মার্কস-এঙ্গেলস বনাম মার্কস এবং এঙ্গেলস


আমরা মার্কস ও এঙ্গেলসের নাম এক নিঃশ্বাসে নিতে অভ্যস্ত। অনুমান করি তাঁদের চিন্তা অবিভাজ্য। কিন্তু ব্যক্তি হিসাবে তাঁরা আলাদা এবং তাঁদের চিন্তাও গড়ে উঠেছে ভিন্ন প্রক্রিয়ায়। এই ভিন্নতার কথা মনে রেখে উভয়কে তাঁদের নিজ নিজ চিন্তার জায়গা থেকে বোঝা দরকার। দুজনে নামের মাঝখানে হাইফেন দিয়ে যুক্ত করে এক না ভবে বরং তাঁদের স্বতন্ত্র সত্তাকে 'এবং' দিয়ে যুক্ত রাখাই যুক্তি সঙ্গত সেটাই এই লেখায় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।

আমাদের আগ্রহ বিশেষ ভাবে মার্কস সম্পর্কে। পাশ্চাত্য দর্শনের ভেতর থেকে গড়ে ওঠা মার্কসের দার্শনিক প্রকল্প নতুন ভাবে পর্যালোচনা এবং একালে তার উপযোগিতা নির্ণয় আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। সেই লক্ষ্যে কিছু বদ্ধমূল অনুমানকে প্রশ্ন করা জরুরী হয়ে পড়েছে। পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের এই কালে কমিউনিজম সম্পর্কে প্রচলিত ও প্রথাগত ধারনার ক্ষয় ঘটলেও মার্কস বিপ্লবী রাজনীতির পুনর্গঠনে এখনও নির্ধারক ভূমিকা রাখবেন। কিন্তু কোথায় এবং কিভাবে সেটা ঘটবে সেই ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করাই এখনকার দরকারি কাজ। বাংলাদেশে মার্কসের চিন্তার উপযোগিতা বাংলাদেশের ইতিহাস ও বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার করতে হবে। বস্তুবাদ বনাম ভাববাদ মার্কা সস্তা বাইনারি কিম্বা মানুষের ধর্ম চেতনা ও বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আরেকটি আধুনিক ‘ধর্ম’ বা মতাদর্শ হিসাবে কমিউনজম বাংলাদেশে দাঁড়াতে পারবে না। বরং মার্কসকে এই কারণেই দরকার যেন আমরা আমাদের বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সজ্ঞান হবার জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতি আরো রপ্ত করতে পারি এবং আমাদের চিন্তার সঙ্গে আমাদের বাস্তব জীবনযাপনের সম্বন্ধ দর্শন ও রাজনৈতিক উভয় ভাবেই বিচার করতে সক্ষম হই। এই কারনেই মার্কসকে তাঁর বন্ধু এঙ্গেলস থেকে আলাদা ভাবে বোঝা জরুরী। হেগেল ও ফয়েরবাখ হয়ে পাশ্চাত্য দর্শনের যে বিপ্লবী প্রকল্প মার্কসের হাতে জন্ম নিয়েছে তার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি জরুরি কাজ হয়ে উঠেছে।

মার্কসের চিন্তা আর মার্কসবাদকে আমরা সাধারণত একাকার করে ভাবি। মার্কসের ডাকনাম ব্যবহার করে যে সকল ‘বাদ’ বা মতাদর্শ গড়ে উঠেছে এবং এখনও রয়েছে তা মার্কসের চিন্তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এটা আমরা অনুমান করি; কিন্তু কোথায় তাদের মিল আর কোথায় অমিল সেটা বিচার করে দেখার প্রয়োজন বোধ করি না। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে পার্থক্য অল্প নয়, গুরুতর। কমিউনিস্ট আন্দোলনের রমরমার মধ্যে এই পার্থক্য গুরুতর বিষয় হয় নি, কিন্তু প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া এবং সমাজতন্ত্র কায়েমের পরীক্ষা নিরীক্ষা ব্যর্থ হবার পর স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে মার্কসের চিন্তার মধ্যে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং সমাজতন্ত্র নির্মাণের ব্যর্থতা আদৌ নিহিত রয়েছে কিনা। যদি থাকে তবে তা শনাক্ত করা দরকার। যদি এই ব্যর্থতা মার্কসকে ব্যাখ্যা ও বোঝার মধ্যে নিহিত থাকে তাহলে কোথায় কিভাবে ভুল ব্যাখ্যার উৎপত্তি ঘটল সেটা চিহ্নিত করা দরকার। পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের বর্তমান সময়ে বিপ্লবী রাজনীতির পুনর্গঠনের তাগিদে মার্কসের চিন্তার পর্যালোচনা আরও বেশী জরুরী হয়ে উঠেছে।

তবে মার্কসের চিন্তার ব্যাখ্যা নিয়ে তর্ক কমিউনিস্ট আন্দোলনে সবসময়ই ছিল। তবে সেটা সবসময়ই ছিল ব্যবহারিক রাজনীতির জায়গা থেকে, কিন্তু মার্কসের সামগ্রিক চিন্তা বা দর্শন নিয়ে তর্ক বিপ্লবী রাজনীতির পুনর্গঠনের তগিদেই সম্প্রতিকালে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একটি বিষয় দ্রুতই সকলে স্বীকার করেন, মার্কস আর মার্কসবাদ সমার্থক নয়; সমার্থক ভাবা নিছকই পূর্বানুমান। যদি তাই হয় তাহলে  'মার্কসবাদ' নামে যে সকল চিন্তাধারা রয়েছে তাদের সঙ্গে মার্কসের চিন্তার পার্থক্য নির্ণয় করতে পারা দরকার। কিন্তু সেটা করতে হলে অন্যের ব্যাখ্যার ওভর নির্ভরশীল না থেকে খোদ মার্কস চর্চা জরুরী হয়ে ওঠে। মার্কসবাদ থেকে আলাদা গণ্য করে মার্কসের চিন্তা ঘনিষ্ঠ ভাবে পাঠ ও পর্যালোচনা সে কারনেই জরুরী হয়ে ওঠে।

এই সত্য অস্বীকার করবার কোন জো নাই যে মার্কসের অধিক কোন দার্শনিকই এ কালের চিন্তা ও রাজনৈতিক তৎপরতায় এতো বিশাল প্রভাব বিস্তার করতে পারেন নি। এখনও তাঁর প্রভাবের কমতি ঘটেনি। মার্কসকে অতিক্রম করে যেতে হলে তাঁকে আত্মস্থ করেই সামনে যেতে হবে, নাকচ করে নেয়। সেই কারণেই বিভিন্ন মার্কসবাদী ধারার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের বাইরে মার্কসকে সরাসরি বোঝার তাগিদ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু মার্কস নয়, মার্কসের নামে গড়ে ওঠা বিভিন্ন ধারারও সুনির্দিষ্ট বিচার জরুরী কাজ। এঙ্গেলস, লেনিন, স্টালিন, মাওজে দং – প্রত্যেককে তাদের নিজ নিজ চিন্তা ও তৎপরতা দিয়েই বিচার দরকার। ধরে নেওয়া উচিত নয় তাঁরা সকলেই মার্কসের নাম নিয়েছেন বলে সব সবসময় মার্কসের মতোই ভেবেছেন। তাছাড়া তাদের প্রত্যেকেরই সুনির্দিষ্ট অবদান – সাফল্য এবং ব্যর্থতা – দুটোই রয়েছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশেষ দেশে এবং কালে তারা মার্কসকে নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তর্ক থাকলেও যা বৈপ্লবিক রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলবার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে। সকল দিক থেকেই বিচার দরকার আছে।

মার্কসকে নতুন করে বিচার বিশ্লেষণ করতে ও বুঝতে গিয়ে অনেকে সম্প্রতি দাবি করেছেন, মার্কস দার্শনিকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ভুল বোঝা দার্শনিক। সে কারণে অনায়াসেই বলা যায় মার্কসবাদ হচ্ছে মার্কস সম্পর্ক সারি সারি ভুল অনুমান ও উপস্থাপন (Henri, 1983)। এই অভিযোগ একটু বাড়াবাড়ি মনে হলেও এর পক্ষে প্রধান যুক্তি হচ্ছে মার্কসকে সাধারনত প্রত্যক্ষ রাজনীতি ও অর্থশাস্ত্রের জায়গা থেকেই বুঝবার ও কাজে লাগানোর চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু মার্কসের দর্শন ঠিক কী, সেটা এখনও অন্ধকারেই রয়ে গিয়েছে। তরুণ বয়সের বিক্ষিপ্ত রচনা ছাড়া মার্কস যেভাবে অর্থশাস্ত্র নিয়ে লিখেছেন সেভাবে দর্শন নিয়ে কোন গ্রন্থ রচনা করেন নি। দার্শনিকরা শুধু দুনিয়া ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু কাজ হচ্ছে একে বদলে দেওয়া – মার্কসের একথার মানে অধিকাংশ মার্কসবাদীদের কাছে হয়ে উঠেছিল দর্শন চর্চার বুঝি আর কোন দরকার নাই, এখন দরকার শুধু রাজনৈতিক তৎপরতা। মার্কসের এই ঘোষণা দর্শন থেকে তার প্রস্থান হিসাবে ধরে নেওয়া হয়। এতে বিস্তর জটিলতা তৈরি হয়েছে।

জটিলতা শুরু হয় গোড়াতেই। কারন দাবি করা হয় মার্কসবাদ একটি দর্শন, একটি সুনির্দিষ্ট মতাদর্শিক ধারা। মার্কস যদি দর্শন নিয়ে কোন কিতাব না লিখে থাকেন তাহলে মার্কসবাদ নামক এই সুনির্দিষ্ট মতবাদের উৎপত্তি কোথা থেকে? এটা এখন অনেকেই মানেন যে এর উৎপত্তি প্রধানত ফিডরিখ এঙ্গেলস-এর লেখালিখি থেকে। মার্কস ‘পুঁজি’ গ্রন্থের মতো সুনির্দিষ্ট ভাবে দর্শন নিয়ে কোন কিতাব লেখেন নি। মার্কসকে তাঁর বন্ধু এঙ্গেলস যেভাবে হাজির ও ব্যাখ্যা করেছেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভিত্তি তার ওপরই তৈরি হয়েছে।

তবে তথ্য হচ্ছে এই যে মার্কস তরুণ বয়সে ১৮৪৩-৪৪ সালের দিকে দর্শন নিয়ে কিছু লেখালিখি করেছেন। যেমন, ‘ইহুদি প্রশ্ন’ এবং ‘হেগেলের অধিকার শাস্ত্রের পর্যালোচনার ক্ষেত্রে একটি অবদান: ভূমিকা’ – এগুলো সেই সময়েই প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু দর্শন নিয়ে তাঁর তরুণ বয়সের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লেখা তার মৃত্যুর অনেক পরে প্রকাশিত হয়। ততোদিনে সোভিয়েত রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লব হয়ে গিয়েছে এবং স্টালিন ক্ষমতাসীন হয়েছেন। ‘হেগেলের অধিকার শাস্ত্রের পর্যালোচনা’ প্রকাশিত হয়েছে ১৯২৭ সালে, আর ‘অর্থনৈতিক ও দার্শনিক খসড়া ১৮৪৪’ বইটির প্রকাশকাল ১৯৩২। এটাও মনে রাখা দরকার যে ‘জর্মান ভাবাদর্শ’ সংক্রান্ত খসড়ার পুরাটা ছাপা হয়েছে ১৯৩২ সালে আর ১৮৪৫ সালে ‘পবিত্র পরিবার’ গ্রন্থটি বেরোবার পরপরই আর ছাপা হয় নি। ফলে কোথাও পাওয়া যেতো না।

ফ্রানৎজ মেহেরিং (১৮৪৬-১৯১৯) মার্কসের প্রথম দিককার কিছু কিছু লেখা ১৯০২ সালে ছেপেছিলেন, কিন্তু মার্কসের দার্শনিক চিন্তা অনুধাবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলো অপ্রকাশিত ও অজানাই থেকে গিয়েছে। ততোদিনে মার্কসবাদী প্রথম সারির লেখকদের সকলেরই চিন্তা কমবেশী রূপ নিয়ে নিয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন কার্ল কাউৎস্কি (১৮৫৪-১৯৩৮), গিওর্গি প্লেখানভ ১৮৫৬-১৯১৮), এডোয়ার্ড বার্নস্টাইন (১৮৫০ -১৯৩২) এবং এন্টনিও লাব্রিওলা (১৮৪৩ – ১৯০৪)। এই সকল তথ্যের ভিত্তিতে ইটালির দার্শনিক লুসিও কোলেত্তি ঠিকই বলেছেন: যে জটিল ও কঠিন দার্শনিক পর্যালোচনা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মার্কসের চিন্তা রূপ নিয়েছে সে সম্পর্কে প্রথম দিকের কমিউনিস্টরা বলা যায় প্রায় অজ্ঞই ছিলেন’ (Marx, 1975, p. ৭)।

মার্কসের দর্শন বোঝার অর্থ প্রধানত মার্কস কিভাবে তাঁর সময়ের প্রধান প্রধান দার্শনিকদের চিন্তা মোকাবিলা করেছেন এবং কিভাবে তিনি তাঁর নিজস্ব দার্শনিক সিদ্ধান্তে এসেছিলেন সেই প্রক্রিয়া জানা, বিশ্লেষণ ও অনুধাবন। অর্থাৎ মার্কসের হাতে চিন্তা বা দর্শনের বিকাশ কিভাবে ঘটেছে তার ধারাবাহিক পদক্ষেপগুলো বোঝা দরকার।  এটা মোটেও দর্শনের জন্য দর্শন চর্চার জন্য নয়। বরং দরকার বৈপ্লবিক চিন্তা ও তৎপরতার পুনর্গঠনের দরকারে। কিন্তু বিংশ শতাব্দির শেষ অবধি 'পুঁজি' গ্রন্থের মতো মার্কসের দার্শনিক চিন্তার কোন হদিস ছিল না। তিনি ‘পুঁজি’ গ্রন্থ লিখেছেন বটে, কিন্তু গোড়ার সেই দার্শনিক জিজ্ঞাসারই কোন হদিস রইল না কেন তিনি দর্শন চর্চা না করে অর্থশাস্ত্র পর্যালোচনাকেই তাঁর জীবনের ব্রত হিসাবে গ্রহণ করলেন। দর্শন আর অর্থশাস্ত্রের মধ্যে তাহলে সম্বন্ধ কি? ‘অর্থশাস্ত্র পর্যালোচনায় একটি সংযোজনা’ নামে ১৮৫৯ সালে তিনি যে পুস্তিকা লেখেন সেখানে ভূমিকা হিসাবে তিনি তাঁর চিন্তা পদ্ধতি বা সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে দুই একটি লাইন লিখেছিলেন মাত্র। কিন্তু অতোটুকুই। আর কিছু না।

তাহলে মার্কসবাদ নির্ণয়ে নির্ধারক লেখালিখি কী ছিল? কার ছিল? সেটা ছিল ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের lল্যুদভিগ ফয়েরবাখের ওপর লেখা পুস্তিকা: ‘ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ এবং ধ্রুপদি জর্মান দর্শনের অবসান’ (Engels, 1888)। মার্কসের সঙ্গে ফয়েরবাখ আর হেগেলের সম্পর্ক বিচার করবার ও বুঝবার এটাই ছিল প্রধান ও আদি পাঠ্যপুস্তক। এই বইটি ছাড়া মার্কসবাদ নামক মতাদর্শ যাঁরা শুরুতে তৈরি করেছেন সেই প্রথম সিঁড়ির মার্কসবাদী লেখকদের কেউই মার্কসের তরুণ বয়সের শুরুর দিকের দার্শনিক রচনা সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। লুইসি কোলেত্তিসহ অনেকেই এই দাবি করেছেন। এই দাবি সঠিক।

তাহলে মার্কসবাদ বা মার্কসবাদী দর্শন কী? মার্কসবাদের দার্শনিক মর্ম নিবদ্ধ ছিল ব্যবহারিক রাজনীতির দিকে। ব্যবহারিক রাজনীতির বাস্তব সমস্যা নিরসনের জন্য মতাদর্শিক তর্কবিতর্কই ছিল মার্কসবাদের ‘দর্শন’। বাস্তবের লড়াই-সংগ্রামের সঙ্গে চিন্তার সপ্রাণ সম্বন্ধ বজায় রাখা ছিল মার্কসবাদের ইতিবাচক দিক। সেদিক থেকে বিচার করলে ব্যবহারিক রাজনীতির রণনৈতিক ও রণকৌশলগত যে সকল বিতর্ক রাশিয়া, চিন এবং অন্যান্য দেশে মার্কসবাদীরা করেছেন তার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু শুধু ব্যবহারিক রাজনীতির ক্ষেত্রে চিন্তাকে ক্রিয়াশীল রাখা মার্কসবাদী দর্শনের সীমাবদ্ধতাও বটে। দর্শনের নিজের একটা ইতিহাস আছে; পাশ্চাত্যে সেই ইতিহাসের মধ্যেই কার্ল মার্কসের জন্ম। মার্কস পাশ্চাত্য জ্ঞানকাণ্ডেরই সম্প্রসারণ। সেই ধারার সঙ্গে সার্বক্ষণিক মোকাবিলা থেকে চ্যূত হবার কারণে দর্শনের ইতিহাস থেকে অচিরেই মার্কসের নামে গড়ে ওঠা ‘মার্কসবাদী’ দর্শন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিছুকাল পর সেটা পরিণত হয় কিছু ঘোষণায় এবং অনড় সিদ্ধান্তে। ‘মার্কসবাদ’ এক প্রকার গোঁড়া ও অন্ধ বিশ্বাসে পরিণত হয়। সপ্রাণ দর্শনের সঙ্গে সম্পর্ক চর্চার মধ্য দিয়ে মার্কসের যে উত্থান ও বিকাশ আমরা দেখেছি মার্কসবাদ সেই সপ্রাণ ও সক্রিয় সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে নি। মার্কসবাদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার এটা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

তবে মার্কসবাদ তত্ত্বকে অবজ্ঞা করেছে এটা বলা যাবে না, কিন্তু বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের পক্ষে প্রচার চালাবার জন্য যে মতাদর্শ গড়ে উঠেছিল সেখানে চিন্তা তার স্বাধীনতা ও সপ্রাণতা হারিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির প্রপাগাণ্ডা যন্ত্রের নাটবল্টু হয়ে পড়ে। তত্ত্ব তার সজীব দার্শনিক জমিন হারিয়ে ফেলে। নতুন যে সকল জিজ্ঞাসা দর্শনের জগতে উত্থাপিত হয় তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে মার্কসবাদ ব্যর্থ হয়।

তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়

মার্কসবাদ গড়ে উঠবার পেছনে মার্কসের দার্শনিক লেখালিখির কোন ভূমিকা ছিল না, কারন মার্কসের তরুণ বয়সের দার্শনিক রচনাগুলো প্রথম সিঁড়ির মার্কসবাদীদের কাছে অজানা ছিল এবং মার্কসবাদের উৎপত্তি প্রধানত এঙ্গেলসের লেখালিখি থেকে –ইত্যাদি তথ্য আমাদের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগে।

এক. মার্কস ও মার্কসবাদের পার্থক্য গড়ে উঠবার বাস্তবতা বা যুক্তিসঙ্গত কারণ উপলব্ধি করা। প্রথম সিঁড়ির কমিউনিস্টদের দোষ দেওয়া অন্যায় ও অর্থহীন। মার্কসের তরুণ বয়সে লেখা দার্শনিক রচনা সম্পর্কে তাঁরা অবহিত ছিলেন না। এটাই বাস্তবতা।

দুই. এই তথ্যগুলো আমাদের মধ্যে একটি তাগিদ সঞ্চার করে। সেটা হোল একালে মার্কসকে বুঝতে হলে তার প্রথম দিকের তরুণ বয়সের রচনা ঘনিষ্ঠ ভাবে পাঠ ও পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা। মার্কসের চিন্তা পরিগঠনের প্রক্রিয়া বোঝা ও পর্যালোচনার জন্য এ কাজটা আমাদের জন্য এখন খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে। সেই কাজ করতে গিয়ে প্রথাগত মার্কসবাদের অবদান কিম্বা সীমাবদ্ধতা – কোনটিই যেন মার্কস বুঝবার ক্ষেত্রে আমাদের প্রভাবিত না করে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরী।

মার্কস দর্শনের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বুঝেছিলেন দর্শন দিয়ে দর্শনের বিচার একটা গোলকধাঁধাঁ বা রহস্যের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকা, বরং দর্শনের দার্শনিক ভাষা, বর্গ ও সিদ্ধান্ত বুঝতে হলে একটি সমাজের বৈষয়িক জীবনকে আমলে নেওয়া দরকার । বৈষয়িক জীবন এবং তার দ্বন্দ্ব-সংঘাত কিভাবে আমাদের চিন্তায় প্রতিফলিত হয় সেই দিকটা বোঝা জরুরী। এ কারণে মার্কস অর্থশাস্ত্রের পর্যালোচনা জরুরী মনে করেছিলেন। মার্কস দর্শনের বিরাট বিরাট বই লেখেন নি, এটা ঠিক। কিন্তু দর্শনের পরিমণ্ডলে তিনি একটি বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটিয়ে ও রটিয়ে গিয়েছেন। সেটা হোল হেগেলের ‘আত্ম-সচেতন’ হওয়ার ধারণাকে সামাজিক ও ঐতিহাসিক ভাবে বোঝার তরিকা । বৈষয়িক জীবনের সঙ্গে চিন্তার সম্বন্ধ বিচার ছাড়া কোন চিন্তাই আত্ম-সচেতন হতে পারে না – এই প্রস্তাবনার মধ্য দিয়ে মার্কস খোদ দর্শনের ভিত্তিকেই ওলটপালট করে দিয়ে গেলেন। দর্শনের জায়গায় নতুন দর্শন হিসাবে হাজির হোল অর্থশাস্ত্র। কিন্তু অর্থশাস্ত্র মার্কসের কাছে স্রেফ অর্থনৈতিক বিষয়াদির শাস্ত্র নয়, বরং বৈষয়িক জীবনের বিষয়াদি নিয়ে মানুষের দৈনন্দিন কিম্বা শাস্ত্রীয় চিন্তাভাবনার পর্যালোচনা। ‘পর্যালোচনা’ কথাটা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। সর্বদা তাই মনে রাখা দরকার যে ‘পুঁজি’ বইয়ের উপ-শিরোনাম হচ্ছে ‘অর্থশাস্ত্রের একটি পর্যালোচনা’। বৈষয়িক জীবনের বিষয়াদি নিয়ে সমাজ যেভাবে ভাবনাচিন্তা করে সেই ভাবনাচিন্তার পর্যালোচনা। তাহলে দর্শনের যথার্থতা সেখানেই যদি আমাদের চিন্তার সঙ্গে বৈষয়িক জীবনযাপনের সম্বন্ধ পর্যালোচনা করবার হিম্মত দর্শন অর্জন করে এবং মানুষের ভাষায় সেই সম্বন্ধ কিভাবে ব্যক্ত হচ্ছে তা বিশ্লেষণ করে তার পেছনে জারি থাকা বৈষয়িক সম্পর্কগুলোকে উন্মোচন করতে সক্ষম হয়। এটাই মার্কসের অর্থশাস্ত্রের পর্যালোচনা। মার্কসের কাছে বৈষয়িক সম্পর্ক পর্যালোচনাই দর্শন। কারন এর মধ্য দিয়েই মানুষ তার বৈষয়িক জীবনের সঙ্গে চিন্তা বা দর্শনের সম্বন্ধ বিশ্লেষণ ও অনুধাবন করতে পারে। এই অর্থে দর্শন আত্ম-সচেতন এবং ইতিহাস সচেতন হয়ে ওঠারই আরেক নাম।

তিন. মার্কসবাদের মতাদর্শিক নির্মাণে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ধারক হয়ে উঠেছিলেন ওপরের তথ্যগুলো সেই বাস্তবতা বুঝতে আমাদের সাহায্য করে। মার্কসের দার্শনিক লেখালিখির অভাব পূরণ করতে গিয়েই এঙ্গেলসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। মার্কসের দার্শনিক চিন্তার অপ্রাপ্যতা এবং অভাবই ‘মার্কসবাদ’ পরিগঠনে এঙ্গেলসের ভূমিকা নির্ধারক করে তোলে। ফয়েরবাখের ওপর তাঁর বইটি ছাড়াও আর যে দুটি বই কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম যুগের ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সেটা হচ্ছে এন্টি ডুহরিং (১৮৭৮) এবং ‘পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা এবং রাষ্ট্রের উদ্ভব’ (১৮৮৮)। এঙ্গেলসের এই তিনটি বই-ই মূলত ‘মার্কসবাদ’ নামে আমরা কমবেশী যার সঙ্গে পরিচিত তার দার্শনিক ভিত্তি, ভাষা ও কাঠামো তৈরি করেছে। এঙ্গেলসের ভাষা এবং প্রকাশভঙ্গী ছিল প্রাঞ্জল। তাই এঙ্গেলসের লেখালিখিই মার্কসবাদের ভিত্তি রচনার ক্ষেত্রে সরাসরি ভূমিকা রাখে। তুলনায় মার্কসের অর্থশাস্ত্র সংক্রান্ত লেখা কিম্বা রাজনীতি নিয়ে লেখালিখি থেকে তাঁর দর্শন পুরাপুরি বুঝতে পারা ছিল খুব কঠিন ব্যাপার।

এই তথ্যগুলো মনে রাখলে আমরা কিছু বদ্ধমূল অনুমানও পরিহার করতে পারব। যেমন, মার্কস ও এঙ্গেলসের সঙ্গে মার্কসবাদের সম্পর্ক। মার্কস এবং এঙ্গেলস-এর বন্ধুত্বের কোন তুলনা নাই। মার্কসবাদকে সাধারণত আমরা মার্কস-এঙ্গেলসের যৌথ চিন্তার ফসল গণ্য করি। কিন্তু এটা পুরাপুরি ঠিক নয়। যদি নতুন ভাবে উভয়ের অবদান পর্যালোচনা করি তাহলে এই অনুমান কেন ভুল সেটা সহজেই বোঝ যায়। প্রচলিত ও পরিচিত মার্কসবাদে এঙ্গেলসের অবদানই বেশী। এই অনুমানও ভুল যে তাঁরা উভয়ে সব সময় একই রকম ভাবতেন, কিম্বা একই রকম ভেবেছেন। তাদের চিন্তার যে সারপদার্থ এখনও বহাল তবিয়তে সক্রিয় চিন্তার জগতে হাজির রয়েছে এবং বাতিল হয়ে যায় নি তা শনাক্ত করতে চাইলে তাঁদের দুজনের চিন্তার প্রক্রিয়া ও বৈশিষ্ট্য আলাদা করে বিচার করাই সঙ্গত। এঙ্গেলসের চিন্তা সম্পর্কে মোটামুটি আমরা অবহিত। সেই জানা আরও ঝালিয়ে নেবার দরকার থাকতে পারে। তবে মার্কস কিভাবে চিন্তা করেছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন সে সম্পর্কে খুব কমই আমাদের জানা আছে।

সফল হোক বা না হোক, মার্কসবাদের দার্শনিক প্রশ্নের মীমাংসা প্রধানত এঙ্গেলসের লেখালিখির মধ্য দিয়েই হয়েছে। মার্কসবাদের গুরুত্বপূর্ণ ধারণা যেমন, ‘ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’, ‘দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ’ ইত্যাদি একান্তই এঙ্গেলসের অবদান। প্রচলিত যুক্তিবাদ আর দ্বান্দ্বিক যুক্তিবাদের মধ্যে পার্থক্য, মার্কসবাদের সঙ্গে বিজ্ঞানের সম্পর্ক এবং মানবেতিহাসকে প্রকৃতি বিজ্ঞানের পদ্ধতি দিয়ে অনুধাবন ইত্যাদি একান্তই এঙ্গেলসের এবং তাঁর ব্যাখ্যাই মার্কসবাদ নামে প্রতিষ্ঠিত।

দর্শনের দিক থেকে আরেকটি গুরুতর প্রশ্ন --যেমন মার্কসের সঙ্গে হেগেল ও ফয়েরবাখের সম্পর্ক -- এ সম্বন্ধে মার্কসবাদে যা কিছু দাবি করা হয় তার সবটাই এঙ্গেলসের এন্টি-ডুহরিং ও ফয়েরবাখ সংক্রান্ত বইয়েরই ব্যাখ্যা। মার্কসকে বোঝার ক্ষেত্রে এই সকল প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যা মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এঙ্গেলসের লেখার আবেদন ছিল বিপুল। তাঁর লেখা ছিল সহজ এবং তিনি আন্তরিক ভাবেই মার্কসের চিন্তা জনপ্রিয় করতে চেয়েছেন। কিন্তু করতে গিয়ে পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসের মধ্যে তৈরি হওয়া মার্কস হাজির হয়েছেন একজন দর্শনের বিপরীতে দাঁড়ানো দর্শন বিরোধী ব্যক্তি হিসাবে, যিনি মনে করেন দর্শনের আর কোন ভূমিকা নাই, এখন কাজ হচ্ছে শুধু বিপ্লব করা। পাশাপাশি মার্কসের চিন্তা হাজির হয়েছে একান্তই অর্থনীতিকেন্দ্রিক চিন্তা হিসাবে। যেখানে দর্শনের সঙ্গে অর্থশাস্ত্রীয় চিন্তার সম্পর্ক অস্পষ্ট ও অপরিচ্ছন্ন।

তাহলে মার্কসকে বোঝার প্রাথমিক দার্শনিক জিজ্ঞাসা হচ্ছে অর্থশাস্ত্রের সঙ্গে দর্শনের সম্পর্ক বিচার। দর্শন বুঝতে হলে কেন দর্শন থেকে বেরিয়ে এসে সমাজের বৈষয়িক উৎপাদন ও পুরুৎপাদন পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ জরুরি সেই দিকটা বোঝা দরকার। সুনির্দিষ্ট ভাবে বলা যায় সামাজিক মানুষের বৈষয়িক জীবনের সঙ্গে চিন্তার সম্বন্ধ পর্যালোচনা। এই অর্থে মার্কস নিঃসন্দেহে দর্শনের একটি সম্পর্ণ নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছেন।

যদি ওপরের কথাগুলো মানি তাহলে একটা চ্যালেঞ্জ ঘাড়ে এসে পড়ে। সেটা হোল মার্কসের অর্থশাস্ত্রীয় চিন্তা থেকে তাঁর দর্শন অনুমান না করে দার্শনিক বিষয়াদি নিয়ে সরাসরি তার চিন্তাভাবনা সম্পর্কে আরও সম্যক জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করা। সেটা কিভাবে সম্ভব? এর একটি প্রাথমিক উত্তর হচ্ছে মার্কসের তরুণ বয়সের লেখালিখি পাঠ এবং সেখানে কিভাবে তাঁর চিন্তার বিবর্তন ঘটছে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ এবং পর্যালোচনা।

এঙ্গেলসের সরলীকরণ

মার্কস এবং এঙ্গেলসের চিন্তার অবিভাজ্যতা মার্কসবাদের একটি প্রধান স্তম্ভ। কিন্তু এটা নিছকই অনুমান। মার্কস কিম্বা এঙ্গেলসকে বোঝার ক্ষেত্রে এই অনুমান একটি প্রতিবন্ধকতা। উভয়ে একই রকম চিন্তা করেছেন সেটা ঠিক নয়। কমিউনিস্ট আন্দোলনে এঙ্গেলসের অবদান অস্বীকার না করেও এই দুইয়ের অবিভাজ্যতার অনুমান থেকে মুক্ত হওয়া জরুরী। এই অনুমান থেকে মুক্ত না হলে উভয়ের চিন্তার পার্থক্য বোঝা যেমন কঠিন, তেমনি মিলের দিকটি শনাক্ত করাও মুশকিল হয়ে পড়ে।

মার্কসের ওপর ফয়েরবাখের প্রভাব পড়তে শুরু করে ১৮৪২ সালে দিকে। লুসিও কোলেত্তি আমাদের জানাচ্ছেন এই সময় এঙ্গেলস ‘শেলিং ও বিপ্লব’ নামে একটি পুস্তিকা বের করেছিলেন। নিজ নাম নয়, এঙ্গেলস এই বইয়ে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছিলেন। বার্লিনে তখন হেগেলের সমালোচক হিসাবে খ্যাত ‘ইয়ং হেগেলিয়ান’দের একটি দার্শনিক পাঠচক্র বা ক্লাব। নাম ‘ডক্টরস ক্লাব’। তারা দাবি করতেন হেগেলের দর্শনের যে বৈপ্লবিক চরিত্র তার সঙ্গে হেগেলের রাজনৈতিক দিক থেকে রক্ষণশীল রাজনৈতিক উপসংহার মেলে না। হেগেল ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রুশিয়ান রাষ্ট্রের সঙ্গে আপোষ করেছেন। সেটা তার দর্শনে প্রতিফলিত হয়েছে। এই আপোষ তাঁর দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অতএব হেগেলের চিন্তায় স্ববিরোধিতা রয়েছে। যদি বিদ্যমান রাষ্ট্রের সঙ্গে আপোষী সম্পর্কের বিচ্যুতি থেকে হেগেলকে মুক্ত করা যায় তাহলে হেগেলের দর্শনই আগামি দিনের দর্শন হয়ে উঠবে। তারা হেগেলের দর্শনের বৈপ্লবিক বৈশিষ্ট্য স্বীকার করতেন, শুধু চাইতেন হেগেলকে তার স্ববিরোধিতা থেকে মুক্ত করে সাফসুতরো করে নেওয়া (Marx, 1975, p. ১৩)।

এই সময় এঙ্গেলসও ডক্টরস ক্লাবের সদস্যদের মতোই চিন্তা করতেন। ফয়েরবাখের লেখাকে এঙ্গেলস মনে করতেন ডেভিড স্ট্রাউসের (১৮০৮-১৮৭৪) লেখারই সম্প্রসারণ। স্ট্রাউস খ্রিস্ট ধর্মের সমালোচনা করে বেশ কিছু বই লিখেছিলেন যার মধ্যে ‘যীশুর জীবনী: পর্যালোচনামূলক নিরীক্ষা’, ‘বিশ্বাসীর যীশু এবং ইতিহাসের যীশু’, ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বই রয়েছে। হেগেলের দর্শনের প্রভাবে ধর্ম নিয়ে নতুন ভাবে ভাবনাচিন্তার যে ধারা তৈরি হয়েছিল এঙ্গেলসের কাছে স্ট্রাউস থেকে ফয়েরবাখ সেই ধারারই ধারক মাত্র। এখানে মনে রাখা দরকার জর্মান ভাবাদর্শে ধর্মের পর্যালোচনার যে ধারা গড়ে উঠেছিল ফয়েরবাখ ও মার্কস তারই উত্তরসূরী। এঙ্গেলস এটাও দাবি করেছিলেন যে ফয়েরবাখের ধর্মের পর্যালোচনা হেগেলের ভাববাদী দর্শনেরই প্রয়োজনীয় সংযোজন’। ফয়েরবাখ ধর্ম ও হেগেলের দর্শনের যে পর্যালোচনা করেছিলেন তার বৈপ্লবিক মর্ম মার্কস যেভাবে বুঝেছিলেন এঙ্গেলস সেভাবে বোঝেন নি।

হেগেলের সমালোচনা করতে গিয়ে ফয়েরবাখ ধর্ম ও দর্শনের যে সমালোচনা করেছেন এঙ্গেলস তাতে উৎফুল্ল হয়েছিলেন। ফয়েরবাখ মনে করেছেন নতুন দর্শনের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা এবং ন্যায্যতা একান্তই হেগেলের সমালোচনার মধ্য দিয়ে অর্জন সম্ভব। যার সারকথা মূলত দাঁড়ায় ধর্ম ও হেগেল উভয়কে নাকচ করে দিয়ে এগিয়ে যাওয়া। ফয়েরবাখ মনে করতেন হেগেলের চিন্তার আর কোন বিকাশ সম্ভব নয়। কারন হেগেলের দর্শন হচ্ছে আধুনিক দর্শনের পরিসমাপ্তি। অন্যদিকে ইয়ং হেগেলিয়ানরা মনে করতেন প্রুশিয়ান রাষ্ট্রের সঙ্গে হেগেলের ব্যক্তিগত আপোষ বাদ দিলে হেগেলের দর্শন একালের বিপ্লবী দর্শনই বটে। এঙ্গেলস তরুণ বয়সে ইয়ং হেগেলিয়ানদের চিন্তার বশবর্তী থাকলেও ফয়েরবাখের প্রভাবের কারণে তিনি ধরে নিয়েছিলেন বস্তুবাদী দর্শনকে ধর্ম ও ভাবাদর্শ উভয়ের বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে হবে। পরবর্তীতে কমিউনিস্ট চিন্তায় ভাববাদ বনাম বস্তুবাদ, নাস্তিকতা বনাম আস্তিকতা ইত্যাদি বাইনারি চিন্তার আধিপত্য এবং ধর্ম ও ভাববাদের বিপরীতে নাস্তিক্যবাদ ও বস্তুবাদ প্রতিষ্ঠাকেই কমিউনিস্ট রাজনীতি হিসাবে হাজির করবার যে ধারা গড়ে ওঠে তার মূল রসদ মার্কস থেকে নয়, একান্তই এঙ্গেলসের লেখালিখি থেকেই গড়ে উঠেছে।

মার্কস হেগেল সম্পর্কে ইয়ং হেগেলিয়ানদের অবস্থান মানেন নি। অর্থাৎ হেগেলের দার্শনিক চিন্তার রাজনৈতিক পরিণতি ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রুশিয়ান রাষ্ট্রের সঙ্গে আপোষ – এটা মার্কস মানতেন না। মার্কসের কোন লেখায় হেগেল রাজনৈতিক আপোষ করেছেন এমন অভিযোগ নাই। বরং পরিণত বয়সে তিনি বলেছিলেন তরুন বয়সে তিনি হেগেলের সমালোচনা করেছিলেন বটে, কিন্তু সবাই যখন হেগেলকে পরিত্যাগ করছে তখন তিনি গর্বের সঙ্গে বলছেন এই মহা শক্তিধর চিন্তাবিদের তিনি ছাত্র। অন্যদিকে ফয়েরবাখ হেগেলকে যেভাবে নাকচ করছেন মার্কস তা করেন নি, বরং ফয়েরবাখের সমালোচনা মার্কসকে হেগেলের চিন্তাকে আরও অগ্রসর জায়গায় নিয়ে যাবার প্রণোদনা তৈরি করেছিলো। হেগেলের দর্শনের রহস্য ঘুচিয়ে বৈষয়িক জীবনের সঙ্গে চিন্তার সম্বন্ধ পর্যালোচনা এবং সেই সম্বন্ধ বিচারের মধ্য দিয়ে মানুষের ঐতিহাসিক চেতনা বিকাশের শর্ত আবিষ্কারের দিকেই মার্কস এগিয়ে গিয়েছিলেন।

বাংলাদেশে ধর্ম, দর্শন ও রাজনৈতিক চিন্তার বাস্তবতা বিচার করলে এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। কমিউনিজমের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক সম্বন্ধে যে প্রচলিত ধারণা বদ্ধমূল, এবং যার নিরসন না হলে আমাদের পক্ষে গুণগত ভাবে নতুন চিন্তা ও রাজনীতির জন্ম দেওয়া অসম্ভব তাদের এইটুকু বোঝা দরকার যে মার্কসের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক বিচার যথেষ্ট গভীর ও সূক্ষ্ম একটি বিষয়, এটা নিছকই আস্তিকতা/নাস্তিকতার মামলা নয়। খ্রিস্ট ধর্মের বিচার থেকে জর্মান ভাবাদর্শের বিকাশ এবং তার পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে বৈষয়িক জীবনের সঙ্গে মানুষের চিন্তার সম্বন্ধ পর্যালোচনা – দর্শনের এটি একটি জটিল ও কঠিন পরিক্রমা। যার কারনে মার্কসের কমিউনিজমকে কোন ভাবেই ভালগার নাস্তিকতায় পর্যবসিত করা যায় না। যদি করা হয় তাহলে হেগেল-ফয়েরবাখ ও মার্কসের মধ্য দিয়ে চিন্তার যে বিকাশ ঘটেছে সেই ধারা থেকে আপসে আপ খারিজ হয়ে যেতে হয়।

মার্কস ও এঙ্গেলসের চিন্তার পার্থক্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে লুসিও কোলেত্তি বলছেন তারা দুইজন কিভাবে তাত্ত্বিক কমিউনিজমে পৌঁছেছেন সেটা একটা জটিল প্রশ্ন, তবে যেসব প্রমানাদি পাওয়া যায় তাতে স্পষ্ট যে এঙ্গেলস এসেছেন অর্থশাস্ত্রীয় চিন্তাভাবনার পথ ধরে, হেগেলের চিন্তার পর্যালোচনাকে একটি সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাবার তাগিদ থেকে নয়। এই কাজটা মার্কস করেছেন। অর্থাৎ জর্মান ভাবাদর্শের মধ্যে উত্থাপিত প্রশ্নের পর্যালোচনা ও মীমাংসার মধ্য দিয়ে মার্কস কমিউনিজমে পৌঁছেছেন, যার ভিত্তি অর্থশাস্ত্রীয় চিন্তায় নয়, বরং দর্শনে। হেগেলের দার্শনিক পর্যালোচনাকে তার যৌক্তিক পরিণতির দিকে নিয়ে গিয়েই মার্কস নতুন চিন্তার দিগন্ত আবিষ্কার করেছেন।

এঙ্গেলস দর্শন পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে তার চিন্তা গড়ে না তোলার ফলে লুইসি কোলেত্তি বলছেন, যখন চল্লিশ বছর পর এঙ্গেলস আবার দর্শন নিয়ে লেখালিখি শুরু করলেন তখন তিনি চল্লিশ বছর আগে দর্শনের বদ হজম হওয়া ধারণাই ফের পুনরুৎপাদন করলেন। সেই পুরানা কথাই বললেন, হেগেলের দ্বান্দ্বিক চিন্তা বৈপ্লবিক, কিন্তু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত রক্ষণশীল। অতএব হেগেলের চিন্তার সঙ্গে তার রাজনীতির স্ববিরোধিতা রয়েছে। কোলেত্তির এঙ্গেলস সমালোচনা নির্মম হলেও, কমিউনিস্টদের মধ্যে দর্শন মাত্রই একটি ভাববাদী ব্যাপার এই চিন্তার প্রাবল্য দর্শনের বদ হজম থেকে জাত – এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।

এঙ্গেলস ১৮৮৩ সালে কমিউনিস্ট ইশতেহারের জর্মান সংস্করণের ভূমিকায় লিখছেন:

“ইশতেহার’-এর ভিতরে যে মূলচিন্তা প্রবহমান তা এই যে ইতিহাসের প্রতি যুগে অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং যে সমাজ-সংগঠন তা থেকে আবশ্যিক ভাবে গড়ে ওঠে, তাই থাকে সে যুগের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিগত ইতিহাসের মূলে; সুতরাং (জমির আদিম যৌথ মালিকানার অবসানের পর থেকে ) সমগ্র ইতিহাস হয়ে এসেছে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস, সামাজিক বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে শোষিত ও শোষক, অধীনস্থ ও অধিপতি শ্রেণীর সংগ্রামের ইতিহাস; কিন্তু এই সংগ্রাম আজ এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, যেখানে একই সঙ্গে গোটা সমাজকে শোষণ, নিপীড়ন ও শ্রেণী সংগ্রাম থেকে চিরদিনের মতো মুক্তি না দিয়ে, শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণী (প্রলিতারিয়েত) নিজেকে শোষক ও নিপীড়ক শ্রেণীর (বুর্জোয়া) কবল থেকে মুক্ত করতে পারে না – এই মূল চিন্তাটি পুরোপুরি ও একান্ত ভাবেই মার্কসেরই চিন্তা”।

এঙ্গেলস মার্কসের চিন্তার সারমর্ম করছেন। বিস্মিত মনে হলেও এটাই সত্য যে ‘মার্কসবাদ’ নামে যা গড়ে উঠেছে তা যতোটা না মার্কসের চিন্তার ওপর দাঁড়ানো, তার চেয়ে অনেক বেশী মার্কস চিন্তার এই প্রকার অতি সরলীকৃত সারমর্ম দিয়ে গঠিত। এঙ্গেলস এখানে ঠিক বলছেন কিনা সেটা একটা আলাদা তর্ক হতে পারে। কিন্তু সত্য হচ্ছে মার্কসের এই সরল পাঠই মার্কসের ‘মূলচিন্তা’ হিসাবে কমিউনিস্টরা ধরে নিয়েছেন। এটি কমিউনিস্ট ইশতেহারের ভূমিকায় সংযোজিত থাকার কারণে এটাই মার্কসের দর্শনের সারকথা বা মার্কসবাদী মতবাদের ‘মূলচিন্তা’ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত।

সত্য যে এই প্রকার সরল ফর্মুলা বিপুল রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে মার্কসবাদের উত্থানের কারণ; কিন্তু একই ভাবে এবং অন্যদিকে তার বিপর্যয় ও সমূহ পতনেরও কারন। আমরা অনায়াসেই বলতে পারি মার্কসের বরাতে এঙ্গেলসের এই ‘মূলচিন্তা’ দিয়ে মার্কসকে কিছুই প্রায় বোঝা যায় না। একালের একজন ফরাসি দার্শনিক এই উদ্ধৃতিটিকে নজির ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। এঙ্গেলসের এই সরলীকরণের ভিত্তি মার্কসের দার্শনিক পর্যালোচনা কিম্বা মার্কসের কোন দার্শনিক সিদ্ধান্ত থেকে জাত নয়। মার্কসের যে সব লেখালিখি থেকে এঙ্গেলস এই সিদ্ধান্ত টানছেন সেগুলো প্রধানত রাজনৈতিক পুস্তিকা এবং অনেকগুলোই সংবাদপত্রের জন্য লেখা ঘটনাভিত্তিক মন্তব্য। কিন্তু যে ‘মূলচিন্তা’র ভিত্তিতে মার্কস লেখালিখি গুলো করেছেন সেই লেখালিখি থেকে মার্কসের ‘মূলচিন্তা’ ধরতে পারা ও বোঝা কঠিন। এই সকল রাজনৈতিক পুস্তিকার মধ্যে রয়েছে, ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’, ‘লুই বোনাপার্টের ১৮ই ব্রুমেয়ার’, ‘ফ্রান্সে শ্রেণী সংগ্রাম’, ‘ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ, ইত্যাদি।

রাজনৈতিক পুস্তিকাগুলোতে মার্কস যে ধারণাগুলো তৈরি করেছেন তা তাঁর দার্শনিক চিন্তার মৌলিক প্রত্যয় নয়। দার্শনিক চিন্তার সঙ্গে তার রাজনৈতিক লেখালিখির সম্পর্ক বিচার ভিন্ন কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। যেমন ‘অর্থনৈতিক উৎপাদন’ কথাটা মার্কস উৎপাদন বলতে যা বুঝাতে চেয়েছেন তা পুরাপুরি ধারণ করে না। কারণ বৈষয়িক জীবনের উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন বলতে মার্কস শুধু 'অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড' বোঝান নি। ফলে ‘অর্থনৈতিক উৎপাদন ...রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিগত ইতিহাসের মূলে’ এটা ঠিক মার্কসের প্রকাশভঙ্গী নয়, এমনকি তার কথাও নয়। মার্কসের গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হচ্ছে ‘উৎপাদন সম্পর্ক’। মানুষ জীব হিসাবে টিকে থাকার জন্য উৎপাদনে প্রকৃতির সঙ্গে এবং পরস্পরের সঙ্গে যে সম্পর্ক তৈরি করে সেই সম্পর্কের বিচারই মার্কসের চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাহলে উৎপাদন বলতে মার্কস যে অর্থে প্রকৃতির সঙ্গে এবং পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত থাকে --যা যুগপৎ মানুষের অস্তিত্বমান থাকবার এবং ঐতিহাসিক হবার শর্ত -- এঙ্গেলস মার্কসের চিন্তার সেই গভীর জায়গাগুলোকে যারপরনাই অস্পষ্ট করে ফেলেছেন।

দ্বিতীয়ত শ্রেণীর প্রশ্ন এঙ্গেলস যেভাবে হাজির করেছেন সেখানেও বড়সড় মুশকিল আছে। কারণ শ্রেণী মার্কসের রাজনৈতিক ধারণা বটে, কিন্তু ‘মূলচিন্তা’র অন্তর্গত ধারণা কিনা সেটা তর্কের বিষয়। কারণ শ্রেণী সংগ্রাম থাকতে হলে আগে শ্রেণীর উপস্থিতি থাকা দরকার। তাহলে শ্রেণী কিভাবে গঠিত হয় তার ব্যাখ্যা থাকার প্রয়োজন রয়েছে। মার্কস শ্রেণী সংগ্রামের কথা অবশ্যই বলেছেন, কিন্তু একই ভাবে শ্রেণীর আবির্ভাবের ব্যাখ্যা করবার জন্য উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদন ব্যবস্থার ব্যাখ্যা করেছেন। সেই দিক মনে না রাখলে ‘সমগ্র ইতিহাস হয়ে এসেছে শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস’ এই সরল প্রকাশ বিভ্রান্তি তৈরি করে। রাজনৈতিক সাহিত্যের ভাষার সঙ্গে মার্কসের দার্শনিক চিন্তার সম্বন্ধ পর্যালোচনা একটি অসম্পূর্ণ অথচ অতিশয় দরকারী কাজ হিসাবে পড়ে আছে।

বিভ্রান্তি যে তৈরি করে তার নজির হচ্ছে ১৮৮৮ সালে কমিউনিস্ট ইশতেহারের ১৮৮৮ সালের ইংরেজি সংস্করণে এঙ্গেলসকে টীকা দিয়ে ব্যাখ্যা করতে হয়েছে যে, শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস বলতে কমিউনিস্ট ইশতেহার মূলত ‘লিখিত ইতিহাস’ বোঝাচ্ছে। কমিউনিস্ট ইশতেহারে এঙ্গেলসের ‘শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস’ সম্পর্কে টীকা আমরা এখানে পড়ে নিতে পারি। কমিউনিস্ট ইশতেহার ঘোষণা করছে ‘আজ পর্যন্ত যতো সমাজ দেখে গেছে তাদের সকলের ইতিহাসই শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস’। কিন্তু আধুনিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমরা শ্রেণী ও শ্রেণী সংগ্রামের যে রূপ দেখি, অতীত ইতিহাসেও কি শ্রেণী ও শ্রেণী সংগ্রা্ম রূপ একই প্রকার ছিল। প্রাচীন ইতিহাসকে কি আমরা শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস বলতে পার? ‘ইতিহাস’ কথাটাকে তাহলে ভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করা দরকার হয়ে পড়ে। এঙ্গেলস ‘ইতিহাস’-এর টীকা দিতে গিয়ে লিখছেন, ইতিহাস বলছে বোঝানো হয়েছে ‘লিখিত’ ইতিহাস। এঙ্গেলস লিখছেন:

“অর্থাৎ সমগ্র লিখিত ইতিহাস। ১৮৪৭ সালে সমাজের প্রাক-ইতিহাস, লিখিত ইতিহাসের পূর্ববর্তী কালের সামাজিক সংগঠনের বিবরণ প্রায় অজ্ঞাতই ছিল। তারপরে, হাফ্‌স্টহাউজেন রাশিয়ার জমির ওপর যৌথ মালিকানা আবিষ্কার করেন, মাউরার প্রমাণ করেন যে সকল টিউনিক জাতির ইতিহাস শুরু হয় এই সামাজিক ভিত্তি থেকে, ক্রমে ক্রমে দেখা গেল যে ভারত থেকে আয়র্ল্যান্ড পর্যন্ত সর্বত্র গ্রাম-গোষ্ঠিই (village communities) সমাজের আদি রূপ ছিল কিংবা রয়েছে। গোত্রের (gens) আসল প্রকৃতি এবং উপজাতির (tribe) সঙ্গে তার সম্পর্ক বিষয়ে মর্গানের চূড়ান্ত আবিষ্কার এবং আদি কমিউনিস্ট ধরনের সমাজের ভিতরকার সংগঠনের বিশিষ্ট রূপটি খুলে ধরল। এই আদিম গোষ্টিগুলো ভেঙ্গে পরার সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ভিন্ন ভিন্ন এবং শেষ পর্যন্ত পরস্পর বিরোধী শ্রেণীতে বিভক্ত হতে শুরু করে। এই ভাঙনের ধারাটা আমি অনুসরণের চেষ্টা করেছি আমার ‘Der Ursprung der Familie, der Privateeiigentums und des Staats’ (পরিবার, ব্যক্তিগত মালিকানা এবং রাষ্ট্রের উৎপত্তি’ গ্রন্থটিতে, দ্বিতীয় সংস্করণ, স্টুটগার্ট, ১৮৮৬) (কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ১৮৮৮ , p. ২৮)।

মোটা হরফে বিভিন্ন শব্দের ওপর গুরুত্বারোপ এঙ্গেলসের। আমরা মস্কোর প্রগতি প্রকাশন-এর অনুবাদ উদ্ধৃত করেছি। আউগুস্ট হাফ্‌স্টহাউজেন (১৭৯২-১৮৬৬) একজন প্রুশীয় ব্যারন, রাশীয়ার কৃষি সম্পর্কে অধ্যয়ন করেছেন ও লিখেছেন। গেওর্গ ল্যুডভিগ মাউরার একজন জর্মান ইতিহাসবিদ। লিউইস হেনরি মর্গান (১৮১৮-১৮৮১) একজন মার্কিন নৃবিজ্ঞানী।

আমরা দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিয়েছি দেখাতে যে রাজনৈতিক সাহিত্যে মার্কস যে সকল ধারণা বা প্রত্যয় ব্যবহার করেছেন তাকে মার্কসের ‘মুলচিন্তা’ দাবি করার সমস্যা আছে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল আঁরি ঠিকই বলেছেন, “মার্কসে শ্রেণী হচ্ছে ইতিহাস সংক্রান্ত ‘মূলচিন্তা’র বাইরের ধারণা, রাজনৈতিক সাহিত্যে যেসব ধারণার প্রবেশ ঘটেছে তারা সেখানে যে ভূমিকা পালন করে তার তুলনায় (মার্কসের মূলচিন্তায়) তাদের তাৎপর্য সীমিত” (Henri, 1983, p. ২)।

মার্কসকে আমরা শ্রেণী ও শ্রেণি সংগ্রাম ছাড়া ভাবতে পারি না। আমরা ধরে নিয়েছি বর্গ হিসাবে ‘শ্রেণী’ মার্কসের মূলচিন্তার ভিত্তি বা নির্ধারক ধারণা। এই অনুমান তর্ক সাপেক্ষ। এটা অবশ্যই সঠিক যে রাজনৈতিক লড়াই সংগ্রামের বর্ণনা বা রাজনৈতিক সাহিত্যে মার্কস সফল ভাবে ‘শ্রেণী’ বর্গটিকে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু মার্কস যখন বৈষয়িক উৎপাদনের কথা বলেন, কিম্বা উৎপাদনের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করেছেন, কিম্বা পুঁজির উদ্ভব ও ইতিহাস নিয়ে বিশাল অভিসন্দর্ভ রচনা করেছেন সেখানে কোথাও ইতিহাস মাত্রই শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস এই দাবিঙ্করেন নি । তাহলে দেখা যাচ্ছে মার্কসের মূল দার্শনিক চিন্তার সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সাহিত্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধারণা ও প্রত্যয়ের সম্পর্কে বিচার একটি অসম্পূর্ণ অথচ অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য পড়ে রয়েছে। স্রেফ রাজনৈতিক সাহিত্যের স্তরে এবং সেই স্তরে ব্যবহৃত ধারণা বা প্রত্যয় দিয়ে মার্কসকে আমরা একদমই বুঝবোনা।

মনে রাখা দরকার ‘পুঁজি’ তৃতীয় খণ্ডে মার্কস শ্রেণী নিয়ে নতুন করে লিখতে আরম্ভ করেছিলেন, কিন্তু শেষ করেন নি। অসমাপ্ত খসড়া যেখানে শেষ হয়েছিল সেখানে এঙ্গেলস লেখেন, ‘এখানে এসে পাণ্ডুলিপি থেমে গিয়েছে’। ফলে মার্কসের রাজনৈতিক সাহিত্যে ব্যবহৃত ‘শ্রেণী’ আর ‘পুঁজি’ গ্রন্থের ‘শ্রেণী’ একই মর্ম ধারণ করে কিনা সেটা গুরুতর তর্কের বিষয়। এই তর্ক মার্কসবাদে ভিন্ন ভাবে সবসময়ই জারি ছিল। যেমন অর্থনৈতিক অর্থে শ্রেণী আর রাজনৈতিক অর্থে শ্রেণীর পার্থক্য। শ্রেণী সচেতনতার মানে কি অর্থনৈতিক অবস্থার সচেতনতা? নাকি অন্য কিছু? লেনিনের রাজনৈতিক চিন্তার গোড়ায় রয়েছে এই অনুমান যে শ্রমিক নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার জায়গা থেকে বড়জোর কারখানাকেন্দ্রিক ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন করতে পারে, কিন্তু বিপ্লব যারা করবে তারা ‘পেশাদার বিপ্লবী’, শ্রেণীর জায়গায় দাঁড়িয়ে তাদের বর্তমান সমাজ ও ইতিহাস বিশ্লেষন করবার ক্ষমতা থাকতে হবে, হতে হবে ইতিহাস সচেতন। এরাই কমিউনিস্ট এবং বিপ্লবের ভ্যানগার্ড বা অগ্রাভিক্রমী শক্তি।

‘পুঁজি’ তৃতীয় খণ্ডের অসমাপ্ত পাতায় মার্কস বলছেন পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তিনটি শ্রেণী আমরা দেখি, ‘পুঁজিপতি, শ্রমিক এবং জমির মালিক। তাদের আয়ের উৎস হচ্ছে যথাক্রমে মুনাফা, মজুরি ও খাজনা। আধুনিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা এই তিনটি প্রধান শ্রেণী গঠন করে। দেখা যাচ্ছে শ্রেণী পরিগঠনের সঙ্গে উৎপাদন ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট রূপের সম্পর্ক রয়েছে। বিমূর্ত ভাবে সর্বত্র ‘শ্রেণী’ দেখে বেড়ানো খুবই বিতর্কিত একটি অনুমান।

মার্কস বলছেনঃ “"এটা অনস্বীকার্য যে ইংলণ্ডেই এই আধুনিক সমাজ এবং তার অর্থনৈতিক রূপ ব্যাপক ও ধ্রুপদি চরিত্র নিয়ে বিকশিত হয়েছিল। কিন্তু এখানেও এই শ্রেণীর অভিপ্রকাশ বিশুদ্ধ রূপ নিয়ে হাজির হয় নি, এখানেও মধ্যবর্তী এবং রূপান্তরশীল পর্যায়গুলো তাদের সীমানা সবসময়ই অদৃশ্য করে রাখে ( যদিও শহরের তুলনায় গ্রামে সেটা কম)” (Marx, CAPITAL (Vol III), tr. David Fernbach, 1991, p. ১০২৫)। ইংলণ্ডে এই তিনটি শ্রেণীর আবির্ভাব ঘটলেও তারা ‘বিশুদ্ধ রূপ’ পরিগ্রহণ করে নি, মার্কস সেটা স্পষ্টই বলছেন। এরপর মার্কস নিজেইবলছেন: "এর পরের প্রশ্ন হোল, 'শ্রেণী গঠিত হয় কিভাবে?', এবং এই প্রশ্ন আপনা-আপনি অন্য আরেকটি প্রশ্নের উত্তর দেবার মধ্য দিয়ে হাজির হয়: ' কীসে মজুরি-শ্রমিক, - পুঁজিপতি এবং জমির মালিক তিনটি প্রধান সামাজিক শ্রেণীর পরিগঠিত হবার উপাদান হয়ে ওঠে?”

এর উত্তর খুব সহজ নয়। মার্কস নিজেই সেটা অনুধাবন করেছিলেন। প্রথমে মনে হয় তাদের আয় এবং আয়ের উৎস দিয়ে তাদের পরিগঠিত হবার উপাদান বোঝা যায়। শ্রমক কারখানায় শ্রম বিক্রি করে এবং তার পরিবর্তে মজুরি পায়। পুঁজিপতিড় আয় আসে মুনাফা থেকে; আর, জমর মালিক উৎপাদনে কোন প্রকার অবদান না রেখেও স্রেফ জমির মালিক বলে এবং মালিকানার আইনী কাগজ ধারণ করে বলে জমির খাজনা বা ভাড়া পায়। তাহলে মার্কস বলছেন ডাক্তাররা কোন শ্রেণীর মধ্যে পড়বে? কিম্বা সরকারী আমলারা? তারা দুটো ভিন্ন সামাজিক গ্রুপ। এ ভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন গ্রুপ ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠি নানান হাবে উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত থাকে। তাদের অবস্থার ব্যাখায় বিশ্লেষণ এবং তাদের ভূমিকা বোঝার দরকার আছে। কিন্তু তিনি আর ব্যাখ্যা করবার সময় পান নি। তার আগেই মার্কস মৃত্যু বরণ করেছেন। এখানেই পাণ্ডুলিপি শেষ হয়ে যায়।

দেখা যাচ্ছে শ্রেণীর উদ্ভব, পরিগঠন এবং অভিপ্রকাশ বিচারের কাজকে মার্কস মোটেও অতো সরল ভাবেন নি। এটা যথেষ্ট জটিল এবং উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদন সম্পর্ক সম্বন্ধে মার্কসের  মৌলিক চিন্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে এঙ্গেলস যখন ‘শ্রেণী’কে মার্কসের ‘মূলচিন্তা’র কেন্দ্রে স্থাপন করেন তখন তা আদতে দুই জনের চিন্তার মৌলিক ফারাককেই বরং স্পষ্ট করে তোলে। অথচ ইতিহাসের প্রহসন হচ্ছে এই যে আধুনিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অভিমুখ ও চরিত্র প্রধানত এঙ্গেলসের চিন্তার দ্বারা নির্ধারিত। মার্কসকে তিনি যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন – যেভাবে মার্কসকে ‘মূলচিন্তা’য় পর্যবসিত ও সারার্থ করেছেন – সেই 'মূলচিন্তা'র ব্যাখ্যার দ্বারাই কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নিয়তি নির্ধারিত হয়ে গিয়েছে। যার পতন আমরা ইতিহাসে দেখেছি। বলা যায়, এই পতন অনিবার্য ছিল। কিন্তু এই পর্যালোচনা থেকে আমরা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে পারি তা হচ্ছে এই যে মার্কসের ‘কমিউনিজম’ এখনও নতুন করে ভাববার, পর্যালোচনার ও পরিগঠনের অপেক্ষায়।

মার্কসের অকৃত্রিম বন্ধু হিসাবে এবং জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের লড়াইয়ে এঙ্গেলসের অবদান অপরিসীম। সেটা তর্কের বিষয় নয়। কিন্তু এখন ২০১৭ সালে মার্কস আর এঙ্গেলসকে হাইফেনে একত্র না ভেবে তাদের চিন্তার মিল ও অমিলের ওপর আরও তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ জরুরী হয়ে পড়েছে।

যদি মার্কস নতুন করে পাঠ, পর্যালোচনা এবং বোঝাবুঝিকে আমরা পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের কালে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি তাহলে ভুল ধারণা এবং মাথায় বয়ে বেড়ানো বিবিধ আবর্জনা ও বদ্ধ অনুমানের বোঝা থেকে অবশ্যই দ্রুত আমাদের মুক্ত হতে হবে। সজীব ও সক্রিয় চিন্তাকে সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উঠতে হবে। সর্বোপরি কার্ল মার্কস চিন্তা ও তৎপরতার যে নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করে গিয়েছেন তাকে বিকশিত করতে হবে।

১৭ নভেম্বর ২০১৭। ৩ অগ্রহায়ন ১৪২৪। শ্যামলী।

বইপত্রের হদিস

Engels, F. (1888). Ludwig Feuerbach & the End of Classical German Philosophy. London.

Henri, M. (1983). Marx: A philosophy of human reality. Bloomington: Indiana University Press.

Marx, K. (1991). CAPITAL (Vol III), tr. David Fernbach. England: Penguin Books.

Marx, K. (1975). Early Writings tr. Rodney Livingstone. New York: Vintage Books.

কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস. (১৮৮৮ ). কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহার (বাংলা অনুবাদ ১৯৮৫). মস্কো: প্রগতি প্রকাশন.

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।