রাজনীতির কেন্দ্রে যা হয়


বিচারপতি নজরুলের সাম্প্রতিক বক্তব্য কিংবা আইনপ্রণেতা প্রতিমন্ত্রী অথবা অ-আইনপ্রণেতা মন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া এই লেখার বিষয় না, উপলক্ষ মাত্র। বিচারপতির বিচারালয়ে কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় রায় কেরানীরা-ই(মুহুরি ইত্যাদি) লেখেন, বিচারকরা শুধু কিছু একটা কইরা ( ‘হু হু’ ও হইতে পারে) সেইটা দেইখা সই দেন। তারপরও বিচারপতি নজরুলকে অশেষ ধন্যবাদ, আজকের লেখাটার শানে নুযুল তৈয়ার করে দেয়ার জন্য। তার বক্তব্যের সুবাদে আমরা বাংলাদেশের জন্মের মতো পুরানো একটা মুশকিল প্রসঙ্গে লেখালেখির সুযোগ পেলাম।

বাংলাদেশে আইন তৈরি করা হয় জাতীয় সংসদে, প্রক্রিয়াও সংসদীয়। গঠনতন্ত্রে (কনস্টিটিউশন) এ বিষয়ে বলা আছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের গঠনতন্ত্রের ১৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন এর সংজ্ঞা হচ্ছে, আইন অর্থ কোনো আইন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, উপ-আইন, বিজ্ঞপ্তি ও অন্যান্য আইনগত দলিল এবং বাংলাদেশে আইনের ক্ষমতা সম্পন্ন যে কোনো প্রথা বা রীতি। এবং যেমনটা আগে বলেছি-- গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আইন প্রণয়নের মূল ক্ষমতা সংসদের। তাছাড়া ৯৩ অনুচ্ছেদ এর অধীনে সংসদ ভেঙ্গে গেলে বা সংসদের অধিবেশনকাল ব্যতীত সময়ে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। তবে ওইরকম অধ্যাদেশ জারি করার পর প্রথম যে অধিবেশন শুরু হবে সংসদেও, সেই অধিবেশনে সংসদকে অধ্যাদেশটি অনুমোদন করতে হবে। নইলে বাতিল।

অন্যদিকে অধ্যাদেশ না, ‘আইন’ মানে অ্যাক্ট অফ পার্লামেন্ট তৈরি হয় এভাবে; সংবিধানের ৮০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সংসদে আনা প্রত্যেকটি প্রস্তাবকে ‘বিল’ বলা হয়েছে। আর সংসদ কর্তৃক সেই আইন গৃহীত হওয়ার পরে রাষ্ট্রপতির সম্মতি পেলেই তা আইন (সংসদের আইন বা অ্যাক্ট অফ পার্লামেন্ট) হয়ে যায়। সংসদের কার্যপ্রণালী-বিধি এর ১৩শ অধ্যায়-এ ধারা ৭২ থেকে ৯৮ পর্যন্ত বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া আছে, কিভাবে একটা ‘বিল’ কে সংসদ ‘আইন’ এ পরিণত করবে-- সংসদ মানে সংসদ সদস্যরা।

সংসদে বেসরকারী সদস্যদের বিল এবং সরকারী বিল-এই দু’ধরনের বিল উপস্থাপন করা যায়। সরকারী বিলগুলো তৈরির কাজ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, তারা একটা খসড়া তৈরি করে। এবং খসড়া বিলটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে নিরীক্ষার জন্য পাঠায়। নিরীক্ষা করে পরে আইন মন্ত্রণালয় তা আবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। নীরিক্ষিত বিলে কোনো আইনগত ঝামেলা নাই, এই মর্মে আইনমন্ত্রণালয় কর্তৃক আশ্বস্ত হয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষে একজন সংসদ সদস্য (মন্ত্রীও হতে পারেন) ওই বিল উত্থাপন করবেন জানিয়ে সংসদের সচিবকে নোটিশ দেন। সচিব বিলটি প্রজ্ঞাপনে প্রকাশ করেন এবং বিলের উদ্দেশ্য এবং কারণ দেখিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন।

যে সংসদ সদস্য বিল উপস্থাপন করেন তিনি বিলের ব্যাপারে নিচের যে কোন প্রস্তাব করতে পারেন।

ক) সংসদ কর্তৃক বিলটি তাৎক্ষণিকভাবে অথবা প্রস্তাবে নির্দেশিত কোনো ভবিষ্যৎ তারিখে বিবেচনার জন্য গ্রহণ করা হোক, বা

খ) এটি কোনো স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হোক, বা

গ) এটি কোনো বাছাই কমিটিতে পাঠানো হোক, বা

ঘ) জনমত বাছাই করার জন্য বিলটিকে প্রচার করা হোক।

চারটে সুযোগের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত প্রথম আর শেষ সুযোগটি সীমিত করে দিয়েছে কার্যপ্রণালী নিজেই। বাছাই/স্থায়ী কমিটির রিপোর্টের উপর বিতর্কের আওতাকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে; ধারা ৮১-এ বলা হয়েছে, ক্ষেত্রমত বাছাই কমিটি বা স্থায়ী কমিটির রিপোর্টের আকারে প্রদত্ত বিলটিকে বিবেচনার জন্য গ্রহণ করা হোক, এই মর্মে প্রস্তাবের উপর বিতর্ক কমিটির রিপোর্ট ও রিপোর্টের অন্তর্গত বিষয়াদি বিবেচনার মধ্যে কিংবা বিলের নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো বিকল্প পরামর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। এছাড়াও বিলটি যখন পাস করার জন্য সংসদে আনা হয় তখনও সীমিত পরিসরে বিতর্কের সুযোগ রয়েছে।

বলা হয়, রাষ্ট্রের তিন বিভাগের একটা হলো আইনসভা, সংসদ। যারা আইন তৈরি করেন। সেই সংসদেও কার্যপ্রণালী বিধি সচেষ্ট থাকে কিভাবে প্রস্তাবিত আইনের ওপর বিতর্কের সুযোগ সীমিত রাখা যায়। তারপরও সেই সীমিত সুযোগ ব্যবহারে বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের আগ্রহের অভাব নেই। তারা বিলের ওপর আলোচন করে সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। যেমন টিআইরি’র রিপোর্ট অনুযায়ী, ৯ম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৯ কার্যদিবসে মোট কর্মঘন্টা ছিল ১৪৫ ঘন্টা ২২ মিনিট। আইনপ্রণয়নের কাজে ব্যয় করা হয় মোট সময়ের মাত্র ৯.৭% সময়- মাত্র ১৪ ঘন্টা ৬ মিনিট। কিন্তু এরমধ্যেই পূর্বের সরকারের আমলে জারি কার ১২২ টি অধ্যাদেশের মধ্য থেকে ৩২টি আইন আকারে পাশ করা হয়। টিআইবি বহুত খেয়াল করে হিসাবটা রেখেছে। ধন্যবাদ দেই তাদের। সাথে এটুকুও বলে রাখি, এই হিসাব রাখার কাজ যারা করে তারাও কিন্তু বিচারপতি নজরুলের ভাষায় ‘কেরানী’। কিন্তু এই হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং ‘কেরানী’দের খাটো করে দেখলে তা অনুচিত হবে। একটা আইনসভা তার মেয়াদের প্রথম অধিবেশনে ১৪৫ ঘন্টার বেশি সময় ধরে বসলো, অথচ আইনপ্রণয়নের কাজে ব্যায় করলো মাত্র ১৪ ঘন্টা।

এবং সেই সময়ের মধ্যে সদস্যরা প্রস্তাবিত আইনগুলোর ওপর কি আলোচনা করেছেন তাও আমরা শুনেছি। তারা বরং আইনের প্রসঙ্গে না থেকে ‘অন্যান্য জনগুরুত্বপূর্ণসম্পন্ন’ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। কারণ প্রথমত সরকারদলীয় সদস্যরা জানেন, যেহেতু তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ সুতরাং এটা তো পাস হবেই। বিরোধীদলও এর উল্টোটা জানে, যেহেতু সংখ্যালঘু সুতরাং ‘কথার দাম নাই’। এবং কোনো সদস্য যদি দলের অবস্থানের বাইরে গিয়ে আলাপ করতে চান তবে সেই উপায়ও নেই। গঠনতন্ত্রের ৭০ অনুচ্ছেদ তার মাথার ওপর তরবারি নিয়ে বসে আছে। এমনকি দলের অবস্থানের ভেতর থেকেও যেটুকু করা সম্ভব সেটুকুও তারা করেন না। কেন? বিচারপতি নজরুল বলেন, ‘ডেমোক্রেটিক সোসাইটিতে বিশেষ করে পর্লামেন্টের সুবিধা যেখানে আছে। সেখানে এই পার্লামেন্ট, আইন সভা, এটা নতুন গাড়ি-বাড়ি কেনার জন্য না।’ তার মানে হলো; আমাদের দেশে সদস্যরা সংসদেও নির্বাচিত হন গাড়ি-বাড়ি কেনার জন্য। সেটা কোনো ‘ডেমক্রেটিক সোসাইটিতে’ হয় না? তামাম গণতান্ত্রিক দুনিয়া ভরেই তো সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হয়ে বিত্ত উপার্জন করেন। মাসখানেক আগেই গণতন্ত্রের তীর্থস্থান ব্রিটেনের বর্তমান প্রতিনিধি সভার সিনিয়র সদস্যদের প্রায় সবার বিরুদ্ধে ‘উপার্জন’ সংক্রান্ত অভিযোগ প্রমাণসহ ছেপেছে ওখানকার একটা দৈনিক, ডেইলি মেইল। আদালতে যেতে হয়নি কাউকে, এমন সব কড়া প্রমাণাদি হাজির করেছেন দৈনিকটির সাংবাদিকরা, অভিযুক্ত সদস্যরা বলেছেন, তারা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং তারা অনুতপ্তও বটে। এবং তারা আর কোনো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন না। তো, আধুনিক গণতন্ত্রে এমন উপার্জন সব সংসদ সদস্যরাই করেন। তবে মন্দের ভালো এই যে, পাশাপাশি তারা আইনসভার যে কাজ-- আইন প্রণয়নের কার্যকরভাবে সক্রিয় থাকেন। বাংলাদেশে যেটা করেন না সদস্যরা।

তাতে যা হয় তা হলো; মন্ত্রণালয়গুলোর ড্রাফটিং কর্মকর্তা, আমলা আর পরামর্শকরা যে বিল তৈরি করেন এবং আইন মন্ত্রণালয়ের ড্রাফটিং কর্মকর্তা, আমলা আর পরামর্শকরা যে বিলটি নীরিক্ষা করে সংসদে পাঠান, সেই বিলটাই প্রায় হুবহু আইনে পরিণত হয়। যেহেতু সংসদ সদস্যরা কেবল ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’ ভোট দিয়েই ‘আলোচনায় অংশ’ নেন। ভোট না দিয়েও উপায় নাই; গঠনন্ত্রের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য যদি তার দলের বিরুদ্ধে ভোটদান করেন অথবা সংসদে উপস্থিত থেকে ভোটদান থেকে বিরত থাকেন তবে তার সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে। এর পর পাস হওয়া বিলটি রাষ্ট্রপতির কাছে সম্মতির জন্য পাঠানো হবে এবং তিনি ১৫ দিনের মধ্যে বিলটিতে সম্মতি দিবেন। এরপর সংসদের সচিব অবিলম্বে সংসদের আইন হিসেবে বিলটি গেজেটে প্রকাশ করেন। অর্থাত মন্ত্রণালয়ে আইনটি লেখা শেষ করে কার্যত তা সরাসরি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয় আইন হিসাবে ঘোষণা দেয়ার জন্য-- মাঝখানে বাছাই কমিটি কিংবা হ্যাঁ ভোটওয়ালা সদস্যরা কোনো ‘কার্য’ই করেন না।

বলে রাখি, নামে আইনসভা হলেও আইন তৈরি ছাড়াও সংসদ আরো অনেক কাজ করে। তবে আইনসভা হিসেবে রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র এবং অন্যান্য আইন-কানুন বিধি-বিধান সংক্রান্ত কাজই মূলত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রধান কাজ। এবং এই কাজেই সবচে কম সময় ‘ব্যয়’ করে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। রাষ্ট্র নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হলো সংসদ-- রাজনীতিকেরা বলেন। এবং তারা যখন সংসদ গঠন করেন, তখন রাজনীতির সেই কেন্দ্রে বসে যা করার কথা তা করেন না। করেন অন্য কিছু।


ছাপবার জন্য এখানে ক্লিক করুন


৫০০০ বর্ণের অধিক মন্তব্যে ব্যবহার করবেন না।