। মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন স্মৃতি ভবনটি তিনি মৃত্যু পর্যন্ত আগলে রেখে দিয়েছেন। বাবার স্মৃতি তাঁর কাছে ছিল অমূল্য সম্পদ। সন্তান হিসেবে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। ধন্য মেয়ে নুরজাহান বেগম।

নূরজাহান বেগম একটি পত্রিকা বের করে এতো বিখ্যাত হলেন কেন? কী তাঁর অবদান ছিল? ‘অবদান’ কথাটা ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা করে ঠিক করা যায় না। ঔপনিবেশিক আমল থেকে সাধারণ ভাবে মুসলমানদের লড়াই-সংগ্রাম এবং মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির গড়ে ওঠার ভালমন্দ ইতিহাসের আলোকেই সেটা বিচার করতে হবে।

নূরজাহান বেগম মেয়েদের জন্য একটি পত্রিকা বের করে এতো বিখ্যাত হলেন কেন? কী তাঁর অবদান ছিল? ‘অবদান’ কথাটা ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন বা আলাদা করে ঠিক করা যায় না। ঔপনিবেশিক আমল থেকে সাধারণ ভাবে মুসলমানদের লড়াই-সংগ্রাম এবং মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির গড়ে ওঠার ভালমন্দ ইতিহাসের আলোকেই সেটা বিচার করতে হবে। যেসব মুসলমান মেয়েরা সবে লিখতে পড়তে শিখছে তাদের কাছে 'বেগম' পত্রিকার মূল্য বিচার করে মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজের বেড়ে ওঠার ইতিহাস বোঝার দরকার আছে।

তবে আমরা যারা নূরজাহান বেগমদের পরে বড় হয়েছি তাঁদের পক্ষে সব সময় আগের জেনারেশানের মূল্যায়ন সহজ নয়। যেমন, ঐতিহাসিক ভাবে দেখলে ‘বেগম’ নিছক একটি নারীদের পত্রিকা ছিল না। মনে রাখতে হবে এই উপমহাদেশে মুসলমান পুরুষরা লেখাপড়া করতে দেরী করেছিলেন নানা কারণে। ইংরেজদের ইংরেজী তাঁরা পড়বেন না। এক পর্যায়ে পুরুষরা লেখা পড়ায় এগিয়ে এলেও নারীদের লেখা পড়ার কোন সুযোগ ছিল না। বেগম রোকেয়া ভাইয়ের সাহায্যে রাতের অন্ধকারে কুপি বাতি জ্বালিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। লেখাপড়া না জানলে কত পিছিয়ে থাকতে হয় সেই ভাবনা থেকে তিনি সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুল স্থাপন করেছিলেন। এই স্কুলেই নূরজাহান বেগম পড়াশোনা করেন এবং ১৯৪২ সালে মেট্রিক পাশ করেন। পরে তিনি ১৯৪৪ সালে কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ থেকে আইএ এবং ১৯৪৬ সালে একই কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। ১৯৫২ সালে কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলার প্রতিষ্ঠাতা রোকনুজ্জামান খানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।বাবা নাসিরুদ্দীনের চেষ্টায় তিনি সেই যুগে একজন উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পেরেছিলেন এবং বেগম পত্রিকার কাজ করে গেছেন নিজ যোগ্যতায়। এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। প্রথম সংখ্যা ছাপা হয়েছিল ৫০০ কপি, দাম ছিল চার আনা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নুরজাহান বেগমই চালিয়েছেন ‘বেগম’ পত্রিকা। তাঁকে সালাম।

নুরজাহান বেগমের কথা বেগম পত্রিকার বাইরে আলোচনার কোন সুযোগ নেই। তাঁর নামের অংশ মনে হলেও এটা ছিল তাঁর জীবনের অংশ। ‘বেগম’ শব্দটি সরাসরি নারী অনুবাদ করা যাবে না। কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা একটু ইতঃস্তত বোধ করি কারণ জমিদাররা তাঁদের স্ত্রীদের ‘বেগম’ বলে সম্বোধন করতেন। উর্দু ভাষায় বুঝতে হলে বে-গম হচ্ছে যার কোন দুঃখ নেই। অথচ বেগম পত্রিকাটি ছিল পিছিয়ে পড়া নারীদের, বিশেষ করে মুসলমান নারীদের, সামনে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্যে একটি উদ্যোগ। সেই অর্থে বলা যায়, এই পত্রিকার উদ্দেশ্য ছিল নারীদের দুঃখ মোচন করা। তবে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য হচ্ছে যখন মুসলমান পরিবারের নারীরা পড়াশোনা করলেও তাদের সাহিত্য প্রতিভা বিকাশের কোন সুযোগ ছিল না সে সময় বেগম তাদের সে সুযোগ করে দিয়েছে। ছোট গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, ছড়াসহ নানাভাবে সাহিত্য চর্চা করার জন্যে। সাহিত্যের অহংকার যাদের আছে তারা পক্ষে মেয়েদের এই প্রকাশের মূল্য বোঝা কঠিন। এককথায় তিনি এদেশের সকল নারীদের, বিশেষ করে মুসলিম নারীদের, লেখিকা, কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছেন। আজ তাদের মধ্যে অনেকেই প্রতিষ্ঠিত লেখিকা। তাদের বই প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু শুরুটা হয়েছে বেগম পত্রিকা থেকেই। এই কথা কোন লেখিকা অস্বীকার করতে পারবেন না যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বেগম তাদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ছোট ছোট খবর প্রকাশের মধ্য দিয়ে বেগম পত্রিকার মাধ্যমে নারী সাংবাদিকও সৃষ্টি হয়েছে।

লেখিকা সৃষ্টি করাই যথেষ্ট নয়, আরো বড় কাজ হচ্ছে নূরজাহান বেগম নারী পাঠক তৈরী করেছেন। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সাহিত্য পত্রিকা বা ম্যাগাজিনগুলোর চরিত্রও পুরুষালি। তাই সাধারণ নারীরা এর মধ্যে তাদের মনের আনন্দ যোগাবার মতো কিছু খুঁজে পান না। বেগম পত্রিকা এমন ছিল যে প্রচ্ছদেই একটি নারী মুখের সুন্দর রঙ্গীন ছবি, যেমন ঘোষনা দিয়ে বলা এটা কিন্তু নারীদের পত্রিকা। এর মধ্যে সব কিছুই আছে। গল্প পড়তে না চাইলে কি হবে, রান্নার প্রণালী দেয়া আছে, এম্রয়ডারীর ডিজাইন, রূপ চর্চা, স্বাস্থ্য কিছুই বাদ নেই। মধ্যবিত্ত নারীদের ফ্যাশন শিখতে চাইলেও বেগম পড়তে হবে। ম্যাগাজিনটি হাতে নিলে পড়তেই হবে। আমাদের মায়েদের দেখেছি বেগম পত্রিকা যেদিন বের হবে সেই দিনের অপেক্ষায় থাকতে, এবং সংসারের কাজ কর্ম সেরে পত্রিকাটি নিয়ে বসতে। তাঁরা জানতেন তাঁদের কোন না কোন প্রয়োজন এই পত্রিকাটি মেটাবে। আমরা বেগম পত্রিকার সাথে পরিচিত হয়েছি আমাদের মা-খালাদের আগ্রহ দেখে। তাঁরা একা পড়তেন না, দল বেঁধে পড়তেন। বিশেষ করে ঈদ সংখ্যা বেগম খুব বড় সাইজের হোত। তার মধ্যে বেশ কিছু পাতা জুড়ে থাকতো এই সংখ্যায় যারা লিখেছেন তাদের পাসপোর্ট সাইজের ছবি। খুব ভাল লাগতো। উৎসাহ যোগাবার কি অভিনব উপায়!

আমরা নিজেরা যখন নারী আন্দোলনে যুক্ত হয়েছি, তখন নূররজাহান বেগমকে দেখে অবাক হয়েছি। তিনি যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ‘বেগম’ আধুনিক করেছেন। বিষয় বিস্তৃত করেছেন। আমার মনে একটু দুঃখ ছিল জীবনে বেগম পত্রিকায় লেখা হোল না। একদিন নুরজাহান আপার ফোন পেলাম ঈদ সংখ্যায় লেখা দেয়ার জন্যে। সেদিন আমার নিজেকে ধন্য মনে হয়েছিল, কিন্তু আমি গোঁ ধরেছিলাম, লিখলে পরিবেশ নিয়ে লিখবো। তিনি তাতেই রাজী হলেন। পাসপোর্ট সাইজের ছবি দিয়ে লেখা ছাপার আনন্দই ছিল আলাদা।

নূরজাহান বেগম কোন পৃষ্ঠপোষকতা পান নি। অনেক দাতা সংস্থা নারী উন্নয়নের জন্যে সহায়তা দিলেও নুরজাহান বেগম কোন সহায়তা পান নি। সরকারও কখনো এগিয়ে আসেনি। কোন সরকারই না। পুরষ্কার পেয়েছেন, ঠিকই, সহায়তা পান নি। রোজার মাসখানেক আগে থেকেই ঈদ সংখ্যার জন্যে তিনি লেখা এবং অর্থ যোগাড় করার জন্যে বিজ্ঞাপন নিতেন। নারীগ্রন্থ প্রবর্তনার ওপর তাঁর যেন একটা আবদার ছিল। এটা আমাদের জন্য ছিল সৌভাগ্যের বিষয়। তিনি নিজে একটি ফোন করে বিজ্ঞাপনের ম্যাটার ও টাকা নেয়ার জন্যে লোক পাঠাতেন। এবার ফোন পাই নি, কারণ তিনি অসুস্থ ছিলেন। এখন তিনি ফোনের বাইরে চলে গেছেন।

তাই প্রশ্ন জাগছে, নুরজাহান বেগম চলে গেছেন, বেগম থাকবে তো?