সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরহাদ মজহার


Tuesday 10 January 17

print

তর্কটা ফেইসবুকের, কিন্তু তর্কটা গুরুত্বপূর্ণ। যেভাবে ফেইসবুকে তর্কটা চলছে সেখান থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি না। তবে তর্কের মর্মটা পেশ করছি।

ধরুন আপনি দাবি করছেন আপনি মত প্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। ফাইন। তার মানে সেটা শুধু আপনার মতের স্বাধীনতা না, সকলের মত প্রকাশের স্বাধীনতা। আপনি যে মতের সমর্থক শুধু সেই মতের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করলে তো হবে না, আপনাকে ভিন্ন বা বিরোধী মতের স্বাধীনতাতেও বিশ্বাস করতে হবে। যে মতের আপনি বিরোধী সেই মতের ধারকরাও তাদের মত প্রকাশ ও প্রচার করতে পারুক সেটাও আপনাকে চাইতে হবে এবং তাদের মত প্রকাশ ও প্রচারের অধিকার আপনাকে মানতে হবে। আফটার অল, সকলের মত প্রকাশ ও প্রচারের স্বাধীনতাতে আপনি বিশ্বাস করেন। তাই না? বেশ। আপনি যে মত প্রকাশ ও প্রচার করতে চান রাষ্ট্র বা সরকার কোন আইনের দ্বারা বা কোন প্রকার প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে কিম্বা গায়ের জোরে সেটা যেন বন্ধ না করে এটাই আপনি চান। ঠিক তেমনি আপনি যে মতের বিরোধী সেই প্রকার বিরুদ্ধ মতও রাষ্ট্র বা সরকার নিষিদ্ধ করলে তার বিরুদ্ধে আপনাকে দাঁড়াতে হবে। নইলে আপনি মত প্রকাশের স্বাধীনতা চান এই কেচ্ছা গেয়ে বেহায়া হবেন না। ঠিক না? গুড।

তাহলে সেই আপনাকেই তো দেখা গিয়েছিল শাহবাগে দৈনিক আমার দেশ বন্ধের দাবি জানাতে। আপনি সফলও হয়েছিলেন। সরকার যখন দৈনিক আমার দেশের তালা বন্ধ করে দিল, আপনি তো তার পক্ষেই ছিলেন। সরকারের দিক থেকে সেটা ছিল আইন বিরোধী অবৈধ কাজ। সেই অবৈধ কাজে আপনি সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। সেই বে আইনী তালা এখনও কিন্তু ঝুলছে। দৈনিক আমার দেশ এখনও বন্ধই আছে। তখন কিন্তু আপনি হাততালি দিয়েছিলেন এবং শাহবাগে মিষ্টি খেয়েছিলেন। এতোদিনে হয়তো ভুলে গিয়েছেন কিভাবে আপনি মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ভুলে যাবেন না, দিগন্ত টেলিভিশনও কিন্তু বেআইনী ভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। এখনও বন্ধই আছে। বন্ধ আছে ইসলামিক টিভি। তাহলে সঙ্গত প্রশ্ন উঠবেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলতে আপনি যে হাতির আণ্ডা বোঝেন সেটা কি গাছে ধরে, নাকি রান্না করে খেতে হয়? নিজের বেলায় দইয়ের হাঁড়ি, পরের বেলায় মাথায় বাড়ি। তাই না? এই যে আপনার নীতি নিজেরটা খাই পরেরটা মারি এই নীতি কি ঠিক? এটাই হচ্ছে তর্কের প্রধান বিষয়।

সেই আপনাকে এখন দেখা যাচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য কান্নাকাটি করছেন। প্রতিবাদ করে বীরত্ব দেখাচ্ছেন। কার বিরুদ্ধে? সরকার? রাষ্ট্র? আরে না না, ওই হিম্মত আপনার নাই। বাংলাদেশের সংবিধানের এখন যে দশা তা আদৌ মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করে কিনা সেটা আপনার জন্য খুবই দূরবর্তী বিষয়। ধরা যাক রাষ্ট্র রাজনীতি সংবিধান ইত্যাদি বোঝার মতো লায়েক আপনি না, বলা হয়, মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত, আপনার দৌড়ও বাংলা একেডেমি পর্যন্তই। তাই প্রতিবাদ জানাচ্ছেন বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধে। বাংলা একাডেমির শামসুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে আপনার প্রতিবাদ। কেন? কারন একটি প্রকাশনা সংস্থাকে আগামি দুই বছরের জন্য বইমেলায় স্টল দেবার অনুমতি বাংলা একাডেমি দেয় নি।

হাসলাম। একটু ভাবুন, প্রকাশনীটির কোন বই একাডেমি নিষিদ্ধ করে নি, কিম্বা তার কার্যক্রমের ওপর কোন প্রকার বাধানিষেধও আরোপ করে নি। এটা করতে পারে এই অনুমানও হাস্যকর। কারন সেই এখতিয়ার একাডেমির নাই।একাডেমির মহাপরিচালকেরও নাই। সেটা রাষ্ট্র করে, সরকার করে, বাংলা একাডেমি না। পরিচালকের কাজের পরিমণ্ডল শুধুই বাংলা একাডেমি। বেচারা শামসুজ্জামান খান!

ঠিক। একাডেমির কার্যক্রম সংক্রান্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিচালক অবশ্যই নিতে পারেন। সেই সিদ্ধান্তের সমালোচনা ও বিরোধিতা করা যায়। অবশ্যই যায়। সেটাই করুন। কিন্তু ওহে মত প্রকাশের স্বাধীনতাওয়ালারা, মত প্রকাশের স্বাধীনতার কেচ্ছা গাইবেন না। বাংলা একাডেমি বই নিষিদ্ধ করেছে, এই ফালতু প্রপাগান্ডা করবেন না। সে ক্ষমতা একেডেমির নাই। প্রকাশনীটির কোন কাজেই কোন নিষেধাজ্ঞা নাই। প্রকাশনীটি আগে যেমন ছিল তেমনি আছে। আমার ধারণা বই মেলার অংশ গ্রহণ করতে না পারার সিদ্ধান্ত বরং প্রকাশনীটির পক্ষে যাবে। মুফতে তারা ভাল একটি প্রচার পেয়ে গেল। এই বিতর্ক প্রকাশনীটির পরিচিতি বাড়িয়েছে। বাড়ুক। শামসুজ্জমান খান ফেইসবুকে তার কোন একটি মন্তব্যে ঠিক এই রকমই বলেছিলেন যার মানে দাঁড়ায় প্রকাশক তার বই বেচার জন্য কিছু বিতর্ক তৈরি করে। সেই অভিযোগ উপেক্ষা করা যাক। কারন ফেইসবুকের তর্ক অন্যত্র। সেটা হোল যে সকল বীরপুরুষ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য বাংলা একেডেমির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে এরা শাহবাগী ব্লগারকুল। এরা অন্যের মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরন করবার দাবি জানায়, দাবি সফল হলে মিষ্টি খায়। অথচ এখন নির্লজ্জ ভাবে তাদের দলভূক্ত একটি প্রকাশনীর পক্ষে দাঁড়িয়ে এখন সকলকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা শেখাচ্ছে। ফেইসবুকে দেখছি বাংলা একাডেমির সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়েও এই সকল ভণ্ড মত প্রকাশের স্বাধীনতাওয়ালাদের বিরুদ্ধে বিপুল জনমত গড়ে উঠেছে। এই তর্ককে আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সচেতনতার লক্ষণ হিসাবে মেনে নিতে পারি। ফেইসবুকের তর্কটা এই কারনেই তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা এই ফাঁকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে দুই একটি কথা বলে ফেলার সুযোগ নেবো।

দুই

জ্বি, আমি একমত যে কোন প্রকাশনীকে বই মেলায় অংশ গ্রহণ থেকে বিরত রাখা বা নিষিদ্ধ করা ঠিক না। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ একটি স্ববিরোধী ও অমীমাংসিত ধারণা। সেই তর্কে আমরা একটু পরে আসছি। নির্বিচারে মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানো একটি বিমূর্ত ও বাস্তবতাবর্জিত ধারণা। এই প্রকার সোনার পিতলা কলস দুনিয়ার কোত্থাও নাই। বাংলাদেশের সংবিধানেও নাই। ‘বাক ও ভাবপ্রকাশ’ এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করবার কথা বলে বটে, কিন্তু সেটা শর্তহীন নয়, শর্তযুক্ত। অর্থাৎ কাছাখোলা স্বাধীনতা বলে কিছু নাই। রাষ্ট্র সেই স্বাধীনতা অবশ্যই ‘আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে’ হরণ কিম্বা সংকুচিত করতে অবশ্যই পারে ও পারবে। যে সকল ক্ষেত্রে রাষ্ট্র তা পারবে সেইগুলো হোল, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশী রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে বন্ধুতাপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃংখলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা’ ইত্যাদি। বাংলাদেশের সংবিধানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ কিম্বা সংকুচিত করবার বিপুল ও বিস্তৃত এখতিয়ার রাষ্ট্রের আছে। বাংলাদেশের সংবিধান সেই ক্ষমতাসীনদের দিয়েছে। ক্ষমতাসীনরা তা হামেশা ব্যবহারও করছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাওয়ালারা এই সকল গোড়ার বিষয় নিয়ে নীরব। কারন তারা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কিম্বা বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু বলতে নারাজ। এখন বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য তারা বেছে নিয়েছে বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমি একটি প্রকাশনী সংস্থাকে কেন দুই বছরের জন্য বইমেলায় স্টল বরাদ্দ দিল না তা নিয়ে খামাখা হৈচৈ করছে।

বইমেলায় স্টল না দেওয়ার পক্ষে বাংলা একাডেমির বইমেলা কমিটির সচিব জালাল আহমেদ যে বক্তব্য দিয়েছেন তা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেছেন, “গত ১০ নভেম্বর বাংলা একাডেমির কাউন্সিলের সভায় শ্রাবণ প্রকাশনীকে বইমেলায় দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। গত বইমেলায় বাংলা একাডেমি পরিস্থিতি বিবেচনায় ‘ইসলাম বিতর্ক’ নামে একটি বই নিষিদ্ধ করেছিল। আর একাডেমির সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন শ্রাবণ প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী রবিন আহসান; যা বাংলা একাডেমির বইমেলার স্বার্থের পরিপন্থী। আর এ জন্য বৃহত্তর স্বার্থে বাংলা একাডেমির বইমেলায় শ্রাবণ প্রকাশনীকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে”। এই বক্তব্য ধোঁয়াশা এবং অর্থহীন। কারন ১. বাংলা একাডেমির যে কোন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার অধিকার বাংলাদেশের যে কোন নাগরিকেরই রয়েছে, পুস্তক প্রকাশকের তো আছেই, তার জন্য এক তরফা কাউকে শাস্তি দেবার অধিকার বাংলা একাডেমির নাই; ২. বাংলা একাডেমির সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কিভাবে ‘বাংলা একাডেমির বইমেলার স্বার্থের পরিপন্থী’? একজন প্রকাশককে বইমেলায় অংশ গ্রহণে অনুমতি না দেওয়ার মধ্যে কিভাবে ‘বইমেলার স্বার্থ’ রক্ষিত হোল? এরপর রয়েছে আরেক বিস্ময়কর দাবি, সেটা হোল ৩. ‘বৃহত্তর স্বার্থ’। এইটা আবার কী জিনিস! জালাল আহমদের বক্তব্য বিতর্কটিকে খামাখা আরও প্রলম্বিত করেছে। তিনি যে যুক্তিতে ‘বাধানিষেধ আরোপ’ করছেন তা ‘যুক্তিসঙ্গত’ নয়। আশা করি তিনি এই লেখাটি পড়বেন এবং ‘একাডেমির বইমেলার স্বার্থ’ , ‘বৃহত্তর স্বার্থ’ ইত্যাদি বাগাড়ম্বর দ্বারা তিনি কি বোঝাচ্ছেন সেটা আমাদের বুঝিয়ে বলবেন।

শামসুজ্জামান খান বলেছেন, “গত বছরে বই মেলায় ইসলাম ধর্ম নিয়ে একটি বিতর্কিত বই প্রকাশ করে বদ্বীপ প্রকাশনী। পরবর্তীতে ওই বই নিষিদ্ধ এবং প্রকাশককে গ্রেফতার করা হয়। আমরা বদ্বীপ প্রকাশনীকে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। তারা ধর্মীয় বিষয়ে অশ্লীল বই প্রকাশের কারণে অভিযুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে হেফাজতে ইসলাম বইমেলায় আক্রমণের হুমকি দেয়। ওই প্রকাশনা থাকলে বইমেলা পুড়িয়ে দেওয়া হতো। কিন্ত সে (রবিন আহসান) ওই প্রকাশনীর পক্ষে টিএসসিতে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছে। এজন্যই তাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে”। অর্থাৎ শামসুজ্জামান খান ভিন্ন কথা বলছেন। তিনি জালাল আহমেদের কথা রিপিট করেন নি।

যুক্তি হচ্ছে গত বছর আরেকটি প্রকাশনা ধর্মীয় বিষয়ে অশ্লীল বই প্রকাশ করেছিল, বাংলা একাডেমি সেই প্রকাশনীকে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। কারন বইটিকে ঘিরে মেলায় দাঙ্গাহাঙ্গামা হতে পারত, সংবিধানের ‘মৌলিক অধিকার’ অংশের অনুচ্ছেদ থেকে যদি এই ক্ষেত্রে নীতি নিয়ে তর্ক করি তাহলে বলা যায় তিনটি যুক্তি শামসুজ্জামানের পক্ষে রয়েছেঃ বইটির কারনে ১. জনশৃংখলা অবনতির আশংকা; বইটিতে ২. শালীনতার অভাব এবং ৩. বইটির নৈতিকতার সমস্যা। হ্যাঁ। এই তিনটি কারনে বাংলাদেশে বদ্বীপ প্রকাশনীকে বইমেলায় নিষিদ্ধ করা যায়। যদি আমরা মনে করি সেটা মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি, তাহলে বিদ্যমান সংবিধানের বিরুদ্ধে দঁড়ানো ও তার সংস্কার দাবি করা ছাড়া আমাদের কোন গত্যন্তর নাই। তাহলে বাংলা একাডেমির বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করে বাংলাদেশের জন্য নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধানের জন্য আমাদের লড়তে হবে। সেই লড়াই ফ্যসিস্ট রাষ্ট্রের সমর্থকরা করবেন না, বলাই বাহুল্য।

‘ইসলাম বিতর্ক’ বইটির বিরুদ্ধে বাংলা একাডেমির অভিযোগগুলো সঠিক কি? এটা নিয়ে তর্ক হতে পারে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা ওয়ালাদের কাছ থেকে অভিযোগ সঠিক না বেঠিক সেই বিষয়ে কোন লেখা আমার চোখে পড়ে নি। অর্থাৎ বাংলা একাডেমির বাধানিষেধ ‘যুক্তিসঙ্গত’ কিনা সেই তর্ক তো অবশ্যই করা যেতো। করা উচিতও বটে। এখনও করা যায়। বোঝাতে চাইছি, যদি আমরা আসলেই মুক্তচিন্তার পক্ষে হই তাহলে তর্কটা কোথায় এবং কী নিয়ে সেই বিষয়ে আমাদের সজ্ঞান ও সচেতন হতে হবে। মুশকিল হচ্ছে ভূয়া মত প্রকাশের স্বাধীনতা ওয়ালারা সেই তর্ক করতে চান না। করেন না। তাদের মুক্তবুদ্ধির অন্তঃসারশূন্যতা এখানেই সাফ সাফ ধরা পড়ে।

‘ইসলাম বিতর্ক' বইটির জন্য হেফাজতে ইসলাম হামলার হুমকি দিয়েছিল কি? শামসুজ্জামান খান হেফাজতের নিন্দা করে কিছু হাততালি পেতে চাইতে পারেন বটে, তবে হুমকি যদি কেউ আসলেই দিয়ে থাকে তবে তারা সাংবিধানিক দায়িত্বই পালন করছে। কারন অশ্লীলতা এবং নৈতিকতা বিরোধী বক্তব্যের জন্যই ইসলামপন্থিরা প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং তাদের প্রতিবাদ সংবিধান সম্মত। সরকার ও একাডেমি উভয়েই বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী কাজ করেছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্র অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করতেই পারে। এটা সংবিধানেই আছে। শামসুজ্জামান খাবও এই ধরনের বাজে উস্কানিমূলক বই বইমেলা থেকে সরিয়ে দিয়ে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেছেন।

হুম! তর্কটা আরও গভীরে। ‘ইসলাম বিতর্ক’ বই প্রকাশের জন্য তথ্য প্রযুক্তি আইনের মামলায় গ্রন্থটির সম্পাদক শামসুজ্জোহা মানিক, ছাপাখানা শব্দকলি প্রিন্টার্সের মালিক তসলিম উদ্দিন কাজল ও বদ্বীপের বিপণন শাখার প্রধান শামসুল আলম – অর্থাৎ লেখক-প্রকাশকসহ তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তথ্য প্রযুক্তি আইনে কেন মামলা হোল? পুলিশ জানিয়েছে তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলার কারণ একটি ওয়েবসাইটে এই বইটি অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে, তাই তাদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে মামলা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে যদি আমরা দাঁড়াতে চাই তাহলে তথ্য প্রযুক্তি আইনের মতো কালো আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং জনগণকে সচেতন করে তোলাই খুবই জরুরি কাজ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়াতে চাই না। কারন মাহমুদুর রহমান, আদিলুর রহমান খান সহ আরো অনেককে , যাদের আমরা পছন্দ করি না, তাদের জবরদস্ত শায়েস্তা করা গিয়েছে। তো তথ্য প্রযুক্তি আইন আমামদের জন্য ইস্যু নয়, ইস্যু হোল বাংলা একাডেমি। যদি এই দিকগুলো আমরা বুঝি তাহলে এটাও বুঝব যারা বাংলা একাডেমির সামনে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করছেন মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা তাদের উদ্দেশ্য না। তারা মতপ্রকাশকে একটা বিশদ ক্যারিকেচারে পরিণত করেছেন। শামসুজ্জামান খান দাবি করেছেন বইমেলা পণ্ড করাই তাদের উদ্দেশ্য। বাইরে থেকে মনে হয় পুস্তক ব্যবসায়ীদের অন্তর্দ্বন্দ্বই এখানে মুখ্য।

তিন

বলেছি, আধুনিক রাষ্ট্রে ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ একটি স্ববিরোধী ও অমীমাংসিত ধারণা। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ ঘোষণা দেয়, ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল’। গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। কিন্তু আইনের দিক থেকে চ্যালঞ্জ এতে বাড়ে, কমে না। কারন কি?

আমরা সাধারনত মনে করি ‘চিন্তা’ মানে কী, আমরা তা জানি ও বুঝি। কিন্তু আমামদের জানা ও বুঝাবুঝি দিয়ে আইন চলে না। আইনের দিক থেকে প্রশ্ন থেকে যায়। ‘চিন্তা’ কী, এই প্রশ্নের সুরাহা না হলে, রাষ্ট্র কীসের নিশ্চয়তা দিচ্ছে তা অস্পষ্ট ও অপরিচ্ছন্ন থেকে যায়। ‘চিন্তা’ ‘মত’ ইত্যাদিকে দর্শন বা বুদ্ধিবৃত্তির চর্চার জায়গা থেকে বুঝলে আইনের চলে না। প্রশ্ন হচ্ছে আইনী অর্থে ‘চিন্তা’, ‘বিবেক’ ইত্যাদিকে আমরা কিভাবে বুঝব? এই সকল প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই আধুনিক রাষ্ট্র নানান অস্পষ্টতা ও পরস্পর বিরোধী ব্যাখ্যার গহ্বরে পড়ে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ ‘মত’, ‘মত প্রকাশ’ বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা ইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহার করে নি। ইংরেজি ফ্রিডম অফ স্পিচ এন্ড এক্সপ্রেশানের অনুবাদ হিসাবে বলা হয়েছে ‘বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার’। ফ্রিডম অব প্রেস কথাটার অনুবাদ ‘সংবাদপত্রের স্বাধীনতা’। আমরা অনুমান করি চিন্তা বিবেক মত ও সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা ধারণা হিসাবে স্পষ্ট, কিন্তু ব্যাপারটা এতো সরল না। এমনকি আইনী পরিভাষা বা বর্গ হিসাবেও পরিচ্ছন্ন ও স্পষ্ট বিষয় নয়। কিন্তু কথাটা মোটেও ঠিক নয়। যে কারণে মত প্রকাশের স্বাধীনতা কার্যত একটি অমীংসিত বিষয় হিসাবেই রয়ে গিয়েছে। যারা মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেন, তাদের এই গোড়ার দিকটি মনে রাখতে হবে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে যে কথাটি আমি বলে রাখতে চাই সেটা হোল ভাবনা চিন্তার বিকাশ ও বিবেকের স্বচ্ছতা আইন বা গঠনতন্ত্র (সংবিধান বা কন্সটিটিউশান) দ্বারা নিশ্চিত করা যায় না। সমাজ ও রাষ্ট্রকে চলতে হলে দরকার আইন ও সামাজিক নীতিনৈতিকতা বোধের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে একটি সমাজে সেই সমন্বয় ঘটাবার ক্ষেত্রে সামাজিক সচেতনতার মাত্রা কতোটুকু? সমাজে সেই সচেতনতা কতোটুকু বিরাজমান যাতে ‘চিন্তা’, ‘বিবেক’ ইত্যাদির মানে বা তাৎপর্য নিয়ে সমাজে আলোচনা হতে পারে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেন ব্যাক্তিতান্ত্রিক স্বেচ্ছাচারে পর্যবসিত না হয় তার জন্য নীতিনৈতিকতাবোধের শক্তি সমাজে কতোটা প্রবল। মত প্রকাশের অধিকার অবশ্যই নিশ্চিত করা উচিত, কিন্তু কোথায় তার সীমা তার উপলব্ধি দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত। দায়িত্ব বা দায় বহনে রাজি না থেকে স্রেফ স্বাধীনতা স্বেচ্ছাচার মাত্র। তখনই আইন দিয়ে স্বেচ্ছাচার রোধের কথা ওঠে। সে কারনেই সমন্বয়ের কথা বলেছি, ধারণা ও আইনের মধ্যে সমন্বয়ের অনিবার্যতা সমাজ তাই এড়িয়ে যেতে পারে না। সমন্বয় কতোটা কার্যকর তার দ্বারাই আমরা  সমাজকে চিনতে পারি।

বলা বাহুল্য, বই বা সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করার ফল কখনই সমাজ, সংস্কৃতি বা রাজনীতির জন্য ভাল হয় না। এতে সমাজে বিভক্তি, বিভাজন, অস্থিরতাই শুধু বাড়ে বা, চিন্তা রুদ্ধ হয়। এই জুলুম একটি জঙ্গোষ্ঠিকে ধ্বংস করে দেবার জন্য যথেষ্ট। যেসকল বিষয় চিন্তার পরিমণ্ডলে মতাদর্শিক বিতর্কের মধ্য দিয়ে আমরা নিষ্পন্ন করি না, আইন আদালত পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে মীমাংসার চেষ্টা করি, তখন আমরা নিজেরাই একটি পুলিশি রাষ্ট্রের আবির্ভাব ও দানবে পরিণত হবার বীজ পুঁতি। যখন সেই দানব চোখের সামনে হাজির হয় তখন আমরা হতচকিত হয়ে ও হতভম্ব হয়ে পড়ি।

যে কোন বিতর্কের সামাজিক মীমাংসার ধারা শক্তিশালী না হলে সমাজে চিন্তার বিকাশ ঘটে না; চিন্তা বা মতকে আইন দ্বারা নিষিদ্ধ করলে সমাজ পিছিয়ে পড়ে। সে কারনে আমি বই বা সংবাদপত্র নিষিদ্ধের বিপক্ষে। কিন্তু সেটা মতের স্বাধীনতা মার্কা সস্তা চিৎকার নয়। সমর্থন করি বলে নয়, সমাজ বা রাষ্ট্রের উর্ধে ‘মতের স্বাধীনতা’ নামক ব্যাক্তির এমন কোন সার্বভৌম ক্ষমতায় আমি বিশ্বাস করি না যার দ্বারা ব্যাক্তি ব্যাক্তিগত কুৎসা রটনা, কিম্বা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য ধর্ম নিয়ে ঠাট্টাতামাশা ফালতু মন্তব্য কিম্বা নবি রসুল কৃষ্ণ, রাম, যীশু, মুসার জীবন নিয়ে কদর্য ভাষায় লেখালিখি করতে পারে। নিজের মতের নির্বিচার স্বাধীনতার দাবি বিমূর্ত ভূতের মতো। এই স্বাধীনতা একবার কাঁধে চাপলে নামানো মুশকিল হয়ে পড়ে। তখন ব্যক্তি ভাবতে শুরু করে যে কোন বিষয় নিয়ে উস্কানি মূলক, দায়িত্বহীন ও সামাজিক শৃংখলা এলোমেলো করে দিয়ে মজা দেখার চরম ব্যাক্তিতান্ত্রিক আচরনই বুঝি মতের স্বাধীনতা। এই প্রকার মতের স্বাধীনতার আমি সমর্থক নই।

প্রশ্ন হচ্ছে কথা বা লেখালিখির দ্বারা কাউকে আহত করা, কারো অমর্যাদা করা, মানবিক মর্যাদা ক্ষুন্ন করা কি আইন দ্বারা প্রতিরোধ করা সম্ভব? আমি মনে করি সেটা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সংবিধান অবশ্য কারো ‘মানহানি’ হয় এমন অপরাধের বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধের আরোপ করা বিধান রেখেছে। কিন্তু তারপরও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো, নবি রসুলদের অপমান বন্ধ করবার কোন আইন নাই। ‘ধর্মীয় অনুভূতি’ আহত করবার পুরানা ধারণা দিয়ে কাজ চলছে। কিন্তু আইন সমাধান নয়। আইনের দ্বারা কোন মত, রচনা বা লেখলিখি নিষিদ্ধ ও শাস্তি দেবার বিধান জারি মূলত রাষ্ট্রকেই শক্তিশালী করে। তখন রাষ্ট্র তথ্য প্রযুক্তির মতো মানবাধিকার বিরোধী আইন জারি করে।

এই অনতিক্রম্য মুশকিল ও অনিবার্য স্ববিরোধিতার পরিপ্রেক্ষিতে ঈসায়ী নববর্ষের আলোকে আমাকে যাত্রার বিবেকের মতো ‘বিবেক’, ‘বিবেক’ বলে ইতিহাসের মঞ্চে লাফিয়ে পড়তে ইচ্ছা করছে। তাঁকে স্মরণ করি যিনি ক্রুশবিদ্ধ হয়েও তাঁর প্রতি যারা নিষ্ঠুর ও নির্মম আচরন করেছিল, তাদের ক্ষমা করে দিতে পেরেছিলেন। বিবেক হচ্ছে সেই দিব্যশক্তির চর্চা যা বাস্তবতাকে শুধু বুদ্ধি যুক্তি বা আইন দিয়ে নয়, হৃদয় দিয়ে ও ভবিষ্যতের দিকে নজর রেখে বোঝার চেষ্টা করে। বিবেক বাইরে থেকে আরোপিত কোন আইন নয়, আমাদের অন্তরের উপলব্ধি থেকে জাত ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের ধারণা।এটা আমাদের ভেতর থেকে আসা সনির্বন্ধ তাগিদ, যা আমাদের শেখায় অপরকে হাতে মারা বা দেহে আঘাত করার চেয়েও কথা বা লেখালিখি দ্বারা কষ্ট দেওয়া বা আঘাত করা অধিক অন্যায়। অপরকে কষ্ট দেওয়া, কুৎসিত ও কদর্য ভাষা দিয়ে অপমান করা – এর চেয়ে অধিক অপরাধ আর কিছুই হতে পারে না। এই ক্ষরণ দীর্ঘকাল জারি থাকে। কথার কদর্যতা দিয়ে আঘাত মত প্রকাশের স্বাধীনতা হতে পারে না। ক্ষরণ অব্যাহত থাকলে কোন সমাজই রক্তপাত ও হানাহানি বন্ধ করতে পারে না। অসংখ্য জীবন দিয়ে শোধ করেও পরিস্থিতি থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না।

বিবেক বিবেক! তাই বলি, নিজের বেলায় দইয়ের হাঁড়ি, পরের বেলায় মাথায় বাড়ি। না ভাই, এই ব্যবসা চলবে না।

 

১৮ পৌষ ১৪২৩। ৩০ ডিসেম্বর ২০১৬। শ্যামলী।

 

 

 

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : কওমি মাদ্রাসা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বইমেলা, বাংলা একাডেমি

View: 1766 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD