সাম্প্রতিক রাজনীতি গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র আদালত, বিচার ও ইনসাফ শাপলা ও শাহবাগ সাম্প্রদায়িকতা, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্র মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সৈনিকতা ও গণপ্রতিরক্ষা ভারত ও আঞ্চলিক রাজনীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতি অর্থনৈতিক গোলকায়ন ও বিশ্বব্যবস্থা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য কৃষক ও কৃষি শ্রম ও কারখানা শিক্ষা: দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশল জীবাশ্ম জ্বালানির অর্থনীতি ও রাজনীতি স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নারী প্রশ্ন সাহিত্যের সমাজতত্ত্ব ও রাজনীতি আবার ছাপা চিন্তা পুরানা সংখ্যা সাক্ষাৎকার

ফরহাদ মজহার


Saturday 14 January 17

print

শিক্ষা আইন, শিক্ষা নীতি ও পাঠ্যবই নিয়ে বিতর্ক চলছে। বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত ভাবে। পুরা শিক্ষা ব্যবস্থাকে মাথায় রেখে সেটা হচ্ছে না। সেটা আশাও করি না। কিন্তু এখন দেখছি জাতিবাদি ও ধর্ম নিরপেক্ষ ওয়ালারা চরম গোস্বা করেছে। কেন? কারন সরকার নাকি হেফাজতের দাবি মেনে নিয়েছে। শিক্ষা কোন ব্যাপার না, পাঠ্যবই সম্পর্কে হেফাজতের আপত্তি সরকার মানলো কেন এই হোল তর্ক। টুপিপরা কোর্তাপরা এইসব বর্বর অশিক্ষিত পশ্চাতপদ মানুষ বুঝি মঙ্গলগ্রহ থেকে এসেছে, তারা এই দেশের কেউ না। এদের ছেলেমেয়ে বালবাচ্চা নাই, শিক্ষা নিয়ে এদের কোন মাথাব্যথা নাই। তো এই টুপিওয়ালাদের আপত্তি শেখ হাসিনা শেষমেষ মেনে নিল? হায় হায়। জাতিবাদী ও সেকুলার হাহাকারে চতুর্দিক দীর্ণবিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে!

বিবিসি দেখছি রীতিমতো উস্কানিমূলক শিরোনাম দিয়ে রিপোর্ট করেছেঃ ‘বাংলাদেশে পাঠ্যপুস্তকে বিতর্কিত বিষয়, খুশি করেছে হেফাজতকে?’ (১২ জানুয়ারি ২০১৭) । উদ্দেশ্য হচ্ছে এটা প্রমাণ করা যে হেফাজতকে খুশি করবার জন্যই বুঝি পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

তাই কি? হেফাজতে ইসলামীর মুখপাত্র মাওলানা মুনীর আহমেদ বিবিসি বাংলাকে ভাল উত্তর দিয়েছেন: "এখানে হেফাজতের খুশী-অখুশির প্রশ্ন নেই। বরং দেশের গণ-মানুষের প্রত্যাশার দিকটাই বিবেচ্য বিষয়। পাঠ্যপুস্তকে হেফাজতের দাবী শতভাগ পূরণ করা হয়েছে বলে যারা বিতর্ক তুলতে চাচ্ছে, আমরা মনে করি তাদেরকে সবাই চিনে। তারা সমাজ বিচ্ছিন্ন অতিক্ষুদ্র একটা অংশ।" দুটো গুরুত্বপুর্ণ বিষয় মাওলানা মুনীর তুলেছেন: এক. গণমানুষের প্রত্যাশা এবং দুই. গণমাধ্যমের জোরে সমাজের অতি ক্ষুদ্র অংশের আধিপত্য। তদুপরি গণমানুষের প্রত্যাশার প্রশ্ন বাদ দিয়ে ইস্যুটির রাজনীতিকরণ ও ক্রমাগত উস্কানি।

ভাবুন এবার। তর্কটা আর শিক্ষা আইন, শিক্ষা নীতি কিম্বা পাঠ্যবই নিয়ে থাকল না। হয়ে উঠেছে হেফাজতের বিরুদ্ধে জাতিবাদী ও ধর্ম নিরপেক্ষতাওয়ালাদের রাজনৈতিক লড়াই। এখন আপনি চাইলে গ্যালারিতে বসে দুই পক্ষের লড়াই উপভোগ করতে পারেন। তবে সেটা বিপজ্জনক বিলাসিতা হবে। ঠিক হবে না। কারন শিশুকিশোররা অল্প বয়স থেকেই ঠিক ভাবে শিক্ষা পাক সেটা তো চাইতেই হবে। তাদের আত্মিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ জরুরী। এর সঙ্গে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জড়িত। কিন্তু জাতিবাদী ও ধর্ম নিরপেক্ষওয়ালারা আমাদের সেটা করতে দেবে না। তারা ধর্মীয় বিদ্বেষের রাজনীতি করবেই। তারা সমাজের বৃহত্তর অংশের কোন কথাই শুনবে না। তাদের কথাই সকলকে শুনতে হবে; তারা যাকে শিক্ষা আইন বলে সেটা আমাদের মানতে হবে; যাকে শিক্ষা নীতি বলে সেটা আমাদের বাস্তবায়ন করতে হবে, ইত্যাদি। তারা খামখেয়ালি খেয়ালখুশি মতো বিএনপি-জামাত জোটের আমলের পাঠ্যবই তাদের মতো করে বদলাবে। সেটাও শুদ্ধ ভাবে নয়, মারাত্মক ভুলভাবে চরম বিনোদনমূলক ‘প্রিন্টিং মিস্টেক’ সহ। সেটাও বিনোদন হিসাবে আমাদের মেনে নিতে হবে। এখন তাদের ৮৫জন বিশিষ্ট ব্যাক্তি এক বিবৃতিতে দাবি করেছে চলতি বছরের পাঠ্য বইতে নাকি তিন ধরনের ‘ভুল, অসংগতি কিংবা বিকৃতি’ রয়েছে। প্রথম দুই ভুল হোল বানান ও তথ্যগত বিকৃতি ও বাক্য গঠনের ভুল। এই ভুলগুলো নাকি ‘সঠিক পরিকল্পনা এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা’র অভাবে হয়েছে। গুড। তাহলে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে চাকুরি ছাড়ুন, যোগ্যদের নিয়োগ দিন। সেটা তারা দেবেন না। কারন অযোগ্যতা ও পরিকল্পনাহীনতা তেমন ধর্তব্যের মধ্যে নয়। কিন্তু তৃতীয় ভুলটি নাকি ‘পরিকল্পিত’। যারা করেছে তারা নাকি সেটা ‘ইচ্ছাকৃত ভাবেই’ করেছে। সেটা করা হয়েছে একটি সাম্প্রদায়িক জাতিরাষ্ট্র গঠনের জন্য”। দুর্দান্ত চিন্তা!!

তো আপনি যদি জাতিবাদী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র গড়বার জন্য পাঠ্যবই তৈয়ার করেন তো তার প্রতিক্রিয়া তো হবেই। সাম্প্রদায়িক জাতি চিন্তার সঙ্গে গণমানুষের প্রত্যাশার বিরোধ আছে। মাওলানা মুনির ঠিকই বলেছেন তথাকথিত বিশিষ্ট ব্যাক্তিরা সমাজের ক্ষুদ্র একটি অংশ। এরা এমনই ‘বিশিষ্ট’ যে চরম বিনোদনমূলক বানান ভুল, বাক্য ভুল ও তথ্য ভুলের পক্ষে সাফাই গাইতে বিন্দুমাত্র লজ্জা বোধ করলেন না। পুরা বিষয়টাকে হেফাজত বনাম তাদের সংকীর্ণ জাতিবাদী সাম্প্রদায়িকতা এবং ইসলাম বিদ্বেষী রাজনীতির দ্বন্দ্বে পর্যবসিত করলেন। কুকুরের লেজ ইচ্ছা করলেও আপনি সোজা করতে পারবেন না।

ধরো তক্তা মারো পেরেক

ঠিক আছে। শিক্ষা আইন, শিক্ষা নীতি এবং পাঠ্যবই নিয়ে আমাদের চরম মতপার্থক্য আছে। বড়সড় চ্যালেঞ্জ বটে কিন্তু আমাদের একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে পৌঁছাতে হবে। সেতাই আমাদের কর্তব্য। সেই ক্ষেত্রে আমরা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে তর্কবিতর্কের মধ্য দিয়ে চাইলে অগ্রসর হতে পারি। সেটাই সবচেয়ে সমীচিন হয়। কিন্তু সেই তর্ক আমরা করছি না। আমরা ধরো তক্তা মারো পেরেকে বিশ্বাস করি, এটাই আমাদের জাতীয় চর্চা। ফলে হেফাজতের ওপর এখন দোষ চাপিয়ে নিজেদের লজ্জা ঢাকবার চেষ্টা করছি। তবুও তর্কে সবাইকে অন্তর্ভূক্ত রাখার জন্য আমরা প্রশ্নটি এভাবে তুলতে পারি যে আমরা সকলেই নিশ্চয়ই চাইব যে আমাদের সন্তান সঠিক ভাবে ঠিক বিষয়ে শিক্ষা পাক। প্রশ্ন তুলতে পারি কিভাবে সঠিক ভাবে সঠিক শিক্ষা দেওয়া সম্ভব?

‘সঠিক ভাবে’ শিক্ষা দেওয়া শিক্ষা পদ্ধতি সংক্রান্ত তর্ক। আজ এখানে সেই তর্কে যাবো না। আজ পাঠ্য বিষয় কেন্দ্র করে আলোচনা করব। মুশকিল হচ্ছে, ‘ঠিক ভাবে বা সঠিক ভাবে শিক্ষা’ বলতে আমরা কী বুঝব সেটা একটি সমাজবিচ্ছিন্ন বিমূর্ত তর্ক নয়, সামাজিক তর্ক। তর্কবিতর্কের একটা সাধারণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করার জন্যই এই ভাবে কথাটা হাজির করলাম। কাণ্ডজ্ঞানেই আমরা বলতে পারি ‘সঠিক শিক্ষা’ নামক সোনার পাথরবাটি জাতীয় কিছু নাই। শিক্ষা সম্পর্কে সমাজের নানান শ্রেণি ও শক্তির ভিন্ন ভিন্ন মত আছে, রাজনৈতিক অবস্থান আছে। তাহলে উচিত কাজ হচ্ছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সেই মতগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।

গণমাধ্যমের বরাতে আমরা এখন জানি যে “পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন, সংযোজন-বিয়োজনের নিয়ম হচ্ছে, বিদ্যালয় পর্যায়ে ট্রাই-আউটের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতামত সংগ্রহ, তার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে কর্মশালা এবং তার আলোকে এনসিসিতে (ন্যাশনাল কারিকুলাম কো-অর্ডিনেশন কমিটি) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কিন্তু এবারের পাঠ্যপুস্তকের সংযোজন-বিয়োজনের বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত হয়েছে এনসিসিসির সভায়। এনসিসিসির প্রধান হচ্ছেন শিক্ষাসচিব। গত বছরের ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত এনসিসির সভায় সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একটি তালিকা দিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন না করে সে অনুসারে পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন-বিয়োজন করে নেওয়ার কথা বলেন বলে জানা গেছে। তাঁর এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই এবারের পরিবর্তন এসেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে”। (দেখুন কালের কন্ঠ, ‘পাঠ্য বইয়ে এসব কী’ ৪ জানুয়ারি ২০১৭)।

তাহলে সামাজিক বিষয়কে যেভাবে সামাজিক ভাবে নিষ্পত্তির প্রয়োজন ছিল সেটা করা হয় নি। এখন দোষ হেফাজতের ঘাড়ে চাপিয়ে ধর্ম বিদ্বেষীরা পঁচা কাসুন্দি ঘেঁটে মোরাল হাই গ্রাউন্ড অর্জনের সস্তা প্রচার চালাচ্ছে।

সত্য হচ্ছে ২০১৬ সালে হেফাজতে ইসলাম স্কুলের বইপত্রে ইসলামী ভাবধারা বাদ দিয়ে 'নাস্তিক্যবাদ এবং ‘হিন্দুত্ব’ পড়ানো হচ্ছে।' অনেকে প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক ভান বজায় রাখবার জন্য বলছেন ‘নাস্তিক্যবাদ’ ও ‘হিন্দুত্ব’ পড়ানো কথাটা পলিটিকালি কারেক্ট ভাষা না। এই ভাষা হেফাজতের ব্যবহার করা ঠিক হয় নি। তাঁদের সঙ্গে আমি অমত করি না। কিন্তু ভাইরে, ইঁটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। আপনি যখন ইসলাম নির্মূলের রাজনীতি করেন আর খেয়ে না খেয়ে বইপুস্তক শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ইসলামি ভাবধারা কিম্বা ইসলামের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে জড়িত বিষয়গুলো পরিকল্পিত ভাবে বাদ দেবেন, আশা করবেন না যে আপনার প্রতিপক্ষ হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। হেফাজত অন্তত বলে নি যে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা শিবসেনাদের হাতে চলে গিয়েছে। তারা তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছে মাত্র। তাদের আপত্তি অযৌক্তিক হলে আসুন তা নিয়ে তর্ক করি। অথচ আপনি তা করতে চান না, আপনি রাজনীতি দিয়ে পগার পেরিয়ে যেতে চান। আপনার নিজের জাতিবোধ ও জাত্যাভিমান হিটলারের ফ্যাসিজমকে হার মানায়। আপনি নিজে ইসলাম বিদ্বেষী ঘৃণ্য বর্ণবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার চর্চা করবেন, ইসলাম নির্মূলের রাজনীতি করবেন আর আশা করবেন হেফাজত নাস্তিক্যবাদ আর হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ না করে আপনার পাঠ্যবই বসে বসে গিলবে। মহৎ চিন্তা!

হেফাজতে ইসলাম তো ঠিকই তাদের জায়গা থেকে জানতে চেয়েছে ২০১২ সালে থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীর বাংলা বইতে ইসলামী ভাবধারার ১৭টি বিষয় বাদ দিলেন কী যুক্তিতে? বাদ দিলেন তো দিলেন তার ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো এর বিপরীতে সাতটি ইসলামী ভাবধারার বিপরীত লেখা অন্তর্ভূক্ত করলেন কেন? হেফাজত হুমায়ুন আজাদের 'বই' কবিতা নিয়ে আপত্তি করেছে, কারন ইসলাম ও মুসলমান সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদের অনেক কুৎসিত ও কদর্য মন্তব্য আছে। যা কোন ন্যূনতম সাহিত্য রুচির সঙ্গে যায় না। তিনি বাংলাদেশের গণমানুষের প্রত্যাশার বিপরীত একজন মানুষ। এই ধরণের ব্যাক্তি ও সমাজের বৃহৎ অংশের কাছে দুষমন হিসাবে চিহ্নিত একজনকে জাতীয় শিক্ষাক্রমের পাঠ্য বইয়ের জন্য কোন্‌ যুক্তিতে নির্বাচিত করলেন? লেখক আর কবি হিসাবে এই ধরনের ব্যাক্তিদের শিশু ও কিশোররা কিছু বুঝে উঠবার আগেই তাদের মনে গেঁথে দেবেন, এই সহজ রাজনীতি বোঝার মতো অক্ষম হেফাজত নয়। ফলে তারা সঙ্গত আপত্তি করেছে। হেফাজত চাইছে না এমন কোন লেখকের লেখা শিশু বা কিশোর বয়সীরা পড়ুক, যারা ধর্মের প্রশ্ন অসহিষ্ণু এবং ধর্মাপ্রাণ মানুষের প্রাণে আঘাত দিয়ে বিকৃত আনন্দ উপভোগ করে। তারা বড় হয়ে তাদের বিচারবুদ্ধি মোতাবেক কি পড়বে না পড়বে তার সিদ্ধান্ত নিক। কিন্তু শিশু বা কিশোর বয়সে পাঠ্য লেখা হিসাবে নয়। বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা কাউকে যখন ‘নাস্তিক’ বলে তখন সেই ব্যাক্তির রুচিবোধ, সংস্কৃতিবোধ, গণমানুষের বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতি কদর্য ও কুৎসিত চিন্তার নিরিখেই বর্গটি ব্যবহার করে। তো হেফাজতের এই আপত্তিতে আপত্তিটা কোথায়?

ভাষা, সাহিত্য ও ধর্ম

গণমাধ্যমে এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল মান্নান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘পাঠ্যপুস্তকের বাংলা বইগুলো ধর্ম কিংবা সমাজ, বিজ্ঞান শেখানোর বই নয়, এগুলো ভাষা-সাহিত্য শেখানোর বই। ভাষা শিক্ষার জন্য যেসব লেখা থাকা দরকার, তাই দেওয়া হয়েছে। ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা হচ্ছে ধর্ম শিক্ষার বই, সেখানে ধর্ম শেখানোর জন্য যা দরকার তা আছে। বিজ্ঞানের বইয়ে কি ধর্মের বিষয় থাকবে? বিজ্ঞানের বইয়ে ধর্মীয় বিষয় নেই কেন এমন প্রশ্ন না উঠলে বাংলার ক্ষেত্রেও তা থাকা উচিত নয়। বইয়ের মধ্যে ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। তবে হলফ করে বলতে পারি, ইসলাম নয়, অন্য যেকোনো ধর্মকে বিন্দুমাত্র হেয় করা হয়েছে, এমন একটি শব্দও পাওয়া যাবে না পাঠ্য বইয়ে।’

তাঁর কথা মেনে নিতে পারলাম না। প্রথমত ভাষা ও সাহিত্য শেখার বই আর বিজ্ঞানের বই এক নয়। বিজ্ঞানে ধর্ম আছে কি নাই সেটা বিতর্কিত ব্যাপার, সেই তর্ক অন্য আরেকদিনের জন্য তোলা থাক। কিন্তু ভাষা এবং ধর্ম পরস্পর বিচ্ছিন্ন কোন ব্যাপার নয়। মানুষের বিশ্বাস ও ধর্মচিন্তা ভাষার মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয়। ফলে ধর্ম বিশ্বাস প্রকাশ ও চর্চা করার মধ্য দিয়েও ভাষার বিকাশ ঘটে ও ঘটেছে। ভাষার গায়ে ধর্মের চিহ্ন খচিত থাকে। তাকে চিহ্নিত করা এবং বর্তমান কালে তার তাৎপর্য আবিষ্কার নৃতত্ত্ব, দর্শন, ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র।

বাংলাভাষায় সংস্কৃত থেকে আসা ‘ঈশ্বর’ একটি ধর্মীয় শব্দ। একে বাংলা ভাষা থেকে বাদ দেবেন কিভাবে? রবীন্দ্রনাথ পড়তে গিয়ে যখন পড়ি ‘আমার এই দেহ খানি তুলে ধরো, তোমার ঐ দেবালয়ের প্রদীপ করো’, তখন ‘পূজা’, ‘দেবালয়’ ধর্মীয় শব্দ নাকি নয় সেই মীমাংসা কিভাবে করবেন?  এই তর্ক অনর্থক নয়। খুবই গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য ঔপনিবেশিক যুগে উচ্চ বর্ণের হিন্দুর হাতে বিকশিত হয়েছে ফলে সেই ভাষার রন্ধ্রে রন্ধ্রে হিন্দুর ধর্মীয় অনুষঙ্গ, প্রতীক, উপমা ও উৎপ্রেক্ষা গলাগলি করে জড়িয়ে রয়েছে। এখন কেউ যদি বাংলা সাহিত্য পড়াতে গিয়ে বলে এটা ধর্মীয় কিছু না, নিছকই সাহিত্য তার যেমন কোন যুক্তি নাই, তেমনি কোন বাঙালি ধর্মসূত্রে মুসলমান বলে হিন্দু সাহিত্যিকের লেখা পড়া বাদ দেবে বা তার সাহিত্যগুণের প্রসাদ নেবে না, তাও হয় না। দেখুন, আমি এখন হিন্দুর ধর্মীয় শব্দ ‘প্রসাদ’ শব্দটি মনের ভাব প্রকাশ করবার জন্য ব্যবহার করেছি। কারন এটা এখন আমারও ভাষা, বাংলাভাষী বলে এই ভাষায় আমার অধিকার আছে। অর্থাৎ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভাষা উচ্চ বর্ণের হিন্দুর বলে এবং তার মধ্যে বিপুল ধর্মীয় অনুষঙ্গ থাকলেও সেটা হিন্দুর নয়, বাঙালির ভাষা। এই দাবি আহাম্মকি যে ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে ধর্মের কোন সম্পর্ক নাই। এই অসত্য দাবিটা একান্তই রাজনৈতিক দাবি। বাংলা ভাষায় বর্ণ হিন্দুর আধিপত্য জারি রাখার রাজনীতি। ঐতিহাসিক কারনেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য হিন্দু ধর্মের প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ এসেছে। এই অনিবার্যতাকে অস্বীকার করাটাই চরম সাম্প্রদায়িকতা।

ঠিক তেমনি বাঙালি মুসলমান ‘কবিতা আমার সাধনা’ না বলে যদি লেখে ‘কবিতা আমার এবাদত’, তখন ‘এবাদত’ মুসলমানের শব্দ হলেও সেটা সকল বাঙালির। যদি বলা হয় বাংলা সাহিত্য পড়াতে গিয়ে ‘এবাদত’ শব্দ ব্যবহার করা যাবে না, তখনি গোলমালটা বাঁধে। সেটা হয়ে ওঠে সাহিত্যের উসিলায় সাম্প্রদায়িকতা। একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপলব্ধি, ভাষা ও চর্চাকে সাহিত্যে স্থান না দেবার চেষ্টা চরম সাম্প্রদায়িক চিন্তা। অন্যদিকে ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় ধর্ম থাকবে না সেটা আজগবি ও অবাস্তব শুধু নয় ধর্ম নিরপেক্ষতার ছদ্মবেশে বাংলা ভাষাকে বর্ণহিন্দুর ভাষাচর্চার মধ্যে আবদ্ধ রাখা। যদি বলি বাংলা ভাষা শেখাতে চাই বলে আল্লাহকে ‘ঈশ্বর’ বলেই শিশুদের পড়তে ও শিখতে হবে। আল্লাহ আরবি শব্দ, এটা বাংলা ভাষায় চলবে না। তখন বাংলাদেশের জনগণ কি তা মানবে? মানবে না। তাদের ধর্ম, ধর্ম চর্চার নিত্যদিনের শব্দ প্রত্যক্ষ ভাবে কিম্বা উপমা উৎপ্রেক্ষা প্রতীক ও প্রত্যয় হিসাবে আসবেই। ইংরেজ ও বর্ণ হিন্দুর শাসন থেকে মুক্ত স্বাধীন বাঙালির ভাষায় তাদের গণমানুষের ধর্মীয় ও আত্মিক উপলব্ধি আসবেই। ভাষা তা প্রকাশ ও প্রচারের মাধ্যম। তেমনি হিন্দুরও আসবে। কেউ নাস্তিক হোক বা না হোক তাতে কিছুই আসে যায় না। স্বাধীন বাংলাদেশে সেই জন্যই ‘গণমানুষের প্রত্যাশা’ কথাটা হেফাজতের খুবই যৌক্তিক চিন্তা। বাংলাদেশের জনগণকে ধর্ম বিচ্ছিন্ন ভাষা আর সাহিত্যের কথা আব্দুল মান্নান বলে দেখুক। জনগণ মানে কিনা দেখার খুব ইচ্ছা। ধর্ম, ভাষা ও সাহিত্যের নিগূঢ় ও অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক সম্বন্ধে আপাদমস্তক অজ্ঞ ব্যক্তিরা যখন প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমের সদস্য হয় তখন তা কি ধরনের বিপদ তৈরি করে সেটা পাঠ্য বই বিতর্কের মধ্য দিয়ে যারপরনাই উদাম হয়ে পড়েছে।

‘অঞ্জলী’ শব্দটি দেখুন। আমার খুবই প্রিয় বাংলা শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে দুই হাত জোড় করে দেবতার উদ্দেশ্য নিবেদন করা ফুল, অর্থাৎ সোজা কথায় পূজা। এখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর গীত’ দিয়ে সেই পূজা করতে চান বলে তাঁর গানের বইয়ের নাম দিয়েছেন গানের অর্ঘ্য নিবেদন, গান দিয়ে দেবতার পূজা: ‘গীতাঞ্জলী’। তো এখন পূজার অনুষঙ্গ আছে বলে কি বাঙালি মুসলমান এই বই পড়বে না? এই গান গাইবে না? অবশ্যই পড়বে এবং গাইবে। তাহলে ধর্ম ও সাহিত্য পরস্পর থেকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন – এই অনুমানের ভিত্তি কি? নাই। পিরিয়ড।

দেখুন আব্দুল মান্নান আরো কি বলছেন। বলছেন, ‘আমাদের দুটি সংস্কৃতি। একটি ধর্মীয় সংস্কৃতি, আরেকটি জাতিগত। যখন জাতিগত সংস্কৃতির কথা উঠবে, তখন হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির কথা আসবে। তখন কোনটা হিন্দু, কোনটা মুসলমান, এটা দেখার বিষয় নয়। কোন্‌ কবিতার মধ্যে কোন্‌ মিথ আসছে, সেটাকে যারা বলেন হিন্দু মিথ তাঁরা ভুল করেন, আসলে এটা বাঙালি মিথ।’

বাঙালি হিন্দুর ধর্মীয় মিথকে হিন্দুর মিথ বললে অসুবিধা কি? এখানে লুকোছাপার কি আছে? এর সঙ্গে ধর্ম ও ধর্মীয় সম্প্রাদায়ের কোন সম্বন্ধ নাই দাবির কী যুক্তি? হিন্দু পুরান বাংলাভাষী হিন্দুর ধর্মীয় কাহিনী হলেও সেটা অবশ্যই বাঙালিরও বটে। কিন্তু হিন্দুর পৌরানিক কাহিনী ধর্ম ও সম্প্রদায় বহির্ভূত বাংলা বলে ধুয়ে মুছে ইতিহাস অস্বীকার করে ধোপদুরস্ত চালাতে চাই বলেই গোলমালটা বাঁধে। অপরদিকে এটা জোরেসোরে দাবি করা হয় বাঙালি  মুসলমানের ধর্মীয় কাহিনী, ইতিহাস বা কল্পনা বাংলা না, বাঙালির না, অতএব সেটা সাহিত্যের বইয়ে থাকবে না। -- এই ধরণের ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িকতার চর্চা ধর্ম নিরপেক্ষতা ও বাঙালিপনার নামে যথেষ্ট হয়েছে। জাতিবাদ বা ধর্ম নিরপেক্ষতার নামে ধর্ম, ভাষা আর সাহিত্যকে পরস্পরকে থেকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন করে রাখার রাজনীতিটাই এই বঙ্গে বর্ণ হিন্দুর সাম্পদায়িক রাজনীতি। এই সাম্প্রদায়িকতা ‘বিশুদ্ধ বাংলা সাহিত্য’, ‘হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি’ , 'প্রমিত বাংলা' ইত্যাদি নানা নামে চালু রয়েছে। অর্থাৎ ‘হাজার বছরের সংস্কৃতি’র নামে ধর্ম নিরপেক্ষ ওয়ালারা উচ্চ বর্ণের হিন্দুর ভাষা ও সাহিত্য রক্ষা করে যাবে, বলবে এটা হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন থেকে তৈরি হওয়া ভাষা না, এটাই বাংলা ভাষা, এটাই সাহিত্য; অপরদিকে উলটা দাবি করবে বাঙালি মুসলমানের ভাষা ধর্মীয়, সেটা বাংলা ভাষা না, সাহিত্য না। শিশুদের ভাষা ও সাহিত্য পড়াতে গেলে যা কিছু প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে ইসলাম বা মুসলমান সম্প্রদায়ের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত অতএব তা বাদ দিতে হবে; ধর্ম আর সাহিত্য -- ধর্মের ভাষা আর সাহিত্যের ভাষা -- নাকি আলাদা ব্যাপার!  -- ইসলাম বিদ্বেষী এই সব সাম্প্রদায়িক বর্ণবাদী রাজনীতি বাংলাদেশের জনগণের কাছে এখন পরিষ্কার। এর বিরুদ্ধে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। সেটা খুবই ইতিবাচক। পাঠ্যবই বিতর্কের এটাই হচ্ছে নগদ লাভ। 

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই চরিত্র হিন্দু বা বর্ণ হিন্দু কারুরই দোষ নয়। এটা কারো ষড়যন্ত্র না, ইতিহাস। এটা অতিক্রম করে যাওয়া ধর্ম নির্বিশেষে সকল বাঙালির কাজ। আমি যদি হিন্দু পুরান, তার চরিত্র ও কাহিনী আমারই ভাই বা ভগ্নির জীবন চর্চার অংশ বলে জানি, শ্রদ্ধা করি এবং বাংলা ভাষায় তাদের উপস্থিতির অনিবার্যতা মানি ও তা রক্ষা করি তাহলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে হযরত মুহাম্মদ (সা.) কে নিয়ে লেখা, তৃতীয় শ্রেণিতে খলিফা আবুবকর (রা.), চতুর্থ শ্রেণিতে খলিফা ওমর (রা), পঞ্চম শ্রেণিতে বিদায় হজ ও শহিদ তিতুমীরকে নিয়ে লেখা অর্ন্তভূক্ত করা হলে অসুবিধা কি? আপত্তিটা কোথায়? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের আবির্ভাবের কারনে এটাও ঐতিহাসিক অনিবার্যতা। উচ্চবর্ণের হিন্দু যাদের এতোকাল 'যবন'  'ম্লেচ্ছ' 'মুছলমান' ইত্যাদি বলে ভাষা ও সাহিত্যে অছ্যুত করে রেখেছিল সেই সাব অল্টার্ন এখন ইতিহাসের কর্তা হয়ে একাত্তরে তাদের দাবি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। তারা বাংলা ভাষা ও সাহিত্য তাদের ছাপ দিয়ে যাবেই। ছাপ ফেলবেই। এটাই বাঙালির ঐতিহাসিক নিয়তি। একাত্তর শুধু পাকিস্তানের পরাজয় ছিল না, একই সঙ্গে ছিল বঙ্গে বর্ণ হিন্দুর পরাজয়, কলোনিয়াল যুগে গড়ে ওঠা বর্ণ হিন্দুর ভাষা ও সাহিত্য বাংলাদেশের বাঙালি অতিক্রম করে যাবেই। এখন হেফাজতিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা আস্ফালন দেখিয়ে লাভ নাই। এটা হেফাজতের ইস্যু না। যাদের বাঙালি বলে এতোকাল বর্ণ হিন্দু স্বীকার করে নি, এখনও করে না, তাদের পিছে ফেলে নিম্নবর্গের এগিয়ে যাওয়া।

তর্ক হতে পারে সকলের পাঠের উপযোগী করে আমরা শিশু ও কিশোরদের জন্য পাঠ্য বই লিখছি কিনা, এবং লেখা হয়েছে কিনা। কিম্বা এমন কিছু আছে কিনা যা অন্য ধর্ম বা সংস্কৃতির প্রতি অবজ্ঞা বা তাচ্ছিল্য প্রকাশ করে। কিম্বা বাংলাভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস অস্বীকার করতে চায় এমন কিছু আছে কিনা, ইত্যাদি। আরও গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ তর্ক হচ্ছে আমরা কিভাবে ধর্ম, ভাষা ও সাহিত্যের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব ও বিরোধের মীমাংসা করব? কিন্তু আমরা তা বলছি না। আমরা বলছি নবি ও নবির সাহাবাদের জীবনী সাহিত্য হিসাবে আমরা আমাদের সন্তানদের পড়াতে পারবো না। অথচ হিন্দু মিথ বা পুরানকে বাঙালির সাহিত্য হিসাবে আমাদের সন্তানদের পড়তে হবে! এটা তো পরাজিত বর্ণ হিন্দুর আস্ফালন মাত্র, যে দিল্লীর জোরে বাংলাদেশ দখল করে রাখতে চায়।  জাত এবং শ্রেণির প্রশ্ন বাদ দিয়ে বাঙালির ইতিহাস বোঝা যাবে না।

শহীদ তীতুমীর পাঠ্য বইয়ে অন্তর্ভূক্ত করায় আপত্তি উঠেছে। অথচ তীতুমীর সম্পর্কে অবশ্যই আমাদের সন্তানদের জানতে হবে, ইংরেজের বিরুদ্ধে বাঁশের কেল্লা বানিয়ে লড়বার হিম্মত যিনি দেখিয়েছেন, তিনি একজন ঐতিহাসিক নায়ক। গোলাম না হয়ে কিভাবে পরাধীনতার বিরুদ্ধে লড়তে হয়, তিনি তার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। আমরা ভুলে যাই এই দেশের জনগন খালি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়ে নি, আঠারো সাতান্নর সিপাহি বিদ্রোহ থেকে শুরু করে তীতুমীরের বাঁশের কেল্লা তারপর সাতচল্লিশ -- তার দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম আত্মত্যাগের ইতিহাস আছে। বাংলাদেশ নয় মাসে আকাশ ফুঁড়ে পয়দা হয় নি।

আসুন সবাইকে নিয়ে ভাবি

আমরা তর্ককে ইতিবাচক দিকে নিতে চাইলে প্রশ্নটিকে আমরা আরও সুনির্দিষ্ট করতে পারি। যেমন নিজেদের প্রশ্ন করতে পারি, বাংলাদেশের বর্তমান ঐতিহাসিক বাস্তবতায় কী ধরণের শিক্ষা আমরা আমাদের সন্তানদের দিতে পারলে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান চাকমা সাঁওতাল, মনিপুরিসহ সকল ধর্ম জাতি সম্প্রদায়ের শিশু ও কিশোর শিশুকাল ও বাল্যকাল থেকেই উপলব্ধি করে তারা একই সমাজ একই ইতিহাসের অন্তর্গত। সেই ইতিহাসের ভালমন্দ দ্বন্দ্বসঙ্ঘাত আছে, কিন্তু ইতিহাস তো আর গোলাপফুল ছিটানো সদর রাস্তা নয়। বাংলাদেশের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র বাংলাদেশের শক্তি, সেতা যেন অনৈক্য ও বিরোধের ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে। নিজেদের মধ্যে আমরা তর্ক করতে পারি কাকে আমরা ‘সঠিক শিক্ষা’ বলব । এখানে অনুমান হচ্ছে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিসাবে আমাদের সমাজের কিছু বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস আছে। সেই জমিনে আমাদের সামষ্টিক ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা অভিপ্রায় দানা বাঁধে। সঠিক শিক্ষা নির্ণয় করতে গিয়ে সেই বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাসকে আমলে নিতে হবে। সেই তর্কে জাতিবাদী, সেকুলার ইসলামপন্থি শুধু নয়, সেখানে যে কেউই অংশগ্রহণ করতে পারে। পাঠ্য বইয়ে চাকমা, মনিপুরী ও সাঁওতালদের ব্যাপারে কিছু লেখা থাকলে কি লেখা আছে তা আমাদের জানতে হবে। আমরা শুধু জাতিবাদী আর ধর্মনিরপেক্ষওয়ালাদের কথা শুনব, আর ইসলামপন্থি এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতি সত্তার কথা শুনব না, সেটা তো হতে পারে না। কিম্বা পালটা শুধু ইসলামপন্থিদের কথা শুনব আর জাতিবাদী আর ধর্ম নিরপেক্ষ ওয়ালাসহ বাকি সকলকে বাদ দেব, সেটাও তো হবে না। সর্বোপরি তর্কে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার উপস্থিতি ভুলে যাব, সেটা হতে পারে না।

জাতিবাদী আর ধর্ম নিরপেক্ষওয়ালারা চাইছে শুধু তাদের মতোই পাঠ্যবই লিখতে হবে। সেটা তখন আর শিক্ষা বিষয়ক তর্ক থাকে না। ইসলাম নির্মুলের রাজনীতি হয়ে ওঠে। তারা জোট সরকারের আমলের পাঠ্য বই বাদ দিয়েছে কারন তারা বাংলাদেশের ইতিহাস হিসাবে যা গেলাতে চায় তা আওয়ামি ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস নয়। জোট সরকারও তাদের ইতিহাস হিসাবে তাদের পাঠ্য বইয়ে যা ঢুকিয়েছিল সেটা তাদের দলীয় ইতিহাস, বাঙালির ইতিহাস না, নানা ধর্ম, জাতি ও সংস্কৃতি নিয়ে সক্রিয় বাংলাদেশীদের ইতিহাস না। । পাঠ্যবই উভয়পক্ষের দলীয় প্রপাগান্ডার হাতিয়ারের অধিক কিছু ছিল না। উভয়েই পাঠ্য বইয়ের বিষয় নিয়ে বিতর্ককে স্রেফ রাজনৈতিক ময়দানের লড়াইয়ে পরিণত করেছে। উভয়ের খপ্পর থেকে বের হয়ে আসাই ‘গণমানুষের প্রত্যাশা’। তাই না?

এই অবস্থা থেকে সকলকেই বেরিয়ে আসার আহ্বান জানাই।

১৩ জানুয়ারি ২০১৭। ৩০ পৌষ ১৪২৩। শ্যামলী

 

 

 


প্রাসঙ্গিক অন্যান্য লেখা


লেখাটি নিয়ে এখানে আলোচনা করুন -(0)

Name

Email Address

Title:

Comments


Inscript Unijoy Probhat Phonetic Phonetic Int. English
  


শব্দানুযায়ী সন্ধান : কওমি মাদ্রাসা, শিক্ষা, ফরহাদ মজহার, পাঠ্যবই, গণতন্ত্র, ইসলাম

View: 2906 Leave comments-(0) Bookmark and Share

EMAIL
PASSWORD