ঐতিহাসিক ‘সন্ধি’!


কওমি মাদ্রাসা সনদের স্বীকৃতি কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে শেখ হাসিনার ‘সন্ধি’ বাংলাদেশের রাজনীতির অনেক হিসাব নিকাশ নিমেষে বদলে দিয়েছে। সমাজে বিভিন্ন শক্তির ভারসাম্যের ক্ষেত্রে এই ‘সন্ধি’ গুণগত রূপান্তরের ইঙ্গিত। চরম ইসলাম বিদ্বেষী ‘নাস্তিক’, সেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদীরা আওয়ামি লীগের ঘাড়ে বন্দুক রেখে এই দেশে যেভাবে সাম্প্রদায়িক ঘৃণা চর্চা করছিল  তাদের উত্তাপ কতোটা কমবে এটা আগাম আন্দাজ করা মুশকিল। কারন এদের শক্তির ভিত্তি বাংলাদেশের জনগণ নয়, বরং দিল্লী ও সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি। এই 'সন্ধি'তে শেখ হাসিনার হাতে গড়ে ওঠা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না। দিল্লির কাছ থেকে তিস্তার পানি না পেয়ে ‘কুছ তো মিলা’ জাতীয় দাস্য কুটনীতির চরম ব্যর্থতা ঢাকা দেবার এটা ক্ষমতাসীনদের সাময়িক কৌশল হবারই সম্ভাবনা। কিন্তু এতে ইসলাম বিদ্বেষী ‘নাস্তিক’, ফ্যাসিস্ট বাঙালি জাতিবাদী এবং ‘কমিউনিস্ট’ ইত্যাদি বিভিন্ন নামে ও পরিচয়ে যারা  ইসলামের বিরুদ্ধে ঘৃণা চর্চা করে তাদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আরও গভীর হবে। গণমাধ্যমে এবং সোশাল মিডিয়ায় তাদের গগন বিদারী আহাজারি ও হাহাকারে এটা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। তাদের মতাদর্শিক পরাজয়ের এটা চূড়ান্ত নমুনা না হলেও, কওমি মাদ্রাসার সনদ স্বীকৃতি দেওয়া উপলক্ষে কওমি আলেম ওলেমাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার বৈঠক সমাজে ইসলাম বিদ্বেষী নানান কিসিমের বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের পরাজয়ের ইঙ্গিত বটে। ক্ষমতাসীনরা এদের সমর্থনের ওপর আর নির্ভর করতে চাইছে না; কারন ধর্ম বিদ্বেষীদের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক অক্ষুণ্ণ থাকলে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ক্ষোভবিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করার সম্ভাবনা সমাজে তৈরি হয়েছে। একে উপেক্ষা করার আর সুযোগ নাই।

ধর্মবিদ্বেষী ও ঘৃণাজীবীদের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক চূড়ান্ত পরাজয় হয় নি, কিন্তু ঘটানো জরুরী। বাংলাদেশে ভাব, চিন্তা বা দর্শনের বিকাশের জন্যই সেটা দরকার। এই পরাজয় নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশে ‘সেকুলারিজম’ ‘ধর্ম নিরপেক্ষতা’ ইত্যাদি পরিভাষার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় উপলব্ধির সঙ্গে বুদ্ধির এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক বা সম্বন্ধ বিচা্রের যে তাগিদ রয়েছে আমরা তা ইতিবাচক ভাবে বুঝতে সক্ষম হব। ধর্ম বিদ্বেষীদের মতাদর্শিক পরাজয়ের মধ্য দিয়েই সক্রিয় চিন্তার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক বা দার্শনিক পরিবেশটুকু দরকার আমরা তা গড়ে তুলতে পারব।

এই ক্ষেত্রে একটি বিষয় বোঝা খুবই জরুরী। খ্রিস্টিয় পাশ্চাত্যে ‘নাস্তিকতা’ ধর্ম বিদ্বেষ আকারে ছিল না যে তা নয়। ছিল, কিন্তু সেটা ছিল গৌণ দিক। কিন্তু এর প্রধান বা মুল প্রবনতা ছিল মানুষ যেন আল্লার মহিমা প্রচার করতে গিয়ে নিজেকে সর্বস্বান্ত – অর্থাৎ সকল মহিমা বর্জিত পাপে দুষ্ট জীবে পরিণত না করে। খ্রিস্টীয় পাশ্চাত্যে দার্শনিকদের প্রধান তর্ক ছিল এই যে মানুষ তার নিজের প্রতিভা ও গুণকে আল্লার ওপর আরোপ করতে গিয়ে নিজেকে হেয় ও সর্বস্বান্ত করে। ফলে ইহলোকে মানুষ তার নিজের সামাজিক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা বুঝতে অক্ষম হয়ে পড়ে। মানুষ নিজে ইতিহাসের কর্তা সেটা সে নিজে ভুলে যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে মানুষ যেন নিজের মহিমা নিজে বুঝতে পারে তার জন্যই আল্লাকে অস্বীকার বা নাস্তিক হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল।  উদ্দেশ্য, মানুষ যেন নিজের কাছে নিজে ফিরে আসে এবং নিজের মহিমা নিজে উপলব্ধি করতে পারে। নাস্তিক্যবাদি দর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে তার মর্যাদা ও মহিমা ফিরিয়ে দেওয়া। বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়ে আল্লাকে স্বীকার কিম্বা অস্বীকার স্রেফ অন্তঃসারশূন্য চেষ্টা সেটা ইম্মেনুয়েল কান্টের (১৭২৪ - ১৮০৪) সময় থেকেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আল্লা আছে কি নাই বাংলাদশে এই ধরণের নিম্ন শ্রেণির থার্ড ক্লাস তর্ক 'মুক্তমনা' বা 'মুক্তবুদ্ধি'র নামে জারি রাখা হয়েছে। কান্ট যুক্তি বা বুদ্ধির দ্বারা আল্লাকে প্রমাণ বা অপ্রমাণ নিস্ফল দাবি করেও মানুষের সামাজিক ও ব্যবহারিক -- বিশেষত নীতিনৈতিকতার ক্ষেত্রে তার উপযোগিতা মেনে নিয়েছেন; পরমার্থিক সত্তার ধারণা্র  প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করে নিতে দ্বিধা।   সেই বিষয়ে বিশদ ব্যাখ্যা করে গিয়েছেন।

নাস্তিকতা এবং ধর্ম বিদ্বেষ আদতে খ্রিস্টীয় সমস্যা, কারন খ্রিস্টিয় ধর্মে মানুষ মাত্রই আদি পাপে পাপিষ্ঠ। ঈশ্বরের পুত্র পাপী মানুষকে উদ্ধার না করলে মানুষের পক্ষে পাপ মুক্ত হওয়া অসম্ভব। ফলে যারাই মানুষ ও মানবতাবাদী হতে চেয়েছেন খ্রিস্টিয় ধর্মের সঙ্গে তাদের ফয়সালা করতে হয়েছে। কাছাকাছি আরেকটি ভারতবর্ষীয় ধারণা আছে: আগের জন্মে মানুষ পাপ করেছিলো বলে মানুষ বর্তমান জন্মে দুঃখভোগ করবার জন্য আবার জন্ম লাভ করে। এই ভারতবর্ষীয় ধারণার মধ্যেও মনুষ্য জন্ম লাভকে ধর্মীয় ভাবে নেতিবাচক হিসাবে দেখা হয়। মনুষ্য জন্মের মহিমা প্রতিষ্ঠার জন্য তখন ধর্মের সঙ্গে বিচ্ছেদের বা ধর্ম অস্বীকারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

তরুন কার্ল মার্কস বুঝে গিয়েছিলেন নাস্তিকতা বা ধর্মহীনতা হচ্ছে ঘোরা পথে মানুষের মহিমা কায়েমের চেষ্টা। তাঁর ঘোষণা ছিল কমিউনিস্ট হবার জন্য এই ঘোরাপথের দরকার পড়ে না। অর্থাৎ আল্লাকে অস্বীকার করা, কিম্বা স্বীকার করা মার্কসীয় চিন্তার বাইরের দিক। মার্কস ধর্ম নিয়ে কোন সন্দর্ভ রচনা না করবার এটা একটা কারণ বটে। ধর্ম বিরোধী বা বিদ্বেষি হওয়ার অর্থ সরাসরি ইহলৌকিক মানুষের তাৎপর্য ও ইতিহাস নিয়ে কথা না বলে ঘোরাপথে খামাখা আল্লার অস্তিত্ব অস্বীকার ; ধর্ম বিরোধী হয়ে মানুষের মহিমা প্রতিষ্ঠা। অর্থাৎ আগে নাস্তিক হয়ে তারপর ঘোরাপথে মানুষকে তার নিজের গুরুত্ব ও মহিমা বোঝানোর চেষ্টা। খ্রিস্টিয় চিন্তার পরিমণ্ডলে এর প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। তারপরও তরুন মার্কস পঁচিশ ছাব্বিশ বছরেই বুঝে গিয়েছিলেন এটা ঠিক পদ্ধতি না। মানুষের ইতিহাস নিয়ে পর্যালোচনা ও বোঝাবুঝির পদ্ধতি পরিচ্ছন্ন করাই বরং কমিউনিস্টদের কাজ। সারাক্ষণ আল্লা খোদার বিরুদ্ধে ওয়াজ করে বেড়ানো কমিউনিস্টদের কাজ না।

মানুষ পাপী কিম্বা ইহলোকে জন্ম লাভ করাই মানুষের দুঃখের কারন এটা ইসলামের অনুমান, প্রস্তাব বা সিদ্ধান্ত নয়। এখানে ইসলামের সঙ্গে অন্য অনেক ধর্মের সঙ্গে মৌলিক পার্থক্য। মানুষের মহিমা কায়েমের জন্য ইসলাম প্রভাবিত সমাজে তাই আল্লাহকে অস্বীকার বা ধর্মের বিরোধিতা সক্রিয় চিন্তার জন্য মোটেও জরুরি নয়। ইসলাম মানুষকে পাপী গণ্য করা দূরে থাকুক, বরং ইহলোকে আল্লার খলিফা হিসাবে মর্যাদা দেয়। কোরানুল করিমে মানুষের এই গৌরব ও মহিমা কীর্তনের তাৎপর্য বিচারই বরং দর্শনের জন্য জরুরি হয়ে ওঠে। মানুষকে আলাদা করে মহিমান্বিত করবার দরকারে ইসলামে ধর্ম অস্বীকার করা কিম্বা নাস্তিক হবার দরকার পড়ে না। যারা করে তারা ইসলামকে খ্রিস্ট ধর্মের মতোই আরেকটি ধর্ম মনে করে। এমনকি অনেক সময় আলেম ওলেমারাও এই ভুল করেন। অথচ নাস্তিকতা ইসলামের জন্য বড় কোন সমস্যাই নয়, বরং ইসলাম কোন ভাবেই যা মেনে নেয় না, নেবে না এবং মেনে নেওয়া উচিতও নয় তা হচ্ছে শেরেকি বা শির্ক।

বাংলাদেশে নাস্তিকতা ও নাস্তিক্যবাদিদের বিরোধিতা বিশেষ ঐতিহাসিক বাস্তবতায় গড়ে উঠেছে। ইসলাম সম্পর্কে বর্ণবাদী, ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী ধ্যান ধারণা ও রাজনীতির বিরোধিতা করতে গিয়েই আলেম ওলেমা ও ইসলামপন্থি বিভিন্ন সামাজিক ও  রাজনৈতিক ধারা নাস্তিকদের বিরোধী হতে বাধ্য হয়েছে। বাংলাদেশের আলেম ওলেমা ও সাধারণ মানুষ এর বিরুদ্ধে অত্যন্ত সফল ভাবে লড়াই চালিয়েছেন। এই লড়াইয়ের সাফল্য বাংলাদেশের বর্তমান ও আগামি ইতিহাসের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষত শাহবাগ পতনের গুরুত্ব অপরিসীম। 

মানুষের মহিমা আল্লার তরফে কোরানুল করিমের আয়াত ও ঘোষণা হিসবে হাজির। ইসলাম প্রধান দেশে মানুষের মহিমা কায়েমের পথ ধর্মের বিপরীতে যাওয়া নয়, বরং তাকে আত্মস্থ করা। এই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লার খলিফা – অর্থাৎ দিব্যসত্তার সম্ভাবনা বহনকারী কর্তা হিসাবে ইহলোকে মানুষের ঐতিহাসিক ভূমিকা কি হতে পারে তা পাশ্চাত্য জ্ঞানকাণ্ডের বাইরে নতুন ভাবে বিবেচনার বিষয় করে তোলাই ইসলাম প্রধান দেশের দার্শনিকদের কাজ। যাতে গ্রিক-খ্রিস্টিয় পাশ্চাত্য চিন্তার পরিমণ্ডল আমরা দ্রুত অতিক্রম করে যেতে পারি। আসলে ইসলাম বলতে আমরা আশে পাশে যা দেখি তার অধিকাংশই পাশ্চাত্য চিন্তার আধিপত্য দ্বারা দুষ্ট। আমাদের সব আলেম ওলেমারাও গ্রিক-খ্রিস্টিয় চিন্তার আধিপত্য থেকে মুক্ত নয়। যে কারণে নাস্তিকতার ব্যাপারে শির্কের তুলনায় তাঁরা খামাখা অতি মাত্রায় সংবেদনশীল। চরম ধর্ম বিদ্বেষ ও ইসলামের বিরুদ্ধে ঘৃণা চর্চার কারণে এই বিষয়গুলো অপরিচ্ছিন্ন থেকেছে। এই বিষয়গুলো পরিচ্ছন্ন করা এবং তরুণ ভাবুকদের উদ্বুদ্ধ করা এর ফলে কঠিন হয়ে পড়েছে। ইসলাম বিদ্বেষী ও ঘৃণাজীবীদের আংশিক পরাজয় ও রাজনৈতিক আধিপত্য হারানো এই দিক থেকেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে ইসলাম কেন্দ্র করে গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক চিন্তা ও আন্তরিক বাহাস ক্রমে ক্রমে সহজ হবে বলেই আমার ধারণা। এই ক্ষেত্রে হেফাজতে ইসলামসহ ইসলামপন্থি বিভিন্ন ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং রাখছে। আশা করি তা অব্যাহত থাকবে।

সামগ্রিক ভাবে বাংলাদেশে ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির টানাপড়েনে বদল ঘটছে – এই বাস্তবতা আগামি ইতিহাসের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি, শক্তি ও মতাদর্শের পারস্পরিক সম্পর্ক ও বিরোধের ক্ষেত্রগুলোর ওপর এর প্রভাব পড়বে গভীর ভাবে। গণমাধ্যমে – বিশেষত টিভি টক শতে এখন হেফাজতের নেতাদের ডাকা হচ্ছে। একজন হেফাজত নেতার ওপর টক শোর সঞ্চালক সহ তিন চারজন এক সঙ্গে হামলে পড়ছে। রাজনীতির নয়া সমীকরণে হেফাজত নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে গণ মাধ্যমের গুণেই হাজির হয়ে যাচ্ছে। সেকুলার মহলে চরম ক্ষোভ ও হতাশা। অভিনব পরিস্থিতি।

সমাজে সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে এই বদলের ফলাফল শেষাবধি কী দাঁড়াবে আগাম বলা কঠিন; বলার সময় এখনও আসে নি। এটা পরিষ্কার যে ঢাকা শহর কেন্দ্রিক চরম সুবিধাবাদী ও এলিট শ্রেণির উৎকট ইসলাম বিদ্বেষের গালে হেফাজত দুর্দান্ত চপটাঘাত করতে সক্ষম হয়েছে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘পোয়েটিক জাস্টিস’। এই পরিভাষাটির মধ্যে এক প্রকার আধ্যাত্মিকতা আছে। আমরা যখন বলি আল্লার বিচার আল্লা করেছেন সেটা পোয়েটিক জাস্টিসের কথাটাই আসলে ধর্মীয় কায়দায় বলা। সেকুলার ভাষা হলেও পোয়েটিক জাস্টিস প্রায় একই আধ্যাত্মিক মর্ম ব্যক্ত করে। অর্থাৎ ইতিহাসের বিচার ইতিহাসের নিজস্ব গতি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সাব্যস্ত হয়। তার ওপর কারও হাত নাই। আইন আদালত দিয়ে নয়, বল প্রয়োগের দ্বারাও নয়। ইতিহাসের এই বিচারটাই কাব্যিক ইনসাফ। যাদের মাত্র ২০১৩ সালে গুলি করে মেরে শহর থেকে কুকুর বেড়ালের মতো এই জঘন্য ও নষ্ট শহর তাড়িয়ে দিয়েছিলো, যাদের লাশের হিসাব পর্যন্ত করা যায় নি, আজ সেই তাড়া খাওয়া হত্যা গুম ও নির্যাতনের শিকার কওমি মাদ্রাসার আলেম ওলেমাদের স্থান হয়েছে সরকারের উচ্চ দরবারে। খোদ প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও শক্তির সর্বোচ্চ দরবারে তারা উচ্চ মর্যাদার মেহমান হয়ে হাজির হয়েছেন। আল্লার কুদরত দারুন!!

তুমি ডুবাইয়া ভাসাইতে পার ভাসাইয়া কিনার দাও কারো
রাখো মারো হাত তোমারো, তাইতে দয়াল ডাকি আমি
এলাহি আলামিন গো বাদশা আলমপানা তুমি!!
              (ফকির লালন শাহ)

দুই

আমি ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট ব্যবস্থার বিরোধী। তবুও শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের আমি সব সময়ই প্রশংসা করেছি। কওমি সনদের স্বীকৃতি দেবার ক্ষেত্রে তার ইন্টেলিজেন্ট সিদ্ধান্তেরও তারিফ না করে পারি না। ইতিহাসের প্রহসন হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়া হেফাজতের নেতাদের তাঁর ঘরের মধ্যে দীর্ঘকাল পেয়েও যা অর্জন করতে পারেন নি, শেখ হাসিনা কয়েক মাসের ব্যবধানে অসাধ্য সাধন করে ফেলেছেন। তাঁকে তারিফ না করা হবে বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। তাঁর নিজের সমর্থক মতাদর্শিক শ্রেণি ও গোষ্ঠিকে উপেক্ষা করে প্রথমে পাঠ্যক্রম এবং এখন কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতির দাবি তিনি মেনে নিয়েছেন। দেবি থেমিসকে উচ্চ আদালতের প্রাঙ্গন থেকে সরাবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শের সমর্থক কন্সটিটিউন্সির সঙ্গে ছাড়াছাড়ির সম্ভাবনা ঘটিয়েও তিনি হেফাজতের সঙ্গে এক ধরণের রাজনৈতিক ‘সন্ধি’ করেছেন।

হতে পারে এই সন্ধি সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা নেবার জন্য। তাঁর এখনকার অবস্থান আগামি দিনে যে কোন মুহূর্তে বদলে যেতেও পারে। কিন্তু তাঁর রাজনীতির সেকুলার সমর্থকদের সাময়িক নিন্দা ও ছাড়াছাড়ির হুমকি উপেক্ষা করে তিনি কাজটা করতে পেরেছেন। এর জন্য সাহস ও দূরদর্শিতা দরকার। সেটা তাঁর আছে, পরিষ্কারই বোঝা গেল। এটা গুরুত্বপূর্ণ। এটা ঠিক যে সকলের মতো শেখ হাসিনাও ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন। তিনি বামপন্থিদের মতো আহাম্মক নন। তাঁকেও রাজনৈতিক তোষামদি দিয়ে প্রবল রাজনৈতি্ক প্রতিপক্ষকে জয় করতে হয়। ধর্মকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার, কিম্বা ধর্মীয় শক্তিকে রাজনৈতিক তোষামদি দিয়ে জয় করার বিরুদ্ধে নীতিবাগীশ বকোয়াজগিরির চেয়ে চরম তামাশা আর কিছুই নাই। রাজনীতি নীতিবিদ্যা চর্চার জায়গা নয়। কাল যাকে মেরেছো আজ তার সঙ্গে কিভাবে হাত মেলালে জাতীয় দীর্ঘশ্বাস সমেত ফাঁপা অভিমান নয়। রাজনীতি ব্যবহারিক অর্থে রাজনৈতিক ক্ষমতা তৈয়ারির জন্য সমাজে শক্তির ভারসাম্য বদলাবার কারিগরি।

কওমি মাদ্রাসার অনেক আলেম ওলেমা ও তরুন ছাত্রদের অনুভূতি ও উপলব্ধি বোঝার জন্য তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি। তাঁরা পালটা প্রশ্ন আমাকে প্রশ্ন করেছেন, রক্তের দাগ এখনও শুকায় নি, হেফাজতের দিক থেকে কাজটা কি ঠিক হোল? এটা আসলে সাধারন মানুষেরও প্রশ্ন। আমি বলেছি, আপত্তি করছেন কেন? ‘কওম’ বা গণসমাজের স্বীকৃতিতে আপনারা তো সন্তুষ্ট না। জনগণের অর্থেই কওমি মাদ্রাসা চলে, আর ঠিক এটাই – কওমের সঙ্গে বৈষয়িক ও আত্মিক সম্বন্ধই কওমি মাদ্রাসার শক্তির জায়গা। জনগণ শুধু ভালবেসে ও স্বীকৃতি দিয়ে ক্ষান্ত না, তারা কওমি মাদ্রাসার খরচেরও যোগানদার। এই মাদ্রাসা রাষ্ট্রের টাকায় চলে না। বলেছি, তবে সরকার ও রাষ্ট্রের কাছে স্বীকৃতি পাবার জন্য আপনাদের অনেকের আগ্রহ বেশি। জনগণের স্বীকৃতি, মহব্বত ও প্রাণের সম্পর্কের চেয়েও এখন আপনাদের কাছে আধুনিক রাষ্ট্রের স্বীকৃতি কি প্রধান হয়ে ওঠে নি? আমরা তো বাইরে থেকে এটাই দেখছি। এখন গেজেট নোটিশ দিয়ে রাষ্ট্র বা সরকারের দেওয়া সার্টিফিকেট ঘরে বাঁধিয়ে রাখবেন, অসুবিধা কি? দেখেন চাকুরি বাকরি পান কিনা। আমি মনে করিনা বর্তমানের চেয়ে তুলনায় আগামিতে অবস্থার কোন হেরফের হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে কওমি সনদের স্বীকৃতি বা রাষ্ট্রের কাছ থেকে সার্টিফিকেট পাবার দাবিটি উঠল কেন? উঠেছে কারন আল্লার সন্তুষ্টি লাভের চেয়েও দুনিয়াবি সার্টিফিকেট এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছে। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ সমাজে যখন বাজার ব্যবস্থার আধিপত্য ঘটে এবং পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কই প্রধান সামাজিক সম্পর্ক হয়ে ওঠে তখন এটাই ঘটার কথা। বোঝা যাচ্ছে কওমি মাদ্রাসার নেতৃত্বস্থানীয় নিঃস্বার্থ আলেম ওলেমারা এর জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। কোরান হাদিসের আলোকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা বা কওমি মাদ্রাসার ভাষায় ‘সাচ্চা মুসলমান’ কিম্বা সেকুলার ভাষায় ‘আধাত্মিক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ প্রকৃষ্ট মানব সন্তান’ তৈরির মধ্য দিয়ে আল্লার সন্তুষ্টি লাভ এখন কি আর কওমি মাদ্রাসার প্রধান লক্ষ্য থাকবে না? কাকে দোষ দেবো? আমরা পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যে বাস করি। আর এই ব্যবস্থার নষ্টামি এভাবেই মোমিনের নফসে প্রবেশ করে এবং রুহানিয়াতের সদর রাস্তা থেকে মোমিনকে বিচ্যুত করে। যুগে যুগে এভাবেই রুহানিয়াতের পথ থেকে ভিন্ন ভিন্ন কারনে আলেম ওলেমারা সরে এসেছেন। আমাড় দৃঢ় বিশ্বাস কওমি মাদ্রাসা এই সংকট অনায়াসেই কাটিয়ে উঠবেন।

অনেকে মিন মিন করে বলেছেন, কিন্তু ছাত্ররা তো কওমি সনদের স্বীকৃতি চায়। চাইছে। অল্প কিছু ছাত্র চাইতেই পারে। তাহলে কওমি আলেম ওলেমাদের সেই ছাত্রদের বলা উচিত ছিলো বাবারা, তোমরা তাহলে ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত আলিয়া মাদ্রাসায় যাও, কওমি মাদ্রাসায় এতো পরিশ্রমের কী দরকার! এই পড়া পড়ে তো তোমরা চাকরি পাবা না।

সরকার ইতোমধ্যেই একটি গেজেট প্রকাশ করেছে। ভাল। গোড়ার প্রশ্ন আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। কওমি মাদ্রাসার আদৌ রাষ্ট্রীয় বা সরকারি স্বীকৃতির দরকার আছে কি? যদি দরকারই থাকত তাহলে বিএনপি-জামাতের আমলে আরো অনায়াসেই তা আদায় করে নেওয়া যেতো। তখন সেটা হয় নি কারন সার্টিফিকেট পাবার ইস্যুকে রাজনৈতিক ইস্যু তৈরি করে আওয়ামি লীগ ও কওমি মাদ্রাসার মিলন ঘটাবার রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা দেখা যায় নি। ক্ষমতাসীনরা এর পূর্ণ স্বব্যবহার করেছে।

কথা হচ্ছে কওমি শিক্ষাকে চাকরি বাকরি পাবার তর্কে পরিণত করাটাই ছিল ভুল। করবার কোন যুক্তি নাই। কারণ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার উদ্দেশ্য আধাত্মিক শিক্ষা। এটাই সত্যিকারের শিক্ষা। আধ্যাত্মিক শিক্ষা কথাটা শুনতে খুব মিস্টিক মনে হয়। মোটেও তা না। মানুষের মধ্যে সুপ্ত পরমার্থিক গুণাবলিকে বিকশিত করাই শিক্ষার প্রথম উদ্দেশ্য। কওমি মাদ্রাসা সেই সুনির্দিষ্ট কাজটি করে। সেটা একটা ধর্মতাত্ত্বিক জায়গা থেকে করা হয়। আধ্যাত্মিক শিক্ষার ক্ষেত্রে মাদ্রাসা কওম বা গণমানুষের প্রত্যাশা মেটাতে পারছে কিনা, সেই তর্ক হতেই পারে। কিন্তু মাদ্রাসায় পড়ে চাকরি বাকরি পায় না, কারন এর কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নাই, অতএব রাষ্ট্রের কাছ থেকে কওমি সনদের স্বীকৃতি আদায় করতে হবে, এটা ইবলিসের তর্ক। কওমি পাশ করা ছাত্র অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারলো কিনা কিম্বা কোন সরকারি চাকুরি পেল কি পেলনা সেটা আধ্যাত্মিক শিক্ষার জন্য অবান্তর ও কূট তর্ক। বরং সত্যিকার অর্থে পরমার্থিক জ্ঞানে বা রুহানিয়াতের প্রজ্ঞায় শিক্ষার্থী আলোকিত হতে পারছে কিনা, সেটাই হচ্ছে তর্কের বিষয়।

কওমি মাদ্রাসার প্রতি আমার নিঃশর্ত সমর্থনের পেছনে পরামার্থিক শিক্ষার গুরুত্বের কথাই আমি বার বার আমার লেখায় বলেছি। মানুষ জন্তু জানোয়ার নয় যে তার অন্ন বস্ত্র শিক্ষা স্বাস্থ্য বাসস্থান নিশ্চিত করলে তার অন্তরের তাগিদ নিবৃত্ত হয়। সেই আকুতি সেকুলার ভাষায় পরমার্থে, কিম্বা আধ্যাত্মিক ভাষায় রুহানিয়াতে – অর্থাৎ জীবের অতিরিক্ত মনুষ্য সত্তার ভূমিকা নিশ্চিত করার মধ্যে। মানুষের সত্যিকারের মানুষ হয়ে ওঠার মধ্যে। এই আলোকেই বলছি কওমি মাদ্রাসা গণমানুষের এই রূহানি প্রত্যাশা মেটাতে পারছে কিনা তা নিয়ে অবশ্যই তর্ক হতে পারে। কিন্তু সেটা চাকরিবাকরি পাওয়া না পাবার তর্ক না। রুহানিয়াত অর্জনের আদর্শ পথ ও পদ্ধতি চররাচ্র তর্ক। সেই লক্ষ্যে কওমি মাদ্রাসার সংস্কার করতে হতে পারে। কিন্তু মাদ্রাসার ছেলেরা চাকরি পায় না, অতএব কওমি মাদ্রাসাকে ‘আধুনিক’ করতে হবে, তাদের সরকারি ‘সার্টিফিকেট’ দিতে হবে যেন তারা চাকরি বাকরি করে খেয়ে পরে থাকতে পারে – ইত্যাদি যারপর নাই কূট তর্ক। শিক্ষা সংস্ক্রান্ত মৌলিক তর্ক থেকে প্রস্থান। যে কারনে একে আমি ঠাট্টা করেই ইবলিসের যুক্তি বলছি। অর্থাৎ মানুষের অসীম পরমার্থিক সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে তাকে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থার গোলামে পরিণত করার ফন্দি। জয় ইবলিস!!

কওমি মাদ্রাসার বিস্তর সমালোচনা হতে পারে। অবশ্যই। সেটা করুন অসুবিধা নাই। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা পাশ্চাত্য সভ্যতা ও পুঁজিতান্ত্রিক শোষণের গোলাম তৈরির কারখানা। কিন্তু শিক্ষার পরিমণ্ডলে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে কওমি মাদ্রাসাই কওম বা গণমানুষের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ। এই কারণেই পাশ্চাত্য শক্তি কওমি মাদ্রাসাকে ধ্বংস করতে বদ্ধ পরিকর। এখন বোঝা যাচ্ছে কওমি মাদ্রাসার ভেতর থেকেই এর সর্বনাশ ঘটাবার বিপদ তৈরি হয়েছে।

যাকে আধুনিক কালে ‘শিক্ষা’ বলা হয় তার প্রধান উদ্দেশ্য মানুষের আত্মিক বিকাশ নয়, বরং পুঁজিবাজারের জন্য দক্ষ শ্রমিক উৎপাদন। এই শিক্ষার অর্থনৈতিক তাগিদ হচ্ছে পুঁজিবাজারের জন্য দক্ষ শ্রমিক সরবরাহ। কওমি মাদ্রাসার শক্তির প্রধান ক্ষেত্র এর সম্পূর্ণ বিপরীত। বাজারের জন্য গোলাম তৈয়ারি এর উদ্দেশ্য নয়। এই মাদ্রাসা গণমানুষের অর্থে চলে। গণ মানুষের আধ্যাত্মিক প্রত্যাশা মেটায়। আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্র গণমানুষের এই অতি আবশ্যকীয় আধ্যাত্মিক পিপাসা বা চাহিদা মিটাতে অক্ষম। কওমি মাদ্রাসা সেই চাহিদা মেটাবে বলেই আধুনিক বাজার ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের পরিমণ্ডলের বাইরে একান্তই গণমানুষের ‘দান’ বা সহায়তার ওপর টিকে আছে। আর ঠিক সমাজের মধ্যে -- যারপরনাই সামাজিক ভাবে টিকে থাকাই কওমি মাদ্রাসার সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তির জায়গা। পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে এবং বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ যে সকল সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে কওমি মাদ্রাসা তার অবিশ্বাস্য কিন্তু দুর্দান্ত নজির। দেওবন্দ ঔপনিবেশিক ইংরেজের বিরুদ্ধে লড়ে ক্ষান্ত দেয় নি। তার লড়াই নিত্যদিনের সংগ্রাম।

প্রশ্ন হচ্ছে এহেন কওমি মাদ্রসা এখন আধুনিক ফ্যসিস্ট রাষ্ট্র ও জালম সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি চাইছে এবং পেয়েছে – এটাই গুরুত্বপূর্ণ বোঝাবুঝির জায়গা। এতে কোমি মাদ্রাসা তার ঐতিহাসিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করল কিনা সেটা প্রজ্ঞাবান আলেম ওলেমারা ভাববেন বলেই আমার বিশ্বাস। কওমি মাদ্রসা যা চেয়েছে শেখ হাসিনা ঠিক সেটাই দিয়েছেন। কওমি মাদ্রাসার সকলে রাষ্ট্রের স্বীকৃতির জন্য কাতর ছিলেন কি? মোটেও না। তাঁরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আলেম ওলেমা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার কারনে সাময়িক পরাজিত হয়েছেন। একদিকে বাহ্যিক ভাবে তাঁরা ইসলাম বিদ্বেষী সমাজের ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদীদের চরম চপেটাঘাত করেছেন। ঠিকই। কিন্তু তাঁদের নিজেদের দুর্গে ভুল লোকজনদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিচ্ছেন। এটা ঠিক না। এখনই তা রুখে না দিলে এর পরিণতি কওমি মাদ্রাসার জন্য ভাল হবে বলে আমি মনে করি না।

তাহলে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার সঙ্গে হেফাজতের সন্ধিতে ফরিদ উদ্দীন মাসুদ ও তাঁর অনুসারীগণ আনন্দিত হতে পারেন, কিন্তু কওমি আলেম ওলেমাদের অতিরিক্ত খুশি হবার কোন কারন নাই। কৌশলগত কারণে – বিশেষত এই দুঃসময়ে কওমি সনদ পাওয়া না পাওয়া নিয়ে কওমি আলেম ওলেমাদের মধ্যে যেন কোন বড় বিভক্তি না ঘটে সেদিকে যারা সতর্ক নজর রেখেছেন তাঁদের বিচক্ষণতাকে আমি প্রশংসা করি। এটা সঠিক কৌশল। কওমি আলেম ওলেমা ও ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে সার্টিফিকেট পাওয়ার বিষয়টিকে তারা বিভেদের কারণে পরিণত করতে চান নি। চাইছেন না। ঠিকই করেছেন। তাঁদের ভাবমূর্তির এই সাময়িক হোঁচট আমামদের মেনেন নিতে হচ্ছে। প্রধান মন্ত্রীর সঙ্গে তাদের বসাকে আমরা সেই আলোকেই বিচার করতে পারি। প্রধান মন্ত্রীর দরবারে অধিকাংশ নেতাই হাজির ছিলেন। ঐক্যের প্রয়োজনে এই কৌশল ভুল নয়। কিন্তু কওমি সনদের স্বীকৃতিতে অতিরিক্ত উল্লসিত হওয়া এবং একে বিশাল অর্জন গণ্য করে পুরা প্রক্রিয়ার পর্যালোচনা না করা মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিশেষত কওমি মাদ্রাসার ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা এখন একই নতুন চ্যালেঞ্জ হিসাবে হাজির হয়েছে।

তিন

তাহলে যে সকল আলেম ওলেমা এবং তরুন কওমি মাদ্রাসার ছাত্র প্রশ্ন করছেন, রক্তের দাগ এখনও শুকায় নি, হেফাজতের দিক থেকে কাজটা কি ঠিক হোল কিনা --তাঁদের ক্ষোভ ন্যায্য ও গুরুত্বপূর্ণ। এটা নৈতিক সমালোচনা। বর্তমান সরকারের সঙ্গে সন্ধিকে ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং ক্ষোভজনিত নৈতিকতার নিরিখে ভাল মন্দ বিচার। কিন্তু ওর মধ্যেও অন্তর্নিহিত রয়েছে রাজনৈতিক সমালোচনা। সেটা কি?

এক. ক্ষমতাসীন শক্তি মানবিক অধিকার বিরোধী; তারা বিরোধী দলের ওপর চরম দমন নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এখনও। তাহলে এদের কাছ থেকে সনদের স্বীকৃতি কেন?

দুই. আলেম ওলেমা ও কওমি মাদ্রাসাসহ ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের নিষ্ঠুর ও নির্মম দমন নিপীড়ন চালাতে এই সরকার কুন্ঠিত নয়। আগামি দিনে হেফাজতের বিরুদ্ধেও তারা তা আবার করবে না তার গ্যারান্টি নাই। তাহলে কিসের আশায় হেফাজত ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে?

তিন. এই সরকারকে সত্যকার অর্থে ‘নির্বাচিত’ সরকার বলা যায় না। এদের ক্ষমতার থাকাটা শক্তির জোরে, জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে নয়। সরকারের আইনী কিম্বা নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ। এহেন সরকারের কাছ থেকে কওমি সনদের স্বীকৃতি কি কওমি আলেম ওলেমাদের দিক থেকে অর্জন? নাকি বোঝা? এগুলো গুরুতর প্রশ্ন। এড়িয়ে যাবার উপায় নাই।

চার. রাজনৈতিক সমালোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। সেটা হোল এটা স্পষ্ট ক্ষমতাসীন সরকার কওমি সনদের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চাচ্ছে। সেটা হোল বিএনপি ও অন্যান্য ইসলামপন্থি দলগুলোকে আরও বিপর্যস্ত করা। বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের জন্য সেটা ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক? এটা স্পষ্ট যে ক্ষমতাসীনরা হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সন্ধির মধ্য দিয়ে অন্যান্য ইসলামি আন্দোলন বা ধারা থেকে তাদের আলাদা করতে চাইছে। আগামি নির্বাচনে হেফাজতে ইসলামের সমর্থকদের ভোটব্যাংক হিসাবে পাবার ইচ্ছা এখানে অবশ্যই কাজ করছে। সামগ্রিক ভাবে বিচার করলে কওমি সনদের স্বীকৃতি ইসলামের হেফাজত নিশ্চিত করবে, নাকি বিভক্তি ও বিভাজন বাংলাদেশে ইতিবাচক ইসলামি আন্দোলনের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এই সকল বিষয় নিয়ে ভাবা দরকার আছে।

বাংলাদেশে প্রধান রাজনৈতিক কর্তব্য হচ্ছে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা। একই সঙ্গে এই ঐক্যকে দিল্লির আগ্রাসন ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ভিত্তি হিসাবে দাঁড় করানো। প্রশ্ন হোল, বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের এই নতুন সম্পর্ক ফ্যাসিস্ট ক্ষমতা ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থাকে দীর্ঘায়িত করবার শর্ত তৈরি করতে পারে কি? হ্যাঁ পারে। আগামি দিনে হেফাজতে ইসলামের ভূমিকার ওপর সেটা অনেকাংশেই নির্ভর করবে।

দেওবন্দী নীতি বা উসুল অনুযায়ী কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতি অবশ্যই হেফাজতের বিজয়। আমি তাকে অভিনন্দন জানাই। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের এই সন্ধি যেন ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে আরও স্থায়ীত্ব না দেয় তার ওপর নির্ভর করবে হেফাজতের প্রতি গণমানুষের আস্থা ও ভালবাসার জায়গা ধরে রাখার প্রধান চ্যালেঞ্জ।

আশা করি বিচক্ষণ আলেম ওলেমারা ভেবে দেখবেন।

৮ বৈশাখ ১৪২৪। ২১ এপ্রিল ২০১৭। শ্যামলী।

 

 

 

 

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।