তরুণ মার্কসের হেগেল 'ক্রিটিক'


হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্ব নিয়ে তরুন বয়সের মার্কসের পর্যালোচনামূলক রচনা (Kritik des Hegelschen Staatsrechts (§§ 261-313)) নানান ভাবে পড়া সম্ভব এবং তার গুরুত্বকে নানান দিক থেকে পর্যালোচনা করা যায়। এই লেখাটির দুটো ইংরেজি অনুবাদ সহজ লভ্য। একটি রদনি লিভিংস্টোনের অনুবাদ (Marx 1975)। লুসিও কোলেত্তির সম্পাদিত Early Writings'-এ অন্তর্ভূক্ত: Critique of Hegel' Doctrine of the State ((§§ 261-313)) । আরেকটি হচ্ছে, এনেট জোলিন ও জোসেফ ও'মালের অনুবাদ Critique of Hegel's Philosophy of Rights'; এই অনুবাদ সম্পাদনা করেছেন জোসেফ ও'মালে এবং তিনি একটি ভূমিকাও লিখেছেন (Marx, Critique of Hegel's 'Philosophy of Right'; tr. Annette Jolin & Joseph O 'Malley 1970)। এটি সংক্ষেপে 'ক্রিটিক' নামে পরিচিত।

হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্বের আরেকটি পর্যালোচনা রয়েছে মার্কসের: 'Zur Kritik der Hegelschen Rechtsphilosophie. Einleitung । হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্ব কেন্দ্র করে মার্কসের পর্যালোচনা এই দুটো লেখা ধরেই সাধারণত করা হয়। এই লেখাটির অনুবাদ দুটো বইতেই রয়েছে: A Contribution to the Critique of Hegel's Philosophy of Right. Introduction (Marx 1975)। এটা সংক্ষেপে ইংরেজভাষীদের মধ্যে 'কন্ট্রিবিউশান' নামে পরিচিত। তবে বাংলায় আমরা 'অবদান' বলব।

তরুণ মার্কস হেগেলের যে বইটির ২৬১ অনুচ্ছেদ থেকে ৩১৩ অনুচ্ছেদ ধরে ধরে আলোচনা পর্যালোচনা করেছেন তা জর্মানিতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৮২১ সালে। তার দুটো নাম ছিল: Naturrecht und Staatswissenschaft im Grundrisse oder Grundlinien der Philosophie des Rechts (Natural Law and Political Science in Outline or Elements of the Philosophy of Right)। বাংলা করলে যা দাঁড়ায় প্রাকৃতিক ঐতিহ্যজাত বিধিবিধান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রূপরেখা অথবা অধিকার দর্শনের উপাদান। এই গ্রন্থটি হেগেলের দার্শনিক চিন্তার খুবই গুরুত্বপূর্ণ মূহূর্ত। পাশ্চাত্য সমাজের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কালপর্বে স্বাধীন সার্বভৌম ব্যক্তিসত্তার আবির্ভাবের পরিণতিতে নীতি, অধিকার, আইন, সমাজ, রাষ্ট্র ইত্যাদি নিয়ে পাশ্চাত্য চিন্তার গভীরতা ও ব্যাপ্তির মাইলফলক হিশাবে এই গ্রন্থটি সমাদৃত। অর্থাৎ পাশ্চাত্য যখন থেকে 'আমি' নামক এক স্বাধীন ও মুক্ত সত্তাকে প্রকৃতি, সমষ্টি ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে শুরু করল এবং যখন থেকে 'আমি' বা 'আমার দাবি' সমাজ ও সমষ্টির বিপরীতে সমাজ ও সমষ্টির উর্ধে নীতিগত ও বিধিগত ভাবে সিদ্ধ বলে পরিগণনা শুরু করল তখন সেই 'আমি' বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে দার্শনিকরা কিভাবে ব্যক্তি ও সমাজের নৈতিক, সামাজিক ও জৈবিক ও রাষ্ট্রীয় সম্বন্ধ ভেবেছেন ও পর্যালোচনা করেছেন তারই দুর্দান্ত দলিল হেগেলের এই বই। টমাস ম্যালকল্ম নক্স (১৯০০-১৯৯০) এই বইটির যে অনুবাদ করেছেন সেটিই আজ অবধি কমবেশী ক্লাসিকে পরিণত হয়েছে (T.M.Knox 1967)।

'অধিকার শাস্ত্রের দর্শন' প্রকাশিত হয় ১৮২০ সালে। এই বইয়ের ২৫৭ থেকে ২৭০ অনুচ্ছেদে হেগেল রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা করেছেন। ক্লাসে তিনি ছাত্রদের রাষ্ট্রের দার্শনিক বিচার নিয়ে ১৮১৮-১৮১৯ সাল ব্যাপী 'স্বাভাবিক ঐতিহ্যগত অধিকার এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান' শিরোনামে যে বক্তৃতা দিয়েছিলেন বইটি তারই সম্প্রসারিত ও পরিমার্জিত পাণ্ডুলিপি। সেই বক্তৃতা এখন মূদ্রিত পাওয়া যায়। হেগেলের সময় থেকে হেগেলের রাষ্টতত্ত্ব ও রাজনীতি নিয়ে তর্ক যেহেতু আজ অবধি জারি রয়েছে তাই অনেক তর্ক নিরসনের জন্য তার ক্লাসে দেওয়া বক্তৃতার নোট কাজে লাগে। অনেক ছাত্রই তা লিখে রেখেছিল, যা পরে প্রকাশিত হয়েছে। হেগেলে ক্লাস নোট এখন ইংরেজি অনুবাদও পাওয়া যায়। হেইডেলবার্গে দেওয়া বক্তৃতা পিটার ওয়ানেনমান-এর নোটের অনুবাদ যেমন একটি (G.W.F.Hegel, Lectures on Political Science and Natural Right, First Philosophy of Right 1995), এবং (G.W.F.Hegel, Elements of the Philosophy of Right, tr.H.B.Nisbet, ed Allen W.Wood 1991)। আমরাও প্রয়োজনে ব্যবহার করবো।

অধিকার, নীতিনৈতিকতা এবং রাষ্ট্র নিয়ে হেগেল প্রথম বক্তৃতা দেন ১৮১৭ সালের শরতে, হেইডেলবার্গে। তিনি ছাত্রদের তখন তাঁর সদ্য ১৮১৬ সালে প্রকাশিত 'দার্শনিক বিজ্ঞানের বিশ্ব কোষ' (Encyclopaedia of the Philosophical Sciences) বইয়ের ৪০০ থেকে ৪৫২ অনুচ্ছেদ পড়াতেন। অনুচ্ছেদ্গুলো চিন্তার নৈর্ব্যক্তিক প্রকাশ অংশের ব্যাখ্যা। চিন্তা কিভাবে রাষ্ট্র রূপে বর্তমান হয় এবং বিরাজ করে, দার্শনিক জায়গা থেকে হেগেল তা বিচার করেছেন।

জর্মান ভাষায় Recht শব্দটি ব্যবহার সাপেক্ষে বিভিন্ন মানে হতে পারে; যেমন, আইন, অধিকার, ইনসাফ, ইত্যাদি। ইংরেজিতে Right আমরা সাধারণত অনুবাদ করি 'অধিকার'; তাই Philosophy of Right অনুবাদ করা হয় 'অধিকার শাস্ত্রের দর্শন'।এই অনুবাদ শুরুতেই হেগেলের রাষ্টতত্ত্ব সংক্রান্ত দার্শনিক বিচার সম্পর্কে আমাদের ভুল ধারনা দেয়। হেগেল Recht বলতে যে বিশেষ মর্মের প্রতি নজর আকৃষ্ট করতে চেয়েছেন সেটা হোল, কিভাবে মানুষ স্বাধীন সত্তা হিশাবে বর্তমান থাকে, অর্থাৎ অধিকার, আইন ও আধুনিক রাষ্ট্রে মানুষ কিভাবে মুক্ত বা স্বাধীন হয়ে বিরাজ করে বা করতে পারে তারই দার্শনিক পর্যালোচনা। হেগেল স্পষ্ট বলছেন, "ইচ্ছা স্বাধীন, অতএব স্বাধীনতা ইচ্ছার যুগপৎ সারাৎসার ও উদ্দেশ্য। অধিকার ব্যবস্থা তাহলে সেই পরিসর যেখানে স্বাধীনতাকে বর্তমান করে তোলা হয়" (G.W.F.Hegel 1967, ২০)।

স্বাধীন ও মুক্ত ব্যক্তি কিভাবে আধুনিক রাষ্ট্রে দার্শনিক বিবেচনায় স্বাধীন বা মুক্ত হেগেল সেটাই দেখাতে চেয়েছেন। শুরু থেকেই হেগেলীয় প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্যের কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। সেই হিশাবে বলা যায় হেগেলের এই বই আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দার্শনিক দলিল। তরুণ মার্কস মাত্র ২৫ বছরে এই বইটিকেই তার পর্যালোচনার কেন্দ্রবিন্দু করেছিলেন। বুঝেছিলেন আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি ও কাঠামো পর্যালোচনা করার অর্থ মূলত হেগেলের এই বইটির বিচার। পর্যালোচনা করতে গিয়ে মার্কস হেগেলের অভূতপূর্ব চিন্তাশক্তির দ্বারা যেমন প্রভাবিত এবং বিকশিত হয়েছিলেন, তেমনি এটাও বুঝেছিলেন হেগেল তাঁর প্রকল্পে ব্যর্থ হয়েছেন। আধুনিক (বুর্জোয়া) সমাজ ও রাষ্ট্রে ব্যক্তি স্বাধীন বা মুক্ত নয়, অতএব হেগেলের পর্যালোচনার ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক রাষ্ট্র সম্পর্কে আমাদের ভিন্ন ভাবে ভাবতে ও পর্যালোচনা করতে শিখতে হবে। কিন্তু ভিন্ন ভাবে ভাবতে গিয়ে মার্কস তরুণ বয়সেই টের পেয়েছিলেন সেই প্রস্তুতি তাঁর নাই। তাঁকে আরও গোড়া থেকে চিন্তা ও পর্যালোচনার বিদ্যা শেখা ও আয়ত্ব করা দরকার। দ্বিতীয়ত দর্শনের বিচার দার্শনিক পরিমণ্ডলে করবার চেষ্টা ও চিন্তাটাই ভুল। আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে 'মানুষ' নামক ব্যাপারটা আসলে কী? অতএব অর্থশাস্ত্র অধ্যয়ন ও পর্যালোচনার কোন বিকল্প নাই। মাত্র ২৫ বছর যুবকের এই আত্মোপলব্ধি কিভাবে চিন্তা ও বাস্তব জগত আগামিতে বদলে দিয়েছে তা বোঝার জন্য মার্কসের হেগেল 'ক্রিটিক' প্রতিটি তরুণের পাঠ্য।

খেয়াল রাখতে হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্বের বইটি আইন, অধিকারশাস্ত্র বা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বই নয়, বরং এই সকল বিষয়ের দার্শনিক পর্যালোচনা। ধরে নেওয়া হয় এই বই যারা পড়বেন তারা মোটামুটি জর্মান, আইন, সংবিধান, অধিকার ইত্যাদি সংক্রান্ত তর্ক বিতর্ক সম্পর্কে মোটামুটি ওয়াকিবহাল রয়েছেন। শুধু তাই নয় অর্থশাস্ত্র ও সমাজতত্ত্ব সম্পর্কেও মোটামুটি জ্ঞান রয়েছে। আদম স্মিথ ও ডেভিড রিকার্ডো বা হেগেলের সমসাময়িক ব্রিটিশ অর্থশাস্ত্রের পণ্ডিতদের ধ্যান ধারণা সম্পর্কেও জ্ঞান থাকা জরুরী। তাদের চিন্তার দার্শনিক সারাৎসার হেগেলে মজুদ রয়েছে।

তরুণ মার্কস বইটির ৩৬০টি অনুচ্ছেদের মধ্যে মাত্র ৫২টি নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা কয়েকটি নোট বইয়ে বা খসড়া খাতায় লিখেছিলেন। সেগুলো তিনি প্রকাশ করেন নি। সেই খসড়াগুলোই পরবর্তীতে প্রকাশিত হয়েছে। হেগেলের তৃতীয় খণ্ডের তৃতীয় অধ্যায়, অর্থাৎ হেগেল যেখানে রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা করেছেন শুধু সেই অংশের ৫২টি অনুচ্ছেদেই মার্কস তাঁর আলোচনা সীমাবদ্ধ রেখেছেন। ফলে হেগেলের অধিকার শাস্ত্র বা রাষ্ট্রচিন্তার সামগ্রিক পর্যালোচনা তরুণ মার্কস করেছেন এটা বলার বিশেষ সুযোগ নাই। কথা প্রসঙ্গে এটাও বলে রাখা দরকার যে পরিণত বয়সেও মার্কস রাষ্ট্র নিয়ে কোন পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করেন নি। যে কারনে মার্কসের বরাতে কোন পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রতত্ত্বের দাবি করা যায় না। এতে বিস্মিত হবার কিছু নাই। মার্কস অর্থশাস্ত্র কেন্দ্রিক যে পর্যালোচনা সেরে এসে রাষ্ট্র নিয়ে লিখবার পরিকল্পনা করেছিলেন আয়ু তাঁর জন্য সেই সুযোগ রাখে নি।

তরুণ বয়সে তিনি যখন তাঁর লেখার খসড়া তৈরি করছিলেন তখন তিনি নিজেও হেগেলের চিন্তার পরিসরের মধ্যেই বাস করছিলেন। তবে এই পর্যায়ে ফয়েরবাখের চিন্তার প্রভাব মার্কসের লেখায় স্পষ্ট, ফলে হেগেলের পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ফয়েরবাখ মার্কসের চিন্তা অধিকার করে রেখেছেন সেটা স্পষ্টই বোঝা যায়। হেগেলের রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে লিখবেন এইরকম পরিকল্পনা আগেই তিনি তাঁর তখনকার বন্ধু আর্নল্ড রুজকে জানিয়েছিলেন। তবে ঠিক যেভাবে লিখতে চেয়েছেন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন নি। ইত্যাদি কারণে মার্কসের এই লেখা দুটো মার্কসের রাষ্ট্রচিন্তা হিশাবে পাঠ করা ঠিক হবে না। তবে আধুনিক রাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁর ধারণার সম্ভাব্য কিছু সূত্র চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে লেখা দুটো গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এটা মনে রাখা দরকার মার্কসের এই লেখা দুটি হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্ব সম্পর্কে মার্কসের কোন পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা নয়। 'ক্রিটিক' তিনি কোথাও ছাপতেও দেন নি। ফলে এটা অনুমান করা ভুল নয় যে মার্কস এই লেখাটিকে অসম্পূর্ণ গণ্য করেছিলেন। এটাও মনে রাখা দরকার রাষ্ট্র নিয়ে মার্কসের পূর্ণাঙ্গ কোন লেখা নাই। তবে 'কন্ট্রিবিউশান' Deutsch-Franzosische jahrbiicher (GerMan_French Yearbook)-এ ১৮৪৪ সালে ছাপা হয়েছিল। মার্কসের লেখা হিশাবে দুটো লেখারই গুরুত্ব রয়েছে, তবে তাকে হেগেলের রাষ্টতত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা হিশাবে গণ্য করা যাবে না। হেগেলের রাষ্ট্রচিন্তার পর্যালোচনা করতে গিয়ে রাষ্ট্র নিয়ে মার্কসের চিন্তার সূত্র, খসড়া বা অন্তর্দৃষ্টি হিশাবে লেখা দুটো পাঠ করলে অধিক উপকার। হেগেলের দার্শনিক পর্যালোচনা এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে মার্কসের তরুণ বয়সের চিন্তাভাবনার কিছু মূল্যবান হদিস আমরা তাহলে পেতে পারি। সেই ক্ষেত্রে এই দুটি লেখার সঙ্গে 'ইহুদি প্রশ্নে' ব্রুনো বাউয়েরের সঙ্গে তাঁর বিখ্যাত তর্কটিকেও আমরা যুক্ত করতে পারি।

'ক্রিটিক' ১৮৪৩ সালের শেষে লিখবার পর মার্কস সেটা আবার পরিমার্জনা করতে চেয়েছিলেন। এই পরিমার্জনার কথা মনে রেখেই তিনি 'অবদান' নিবন্ধটি লেখেন এবং সেটা ফেব্রুয়ারি ১৮৪৪ সালে ফ্রান্সে তাঁর আর তার বন্ধু আর্নল্ড রুজের সম্পাদিত পত্রিকায় ছাপা হয়। জেনি সহ মার্কস তখন ফ্রাসে স্বেচ্ছা নির্বাসনে। পত্রিকাটি একবারই ছাপা হয়েছিল। কিন্তু একই পত্রিকায় তাঁর বিখ্যাত 'ইহুদি প্রশ্ন' লেখাটিও ছাপা হয়। হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্ব পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে মার্কসের চিন্তার দিক থেকে কতোটা এগিয়ে গিয়েছেন তার প্রভাব 'ইহুদি প্রশ্নে' রয়েছে। কিন্তু এর পরই 'ক্রিটিক' পরিমার্জনা বা পুনর্লিখনের আইডিয়া মার্কস বাদ দেন। কাজটা সহজ ছিল না। ততোদিনে মার্কস বুঝে গিয়েছিলেন শুধু দর্শনের পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রচিন্তার পর্যালোচনা নিরর্থক হতে বাধ্য। কিন্তু হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্বের পর্যালোচনা যতোটুকুই করেছেন ততোটুকু তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর দুটো চিঠিতে এর উল্লেখ তিনি করেছেন। বিশেষত তাঁর নিজের চিন্তার বিকাশে জন্য হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্বের পর্যালোচনার যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সে ব্যাপারে তাঁর নিজের উপলব্ধি ছিল টনটনে। ১৮৮৩ সালে তিনি মারা যাবার পর তাঁর কাগজপত্রের মধ্যে পাণ্ডুলিপিটা পড়ে ছিল দীর্ঘদিন। ডেভিড রিয়াজানভ যখন তাঁর লেখালিখি সংগ্রহ করে ছাপবার উদ্যোগ নিচ্ছিলেন তখন ১৯২২ সালে বার্লিনে জর্মান সোশ্যাল ডেমোক্রাটদের মহাফেজখানায় লেখাটি খুঁজে পান।

তাঁর জীবনের এই পর্যায়ে হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্বের মোকাবিলা করতে গিয়ে মার্কস কেন এই বিষয়ে আর ফিরে আসেন নি সেটা ১৮৫৯ সালে 'অর্থশাস্ত্র পর্যালোচনার ক্ষেত্রে একটি অবদান' বইয়ের ভূ্মিকাতে মার্কস নিজেই উল্লেখ করেছেন। তিনি সাংবাদিকতা করতে গিয়ে টের পেয়েছিলেন যে স্রেফ রাষ্ট্র ও আইনের পরিমণ্ডলে থেকে জাগতিক ও বাস্তব প্রশ্নের ব্যাখ্যা তিনি করতে পারছেন না। সেই কাজ করবার জন্য বৈষয়িক বিষয়, যেমন অর্থশাস্ত্রে যে জ্ঞান দরকার নিজের মধ্যে তার ঘাটতি আছে। অতএব অর্থশাস্ত্র পাঠে তিনি মনোনিবেশ করেছিলেন (Marx 1972, ২০)। 'পুঁজি' প্রথম খণ্ডের জর্মান সংস্করণেও শেষের কথা হিশাবে তিনি 'ক্রিটিক'-এর উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, তিনি হেগেলের চিন্তা পদ্ধতির মিস্টিক বা ধোঁয়াশা দিকটা এই লেখায় সমালোচনা করেছেন (Marx 1977, ১০২)। 'ক্রিটিক'-এ তিনি সেটা তিনি কিভাবে করলেন সেটা বোঝা তাহলে একটা জরুরি কাজ হতে পারে।


 

Hegel
গেওর্গ ফ্রিডরিখ ভিলহেল্ম হেগেল (২৭ অগাস্ট ১৭৭০ - ১৪ নভেম্বর ১৮৩১)


খসড়া 'ক্রিটিক' খাতার কভার পাওয়া যায় নি এবং সামনের চারটি পাতা খোয়া গিয়েছে। অনুমান করা হয় এই পাতাগুলোতে মার্কস হেগেলের রাষ্ট্র খণ্ডের অন্তর্গত ২৫৭ থেকে ২৬০ অনুচ্ছেদ আলোচনা করেছেন। কভার পাতায় হয়তো লেখার তারিখ ছিলো। তবে কিছু মতান্তর আছে। কেউ কেউ মনে করেন ১৮৪১-৪২ সালের দিকেই লেখাগুলো রচিত। তবে অন্যন্য প্রমাণ ও সূত্রের নিরিখে কমবেশী সকলেই এটা মানেন যে মার্চ-অগাস্ট ১৯৪৩ সালের দিকেই মার্কস 'ক্রিটিক'টি লিখেছেন। পুরাটাই এক নাগাড়ে মার্কস ১৮৪৩ সালের গ্রীষ্মে শেষ করেছেন। যদি শেষের তারিখটি ঠিক বলে ধরা হয় তাহলে বলা যায় লেখার স্থান ছিল ক্রুজনাখ। ততোদিনে মার্কস সেই বছরের বসন্তে ইতিহাস ও রাজনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে গবেষণার জন্য স্বেচ্ছা অবসর নিয়েছেন। অথচ তাঁর বয়স তখন মাত্র ২৫ বছর। আর এই সেই সময় যখন তিনি ১৯ জুনে তাঁর বাল্য বয়সের বন্ধু জেনি ফন ওয়েস্টফালেনকে বিয়ে করেছেন। আর সম্ভবত জেনির মায়ের গ্রীষ্মকালীন বাড়িতে বসেই 'ক্রিটিক'টি লেখা। তার মানে জেনিকে নিয়ে তখন জেনির মায়ের বাড়িতে মার্কস হানিমুনে রয়েছেন।

 

'অবদান'-লেখাটি ধর্ম সম্পর্কে মার্কসের নিরীক্ষণের জন্য কুখ্যাত এবং বিখ্যাত। কুখ্যাত এ কারণে যে মূল প্রসঙ্গের সঙ্গে কোন প্রকার সঙ্গতি ছাড়া মার্কসের একটি বাক্যকে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত ভাবে উল্লেখ করে মার্কসকে নাস্তিক প্রমাণ করবার চেষ্টা কমিউনিস্ট ও কমিউনিস্ট বিরোধী উভয় পক্ষই জোরেসোরে করেছে। বাক্যটি হচ্ছে: 'এটি জনগণের আফিম'। এই সেই কুখ্যাত বাক্য। এই বিষয়টি আমি আমার 'মোকাবিলা' গ্রন্থে আলাদা আলোচনা করেছি। এখানে পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন দেখছি না। কিন্তু বিখ্যাত এ কারণে যে জর্মান দর্শনে রাষ্ট্রতত্ত্ব বা বিশেষ ভাবে হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্বের আলোচনায় ধর্মের প্রসঙ্গ তুলছেন মার্কস। সেটা লক্ষ্য করার মতো বিষয়। কারন তিনি বুঝে গিয়েছিলেন আধুনিক রাষ্ট্র ধর্মতত্ত্বের প্রকল্প থেকে আলাদা কিছু নয়। তাহলে লেখাগুলো এই আলোকে নতুন করে পাঠ করা দরকার।

কিন্তু আমরা যদি নতুন করে লেখাটি পড়ি তাহলে শুরুতেই অনায়াসে উপলব্ধি করব আস্তিকতা/নাস্তিকতা তর্কের বাইরে ধর্মের প্রশ্নে দর্শনের কর্তব্য সুস্পষ্ট ভাবে নির্ণয় করাই তরুণ মার্কসের উদ্দেশ্য। বিশেষত যখন ফয়েরবাখের নাস্তিকতা জর্মান দর্শনে সবলে হাজির হয়েছে। এই ক্ষেত্রে ফয়েরবাখসহ বস্তুবাদী নাস্তিক্যবাদ খণ্ডন করাই তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। দর্শনের কাজ ধর্ম মিথ্যা প্রমাণ করা, কিম্বা আস্তিকতার বিপরীতে নাস্তিকতা, কিম্বা নাস্তিকতার বিপরীতে আস্তিকতা কায়েম নয়, বরং বাস্তব জগতের পর্যালোচনা; যাতে বাস্তব জগতের সঙ্গে শুধু ধর্ম নয় মানুষের চিন্তা কিম্বা বিবিধ আদর্শ ও ধ্যানধারণার সম্বন্ধের চরিত্র বা রূপ বাস্তবসম্মত ভাবে বিচার করা যায়। শেষাবধি আসল কাজ বাস্তব জগতকে বদলানো। ধর্ম বা মতবাদ নামে আমরা যা কিছুই হাজির দেখি তার সঙ্গে সম্বন্ধ বাস্তব জগতের। অতএব ধর্ম কিম্বা মতাদর্শের পর্যালোচনা বা বিরোধিতায় চিড়ে ভিজবে না, বাস্তব জগত বদলানোর কাজটাই হচ্ছে আসল কথা। একই ধরণের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি আমরা লেনিনের মধ্যেও পাই, যিনি জোর দিয়ে বলতেন খেয়ে না খেয়ে যে সকল পেটি বুর্জোয়া ধর্মের বিরোধিতা করে তারা মূলত বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থই রক্ষা করে। কারণ বিপ্লবের কাজ তো একটি ধর্ম উচ্ছেদ করে আরেকটি ধর্ম কায়েম করা নয়, যে ধর্ম বা মতাদর্শ পুঁজিতান্ত্রিক কালপর্বে মানুষকে মজুর বা পুঁজির দাস হিসাবে পরাধীনতার শৃংখল অব্যাহত রাখে, দাসত্বের জুলুম অব্যাহত রাখে, সেই ব্যবস্থাকেই পালটে দেওয়ার কাজ করতে নামলেই দেখা যাবে ধর্মের কোন্‌ বয়ান পুঁজির দাসত্ব থেকে মানুষের মুক্তির কথা বলে আর কোন বয়ান সেই দাসত্ব বহাল রাখবার কথা বলে সেটা বোঝা বোঝা যায়। আর এটাতো কাণ্ডজ্ঞানেই বোঝা যায় যে ধর্মই যদি আর্থ-সামাজিক শোষণের প্রধান কারণ হোত তাহলে 'পুঁজি' ব্যাখ্যার জন্য মার্কসকে সারাজীবন অর্থশাস্ত্র নিয়ে পড়ে থাকতে হোত না।

প্রশ্ন হচ্ছে মার্কসের হেগেল 'ক্রিটিক' ঘনিষ্ঠ ভাবে এখন পড়বই বা কেন? পড়ে ফায়দা কি? ফায়দা পেতে হলে খেয়াল রাখতে হবে জর্মান দর্শনে রাষ্ট্র এবং আইনের পর্যালোচনা এবং বিশেষ ভাবে হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্ব মার্কস যেভাবে মূল্যায়ন করেছেন সেই মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে এমন কোন সূত্র চিহ্নিত করা সম্ভব কিনা যা আধুনিক রাষ্ট্রতত্ত্বের পর্যালোচনায় আমাদের তাৎক্ষণিক, অর্থাৎ বাংলাদেশের এখ্নকার ব্যবহারিক রাজনীতিতে কাজে আসে? তাহলে আবশ্যিক পর্যালোচনার বিষয়গুলো শনাক্ত করা একটি দরকারি কাজ।

তৎক্ষণাৎ কাজে আসা বলতে শুধু বাংলাদেশে দার্শনিক চিন্তার অগ্রগতি বোঝাচ্ছি না, বরং আমাদের বিশেষ আগ্রহ বাংলাদেশের ব্যবহারিক রাজনীতিতে সেই চিন্তার উপযোগিতা বিচার করা এবং কাজে খাটানো। সেই দিক থেকে কয়েকটি বিষয় আমরা অনায়াসেই চিহ্নিত করতে পারি যার আলোচনা/পর্যালোচনা ছাড়া বাংলাদেশে নতুন চিন্তা ও রাজনৈতিক তৎপরতার পুনর্গঠন অসম্ভব। আমি যে কয়টি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করি তা একে একে নীচে উল্লেখ করছি

১. পদ্ধতির তর্ক

প্রথম জিজ্ঞাসা হতে পারে হেগেলকে পর্যালোচনার ফয়েরবাখীয় পদ্ধতি মার্কস কিভাবে 'ক্রিটিক' লেখাটিতে প্রয়োগ করেছেন? সেই পদ্ধতিটিই বা কী? এই প্রয়োগের নগদ ফল কী দাঁড়ালো?

রাষ্ট্র একটি বাস্তব সত্য, ফলে বাস্তব ইতিহাসের মধ্য দিয়ে কিভাবে রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, সেই বাস্তব ইতিহাস পর্যালোচনা না করে হেগেল দেখাতে চান দার্শনিক হিশাবে তিনি 'রাষ্ট্র' সম্পর্কে যে ধারণা পেশ (idea) করেন সেটা কিভাবে বাস্তবে মূর্ত হচ্ছে, কিভাবে রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে, ইত্যাদি। রাষ্টের উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস হেগেল উপেক্ষা করছেন ব্যাপারটা এতো সরল ও সোজা নয়। হেগেল শুরু করেছেন ধারণা হিসাবে বিমূর্ত অধিকারের ধারণা থেকে। কিন্তু 'অধিকার' কী জিনিশ? হেগেল দাবি করছেনঃ

'সাধারণ ভাবে অধিকারের ভিত্তি হচ্ছে মন এবং তার উদ্ভবের সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র ও উৎসবিন্দু হচ্ছে ইচ্ছা। ইচ্ছা স্বাধীন, অতএব স্বাধীনতা ইচ্ছার যুগপৎ সারাৎসার ও উদ্দেশ্য। অধিকার ব্যবস্থা তাহলে সেই পরিসর যেখানে স্বাধীনতাকে বর্তমান করে তোলা হয়। মনের জগতকে তার অভ্যন্তর থেকে বের করে আনা যেন দ্বিতীয় প্রকৃতি' (G.W.F.Hegel 1967, ২০) ।

দেখা যাচ্ছে, স্বাধীন ও সার্ব্বহৌম ইচ্ছার ওপর তাঁর রাষ্ট্র গড়ে চাইছেন। মার্কস হেগেলকে বুঝতে ভুল করেন নি, এটাই আধুনিক বুর্জোয়া রাষ্ট্রের খাঁটি প্রকল্প। হেগেলের রাষ্ট্রচিন্তা জর্মান দর্শনের অনেক গভীর ভিত্তি থেকে গড়ে তোলা, ফলে তার পর্যালোচনা ও মোকাবিলা খুব সহজ কাজ নয়। হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্বের মোকাবিলার অর্থ পাশ্চাত্যে সার্বভৌম ব্যক্তি বা ব্যক্তির স্বাধীন ও সার্বভৌম ইচ্ছার ওপর যে আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে মূলত তার গোড়া ধরে টান দেওয়া, ব্যক্তিতান্ত্রিক (বুর্জোয়া) সমাজ ও আধুনিক ব্যক্তি অধিকার ভিত্তিক আইন, গঠনতন্ত্র ও রাষ্ট্রের ব্যবচ্ছেদ। বিপ্লবী রাজনীতির দিক থেকে এই কাজ এখনও মুখ্য ও প্রধান কর্তব্য হয়ে রয়েছে। নানান দিক থী নানানভাবে এই কজটি করতে হবে। মার্কস এই কাজ সম্পূর্ণ করে গিয়েছেন সেটা ভুল ধারণা এবং আকাশ কুসুম কল্পনা। বরং বোঝা দরকার মার্কস হেগেলের রাষ্টতত্ত্বের কোথায় আঘাত করেছেন, তাঁর পদ্ধতির সবলত এবং দুর্বলতা কোথায় এবং তিনি কতোটা সফল হয়েছেন এবং তাঁর কাজ কতোটা অসম্পূর্ণ রয়ে গিয়েছে। অতঃপর এখনকার সুনির্দিষ্ট কাজ কী হতে পারে সেটা নির্ণয় করার প্রতি আমাদের মনোযোগী ও নিষ্ঠ হতে হবে।

রাষ্ট্র সংক্রান্ত হেগেলের দার্শনিক ধারণা কিভাবে রাষ্ট্রের নানান প্রতিষ্ঠানের রূপ নিয়ে বর্তমান বা জাগতিক হয় হেগেল তাই দেখাতে চেয়েছেন। সেই আলোকে তিনি গণতন্ত্র, আমলা বা প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান হিশাবে রাষ্ট্রের নানান দিক যেমন গঠনতন্ত্র (Constitution), আইন, সার্বভৌম ক্ষমতার ধারক রাজা ও রাজতন্ত্র, নির্বাহী বিভাগ, আইন প্রণয়ণী বিভাগ, ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন। অন্য রাষ্ট্রের বিপরীতে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ধারণা, আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্ব ইতিহাস নিয়েও হেগেল অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। মার্কস অবশ্য সেই বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেন নি। হেগেল দেখাতে চেয়েছেন কিভাবে বাস্তবের রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্র সংক্রান্ত তাঁর আইডিয়া বা ধারণারই রূপ।মার্কস হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্বের পর্যালোচনা করতে গিয়ে শুরুতেই হেগেলের এই পদ্ধতির জায়গাটিতেই আঘাত করেছেন।

মার্কসের আপত্তি হচ্ছে বাস্তব প্রতিষ্ঠানকে বাস্তবিক ভাবে আলোচনা না করে হেগেল দার্শনিক ধারণা (idea)থেকে বাস্তবকে (state) বানাচ্ছেন, নির্মাণ করছেন। এর ফলে চিন্তার দিক থেকে একটা উল্টামি বা উলটা ব্যাপার ঘটে। হেগেলের পদ্ধতি সে কারনে এক ধরণের নির্বিচার রহস্যগিরি, এক প্রকার লজিকাল মিস্টিসিজম। যদি হেগেলের অসামান্য বিশ্লেষণুটুকুর মর্ম আমরা ছেঁকে নিতে চাই তাহলে হেগেল কিভাবে দার্শনিক ধোঁয়াশা তৈরি করেন সেটা বোঝা খুবই জরুরি। কিভাবে সেটা করা যায় মার্কস সেটাই অনুচ্ছেদ ধরে ধরে পেশ করেছেন।

 পদ্ধতির দিক থকে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে অনুচ্ছেদ ধরে ধরে মার্কসের পর্যালোচনার। একদিকে তরুণ মার্কস হেগেলের চিন্তার সারাৎসার থেকে শিক্ষণীয় মর্মটি ছেঁকে আনতে চাইছেন, কিন্তু সেটা করছেন হেগেলের চিন্তার অসঙ্গতি যেখানে চোখে পড়ছে তা উদাম করে দিয়ে। তাহলে নিষ্ঠার সঙ্গে খেয়াল করা কর্তব্য মার্কস কিভাবে হেগেলের যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে হেগেলের চিন্তার অসঙ্গতি শনাক্ত ও পর্যালোচনা করছেন। হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্ব বিচারের জন্য মার্কসের এই পদ্ধতি একদিকে ফয়েরবাখীয় প্রভাব থেকে আলাদা, অন্যদিকে পর্যালোচনার এই পদ্ধতি তাঁকে সচেতন করে তুলেছে যে নিছকই তত্ত্বীয় জায়গা থেকে হেগেলের রাষ্টতত্ত্বের পর্যালোচনা অসম্পূর্ণ হতে বাধ্য। প্রুশিয়ার আর্থ-সামাজিক অবস্থা হেগেলের চিন্তাকে কিভাবে প্রভাবিত করছে সেটাও বোঝার দরকার আছে। ইংলণ্ড ও ফ্রান্সের তুলনায় অবিকশিত জর্মানিতে বসে হেগেল বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের তত্ত্ব লিখতে বসেছেন। ফলে বাস্তবের সঙ্গে তত্ত্বের অসঙ্গতি ঘটছে; বুর্জোয়া গণতন্ট্রের রাষ্ট্রের রূপ হেগেল প্রুশিয়ার রাজতন্ত্রের আবিষ্কার করতে চাইছেন। কিন্তু হেগেলকে এই ক্ষেত্রে পুরাপুরি পর্যালোচনা করতে হলে মার্কসের নিজেরও আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা বিচারের সামর্থ অর্জনের প্রয়োজন রয়েছে।  তরুণ মার্কস বুঝতে পারছিলেন অবিলম্বে তাঁর অর্থশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা শুরু করা দরকার। আর এই উপলব্ধি এবং তার বাস্তবায়নই ঐতিহাসিক মার্কসের বেড়ে ওঠার পেছনে প্রধান প্রণোদনা হিশাবে কাজ করেছে।

২. বাজারি সমাজ

বাজারি সমাজ বা বুর্জোয়া সমাজ (burgerliche Gesellschaft ) নিয়ে আলোচনা/পর্যালোচনা। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাজারি সমাজে ব্যক্তি ও সমষ্টির দ্বন্দ্ব। বাংলাদেশে burgerliche Gesellschaft ইংরেজিতে Civil Society অনুবাদ করা হয়। আমরা ইংরেজি থেকে অনুবাদ করবার কারনে সেটা হয়ে গিয়েছে 'নাগরিক সমাজ'। আক্ষরিক অনুবাদের এই হোল দুর্দশা। এর ফলে বিস্তর বিভ্রান্তি ও চিন্তার মারাত্মক আবর্জনা তৈরি হয়ে আছে। হেগেল এবং মার্কস কিভাবে জর্মান ধারণাটি বুঝেছেন সেটা যথাসম্ভব স্পষ্ট ভাবে আমাদের বোঝা দরকার। বোঝার সুবিধার জন্যই বাংলায় একে আমি 'বাজারি সমাজ' বলার পক্ষপাতি। এর সুবিধা হচ্ছে বাজারি সমাজ বলতে আমরা কাণ্ডজ্ঞানে যা বুঝি তা মার্কস ও হেগেলের সমাজ ও রাষ্ট্র চিন্তা বোঝার প্রভূত সহায়ক। কারণ 'বাজারি' বলতে আমরা কী বুঝি সেটা আমাদের দৈনন্দিনের অভিজ্ঞতার মধ্যে কমবেশী হাজির আছে। তাই 'বাজারি সমাজ' বললে কাণ্ডজ্ঞান থেকেই হেগেল ও মার্কস পড়তে ও বুঝতে সুবিধা হয় এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবন সংগ্রাম ব্যাখ্যায় কাজে আসে। দর্শনের মোটা মোটা ভারি ভারি শব্দের পরিবর্তে সহজ সাধারণ ভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে দার্শনিক পর্যালোচনা সাধারণ মানুষের ভাষাতে চালিয়ে যাওয়াও সহজ হয়।

তবে হেগেলের দার্শনিক বিচারের দিক থেকে বাজার ব্যবস্থা 'চাহিদা ও বাসনা পূরণের ব্যবস্থা' (System of Need) নামে পরিচিত। মার্কসের কাছে আধুনিক পণ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় 'চাহিদা ও বাসনা পূরণের ব্যবস্থা' ব্যক্তিগত মালিকানার ওপর গড়ে ওঠা পণ্য উৎপাদন, বিনিময় ও বিচলন ব্যবস্থার সমার্থক। মার্কসের কাছে বিমূর্ত 'সমাজ' নামক কোন ধারণা নাই। সমাজের সুনির্দিষ্ট চরিত্র আছে। সেই সুনির্দিষ্ট চরিত্রটাই হচ্ছে তার বাজারি চরিত্র।

বাজারি ব্যবস্থা টিকে থাকে তীব্র প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে এবং পণ্যের সঙ্গে পণ্যের সম্পর্কই মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক হয়ে ওঠে। মানুষ এই সমাজে হয়ে ওঠে চরম ব্যক্তিতান্ত্রিক, হিংসুটে, পরম স্বার্থান্বেষী। শুধু তাই নয়, মানুষ নিশ্চিত বিশ্বাস করতে শুরু করে ব্যক্তিতন্ত্র বা ব্যক্তির মুক্তির মধ্যেই মানুষের মুক্তি। ব্যক্তি সমাজকে তার চাহিদা ও বাসনা পূরণের উপায় মাত্র গণ্য করে এবং একই ভাবে সমাজকে ব্যক্তির চাহিদা ও বাসনা পূরণের বাধা হিশাবেও সামনে দেয়ালের মতো হাজির দেখতে পায়।

বাজারি সমাজে ব্যক্তিতান্ত্রিক মানুষের হিংসুটে এবং স্বার্থান্বেষী স্বভাব আড়াল করবার জন্যই মানুষ সম্পর্কে নানান ব্যক্তিবাদী মতাদর্শ গড়ে ওঠে। অধিকাংশই নিশ্চিত বিশ্বাস করতে শুরু করে হিংসুটে ও স্বার্থান্বেষী হওয়াই মানুষের চিরায়ত স্বভাব। সব মিলিয়েই বাজারি সমাজ: স্বার্থান্ধ, অপরের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে নিজে খাওয়া, অপরকে দাবিয়ে রেখে নিজের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা, ইত্যাদি। অথচ এই হিংসুটে বাজারি সমাজকেই 'নাগরিকতা', 'সিভিল সোসাইটি', 'নাগরিক সমাজ' নামক মধুর মধূর ভাষ্য দিয়ে আড়াল করা হয়। বাজারি সমাজ তাহলে গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র যা নিয়ে গুছিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা খুবই দরকারি একটি কাজ।

৩. ব্যক্তি ও সমষ্টির দ্বন্দ্ব

বাজারি সমাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য তাহলে ব্যক্তি ও সমষ্টির দ্বন্দ্ব। সেই দ্বন্দ্বের মীমাংসা ছাড়া সমাজ টিকে থাকতে পারে না। হেগেল তাঁর রাষ্ট্রতত্ত্বে ঠিকই দেখান যে বাজারি সমাজ হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক শক্তির প্রকট দ্বন্দ্ব। এই বিরোধ মীমাংসার একমাত্র উপায় হচ্ছে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে বিশেষ স্বার্থের পরিসর অতিক্রম করে সমষ্টির বা সর্বজনীন স্বার্থের পরিসর নির্মান। হেগেলের কাছে এটাই রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় পরিসরের কাজ।

বাজারি সমাজে বিশেষ স্বার্থের পরিসর মানুষ আধুনিক রাষ্ট্রের বিকাশের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে যায়।

মার্কস হেগেলকে ঠিক এখানেই চ্যালেঞ্জ করেছেন। সেটা বিস্তৃত ভাবে বুঝতে হল বাজারি সমাজে ব্যক্তি ও সমষ্টির দ্বন্দ্ব বিস্তৃত ভাবে ব্যাখ্যা করা দরকার। হেগেলকে এই ক্ষেত্রে তরুণ মার্কস কিভাবে পর্যালোচনা করছেন তা সতর্কতার সঙ্গে পাঠ করা জরুরী

বাজারি সমাজ এবং রাজনৈতিক সমাজের বিভাজন অতিক্রম করা বা মীমাংসা করা হেগেল ও মার্কস উভয়েরই উদ্দেশ্য। এই দ্বন্দ্বকে আরেক ভাবে হাজির করবার রূপ হচ্ছে এক দিকে ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করা এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক অধিকার ভোগী হিশাবে 'নাগরিক' হবার স্ববিরোধী সংগ্রামের মীমাংসা। কিভাবে দুইজনে দুই সমাধান দিচ্ছেন সেই দিকটাই আমাদের বুঝতে হবে।

৪. সমাজ বদলাবে কে?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা হচ্ছে বাজারি সমাজ এবং তার ওপর গড়ে ওঠা আধুনিক রাষ্ট্র বদলাবে কে? সর্বহারা শ্রেণীকে বিপ্লবের এজেন্ট নির্ণয় করবার পেছনে হেগেলের চিন্তা মার্কসকে কিভাবে প্রভাবিত করেছিল? মার্কস কি সঠিক ছিলেন?

এই প্রশ্নটি একালে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারন এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একালে বিপ্লবের কর্তাশক্তি নির্ণয়ের তর্ক। এই তর্ক নিষ্পন্ন হবে কিভাবে? বৈপ্লবিক রূপান্তরে সমাজে কারা কিভাবে ভুমিকা রাখবে বা রাখতে পারে?

৫. সার্বজনীন ভোটাধিকার , 'সত্যিকারের গণতন্ত্র' ইত্যাদি

মার্কসে 'সত্যিকারের গণতন্ত্র' নামক একটি ধারণা আমরা পাই। ভেজাল গণতন্ত্র আর আসল গণতন্ত্রের একটা তর্ক তাহলে রয়েছে।

ব্যবহারিক রাজনীতির দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য এটি আসলেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মার্কস যদি বিপ্লবী হয়ে থাকেন, কমিউনিজম কায়েমই তাঁর লক্ষ্য হয় তাহলে তিনি গণতন্ত্র (ছহি), সার্বজনীন ভোটাধিকার ইত্যাদি সম্পর্কে বা সংক্ষেপে তাঁর ভাষায় 'সত্যিকারের গণতন্ত্র' কায়েমকে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গণ্য করেছেন কেন?

যে আধুনিক রাষ্ট্রের মধ্যে ব্যক্তি স্বাধীন ও সার্বভৌম হয়ে বর্তমান থাকে তার মর্ম ও রূপ হাজির করাই ছিল হেগেলের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ একটি আদর্শ বুর্জোয়া রাষ্ট্রের রূপরেখা হেগেল দিতে চেয়েছেন, যদিও বাস্তব উদাহরণ হিশাবে অবিকশিত জর্মানিতে সামন্ত অবশেষের আবর্জনা বয়ে বেড়ানো প্রুশীয় রাষ্ট্রের ছাপ হেগেলের রাষ্ট্রের ধারণায় রয়ে গিয়েছে বলে মার্কস সমালোচনা করেছেন, কিন্তু বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণা মার্কস নাকচ করেন নি। বরং হেগেলের ভুল ত্রুটি ও স্ববিরোধিতা সাফসুতরো করে প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের বৈপ্লবিক রূপান্তরের জন্য বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক গুরুত্ব মার্কস মেনে নিয়েছিলেন। সাময়িক হলেও বাজারি ব্যবস্থায় স্বাধীন ও সার্বভৌম ব্যক্তির ব্যক্তিস্বার্থ আর সমাজে সকল মানুষের সার্বজনীন স্বার্থের দ্বন্দ্ব মীমাংসারই একটা ধরণ আধুনিক গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া রাষ্ট্র। যে কারণে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব কেন দরকার তার একটা দার্শনিক যুক্তি খাড়া করা যায়। লেনিন ও মাও যে দং এই ক্ষেত্রে সথিক ছিলেন।

প্রশ্ন হচ্ছে গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করতে পারলেই কি বাজারি সমাজের ভিত্তি ও বৈশিষ্ট বদলে যাবে? নাকি আরও তীব্র হবে? বুর্জোয়া সমাজের দ্বন্দ্ব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করলে মিটবে না। কিন্তু তারপরও মার্কস কেন 'সার্বজনীন ভোটাধিকার' ও ভোটাভুটি মিয়ে এতো উৎসাহী ছিলেন?, কেন হেগেলকে শুধরিয়ে 'সত্যকারের গণতন্ত্র' কায়েমের কথা বলে ছিলেন? মার্কস কি তাহলে সাময়িক হলেও উদার গণতন্ত্রের উপযোগিতায় আস্থা রাখতেন?

এই প্রশ্নের সঙ্গেই যুক্ত রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: বুর্জোয়া গণতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্রে রূপান্তরের জন্য কি আরেকটি রাজনৈতিক বিপ্লবের দরকার রয়েছে? নাকি নাই?

৬. সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত মালিকানা

মার্কস হেগেলের বইয়ের পুরা আলোচনার করেন নি। পুরা পর্যালোচনা তার প্রকল্প হয়ে থাকলেও সে প্রকল্প তিনি বাদ দিয়েছিলেন, কিম্বা করবার অবসর পান নি। মার্কসের পর্যালোচনার বাইরে হেগেলের রাষ্টতত্ত্বের কোন্‌ বিষয়টি নতুন করে ভাবা ও পর্যালোচনা সবচেয়ে গভীর ও বিস্তৃত ভাবে করা জরুরী? এই প্রশ্নের উত্তর হবে হেগেল ও মার্কসের সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত মালিকানা সংক্রান্ত চিন্তা ও বিশ্লেষণ পর্যালোচনা। মার্কসের বিপ্লবী চিন্তার গোড়ায় রয়েছে ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থার উৎখাত এবং উৎপাদনের সামাজিকীকরণ। তাহলে মার্কস সম্পত্তি ও ব্যাক্তিগত মালিকানা বলতে আসলে কী বুঝিয়েছিলেন? তাঁর ধারনার সঙ্গে হেগেলের পার্থক্য কোথায়? আমরা কি মার্কসের সম্পত্তি ও ব্যাক্তিগত মালিকানার ধারণা সম্পর্কে স্পষ্ট? এই ক্ষেত্রে মার্কস নিজেও কি স্পষ্ট ছিলেন?

বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কিন্তু উত্তর হচ্ছে এই ব্যাপারে মার্কস অস্পষ্ট। এই আক্ষেপ যদি অতিশোয়াক্তি মনে হয় তাহলে বলা যায় এই ক্ষেত্রে মার্কসকে স্পষ্ট ও পরিচ্ছন্ন ভাবে সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টরা বুঝেছেন কিম্বা এখনও বোঝেন কিনা সন্দেহ। বাংলাদেশে এই অজ্ঞতা প্রকট। সেটা আমরা নিজেদের ছোট একটি প্রশ্ন করলেই নিজের কাছেই নিজেরা ধরা পড়ে যাব। যেমন, সম্পত্তির মালিকানা কি আইনী ধারণা, নাকি অর্থনৈতিক সম্পর্কের ধারণা? তাহলে অর্থনীতি ও আইনের মধ্যে সম্বন্ধ কী? এই প্রশ্নের মীমাংসার ওপর মার্কসের 'ইতিহাস' নামক ধারণাও নিহিত। ফলে সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত মালিকানার তর্ক হেগেলের রাষ্ট্রতত্ত্ব পড়ার সময় সবার আগের আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত। কিন্তু এই তর্কের মীমাংসা করতে হলে সামগ্রিক ভাবে মার্কস পাঠের বিকল্প নাই বলে সম্পত্তি ও ব্যাক্তিগত মালিকানার প্রশ্নটিকে সবার শেষে রেখেছি। হেগেলের রাষ্টতত্ত্ব পর্যালোচনা থেকে বৃহৎপরিসরে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র অবশ্য আমরা মার্কসের তরুণ বয়সের লেখালিখিতে পাবো।

বলাবাহুল্য প্রতিটি জিজ্ঞাসাই বিশাল আলোচনার ক্ষেত্র। আলোচনা করতে গেলে একটি প্রশ্নের সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন এসে যাবে। ছক ধরে আলোচনার জন্য জিজ্ঞাসাগুলো পেশ করছি না। এই জিজ্ঞাসাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুসন্ধনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশে আমাদের চিন্তা ও তৎপরতা বড় ধরণের উল্লম্ফন ঘটাতে সক্ষম বলে মনে করি। এই গোড়ার কাজগুলো না হলে হাওয়ায় তলোয়ার ঘুরিয়ে লাভ নাই।

দরকারি বই

G.W.F.Hegel. Hegel's Philosophy of Right. tr. T.M.Knox with notes. London: Oxford, 1967.

Marx, Karl. “A contribution to the Critique of Hegel's Philosophy of Right. Introduction.tr. Rodney Livingstone.” In Early Writings, by Karl Marx, 243-257. New York: Vintage Book, 1975.

—. A Contribution to the Critique of Political Economy; tr. S.W.Ryazanskaya with an Introduction by Maurice Dobb. New York: International Publishers, 1972.

—. CAPITAL: A Critique of Political Economy. tr. Ben Fowkes, Intro. Ernest Mandel. New York: Vintage Book, 1977.

Marx, Karl. “Critique of Hegel's Doctrine of the State (261-313). tr. Rodney Livingstone.” In Early Writings, by Karl Marx, 57-209. New York: Vintage Book, 1975.

—. Critique of Hegel's 'Philosophy of Right'; tr. Annette Jolin & Joseph O 'Malley. Cambridge: Cambridge Univesity Press, 1970.

T.M.Knox. Hegel's Philosophy of Right. London: Oxford, 1967.

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন



৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।